#পর্ব_২১
#আমার_হয়ে_থেকো🍁
#Tasnim_Riya_khan
নারীকণ্ঠের তীব্র বিদ্রূপ আরভানের কানে পৌঁছালেও সে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। নির্বিকার চিত্তে নিজের ফোনের স্ক্রিনে নজর বুলিয়ে জেসিকাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করল। এই উপেক্ষা সইতে না পেরে জেসিকা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে আরভানকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল।
জেসিকা আরভানের পিঠে মুখ ঘষতে ঘষতে মাদকতাভরা স্বরে বলল, “এত কষ্ট করার কী দরকার এভি? ওমেন্স ওয়াশরুমের সামনে পাহারা না দিয়ে বরং আমার সাথে চলো, তোমার সব অপূর্ণতা আমি মিটিয়ে দেব।”
আরভানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে এক ঝটকায় জেসিকার হাত সরিয়ে তাকে ওয়াশরুমের পাশের এক নির্জন করিডোরে টেনে নিয়ে এল। তার শীতল চোখে এক অদ্ভুত অগ্নিপিণ্ড খেলা করছে। খুনে স্বরে বলল,
“তোমাকে মেয়ে বলে অনেক ছাড় দিয়েছি, অনেক সহ্য করেছি। এখন কিন্তু ভুলে যাবো যে তুমি একজন নারী। আমার ধৈর্য নিয়ে বিন্দুমাত্র ধারণা থাকলে আই থিঙ্ক তোমার এই সস্তা আচরণ এখনই বন্ধ করা উচিত।”
জেসিকা দুপা এগিয়ে এসে আরভানের খুব কাছাকাছি দাঁড়ালো। তার চোখে উন্মাদের মতো নেশা। সে ধরা গলায় বলল,
“আমি জানি তুমি কী করতে পারো, এভি। তোমার ভয়ংকর রূপটা আমার দেখা আছে। তবুও আমি তোমার পিছু ছাড়তে পারছি না। তোমার ওই রুক্ষতাতেই তো আমি আসক্ত!”
আরভানের কণ্ঠে তাচ্ছিল্য ঝরে পড়ল।
“কেন করছো এসব? সেদিন চড় মেরেছিলাম বলে? নাকি আমার কাছে বারবার রিজেক্ট হওয়ার তাড়নায় নিজেকে সস্তা প্রমাণ করতে চাইছো?”
”আমি তোমাকে ভালোবাসি এভি!” জেসিকা চিৎকার করে উঠল।
আরভান এক পা এগিয়ে এল। তার লম্বা সুঠাম শরীরটা জেসিকার ওপর পাহাড়ের মতো ছায়া ফেলল। সে নিচু স্বরে বলল, “ভালোবাসা কী তা কি বোঝো তুমি? নাকি শুধু শারীরিক আকর্ষণ আর বিকৃত জেদকেই ভালোবাসা মনে করো?”
জেসিকা এবার বিদ্রূপের হাসি হাসল। “শারীরিক আকর্ষণ? আমি সস্তা? তাহলে ওই মেয়েটা কী? যে মেয়েটা তোমার বৈধ স্ত্রী, যার না আছে রূপ, না আছে আভিজাত্য! আমার দিকে তাকাও এভি। আমার সব আছে, তোমাকে সুখী করার মতো সবকিছু আমার মাঝে আছে। তবুও তোমার মতো একজন পুরুষ প্রতিদিন নিজের বিছানায় ওই মেয়েটার শয্যাসঙ্গী হতে পারে? কী জাদু আছে ওর শরীরে যা আমাকে হার মানাচ্ছে?”
কথাটা শেষ করার আগেই আরভানের ভেতরের শান্ত আগ্নেয়গিরিটা এবার ফেটে পড়ল। সে জেসিকার গাল দুটো সজোরে নিজের এক হাতের মুঠোয় চেপে ধরল। জেসিকা ব্যথায় চোখ বন্ধ করে ফেলল, তার হাত দুটো আরভানের কোমর শক্ত করে আঁকড়ে ধরল নিজেকে সামলাতে। আরভান দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“মাইন্ড ইয়োর ল্যাঙ্গুয়েজ জেসিকা!তোমাকে বারবার ওয়ার্নিং দিচ্ছি , কারণ আমি আমার হাত নোংরা করতে চাই না। কিন্তু তুমি আমার ব্যক্তিগত জীবনে নাক গলিয়ে নিজের মৃত্যু পরোয়ানা নিজেই সই করছো!”
ঠিক সেই মুহূর্তে ‘ঠাস’ করে একটা শব্দ হলো। আরভান আর জেসিকা দুজনেই চমকে সেদিকে তাকালো। দেখল সামনে আয়াত দাঁড়িয়ে আছে। পাশে মেঝেতে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পড়ে আছে একটি সিরামিকের ফ্লাওয়ার ভাস। আয়াতের চোখ দুটো ছলছল করছে, শরীর থরথর করে কাঁপছে। কিন্তু সেখানে কান্নার চেয়েও বেশি ছিল এক রাশ ঘৃণা।
আরভান নিজের অবস্থার দিকে তাকালো। সে জেসিকার খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে তার গাল চেপে ধরে আছে, জেসিকাও তাকে জড়িয়ে ধরে আছে—দূর থেকে দেখলে মনে হবে তারা কোনো এক তৃষ্ণার্ত প্রেমিক-প্রেমিকার মতো নিবিড় মুহূর্তে মগ্ন।
আরভান কিছু বলতে যাওয়ার আগেই আয়াত এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়ালো না; সে উল্টো দিকে দৌড় দিল।
আরভান তার পিছু নিতে চাইলে জেসিকা আবার তার হাত টেনে ধরল। কিন্তু এবার আরভানের চোখে বিরক্তি নয়, বরং এক অদ্ভুত বক্র হাসি ফুটে উঠল; যা দেখে জেসিকার শিরদাঁড়া দিয়ে যেন হিমস্রোত বয়ে গেল।
জেসিকা অজান্তেই আরভানের হাত ছেড়ে দিল। আরভান ধীরপদে জেসিকার কাছে এগিয়ে এল। তার কপালে ঝুলে থাকা অবিন্যস্ত চুলগুলো পরম যত্নে কানের পিছে গুঁজে দিয়ে এক রহস্যময় কণ্ঠে বলল,
”সরি ডার্লিং! এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিরতির জন্য দুঃখিত। তবে চিন্তা করো না, তোমার জন্য সামনে অনেক বড় সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে। ওয়েট ফর মি… আই উইল গিভ ইউ অল মাই অ্যাটেনশন, ভেরি সুন!”
জেসিকা স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আরভানের এই হঠাৎ নমনীয়তার অন্তর্নিহিত মানে সে বুঝতে পারল না। আরভান কি তবে সত্যি তাকে গ্রহণ করবে? নাকি এই হাসির আড়ালে কোনো বড় ধ্বংসলীলা লুকিয়ে আছে?
***
আয়াত কাউকে কিছু না বলে পার্টি থেকে সোজা বেরিয়ে এল। তার মাথা কাজ করছে না। বুক ফেটে কান্না আসলেও সে নিজেকে শক্ত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। সে আর কোনোদিন আরভানের ওই বিষাক্ত মায়ার কাছে নিজেকে সঁপে দেবে না। অচেনা মেলবোর্নের রাস্তায় সে লক্ষ্যহীনভাবে হাঁটতে শুরু করল। চোখের জল বারবার দৃষ্টি ঝাপসা করে দিচ্ছে। ভেবেছিল মানুষটা হয়তো সত্যি তাকে ভালোবাসতে শুরু করেছে।কিন্তু না —আরভান চৌধুরী বড্ড জঘন্য। সে হয়তো প্রতিটি নারী শরীরের মাঝেই প্রশান্তি খোঁজে।
কিছুক্ষণ হাঁটার পর আয়াতের মনে হলো কেউ তার পিছু নিয়েছে। সে থামলে পায়ের শব্দও থেমে যায়, সে জোরে হাঁটলে শব্দটাও দ্রুত হয়। আয়াত আরচোখে পেছনে তাকাতেই তার কলিজা শুকিয়ে গেল। পাঁচজন লোক, যাদের কারো হাতে ধারালো অস্ত্র, কারো হ চায়নিজ কুড়াল আর কারো হাতে হকি স্টিক। এরা কি তাকে মারতে এসেছে? কিন্তু কেন? সে তো কারও শত্রু নয়। সে তো এ দেশে কাউকে চেনেও না!
আয়াত আর এক মুহূর্ত না ভেবে সোজা দৌড় দিল। লোকগুলো হয়তো প্রস্তুত ছিল না, দৌড়াতে দৌড়াতে সে একদম জনমানবহীন এক নির্জন গুদামঘরের এলাকায় চলে এসেছে। আশেপাশে সব অন্ধকার আর ঝোপঝাড়।
আয়াত হাঁপাতে হাঁপাতে তার ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করল। ভাবল এলিনাকে কল দেবে। অন্তত তিনি তাকে উদ্ধার করতে পারবেন। কিন্তু স্ক্রিনে আঙুল ছোঁয়ানোর আগেই এক অতি পরিচিত ঘিনঘিনে কণ্ঠস্বর আয়াতের কানে প্রবেশ করল।
”এতটা তারা কিসের জানপাখি?”
আয়াত পাথর হয়ে পেছনে ফিরল। তার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। সামনে দাঁড়িয়ে আছে শাহরিয়ার! পরনে একটা ওভারসাইজড টি-শার্ট, এলোমেলো চুল, গলায় ঝুলছে প্ল্যাটিনামের স্টাইলিশ চেইন। ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত ধূর্ত আর বিকৃত হাসি। সে দেয়ালের সাথে দুই হাত বুকে বেঁধে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে মুখ ভর্তি চুইংগাম চিবুচ্ছে।
শাহরিয়ার বাকা হেসে বলল, “নিজে খুঁজে আমার কাছেই চলে আসলে জানপাখি? দ্যাট মাচ ইউ মিস মি? ওহ, আই অলসো লাভ ইউ জানু। এখন চলো, আমাদের পুরনো হিসেবটা আজ মিটিয়ে ফেলি। এবার আর কোনো আরভান এসে তোমাকে আমার কোল থেকে কেড়ে নিতে পারবে না।”
আয়াতের পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল। যে নরক থেকে সে বাঁচতে চেয়েছিল, সেই নরকই আজ সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
আজ যেন তার এক চরম অগ্নিপরীক্ষা চলছে। নিস্তব্ধ, জনমানবহীন রাস্তায় সে একা; আর সামনে এক ধূর্ত, শক্তিশালী জানোয়ার। গায়ের শক্তিতে শাহরিয়ারের সাথে লড়াই করে জেতা সম্ভব নয় জেনেও আয়াতের দুচোখে আজ আগুনের ফুলকি। সে ঘৃণায় মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“শয়তানদের বোধহয় আমন্ত্রণ জানাতে হয় না; তারা অন্যের জীবন নরক বানাতে দুর্গন্ধ শুঁকেই নিজে থেকে হাজির হয়ে যায়।”
শাহরিয়ার চুইংগামটা মুখ থেকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে বিশ্রীভাবে হাসল।
“হায় এখনো সেইম তেজ? এই তেজটাই তো তোমার প্রতি আমার আকর্ষণ বাড়িয়ে দেয় জানপাখি। তা এই তেজটা কি শুধু আমার ওপর দেখানোর জন্য তোলা থাকে, নাকি আরভান চৌধুরীর স্পর্শেও এই আগুন জ্বলে ওঠে?”
আয়াত ঘৃণাভরা চোখে তাকিয়ে বলল,
“সে আপনার মতো জানোয়ার নয়।আগে নিজের ছায়াটা আয়নায় দেখুন, মানুষ নয়—একটা পিশাচকে দেখতে পাবেন।”
শাহরিয়ার মাথা দুলিয়ে অট্টহাসি হাসল। তারপর গায়ের ওভারসাইজড টি-শার্টটা খুলে ছুড়ে ফেলে দিয়ে ধীরপায়ে আয়াতের দিকে এগোতে শুরু করল।
তার চোখেমুখে তখন আদিম এক লালসা। সে কুৎসিত স্বরে বলল,
“এত প্রসংশা যার জন্য সেই, আরভান চৌধুরী তোমাকে আগলে রাখতে পারবে না আয়াত। আজ এই নির্জনতায় আমি তোমাকে বোঝাবো, একজন আসল পুরুষ কাকে বলে। তোমার ওই তথাকথিত স্বামীর আভিজাত্য আজ আমার পায়ের নিচে পিষ্ট হবে।”
তার উন্মুক্ত শরীর আর চোখের লালসা দেখে আয়াতের বুকের ভেতরটা শুকিয়ে গেল। মনে এক অদ্ভুত শঙ্কা দানা বাঁধতেই সে আবারও দৌড়াতে শুরু করল। পেছন থেকে ভেসে এল শাহরিয়ারের পৈশাচিক হাসি,
”বারবার কোথায় পালাবে জানপাখি? আমার খাঁচা থেকে আজ পালানো অসম্ভব। সন্ধ্যা প্রায় অন্ধকার হয়ে এসেছে।এই গভীর জঙ্গলে আজ আমিই রাজা আর তুমি আমার শিকার। ”
আয়াত গভীর অন্ধকারের ঝোপঝাড়ের দিকে ছুটে চলল। দৌড়াতে দৌড়াতে ঝোপঝাড়ের কাঁটায় আয়াতের হাত-পা ছিলে যাচ্ছিলো কিন্তু সে থামলো না।
একজন নারীর কাছে নিজের ইজ্জতের চেয়ে বড় সম্পদ আর কিছুই নেই। যেখানে কিছু পুরুষরূপী কাপুরুষ একটা অবুঝ শিশুকেও ছাড়ে না, সেখানে সে তো এক যৌবনবতী নারী। পুরুষালি পাশবিক শক্তির সামনে একজন নারীর শারীরিক শক্তি হয়তো বড্ড নগণ্য, কিন্তু তাদের আত্মসম্মানের শক্তি হিমালয়সম।
দৌড়াতে দৌড়াতে হুমড়ি খেয়ে আছাড় খেল সে, হিল জুতোটা ছিঁড়ে গেল। কিন্তু আয়াত থামল না; সে শুধু এই নরকের কীটের চোখের আড়াল হতে চাইল। পায়ের পাতায় ধারালো পাথর আর কাঁটা বিঁধে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেল, তবুও সে ছুটল। কয়েকবার গাছের সাথে ধাক্কা খেল, ঝোপের আড়ালে পা আটকে ছিটকে পড়ল—অবশেষে শ্রান্ত শরীর আর সায় দিল না। আয়াত একটা বিশাল ওক গাছের নিচে বসে পড়ল।
চারপাশে অচেনা বন্য পশুদের ডাক। অস্ট্রেলিয়ার এই গহীন বন মানেই বিষাক্ত সব পোকামাকড় আর প্রাণীর আস্তানা। আয়াতের মনে হলো—এটাই কি তবে তার শেষ রাত? কালকের ভোরের সূর্য কি আর তার চোখে ধরা দেবে না? অবশ্য তার জন্য এটাই হয়তো সঠিক—আরভানের দেওয়া অবজ্ঞা আর শাহরিয়ারের লালসা থেকে চিরতরে মুক্তি।
এমন অন্ধকার ভাবনায় ডুবে থাকার সময় আচমকা আয়াতের ঘাড়ের কাছে কারো উষ্ণ নিশ্বাস পড়ল। সেই পরিচিত কড়া পারফিউমের ঘ্রাণ নাকে আসতেই আয়াতের মুখ দিয়ে অবলীলায় বেরিয়ে এল,
“আরভান!”
”ইয়েস! মিসেস আরভান…”
আয়াত চমকে তাকাতেই দেখল ঘন অন্ধকারের মাঝে দুটো জ্বলজ্বলে চোখ তার দিকে চেয়ে আছে। বুকটা ধক করে উঠল তার। সে যেন ডুবন্ত অবস্থায় এক টুকরো খড়কুটো নয়, বরং আস্ত এক জাহাজ খুঁজে পেল। তবে পরক্ষণেই জেসিকার সাথে দেখা দৃশ্যের অভিমান ফিরে এল কণ্ঠে। সে শক্ত হয়ে বলল,
“আপনি এখানে আসলেন কী করে? তাছাড়া এই ঘন অন্ধকারে জানলেন কী করে আমি এখানে আছি?”
আরভান অন্ধকারের মধ্যেই আয়াতের একদম কাছে মুখ নিয়ে এল। তার কণ্ঠস্বর অদ্ভুত নিচু আর মাদকতাময়। সে ফিসফিস করে বলল,
”তোমার নিশ্বাস নেওয়ার শব্দ আমি হাজার মাইল দূর থেকেও শুনতে পাই সুইটি! তোমাকে পটাতে এই খতরনাক ‘ফিল্মি হিরো’ টাইপ ডায়ালগটা প্র্যাকটিস করে আসলাম। তা… তুমি কি একটুও পটেছো, আয়াত?”
আয়াত আনমনে বিড়বিড় করল, “বজ্জাত লোক! এমন পরিস্থিতিতেও সে সিরিয়াস থাকতে পারে না!”
পরক্ষণেই তেতে উঠে বলল,” আপনি এখানে কেন এসেছেন? ওখানে যা করছিলেন তাই করতে পারতেন—জেসিকার সাথে মাখামাখি! এখানে এসে আপনার বিশেষ কোনো লাভ নেই।”
আয়াতের কথা শেষ হওয়ার আগেই তার গালে কারো নরম ঠোঁট ছোঁয়া দিয়ে গেল। আরভান তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
“আপনি কি জেলস মিসেস?”
আয়াত থমকে গেল। কাঁপাকাঁপা গলায় বলল,
“মো… মোটেও না! আমি কেন জেলস হবো? আপনি যার সাথে যা খুশি করুন, জড়িয়ে ধরুন আর ঢলাঢলি করুন।আমার তাতে কী আসে যায়?”
আরভান তার হাত দিয়ে আয়াতের মুখটা নিজের দিকে ফেরাল। অন্ধকারে তার চোখের মণি দুটো হিরের মতো জ্বলছে। সে গম্ভীর স্বরে বলল,
“এই ঠোঁট আজ পর্যন্ত শুধু একজনকে ছুঁয়েছে মিসেস -আর সে আপনি। সবসময় চোখের দেখা বিশ্বাস করতে নেই। জীবনে এই প্রথম কাউকে কৈফিয়ত দিচ্ছি, এর বেশি আমার কাছে আশা করবেন না।”
আয়াত তিক্ত স্বরে বলল, “আপনি বলছেন আপনি জেসিকার সাথে কিছুই করেন নি? আপনি একদম ধোয়া তুলসী পাতা?”
“ইউ ওয়ান্ট টু চেক মাই ভার্জিনিটি মিসেস?” আরভানের এমন লাগামহীন সরাসরি প্রশ্নে আয়াত কেশে উঠল। সে তড়িঘড়ি করে বলল, “শরীর খারাপ লাগছে, আমি বাড়ি যাবো।”
আরভান ফোনের ফ্ল্যাশ জ্বালাল। সে পকেট থেকে আয়াতের ফোনটা বের করে তার হাতে দিল। আয়াত অবাক হয়ে বলল, “এটা তো আমার ফোন! দৌড়ানোর সময় জঙ্গলর কোথায় যেন পড়ে গিয়েছিল, আপনি কীভাবে পেলেন? আমার মতো কি আমার ফোনের নিশ্বাসের শব্দও কি হাজার মাইল দূর থেকে পেয়েছেন?”
আরভান একটু রহস্যময় হাসি দিয়ে বলল, “বলতে পারেন সেটাই—ফোনের নিশ্বাসের শব্দ শুনেই আপনার কাছে এসেছি।”
সে আয়াতের গায়ের ধুলোবালি ঝেড়ে দিতে দিতে তার মুখের খুব কাছে চলে এল।
আয়াত তিক্ত গলায় বলল,” কি করছেন- কিছুক্ষণ আগে একজনকে দিয়ে মেটেনি? এখন এখানে এসেছেন আর কখনও আমাকে ছোঁবেন না আপনি।”
আরভান মুচকি হেসে বলল,
”হাজার জনকে দিয়েও এই লাল শাড়ির মালিকের চাহিদা মেটানো সম্ভব না মিসেস। আপনার ভেতরে এত ইনসিকিউরিটি কেন? জেসিকার সাথে দেখে এতটা কষ্ট যখন পাচ্ছিলেন, তবে পালিয়ে না এসে এগিয়ে গিয়ে দুটো চড় কেন মারলেন না আমাকে?”
আয়াতের চোখের কোণ ঘেঁষে এক ফোঁটা জল গাল বেয়ে পড়ল। আরভান একটু নড়েচড়ে আয়াতকে শক্ত করে নিজের বুকের সাথে পিষ্ট করে আলিঙ্গন করে নিল। আয়াতের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “কাঁদছো কেন আয়াত? আমি তো তোমার চোখের জল সহ্য করতে পারি না।”
“কোন অধিকারে মারবো? আপনার ওপর আমার কোনো অধিকার নেই আরভান। আজ এই লাল শাড়িতে আমাকে দেখে আপনার বেসামাল দশা হচ্ছে, তাহলে প্রথম যেদিন আপনি চৌধুরী বাড়িতে পা দিয়েছিলেন সেদিন কেন হননি? সেদিনও তো আমি লাল শাড়িতেই আপনার সামনে দাঁড়িয়েছিলাম! সেদিন তো শুধু তিক্ত কথা শুনিয়েছিলেন।”
আরভান আয়াতের গলার ভাঁজে মুখ গুঁজে দিল। আয়াত শক্ত হয়ে এক হাত দিয়ে আঁচল খামচে ধরল। সে নিজেকে ছাড়াতে চাইলেও আরভানের শক্তির কাছে পরাস্ত হলো। আরভান ফিসফিস করে বলল,
“কারণ সেদিন তোমার সাজ অন্য কোনো পুরুষের জন্য ছিল, আমার জন্য নয়। নিজের স্ত্রীকে অন্যের জন্য বউ সাজতে দেখলে কেমন লাগে তা কি জানো?”
”আপনি তো সেদিন আমায় স্ত্রী হিসেবে দেখেননি। ডিভোর্স পেপার মুখে ছুড়ে দিতে গিয়েছিলেন!”
আরভান আয়াতের গলার ভাঁজে ছোট একটা চুমু এঁকে দিয়ে বলল,
“ডিবোস তো আমি অস্টেলিয়ে বসেও পাটাতে পারতাম আয়াত।তাহলে কেন ওখনে গিয়েছিলাম একবার কি ভেবে দেখেছো।কেন শাহরিয়ারের গালায় তার পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করতে চেয়েছিলাম? কেন তার হাতে আঘাত করেছিলাম? তোমার কি কিছুই চোখে পড়ে না,আয়াত? শাহরিয়ার মতো একজন পুরুষ কেন বলবে—সে ছাড়া তোমার ঘরে অন্য কেউ প্রবেশ করতে পারবে না? আর তুমিও তার কথায় প্রতিবাদ করোনি! তখনই তো আমার মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল।
তাহলে আজ আমি জেসিকার সাথে সামান্য কথা বললে তোমার কেন এতটা কষ্ট হলো?”
আয়াত ধরা গলায় বলল,
“আপনি বারবার আমায় সরিয়ে দিতে চেয়েছেন আরভান। আমি কি করে বুঝবো আপনার মনে কী ছিল?”
”তুমি কেন নিজের অধিকার বুঝে নাওনি আয়াত? হ্যাঁ, তোমাকে বিয়ের সাজে দেখে রাগে জেসিকাকে ফিওন্সে বলেছিলাম।দেখতে চেয়েছিলাম তোমার স্বামী অন্য কাউকে বিয়ে করছে শুনলে তোমার প্রতিক্রিয়া কী হয়। কেন এগিয়ে এসে সেদিন প্রতিবাদ করোনি? কেন বলোনি— ‘ডিভোর্স দেব না’? আমি তোমার মুখ থেকে ওই ‘না’ শব্দটা শোনার অপেক্ষায় ছিলাম আয়াত।”
”আমি কেনো অধিকার ফলাতে যাবো? যে মানুষটা ১২ বছর পর ফিরে এসেই ডিভোর্স চায়, তার ওপর কিসের অধিকার?”
”অধিকার কেউ কাউকে দেয় না আয়াত, অধিকার ছিনিয়ে নিতে হয়। সবসময় মনে রাখবেন,ম্যাডাম —আপনার স্বামী একটু উদ্ধত হলেও চরিত্রহীন নয়, সে কেবল অভিমানী।”
”আপনি বড্ড অদ্ভুত আরভান! আগে নিদ্বিধায় নামাজের প্রতিটা মোনাজাতে আপনাকে চাইতাম, তবে এখন সৃষ্টিকর্তার কাছে আপনাকে নিজের জন্য চাইতে বড্ড ভয় লাগে।”
আরভান অদ্ভুতভাবে হাসল এবং আয়াতের ঠোঁটে নিজের তপ্ত আঙুল চেপে ধরল।
“তাহলে চাওয়া বন্ধ করে দাও।আর শুধু বিশ্বাস করো। বিশ্বাস যদি করতে না পারো, তবে শুধু অনুভব করো।
সে আয়াতের হাতটা নিয়ে নিজের হৃৎপিণ্ডের ওপর রাখল।
”আপনাকে চাওয়া আমার অভ্যাস আর অভ্যাস এত সহজে যায় না আরভান।”
আয়াত উঠে দাঁড়াতে যেতেই ব্যথায় গোঙানি দিয়ে উঠল। “আহ!”
আরভান অস্থির হয়ে বলল, “কী হয়েছে?”
“পায়ে কাঁটা ঢুকেছে।”
”হোয়াট! এতক্ষণ ধরে বসে আছো, কিছু বলোনি কেন? আর এই জঙ্গলে কেন ঢুকেছিলে তুমি?”
আরভান আর এক মুহূর্ত দেরি না করে আয়াতকে পাঁজাকোলে তুলে নিল। আয়াত তার গলা জড়িয়ে ধরল। আরভান হাঁটতে হাঁটতে বলল,
“জঙ্গলে কেন এসেছিলে তা এখনও বলোনি আয়াত।”
আয়াত আরভানের কাঁধে মাথা রেখে বলল,
“কাউকে দেখে ভয় পেয়েছিলাম, তাই বাঁচার জন্য এখানে ছুটে এসেছি।”
আরভান উত্তর দিল না, শুধু একটা বাঁকা হাসি হাসি দিল যা আয়াতের চোখে এড়ালো না।।
সে গম্ভীল স্বরে বলল,
“একটা সামান্য পুরুষের ভয়ে আপনার জঙ্গলে ঢোকা উচিত হয়নি মিসেস। লড়াই করা উচিত ছিল।”
আয়াত অবাক হয়ে বলল,
“আপনি কী করে জানলেন? তার মানে কি আপনি শাহরিয়ারকে দেখেছেন?”
”দেখেছি।”
আরভানের গলার স্বর হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল।
আয়াত অবাক চোখে আরভানের দিকে তাকিয়ে রইল। আরভান বনের দুর্গম রাস্তা দিয়ে সাবধানে পা ফেলে আয়াতকে বুকে জড়িয়ে নিজের গাড়ির দিকে এগিয়ে চলল।
চলবে….
#পর্ব_২২
#আমার_হয়ে_থেকো🍁
#Tasnim_Riya_khan
গহীন অরণ্যের বুক চিরে আরভান আয়াতকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে এসে গাড়ির সামনে দাঁড় করালো। গাড়ির হেডলাইটের প্রখর সাদা আলোয় অন্ধকার জায়গাটা মুহূর্তেই আলোকিত হয়ে উঠল। আরভান খুব সাবধানে আয়াতকে গাড়ির সামনের সিটে বসিয়ে দিয়ে তার পা দুটো বাইরের দিকে ঝুলিয়ে দিল। এরপর গাড়ির ভেতর থেকে ফার্স্ট এইড বক্সটা বের করে এনে ঠিক আয়াতের পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসল সে।
আয়াত নিষ্পলক চোখে আরভানের দিকে তাকিয়ে আছে। এই মানুষটার প্রতিটি ভাঁজে আজ এক রহস্যময় শীতলতা। আরভান আয়াতের ক্ষতবিক্ষত পায়ের দিকে তাকিয়ে খুব নিরাসক্ত গলায় বলল,
“আমি ভেবেছিলাম তুমি বাংলাদেশে যাওয়ার জন্য হয়তো শাহরিয়ারের সাথে স্বেচ্ছায় চলে যাবে। কারণ তোমার কাছে তো আমিই সবচেয়ে বড় ভিলেন, তাই না? কিন্তু তুমি তো দেখছি বড্ড ভীতু, তাকে দেখেই জান হাতে নিয়ে উল্টো দিকে দৌড় দিলে!”
কথাটা বলে আরভান আয়াতের মুখের দিকে তাকালো। আয়াতের চোখ দুটো অভিমানে ছলছল করছে। আরভানের চোয়াল শক্ত, কিন্তু চোখের কোণে এক অদ্ভুত দহন। আরভান তুলা দিয়ে আয়াতের পায়ের রক্ত পরিষ্কার করতে করতে বলল,
“মনের মধ্যে যা আছে বলে দিতে পারো আয়াত। এভাবে বোবা হয়ে থাকাটা তোমার সাজে না।”
আয়াত এক ঢোক গিলে অস্ফুট স্বরে বলল,
“একজন হিংস্র পুরুষ আপনার স্ত্রীর পিছু নিয়েছিল, আপনি সেটা নিজের চোখে দেখলেন; তারপরও আপনি কিছুই করলেন না? বরং দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছিলেন? আপনি কি এতটাই নির্দয়?”
আরভান ক্ষতস্থানে অ্যান্টিসেপটিক লাগাতে লাগাতে বলল,
“আমি আসার পূর্বেই তুমি জঙ্গলে ঢুকে পড়েছিলে। তোমার সেই সো-কল্ড স্টকার আমার গাড়ি দেখেই ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে পড়েছিল। যারা কাপুরুষের মতো লুকিয়ে আক্রমণ করতে চায়, তাদের আমি অন্তত সামনাসামনি আপ্যায়ন করি না। তবে তুমি যে এমন বোকামি করবে তা ভাবিনি।”
কথাটা বলার মাঝেই আরভান আয়াতের পায়ে বিঁধে থাকা কাঁটাটা এক হ্যাঁচকায় টেনে বের করল। যন্ত্রণায় আয়াত “আহ!” করে চিৎকার দিয়ে আরভানের চুল খামচে ধরল। তার চোখ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ল। অভিমানে বুক ফেটে যাচ্ছিল তার। সে ধরা গলায় বলল,
“হ্যাঁ, আমি তো বোকাই! তাহলে কেন আসলেন আমাকে বাঁচাতে? আমি আপনার কে-ই বা হই? আমাকে কেউ মেরে ফেললেও তো আপনার কিছু যায় আসে না!”
আরভানের হাত মুহূর্তেই স্থির হয়ে গেল। তার চোখ দুটো মুহূর্তেই হিংস্র জানোয়ারের মতো লাল হয়ে উঠল। মুখ তুলে একদম আয়াতের চোখের গভীরে তাকিয়ে ক্ষিপ্ত স্বরে বলল,
“তোমাকে কেউ ছোঁয়ার সাহস দেখালে, তাকে আমি জ্যান্ত পুড়িয়ে মারবো! মনে রেখো আয়াত, তুমি কেবলই আমার।”
বলেই সে ব্যান্ডেজটা এত জোরে গিঁট দিল যে আয়াত ব্যথায় চোখ কুঁচকে আরভানের শার্টের কলার শক্ত করে চেপে ধরল। আরভান তার হাতটা আলতো করে ছাড়িয়ে দিয়ে তাকে সিটের ভেতরে সরিয়ে দিল। তারপর নিজেও ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসল। আয়াত স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। এই আরভান বড্ড অপরিচিত, বড্ড রহস্যময়। তার এত রূপ কেন? কখনো প্রেমিক, আবার কখনো খুনে মেজাজের পাষাণ। এর মধ্যে কোনটা আসল আরভান?
গাড়ি চলতে শুরু করলে আরভান গুমোট স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“পার্টি থেকে বের হয়ে শাহরিয়ার পিছু নিয়েছিল বলেই কি এত দূরে এসেছো?”
আয়াত জানালা দিয়ে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল,
“সেখান থেকে বের হওয়ার পর আরও পাঁচজন লোক আমার পিছু নিয়েছিল। তাদের হাতে ধারালো অস্ত্র ছিল। আমি ভয় পেয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে পথ হারিয়ে শাহরিয়ারের সামনে পড়ি।”
আরভান আর কোনো প্রশ্ন করল না। সে ফোন বের করে কিছু একটা টাইপ করল। কিন্তু সিগন্যাল নেই দেখে বিরক্তিতে ফোনটা ড্যাশবোর্ডে ছুড়ে মারল।
“আসার আর জায়গা পেলে না? এমন জায়গায় আসলে যেখানে ফোনের নেটওয়ার্ক পর্যন্ত নেই!”
হঠাৎ গাড়িটা এক তীব্র ঝাঁকুনি দিয়ে থেমে গেল। আরভান বিড়বিড় করে একগাদা গালি দিয়ে গাড়ি থেকে নামল। টায়ার পাংচার হয়েছে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সে আয়াতের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি একটু আসছি, দেখি আশেপাশে কাউকে পাওয়া যায় কি না।”
আয়াত আঁতকে উঠে আরভানের হাত চেপে ধরল।
“আমাকে এভাবে একা ফেলে যাবেন না প্লিজ! আমার খুব ভয় করছে।”
আরভান একবার তৃষ্ণার্ত দৃষ্টিতে আয়াতের ভীতু মুখটার দিকে তাকালো। তার চোখের কাঠিন্য কিছুটা নরম হলো। সেই মায়াবী চোখের চাহনিতে আয়াত মুহূর্তেই কুপোকাত। আরভান কোনো কথা না বলে নিচু হয়ে আয়াতকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল। আয়াতের হাতে ফোনের ফ্ল্যাশলাইট অন করে দিয়ে বলল, “আলোটা সামনে ধরো।”
আয়াত আবেশে আরভানের গলা জড়িয়ে ধরল। তার পুরো মনোযোগ তখন আরভানের ওপর। সে এতটাই আরভানের মুখের দিকে তাকিয়ে বিভোর হয়ে ছিল যে ফ্ল্যাশলাইটটা রাস্তার বদলে আরভানের মুখের ওপর ধরে রেখেছে।
আরভান বাঁকা হেসে বলল, “মিসেস আরভান, আপনার হাসবেন্ড কোথাও যাচ্ছে না, তাকে পরে দেখলেও চলবে। আপাতত আলোটা সামনে ধরুন যাতে আমি রাস্তাটা দেখতে পাই।”
আয়াত অপ্রস্তুত হয়ে তড়িঘড়ি করে আলোটা অন্যদিকে ঘোরাল। কিছুদূর যেতেই রাস্তার পাশে বিশাল এক আজগর সাপ দেখে আয়াত গগনবিদারী চিৎকার দিয়ে আরভানের গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার বুকে মুখ গুঁজে দিল। “আরভান! সাপ! ও আমাদের খেয়ে ফেলবে! প্লিজ পালান এখান থেকে!”
আরভান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “বোকা মেয়ে! গলাটা ছাড়ো, সাপ মারার আগে তুমিই তো আমাকে শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলবে!”
আয়াত গলার বাঁধন সামান্য ঢিলে করলেও মুখ তুলল না। ফিসফিস করে বলল, “প্লিজ চলুন না এখান থেকে! না হয় আমাকে নিচে নামিয়ে দিন, আমি দৌড় দেব।”
আরভান বিরিবির করে ”স্বার্থপর মেয়ে,”বলেও মুখে বলল,
”তুমি বড্ড জ্বালাচ্ছো আয়াত। ও ওর মতো চলে যাচ্ছে, আমাদের দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না। সারা রাত আমরা এভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারবো না।”
আয়াতের ভয় তবুও কমল না। সে কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি কোনো কিছুতেই ভয় পান না?”
“না।” আরভান সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল।
আয়াত আরভানের কাঁধে মাথা রেখে আবারও তার তীক্ষ্ণ নাক আর চোয়ালের দিকে তাকালো। ঠিক তখনই একটা ছোট্ট পরিত্যক্ত কাঠের বাড়ি নজরে পড়লে আরভান সেদিকেই পা বাড়ালো।
***
আরভান আয়াতকে ইশারা করতেই সে কাঠের দরজায় নক করল। কিছুক্ষণ পর ভেতর থেকে এক বৃদ্ধা নারী বেরিয়ে এলেন। আরভান তার কাছে নিজেদের পরিস্থিতির কথা খুলে বললে তিনি জানালেন, এই তল্লাটে নেটওয়ার্ক পাওয়া দুষ্কর। নিকটস্থ লোকালয়ে যেতেও অন্তত ৩০ মিনিট সময় লাগবে, কিন্তু এত রাতে এই জঙ্গলের রাস্তায় আয়াতকে নিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি আরভান নিতে চাইল না। বৃদ্ধার প্রস্তাবে তারা সেই বাড়িতেই রাতটুকু কাটাতে রাজি হয়ে গেল।
বৃদ্ধা তাদের ছোট একটা ছিমছাম রুমে নিয়ে গেলেন। রুমটিতে একটি মাত্র সিঙ্গেল বেড। আয়াতের অন্তরাত্মা শুকিয়ে গেল—আরভানের সাথে এক ঘরে, এক বিছানায়! সেদিন জ্বরের ঘোরে ওসব খেয়াল ছিল না, কিন্তু আজ তো সে পূর্ণ সজ্ঞানে। এইটুকু বিছানায় দুজন শোয়া কি আদৌ সম্ভব? তার ভাবনার মাঝেই বৃদ্ধা নারীটি আয়াতের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হেসে বললেন, “ইওর বয়ফ্রেন্ড ইজ টু মাচ হ্যান্ডসাম!”
আয়াত কিছুটা লজ্জা পেল, তবে মৃদু হেসে।গর্বের সাথে জবাব দিল, “হি ইজ মাই হাজব্যান্ড।” নারীটি মাথা নেড়ে হাসিমুখে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
আরভান কোথায় যেন গেল। বেশ কিছুক্ষণ হয়ে গেছে সে ঘরে নেই। আয়াত বিছানার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে যখন গভীর ভাবনায় মগ্ন, ঠিক তখনই পেছন থেকে গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “আমার জন্য অপেক্ষা করছিলে বুঝি?”
আয়াত চমকে উঠে পেছনে ফিরতে গিয়ে আরভানের শক্ত শরীরের সাথে ধাক্কা খেল। টাল সামলাতে না পেরে সে বিছানায় ধপ করে বসে পড়ল। আরভান সেই সুযোগে আয়াতের দুই হাত বিছানায় আটকে তার ওপর ঝুঁকে এল। আয়াত ছটফট করে বলে উঠল, “কী করছেন? ছাড়ুন! সবসময় অসভ্যদের মতো আচরণ কেন করেন?”
আরভান আয়াতের চোখের গভীরে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বলল, “তখন তো অন্ধকারে খুব স্বামীকে দেখা হচ্ছিল। এখন তো আলো আছে, আমি আছি। লুক অ্যাট মি, আয়াত।”
আয়াত চোখ খিঁচিয়ে বন্ধ করে তাকে ঠেলতে লাগল। আরভান তার উত্তপ্ত আঙুলগুলো আয়াতের গলার ভাঁজে স্লাইড করতে করতে ফিসফিস করে বলল,
“আই’ম অবসেশন টু ইয়র নেক, ইয়র নেক হ্যাজ মি কমপ্লিটলি এনচান্টেড, আয়াত!”
বলেই সে আয়াতের গলার নরম বাঁকে মুখ ডুবিয়ে দিল। আয়াত থমকে গেল। আরভানের ছোট ছোট উষ্ণ চুমুর ছোঁয়ায় তার সারা শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল। আয়াতের এমন আড়ষ্টতা দেখে আরভান মুখ তুলে তাকালো। দেখল আয়াতের চোখ বন্ধ, কিন্তু চোখের কোণ দিয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে। তার বুকটা ধড়ফড় করে কাঁপছে। আরভান গম্ভীর স্বরে বলল,
“এত সহজে এই ছোঁয়াকে একসেপ্ট করে নিলে নাকি মিসেস?”
উথাল-পাতাল বুক নিয়ে আয়াত কোনোমতে বলল, “দেখতে চাইছি আপনি ঠিক কতদূর পর্যন্ত যেতে পারেন।”
আরভান তার কথায় শব্দ করে হাসল। আয়াতের কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে সে পাশে ধপ করে শুয়ে পড়ল। আয়াত আরভানের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। আরভান সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “যেতে তো আমি অনেক দূর পারি আয়াত, তবেতবে বিনা অনুমতিতে সীমানা অতিক্রম করা আমি পছন্দ করি না।”
কথাটা বলে আরভান উঠে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে এল। কিছুক্ষণ পর সে কিছু খাবার আর দুটো ওষুধ নিয়ে ঘরে ঢুকল। আয়াতের দিকে খাবার এগিয়ে দিয়ে বলল,
“খাবারটা খেয়ে এই ঔষধ দুটো খেয়ে নাও। এই অবস্থায় তোমার আবার জ্বর উঠলে আমার কী হাল হবে বুঝতে পারছো নিশ্চই? পার্টিতে তোমার শরীর গরম দেখেছিলাম, আমি আর রিস্ক নেব না।”
আরভান নিজেই খাবার তুলে আয়াতের মুখে ধরল। আয়াত একের পর এক চমক পেয়েই যাচ্ছে। তার চোখ দুটো কেন যেন ছলছল করে উঠল। আজীবন অবহেলার পর এইটুকু আদর যেন তার সহ্য হচ্ছে না। কোনো বাক্যব্যয় না করে সে খাবার খেয়ে ওষুধ খেয়ে নিল।সব ঠিকঠাক চললেও শোয়ার সময় বিপত্তিটা আবার শুরু হলো। আরভান চোখ কুঁচকে বলল,
“ভদ্রমহিলা তোমাকে যে ঢিলেঢালা পোশাকটা দিয়েছেন সেটা পরে নাও। আমার পাশে শাড়ি পরে ঘুমানো যাবে না।”
আয়াত ভ্রু কুঁচকে বলল, “কেন? আমার শাড়ি কি আপনাকে চুলকাচ্ছে?”
আরভান বাঁকা হেসে বলল, “প্রচুর চুলকায়! মনে হয় শাড়ির প্যাঁচগুলো নিজের হাতে খুলে ফেলি।”
আয়াতের চোখ বড় বড় হয়ে গেল। সে তোতলামি করে বলল, “আপনার সাথে এক বিছানায় আমি শোব এটা ভাবলেন কী করে? আমি নিচে ঘুমাবো।”
আয়াত বালিশ নিয়ে নিচে শুতে গেলে আরভান আফসোসের সুরে বলল, “শোও, আমার কী! এটা অস্ট্রেলিয়ার জঙ্গলের ভাঙাচোরা বাড়ি। এখানে পোকা-মাকড়, জিন-ভূত আর মাঝে মাঝে এনাকোন্ডাও আসে। ওরা মানুষকে খেয়ে ফেলে আবার চলে যায়। আর ওদের তো জেলের ভয় নেই!”
আয়াত ভ্রু কুঁচকে বলল, “আমাকে কি খুব বোকা মনে হয় আপনার? আপনি আবোলতাবোল গল্প বলবেন আর আমি বিশ্বাস করব? ঘরের মধ্যে সাপ আসবে কীভাবে?”
”তুমি কেন বোকা হবে? বোকা তো হলো সাপ। ওই দেখো জানালাটা ভাঙা। ওরা ওখান দিয়েই যাতায়াত করে।” আরভান হাত দিয়ে ইশারা করল।
আয়াত জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখল সত্যিই কাঁচ ভাঙা। ভয়ের এক শীতল স্রোত তার পিঠ দিয়ে বয়ে গেল। ভয় বাড়লেও সে মুখ শক্ত করে বলল, “যদি অ্যানাকোন্ডা আসেও, আপনি কি আমাকে বাঁচাবেন না?”
আরভান ঠোঁট চেপে হাসি আটকে বলল, “পাগল হয়েছো? তোমাকে বাঁচাতে গেলে ও তো আমাকেও খেয়ে ফেলবে। ওদের হজম করতে সময় লাগে, তার মানে পেটের ভেতর গিয়ে আমাকে জীবিত থাকতে হবে। জাস্ট ইমাজিন করো, ওর পেটের ভেতরে আমি আর তুমি একসাথে বমি আর পিত্তরসের মধ্যে ভাসছি…”
আয়াত শিউরে উঠে বলল, “ছি! চুপ করুন আপনি! আপনার মুখ থেকে কি সবসময় ডাস্টবিনের মতো জঘন্য ভাষা বের হয়।”
আরভান ফিসফিস করে বলল, “না দেখে জানলে কীভাবে? চাইলে একটা লম্বা চুমু দিয়ে পরখ করে দেখতে পারো—ডাস্টবিন নাকি সুগন্ধি বাগান!”
আয়াত রাগে কটকট করে নিচে শুয়ে পড়ল। আরভানও ঠোঁট কামড়ে হেসে উল্টো দিকে ফিরে শুয়ে পড়ল। বাইরে জঙ্গলের বাতাসের শব্দে এক ভুতুড়ে পরিবেশ তৈরি হয়েছে। হঠাৎ বাইরে কিছু একটা পড়ার শব্দ হতেই আয়াত আঁতকে উঠল। সে মৃদু স্বরে ডাকল, “আরভান? আরভান? আপনি কি ঘুমিয়ে গেছেন? আচ্ছা, এনাকোন্ডারা কি বিছানায় উঠতে পারে না?”
আরভান কোনো সাড়া দিল না। আয়াত কুঁকড়ে গিয়ে কিছুক্ষণ বসে রইল। হঠাৎ জানালার পাশে খসখস শব্দ হতেই আয়াত আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। সে ছিটকে গিয়ে বিছানায় আরভানের পাশের ফাঁকা জায়গাটা দখল করে নিল। ভয়ে আরভানের পিঠের সাথে লেপ্টে মুখ গুঁজে দিল সে। আরভানের শার্ট খামচে ধরে চোখ বন্ধ করে রইল।
ওপাশে আরভান তখন নিজের কৌশলে সফল হয়ে অন্ধকারে নিঃশব্দে হাসছে। সে জানে, এই বাঘিনিকে বশ করার জন্য একটু ভয়ের দরকার ছিল। আলতো করে পেছনের দিকে হাত বাড়িয়ে আয়াতকে নিজের সাথে আরও সেঁটে নিল।
******
“আপনার ছেলে আমার সব প্ল্যান শেষ করে দিল! জাস্ট সব শেষ!”
ক্ষিপ্ত হয়ে শাহরিয়ার ঘরের ভেতর পায়চারি করছে আর রাগে নিজের চুলগুলো মুচড়ে ধরছে। তার দুচোখে তখন ব্যর্থতার আগুন।
সামনে সোফায় পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছেন আরশাদ চৌধুরী। তার পাশে দাবার বোর্ড নিয়ে বসে আছেন বিশ্বস্ত সহযোগী মির্জা সাহেব। আরশাদ চৌধুরী দাবার গুটিতে গভীর মনোযোগ দিয়ে এক চাল চাললেন।
”চাচাজান! আমি আপনার সাথে কথা বলছি। আপনিই তো বলেছিলেন আয়াতকে একা পেলে আমি তাকে নিজের সাথে নিয়ে যেতে পারব। তাহলে আপনার ছেলে সেখানে হঠাৎ করে কীভাবে উদয় হলো?”
আরশাদ চৌধুরী দাবার বোর্ডের দিকে তাকিয়েই নিস্পৃহ কণ্ঠে বললেন, “তোমাকে আরভানের সামনে যেতে বারণ করেছিলাম। তারপরও তুমি নিজের বোকামিতে তার নজরে পড়লে।”
শাহরিয়ার আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল।
” গাড়ি দেখেই আমি ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে পড়েছিলাম। সে আমাকে দেখেনি!”
আরশাদ চৌধুরীর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাকা হাসি ফুটে উঠল। “মুর্খ ছেলে! আমার ছেলেকে এক বিন্দু চেনার যোগ্যতা তোমার নেই। বাজপাখির নজর যখন কোনো শিকারের ওপর পড়ে, তখন শিকার গর্তে ঢুকলেও নিস্তার পায় না। ও তোমাকে দেখেও না দেখার ভান করেছে।”
একটু থেমে তিনি আবার বললেন, “আয়াতের মধ্যে এমন কী আছে শাহরিয়ার, যার জন্য বাংলাদেশ থেকে সুদূর অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত হন্যে হয়ে ছুটে আসলে?”
শাহরিয়ার পাশের একটা চেয়ার টেনে বসে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “জানি না। ও একটা নেশার মতো। জীবনে অনেক নারী শরীর ছুঁয়েছি, কিন্তু ওকে দেখলে যে উম্মাদনা কাজ করে, তা আর কারো মাঝে পাইনি।”
আরশাদ চৌধুরী শব্দ করে হাসলেন। “রূপটাই এমন। আগুনের মতো, কাছে গেলে ছাই হয়ে যেতে হয়।”
”আজেবাজে কথা বাদ দিন। আপনি আগে বলুন, আয়াতকে আমাকে এনে দেবেন কি না? “
“আমি যদি আয়াতকে আরভানের থেকে সরাতে চাই, তবে তাকে তোমার কাছে নয়, সোজা কবরে পাঠাব। কারণ আরভানের জেদ সামলানো সহজ নয়।”
”এত ক্ষমতা দিয়ে কী লাভ চাচাজান, যদি নিজের ছেলের কাছ থেকে একটা মেয়েকে কেড়ে নিতে না পারেন?” শাহরিয়ার তাচ্ছিল্যভরা গলায় বলল।
আরশাদ চৌধুরীর চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই হিমশীতল হয়ে গেল। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে শাহরিয়ারের খুব কাছে গিয়ে নিচু স্বরে বললেন, “আমার ছেলেকে চেনার ক্ষমতা তোমার সাত জন্মেও হবে না। তোমার জন্য ভালো হবে কালকের মধ্যে বাংলাদেশ ফিরে যাও। নাহলে কখন কী হবে, তা আমি নিজেও ঠেকাতে পারব না।”
এক রহস্যময় প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়ে তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। শাহরিয়ারের বিরক্তি তখন চরমে। ঠিক তখনই মির্জা সাহেব তার কৃত্রিম পা ওপর হাত বুলাতে বুলাতে বলল,
“শাহরিয়ার সাহেব,যার শান্ত আর নিপাট ভদ্রলোকের চেহারা দেখে আপনি তাকে সাধারণ মানুষ ভাবছেন, আসলে সে একজন ভয়ংকর ধূর্ত ও কুটিল মস্তিষ্কের ব্যবসায়ী জানোয়ার। বাইরের পৃথিবীর কাছে সে একজন সাকসেসফুল বিজনেস আইকন, কিন্তু পর্দার আড়ালে সে এমন এক শিকারি যে নিজের হাত কোনোদিন রক্তে নোংরা করে না। বরং পরিস্থিতির এমন এক জাল বোনে যেখানে তার শত্রুরা নিজেই নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনে। সে কোনো মানুষকে মারতে চাইলে নিজে অস্ত্র ধরে না, বরং ক্ষুধার্ত হিংস্র বন্যপ্রাণীদের ব্যবহার করে। কেন জানেন? কারণ মানুষের জন্য আইন আছে, ফাঁসির দড়ি আছে; কিন্তু পশুপাখির জন্য কোনো আদালত নেই।
আমার এই পা-টা দেখছেন? এটাও আরভানের সেই ঠান্ডা মাথার নিষ্ঠুরতার উপহার।
মির্জা সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে লাগল,
“একটা ডিল কনফার্ম করার নাম করে ও আমাকে এক নির্জন কুমিরের খামারে ডেকেছিল। ডিল পেপারে সই করার পর ওটা সোজাসুজি কুমিরের পালের মাঝখানে ফেলে দিয়ে খুব শান্ত গলায় বলেছিল— ‘ডিলটা যদি আপনার কাছে এতটাই মূল্যবান হয়, তবে ওটা নিয়ে আসুন। নয়তো ডিল বাতিল। কোটি টাকার লোকসানের ভয়ে আর আরভানের চোখের ওই সম্মোহনী ভয়ের মুখে আমি নিরুপায় হয়ে কুমিরের মুখে পা দিয়েছিলাম। ডিলটা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু বিনিময়ে আমি আমার পা-টা চিরতরে হারিয়েছি।এমন অনেক ব্যবসায়ী আছে যাদের সে অপছন্দ করত। তাদের সাথে ডিল করার ছলে সে কখনো গভীর সমুদ্রে হাঙরের মুখে ঠেলে দিয়েছে, তো কখনো গহীন অরণ্যের হিংস্র প্রাণীদের সামনে। দুনিয়ার চোখে সেগুলো কেবলই ‘দুর্ঘটনা’ হিসেবে ফাইলে জমা হয়ে ডিসমিস হয়ে গেছে। তাই বলছি শাহরিয়ার সাহেব, আপনার জন্য ভালো হবে ওই মেয়েকে ভুলে যাওয়া। একটা সাধারণ ব্যবসায়িক ডিলের জন্য যে মানুষ এই মাত্রার নৃশংসতা করতে পারে, তার ব্যক্তিগত পছন্দের নারীর গায়ে হাত দিলে সে আপনাকে দিয়ে কোন পশুর ভোজ বানাবে—তা কি কল্পনা করতে পারছেন?”
কথাগুলো বলে মির্জা সাহেব তার কৃত্রিম পা টেনে টেনে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। শাহরিয়ার একা ঘরে দাঁড়িয়ে দাঁতে দাঁত চিপে বিড়বিড় করল,
“সবগুলো কাপুরুষ! ওই আরভানকে তো আমি দেখে নেব। আর আয়াত? ওকে আমি নিয়ে যাবই। ওর সাথে সংসার করা হোক বা না হোক, এক রাতের জন্য হলেও ওকে আমার শয্যাসঙ্গী আমি করবই।দেখি ওর স্বামী কত বড় জানোয়ার”
ভোরের স্নিগ্ধ আলো জানালার ফাঁক দিয়ে ঘরে এসে পড়েছে। পাখিদের কলকাকলিতে কাঠের বাড়িটা মুখরিত। বাইরে বৃদ্ধা মহিলাটি হয়তো পাখিদের খাবার দিচ্ছেন আর নিজের মনেই মগ্ন হয়ে তাদের সাথে কথা বলছেন। পাখিদের কিচিরমিচির শব্দে আয়াতের ঘুম ভাঙল।
গায়ের সেই লাল শাড়িটা কখন যে অবিন্যস্ত হয়ে আধখোলা হয়ে গেছে সে খেয়ালও নেই; আরভানের উদোম তপ্ত শরীরের উষ্ণতা নিজের উন্মুক্ত ত্বকে অনুভব করতেই আয়াতের সারা শরীরে এক পশলা বিদ্যুৎ বয়ে গেল। আরভানের বলিষ্ঠ দুই হাত তাকে কোনো দামী সম্পদের মতো আষ্টেপৃষ্ঠে আগলে রেখেছে।
নিজের এমন অবস্থা বুঝতে পেরে লজ্জায় আয়াতের কান-মুখ লাল হয়ে গেল। সে আলতো করে নিজেকে ছাড়িয়ে উঠে বসতে চাইল, কিন্তু আরভানের বাঁধন যেন আরও শক্ত হলো। আয়াত থমকে গিয়ে ঘুমন্ত আরভানের মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। শান্ত, স্নিগ্ধ অথচ কী এক প্রবল আভিজাত্য আর কর্তৃত্ব সেই চেহারায় মিশে আছে! যেন এক ঘুমন্ত সিংহ, যে জেগে উঠলেই প্রলয় ঘটাবে।
আয়াত আবারও আলতো করে আরভানের বুকের ওপর মাথা রাখল। আরভানের হৃদপিণ্ডের প্রতিটি ধুকপুকুনি সে কান পেতে শুনতে লাগল। কেন যেন এই শক্ত বুকটা তাকে প্রচণ্ড টানে, এক অদ্ভুত অভয় আর নিরাপত্তার অনুভূতি দেয় যা সে পৃথিবীর আর কোথাও পায়নি। হঠাৎ নজরে পড়ল আরভানের শার্টের বোতামের ফাঁক দিয়ে বুকের বাম পাশে এক গভীর কালো ক্ষতচিহ্ন। আয়াত কৌতূহলী হয়ে নিজের নরম আঙুল দিয়ে শার্টের কাপড়টা আরও একটু সরিয়ে সেখানে হাত বুলালো। এক অজানা ব্যথায় তার মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল।
আয়াতের মনে হলো, এই মানুষটা যেন এক বিশাল সমুদ্র। ওপরটা শান্ত নীল দেখালেও গভীরে কত যে রহস্য আর ক্ষত লুকিয়ে আছে তার ইয়ত্তা নেই। এই কয়দিনে সে বেশ বুঝতে পারছে।আরভান শুধু বাইরে থেকেই কঠিন আচরণ করে, কিন্তু তার ভেতরে আয়াতের প্রতি এক গভীর ও পসেসিভ ভালোবাসা আছে যা সে মুখ ফুটে বলতে পারে না। এই রহস্যময় আর ভয়ংকর সুন্দর মানুষটাকে ভালো না বেসে থাকা কি কোনো নারীর পক্ষে সম্ভব? হয়তো না। হয়তো তাকে ভালোবাসাটা নিজের ধ্বংস ডেকে আনা, তবুও এই ধ্বংসের নেশাটাই যেন অনন্য।
আয়াত আরভানকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করে ফেলল। নিজের অঘোষিত আশ্রয়টা সে আজ নতুন করে উপলব্ধি করল। ওপাশে বৃদ্ধা মহিলার হাঁটাচলার শব্দে সে সংবিৎ ফিরে পেল। বুঝতে পারল এবার তাদের এই নির্জন মায়া কাটিয়ে চিরচেনা কোলাহলে ফেরার পালা।
চলবে….

