#পর্ব_১৯
#আমার_হয়ে_থেকো🍁
#Tasnim_Riya_khan
—–
বাইরে তখন প্রকৃতির তাণ্ডবলীলা চলছে, আর ঘরের ভেতর চলছে এক নিস্তব্ধ যন্ত্রণার লড়াই। জানালার কাঁচে বৃষ্টির প্রতিটি আঘাত যেন আয়াতের তপ্ত শরীরে তীরের মতো বিঁধছে। টানা বৃষ্টিতে ভেজার কারণে আয়াতের শরীর একদম নেতিয়ে পড়েছে, জ্বরের ঘোরে সে ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠছে। আরভান তাকে মোটা কম্বলে মুড়িয়ে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছে; যেন এই উষ্ণতাটুকু দিয়ে সে বাইরের সবটুকু শীতলতা কেড়ে নিতে চায়। পাশে টেবিলের ওপর সুপের খালি বাটি আর খোলা ওষুধের পাতাগুলো অবহেলায় পড়ে আছে।
আয়াতকে নিয়ে আসার পর থেকে আরভান এক মুহূর্তের জন্যও স্থির হতে পারেনি। আয়াতের গায়ের ভেজা কাপড়গুলো এখনো পাল্টানো হয়নি। ডেইজিকে বারবার ফোন করেও লাভ হয়নি; এই দুর্যোগের রাতে মেলবোর্নের রাস্তাঘাট প্রায় অচল হয়ে যাওয়ায় সে আসতে পারছে না। আরভান আয়াতের কপালে মুখ ঠেকিয়ে খুব নিচু স্বরে ডাকল,
“আয়াত… শুনতে পাচ্ছো? আয়াত!”
আয়াত পিটপিট করে চোখ মেলল। কিন্তু মাথা সোজা করার মতো বিন্দুমাত্র শক্তি আজ তার শরীরে অবশিষ্ট নেই। সে কেবল অস্ফুট স্বরে একটা শব্দ করে আবার আরভানের প্রশস্ত বুকের উষ্ণতায় মুখ গুঁজে রইল। আরভান আয়াতের কপালে জলপট্টিটা পাল্টে দিয়ে খুব শান্ত অথচ গভীর স্বরে বলল, “আয়াত, তুমি কি একটু কষ্ট করে নিজের ড্রেসটা পাল্টাতে পারবে?এই ভেজা কাপড়ে বেশিক্ষণ থাকলে ঠান্ডা বসে গিয়ে নিউমোনিয়া হয়ে যাবে। একটু লক্ষ্মী মেয়ের মতো চেষ্টা করো না!”
আরভান উঠে গিয়ে আলমারি থেকে নিজের একটা ঢিলেঢালা সাদা টি-শার্ট আর ট্রাউজার বের করে আনল। আয়াতের জন্য এগুলো বড় হলেও এই অবস্থায় আরামদায়ক হবে। সে পোশাকগুলো আয়াতের পাশে রেখে দিয়ে বলল, “আমি ওদিকে ফিরে দাঁড়াচ্ছি। তুমি একটু কষ্ট করে পরে নাও। কোনো অসুবিধা হলে আমায় ডেকো।”
আরভান আয়াতের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার পুরুষালি হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ, চোয়াল শক্ত। সে নিজের ভেতরকার সবটুকু অস্থিরতা আর আদিম পুরুষালি সত্তাকে কোনোমতে সংযত করে দাঁড়িয়ে রইল। তার ভেতরের সুপ্ত পুরুষটা বারবার জেগে উঠতে চাইলেও সে জানে, এই মুহূর্তে আয়াত কতটা অসহায়। আর তার এই অসহায়ত্বের ওপর অধিকার খাটানো কোনো পৌরুষত্ব নয়, বরং কাপুরুষতা।
বেশ কিছুক্ষণ পেরিয়ে গেলেও আয়াতের কোনো সাড়া-শব্দ পাওয়া গেল না। আরভান আর ধৈর্য ধরে রাখতে না পেরে পেছনে ফিরে তাকাতেই তার হৃদস্পন্দন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। আয়াত টি-শার্টটা পুরোপুরি পরতে পারেনি। অর্ধেকটা গায় গলিয়ে সে ক্লান্তিতে সোফাতেই এলিয়ে পড়েছে। টি-শার্টটা কুঁচকে পেটের কাছে জমে থাকায় তার দুগ্ধশুভ্র উন্মুক্ত কোমর আর পিঠের কিছুটা অংশ দৃশ্যমান। আরভানের দৃষ্টি মুহূর্তেই গভীর আর তৃষ্ণার্ত হয়ে এল। সেই ফর্সা নমনীয় শরীরে বৃষ্টির শীতলতা আর জ্বরের আগুনের মতো তাপ মিলেমিশে এক অদ্ভুত সম্মোহন তৈরি করেছে। তার হাত দুটো অবাধ্য হয়ে আয়াতের কোমরের দিকে এগোতে গিয়েও থমকে গেল। সে নিজের চোখ বুজে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। না, আজ নয়। আজ সে কেবলই একজন নিঃস্বার্থ সেবক।
খুব সন্তর্পণে সে আয়াতের টি-শার্টটা টেনে ঠিক করে দিল এবং তাকে সাবধানে কোলে তুলে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে কম্বলটা গলার কাছে টেনে দিল। আয়াতের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে ডাকল, “আয়াত… আমার কথা কি শুনতে পাচ্ছো?”
”হুম…”
ক্ষীণ শব্দটুকু উচ্চারণ করতে না করতেই আয়াত ধড়ফড় করে উঠে বিছানা থেকে নামার চেষ্টা করল। কিন্তু দুর্বল শরীর তাকে সঙ্গ দিল না। আকস্মিক এই ঘটনায় আরভান চমকে গিয়ে তাকে শক্ত করে ধরতেই আয়াত গলগল করে বমি করে দিল। পুরোটা আরভানের গায়ের ওপর। আরভানের বুক আর শার্ট ভিজে একাকার। বমি শেষ হতে না হতেই আয়াত তাসের ঘরের মতো আরভানের হাতের ওপর নেতিয়ে পড়ল; যেন কোনো প্রাণহীন নিথর দেহ।
আরভান আঁতকে উঠল। সে আয়াতের গালে হালকা চড় দিয়ে উন্মাদ হয়ে ডাকতে শুরু করল, “এই.আয়াত! আয়াত… কথা বলো! এভাবে প্লিজ থমকে থেকো না। আমার দিকে তাকাও!”
কিন্তু আয়াতের কোনো সাড়া নেই। সে নিথর হয়ে পড়ে আছে। আরভান অস্থির হয়ে উঠল, তার হাত কাঁপছে। সে দ্রুত ডাক্তারকে ফোন করল। ঝড়ের রাতের অজুহাতে ডাক্তার প্রথমে আসতে না চাইলেও আরভানের গলায় এমন এক করুণ হাহাকার আর খুনে মেজাজের চাপা ধমক ছিল যে ডাক্তার সাত-পাঁচ না ভেবেই রাজি হতে বাধ্য হলেন। ফোন রেখে সে আয়াতের শিয়রে বসে পাগলের মতো ডাকতে লাগল। অজানা কোনো শঙ্কায় আরভানের চোখ ভিজে উঠছে; নিজেকে তার খুব অসহায় আর অপরাধী মনে হচ্ছে।
নিজের নোংরা হয়ে যাওয়া শার্টটা এক টানে খুলে ফেলে দিয়ে দ্রুত একটা টি-শার্ট গলিয়ে সে আবারও আয়াতের পাশে গিয়ে বসল। সে আয়াতকে আবার নিজের বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরল। কিছুক্ষণ পর আয়াতের শরীরটা একটু নড়ে উঠল, সে ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালো।
আরভান তার দুই গাল হাতের আঁজলায় ভরে নিল। তার কণ্ঠস্বর আজ কোনো এক পরাজিত সৈনিকের মতো কাঁপছে। সে প্রলাপের মতো বলতে শুরু করল,— “আমি বুঝতে পারিনি আয়াত! আমার সামান্য একটা রূঢ় কথায় তুমি এমন প্রাণঘাতী বোকামো করবে তা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি। কেন এমনটা করলে বোকা মেয়ে? নিজেকে কষ্ট দিয়ে আমার ওপর প্রতিশোধ নিতে চাইছো? তোমাকে ভালো রাখতে আরভান নিজেকে পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছে, আর তুমি কি না সেই আরভানকেই নিঃস্ব করে চলে যেতে চাইছিলে?”
****-
ঘণ্টা দুয়েক পর প্রবল বর্ষণ মাথায় নিয়ে ডাক্তার এলেন। আয়াতকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করার পর তার মুখমণ্ডল গম্ভীর হয়ে উঠল। তিনি থার্মোমিটারের রিডিং দেখে আরভানের দিকে তাকিয়ে আক্ষেপের গলায় বললেন,
“এতটা ঠান্ডা কীভাবে লাগল মিস্টার চৌধুরী? আর কিছুক্ষণ দেরি হলে এই হাই ফিভার হয়তো নিউমোনিয়ার দিকে টার্ন নিত। মেয়েটার কন্ডিশন কিন্তু খুব একটা স্ট্যাবল নয়।”
আরভান কোনো উত্তর দিল না। সে পাথরের মূর্তির মতো সামনে শুয়ে থাকা ফ্যাকাশে মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার ভেতরে তখন এক আত্মদহনের সুনামি বয়ে যাচ্ছে। ডাক্তার কিছু কড়া ডোজের ওষুধ আর ইনজেকশন দিয়ে আরভানকে কিছু প্রয়োজনীয় ইনস্ট্রাকশন দিয়ে বিদায় নিলেন।
ডাক্তার চলে যাওয়ার পর ঘরে আবারও সেই ভারী নিস্তব্ধতা নেমে এল।
জ্বরের তীব্র তাপে আয়াতের চোখের কোনা দিয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে। আরভান খুব সন্তর্পণে নিজের আঙ্গুল দিয়ে সেই জলটুকু মুছে দিল। কিন্তু আজ তার নিজের চোখের বাঁধও যেন ভেঙে গেছে।
আয়াতের গালের ওপর ঝুঁকে পড়তেই আরভানের চোখের কোণ থেকে এক ফোঁটা জল টুপ করে আয়াতের উত্তপ্ত গালে আছড়ে পড়ল।সেই নোনতা পানির ছোঁয়ায় আয়াত ঝাপসা চোখে তাকালো। আবছা দৃষ্টিতে দেখল আরভানকে—তার সেই বজ্রকঠিন মানুষটা আজ কতটা বিধ্বস্ত!
দুর্বল হাতটা কাঁপতে কাঁপতে তুলে আরভানের গাল ছুঁতে চাইল। আরভান মুহূর্তের মধ্যে আয়াতের সেই নরম ছোট হাতটা নিজের শক্ত হাতের মুঠোয় পুরে নিয়ে নিজের গালের সাথে চেপে ধরল। তার কণ্ঠস্বর কান্নায় বুজে এল, সে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
”এমন কেন করলে আয়াত? নিজেকে তো বড্ড শক্ত দেখাও, তবে তোমার ভেতরে এত দুর্বলতা কোথায় লুকিয়ে ছিল? এই অবুঝপনা দিয়ে কাকে শাস্তি দিতে চেয়েছিলে? আমাকে? দেখ, আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি। প্লিজ একটা কথা বলো… এই চুপ করে থাকাটা আমি সহ্য করতে পারছি না। পাখি… আমার বুকের ভেতরটা ছিঁড়ে যাচ্ছে কস্টে।। আমি আর কখনো তোমাকে বকব না, কখনো রাগ দেখাবো না, শুধু একবার মুখ ফুটে বলো যে তুমি ঠিক আছো!”
আরভানের মতো লৌহমানব আজ শিশুর মতো ডুকরে কেঁদে উঠল। আয়াতও সাথে ফুঁপিয়ে উঠল। জ্বরের ঘোরে অবুঝের মতো জড়িয়ে যাওয়া স্বরে বলল,
“আমি মা-বাবার কাছে যাব… আমাকে তাদের কাছে দিয়ে আসুন। আমি আর সহ্য করতে পারছি না এই যন্ত্রণা।”
আয়াতের মুখে এমন বিদায়ের সুর শুনে আরভানের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে আয়াতকে আরও আয়াতকে আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে বলল, “না আয়াত! এমন কথা ভুলেও মুখে এনো না। আমি আছি তো! তুমি আমার কাছেই থাকবে। আমি যতদিন বেঁচে আছি, তুমি শুধু আমার হয়েই থাকবে আয়াত। আমি তোমাকে ছায়ার মতো আগলে রাখব, প্রমিজ!”
“আয়াত কাঁপা কাঁপা গলায় বিড়বিড় করল,”আমার শীত লাগছে… অনেক শীত করছে আরভান!”
আরভান আর এক মুহূর্ত দ্বিধা করল না। সে আয়াতের পাশে শুয়ে তাকে সজোরে নিজের বুকের মাঝে টেনে নিল। একটি তপ্ত, কোমল নারী শরীর আজ এক ক্ষুধার্ত পুরুষের বুকের মাঝে মিশে আছে—স্বাভাবিক সময়ে হয়তো আরভানের ভেতরের আদিম পুরুষ সত্তা জেগে উঠত, কিন্তু আজ সেই কামনার লেশমাত্র নেই। সে কেবল নিজের শরীরের সমস্ত উষ্ণতা দিয়ে এই অসহায় প্রাণটাকে আগলে রাখতে চাইল। আরভানের মনে হলো, এই পৃথিবীতে তার সমস্ত বীরত্ব আর অহংকার আজ এই মেয়েটার এক ফোঁটা চোখের জলের কাছে পরাজিত। ধীরে ধীরে আরভানের শরীরের ওম পেয়ে আয়াতের কাঁপুনি কমে এল। আরভানের হৃদস্পন্দনের তালে তালে আয়াত এক গভীর ঘুমের দেশে পাড়ি জমাল। আর আরভান? কিন্তু আরভান সারারাত জেগে রইল আয়াতের নিশ্বাস গুনতে, যেন এক মুহূর্ত চোখ সরালেই এই মায়াটা মিলিয়ে যাবে।
*****
।সকালের রক্তিম আভা জানালার পর্দা ভেদ করে পুরো রুমকে আলোকিত করে দিল। তন্দ্রাচ্ছন্ন আচ্ছন্নতায় আয়াত প্রথমে কিছু না বুঝলেও, পরক্ষণেই নিজেকে কারো বলিষ্ঠ এবং শক্ত বাঁধনে আবদ্ধ অনুভব করল। সে ধীরলয়ে চোখ মেলে তাকালো। স্থির হতেই দেখল সামনে আরভানের ঘুমন্ত মুখ। তার ঘন পাপড়িগুলো স্থির, কপালে অবাধ্য কয়েকগাছি চুল এসে পড়েছে। আরভানের সেই রক্তিম ঠোঁট জোড়া দেখে আয়াত ভাবল—লোকটা কি আসলেও নির্ভেজাল? কখনো কি এই ঠোঁট অন্য কোনো শিখার ছোঁয়ায় অপবিত্র হয়নি?
আয়াত চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিশ্চিত হলো—এটা আরভানের নিজের রুম।
কালকের রাতের আরভানের করা সেই পাগলামিগুলো আয়াতের চোখের সামনে ভেসে উঠল। আরভানের সেই পাগলামি, আর্তনাদ আর তাকে আগলে রাখার ব্যাকুলতা… কথাগুলো মনে পড়তেই আয়াতের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ম্লান হাসি ফুটে উঠল। কেউ তাকে আগলে রাখার জন্য এভাবে হন্যে হয়ে দুনিয়া এক করে ফেলুক, সে-ও তো সব মেয়েদের মতো তেমনটাই চেয়েছিল।
আয়াত আজ আর নিজেকে সংবরণ করতে পারল না। সে সন্তর্পণে নিজের হাত বাড়িয়ে দিল। আরভানের সুঠাম পৌরুষালি গালে জমে থাকা খোঁচা খোঁচা দাড়িগুলো আলতো করে ছুঁয়ে দিল সে। প্রথমবার কোনো পুরুষকে এভাবে স্পর্শ করায় আয়াতের সারা শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেল। এক অদ্ভুত ভালো লাগার আবেশ তাকে ছুঁয়ে গেল। আঙুলগুলো গাল ছুঁয়ে ধীরে ধীরে আরভানের ওই রক্তিম ঠোঁটের কিনারা স্পর্শ করতেই আয়াতের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। পরক্ষণেই আয়াতের মনে হলো—এই মায়া কি সত্যি? নাকি কেবলই এক রাতের অসুস্থতার করুণা? এই মানুষটা কি পারবে আজীবন তাকে এভাবে আগলে রাখতে, নাকি রোদ উঠলেই এই ভালোবাসা বাষ্প হয়ে উড়ে যাবে?
হঠাৎ আরভান চোখ না মেলেই জড়িয়ে যাওয়া গম্ভীর স্বরে বলে উঠল, “এভাবে জ্বালাতন করা বন্ধ করুন ম্যাডাম! অনেক কষ্ট করে নিজেকে কন্ট্রোল করে আছি। কন্ট্রোললেস হয়ে গেলে কিন্তু আমায় দোষ দিতে পারবেন না, তখন সামলানো দায় হয়ে যাবে।”
আরভানের আকসিক এমন লাগামছাড়া কথায় আয়াতের চোখ বড় বড় হয়ে গেল। লজ্জায় আর আড়ষ্টতায় সে মুহূর্তে কুঁকড়ে গেল। দ্রুত নিজের হাত সরিয়ে নিয়ে আরভানকে সজোরে একটা ধাক্কা দিয়ে সে বিছানা থেকে ছিটকে সরে এল।
আয়াতের এমন আকস্মিক কাণ্ডে আরভান ভরকে গিয়ে উঠে বসল। ভ্রু কুঁচকে কয়েক সেকেন্ড আয়াতের দিকে তাকিয়ে কিছু বোঝার চেষ্টা করল সে। আয়াতের থমথমে মুখ দেখে আরভানের দুশ্চিন্তা বেড়ে গেল। সে আয়াতের দিকে এগিয়ে গিয়ে ব্যাকুল হয়ে বলল, “কী হয়েছে আয়াত? শরীর কি আবার খারাপ লাগছে? ওকে, চলো এখনই হসপিটালে যাই। সেই কোয়াক ডাক্তারের ট্রিটমেন্টে বোধ হয় কাজ হয়নি। অযোগ্য মূর্খ ডাক্তার! চলো, কোনো ভালো স্পেশালিস্ট দেখাই।”-
আয়াত নির্বিকারভাবে আরভানের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। যেন এই মানুষটার প্রতিটি শব্দের ভেতরে সে মিথ্যার জাল খুঁজছে।
সে শীতল কণ্ঠে বলল, “আপনার আর কষ্ট করে দরদ দেখানো নাটক করতে হবে না মিস্টার চৌধুরী। দয়া করে আমাকে আমার পাসপোর্টটা ফিরিয়ে দিন। আমি আজই এখান থেকে চলে যেতে চাই।”
আয়াতের এমন কথা আরভানের বুকের ঠিক মাঝখানে তীরের মতো বিঁধল। কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ থেকে আরভান একটা শুষ্ক হাসি দিয়ে বলল, “বোধ হয় শরীর থেকে জ্বরটা সরাসরি মগজে উঠে গেছে। তাই আবোলতাবোল বকছো।”
আয়াত আরভানের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল, তার চোখের কোণ ঘেঁষে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। সে ধরা গলায় বলল, “আমি আর পারছি না আরভান। নিজের সাথে নিজে যুদ্ধ করতে করতে আমি হাঁপিয়ে উঠেছি। আমার শরীর আর মন কোনোটারই আর ধকল সইছে না। আমাকে মুক্তি দিয়ে দিন না! আপনি তো আমায় পছন্দ করেন না, তাহলে কেন এই অসুস্থতার সুযোগে এত ভালোবাসার নাটক? ”
আরভান ম্লান হাসল। সে এগিয়ে এসে আয়াতের দুই হাত নিজের শক্ত মুঠোয় পুরে নিল। গভীর মায়াভরা চোখে তাকিয়ে বলল, “কে বললো পছন্দ করি না? শুধু পছন্দ না আয়াত, তার চেয়েও অনেক বেশি কিছু করি। তবে সত্যি বলতে, তোমার ওপর আমার অনেক অভিমান ছিল। বিয়ে করে ফিরে আসার পর হঠাৎ এলিনা চৌধুরী তোমার নাম শুনলেই বিরক্ত হতে শুরু করলেন। আমি তাঁর কাছে গেলে তিনি আমায় ঝাড়ি দিয়ে দূর দূর করে দিতেন। আমার জীবনের একমাত্র ভালোবাসার মানুষটার এই দূরত্বের জন্য আমি তোমার নামটাকেই দায়ী করতাম। মনে হতো, তোমার নামটা এলেই বুঝি তিনি আমার থেকে দূরে সরে যান। যদিও তা আমার মনে ভুল ধরনা ছিলো।তবে তোমার ওপর সেই অভিমান বেশিদিন টিকতে পারেনি আয়াত।
বিশেষ করে যেদিন আমি জানতে পারলাম আমার… ”
আরভানের অসম্পূর্ণ কথায় আয়াত ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে ব্যাকুল হয়ে বলল, “আপনার কী? থামলেন কেন? বলুন…”
আরভান ম্লান হেসে বলল, “কিছু না।” বলেই সে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলে আয়াত ক্ষিপ্ত হয়ে চিৎকার করে উঠল,
”আট বছর বয়সী একটা ছোট্ট মেয়েকে বিয়ে করে বারোটা বছরের জন্য নিরুদ্দেশ হয়ে গেলেন আপনি! একবারও কি মনে পড়েনি সেই মেয়েটার কথা? অথচ আমি… আপনার নামটাকে আঁকড়ে ধরে, আপনাকে নিয়ে কল্পনার এক বিশাল সংসার সাজিয়েছিলাম। আট থেকে বিশ—এই বারোটা বছরে হাজারো ঝড় বয়ে গেছে, কিন্তু আপনার নামটা আমি এক মুহূর্তের জন্যও ভুলিনি। এই নামটা আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে আপন কিছু ছিল।”
আয়াতের গলার স্বর আবেগে বুজে আসছিল, কিন্তু সে থামল না। বুক ফেটে আসা দীর্ঘদিনের জমানো অভিযোগগুলো আজ যেন বাঁধ ভেঙে বেরোচ্ছে।
”আপনার সেই লম্পট কাজিন যখন দিনের পর দিন আমাকে নোংরা ইঙ্গিত দিত, নিজের লালসার শিকার বানাতে চাইত, আমি লড়ে গেছি শুধু এই আশায় যে একদিন আপনি আসবেন! আপনি এসে আমাকে আগলে নেবেন, কেউ আমার দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারবে না, কেউ খারাপ কথা বলতে পারবে না—কিন্তু আপনি আসলেন না! দাদাজান যখন আমাকে আবার দাবার ঘুঁটি বানিয়ে সেই নরকের কীটের হাতেই তুলে দিতে চাইল, আমি স্থির করেছিলাম নিজের জীবন দিয়ে দেব। তবে সব শেষে আপনি আসলেন… আমার জীবন বাঁচল ঠিকই, কিন্তু আপনি আমার আত্মাটা মেরে ফেললেন! যার অপেক্ষায় বারোটা বছর পার করলাম, সে এসেই মুখের ওপর ডিভোর্স পেপার ছুঁড়ে দিয়ে বলল— ‘এই বিয়েটা পুতুল খেলা, আই নিড ডিভোর্স’!”
আয়াত আরভানের সামনে এসে দাঁড়ালো। তার দুচোখ দিয়ে অবিরত নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে।
”আপনি আমাকে মুক্তি দিতে এতটাই মরিয়া ছিলেন যে, যে মেয়েটাকে সহ্য করতে পারেন না, তাকেই ফিউন্সে বানিয়ে নাটক সাজালেন!নিজের জীবন থেকে সরাতে আমার চরিত্র নিয়েও প্রশ্ন তুলতে দ্বিধা করলেন না? আপনি একটা কথা ঠিকই বলেছিলেন— আমি বড্ড বোকা? না হলে এত কিছুর পরেও আপনার মতো ওই বিষাক্ত মায়াতেই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়লাম।”
আরভান দীর্ঘশ্বাস ফেলে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বলল, “কখনো কখনো মুক্তি দেওয়াটাই পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিনতম ভালোবাসা আয়াত। আমি যা করেছি, তা তোমার জন্যই করেছি। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস দেখো, আমি তোমাকে যত দূরে ঠেলতে চেয়েছি, নিয়তি তোমাকে ততটাই আমার বুকের পাঁজরে এনে আছড়ে ফেলেছে।”
আয়াত আরভানের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ধরা গলায় বলল, “আপনি সব কেন আমার ভালোর জন্য করতে যান।কখন আমার খারপ করেও দেখুন আরভান।ওটাতেই বোদ হয় আমি সবচেয়ে বেশি সুখি হবো।জানেন,আপনার চেহারা আমি ভুলে গিয়েছিলাম, কিন্তু আপনার নামটা আমার নিশ্বাসে মিশে ছিল। পরিবার হারানোর পর যখন দাদাজান আমাকে আশ্রয় দিলেন, তখন থেকেই আমি মানসিকভাবে নিজেকে আপনার নামে উৎসর্গ করে দিয়েছিলাম। একটা মেয়ে কতটা অন্ধ হলে এমন একজনকে ভালোবাসতে পারে যে তাকে চেনেও না?”
”সেই আপনিই আমাকে একবার বলছেন আপনাকে ভালোবাসতে, পরক্ষণেই বলছেন দূরে থাকতে। কখনো বলছেন আমি আপনার কেউ না, আবার পরক্ষণেই অধিকার নিয়ে শাসন করছেন। আমাকে মুক্তিও দিচ্ছেন না, আবার আপনও করে নিচ্ছেন না। তাহলে কোন সম্পর্কের জোরে আমাকে নিজের কাছে আটকে রাখতে চাইছেন আপনি?”
আরভান এবার কোনো কথা বলল না। সে আয়াতের চোখের গভীরে জমে থাকা এক সমুদ্র বিষাদ দেখতে পেল। আয়াতের কথার পিঠে সে শুধু বিড়বিড় করল— “তোমাকে চাই আয়াত, অনেক বেশি করে চাই। হয়তো নিজের জীবনের চেয়েও বেশি… কিন্তু…”
”কিন্তু কী? কেন বারবার কথার মাঝে থেমে যান? কেন সবকিছু অস্পষ্ট…”
আরভান এবার আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না। সে এক ঝটকায় আয়াতকে ঘুরিয়ে সজোরে নিজের বুকের মাঝে পিষ্ট করে জড়িয়ে ধরল। আয়াতের কাঁধে মুখ গুঁজে দিয়ে তার গলার কাছের তপ্ত চামড়ায় নিজের মুখ ঘষে আরভান রুদ্ধশ্বাসে বলতে শুরু করল,
”কিছু বলো না আয়াত… Just breathe with me. Let me feel you… deeply! শুধু আমার সাথে নিঃশ্বাস নাও আয়াত… তোমাকে গভীরভাবে অনুভব করতে দাও।”
আয়াত আরভানের প্রশস্ত কাঁধে মুখ রেখে ওর টি-শার্টটা খামচে ধরে ফুঁপিয়ে উঠল। কান্নার তোড়ে ওর শরীর কাঁপছে। সে অস্ফুট স্বরে বলল, “শুধু আপনার রাগ আছে? আমার নেই? আমি… আমি আপনাকে ঘৃণা করতে পারছি না কেন আরভান? কেন আমার মন আপনার বিরুদ্ধাচরণ করতে পারে না?”
আরভান আয়াতের রেশমি চুলে বিলি কেটে ফিসফিস করে বলল, “তোমার সব অধিকার আছে আয়াত। শুধু দয়া বাদে সব দাও আমায়। তুমি আমায় ঘৃণা করবে, আবার পরক্ষণেই তুমিই আমায় ভালোবাসবে। আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসে তোমার ভাগ থাকবে।”
আয়াত জেদ ধরে নাক টেনে বলল, “কখনো ভালোবাসব না আপনাকে! একদম না!”
আরভান ম্লান হেসে বলল।
”না ভালোবাসাটাই হয়তো তোমার জন্য ভালো হবে আয়াত।”
আয়াত আবারও তেতে উঠল, “আপনি আবার সেই দ্বিচারিতা শুরু করলেন! আপনি আমায় কোনোদিন বুঝবেন না। আপনি বড্ড জঘন্য! আপনি আমাকে একবারও প্রাণভরে চাইবেন না, আমিও আপনাকে আর চাই না। আমি আপনাকে কখনো ভালোবাসবো না, কখনো না!”
আরভান এবার আয়াতের কপালে একটা দীর্ঘ এবং তপ্ত চুমু এঁকে দিয়ে খুব শান্ত অথচ বেদনাসিক্ত গলায় বলল,
”বেসো না ভালো, শুধু সারাটা জীবন আমার হয়ে থেকো। আমি যদি কোনোদিন না-ও থাকি আয়াত, তবুও তুমি কেবল আমার হয়েই থেকো।”
আয়াত আরভানের বুকের ধুকপুকুনি শুনতে পাচ্ছে। লোকটার কথার মানে বুঝতে না পারলেও, আরভানের এই গভীর আলিঙ্গন আজ ওকে এক অদ্ভুত নিরাপত্তার চাদরে মুড়িয়ে দিল।
চলবে….
#পর্ব_২০
#আমার_হয়ে_থেকো🍁
#Tasnim_Riya_khan
[ অনুমতি ব্যতীত কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ🚫]
বিছানায় গুটিসুটি মেরে চোখ বন্ধ করে বসে আছে আয়াত। তার গায়ে জড়ানো আরভানের সেই ঢিলেঢালা সাদা টি-শার্ট। কাপড়টা থেকে আরভানের গায়ের সেই কড়া পুরুষালি পারফিউম আর এক অদ্ভুত তপ্ত ঘ্রাণ নাকে আসছে। আয়াত অবাধ্যের মতো সেই ঘ্রাণ টেনে নিচ্ছে বুক ভরে, আর ঠোঁটের কোণে ঝুলে আছে লাজুক এক চিলতে হাসি। এই অনুভূতিটা একদম নতুন, একদম অন্যরকম। মন বলছে—সে এই দ্বিমুখী, নিষ্ঠুর আর রহস্যময় লোকটার মায়াবী প্রেমে পড়েছে। অথচ ‘প্রেমে পড়া’ শব্দটা তার জন্য অনেক পুরনো; সে তো বহু বছর আগে থেকেই এই মানুষটার প্রেমে পড়ে আছে। পার্থক্য শুধু এটুকুই—তখন ভালোবেসেছিল না দেখে, না জেনে; আর এখন ভালোবাসছে লোকটা ভীষণ নিষ্ঠুর জেনেও।
তার ভাবনার মাঝেই ওয়াশরুমের দরজাটা খট করে খুলে গেল। আয়াত চমকে উঠে তড়িঘড়ি করে কম্বলটা বুকের ওপর টেনে নিয়ে চিৎকার করে উঠল,
“দয়া করে সস্তা সিনেমার হিরোদের মতো শুধু তোয়ালে পড়ে এখানে চলে আসবেন না! খবরদার!”
ওয়াশরুম থেকে শার্টের হাতা গুটাতে গুটাতে বের হয়ে আসছিল আরভান। আয়াতের এমন অদ্ভুত কথায় সে থমকে দাঁড়ালো। ভ্রু কুঁচকে কয়েক মুহূর্ত আয়াতের দিকে তাকিয়ে থেকে কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,
“এত বড় একটা ওয়াশরুম বানিয়েছি কি রুমের ভেতরে এসে সবার সামনে কাপড় পাল্টানোর জন্য? ভুত-পেতনীর নজর লাগানোর শখ আমার নেই।”
প্রথমবার আরভানের কথার খোঁচাটা আয়াত ধরতে না পারলেও পরক্ষণেই বুঝতে পেরে মুখ ফুলিয়ে নিল। সে বিড়বিড় করে বলল,
“হ্যাঁ, আপনার রূপ তো একেবারে পূর্ণিমার চাঁদের মতো! তাই আমি নামক পেতনীর নজর থেকে বাঁচতে দরজাটা খুলে দিন, আমি আমার রুমে যাবো।”
”যাও, কেউ কি হাত-পা বেঁধে রেখেছে?”
আরভান ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে চুল ঠিক করতে করতে নির্লিপ্ত স্বরে বলল।
আয়াত বিরক্তির চরম সীমায় পৌঁছে গেল। সকাল থেকে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেছে, লোকটা তাকে বিছানা থেকেও নামতে দিচ্ছে না। সারাক্ষণ সামনে বসে পাহারা দিচ্ছে। দরজায় পাসওয়ার্ড লক থাকায় সে নিজেও বের হতে পারছে না। ভাগ্য ভালো যে ফারহান ফোন করে আরভানকে কিছু একটা বলায় সে এখন বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, নইলে হয়তো আজ আর এই মানুষের বন্দিশালা থেকে মুক্তি পাওয়া হতো না।
আয়াত বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “লকের পাসওয়ার্ড বলুন, আমি নিজের হাতে খুলে চলে যাবো।”
একটু থেমে আয়াত আবারও প্রশ্ন করল, “আচ্ছা, আপনার এই রুমে এমন কী সোনা-দানা আছে যার জন্য দরজায় এত কড়া পাসওয়ার্ড দিয়ে রাখতে হয়?”
আরভান আয়াতের দিকে ফিরে চুলে হাত বোলাতে বোলাতে বাঁকা হাসল। “এই রুমে আমি আছি। আমার চেয়ে দামি কোনো সম্পদ এই দুনিয়ায় আর আছে বলে তো আমার মনে হয় না?”
আয়াত কপালে হাত দিয়ে বিড়বিড় করল, “হায় খোদা! এই কার পাল্লায় পাঠালে আমায়! এত নার্সিসিস্ট মানুষ আমি জীবনেও দেখিনি!”
আয়াতের বাচনভঙ্গি দেখে আরভানের ঠোঁটের কোণে সত্যিকারের এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। আয়াত গম্ভীর হয়ে বলল,
“আপনি এভাবে হাসবেন না। আপনার এই হাসি দেখলে আমার বড্ড ভয় হয়।”
আরভান এবার আয়াতের খুব কাছে এসে দাঁড়ালো। তার লম্বা ছায়াটা আয়াতের ওপর পড়তেই আয়াত পিছু হটতে শুরু করল।পিছাতে পিছাতে একপর্যায়ে সে বিছানার ওপর ধপ করে পড়ে গেল, আর আরভান দুপাশে হাত রেখে তার ওপর ঝুঁকে এল। আয়াতের মনে হলো তার হৃৎপিণ্ডটা এখনই বুক চিরে বেরিয়ে আসবে।
”ভয় লাগে? নাকি বুকটা খুব বেশি ধকপক করে?” আরভানের ফিসফিসানি কণ্ঠ আয়াতের কানের লতিতে উষ্ণ ঢেউ তুলল।
”দূ…দূরে সরুন!” আয়াত তোতলামি করে বলল।
”কেন? সারা রাত তো ছোট বিড়াল ছানার মতো আমার বুকের ঠিক এইখানটাতে মুখ গুঁজে শুয়ে ছিলে।” আরভান নিজের বুকের বাম পাশে হাত দিয়ে ইশারা করল।
কথাটা আরভান এমন মোহগ্রস্তভাবে বলল যে আয়াতের হৃৎপিণ্ড এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তার গাল দুটো লজ্জায় রক্তবর্ণ হয়ে উঠল। আরভান আরও একটু ঝুঁকে আসতেই আয়াত চোখ বন্ধ করে ফেলল। আরভান মুচকি হেসে আয়াতের নাজাল ডগায় একটা টোকা দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো।
”তোমার এখন ভয় পাওয়া উচিত আয়াত। তোমার সাথে এখন থেকে অনেক কিছু হতে পারে—তবে সেগুলো সব তোলা থাকল। আপাতত আমি কাজে যাচ্ছি, একটা ইম্পর্ট্যান্ট বিজনেস পার্টি আছে। ক্লায়েন্টের সাথে ডিল শেষ করে ফিরতে লেট হতে পারে। ডেইজিকে তোমার সাথে থাকতে বলেছি, আমি না আসা পর্যন্ত সে তোমার খেয়াল রাখবে। আর সাবধান, আমি না আসা পর্যন্ত নিচে নামাবে না, শুধু রেস্ট নেবে। আবার যদি জ্বর আসে, সাথে সাথে আমায় কল দেবে। আমি সব ফেলে চলে আসবো।”
আরভানের একনাগাড়ে বলা কথাগুলো শুনে আয়াত স্তব্ধ হয়ে গেল। যেন কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে সে। সামান্য জ্বরের জন্য কেউ এতটা ব্যাকুল হতে পারে? এতটা কেয়ার করতে পারে? এর আগেও সে বহুবার জ্বরে পড়েছে, কেউ তো এভাবে মাথায় জলপট্টি দিয়ে সারারাত জাগেনি। বারো বছর পর ফিরে আসা এই মানুষটা কেন তাকে এভাবে আগলাচ্ছে?
ভাবনাগুলো আয়াতের মনে জট পাকানোর আগেই আরভান দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আয়াত শুধু শূন্য দৃষ্টিতে দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। মানুষটা কি মায়াবী কোনো ধাঁধা, নাকি আশ্রয়—এই ধোঁয়াশা যেন কাটছেই না।
গভীর এক দীর্ঘশ্বাস নিয়ে যখন এক নতুন ভাবনার সাগরে আয়াত পাড়ি দিল, ঠিক তখনই দরজায় আবারও নকের শব্দ শোনা গেল। চরম বিরক্তি নিয়ে আয়াত বলে উঠল,
“একবার গিয়ে আবারও কেন ফিরে এসেছেন? আপনার কি একবারও মনে হয় না যে আপনি আজ বড্ড বেশি ডিস্টার্ব করছেন?”
কথাটা বলতে বলতেই সে থমকে গেল। দরজায় আরভান নয়, বরং মার্জিত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন এলিনা চৌধুরী। তিনি একবার পেছনে ফিরে তাকিয়ে চেক করে নিলেন আয়াত ঠিক কাকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলো বলছে, তারপর মৃদু হেসে ঘরের ভেতরে এগিয়ে এলেন। আয়াত লজ্জিত হয়ে মাথা নিচু করল।
”আসলে … আমি ভেবেছিলাম …”
এলিনা চৌধুরী বিছানার পাশে এসে বসলেন।
“বুঝতে পেরেছি, আরভানকে ভেবেছিলে। ডেইজির কাছে শুনলাম তুমি নাকি জেদ করে বৃষ্টিতে ভিজে জ্বর বাঁধিয়েছ? তোমাদের মান-অভিমান এখনো মেটেনি তারমানে! তা এখন শরীর কেমন লাগছে তোমার?”
এলিনা পরম মমতায় আয়াতের কপালে হাত দিয়ে তাপ মেপে নিলেন। জি আলহামদুলিল্লাহ, এখন একটু ভালো লাগছে।”
আয়াত কিছুটা বিমূঢ় হয়ে এলিনার দিকে তাকিয়ে রইল। তার মাথায় তখন আরভানের বলা সেই পুরনো কথাগুলো ঘুরপাক খাচ্ছিল—কেন এই ভদ্রমহিলা বাংলাদেশ থেকে আরভানের ফেরার পর আয়াতের নাম শুনলে বিরক্ত হতেন? এমনকি প্রথম দিন এসে তিনি বলেছিলেন, আরভানের সাথে তাঁর সম্পর্কের টানাপোড়েনের কারণ পরোক্ষভাবে কিছুটা হলেও আয়াত এবং তার পরিবার দায়ী। মনের খচখচানি চাপা না দিয়ে আয়াত বলেই ফেলল,
“আমি কি আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে পারি?”
এলিনা চৌধুরী হয়তো বুঝলেন আয়াতের মনে কী চলছে। তিনি শান্ত গলায় বললেন, “প্রশ্নগুলো পরে জমা থাক আয়াত। এখন সময় খুব কম। তোমার সব প্রশ্নের উত্তর আমি দেব, তবে আজ নয়। এখন চট করে উঠে পড়ো তো!”
আয়াত অবাক হয়ে বলল, “কেন? কোথায় যাব আমরা?”
”এক জায়গায় যাওয়ার আছে। পারবে তো? নাকি শরীর খুব বেশি দুর্বল লাগছে? শরীর সায় না দিলে আমি জোর করব না।”
এলিনা সামনে একটা প্যাকেট রেখে বললেন,
“এতে একটা শাড়ি আছে। আমি তোমার জন্য কোনো ওয়েস্টার্ন ড্রেস আনিনি, একটা লাল টকটকে জামদানি এনেছি। তুমি কি নিজে এটা পরে নিতে পারবে?”
আয়াত ইতস্তত করে বলল, “পারবো, কিন্তু আরভানকে না বলে আমি কোথাও যাবো না। ও নিচে নামতেও মানা করেছে গিয়েছে।”
এলিনা চৌধুরী এক প্রশান্তির হাসি হাসলেন। “ইউ ট্রাস্ট মি ? তাহলে চলো। ভয় নেই, সেখানে তোমার স্বামীও আছে—এবার তো যাবে?”
আয়াত কী করবে বুঝতে পারল না,তবে এমন স্নেহমাখা আহ্বানে সে আর ‘না’ বলতে পারল না। শাড়িটা গায়ে জড়িয়ে কোমড় সমান চুলগুলো এলিয়ে দিল। এলিনা তাকে খুব ন্যাচারাল কিন্তু স্নিগ্ধভাবে সাজিয়ে দিলেন।আয়াতের মনে একটা খটকা থেকেই গেল—এলিনা যদি তাকে অপছন্দই করতেন, তবে সামনাসামনি হওয়ার পর থেকে কেন এত ভালোবাসার চাদরে আগলে রাখছেন? গাড়িতে বসে আয়াত আবারও প্রশ্নটা করতে চেয়েছিল, কিন্তু এলিনা ফোনের ওপাশে একের পর এক বিজনেস কল এটেন্ড করতে এতটাই ব্যস্ত ছিলেন যে আয়াত আর সুযোগ পেল না।
-****
পার্টিতে প্রবেশ করতেই চারদিকের চাকচিক্য আর আলোর রোশনাই আয়াতকে ধাঁধিয়ে দিল। পশ্চিমা ধাঁচের পার্টি, নারীদের খোলামেলা ওয়েস্টার্ন ড্রেস আর হাতে অ্যালকোহলের গ্লাস।সব মিলিয়ে এক অস্থির পরিবেশ। এলিনার হাত ধরে যখন আয়াত হলে প্রবেশ করল, সবার উৎসুক চোখ তাদের দিকে নিবদ্ধ হলো। এই আধুনিকার ভিড়ে লাল শাড়ি পরিহিতা এক বাঙালি তরুণীকে যেন এক অপার্থিব সৌন্দর্যের মতো লাগছিল।
কিন্তু আয়াতের চোখ তখন ভিড়ের মাঝে আরভানকে খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।। এলিনা তাকে কিছু পরিচিত নারীর সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন। হঠাৎ আয়াতের চোখ পড়ল এক কোণে জেসিকা একদল তরুণের সাথে আড্ডা দিচ্ছে। আরভান এখানে, আর জেসিকাও এখানে! ভাবতেই আয়াতের মাথায় রক্ত চড়ে গেল।
চোখ ঘুরাতেই সে দেখল আরশাদ চৌধুরীকে। সেই প্রথম দিনের মতো আজও আরশাদ চৌধুরী অপলক চোখে এবং এক অদ্ভুত তৃষ্ণার্ত দৃষ্টিতে আয়াতের দিকে তাকিয়ে আছেন। আয়াত অস্বস্তিতে পড়ে সৌজন্যমূলক এক চিলতে হাসি দিয়ে নজর ঘুরিয়ে নিল।
তার দম বন্ধ হয়ে আসছে।নিজেকে এই কৃত্রিম কোলাহল থেকে একটু আড়াল করা প্রয়োজন মনে করে সে এলিনার কানে ফিসফিস করে বলল, আমি একটু ওয়াশরুম থেকে আসছি।”
”চলো, আমি সাথে যাচ্ছি।”
”না লাগবে না, আপনি এখানেই থাকুন।আমি একাই যেতে পারব। আপনি সবার সাথে কথা বলুন।”
এলিনা ইতস্তত করলেও পাশ থেকে একজন পরিচিত নারী তাকে ডেকে ফেলায় তিনি রাজি হলেন। আয়াত দ্রুত পা চালিয়ে ভিড় এড়িয়ে ওয়াশরুমের দিকে এগোতে লাগল।
****
এদিকে আরভান তখন গুরুত্বপূর্ণ ডিল পেপারে সই করছে। ফারহান নিচু স্বরে কানে কানে কিছু বলতেই আরভানের কপালের শিরা ফুলে উঠল। সামনে তাকাতেই সে মানুষের ভিড়ের ফাঁকা দিয়ে নজর পড়ল আয়াতের ওপর।
যেন আকাশ থেকে কোনো এক লাল পরী মাটিতে নেমে এসেছে। কিন্তু সেই পরীর সামনে একজন অস্ট্রেলিয়ান যুবক হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তাকে ড্যান্স ফ্লোরে নিয়ে যাওয়ার জন্য বোদ হয় অনুনয় করছে।
আরভান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে ক্ষিপ্র গতিতে এগিয়ে গিয়ে পেছন থেকে ওই যুবকের হাতটা সজোরে মুচড়ে ধরল। তার কানে ফিসফিস করে হিংস্র স্বরে বলল,
“নিজের হাতটা কি আজই দান করে দিতে চাও, নাকি না জেনেই ভুল করেছ?”
যুবকটি যন্ত্রণায় কুকড়ে গিয়ে বলল, “সরি, মিস্টার এভি,মাই মিস্টেক! আমি জানতাম না উনি আপনার পরিচিত…”
“শী ইজ মিসেস আরভান চৌধুরী! সো গেট লস্ট বিফোর আই লুজ মাই কুল!”
আরভান তাকে এক ধাক্কায় সরিয়ে দিল। এমন খুনে মেজাজ দেখে যুবকটি প্রাণভয়ে পালিয়ে গেল।
আকস্মিক এই কান্ড দেখে আয়াত কিছুটা ভয় পেলেও নিজেকে সামলে নিল। আরভান আয়াতের সামনে এসে দাঁড়িয়ে খুব শান্ত কিন্তু গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“তুমি এখানে কীভাবে এলে? কে নিয়ে এসেছে তোমাকে? এই অসুস্থ শরীর নিয়ে এখানে তোমার কাজ কী?”
আয়াত কিছু বলার আগেই এলিনা চৌধুরী সেখানে উপস্থিত হলেন। “আমি নিয়ে এসেছি ওকে। আরভান, তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে।”
”আপনার কথা আপনার কাছেই রাখুন। একটা অসুস্থ মেয়েকে আপনি কোন আক্কেলে এখনে নিয়ে এসেছেন? কার পারমিশন নিয়েছেন আপনি?”
এলিনা বুঝলেন ছেলেকে এখন শান্ত করা সম্ভব না, তাই একপ্রকার বাধ্য হয়েই আরভানকে একপাশে টেনে নিয়ে গেলেন। প্রথমে আরভান ক্ষিপ্ত থাকলেও এলিনা যখন নিচু স্বরে কিছু গোপন কথা তাকে শোনালেন, তখন আরভান একদম স্থির হয়ে গেল।
এলিনা শান্ত গলায় বললেন, “সময় এসেছে।তোমাদের দুজনেরই কিছু সত্যের মুখোমুখি হওয়ার।”
আরভান তার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে আর সেখানে এক মুহূর্ত দাঁড়ালো না। সে দ্রুত পায়ে আয়াতের দিকে পা বাড়ালো। আয়াত দূর থেকে মা-ছেলের এমন বাক-বিতণ্ডা দেখছিল। এই রহস্যময় আচরণ সে কিছুই বুঝতে পারছিল না। সে অস্বস্তি কাটাতে আবারও ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াতেই আরভান পেছন থেকে তার হাত ধরে এক হ্যাঁচকা টান দিয়ে নিজের বুকের খুব কাছে নিয়ে এল।
আয়াত সজোরে আরভানের প্রশস্ত বুকে আছড়ে পড়ল। আরভান ওর কোমরের বাঁধন আরও শক্ত করে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল। আয়াতের পিঠ আরভানের শক্ত বুকের সাথে মিশে গেল। আরভানের তপ্ত নিঃশ্বাস আয়াতের ঘাড়ের ওপর আছড়ে পড়ছে।
আরভানের চোখের সেই তেজ আর ক্ষিপ্রতা যেন মুহূর্তেই অন্য এক মাদকতায় রূপ নিল; ওর চোখের মণি দুটো আজ বড্ড নেশাক্ত হয়ে উঠেছে। আরভান আয়াতের কানের খুব কাছে মুখ নিয়ে তপ্ত স্বরে বলল,
“আপনাকে বিছানা থেকে এক পা নিচে নামাতে বারণ করেছিলাম, আর আপনি আমার নিষেধ অমান্য করে অন্য কারো কথায় সোজা পার্টিতে চলে আসলেন?”
আয়াত নিজেকে ছাড়ানোর বৃথা চেষ্টা করে অভিমানে মুখ ফুলিয়ে বলল, “কেন? আমি এসেছি বলে বুঝি খুব সমস্যা হয়ে গেল? আপনার সাজানো ফিউন্সে জেসিকার সাথে একান্ত মুহূর্ত কাটাতে বোধ হয় খুব ব্যাঘাত ঘটছে, তাই না?”
কথাটা বলেই আয়াত হাত ছাড়িয়ে ওয়াশরুমের দিকে দৌড় দিতে চাইল, কিন্তু আরভানের এই বলিষ্ঠ বাহুডোরের কাছে সে বড়ই অসহায়। আরভান এক ঝটকায় ওকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল। ওর চুলের ভাঁজে নিজের মুখ ডুবিয়ে গভীর এক ঘ্রাণ নিয়ে আরভান ফিসফিস করে বলল,
“শাড়ি কেন পরেছেন ম্যাডাম? এই দুর্বল শরীর আর মায়াবী সাজ দিয়ে কি আজ আমাকে পাগল করার পরিকল্পনা করেছেন?আপনি কি জানেন , এই লাল রঙটা আমার মস্তিষ্কের শিরায় আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে?”
আয়াতের হৃৎপিণ্ড তখন ড্রাম পেটাচ্ছে। সে কাঁপা গলায় বলল, “ব…বাজে কথা বলবেন না! আমার শরীর পুরোপুরিভাবে ঢাকা আছে।”
আরভান এবার আয়াতের চিবুক ধরে নিজের দিকে ফেরাল। আয়াতের কপালে কপাল ঠেকিয়ে আরভান তার গভীর মায়াবী চোখে তাকিয়ে বলল,
“ঢাকা আছে বলেই তো রহস্যটা বেশি কাজ করছে আয়াত। আমার চোখের সামনে তো তোমার সেই নরম, কোমল আর মেদহীন উদরের অনাবৃত দৃশ্যটা ভাসছে। এই শাড়ির প্রতিটি ভাঁজে তুমি আমার নেশা ধরিয়ে দিচ্ছো আয়াত। মনে হচ্ছে, তোমাকে এখনই এই কোলাহল থেকে দূরে কোনো নির্জনতায় নিয়ে যাই।”
আরভানের তপ্ত নিঃশ্বাস আয়াতের ঠোঁটের খুব কাছে আছড়ে পড়ছে। আরভানের হাত যখন আয়াতের শাড়ির পাতলা আবরণ ভেদ করে উন্মুক্ত ত্বকের উষ্ণতা স্পর্শ করতে চাইল, আয়াত শিউরে উঠে আরভানের হাতটা চেপে ধরল। তার বুক দ্রুত ওঠানামা করছে।
”আ…আপনিই তো বলেছিলেন আমি যেন আপনার থেকে দূরে থাকি, তবে এখন এত কাছে কেন এসেছেন?” আয়াত কোনোমতে কাঁপা গলায় প্রশ্নটা করল।
আরভান আয়াতের কানের লতিতে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে নেশাতুর কণ্ঠে বলল,
“আপনি যদি বারবার আমার আদেশ অমান্য করতে পারেন, তবে আমিও আমার দেওয়া প্রতিজ্ঞা ভেঙে আপনার নিঃশ্বাসের অনেকটা কাছে চলে আসতে দ্বিধা করব না—মিসেস আরভান ।”
’মিসেস আরভান ‘ ডাকটা শুনতেই আয়াতের সারা শরীরে বিদ্যুতের ঝলক বয়ে গেল। আরভান এবার ওর গাল আর ঘাড়ের সন্ধিস্থলে নিজের শীতল নাকটা ঘষতে শুরু করল। আয়াত পাথরের মতো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। লোকটা আজ বড্ড অস্বাভাবিক আচরণ করছে। যখন-তখন যেভাবে পারছে ওকে ছুঁতে চাইছে; সে কি জানে না এই ছোঁয়ায় আয়াতের ভেতরটা কতটা ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে?
হঠাৎ আরভানের হাত আয়াতের গালে স্লাইড করতে যেতেই সে অস্থির হয়ে উঠল। গাল থেকে হাত সরিয়ে কপালে ছুঁইয়ে আরভান ব্যাকুল হয়ে বলল, “আয়াত, তোমার শরীর আবার গরম হচ্ছে। মনে হচ্ছে জ্বরটা ফিরে আসবে। অনেক হয়েছে, চলো বাড়ি ফিরি। এই শাড়িতে তোমাকে দেখার ধৈর্য্য আর শক্তি- দুটোই আমার ফুরিয়ে আসছে। এর চেয়ে বেশি সময় এখানে থাকলে আমি হয়তো সবার সামনেই অঘটন ঘটিয়ে ফেলব।”
প্রথম কথায় আরভানের উদ্বেগ বুঝলেও শেষ কথার ইঙ্গিত বুঝতে আয়াতের বাকি রইল না। কথাগুলো আরভান এতটাই সোজাসুজি আর ঠোঁটকাটা ভাবে বলল যে একরাশ লজ্জা আর অস্বস্তি আয়াতকে গ্রাস করল। সে আরভানকে সজোরে এক ধাক্কা দিয়ে দ্রুত পায়ে ওয়াশরুমের দরজার দিকে এগিয়ে যেতে চাইল। লোকটা এতটাই বেপরোয়া তা তার ভাবনারও বাইরে ছিল।
কিন্তু তার যাওয়া এবারও হলো না আরভান শাড়ির আঁচল টেনে ধরল। আয়াত ঘুরে দাঁড়িয়ে রাগী চোখে তাকাতেই আরভান এক টানে তাকে আবার কাছে নিয়ে এল।
”শাড়ি পরে সামলাতে পারো না, আবার বড় বড় কথা! চলো, এখান থেকে চলো না হলে আমি হয়তো বড় কোনো ভুল করে ফেলব।”
আরভান তার চোখের গভীরে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল। আয়াত আবারও তাকে ধাক্কা দিয়ে পিছিয়ে গেল। “আপনি একটা আস্ত অসভ্য! সাথে অশ্লীল!”
সুযোগ বুঝে আয়াত কোনোমতে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ওয়াশরুমের ভেতর ঢুকে পড়ল। ভেতর থেকে চেঁচিয়ে বলল, “খবরদার! এটা ওমেন্স ওয়াশরুম, ভেতরে আসার চেষ্টা করবেন না একদম!”
আরভান ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি নিয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখেমুখে তখন এক আদিম বিজয়ীর তৃপ্তি। সে মনে মনে ভাবল, ‘এই মেয়েটা কি জানে না, কোনো স্বামী তার স্ত্রীকে এমন সাজে দেখলে কতটা দিকভ্রান্ত হয়ে যেতে পারে?’
আরভান বাইরে দাঁড়িয়ে ঠোঁটের কোণে সেই বাঁকা হাসি নিয়ে নিজের চুলগুলো ঠিক করে নিল। ঠিক সেই মুহূর্তেই পেছন থেকে এক তীক্ষ্ণ নারী কণ্ঠ ভেসে এল”
”Av ইন্টেল -এর মালিকের কী অধঃপতন! এখন কি না একটা দুই টাকার মেয়ের জন্য ওমেন্স ওয়াশরুমের সামনে পাহারা দিতে হচ্ছে? খুবই লজ্জাজনক মিস্টার আরভান চৌধুরী!”
চলবে…

