#পর্ব_২৫
#আমার_হয়ে_থেকো🍁
#Tasnim_Riya_khan
(সতর্কতা: এই পর্বে কিছুটা নৃশংসতা ও সাইকোলজিক্যাল থ্রিলারের উপাদান রয়েছে। পাঠকদের নিজ দায়িত্বে পড়ার অনুরোধ রইল।)
বাইরে রাতটা শান্ত হলেও শহরের এক পরিত্যক্ত কোল্ড স্টোরেজের আন্ডারগ্রাউন্ড বেজমেন্টে বাতাসের আর্দ্রতা জমাট বেঁধে আছে। ভেতরের এসি চলছে হিমাঙ্কের নিচে, কিন্তু সেখানে উপস্থিত মানুষগুলোর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। ঘরের মাঝখানে পাঁচটি লোহার শিকল ওপর থেকে ঝুলে আছে, আর সেই শিকলে হাত বাঁধা অবস্থায় ঝুলছে পাঁচটি জীবন্ত দেহ। তাদের প্রত্যেকের ঠোঁটে কালো টেপ লাগানো, চোখ জোড়া আতঙ্কে কোটর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। ঠিক পেছনে, ঘরের এক কোণায় একটা জরাজীর্ণ কাঠের চেয়ারে জ্ঞান হারিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে জেসিকা।
আরভান তার গায়ের ব্লেজারটা খুলে একপাশে ছুড়ে ফেলল। সাদা শার্টের হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে সে টেবিলে সাজানো ধারালো অস্ত্রগুলোর ওপর হাত বোলাচ্ছে। কখনো লেজার কাটার, কখনো সার্জিক্যাল স্ক্যাল্পেল থেকে শুরু করে ছোট কুড়াল। সে একেকটি অস্ত্রের ধার পরীক্ষা করছে আর কপালে সূক্ষ্ম বিরক্তির ভাঁজ পড়ছে। আরভান চৌধুরী! তার শান্ত দুচোখে আজ নরকের লেলিহান শিখা জ্বলছে। শান্ত স্বভাবের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সেই ভয়ংকর সাইকোপ্যাথ আজ জাগ্রত।
”ফারহান! এদিকে আয়।”
আরভানের শীতল কণ্ঠস্বর পুরো বেজমেন্টে প্রতিধ্বনিত হলো। ফারহান হাই তুলতে তুলতে এগিয়ে এল। সে নিজেও এই পরিবেশে বেশ অস্বস্তি বোধ করছে। সে আরভানের পাশে দাঁড়িয়ে করুণ স্বরে বলল, “এভি, অনেক রাত হয়েছে। এবার কি শেষ করবি?”
আরভান একটা ধারালো স্কালপেল তুলে নিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “হারামজাদা! এগুলোতে ধার নেই কেন? আমি কি এগুলো দিয়ে সবজি কাটব? তুই জানিস আমি নিখুঁত কাজ পছন্দ করি।”
ফারহান ঢোক গিলে বলল, “ব্রো, তুই কি সত্যিই এটা করতে চাস? এদের মেরে তোর কী লাভ হবে? এর চেয়ে কোনো গহীন জঙ্গলে ফেলে দিয়ে আয়, বন্য পশুরাই কাজ সেরে দেবে। পুলিশও কোনো ঝামেলা করতে পারবে না।”
আরভান স্কালপেলটা আঙুলের ডগায় ঘুরিয়ে এক পৈশাচিক হাসি হাসল। “ছেড়ে দেব? ফারহান, তুই জানিস না আয়াত আমার কাছে কী! ও আমার এই অন্ধকার জীবনে একমাত্র আলো হয়ে এসেছে। ও এমন একজন নারী, যার চোখে আমি প্রথমবার নিজের জন্য সত্যিকারের মায়া দেখেছি, অকৃত্রিম ভালোবাসা দেখেছি। একটা মেয়ে যখন কোনো পুরুষকে না দেখেও তার ওপর এতটা অটল ভরসা রাখে, তখন সেই ভরসা ভাঙার চেষ্টা যারা করে, তাদের মাশুল কতটা ভয়াবহ হতে পারে তোর কোনো ধারণা আছে?
আরভান থামল না, স্কালপেলের ডগা দিয়ে টেবিলের কাঠে আঁচড় কাটতে কাটতে বলতে লাগল,
” ও চেয়েছিল একটা সুন্দর জীবন। আমি ওকে সেই জীবনটাই দেব… ওর চারপাশটা ফুলে ফুলে ভরিয়ে দেব। কিন্তু সেই ফুল বাগানের গায়ে যারা ধুলো ছিটাতে আসবে, তাদের অস্তিত্ব আমি এই পৃথিবী থেকে এমনভাবে মুছে দেব যেন তারা কোনোদিন জন্মই নেয়নি। আর তারপর আমি …
আরভান থামল। বাকিটা আর বলল না। কালো পোশাকে থাকা তার দুই ব্যক্তিগত দেহরক্ষীকে ইশারা করল। তারা গিয়ে ওই পাঁচজন লোকের মুখ থেকে টেপ খুলে দিল। মুখ খুলতেই বেজমেন্টের দেয়াল কাঁপিয়ে তারা আর্তনাদ করে উঠল।
”স্যার! প্লিজ মাফ করে দিন! আমরা কিছু করিনি। আমাদের মারবেন না!”
আরভান ধীর পায়ে তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার হাতের স্ক্যাল্পেলটা মৃদু আলোয় ঝিলিক দিয়ে উঠল। সে একজনের চিবুক স্ক্যাল্পেলের আগা দিয়ে উঁচু করে ধরে শীতল গলায় প্রশ্ন করল, “আয়াতের পেছনে কে পাঠিয়েছিল তোদের? সত্যি বললে যন্ত্রণাহীন মৃত্যু পাবি, আর মিথ্যা বললে জীবন্ত নরক এখানেই দেখবি।”
লোকগুলো কাঁপতে কাঁপতে বলল, “আমরা জানি না স্যার! ফোনে শুধু একজন মধ্যবয়স্ক পুরুষের গলা শুনেছিলাম। আর এই জেসিকা ম্যাডাম আমাদের টাকা আর ওই মেয়ের ছবি দিয়েছিলেন। আমাদের বলা হয়েছিল মেয়েটাকে ভয় দেখিয়ে একটা নির্জন জায়গায় নিয়ে যেতে, সেখানে একজন পুরুষ থাকবে… আমাদের কাজ ছিল কেবল তাকে পৌঁছে দেওয়া।”
আরভান বাঁকা হাসল। “শাহরিয়ার? রিয়েলি? ফারহান, শাহরিয়ার কোথায় এখন?”
ফারহান মোবাইল চেক করে বলল, “তোর বাবার সিকিউরিটি জোনে গাপটি মেরে বসে আছে। ভয়ংকর ভীতু শালায়, ওখান থেকে বেরই হচ্ছে না।”
আরভানের এক দেহরক্ষী পাশ থেকে বলে উঠল, “স্যার, এদের কী করব?”
লোকগুলো আবারও ডুকরে কেঁদে উঠল, “স্যার আমাদের ছেড়ে দিন… আমাদের পরিবার আছে…”
আরভান ঠোঁটের কোণে নৃশংস হাসি নিয়ে লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল, “লিসেন কেয়ারফুলি…
আমি একটা মশাও নিজের হাতে মারি না। ওটা বড্ড সস্তা কাজ।বাট ফর হার? আই ডোন্ট মাইন্ড গেটিং ব্লাড অন মাই হ্যান্ডস।শি’জ নট জাস্ট মাই ওয়াইফ — শি’জ মাই লাইন।ক্রস ইট… অ্যান্ড প্রে দ্যাট ইউ ডাই ফাস্ট,
বিকজ আই ওয়োন্ট শো মার্সি।
আরভানের এমন রুদ্ররূপে ফারহান পাথর হয়ে গেল। এই আরভান তার পরিচিত নয়। সে জানত আরভান ধূর্ত ব্যবসায়ী, সে মানুষকে ম্যানিপুলেট করতে ওস্তাদ; কিন্তু নিজের হাতে অস্ত্র তুলে নিয়ে জল্লাদের মতো বিচার করবে, তা ফারহানের কল্পনারও বাইরে ছিল। আরভানের পসেসিভনেস যে এত গভীর আর ভয়ংকর হতে পারে, তা আজ সে হাড়েমাসু টের পাচ্ছে।
আরভান এবার জেসিকার সামনে গিয়ে এক জগ হিমাঙ্ক শীতল পানি ওর মুখে সজোরে ছুড়ে মারল। জেসিকা আঁতকে উঠে চোখ মেলল। নিজের হাত-পা বাঁধা অবস্থা আর চারপাশের বীভৎস রক্তারক্তি পরিবেশ দেখে তার কলিজা শুকিয়ে গেল। সে চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু প্রচণ্ড আতঙ্কে গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। কোনোমতে তোতলামি করে বলল,
”আমাকে এখানে কেন আনা হয়েছে? এভি… এসব কী? তুমি আমায় কেন বেঁধে রেখেছ? প্লিজ ছেড়ে দাও!”
আরভান জেসিকার চিবুকটা তার হাতের ধারালো স্ক্যাল্পেল দিয়ে আলতো করে স্পর্শ করল। ওর চোখে এখন হন্তারকের শীতলতা।
“বলেছিলাম না বেবি, খুব শীঘ্রই তোমাকে অনেক ভালোবাসা দেব? আজ দেখবে আমার ভালোবাসা কতটা ভয়ঙ্কর আর কতটা সুন্দর। আর আমি আজ দেখব তোমার সহ্য ক্ষমতা ঠিক কতটুকু।”
জেসিকা কাঁপতে কাঁপতে বলল, “এভি, তুমি এটা করতে পারো না! তুমি একজন সফিস্টিকেটেড জেন্টলম্যান! এই নোংরামি তোমার সাজে না!”
”Fuck…ইওর জেন্টলম্যানশিপ! তোমরা সবাই আমাকে বড্ড ‘ভদ্র’ ভেবেছ, এটাই তোমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। আমি শুধু শান্ত থাকি—কারণ আমার হিংস্র হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু আমার স্ত্রীর গায়ে হাত? দ্যাট’স দ্য অনলি রিজন আই’ড পার্সোনালি শো আপ। বেবি, আমার বউয়ের চোখের এক ফোঁটা জলের দাম তোদের সবার রক্ত দিয়েও শোধ হবে না।”
শিকলে ঝুলতে থাকা লোকগুলোর একজন ডুকরে কেঁদে উঠল,
“স্যার! ওই ম্যাডামকে শুধু ভয় দেখাতে বলা হয়েছিল আমাদের! আমরা তাকে আঘাত করতে চাইনি! আমরা তাকে আঘাত করতে চাইনি! আমরা অসহায় স্যার, পরিবারের জন্য টাকার লোভে এসব করেছি। এবারের মতো মাফ করে দিন, আমরা এই অন্ধকার পথ ছেড়ে দেব!”
আরভান লোকটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। “তোমাদের ইনস্ট্রাকশন ছিল শুধু ভয় দেখানো? গুড। আমিও তোমাদের শুধু একটু ভয় দেখাবো আর সামান্য ‘অক্ষম’ করে দেব যাতে ভবিষ্যতে কোনো মেয়ের দিকে টাকার লালসায় তাকাতে না পারো। তোমাদের পরিবারের দায়িত্ব আমি নিলাম, তারা রাজার হালে থাকবে। শুধু তোমাদের এই সুন্দর পা দুটো আমার চাই। কারণ এই পা দিয়ে তোমরা আমার আয়াতের পেছনে ধাওয়া করেছিলে।”
ফারহান চোখ বড় বড় করে বলল, “আরভান, এটা কি একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে না? ”
আরভান কোনো কথা বলল না। সে নিজের হাতে একটি ছোট ধারালো কুড়াল তুলে নিল। বেজমেন্টের দেওয়ালে বড় স্ক্রিনে সিসিটিভি ফুটেজটা আবার প্লে করল। সেখানে দেখা যাচ্ছে আয়াত প্রাণভয়ে দৌড়াচ্ছে আর এই লোকগুলো পৈশাচিক উল্লাসে তার পিছু নিয়েছে। আরভানের রক্ত মাথায় চড়ে গেল। পৈশাচিক এক উন্মাদনায় সে কুড়াল দিয়ে একে একে সবার পায়ের গোড়ালি শরীর থেকে আলাদা করতে শুরু করল।
বীভৎস আর্তনাদে পুরো বেজমেন্ট নরকপুরীতে পরিণত হলো। ফারহান চোখ বন্ধ করে কাঁপছে। সে ভাবতেও পারেনি আরভান এতটা নৃশংস হতে পারে। এই দৃশ্য দেখে জেসিকা গগনবিদারী চিৎকার করে আবারও জ্ঞান হারালো। আরভান কোনো কথা না বলেই একেকজনের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তাদের আর্তনাদে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হলেও আরভানের পাথুরে চোখে কোনো করুণা নেই। সে শান্ত গলায় বলল, “তোমরা আমার বউয়ের চিৎকার শুনতে চেয়েছিলে না? আজ আমি তোমাদের হাহাকার শুনব। অদ্ভুত না? আমার মস্তিষ্কটাই কেমন ড্যামেজ করে দিয়েছে ওই মেয়েটা। ওর সামনে গেলে আমি মানুষ হয়ে যাই, আর ওর পেছনে কেউ লাগলে আমি সাক্ষাৎ জানোয়ার হয়ে যাই।”
রক্তের ফিনকি আরভানের শ্বেতশুভ্র শার্টে লেপ্টে গেল। সে নিজের রক্তাক্ত হাতের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল, “Fuck man, শুধু এই একটা মেয়ের জন্য আমাকে পিস বাই পিস মানুষ কাটতে হচ্ছে! কী এক সর্বনাশা নেশায় ফেললে আমায় আয়াত!”
রক্তাক্ত হাতে আরভান এবার জেসিকার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আবারো তার মুখে পানি দিয়ে জ্ঞান ফেরালো। জেসিকা চোখ মেলতেই আরভানের গায়ে ছোপ ছোপ টাটকা রক্ত আর কাঁচা মাংসের গন্ধ পেয়ে সোজা বমি করে দিল। আরভান বিরক্তি নিয়ে মুখ কুঁচকে নিল। “ছিঃ জেসিকা! এসব কী নোংরামি?”
”আমাকে ছেড়ে দাও আরভান… প্লিজ!” জেসিকা হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।
”তুমিই তো সব নষ্টের মূল। বলো, আমার আরশাদ চৌধুরী কেন চাইছেন তোমাকে আমার বউ করতে? নাকি এর পেছনে অন্য কোনো চাল আছে?”
জেসিকা কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমি জানি না আরভান! বিশ্বাস করো আমি জানি না! আমি আর কোনোদিন আয়াতের সামনে যাবো না! তোমার ছায়াও মাড়াবো না! আমার বাঁধনটা খুলে দাও আরভান, বড্ড ব্যথা লাগছে!”
”উম্ম… তোমার হাতের বাঁধন খুলতে গেলে তো আমাকে তোমাকে ছুঁতে হবে জেসিকা। আর আয়াত বলেছে আমি যদি তোমাকে স্পর্শ করি তবে ও আমার আঙুল কুচিকুচি করে কাটবে। আমি আমার বউয়ের কথা অমান্য করতে পারব না।”
আরভানের কথা শুনে ফারহান আর জেসিকা দুজনেই হতবাক। এত বড় এক সাইকোপ্যাথ খুনি কি না এখন বউয়ের কাল্পনিক ভয়ের দোহাই দিচ্ছে! ফারহান এগিয়ে এসে বলল, “আরভান, এবার শেষ কর। পুলিশ সিগন্যাল পেয়ে যেতে পারে।”
আরভান জেসিকার দিকে তাকিয়ে একটা মায়াবী কিন্তু খুনে হাসি দিল। “বেবি জেসিকাকে একটা ছোট গিফট না দিলে ও তো আমায় ভুলে যাবে।”
আরভান টেবিল থেকে একটা লেজার কাটার মেশিন প্রচণ্ড গরম করে নিয়ে এল। জেসিকার চোখ আতঙ্কে কোটর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইল। “আরভান! কী করতে চাইছো তুমি?”
আরভান কোনো জবাব দিল না। সে তপ্ত লেজার দিয়ে জেসিকার গালে আর কপালে নিখুঁতভাবে ‘A’ অক্ষরটি খোদাই করে দিল—যেটা আয়াতের নামের আদ্যক্ষর। এক গগনবিদারী চিৎকারে পুরো কোল্ড স্টোরেজ কেঁপে উঠল। জেসিকার সুন্দর মুখে আরভানের দেওয়া স্থায়ী কলঙ্কের দাগ বসে গেল।
”এটা শুধু টিজার জেসিকা। এরপরেও যদি আমার সীমানা অতিক্রম করো, তবে পুরো মুভি দেখতে পাবে। আই হোপ এর পর থেকে আর কখনো জানতে চাইবে না ওই মেয়ের মধ্যে এমন কী আছে।”
বীভৎস পোড়া গন্ধ আর কানফাটানো চিৎকারে পুরো বেজমেন্ট যেন এক জীবন্ত নরকে পরিণত হলো। জেসিকা আবারও জ্ঞান হারালো, কিন্তু আরভানের চোখে কোনো অনুশোচনা নেই। সে একটা রুমাল দিয়ে নিজের মুখের রক্তের ছিটে পরিষ্কার করল। ওর চোখে এখন এক পৈশাচিক তৃপ্তি। সে তার লোকদের ডেকে বলল,
“এই লোকগুলোর একটাকেও মরতে দিবি না। ট্রিটমেন্টে পাঠা। কিন্তু এদের বিচ্ছিন্ন হাত আর পাগুলো একটা সুন্দর আকর্ষণীয় গিফট বক্সে প্যাকিং করো। পার্সেলের ওপর লিখে দিস— ‘দিস ইজ হোয়াট হ্যাপেনস হোয়েন ইউ টাচ মাই ওম্যান’। আর হ্যাঁ, গিফট র্যাপটা যেন খুব লাক্সারিয়াস হয়।”
ফারহান অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞেস করল, “এই পার্সেল কোথায় যাবে?”
আরভান তার দিকে তাকিয়ে একটা ভুবন ভোলানো হাসি দিল। “উপহার পাঠাতে হবে ফারহান। আমার শ্রদ্ধেয় বাবা যেন বুঝতে পারে—আরভান চৌধুরীর সীমারেখা ঠিক কোথায় শুরু আর কোথায় শেষ।”
কিছু একটা ভেবে সে আবারও বলল, “ফারহান, বাংলাদেশে আয়াতের বাবা-মার সেই পুরনো কেসটা রি-ওপেন করতে হবে। কাজটা যেন দ্রুত হয়।”
কথাটা বলে সে সেখান থেকে বের হতে হতে মোবাইলের ওয়ালপেপারে আয়াতের হাসিমুখের ছবিটা দেখল। তার চোখে তখন দানবীয় রুক্ষতা মুছে গিয়ে ফুটে উঠল পরম মমতা। সে মনে মনে বলল, “আসছি আয়াত, তোমার ওই অদ্ভুত সুন্দর ভুলটা তোমার কাছেই ফিরে আসছে। একদম পবিত্র হয়ে।”
ফারহান পেছনে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করল, “এই শালা যে লেভেলের সাইকো, তাতে আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে কোনোদিন ‘বোন বোন’ করলে তাকেও হয়তো পিস করে কেটে পার্সেল করে দেবে!”
*******
রাত তখন এগারোটা ছুঁইছুঁই। বাড়ির ভেতর পিনপতন নীরবতা থাকলেও রান্নাঘরে আয়াতের মনের ভেতর যেন অগ্নিকুণ্ড জ্বলছে। চুলার ওপর রাখা কড়াইয়ে খুন্তি নাড়ছে সে, আর রাগে ফেটে পড়ছে। মুখে অনবরত গালি ছুড়ে দিচ্ছে সেই নিষ্ঠুর লোকটার নামে। সেই যে সকালে বাড়ি এল, তারপর নিজের রুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে কোথায় যে উধাও হলো, আর তার দেখা নেই!
আয়াতের ভাবনার মাঝেই সদর দরজা খোলার শব্দ হলো। আরভান বাড়িতে ঢুকেছে। শব্দ পেয়ে আয়াত কোমরে হাত দিয়ে ড্রয়িং রুমে এসে দাঁড়াল। হাতে রান্নার চামচ, চোখেমুখে যেন আগুন ঝরছে।
আরভানের হাতে একগুচ্ছ তাজা নীল অপরাজিতা। সে আয়াতকে দেখে একগাল হেসে নিজের ব্লেজারটা সোফায় ছুড়ে ফেলে এগিয়ে এল।
“বিউটিফুল ফ্লাওয়ার্স ফর মাই বিউটিফুল মিসেস! কেমন আছেন প্রিয়তমা?”
আয়াত ঝামটা দিয়ে উঠল, ” কোথায় গিয়েছিলে?”
”কেন? অফিসেই তো ছিলাম।” আরভান খুব স্বাভাবিক গলায় মিথ্যাটা বলল।
”তাই? বাড়িতে পুলিশ আসলো, জেসিকার বাবা আপনার নামে অপবাদ দিয়ে গেল, পুরো বাড়ি নজরবন্দি—অথচ আপনি আপনার স্ত্রীকে একা ফেলে অফিসের বাহানায় বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন? বাহ! দারুণ দায়িত্ব আপনার!”
আরভান এবার আয়াতের একদম কাছে এগিয়ে এল। নিচু হয়ে ওকে পাঁজাকোলা করে ধরতে চাইল, কিন্তু আয়াত সরে যেতেই সে খুব নরম করে ওকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। ওর চিবুকটা আয়াতের কাঁধে রেখে আদুরে গলায় বলল, “আমার বাড়ির সিকিউরিটি অনেক স্ট্রং আয়াত, তোমাকে কেউ টাচ করার সাহস পাবে না। সারাদিন পর ফিরেছি, আমাকে একটু ভালোবাসো তো… বড্ড ক্লান্ত আমি।”
আরভানের আচমকা এমন কাতর অনুরোধে আয়াত জমে গেল। ওর হাত দুটো অজান্তেই আরভানের মাথায় আশ্রয় নিল। কিন্তু হাত রাখতেই সে চমকে উঠল। আরভানের চুলগুলো একদম ভেজা!
“অফিসে ছিলেন তাহলে চুল ভেজা কেন? বৃষ্টি তো হয়নি!”
আরভান শব্দ করে হেসে আয়াতের গালে ঠোঁট ডুবিয়ে দিল। “বড্ড নজর আপনার মিসেস! শাওয়ার নিয়েছিলাম অফিসের জিমেই। আপনাকে ছাড়া কোনো নারীকে আজ পর্যন্ত আরভান চৌধুরী স্পর্শ করেনি, করার রুচিও নেই।”
আয়াত আর কথা বাড়ালো না। সে আরভানকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ালো। আরভানও লেজের মতো পেছনে পেছনে গেল। আয়াত থালাবাসন ধোয়ার সিঙ্কের দিকে ইশারা করে বলল, “বেশি ভালোবাসা দেখাতে হবে না, যান গিয়ে থালা-বাসনগুলো ধুয়ে দিন।”
আরভান আকাশ থেকে পড়ল। “আমি? আরভান চৌধুরী থালাবাসন ধোবে? মেলবোর্নের বিজনেস টাইকুন এখন ভিম লিকুইড হাতে নেবে?”
আয়াত চোখ পাকিয়ে তাকাতেই আরভান দুই হাত তুলে আত্মসমর্পণ করল। “ওকে, ওকে! করছি। বউয়ের হুকুম বলে কথা!”
আয়াত রান্নায় মনোযোগ দিল, আর আরভান আয়াতের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসল। এই ছোট ছোট শাসন আর মায়ার মধ্যে সে এক অদ্ভুত প্রশান্তি খুঁজে পায়। সে এখন নিশ্চিত—শাহরিয়ার কেন সামান্য এক মেয়ের জন্য দেশ ছেড়ে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত ছুটে এসেছে। তার এই বউটা সত্যিই বড্ড স্পেশাল।
থালাবাসন ধুতে গিয়ে হঠাৎ আরভানের মুখ দিয়ে একটা যন্ত্রণার শব্দ বের হলো। আয়াত আঁতকে উঠে ওর হাত টেনে ধরল। “কী হয়েছে? দেখি আপনার হাত!
”
দেখল আরভানের ডান হাতের পাতায় লালচে ছোপ।সেই নৃশংস অভিযানের সময় ওর হাতে ছোট একটা চোট লেগেছিল।
আরভান মিথ্যা হাসল।
”কিছু হয়নি আয়াত, সামান্য ছ্যাঁকা লেগেছে বোধ হয়।”
”আপনি সবসময় কেন এমন করেন? নিজের শরীরের যত্ন কেন নিতে পারেন না? একদম নিয়ম মানেন না!”
আয়াতে চোখে জল টলমল করছে।
”আপাতত তো তুমি আছো, তুমিই দেখে নাও না।” আরভান মুচকি হাসল।
আয়াত তড়িঘড়ি করে মলম এনে আরভানের হাতে লাগিয়ে দিল। “আপনার আর কিছু করতে হবে না, আমি করে নিচ্ছি। আপনি গিয়ে বিশ্রাম নিন।”
আয়াত আবারও রান্নায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আরভান রান্নাঘরের দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে অপলক তাকিয়ে রইল আয়াতের দিকে। আয়াতের পিঠের ওপর ছড়িয়ে থাকা রেশমি চুলগুলো হাত দিয়ে ছুঁয়ে বলল,
“এত লম্বা চুল আপনার, বিরক্ত লাগে না?”
“লাগে।”
“তাহলে কেন রেখেছেন?”
“আপনার জন্য।”
আরভান অবাক হলো। “আমার জন্য মানে?”
“ছোট মা বলেছিল—আপনি যখন বাংলাদেশে গিয়েছিলেন, তখন উনার লম্বা চুলের প্রশংসা করেছিলেন। সেটা শুনেই আমি চুল কাটা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম আপনি যখন আসবেন, আপনি আমার চুলের প্রশংসা করবেন, আমার পিছু পিছু ঘুরবেন… কিন্তু আপনি তো…” আয়াতের কথা অসমাপ্ত রয়ে গেল।
আয়াতের কথা শেষ হওয়ার আগেই আরভান পেছন থেকে ওকে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরল। কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “না দেখে, না চিনেও একটা মানুষের জন্য এতটা আবেগ জমা রাখা যায় আয়াত? সরি, সবকিছুর জন্য। খুব দেরি করে ফেলেছি তোমাকে চিনতে। এখন তোমার সাথে এই ক্ষুদ্র জীবনটা কাটানোর লোভ হচ্ছে ভীষণ।”
আয়াত একটু গলে গিয়ে বলল, “হঠাৎ এমন করছেন কেন? আপনি কি আমায় ছেড়ে কোথাও চলে যেতে চাইছেন?”
”উমঁহু! সারাজীবন তোমার সাথে থাকতে চাইছি। তোমার সাথে বৃদ্ধ হতে চাইছি। আমাদের একটা ছোট্ট সুন্দর সংসার হবে। দিবে না আমাকে একটা সুন্দর পরিবার?”
আরভানের এমন আবেগপ্রবণ কথায় আয়াতের বুকটা কেঁপে উঠল। এই লোকটা মাঝে মাঝে এমনভাবে অধিকার দাবি করে যে আয়াত নিজেকে হারিয়ে ফেলে। আরভান আয়াতের কানের লতিতে ওষ্ঠ ছুঁইয়ে দিল।
“আপনাকে সারাদিনে অনেক মিস করেছি মিসেস। আপনার ভেতরের রাগটা এবার ঝেড়ে ফেলুন না!”
আয়াত অভিমানী সুরে বলল, “আপনি বড্ড নষ্ট মানুষ আরভান! মায়ার জালে ফাঁসাতে ওস্তাদ।”
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই আরভান আয়াতকে এক ঝটকায় কিচেন স্ল্যাবের ওপর বসিয়ে দিল। আয়াত হকচকিয়ে গিয়ে আরভানের শার্টের কলার খামচে ধরল। আরভান ওর দুপাশে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে গভীর নেশালো চোখে তাকাল।
“যেমনই হই, পুরোটাই তো তোমার।”
আয়াত ধরা গলায় বলল, “আবারও বলছি, ভুল জেনেই বলছি— ভালোবাসি আরভান।”
আরভানের চোখে তখন কামনার চেয়েও বেশি তৃপ্তি। “আয়াত, তোমার ঠোঁটের নিচের এই ছোট্ট তিলটা আমাকে চুম্বকের মতো টানছে। যদি আজ এটা ছুঁয়ে দিই, তবে কি খুব বড় অপরাধী হয়ে যাব? ক্যান আই কিস ইউ আয়াত?”
আয়াতের দম বন্ধ হয়ে আসছে। সে শুধু আরভানের শার্টের কলারটা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। আরভান যখন আয়াতের ওষ্ঠে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দিতে উদ্যত, ঠিক তখনই আয়াত মুচকি হেসে বলে উঠল,
“বাসর তো হয়েই গেছে বন্ধুর সামনে দাবি করলেন, তবে এখন আবার নতুন করে কীসের চেষ্টা করছেন মিস্টার?”
আরভান থমকে গেল। তারপর শব্দ করে হেসে উঠল। “বাহানা বাদ দিন মিসেস!”
আরভান আয়াতের হাত দুটো পেছনে নিয়ে চেপে ধরল। ওর অধরে নিজের অধর ডুবিয়ে দিল। জীবনের প্রথম কোনো পুরুষের এমন তৃষ্ণার্ত আক্রমণ আয়াত সহ্য করতে পারল না। আরভানের দাঁতের কামড়ে ঠোঁট কেটে যাওয়ার উপক্রম হলো। আয়াত যন্ত্রণায় আর আদরে কুঁকড়ে গিয়ে আরভানকে সরিয়ে দিতে চাইল, কিন্তু আরভান সরল না। আয়াতের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল, সে ছটফট করছিল। একপর্যায়ে আরভান যখন ঠোঁট ছেড়ে আয়াতের গলার ভাঁজে মুখ রাখল, আদরে ভরিয়ে দিল।
আয়াত হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “আরভান… আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। আপনার এই বন্যতা সহ্য করা যাচ্ছে না।”
আরভান মুখ তুলে আয়াতের কপালে কপাল ঠেকাল। গাড়ে স্বরে বলল, “অভ্যেস করে নিন মিসেস। এরপর থেকে আমার ছোঁয়া আরও গভীর হবে। ক্যান আই টাচ ইউর হোল বডি, মিসেস আরভান?”
আয়াত চমকে উঠল। একটা চুম্বন যদি এতটা দাহ্য হয়, তবে পুরো শরীরের দখল সে কীভাবে সইবে? আয়াত আঁতকে উঠে বলল, “না!”
আয়াত ভেবেছিল আরভান হয়তো জোর করবে, কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে আরভান আয়াতের কপালে একটা গভীর চুমু এঁকে দিল। তারপর আলতো করে ওকে স্ল্যাব থেকে নামিয়ে দিয়ে রান্নাঘর ছেড়ে গম্ভীর মুখে বেরিয়ে গেল। আয়াত হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। লোকটা কি রাগ করল? তার কি ‘না’ বলাটা উচিত হয়নি? একজন স্বামী তার স্ত্রীর কাছে আসার প্রস্তাব রাখতেই পারেন।
আয়াত যখন নিজেকে দোষী ভেবে অস্থির হচ্ছে, ঠিক তখনই রান্নাঘরের দরজায় আরভান আবার উদয় হলো। “মিসেস আরভান! আপনার স্বামী তার হাত পুড়িয়ে ফেলেছে, আপনি কি তাকে একটু খাইয়ে দিবেন না? নাকি এখানেও ‘না’ বলবেন?”
আয়াত চমকে উঠল। এই লোকটা এত বেহায়া কেন! একটু আগেই কী গভীর সিন তৈরি করেছিল, আর এখন বাচ্চার মতো খাবারের আবদার করছে! আয়াত বিরক্ত হয়ে চিৎকার করে উঠল, “আরভান! আপনার বাঁ হাত পুড়েছে, তাও সামান্য। ডান হাত তো একদম ঠিক আছে! যান হাত-মুখ ধুয়ে টেবিলে বসুন!”
আরভান মুখ গোমড়া করে চলে গেল। আয়াত সেখানেই স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারল না। এটা কি সেই প্রথম দিনের ভয়ংকর আরভান নাকি কোনো একটা আদুরে বাচ্চা!
চলবে…
#পর্ব_২৬
#আমার_হয়ে_থেকো🍁
#Tasnim_Riya_khan
রান্নাঘরের কাজ শেষ করতে আয়াতের কিছুটা দেরিই হয়ে গেল। ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই ওর নজরে এল সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে আরভান গভীর ঘুমে মগ্ন। মাথার নিচে একটা কুশন দেওয়া, এক হাত নিজের পেটের ওপর রাখা। আয়াত ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে সোফার পাশে কার্পেটের ওপর বসল।
চাঁদের আলো জানলা দিয়ে চুঁইয়ে আরভানের তীক্ষ্ণ মুখশ্রীর ওপর পড়েছে। আয়াত অপলক চেয়ে রইল সেই মুখটার দিকে। ঘন চোখের পাপড়িগুলো যেন নিখুঁতভাবে আঁকা কোনো তুলির আঁচড়। ঘুমের ঘোরেও ওর সরু ভ্রু জোড়া সামান্য কুঁচকে আছে, যেন অবচেতনেও সে কোনো এক গভীর চিন্তায় নিমগ্ন। লোকটাকে কী এক অপার্থিব সুন্দর লাগছে এই আধো-আলো ছায়ায়!
কিছুক্ষণ আগের রান্নাঘরের সেই পাগল করা দৃশ্যগুলো আয়াতের চোখের সামনে সিনেমার মতো ভেসে উঠল। মনের অজান্তেই ওর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। এই তো সেই আদুরে বাচ্চাটা, যে একটু আগে তার কাছে ছোট ছোট আবদার করছিল!
আয়াত আলতো করে আরভানের গালে নিজের আঙুলগুলো বুলালো। আরভানের এই ট্রিম করা দাড়িওয়ালা গালটা ওর ভীষণ পছন্দের। দেখলেই বারবার ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে করে। প্রতিটা নারীর মনেই কি তার প্রিয় পুরুষের জন্য এমন সুপ্ত ইচ্ছা জাগে? নাকি সে একাই তার স্বামীর এই ব্যক্তিত্বের প্রতি এতটা আসক্ত? কী অদ্ভুত! কিছুদিন আগেও যাকে সহ্য করতে পারত না, আজ তার প্রতি এই টান কোত্থেকে এল? আজ তার সামান্য সান্নিধ্যের জন্য আয়াতের মনটা কেন এভাবে ব্যাকুল হয়ে ওঠে?
আয়াত খুব সাবধানে আরভানের মাথাটা একটু তুলল। কুশনটা সরিয়ে দিয়ে নিজে সোফায় বসল, তারপর পরম মমতায় আরভানের মাথাটা নিজের কোলে টেনে নিল। ঘুমের ঘোরেই আরভান কিছুটা নড়েচড়ে উঠল, হয়তো কাঁচা ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায় কিছুটা বিরক্ত হলো। অবচেতনেই সে মুখ ঘুরিয়ে আয়াতের পেটের দিকে ফিরল। আরভানের তপ্ত নিঃশ্বাস আয়াতের পেটে এসে বিঁধতেই এক অদ্ভুত শিহরণ ওর সারা শরীরে বয়ে গেল। আয়াত কয়েক মুহূর্তের জন্য শক্ত হয়ে গেল, কিছুক্ষণ দম বন্ধ করে নিজেকে শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করল। তারপর আরভানের সিল্কি চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে খুব নিচু স্বরে ডাকল,
”আরভান… শুনছেন?”
”হুম।” আরভানের বুজে আসা চোখ থেকে খুব সংক্ষিপ্ত এবং ভারী একটা উত্তর এল।
”আপনি তো কিছুই খাননি। একটু উঠে কিছু খেয়ে নিন না প্লিজ? খালি পেটে ঘুমানো একদম ঠিক নয়।”
আরভান চোখ না খুলেই বিড়বিড় করে বলল, “খাচ্ছি তো…”
আয়াত অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল, “কী খাচ্ছেন? খাবার তো ওখানেই পড়ে আছে।”
আরভান এবার মুখটা আয়াতের পেটে আরও গভীর করে গুঁজে দিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল, “বউয়ের আদর খাচ্ছি… ডিস্টার্ব করবেন না তো!”
আয়াত স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে সে। এই মানুষটা মুহূর্তের মধ্যে কীভাবে সব গাম্ভীর্য ধুয়ে মুছে দিয়ে এমন পসেসিভ পাগলামি করতে পারে! আরভান যেন কয়েক জন্মের ক্লান্তি নিয়ে আবারও ঘুমের অতলে হারিয়ে গেল। দেখে মনে হচ্ছে, কতদিন এই মানুষটা ঠিকমতো শান্তিতে ঘুমায়নি। আয়াত নিস্পলক চেয়ে রইল আরভানের শান্ত অবয়বের দিকে। কী এক মায়া জড়িয়ে আছে এই মুখটাতে! এই মায়ার বাঁধনে সে কবে যে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছে, তা সে নিজেও জানে না। এই বাঁধন যে এত শক্তিশালী হবে, তা আয়াত বোধহয় কোনোদিন কল্পনাও করেনি।
কয়েক মিনিট পর আরভান হঠাৎ ধড়ফড় করে উঠে বসল। চোখের ঘুম ঝেড়ে ফেলে সে আয়াতের দিকে একবার তাকালো, কিন্তু সেই চোখে আগের সেই আদুরে ভাবটা মুহূর্তেই উধাও। একদম নিরাসক্ত এবং গম্ভীর গলায় বলল,
“তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো। কাল সকালে তোমার কলেজ আছে, সঠিক সময়ে তৈরি থেকো।”
বলেই আরভান কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করে নিজের ঘরের দিকে হাঁটা দিল। আয়াত বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে সোফায় বসে রইল। এই মানুষটা আসলে কী দিয়ে তৈরি? কিছুক্ষণ আগের সেই আবেগপ্রবণ মানুষটা মুহূর্তেই কেমন যেন অচেনা আর শীতল হয়ে গেল। কেন একে বোঝা এত কঠিন? কখনো সে আগুনের মতো উত্তপ্ত, আবার কখনো বরফের মতো শীতল।
আয়াত দীর্ঘশ্বাস ফেলে খাবারের টেবিলের দিকে তাকালো।
——
একটি বন্ধ অন্ধকার ঘর। বাইরে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করলেও ভেতরটা যেন ঘনীভূত অন্ধকারে ঠাসা। রুমের প্রতিটি আসবাবপত্র তছনছ হয়ে আছে, দেওয়ালে লাগানো দামী কাঁচগুলো ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে মেঝেতে বিছিয়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে এখানে কোনো প্রলয় বয়ে গেছে।
এলোমেলো চুলে মেঝেতে বসে শূন্য চোখে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে আছে জেসিকা। ওর সুন্দর মুখের একপাশে এখন আরভানের দেওয়া সেই কলঙ্কের ক্ষত। কিছু দূরে দাঁড়িয়ে আছে লিওনার্ড। জেসিকার এই বিধ্বস্ত রূপের দিকে তাকিয়ে লিওনার্ডের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। যে মেয়েটি একদিন আগেও নিজের সৌন্দর্য নিয়ে অহংকার করে বেড়াত, আজ সে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত। লিওনার্ডের হয়তো খুশি হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু নিজের প্রিয়তমার এমন করুণ অবস্থা দেখে সে মোটেও আনন্দিত হতে পারল না।
লিওনার্ড ধীর গলায় বলল, “স্যারকে বলেছি যে তোমাকে খুঁজে পাওয়া গেছে। তুমি আপাতত বাইরে বন্ধুদের সাথে ট্রিপে গিয়েছিলে।এটাই জানানো হয়েছে। যদিও তোমার বাবা এটা পুরোপুরি বিশ্বাস করেননি, তাই তিনি এখনই তোমার সাথে কথা বলতে চান।”
লিওনার্ড একটু থেমে জেসিকার প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় রইল, জেসিকা কোনো উত্তর দিল না। লিওনার্ড দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বলল, “আমি আপাতত বিষয়টা সামলে নিয়েছি, বলেছি যে তুমি খুব ক্লান্ত আর ঘুমাচ্ছ। কিন্তু এভাবে বেশিক্ষণ আড়াল করা যাবে না।তোমার উচিত তার সাথে অন্তত একবার কথা বলা। জেসি, চেহারা নিয়ে এতটা ভেঙে পড়া তোমার সাজে না। এখন সার্জারি সহ অনেক উন্নত ট্রিটমেন্ট আছে। তোমার চেহারা আবারও সুন্দর করা সম্ভব। এবার ওঠো, নিজেকে সামলাও।”
জেসিকা হঠাৎ এক পৈশাচিক হাসিতে ফেটে পড়ল। ওর হাসিতে কোনো শব্দ নেই, কেবল বুকফাটা হাহাকার। “শুনেছিলাম পুরুষের ভালোবাসা নাকি খুব ভয়ংকর হয়, আজ সেটা নিজের হাড় দিয়ে অনুভব করলাম। লিও… এভি কেন আমায় এভাবে ভালোবেসে ফেলল না লিও? কেন ওই সামান্য মেয়েটার জন্য সে এতটা নিচে নামল?”
একটু থেমে সে লিওনার্ডের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “লিও, তুমি তো সবসময় বলো তুমি আমাকে পাগলের মতো ভালোবাসো। তাহলে আমার জন্য তুমি কি ওই আয়াতকে মেরে ফেলতে পারবে না? ওকে শেষ করে দাও লিও!”
লিওনার্ড স্থির দৃষ্টিতে জেসিকার দিকে তাকালো। ওর কণ্ঠে কোনো দ্বিধা নেই, বরং এক রূঢ় বাস্তবতা ফুটে উঠল। “না জেসি, পারব না। যাকে শুধু ভয় দেখানোর অপরাধে জ্যান্ত মানুষের হাত-পা কাটা হয়েছে, সেই আয়াতের দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস আমার নেই। আমি তোমাকে ভালোবাসি তবে
আমি তোমাকে এতটাও ভালোবাসি না জেসি যে তোমার প্রতিশোধ মেটাতে গিয়ে আমি আরভানের তলোয়ারের নিচে গলা বাড়িয়ে দেব।”
জেসিকা এবার কান্নায় ভেঙে পড়ল। লিওনার্ড এমন নিষ্ঠুর কথাগুলো তাকে ভেতর থেকে দুমড়ে মুচড়ে দিল। লিওনার্ড সাহস করে কাছে এগিয়ে এসে জেসিকাকে বুকে আগলে নিল। অন্য সময় হলে জেসিকা হয়তো তাকে এক ধাক্কায় সরিয়ে দিয়ে সপাটে চড় মারত, কিন্তু আজ সে কিছুই করল না। আজ সে অসহায়। তার সব অহংকার আজ চুরমার হয়ে গেছে। সে লিওর বুকেই মুখ লুকিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল।
সে জানে, আরভান চৌধুরী নামক সেই মাদকতা এখন তার জন্য নিষিদ্ধ বিষ।
আর্তস্বরে জেসিকা বলল, “আমাকে এভাবেই আগলে রাখো লিওনার্ড। আজ আমি বড্ড একা হয়ে গেছি।”
লিওনার্ড জেসিকার চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে দৃঢ় স্বরে বলল, “রাখব, সবসময় এভাবেই তোমাকে আগলে রাখব। শুধু আরভানের পথ থেকে নিজেকে সরিয়ে নাও জেসি।
—–
গাড়িটা আয়াতের কলেজের সামনে প্রায় ২০ মিনিট ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আরভান স্টিয়ারিংয়ে আঙুল দিয়ে তাল ঠুকছে আর অপলক আয়াতের থমথমে মুখটার দিকে তাকিয়ে আছে। আয়াত গম্ভীর হয়ে পাশের সিটে বসে জানলার বাইরে তাকিয়ে রইল; যেন আরভানের অস্তিত্বই তার কাছে নেই।
আরভান একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে শান্ত কিন্তু মাদকতাভরা গলায় বলল,
“তোমাকে কি শেষমেশ কোলে করেই ক্লাসে দিয়ে আসতে হবে মিসেস? চাইলে বলতে পারো, তোমার স্বামীর গায়ে কিন্তু প্রচুর শক্তি আছে। তোমাকে বয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা আমি রাখি।”
আয়াত রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে একবার আরভানের দিকে তাকালো, তারপর আবারও সামনের দিকে নজর ফেরালো। আরভান কিছুটা সরে এসে আয়াতের হাত ধরতে নিলে আয়াত এক ঝটকায় হাত সরিয়ে নিল। আরভান বাঁকা হাসল। সে এবার আয়াতের এলোমেলো চুলগুলো খুব যত্নে কানের পেছনে গুঁজে দিয়ে। আঙুলের ডগা দিয়ে ওর গালে স্লাইড করতেই আয়াত আবারও হাত সরিয়ে দিল। কিন্তু আরভান দমবার পাত্র নয়; সে জোর করে আয়াতের নরম হাতটা নিজের শক্ত মুঠোয় পুরল।
আয়াত বিরক্ত হয়ে বলল, “সমস্যা কী আপনার? এভাবে জ্বালাচ্ছেন কেন? মানুষকে কি আপনার মানুষ মনে হয় না? সবসময় কি নিজের যা ভালো লাগে সেটাই করবেন?”
আরভানের ভ্রু মুহূর্তের জন্য কুঁচকে গেলেও পরক্ষণেই সে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল। আয়াত আরও বিরক্ত হয়ে বলল, “হাসবেন না একদম! কথায় কথায় হাসেন কেন আপনি? আমার রাগ কি আপনার কাছে রসিকতা মনে হয়?”
আরভান এবার সশব্দে হেসে উঠল। সে আয়াতকে কোমরে জড়িয়ে নিজের দিকে কিছুটা টেনে আনল। “কী হয়েছে মিসেস? এত রেগে আছেন কেন? সকালের মিষ্টি রোদ কি আপনার সহ্য হচ্ছে না?”
আয়াত সরতে চাইলেও আরভান তাকে আরও শক্ত করে ধরে রাখল। আয়াত চেঁচিয়ে বলল, “কেন রাগব না? কাল রাত থেকে আপনার অদ্ভুত ব্যবহার সহ্য করছি। কী ভেবেছেন আপনি? সকালে উঠে একবারও ভালো করে কথা বললেন না। আমি বললাম আজ কলেজে যাবো না, আপনি সেটার উত্তর না দিয়ে হুকুম করলেন— ‘৫ মিনিট সময় দিচ্ছি, বাইরে দাঁড়িয়ে আছি, তাড়াতাড়ি আসো’। আমি কি আপনার হুকুমের গোলাম? কাল রাতে ‘না’ বলেছিলাম বলে রেগে থাকলে সরাসরি বলে দিলেই পারতেন!”
”এত অভিযোগ আপনার? আমি ভাবলাম পড়াশোনায় ফাঁকি দেওয়ার জন্য কলেজে যেতে চাইছেন না। আপনার ওপর আমি বেশিক্ষণ রেগে থাকতে পারি না মিসেস। আমি জানতাম আপনি পড়াশোনা নিয়ে সিরিয়াস, এখন দেখছি উল্টো। আরভান চৌধুরীর বউ অশিক্ষিত—এটা লোকে জানলে আমার সম্মানের কী হবে?”
আরভান হালকা মেজাজে বললেও আয়াত রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে বলে ফেলল, “তাহলে খুব বেশি শিক্ষিত দেখে কাউকে বিয়ে করুন না! জেসিকা কোথায়? যান তার কাছে, সে তো আপনার লেভেলের শিক্ষিত!”
আরভান মুচকি হেসে বলল, “বুঝেছি, আজ আপনি ঝগড়া না করে ক্লাসে যাবেন না। চলুন আমিই ক্লাসে দিয়ে আসছি।”
“হ্যাঁ, যাবেনই তো! কলেজের মেয়েরা আপনার দিকে তাকিয়ে গিলবে আর আপনার তো তা বেশ ভালোই লাগবে!” আয়াত বিদ্রূপ করে বলল।
আরভান এবার আয়াতের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর হলো। “আয়াত, তুমি আসলেই গিরগিটি হয়ে গেছ, আমার চেয়েও ওপরের লেভেলের। না যেতে চাইলে না যাবে, তাই বলে এভাবে ইনসিকিউরড ফিল করাটা ঠিক মানাচ্ছে না। ওকে, যেতে হবে না। সারাটা ক্ষণ বাড়িতে প্যাঁচার মতো মুখ করে বসে থাকো তাহলে।”
আয়াত আর কোনো কথা না বলে রাগে গজগজ করতে করতে গাড়ি থেকে নেমে সোজা কলেজের ভেতর হাঁটা দিল। একবারও পেছন ফিরে তাকালো না। আয়াত সোজা ক্লাসে গিয়ে দেখল সকলে বসে আছে। কিছুক্ষন পরে তানিয়া ক্লাসে ডুকলো। তাকে দেখেই পাশে এসে বসল।
”কেমন আছো আয়াত?” তানিয়া বেশ উচ্ছ্বসিত।
“হুম ভালো। তুমি কেমন আছো?” আয়াত ম্লান হেসে উত্তর দিল।
”একদম ফার্স্ট ক্লাস! চলো না আজ ক্লাস বাঙ্ক করে কোথাও ঘুরতে যাই?” তানিয়া উৎসাহ দিল।
”একদম ইচ্ছা করছে না তানিয়া।”
”আচ্ছা, তাহলে থাক। জানো, আজ আমার এক ফ্রেন্ড আমাকে একটা বিশাল রেস্টুরেন্টে নিয়ে গিয়েছিল। সেখান থেকেই এখন আসলাম।এত চমৎকার জায়গা সেটা! তুমি আর আমি একদিন যাবো।”
আয়াত মুচকি হেসে বলল,”অবশ্যই যাবো।”
“শোনো একটা কথা বলি,” তানিয়া কিছুটা তানিয়া ফিসফিস করে বলল,
“আয়াত, জানো ওই রেস্টুরেন্টে এভি এন্টারটেইনমেন্টের মালিক এভি-ও ছিল। এভি এন্টারটেইনমেন্টের মালিক আরভান চৌধুরীকে! সে একটা মেয়ের সাথে বসে ছিল। দুজনকে পাশাপাশি দেখে মনে হলো তার গার্লফ্রেন্ড হবে। ওই মেয়েটা আরভানের ফোন নিয়ে কিছু একটা করছিল, আর আরভানও সেটা বেশ মনোযোগ দিয়ে দেখছিল। আমার বাস চলে আসায় পুরোটা দেখতে পারিনি, তবে…”
আয়াতের ভেতরটা নিমেষেই জ্বলে উঠল। সে তীক্ষ্ণ স্বরে প্রশ্ন করল, “কোন মেয়ে? দেখতে কেমন? ফর্সা, নীল চোখ আর লাল চুল ?”
“আরে না! কোনো অস্ট্রেলিয়ান না, বাঙালি। তবে দেখতে ঠিক বলিউডের হিরোইনদের মতো! অসম্ভব সুন্দর!” তানিয়া উত্তর দিল।
”কতক্ষণ আগে দেখে এসেছো? তারা কি এখনো সেখানে আছে?” আয়াত উত্তেজিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
আয়াতের অস্থিরতা তানিয়াকে থতমত খাইয়ে দিল। সে কিছু একটা আঁচ করার চেষ্টা করে বলল, “মিনিট পাঁচেক আগে। সামনের ওই রেস্টুরেন্টেই।এখনো আছে কি না আমি ঠিক বলতে পারছি না।”
তানিয়া একটু ইতস্তত করে যোগ করল, “আচ্ছা আয়াত, ওদিন তোমাকে সেভাবে ধমকে গাড়িতে তুললো ওই লোকটা। তোমার সাথে তার সম্পর্ক কী? শোনো আয়াত, আমি বলছি এসব বড় বিজনেসম্যানদের চরিত্র মোটেও ভালো হয় না। ওই লোকটাকেও তোমায় জোর করে নিয়ে যেতে দেখেছিলাম, তাই বলছি সাবধানে থেকো, দূরত্ব বজায় রেখো।”
আয়াতের মুখ থমথমে হয়ে গেল। ক্লাস করার মানসিকতা তার উবে গেছে। সে উঠে দাঁড়ালো। “আমাকে সেখানে একটু নিয়ে চলো তো এখনই।”
তানিয়া পেছন পেছন ছুটতে ছুটতে বলল, “আয়াত, তুমি কি ওর গার্লফ্রেন্ড নাকি? হায় আল্লাহ! এই মানুষের প্রেমে তুমি কী করে পড়লে? এরা তো মেয়েদের জাস্ট একদিনের বেড পার্টনার বানায়, তারপর মুখের ওপর টাকা ছুড়ে দেয়! তুমি মুভিতে বা নিউজে দেখো না?”
আয়াত এবার রাগে চিৎকার করে উঠল, “বাজে কথা বলা বন্ধ করো! আমার স্বামী মোটেও তেমন লোক নয় সে!”
তানিয়া যেন আকাশ থেকে পড়ল। “স্বামী! আরভান চৌধুরী তোমার স্বামী!”
আয়াত আর উত্তর না দিয়ে রেস্টুরেন্টের দিকে দ্রুত পা বাড়ালো। আরভানের বড় বড় কথা—অন্য কোনো নারীর স্পর্শে সে আসে না! আজ সে নিজের চোখে সব প্রমাণ করবে।
আয়াত যখন রেস্টুরেন্টের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো, কাঁচের ওপাশ দিয়ে দেখা যাচ্ছে ভেতরে কেউ নেই। আরভান নেই, সেই মেয়েটিও নেই।
তার বিরক্তি আর রাগ এখন চরমে। একটু আগে আসলেই হয়তো হাতেনাতে ধরা যেত! রাগে নিজের চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে তার। পেছন ফিরে আবার কলেজের দিকে যাবে ভাবতেই সামনের মানুষটাকে দেখে তার বুকটা কেঁপে উঠল।
অস্ফুট স্বরে মুখ দিয়ে বের হলো,
“আপনি!”
চলবে….

