Home "ধারাবাহিক গল্প আমার হয়ে থেকো আমার হয়ে থেকো পর্ব-২৭+২৮

আমার হয়ে থেকো পর্ব-২৭+২৮

0
370

#পর্ব_২৭
#আমার_হয়ে_থেকো🍁
#Tasnim_Riya_khan

গাড়ির বডিতে হেলান দিয়ে দু’হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে আছে আরভান। পরনে ব্ল্যাক শার্ট, যার ওপরের দুটো বোতাম আজও খোলা। ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত বাঁকা হাসি, যা একইসাথে মুগ্ধতা আর আতঙ্ক ছড়ায়। তার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে শাহরিয়ার। শাহরিয়ারের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে, বুকটা ধড়ফড় করছে অনিয়ন্ত্রিতভাবে। পরিস্থিতিটা ঠিক কীভাবে তার হাতের বাইরে চলে গেল, সে বুঝতেই পারল না। সে আরভানকে দেখেই নিজের গাড়ি নিয়ে সটকে পড়তে চেয়েছিল, কিন্তু আরভান যেন এক শিকারি চিল; ঠিক শাহরিয়ারের সামনেই আড়াআড়িভাবে গাড়ি থামিয়ে তার পথ রুদ্ধ করেছে।

​শাহরিয়ারের চোখের সামনে বারবার সেই মির্জা নামক লোকটার কথা ঘুরপাক খাচ্ছে, যাকে আরভান কুমিরের খামারে ফেলে দিয়েছিল। আর সেই বীভৎস উপহারের কথা মনে পড়তেই তার শরীরটা ভয়ে সিঁটিয়ে গেল। যাদের আরভান গত রাতে পৈশাচিক সাজা দিয়েছে, বা দেখেও তাদের আর্তনাদ যেন সে কানে শুনতে পাচ্ছে।

শাহরিয়ার চারপাশটা একবার দেখে নিল। জনসমাগম আছে, দূরে পুলিশও টহল দিচ্ছে। সে নিজেকে আশ্বস্ত করল যে আরভান জনসমক্ষে তাকে কিছু করবে না। আরভান তো এই শহরের আইডল, সে নিজের ইমেজ নষ্ট করবে না। এই ভেবে শাহরিয়ারের ঠোঁটে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল।

​আরভান যেন শাহরিয়ারের মস্তিষ্কটা এক লহমায় পড়ে ফেলল। সে শব্দ করে হেসে উঠল, যা শাহরিয়ারের শিরদাঁড়া দিয়ে হিমেল স্রোত বইয়ে দিল। আরভান এবার হেলেদুলে নিজের কারের ওপর বসল।

​”হ্যালো ব্রো! হোয়াটস আপ?” আরভানের কণ্ঠস্বর একদম স্বাভাবিক, কিন্তু তাতে মিশে আছে বিষাক্ত শ্লেষ।
“ভাইয়ের থেকে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছো, আর ওদিকে চাচার সাথে হাত মিলিয়ে সেই ভাইয়ের বউকে ধাওয়া করছো—লুকোচুরিটা তো ভালোই খেলছো। কাম অন শাহরিয়ার, আই অ্যাম ইওর কাজিন! তোমার তো সবার আগে আমার কাছে আসা উচিত ছিল, আমার বাড়িতে ওঠা উচিত ছিল। আতিথেয়তায় কি আমি কোনো কমতি রাখতাম?”

​আরভান এক মুহূর্ত থামল। তার ধারালো চাউনি শাহরিয়ারের চোখে স্থির রেখে আবার বলল,
“একটা মেয়ের জন্য বাংলাদেশ থেকে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত ছুটে এলি? মেয়েমানুষের এত অভাব তোর? আমাকে একবার বলতিস, তোকে সুন্দরীদের লাইন লাগিয়ে দিতাম। কিন্তু তাই বলে নিজের ভাইয়ের বউয়ের দিকে নজর? ইটস টু মাচ ব্রো, ইটস টু মাচ!”

​শাহরিয়ারের দম্ভ যেন জেগে উঠল। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “আয়াত তোর বউ না! ও শুধু আমার অর্জিত বস্তু আর ওকে আমি আমার করেই ছাড়ব। তোর কী মনে হয় আরভান? বাংলাদেশে পাঁচটা মেয়েকে ভোগ করেও যে আমাকে কেউ একদিন জেলে রাখতে পারেনি, সেই আমি আয়াতকেও বিছানায় তুলতে পারতাম, জাস্ট এক রাতের ব্যাপার ছিল। কিন্তু আমি তা করিনি কারণ ওকে আমার পার্মানেন্টলি লাগবে।
পার্মানেন্টলি মানে তো বুঝিসই।”

​আরভান এবারও নিশ্চুপ। তার চোখের মণি দুটো আগুনের মতো জ্বলছে। যেকোনো সাধারণ মানুষ এই চাহনি দেখলে নজর সরিয়ে নিত, শাহরিয়ারও নিতে বাধ্য হলো। আরভান কোনো চিৎকার করল না, ধীরপায়ে শাহরিয়ারের একদম কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। ওর কাঁধে এক হাত রেখে কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,

​”আয়াত কারো ‘জিনিস’ না শাহরিয়ার… ও শুধু আমার আমানত, আমার ব্যক্তিগত সম্পত্তি। যে চোখ ওকে নোংরা নজরে দেখার সাহস করবে, আমি তার দৃষ্টি কেড়ে নেব। আর যে জিহ্বা ওর নামে অশুভ ইঙ্গিত দেবে, আমি আরভান চৌধুরী তা চিরতরে স্তব্ধ করে দিতে দ্বিতীয়বার ভাবব না।”

​শাহরিয়ার মুখ খুলতে চাইল, “আয়াতকে—”

​”হিশশশ!” আরভান তর্জনী শাহরিয়ারের ঠোঁটে চেপে ধরল। তারপর সেই আঙুলটা ধীরে ধীরে শাহরিয়ারের গলার দিকে নামিয়ে আনল। “যখন ওই মেয়েকে চাইনি, তখন এই গলায় ফাঁসের দড়ি পড়েছিল। আর এখন সে আমার অস্তিত্বে মিশে আছে, তাহলে আমি কী করতে পারি তোমার কোনো ধারণা আছে?”

​আরভান শাহরিয়ারের চোখে চোখ রেখে বজ্রকণ্ঠে বলল,
“লিসেন… আই ডোন্ট ইউজুয়ালি গেট মাই হ্যান্ডস ডার্টি। বাট হোয়েন ইট কামস টু মাই ওয়াইফ, আই ডোন্ট প্লে বাই রুলস। শি স্ট্যান্ডস বিসাইড মি—অ্যান্ড দ্যাটস এনাফ। অ্যানিওয়ান হু ডেয়ারস টু লুক অ্যাট হার দ্য রং ওয়ে… ওন্ট বি লুকিং অ্যাট অ্যানিথিং এভার এগেইন। ট্রাস্ট মি, মেট—আই ডোন্ট রিপিট ওয়ার্নিংস।”

​কথাটা বলে আরভান পাশের টহলরত পুলিশের দিকে তাকালো। তারা আরভানের সম্মানে মাথা নোয়ালো। আরভান শাহরিয়ারের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল, “তোর কী মনে হয়? আমি যদি তোকে এখন এখান থেকে টেনে নিয়ে কোথাও গায়েব করে দিই, তবে ওইরা তোকে বাঁচাবে? ভুল, ওরা আমাকেই সাহায্য করবে, তোকে নয়। এটাই লাস্টবার, এরপরে আমি আর কোনো ওয়ার্নিং দেব না। বাংলাদেশে ফিরে যা নিজের বাবা-মা আর দাদার কাছে, সেখানে গিয়ে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দে। না হলে… নিজের পুরুষত্ব বিসর্জন দিয়ে সারাজীবন আফসোস করতে হবে।”

​আরভান গটগট করে নিজের গাড়ির দিকে হেঁটে গেল। পেছন থেকে শাহরিয়ার চিৎকার করে বলল,
” আয়াত যদি একবার জানতে পারে সত্যিটা… ও যদি জানতে পারে তোর ওই…”বাকি কথাটুকু অস্পষ্ট থেকে গেল….

“তাছাড়া তুই তো ওর সাথে সারাজীবন থাকবি না ব্রো! তখন ও কী করবে?”

​শাহরিয়ার ভেবেছিল আরভান হয়তো চমকে যাবে, তার গোপন কোনো তথ্য ফাঁস হওয়ার আশঙ্কায় সে ঘাবড়ে যাবে। কিন্তু আরভানের মধ্যে তেমন কোনো নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। তার বাবার থেকে শোনা কথাগুলোই যে এই ছেলে এখন তার কাছে আউড়াচ্ছে, তা সে বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পারল। আরভান গাড়ির দরজা খোলার আগে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে শান্তভাবে বলল,

“সত্যিটা যখন সামনে আসবে, তখন দেখা যাবে। আর ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা আমার ওপর ছেড়ে দে। কারণ আয়াতের বর্তমান আর ভবিষ্যৎ—দুটোর ওপরই এখন কেবল আরভান চৌধুরীর অধিকার। আমার অনুপস্থিতিতেও ওর ছায়া ছোঁয়ার সাধ্য তোর হবে না। এর জন্যই তো এত যত্ন করে ওর রাস্তা পরিষ্কার করছি, যেন ওর হাঁটার পথে কোনো ধূলিকণা তার পবিত্রতাকে স্পর্শ করতে না পারে।কারন সেই ধুলোগুলোকে আমি নিজের জুতো দিয়ে পিষে ফেলবো।”

​বুকের ওপর গোঁজা সানগ্লাসটা চোখে পরে সে গাড়িতে উঠে বসল। স্টার্ট দেওয়ার আগে শাহরিয়ারের রক্তশূন্য ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া চেহারার দিকে তাকিয়ে আরভানের হাসিটা আরও চওড়া হলো। তীব্র গতিতে ধুলো উড়িয়ে গাড়িটা চোখের পলকে মিলিয়ে গেল। শাহরিয়ার হাতের মুঠো শক্ত করে মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে রইল; অপমানে আর রাগে তার সারা শরীর রি রি করছে।

—–

আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন আরশাদ চৌধুরী। তিনি প্রথমে কিছুটা অবাক হলেও পরক্ষণেই ঠোঁটে সেই চিরচেনা কুটিল হাসি ফুটিয়ে তুললেন। একরাশ বিস্ময় নিয়ে চারদিকে তাকিয়ে বললেন, “আরে আয়াত! তুমি এখানে কী করছো? আরভানের সাথে এসেছো বুঝি? কোথায় সে?”

​আয়াত কিছুটা অপ্রস্তুত হলেও সৌজন্যের খাতিরে হালকা হাসল। “না, সে আসেনি। আমি একাই এসেছি।”

​”রেস্টুরেন্টে খেতে এসেছো?”

আয়াত মেকি হেসে বলল, “জি।”

“খেয়েছো?”

“না আসলে…”

​আয়াতের কথা শেষ করতে না দিয়ে তিনি বললেন, “চলো তাহলে একসাথে বসা যাক।”

​আয়াত থমকে দাঁড়ালো। আরশাদ চৌধুরী উত্তরের অপেক্ষা না করেই হাঁটা শুরু করে দিয়েছেন। পেছন ফিরে কিছুটা আদেশের সুরে বললেন, “ভয় নেই, আসো।”

​আয়াত ঘোর সংকোচ নিয়ে তাঁর পিছু পিছু ভেতরে ঢুকল। মেলবোর্নের এই রাজকীয় রেস্টুরেন্টটি অত্যন্ত অভিজাত; এখানে বড় বড় ব্যবসায়ী আর প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আনাগোনা। পেছনের প্রিভেসি জোনটি আরও গম্ভীর, যেখানে সাধারণের প্রবেশ নিষেধ। আয়াত যখন চারিপাশে চোখ বুলিয়ে ভেতরে যাচ্ছিল, সে অনুভব করছিল এক জোড়া তৃষ্ণার্ত চোখ তার দিকে নিবদ্ধ হয়ে আছে। আরশাদ চৌধুরীর সেই দৃষ্টিতে স্নেহ চেয়েও বেশি কিছু একটা ছিল যা আয়াতকে অস্বস্তিতে ফেলছিল।

​”কী খাবে বলো?” আরশাদ চৌধুরী আয়াতের দিকে তাকিয়েই জিজ্ঞেস করলেন।

আয়াত শান্তভাবে বলল, “আপনার যা ইচ্ছা।”

আরশাদ চৌধুরী যখন সি-ফুড অর্ডার দিতে গেলেন, আয়াত বাধা দিয়ে বলল, “আমি ওসব খাই না।”

​আরশাদ চৌধুরী আবারও হাসলেন। “তুমিও ঠিক তোমার মায়ের মতোই হয়েছো দেখছি। প্রথমে অন্যের কথা ভাববে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত করবে নিজের ইচ্ছামতোই।”

তিনি ওয়েটারকে কিছু সালাদ আর স্নাক্স অর্ডার দিলেন।​মায়ের প্রসঙ্গ আসতেই আয়াত অবাক হয়ে তাকালো। “মানে? ঠিক বুঝলাম না। আপনি কি আমার মাকে চিনতেন?”

​আরশাদ চৌধুরী সোজা হয়ে বসলেন। তাঁর চোখে তখন এক রহস্যময় চকমকি। “চিনবো না কেন? একসময় আমরা খুব ভালো বন্ধু ছিলাম। বলতে গেলে ছোটবেলা থেকে দুজনে একসাথে বড় হওয়া।”

​আয়াত শুধু বলল, “ওহ্।”

কারণ সে জানত তার নানা আর আরভানের দাদা অভিন্ন হৃদয়ের বন্ধু ছিলেন। সেই সূত্রে তাদের বন্ধুত্ব অস্বাভাবিক কিছু নয়। আয়াতের ভাবনার সুতো ছিঁড়ল আরশাদ চৌধুরীর এক অদ্ভুত প্রশ্নে।

“তুমি কেন আরভানের সাথে অস্ট্রেলিয়ায় এসেছো আয়াত? তোমার তো উচিত ছিল তাকে ডিভোর্স দেওয়া। যে মানুষ তোমাকে ডিভোর্স দেওয়ার জন্য বাংলাদেশে গেলো, তুমি তার সাথেই অস্ট্রেলিয়া চলে আসলে ইটস আ ভেরি ব্যাড ডিসিশন!”

​আয়াতের ভ্রু কুঁচকে গেল। “সে নিজেই আমাকে নিয়ে এসেছে। আমি নিজে থেকে আসিনি। তাছাড়া আপনি এমন কথা কেন বলছেন?”

​”এমনিই জিজ্ঞেস করলাম। দেখলাম তুমি আরভানের সাথে তার জোরে আছো, নাকি নিজের ইচ্ছায়। ওর সাথে কি তোমার স্বাভাবিক স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক গড়ে উঠেছে?”

​আয়াত এবার ভীষণ অস্বস্তি বোধ করতে শুরু করল। কোনো শ্বশুর যে তার পুত্রবধূর ব্যক্তিগত সম্পর্কের গভীরতা নিয়ে এভাবে সোজাসুজি প্রশ্ন করতে পারে, তা তার ধারণার বাইরে ছিল। আয়াত আর এক মুহূর্ত সেখানে বসতে পারল না। একটি বাহানা খুঁজে উঠে দাঁড়ালো।
“আমার মনে হয় এখন যাওয়া উচিত। আরভান কলেজের বাইরে আমার জন্য অপেক্ষা করবে বলেছিল। আমি ভুলে গিয়েছিলাম, ভালো থাকবেন।”

​বলেই সে দ্রুত পা বাড়ালো। আয়াত বেরিয়ে যেতে নিলে আরশাদ চৌধুরী অট্টহাসি হেসে বললেন, “আয়াত তুমি বাহানায় তোমার মায়ের মতোই ১-এ-১। ঠিক আছে, তবে তোমার হাজবেন্ডকে বলো—সে যে ‘গিফট’ পাঠিয়েছে, সেটা তোমার শ্বশুরের বড্ড পছন্দ হয়েছে।”

​’গিফট’ শব্দটা শুনে আয়াত থামল। কিসের গিফটের কথা বলছেন তিনি? জিজ্ঞেস করতে গিয়েও করল না।জিজ্ঞেস করতে গিয়েও করল না। ছেলে তার বাবাকে উপহার দিতেই পারে, তাতে তার কৌতূহল দেখানোর কিছু নেই। আয়াত মাথা নেড়ে দ্রুত রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে গেল।

​আয়াত চলে যাওয়ার পর আরশাদ চৌধুরী চোখ বন্ধ করে চেয়ারে হেলান দিলেন। তাঁর চোখে এক পলকের জন্য পুরনো কোনো স্মৃতি চিকচিক করে উঠল। ভেসে উঠল এক জোড়া হাসি-খুশি উজ্জ্বল চোখ আর চশমা পরা এক সাধারণ চেহারার তরুণী— হাবিবা। আর সেই বোকা-সোকা যুবক আরশাদ।

​সেদিন আরশাদের বাবা ঘোষণা করেছিলেন, “আমার বড় ছেলে আরশাদের সাথে হাবিবার বিয়ে ঠিক করলাম।” হাবিবা তখন রাজি ছিল, তার ঠোঁটে হাসি ছিল।

যাকে ছোটবেলা থেকে মনের মণিকোঠায় রেখেছিলেন, তাকে অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে পাওয়ার আনন্দে আরশাদ বিভোর ছিলেন। কিন্তু কিছুদিন পরেই তিনি আবিষ্কার করেন—হাবিবা তাঁরই এতিম চাচাতো ভাই ইমতিয়াজকে ভালোবাসে। হাবিবা আরশাদের সামনে দাঁড়িয়ে ভয়ার্ত কণ্ঠে বলেছিল, “আরশাদ ভাই, আমি আপনাকে বিয়ে করতে পারব না। আমি ইমতিয়াজ ভাইকে ভালোবাসি। প্লিজ বিয়েটা ভেঙে দিন।”

ইমতিয়াজ বলেছিল সে এখন টাকা রোজগার করছে, হাবিবাকে সুখে রাখবে—যা বাবার ওপর নির্ভরশীল আরশাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

​আরশাদের পুরুষতান্ত্রিক ইগোতে লেগেছিল। নিজেকে বড় প্রমাণ করতে তিনি দেশ ছেড়ে অস্ট্রেলিয়া চলে আসেন। সেখানে তাঁর বন্ধুত্ব হয় এলিনার সাথে। এলিনা আরশাদকে পছন্দ করে ফেলল তারপর তাঁর বাবা আরশাদকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। কিন্তু আরশাদ তখন সেই বিয়ে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বাংলাদেশে ফিরে যায় হাবিবাকে পাওয়ার আশায়। কিন্তু ফিরে এসে দেখেন হাবিবা তার প্রেম নিয়ে অনড়। বারবার ভালোবাসার মানুষটা পাওয়ার বাধায় একদিন হাবিবা আরশাদকে তিক্ত ভাষায় অপমান করে বলেছিল, আরশাদ তার বাবার টাকা ছাড়া কিছুই না। বাবা বলেছে তাই সে তার পিছু পরে আছে। নিজ ক্ষমতা থাকলে অন্য কাউকে বিয়ে করে দেখাক।

​হাবিবার কথায় কষ্ট পেয়ে জেদের বশে আরশাদ এলিনাকে বিয়ে করে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। তাঁর বাবা এলিনাকে দেখে রাগে ফেটে পড়েন।পরিবার সহ সকলের চোখে হাবিবা হয়ে গেল ‘বেচারি প্রতারিত মেয়ে’ আর আরশাদ হয়ে গেলেন ‘বিশ্বাসঘাতক’। বাবা তাকে ত্যাজ্য করলেন। এদিক থেকে আরশাদের মা ছেলের জন্য ধুঁকে ধুঁকে অসুস্থ হন।

মা যখন আরশাদকে দেখার শেষ ইচ্ছা পোষণ করলেন, তখন আরশাদ ১৭ বছরের আরভানকে নিয়ে প্রথমবার বাড়িতে পা রাখেন।

অসুস্থ মা তখন শেষ আবদার করেছিলেন, আরভানের সাথে হাবিবার মেয়ের বিয়ে দিতে। হাবিবাও অনুতপ্ত হয়ে রাজি হয়েছিল।

আয়াত আরভানের ছোটবেলায় বিয়ে দিয়ে রাখা হলো যাতে বড় হয়ে তারা সম্পর্ক বুঝে নেয়। কিন্তু হাবিবা-ইমতিয়াজের সুখের সংসার দেখে আরশাদের ভেতর হিংসা দানা বাঁধে। সে এলিনাকে ভালোবাসতে পারেনি, নিজের ছেলেকে তো আরও না। সে চায়নি আরভান বাংলাদেশে গিয়ে ওই প্রতারিত নারীরই মেয়ের সাথে সংসার করুক।

এর জন্যই তিনি আরভানের ট্রাভেল ব্যান করেছিলেন যেন সে বাংলাদেশে না যেতে পারে। আর তাকে ধোঁকা দেওয়া নারীর সন্তানের সাথে কোন প্রকার সর্ম্পক না হয়। যে ট্রাভেল ব্যান তুলতে আরভানের কয়েক বছর লেগে​ যেতো সেটা সে মাএ কয়েক দিনে তুলে দিয়েছিলো।শুধু মাএ পুরোপুরি সম্পর্কে ছিন্ন করার জন্য তবে জেসিকাকে সাথে পাঠানোর শর্তও ছিল নজর রাখার জন্য। কিন্তু আরভান তাঁর সাথে খেলা খেলেছে । আয়াতের এই মুখটা ঠিক হাবিবার মতোই মায়াবী অথচ ধ্বংসাত্মক। এই মুখ দেখলে এখনও তার নিষিদ্ধ ইচ্ছা জাগে।

​আরশাদ চোখ খুললেন।কাচের গ্লাস দিয়ে দেখলেন আয়াত একটা ট্যাক্সিতে উঠছে। তাঁর ঠোঁট বেঁকে এক বীভৎস হাসি ফুটে উঠল। হঠাৎ করেই তাঁর মনে প্রশ্ন জাগলো- এই নিষিদ্ধ ইচ্ছাটাকে প্রশ্রয় দিলে কেমন হয়!

অস্ফুট স্বরে গেয়ে উঠলেন, “যখন ওই রূপ স্মরণ হয়,
থাকে না লোকলজ্জার ভয়।
লালন ফকির ভেবে বলে সদাই,
ও প্রেম যে করে সে জানে।।
আমার মনের মানুষের সনে”

—-

​এদিকে এলিনা চৌধুরী একটি পুরনো ছবির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। ছবির সেই বৃদ্ধার মুখের ওপর আঙুল বুলিয়ে অস্ফুট স্বরে বললেন, “কাউকে ছাড়ব না… সব হিসাব আমি কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে নেব!”

—–

​আয়াত যখন বাড়িতে ঢুকল, দেখল আরভান সিঁড়ি দিয়ে নিজের রুমে যাচ্ছে। হাতে কিছুই ফাইল হয়তো এতক্ষণে সে স্টাডি রুমে ছিল। আয়াত অবাক হলো; আরভানের তো এই সময় বাড়িতে থাকার কথা নয়! আয়াত নিজের রুমে গিয়ে কিছুক্ষণ বিছানায় চুপচাপ বসে রইল। কিন্তু মনের ভেতর উসখুসানি কমছিল না। শেষমেশ আরভানের রুমের দিকে পা বাড়ালো সে। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই আয়াতের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল..

নোট-সবাই প্লিজ একটু রেসপন্স করবেন।আপাতত আমি চাই প্রতিদিনই আপনাদের গল্প দিতে। তাই প্রতিদিন অন্তত ৫০০+ রিয়্যাক্ট আশা করছি। রেসপন্স ভালো পেলে আমারও লেখার আগ্রহ থাকবে এবং টানা গল্প দিতে পারবো। কিন্তু রেসপন্স কম হলে আগ্রহটা একটু কমে যায়, তখন হয়তো কিছুদিন বিরতি চলে আসে।

আর গল্পটা নিয়ে শুরু থেকে এখন পর্যন্ত কারো কোনো ডাউট থাকলে আমাকে জিজ্ঞেস করতে পারেন, আমি উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবো।তবে সামনে কাহিনীতে কী হবে সেটা জানতে চাইলে বলবো না। 🙂

চলবে….

#পর্ব_২৮
#আমার_হয়ে_থেকো🍁
#Tasnim_Riya_khan

আরভানের রুমে ঢুকেই আয়াতের চোখ পড়ল বিছানায় রাখা ফোনটার দিকে। ফোনের স্ক্রিনটা বারবার জ্বলছে আর নিভছে। আয়াত ভ্রু কুঁচকে চারদিকে চোখ বোলালো, আরভান রুমে নেই। হয়তো ওয়াশরুমে হবে। বিছানার দিকে পা বাড়াতেই হঠাৎ ওয়াশরুমের দরজাটা খুলে গেল। বেখেয়ালে আয়াত সেদিকে তাকাতেই তার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল!

​বিস্ময় আর লজ্জায় সে কয়েক সেকেন্ড একধ্যানে তাকিয়ে স্থবির হয়ে রইল। আরভানের ভেজা সুঠাম শরীর থেকে চুইয়ে চুইয়ে পানি পড়ছে। মুহূর্তেই আয়াতের ফর্সা গাল দুটো টকটকে লাল হয়ে উঠল। পরক্ষণেই হুঁশ ফিরতেই সে এক গগনবিদারী চিৎকার দিয়ে চোখ চেপে ধরল আর বিড়বিড় করে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ পড়তে শুরু করল।

​আয়াতের সেই গগনবিদারী চিৎকারে আরভানের কানের পর্দা ফেটে যাওয়ার উপক্রম হলো। সে কানে হাত দিয়ে বিরক্তি আর বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইল। অদ্ভুত, এমন রিয়্যাকশনের মানেটা কী? এতক্ষণ হা করে অপলক তাকিয়ে সব দেখে এখন চিল্লানোর মানে হয় কোনো?

​আরভানের ভ্রুর মাঝে সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়ল। সে ধীরপায়ে আয়াতের দিকে এগিয়ে আসতে শুরু করল। আয়াত চোখ বন্ধ করে থাকলেও আরভানের উপস্থিতি ঠিকই টের পাচ্ছিল যে সে তার দিকে আসছে। সে চেঁচিয়ে তোতলামি স্বরে কাঁপা গলায় বলল,

“এ..একদম… একদম আমার কাছে আসবেন না আপনি! দূ… দূরে থাকুন বলছি।”

​আয়াতের এমন পাগলামি দেখে আরভানের বিরক্তি ছাপিয়ে একরাশ কৌতুক দানা বাঁধল। সে নিজের দিকে তাকালো; পরনে কেবল একটি সাদা তোয়ালে, যা কোমরে পেঁচানো। সে ঠোঁট কামড়ে হাসল। বিছানার পাশ থেকে ফোনটা তুলে নিয়ে সে আয়াতের একদম কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। তারপর তর্জনী দিয়ে আয়াতের বাহুতে পরপর তিনটা খোঁচা দিয়ে শয়তানি হাসিমাখা ভঙ্গিতে বলল,

​”মিসেস আরভান, চোখ খুলুন! দেখুন, আপনার হাসব্যান্ড ইজ সো হট! তার এই সুগঠিত মাসেল আর সিক্স-প্যাক… উফ! জাস্ট লুক অ্যাট মাই বডি! আমার এই পারফেক্ট বিল্ডআপ। ইট’স ফার বেটার দ্যান ইওর সো-কল্ড স্টকার শাহরিয়ার!”

বলেই সে হাত ভাঁজ করে বাইসেপস ফুলিয়ে আয়াতের সামনে পোজ দিল।

​​আয়াত এবার আরও জোরে চিৎকার করে উঠল,
“অসভ্য লোক একটা! তোয়ালে পরে পুরো ঘরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, আবার বড় বড় কথা বলছেন? লজ্জা করে না আপনার? সেদিনের সেই দম্ভ কোথায় গেল? বলেছিলেন না আপনার ওয়াশরুম নাকি বিশাল বড়, আপনি তোয়ালে পরে রুমে আসেন না।তাহলে আজ এই অবস্থা কেন?”

​আরভান একদম নির্লিপ্তভাবে বলল,
“অবশ্যই বিশাল! আমি তো শুধু ফোনটা নিতে এসেছিলাম। আমি কি জানতাম যে আমার ঘরে কোনো এক ‘নিলজ্জ চোর’ ঢুকে আমার রূপের প্রদর্শনী দেখবে? তুমিই তো সুযোগ পেয়ে আমাকে ড্যাবড্যাব করে তারিয়ে তারিয়ে দেখছিলে, দোষ এখন আমার?”

​আয়াতের ভেতরটা লজ্জায় কুঁকড়ে গেল। সত্যি তো, ওই মুহূর্তে আরভানকে ওভাবে দেখে সে একদম স্থবির হয়ে তাকিয়ে ছিল! কী লজ্জার ব্যাপার! কিন্তু মুহূর্তেই তানিয়ার বলা সেই কথাগুলো মনে পড়তেই আয়াতের অস্বস্তি রাগে রূপ নিল। সেই মেয়েটা আরভানের ফোন নিয়ে কী করছিল? আর এই লোকটাই বা ওয়াশরুমে ফোন নিয়ে কেন যাচ্ছিল?

​​আয়াত এবার চোখ খুলে সরাসরি আরভানের চোখের দিকে চাইল। “ফোন নিয়ে ওয়াশরুমে কেন যাবেন শুনি?”

আরভান প্রথমে আয়াতের এমন প্রশ্নে কিছুটা অবাক হলো, কারণ আয়াত সচরাচর এমন আচারন করে না।

“কাজ আছে বলে।”

আয়াতকে কোনো পাত্তা না দিয়ে পাশ কাটিয়ে হাঁটা দিতে চাইল সে।
​আরভানের এমন নির্লিপ্ততা আয়াতের মনে বিরাট ধাক্কা দিল। লোকটা তাকে কোনো তোয়াক্কাই করছে না! আয়াত ক্ষিপ্র গতিতে আরভানের হাত টেনে ধরল।

“আপনার ফোনটা দিন আমাকে।”

​আরভান ভ্রু কুঁচকে তাকালো। “কেন?”

​”কেন মানে? আপনি যখন তখন আমার ফোন নিয়ে যা খুশি করেন, কত কী চেক করেন তার তো কোনো হিসাব নেই। জানি না ওর ভেতরে কত কী করে রেখেছেন!আর আমি আপনার ফোন ধরলেই এত কৈফিয়ত দিতে হবে কেন? দিন বলছি।”

​”এখন জরুরি কাজ আছে আয়াত। কাজ শেষ করার পর ফোন নিয়ে যা খুশি কোরো।”

​”কিসের কাজ আপনার? আমি ফোন এখনই দেখব!”

​আয়াত ফোনটা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে আরভান হাতটা উঁচুতে তুলে ধরল। ঠোঁট বাঁকিয়ে বিজয়ীর হাসি দিয়ে বলল,
“নাও এবার! দেখি কেমন করে নাও।”

​আয়াত রাগে জ্ঞান হারিয়ে হিতাহিত ভুলে গেল। সে এক ঝটকায় আরভানের কোমরের তোয়ালেটা খামচে ধরল।
“ফোন না দিলে এখন এমন কিছু করে ফেলব যা আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না মিস্টার আরভান!”

​আরভান কিছুটা থমত খেয়ে গেল। তোয়ালে খুলে যাওয়ার আতঙ্কে সে দ্রুত আয়াতের মুঠো ধরে মুঠো ধরে বলল,
“কী করছো আয়াত? ছাড়ো! এটা খুলে যাবে তো!”

​”ছাড়ব না! খুলে খুলুক, আগে ফোন দেবেন, তারপর ছাড়াছাড়ি। তার আগে কোনো কথা নেই।”

​আরভান ঠোঁটে এক পৈশাচিক শয়তানি হাসি ফুটে উঠলো। সে নিজের দু-হাত মাথার পেছনে বেঁধে আয়েশি ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে পড়ল।
“ওকে, খোলো! আমার কী? এটা খুললে এখন আমিও অন্য কিছু করা শুরু করব। তখন কিন্তু সামলাতে পারবে না মিসেস।”

আয়াতের হুঁশ ফিরল। আরভানের কথা আর চাহনি দেখে সে তড়াক করে তোয়ালে ছেড়ে দুই হাত দূরে ছিটকে গেল। এই অসভ্য লোকটার মুখে কিছু বাধে না! সে কোনোদিন সভ্য হবে না।

​আরভান একটা বাঁকা হাসি দিয়ে বলল, “গুড গার্ল!” বলেই সে আয়াতের কপালে একটা টোকা দিয়ে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়ালো।

কিন্তু আয়াতের জেদ তখন তুঙ্গে। আজ সে শেষ দেখে ছাড়বে। সে-ও আরভানের পিছু পিছু ওয়াশরুমে ঢুকে গেল।
​ভেতরে ঢুকে আয়াত দেখল আরভানের ওয়াশরুমটা আসলেও বিশাল—একদিকে বিশাল ড্রেসিং সেকশন, অন্যদিকে দামী বাথটাব আর শাওয়ার। আরভান বাথটাবের দিকে ফিরতেই আয়াতের সাথে ওর সজোরে ধাক্কা লাগল।

আরভান দীর্ঘশ্বাস ফেলে পেছনে তাকালো।
​”কী? এখন কি আমার সাথেই গোসল করার প্ল্যান করছো নাকি?”

আরভানের এই বাঁকা প্রশ্নে আয়াতের সম্বিত ফিরল। সে এতক্ষণ খেয়াল করেনি যে ঝরনার একদম নিচে দাঁড়িয়ে আছে তারা। আয়াতের গাল দুটো লজ্জায় আরও রক্তিম হয়ে উঠল। সে মাথা নিচু করে কাঁপা গলায় বলল, স…সরি, আমি বাইরে যাচ্ছি।”

আয়াত এক মুহূর্তও সেখানে না দাঁড়িয়ে চলে যেতে চাইল, কিন্তু আরভান তাকে সেই সুযোগ দিল না। সে আয়াতের হাত ধরে এক হ্যাঁচকা টান দিল। আয়াত টাল সামলাতে না পেরে সরাসরি আরভানের উন্মুক্ত বলিষ্ঠ বুকে আছড়ে পড়ল। আরভান এক মুহূর্ত দেরি না করে নিজের শক্তিশালী দুহাতে আয়াতের কোমর পেঁচিয়ে ধরল। একদম নিবিড়ভাবে নিজেকে মিশিয়ে নিল আয়াতের সাথে।

​”কী করছেন? ছাড়ুন বলছি!”

আয়াত চেঁচিয়ে উঠলে তাকে ছাড়াতে চাইল, কিন্তু আরভানের এই বাহুবন্ধন থেকে মুক্ত হওয়া অত সহজ নয়।

​আরভান তাকে ছাড়ল না, বরং এক ঝটকায় আয়াতের পিঠ দেয়ালের সাথে চেপে ধরল। নিজের দাড়িওয়ালা গালটা আয়াতের নরম গালে ঘষতে ঘষতে ফিসফিস করে বলল,
“সকালের রাগ কি এখনো কমেনি আপনার? নাকি রাগ ভাঙানোর নতুন কোনো প্র্যাকটিক্যাল মেথড অ্যাপ্লাই করাতে চাইছেন?”

আয়াতের শরীর জমে গেল এই অতর্কিত আর ঘনিষ্ঠ স্পর্শে। আরভানের শরীর থেকে চুইয়ে আসা শীতল জল আর তার তপ্ত নিঃশ্বাসের এই বৈপরীত্য ওকে এক নিমেষে অসাড় করে দিল। ওর গলা দিয়ে কোনো স্বর বের হচ্ছিল না। আরভানের এক হাত কোমর থেকে সরে এসে আয়াতের অবাধ্য ভিজে চুলগুলোকে কানের পেছনে গুঁজে দিল। উন্মুক্ত গলার পাশটায় আরভান একের পর এক ছোট ছোট তৃষ্ণার্ত চুমু আঁকতে শুরু করল।

আয়াতের বিচারবুদ্ধি লোপ পাচ্ছিল; সে ঘোরগ্রস্তের মতো নিজের হাত দুটো দিয়ে আরভানের ভেজা চুলগুলো শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। তার শরীরের প্রতিটি কোষে যেন এক অজানা বৈদ্যুতিক কম্পন শুরু হয়েছে। সে চাইছে আরভানকে দূরে সরাতে, অথচ অবচেতন মন চাইছে এই নিবিড়তা আরও প্রগাঢ় হোক।

​আয়াত যখন সেই মায়ার নেশায় বুঁদ হয়ে চোখ বুজে দাঁড়িয়ে ছিল, ঠিক তখনই আরভান ওর কানের লতিতে ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বলল,
“পানি পড়ে মাথাটা কি একটু ঠান্ডা হয়েছে মিসেস?”

বলেই সে আয়াতকে হঠাৎ ছেড়ে দিয়ে কিছুটা দূরে সরে দাঁড়ালো। আয়াত চোখ খুলে দেখল আরভান ওর থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসছে। সেই চোখে একরাশ নেশা আর অদম্য দুষ্টুমি। আয়াত নিজের দিকে তাকিয়ে লজ্জায় আষ্টেপৃষ্ঠে কুঁকড়ে গেল। তার পুরো শরীর ভিজে চুপচুপ করছে। পাতলা কামিজ শরীরের সাথে লেপ্টে থাকায় একজন নারীর দেহের প্রতিটি ভাঁজ এখন আরভানের চোখের সামনে স্পষ্ট।

ওড়নাটা কোনোমতে গলার পাশে ঝুলে আছে। আরভান হঠাৎ এগিয়ে এসে আয়াতের গলার ওড়নাটা এক টানে খুলে নিজের হাতে নিল। তারপর আবারও তাকে কাছে টেনে নিয়ে গালে হাত বুলিয়ে গাঢ় স্বরে বলল,
“বাংলাদেশে সাদা জামায় প্রথম ভেজা অবস্থায় তোমাকে দেখেছিলাম। কিন্তু আজ এই নীল পোশাকে তোমার এই ভিজে রূপ আমাকে পাগল করে দিচ্ছে আয়াত। তোমার এই কাঁপা ঠোঁটদুটো যেন চিৎকার করে বলছে, ‘আরভান, আমাকে একটু ছুঁয়ে দেও।’ আমাকে বারবার প্ররোচিত করো না আয়াত, আমি মানুষটা কিন্তু খুব একটা সুবিধের নই।”

আবারও ওকে কাছে টেনে নিয়ে আরভান আয়াতের থুতনিটা উঁচিয়ে ধরল। ওর চোখের মণি দুটো তখন কামনার গভীর সমুদ্রে ডুবে আছে। আয়াতের শরীরের কাঁপন যেন আরও বেড়ে গেল। সে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু আরভানের চোখের ওই গভীরতা তাকে স্তব্ধ করে দিল। আরভান তার কপালে কপাল ঠেকিয়ে বলল,

“তোমাকে এভাবে দেখার পর কোনো পুরুষের পক্ষেই নিজেকে সামলানো সম্ভব নয় আয়াত। এই মুহূর্তে আমার খুব ইচ্ছে করছে তোমাকে পাঁজাকোলা করে বিছানায় নিয়ে যেতে। তোমার ওই রেশমি চুলে মুখ গুঁজে হারিয়ে যেতে চাই আমি। দিবে কি সেই অধিকার?”

​আয়াতের চোখ যেন কোটর থেকে বের হয়ে আসার উপক্রম! এই লোকটা ইদানীং যেন সারাক্ষণ ওই এক ধান্দাতেই থাকে। আয়াত বুঝতে পারল এখনই না পালালে বিপদ নিশ্চিত। আরভান যখন আবারও মাথা নিচু করে আয়াতের ওষ্ঠের দিকে এগোতে চাইল, আয়াত সর্বশক্তি দিয়ে আরভানকে ধাক্কা দিল। আরভান অপ্রস্তুত অবস্থায় টাল সামলাতে ব্যস্ত, আর সেই সুযোগে আয়াত এক দৌড়ে ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে গেল।

​আরভান ওর পালানো দেখে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।
“পালিয়ে কোথায় যাবে মিসেস?”

​কিন্তু পরক্ষণেই আরভানের হাসি থেমে গেল। সে বুঝতে পারল কোমরে বাতাস লাগছে। নিচে তাকিয়ে দেখল তার একমাত্র সম্বল সাদা তোয়ালেটা উধাও! আয়াত যাওয়ার সময় শয়তানি বুদ্ধি করে তোয়ালেটা এক টানে নিয়ে গেছে।

​আরভান চিৎকার করে উঠল, “ইডিয়ট গার্ল! তুমি নিজেকে কী ভাবো? তোমাকে একবার আমার সামনে পাই, তারপর দেখো।আমার তোয়ালে ফেরত দিয়ে যাও আয়াত।”

আয়াত নিজের রুমে চলে এসে কোনোমতে দরজা লাগিয়ে সবগুলো লক আটকে দিল। দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে হাঁপাতে লাগল সে। তার হৃৎপিণ্ডটা যেন পাগলের মতো লাফাচ্ছে। এই লোকের পাল্লায় পড়লে তার জানটা কোনোদিন খুশিতেই বের হয়ে যাবে।আর বেইমান হৃদপিণ্ডটা এত ছটফট করার কী আছে? আয়াত আয়নায় নিজের বিধ্বস্ত রূপ দেখে হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারল না। আরভানের চেহারার চেয়েও ওই নেশালু চোখ দুটো মনে পড়তেই সে আবার শিউরে উঠল।

​তবে তোয়ালে ছাড়া আরভানের ওই কিংকর্তব্যবিমূঢ় চেহারাটা কল্পনা করতেই সে আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। বুকের ওপর হাত রেখে সে খিলখিল করে হেসে উঠল। এই প্রথম সে আরভান চৌধুরীকে কোনো যুদ্ধে পরাজিত করতে পেরেছে।

চলবে..