#পর্ব_৪৭
#আমার_হয়ে_থেকো🍁
#Tasnim_Riya_khan
—
আয়াতের সেই বজ্রকণ্ঠের চিৎকারে আরভান ধড়ফড় করে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। ইদানীং তার এই নরম-সরম লক্ষ্মী বউটা বড্ড রাগী হয়ে উঠেছে;কথায় কথায় রেগে যায় চিল্লে বাড়ি মাথায় তোলে আর যখন-তখন চোখ রাঙিয়ে ঝাড়ি দেয়।
পুরো মেলবোর্নের বিজনেস ম্যাগনেটরা যার ভয়ে কাঁপে, এই এক ফুটের মায়াবতী বউটাকে সে আজকাল দস্তুরমতো ভয় পায়।
আয়াত কোমরে দুই হাত দিয়ে একদম কড়া শিক্ষিকার মতো দাঁড়িয়ে রাগি স্বরে বলল, “আপনি কি আজও অফিসে যাবেন না, আরভান?”
আরভান শুকনো ঢোক গিলল। বিছানায় শুয়ে থাকা আইরার দিকে একবার অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে সাহায্য চাইল, কিন্তু পুঁচকে মেয়ে তো আর বাবাকে উদ্ধার করতে পারবে না।কিন্তু আইরা তখন নিজের হাত-পা ছড়াতে ব্যস্ত।সে আমতা আমতা করে বলল, “যাচ্ছি তো আয়াত… এত রাগ করার কী আছে বলো তো?”
বলেই সে একটু পা টিপে টিপে আয়াতের একদম কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। অফিসে যাওয়াটা কীভাবে আজকের মতো ক্যানসেল করা যায়, তার শেষ চেষ্টা হিসেবে আয়াতের কোমরে আলতো করে দুহাত জড়িয়ে একটু নরম সুরে বলল, “মিসেস, অনেকদিন হলো তোমাকে একটু ভালো করে…”
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই আয়াত আরভানের বুকে হাত দিয়ে ঠেলে সরিয়ে দিল। চোখ বড় বড় করে বলল, “আপনি আমার সাথে মোটেও ছ্যাবলামি করবেন না আরভান! তাড়াতাড়ি গিয়ে রেডি হন, আমি নিচে খাবার দিচ্ছি।”
আরভান এবার ক্ষুণ্ণ চোখে তাকিয়ে আয়াতের আরও কাছে এসে তার পথ আগলে দাঁড়াল। তার সেই গভীর, মাদকতাময় চোখে এক চিলতে দুষ্টুমি ফুটিয়ে বলল,
“অফিস তো রোজই থাকে আয়াত, কিন্তু এক মাসের দুটো ফুটপুটে বাচ্চার এই রূপবান বাবাটাকে একটু আদর করার সময় কি তোমার হবে না? এই যে এত কষ্ট করে সকালে এক্সারসাইজ করলাম, তার কোনো রিওয়ার্ড পাব না?”
আয়াত ঠোঁট উল্টে বলল, “উঁহু, একদম না! রিওয়ার্ড পরে হবে। আগে কাজে যান। এক মাস ধরে ফারহান ভাইয়া এক হাতে সব সামলাচ্ছেন, আপনার কি বিন্দুমাত্র দয়া হয় না ওনার ওপর?”
”ওর ওপর দয়া দেখাব কেন? ও কি আমার হবু…”
আরভান কথা শেষ করার আগেই আয়াত তার চিবুকে নিজের আঙুল দিয়ে মৃদু ধাক্কা মেরে বলল, “চুপ করুন! আর কোনো বাহানা শুনব না। আর দশ মিনিটের মধ্যে আপনাকে আমি ডাইনিং টেবিলে দেখতে চাই।”
আরভান এবার আর কথা বাড়াল না। হঠাৎ করেই সে আয়াতের হাতটা শক্ত করে ধরে তাকে নিজের শক্ত বুকের সাথে লেপ্টে নিল। আয়াত কিছু বুঝে ওঠার আগেই আরভান ঝুঁকে এসে আয়াতের সেই রাগী ওষ্ঠাধরে গভীর এক ভালোবাসার চুম্বন এঁকে দিল। আচমকা এই আক্রমণে আয়াতের গালের রঙ মুহূর্তেই লাল হয়ে উঠল, তবে সে নিজের রাগ বজায় রাখার ভান করে আরভানের বুকে আলতো কিল মেরে বলল, “ছাড়ুন আরভান! সারাক্ষণ শুধু দুষ্টুমি… বাচ্চারা দেখছে!”
“ওরা এখন অনেক ছোট, কিচ্ছু বোঝে না।” আরভান তৃপ্তির হাসি হেসে আয়াতের কপালে আরও একটা চুমু দিয়ে অবশেষে তাকে ছেড়ে দিল। আয়াত আর এক মুহূর্তও সেখানে না দাঁড়িয়ে গটগট করে ঘর থেকে বেরিয়ে চলে গেল।
আরভান পেছনে দাঁড়িয়ে নিজের চুল হাত দিয়ে ঠিক করতে করতে বিড়বিড় করল, “বউ তো নয়, যেন আস্ত একটা লেডি হিটলার!”
আরভান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে চরম বিরক্ত হলো—বউটা মা হওয়ার পর থেকে তার রোমান্সের বারোটা বাজিয়ে ছেড়েছে।তবে আরভান রেডি হওয়ার আগে বিছানায় শুয়ে থাকা আইরার সাথে আবারও আধো আধো কথায় মেতে উঠল।
এক মাসের আইরা যেন বাবার সব দুঃখ বোঝে; সে তার ছোট ছোট হাত-পা নেড়ে বাবার দিকে তাকিয়ে ‘উ,উম,’ জাতীয় কিছু একটা শব্দ উচ্চারণ করার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল। আরভান মেয়ের এই কাণ্ড দেখে আবার গলে জল হয়ে গেল। আইরা আর ঘুমন্ত আনায়ার কপালে শেষবারের মতো চুমু খেয়ে, দীর্ঘ সময় মেয়েদের সাথে বিদায়ী প্রলাপ সেরে অবশেষে সে অফিসের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হলো। ঘরের আড়াল থেকে বাবা-মেয়ের এই ভালোবাসার কাণ্ড দেখে আয়াতের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠলেও, সে আরভানের সামনে তা প্রকাশ না করে কঠোরভাবে চেপে রেখেছিল।
দেখতে দেখতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল নেমে এল আকাশে। বিকেলের মায়াবী রোদ তখন জানালার কাঁচ গলে ঘরের দেয়ালে এসে এক অদ্ভুত আলো-ছায়ার খেলা তৈরি করেছে।
আকাশটা আজ ভারী চমৎকার রূপ ধারণ করেছে। জানালার বাইরে তাকালে দেখা যায় দিগন্তজোড়া রক্তিম আভা, মেঘের দল যেন সোনাঝুরি রঙে সেজেছে। হালকা হিমেল হাওয়া এসে দোলা দিয়ে যাচ্ছে ঘরের পর্দায়, যা পুরো পরিবেশের মধ্যে এক অদ্ভুত স্নিগ্ধতা আর শান্ত মায়া ছড়িয়ে দিয়েছে।
আয়াত দুই মেয়েকে ফিডিং করিয়ে, সবেমাত্র গোসল সেরে চুল মুছতে মুছতে বের হয়েছে। শাহজাদি বিছানায় আনায়া আর আইরার মাঝখানে বসে আছে। সে দুই বাচ্চার তুলতুলে গালে আঙুল দিয়ে সুড়সুড়ি দিচ্ছে আর ওদের সাথে অদ্ভুত সব শব্দ করে একমনে কথা বলছে আর নিজেই হেসে কুটিকুটি হচ্ছে। পুঁচকে দুটোও ফুফুর কাণ্ড দেখে হাত-পা ছুড়ছে।
শাহজাদি আয়াতকে ঘর ঢুকতে দেখে মুখ তুলে একগাল হেসে বলল, “আপু! দেখে যাও তোমার মেয়েরা কী বদমাইশ হয়েছে… আনায়া একদম তোমার মতো শান্ত আর আইরাটা পুরো ভাইয়ার মতো দুষ্টু…” বলতে বলতেই শাহজাদি হঠাৎ জিব কেটে নিজের গালে একটা হালকা থাপ্পড় মারল। “উপস, সরি! ভুলেই গিয়েছিলাম, তুমি তো এখন আমার ভাবি হও!”
আয়াত শাহজাদির এই মিষ্টি পাগলামি দেখে হেসে ফেলল।
সে তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে বলল, “আরে ধুর! ভাবি বলতে হবে না, আগের মতো আপু বলেই ডাক। ওটাই শুনতে বেশি ভালো লাগে।”
”তা অবশ্য ঠিক।” শাহজাদি আনায়াকে কোলে নিয়ে একটু দুলিয়ে বলল, “কিন্তু আরভান ভাইয়া যদি শুনতে পায় যে আমি তোমাকে ভাবি না বলে আপু ডাকছি, তাহলে নির্ঘাত ওনার সেই খাঁটি ব্যবসায়ী মার্কা গম্ভীর চোখে আমার দিকে তাকাবেন। ওনাকে আমার বড্ড ভয় লাগে!”
আয়াত হাসতে হাসতে বলল, “আরে ও এখন শুধু নামেই গম্ভীর, কাজের বেলায় আস্ত একটা বাচ্চার মতো। মেয়েদের সামনে ওনার সব জারিজুরি শেষ।”
ঠিক তখনই শাহজাদির হাতের ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। স্ক্রিনে ফারহানের নাম আর সাথে একটা মেসেজ ভেসে উঠল। মেসেজটিতে লেখা ছিল: “আজ একটু তাড়াতাড়ি ফিরব। সন্ধ্যার পর কি আমার অর্ধাঙ্গিনী তার এই ক্লান্ত স্বামীর সাথে মেলবোর্নের রাস্তায় একটু হাঁটতে বের হবেন? আই মিস ইউ, আজকে একটা শাড়ি পরো না শাহজাদি? হালকা নীল রঙেরটা। বাড়ি ফিরেই কিন্তু আমি শাড়ি পরিহিত আমার বউকে দেখতে চাই। সন্ধ্যায় রেডি হয়ে থাকবে।”
মেসেজটা পড়েই শাহজাদির ফর্সা গাল দুটো লজ্জায় একদম টকটকে লাল হয়ে উঠল। সে তড়িঘড়ি করে ফোনটা লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা করল। আয়াত আয়নার প্রতিবিম্বে শাহজাদির এই লজ্জামাখা মুখটা লক্ষ্য করেছিল। সে মুচকি হেসে শাহজাদির দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, “কী ব্যাপার শাহজাদি? বিকেলের রোদের আলো তো ঘরে আসেনি, তাহলে তোমার ফেসটা এমন চেরি ফলের মতো লাল হয়ে উঠল কেন? ফারহান ভাইয়া কোনো স্পেশাল মেসেজ পাঠিয়েছেন নাকি?”
শাহজাদি আমতা আমতা করে বলল, “না… মানে… তেমন কিছু না আপু। ওনি জাস্ট… জাস্ট জিজ্ঞেস করলেন রাতে কী রান্না হবে।”
আয়াত শাহজাদির কাছে এসে ওর কান টেনে দিয়ে দুষ্টুমিভরা কণ্ঠে বলল, “মিথ্যে কথা! রাতে কী রান্না হবে সেটা শুনে কেউ এভাবে লজ্জায় লাল হয় না। ফারহান ভাইয়া যে দিন দিন বড্ড রোমান্টিক হয়ে উঠছেন, সেটা কিন্তু আমি বেশ বুঝতে পারছি।”
শাহজাদি মুখ লুকিয়ে বলল, “আহা আপু, ছাড়ো না! ওনি একটু বেশিই বানিয়ে বানিয়ে কথা বলেন।”
আয়াত আরও কিছু বলে শাহজাদিকে ক্ষ্যাপাতে যাবে, ঠিক তখনই নিচের তলা থেকে কলিং বেলের কর্কশ আর একটানা আওয়াজ ভেসে এল।,
কলিং বেলের আওয়াজ শুনেই আয়াতের কপালে বিরক্তির ভাঁজ পড়ল, তার রাগ এবার তিরতির করে বাড়তে লাগল। সে দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখাল, মাত্র বিকেল চারটে বাজে। সে নিশ্চিত, এটা আরভান ছাড়া আর কেউ হতেই পারে না! লোকটা অফিসে যেতে পারল না, কয়েক ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই আবার কাজ ফেলে বাড়ি ফিরে এসেছে।
আয়াত হাতের তোয়ালেটা বিছানায় ছুড়ে মেরে রাগত স্বরে বলল, “আজকে এই লোকের সাথে আমার একটা এসপার-ওসপার কিছু হবেই। অফিসে না গিয়ে সারাক্ষণ যদি এভাবে বাচ্চার আঁচল ধরে বসে থাকে, তবে তো চলবে না!
সে ওভাবেই ভেজা চুলে, রাগ চড়চড় করে মাথায় নিয়ে গটগট করে নিচে নেমে গেল। মনে মনে আরভানকে দেওয়ার জন্য একগাদা ঝাড়ি রেডি করে সজোরে সদর দরজাটা খুলে দিল।
কিন্তু দরজাটা খুলতেই আয়াতের ভেতরের সমস্ত রাগ এক নিমেষে কর্পূরের মতো উবে গেল। তার মুখের সমস্ত কথা গলার ভেতর আটকে গেল। রাগের সেই চাদর ভেদ করে তার সারা শরীরে এক তীব্র বিস্ময় আর হিমশীতল ভয় এসে জেঁকে বসল। ভয়ে তার হাত-পা কাঁপতে শুরু করল।সামনে আরভান দাঁড়িয়ে নেই। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে…
চলবে….
#পর্ব_৪৮
#আমার_হয়ে_থেকো
#Tasnim_Riya_khan
_
সামনে দাঁড়িয়ে আছেন স্বয়ং আরশাদ চৌধুরী! মাত্র এক মাস এক সপ্তাহ আগে আয়াতের ছোঁড়া বুলেটে তার যে বাম বাহু ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল, সেখানে এখনো সাদা ব্যান্ডেজ জড়ানো। কিন্তু তার মুখে যন্ত্রণার কোনো ছাপ নেই, বরং সেখানে খেলা করছে এক হিংস্র, পৈশাচিক উল্লাস। তার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে কুচকুচে কালো পোশাক পরিহিত এক দীর্ঘকায় লোক, যার হাতে উদ্যত এক মারণাস্ত্র! লোডেড বন্দুকের সেই কালো নলটা সোজা আয়াতের দিকে তাক করা।
হঠাৎ এই যমদূতদের বাড়ির দোরগোড়ায় দেখে আয়াতের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। এক মাস আগের সেই রক্তাক্ত বিকেলের স্মৃতি দগদগে ঘায়ের মতো তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। কিন্তু ভেতরে থাকা দুই নিষ্পাপ কন্যাসন্তানের কথা মনে হতেই সে নিজের সমস্ত দুর্বলতা ঝেড়ে ফেলল। নিজের ভেতরের সমস্ত ভয়কে এক পাশে ঠেলে দিয়ে, যতটা সম্ভব সাহস সঞ্চয় করে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল,
“আপনি এখানে আবার এসেছেন? কোন সাহসে? আপনার বিন্দুমাত্র লজ্জা করে না? যে মানুষটা নিজের ছেলেকে বিষ খাইয়ে মারতে চেয়েও শান্তি পায়নি, সে আজ আবার কোন মুখে এই বাড়ির দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে?”
আয়াতের এমন জ্বলন্ত রূপ দেখে আরশাদ চৌধুরী বিন্দুমাত্র বিচলিত হলেন না। বরং ঠোঁটের কোণে এক কুৎসিত, বিদ্রূপাত্মক হাসি ফুটিয়ে বললেন, “একদম মায়ের মতো তেজ তোমারও! রক্ত তো কথা বলবেই।”
আয়াত মুহূর্তের জন্য অবাক হলো, তার ভ্রু জোড়া কুঁচকে গেল। এই লোকটা কথায় কথায় কেন তার মৃত মায়ের প্রসঙ্গ টেনে আনে, তা সে কিছুতেই বুঝতে পারে না। তার মায়ের পবিত্র স্মৃতির ওপর এই লোকের কুৎসিত বাক্যবাণ আয়াতের সহ্যক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছিল। তার মৃত মায়ের অতীতে এমন কী রহস্য লুকিয়ে আছে, যার কারণে আরশাদ চৌধুরী আজ এই চরম মুহূর্তেও তাকে টেনে আনছেন?
আরশাদ চৌধুরী নিজের ব্যান্ডেজ করা হাতটার ওপর অন্য হাত বুলিয়ে উপহাসের সুরে বললেন, “আমি তো এখানে তোমার সাথে গল্প করতে আসিনি আয়াত। আমি এসেছি আমার নাতিদের সাথে দেখা করতে, তাদের একটু আদর করতে। সরো পথ থেকে!”
আয়াত নিজের দুই হাত দিয়ে দরজার দুপাশ আগলে দাঁড়িয়ে তীব্র চিৎকারে বলল,” যে লোক নিজের ছেলের শরীরে তিলে তিলে বিষ দিয়ে তাকে চিরতরে শেষ করে দিতে চেয়েছিল, তার জন্ম দেওয়া সন্তান আপনার নাতি হয় কীভাবে? ওদের সাথে আপনার কোনো সম্পর্ক নেই! এই বাড়িতে আপনার মতো একটা কলঙ্কিত মানুষের কোনো জায়গা নেই, কোনোদিন হবেও না।”
আরশাদ চৌধুরী যেন আয়াতের এই কথায় এক পরম মজা পেলেন। তিনি আরও একধাপ এগিয়ে এসে হিসহিসিয়ে বললেন, “একদম ঠিক বলেছ। একজন চরিত্রহীনা নারীর মেয়ের পেটে আমার চৌধুরী বংশের রক্ত বড় হয়েছে, এটা আমি নিজেও কোনোদিন মেনে নিতে পারব না। আর তা আমি হতেও দেব না!”
কথাটা শেষ হতেই আরশাদ চৌধুরী নিজের সর্বশক্তি দিয়ে আয়াতকে এক সজোরে ধাক্কা দিলেন। এক মাসের প্রসবের ধকল কাটিয়ে ওঠা আয়াতের দুর্বল শরীরটা সেই ধাক্কা সামলাতে না পেরে ছিটকে গিয়ে ড্রয়িংরুমের দেয়ালের সাথে আছড়ে পড়ল। আরশাদ চৌধুরী ও তার সেই কালো পোশাকধারী বন্দুকবাজ লোকটাকে নিয়ে সোজা বাড়ির ভেতরের দিকে, সিঁড়ির অভিমুখে এগোতে লাগল।
“কী বললেন আপনি? চরিত্রহীনা নারীর মেয়ে মানে? মুখ সামলে কথা বলুন! আমার মা আপনার সাথে কী চরিত্রহীনার মতো কাজ করেছে?
আর আপনি কোথায় যাচ্ছেন? এরা কারা? এই বাড়ি থেকে বের হোন বলছি!”
আয়াত দেয়াল ধরে কোনোমতে উঠে দাঁড়িয়ে যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠল। কিন্তু নিজের চেয়েও এই মুহূর্তে ওপরের ঘরে ঘুমিয়ে থাকা নিষ্পাপ আনায়া আর আইরার নিরাপত্তা তার কাছে বড়। সে পাগলের মতো চিৎকার করে আরশাদ চৌধুরীর পেছন পেছন ছুটতে লাগল।
” আপনি ওপরের দিকে কোথায় যাচ্ছেন? কে ওরা?আবারও বলছি এদের আমার বাড়ি থেকে বের করুন!”
আয়াত নিজের সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করে আরশাদ চৌধুরীকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও সেই লোক তার কোনো কথাই কানে তুলল না। তার লক্ষ্য তখন ওপরের তলার সেই ঘরটা, যেখানে আরভানের দুই কলিজার টুকরো ঘুমিয়ে আছে। অবস্থা বেগতিক দেখে আয়াত ওপরের দিকে তাকিয়ে গগনবিদারী চিৎকার দিয়ে বলল, “শাহজাদি! দরজা বন্ধ করো! ঘরের দরজা ভেতর থেকে লক করে দাও! কোনোভাবেই এই অমানুষটাকে ঘরের ভেতর ঢুকতে দিবে না!”
ওপরে বাচ্চাদের পাশে বসে থাকা শাহজাদি আয়াতের এমন ভয়ঙ্কর আর্তনাদ শুনে মুহূর্তের মধ্যে শিউরে উঠল। সে এক ছুটে ঘরের দরজার মুখে আসতেই স্তম্ভিত হয়ে গেল। সিঁড়ির শেষ ধাপে দাঁড়িয়ে আছেন স্বয়ং তার বড় চাচাজান! শাহজাদি জীবনে মাত্র একবার, খুব ছোটবেলায় এই চাচার মুখ দেখেছিল। তারপর আর কখনো তাকে সামনাসামনি দেখার সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য তার হয়নি। তবে চৌধুরী বাড়ির ড্রয়িংরুমে ঝোলানো সেই বিশাল পারিবারিক ছবির ফ্রেমে এই মুখটা সে হাজারবার দেখেছে। তাই আরশাদ চৌধুরীকে চিনতে শাহজাদির বিন্দুমাত্র ভুল হলো না।প্রথমে খুশি হলেও তা স্থায়ী হলো না, চাচার পেছনের লোকটার হাতের বন্দুক দেখে শাহজাদির কলিজা শুকিয়ে গেল।
পেছন থেকে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে আয়াত তখনো অনবরত চিৎকার করে যাচ্ছে, “শাহজাদি! দাঁড়িয়ে থেকো না! প্লিজ দরজা বন্ধ করো! নইলে ওরা আমার বাচ্চাদের মেরে ফেলবে! জলদি কর শাহজাদি, তোমার ভাইয়াকে কল দেও…”
ঠিক তখনই পেছন থেকে আরশাদ চৌধুরীর সাথে আসা দ্বিতীয় লোকটা অতর্কিতে ঘরের ভেতর ঢুকে আয়াতের হাত দুটো পেছন থেকে খপ করে ধরে ফেলল। একজন বলিষ্ঠ, পেশীবহুল পুরুষের পাশবিক শক্তির সাথে নিজের দুর্বল শরীর নিয়ে কিছুতেই কুলাতে পারল না আয়াত।সে সর্বশক্তি দিয়ে ছটফট করতে করতে আর্তনাদ করে উঠল, “ছাড়ো আমাকে! হাত ছাড়ো বলছি,। শাহজাদি, দরজা আটকা।”
শাহজাদি ওপর থেকে আয়াতের কণ্ঠস্বরের সেই তীক্ষ্ণ আকুলতা শুনে প্রথমে কিছু না বুঝলেও, আশন্ন বিপদের তীব্রতা টের পেয়ে চাচা আরশাদ চৌধুরী ঘরের দরজায় পৌঁছানোর আগেই ভেতরের লক আটকে দিতে গেল। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। শাহজাদি যখন দরজাটা জোরে কপাট করতে যাবে, ঠিক তখনই আরশাদ চৌধুরী নিজের এক হাতের পুরো শক্তি দিয়ে দরজাটা ধাক্কা দিয়ে ধরে ফেললেন। একজন বলিষ্ঠ ও দীর্ঘকায় প্রৌঢ় পুরুষের গায়ের জোরের সামনে শাহজাদির মতো এক ফালি শুকনো মেয়ের শারীরিক শক্তি কিছুই ছিল না। তবুও নিজের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে শাহজাদি দরজার ওপাশ থেকে লড়াই চালিয়ে গেল, কিন্তু আরশাদ চৌধুরীর এক প্রচণ্ড ও হিংস্র ধাক্কায় দরজাটা হুড়মুড় করে খুলে গেল। সেই ধাক্কার চোটে শাহজাদি ছিটকে গিয়ে ঘরের এক কোণে থাকা ড্রেসিং টেবিলের কাঠের কোণায় সজোরে আঘাত পেল। কপাল ফেটে সাথে সাথে তাজা রক্ত গড়িয়ে পড়ল তার চোখ মুখ বেয়ে। সেই তীব্র আঘাতেই শাহজাদি কোনো গোঙানি ছাড়াই মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে তৎক্ষণাৎ জ্ঞান হারাল।
আরশাদ চৌধুরী সেদিকে একটিবারও ফিরে না তাকিয়ে পৈশাচিক উল্লাসে ঘরের ভেতর ঢুকলেন। তার বিষাক্ত চোখ দুটো গিয়ে পড়ল বিছানার মাঝখানে শুয়ে থাকা এক মাসের সেই দুধের শিশু দুটোর দিকে।
ওদিকে নিচে থাকা লোকটার হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করতে আয়াত তখন এক উন্মাদ বাঘিনী। সে নিজের সমস্ত শক্তি পায়ে জড়ো করে লোকটার স্পর্শকাতর জায়গায় সজোরে এক লাথি মারল। ব্যথায় লোকটার হাত শিথিল হতেই সে তার অন্য হাতটায় নিজের ধারালো দাঁত দিয়ে এক কামড় বসিয়ে দিল। যন্ত্রণায় লোকটা হাত ছেড়ে দিতেই আয়াত তাদের হাতের বাঁধন থেকে ছুটে এক নিঃশ্বাসে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে চলে এল। ঘরে ঢুকেই যখন সে দেখল আরশাদ চৌধুরী এক অদ্ভুত হিংস্র দৃষ্টিতে বিছানার নিষ্পাপ শিশু দুটোর দিকে তাকিয়ে আছেন, তখন আয়াতের মাতৃত্বের ভেতর যেন এক রুদ্র রূপ চাড়া দিয়ে উঠল। সে ড্রেসিং টেবিলের ওপর থাকা ভারী একটা পাথরের ক্রিস্টাল প্লেট দুই হাতে তুলে নিয়ে কোনো কিছু না ভেবে সোজা আরশাদ চৌধুরীর মাথার পেছনে আঘাত করল।
হঠাৎ এমন অতর্কিত ও ভারী আঘাতে আরশাদ চৌধুরীর মাথাটা মুহূর্তের জন্য ঝিম ধরে গেল। তিনি দুই হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরে টাল সামলালেন।
আয়াত পিস্তলহীন অবস্থাতেও আরশাদ চৌধুরীর সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে কাঁপাকাঁপা অথচ তীব্র ধারালো কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “আরভান কি আদেও আপনার নিজের সন্তান? নাকি ওকেও নিজের স্বার্থে, নিজের প্রয়োজনে বছরের পর বছর ব্যবহার করে আজ মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছেন? নিজের সন্তানকে তিলে তিলে শেষ করে দিয়েও আপনার লোভ মেটেনি, এখন আমার এই নিষ্পাপ এক মাসের বাচ্চাদের পেছনে কেন লেগেছেন আপনি? ওরা আপনার কী ক্ষতি করেছে?”
আরশাদ চৌধুরী মাথা চেপে ধরে সোজা হলেন। তার চোখের মণি দুটো এবার রাগে ও অপমানে একদম লাল হয়ে উঠল। এই এক রত্তি মেয়ে, যে কিনা মাত্র এক মাস আগে তাকে গুলি করেছিল, সে আজ আবারও তার মাথায় আঘাত করার দুঃসাহস দেখাল! এত বড় কলিজা এই মেয়ের আসে কোত্থেকে? তিনি রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে আয়াতের চুল মুঠো করে ধরে তার গালে কষিয়ে পর পর কয়েকটা চড় মারলেন।
থাপ্পড়ের তীব্রতায় আয়াতের ঠোঁটের কোণ ফেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হয়ে এল। সে ছিটকে গিয়ে বিছানার পাশে পড়ল। ঠিক তখনই আরশাদ চৌধুরীর দ্বিতীয় লোকটা হাঁপাতে হাঁপাতে ওপরের ঘরে ঢুকে অত্যন্ত আতঙ্কিত কণ্ঠে বলল, “স্যার! আরভান ফিরে এসেছে! ওর গাড়ি বাড়ির একদম কাছাকাছি চলে এসেছে। আর বড়জোর কয়েকটা মিনিট, তারপরই ও এই ঘরে ঢুকে যাবে!”
আরভানের আসার খবর শুনে আরশাদ চৌধুরীর মাথা যেন কাজ করা বন্ধ করে দিল। সে আরভানের মুখোমুখি হতে চায় না, অন্তত এই মুহূর্তে তো নয়ই। তার মনে হলো, আজ যা কিছু ঘটছে, তার সবকিছুর মূলে এই এক রত্তি মেয়ে আয়াত! এর জন্যই আজ তার সাজানো সাম্রাজ্য ধ্বংসের মুখে।
শান্তিতে এসে সব কটাকে শেষ করে দিয়ে চলে যাবে, তা না—শুরু থেকেই এই মেয়ে তার প্রতিটি চালে বাগড়া দিয়ে যাচ্ছে। এই মেয়েকে সে আজ মেরেই ফেলবে, আর তার আগে শেষ করবে এই রক্তকে—যে রক্ত হাবিবা নামক প্রতারিত নারীর রক্ত, আরভানের রক্তের সাথে মিশে এক নতুন চৌধুরী বংশের জন্ম দিচ্ছে।
ঘরের ভেতর এই তুমুল চিৎকার, মারামারি আর বারুদের কড়া গন্ধে এক মাসের ছোট্ট আনায়া আর আইরা ভয় পেয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠল। অবুঝ শিশু দুটো নিজেদের চেনা শান্ত পরিবেশ না পেয়ে একযোগে তারস্বরে কান্না জুড়ে দিল। বাচ্চাদের সেই কান্নার আওয়াজ শুনে আয়াতের বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। সে নিজে ঠোঁটের রক্ত মুছে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল এবং ঝাপসা চোখে ওপরের দিকে তাকিয়ে মনে মনে আল্লাহকে ডাকতে লাগল‘আল্লাহ, তুমি আরভানকে একটু তাড়াতাড়ি এনে দাও! ও না আসলে আজ আমার কোল খালি হয়ে যাবে। এই লোকটা যে এতটা জঘন্য, এতটা পিশাচ হতে পারে-তা আমার জানা ছিল না।’
আয়াত চিৎকার করে আরশাদ চৌধুরীকে বলল, “আপনি এতটা জঘন্য মানুষ কীভাবে হতে পারলেন? নিজের পেটের ছেলের সাথে বছরের পর বছর অন্যায় করেছেন, তার কলিজা কেটে কুচি কুচি করেছেন, তারপরও আপনার ক্ষুধা মেটেনি? এখন এই এক মাসের সন্তানদের ওপর হাত তুলতে আপনার হাত কাঁপছে না?”
রাগে আর কান্নায় আয়াত আর কথা বলতে পারল না, তার গলার ভেতর কান্নার দলা পাকিয়ে এল।
আরশাদ চৌধুরী যেন আয়াতের এই আর্তনাদে এক পরম পৈশাচিক আনন্দ পেলেন। তিনি এক ভয়ঙ্কর, কুৎসিত হাসি দিয়ে বললেন, “শুধু এতটুকু কেন আয়াত? আমি কিন্তু এর চেয়েও আরও অনেক বড় বড় কাজ করেছি, যা তুমি জানোও না!”
আয়াত নিজের কান্না চেপে হেঁচকি তুলতে তুলতে আরশাদ চৌধুরীর রক্তচক্ষুর দিকে তাকিয়ে রইল। তার ঠোঁটের কোণ বেয়ে তখনো তাজা রক্ত গড়িয়ে পড়ছে।
আরশাদ চৌধুরী আরও একধাপ এগিয়ে এসে হিসহিসিয়ে বললেন, “তুমি কি জানো তোমার বাবা মা কিভাবে মারা গেছে? বোকা মেয়ে জানবে কিভাবে? আমি কিন্তু তোমার বাবা-মাকেও এই পৃথিবী থেকে চিরতরে সরিয়ে দিয়ে ওপরে পাঠিয়ে দিয়েছি, ইউ নো আয়াত? আই রিয়ালি ডোন্ট ওয়ান্ট দ্যাট… তোমার ওই মা-যাকে আমি নিজের ঘরের রানী করে রাখতে চেয়েছিলাম, তার মেয়ে এসে আমার ছেলের বউ হয়ে এই চৌধুরী বাড়ির গদিতে বসুক! আমি তো আমার ছেলেকে অনেক বুঝিয়েছিলাম যাতে সে তোমাকে দূরে সরিয়ে দেয়, কিন্তু সে বোঝেনি। এখন বলো, এখানে দোষটা কার? আমার নাকি তোমাদের?”
আরশাদ চৌধুরীর এই রোমহর্ষক স্বীকারোক্তি শুনে আয়াত স্তম্ভিত হয়ে গেল। সে যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছে না। সে তো এতকাল জানত তার বাবা-মা এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন! তাহলে… সব মিথ্যা ছিল? এই লোকটাই তার মা-বাবার খুনি? তার সমস্ত পৃথিবী যেন এক নিমেষে দুলতে শুরু করল।
এর মাঝেই আরশাদ চৌধুরীর সাথে থাকা সেই বন্দুকধারী লোকটা বন্দুকের নল সোজা বিছানার বাচ্চাদের দিকে তাক করতেই আয়াত নিজের মা-বাবার খুনের ধাক্কা ভুলে এক হিংস্র বাঘিনীর মতো নিজেকে ছুটিয়ে দিল। পাশেই ড্রেসিং টেবিলের ওপর ফল কাটার একটা ধারালো ছুরি রাখা ছিল, আয়াত এক সেকেন্ডও না ভেবে সেই ছুরিটা তুলে নিয়ে সোজা লোকটার পেটে ঢুকিয়ে দিল।
”আহ!” বলে লোকটা নিজের পেট চেপে ধরে তীব্র যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে ফ্লোরে লুটিয়ে পড়ল। তার পেট থেকে গলগল করে রক্ত বের হতে লাগল।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরশাদ চৌধুরীর দ্বিতীয় লোকটা এই বীভৎস দৃশ্য দেখে চরম আতঙ্কিত হয়ে চিৎকার করে বলল, “স্যার! এই মেয়ে এটা কী করল? ও তো মরে যাবে, এমন টা হবে তা তো আপনি আমাদের বলেন নি।”
আরশাদ চৌধুরী নিজের রক্তাক্ত, হিংস্র চোখে তাকালেন আয়াতের দিকে, যে ছুরিটা ফেলে দিয়ে ততক্ষণে বিছানার দিকে ছুটে গিয়ে নিজের দুই সন্তানকে বুকের মাঝে আগলে নিতে ব্যস্ত। আরশাদ চৌধুরী দাঁত কিড়মিড় করে বললেন, “মরুক!”
কিন্তু পেটে ছুরি লাগা লোকটা তখন যন্ত্রণায় ছটফট করছিল। আরশাদ চৌধুরীর সাথে থাকা অন্য লোকটা নিজের সঙ্গীকে এভাবে মরতে দিতে রাজি ছিল না, তাই সে আহত লোকটাকে কাঁধে তুলে নিয়ে রুম থেকে বের হতে গেল। আরশাদ চৌধুরী সেদিকে খেয়াল করলেন না, তার পুরো দৃষ্টি তখন আয়াতের ওপর। তার ভেতরের পুরনো হিংস্রতা আর প্রতিশোধের আগুন দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। আয়াতের এই মুখটার মাঝে যেন আবার সেই হাবিবার মুখ ভেসে উঠল—যে তাকে প্রত্যাখ্যান করে অন্য কারো হাত ধরেছিল, আর আজ তার দেওয়া সন্তানেরা এই আরভানের বংশকে আগলে রাখছে!
মুহূর্তের মধ্যে আরশাদ চৌধুরী সেই পড়ে থাকা বন্দুকটা নিজের হাতে তুলে নিলেন। তিনি সোজা বাচ্চার দিকে তাক করে ট্রিগারে চাপ দিতে যাবেন, ঠিক তখনই আয়াত এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশে নিজেকে ছুড়ে দিয়ে দুই বাচ্চার সামনে নিজের শরীরটাকে ঢাল বানিয়ে দিল।
’ঢিসুম! ঢিসুম!’
পর পর দুটো তপ্ত বুলেট আয়াতের পিঠের ডান পাশ বরাবর সজোরে ঢুকে গেল। একটি বুলেট আয়াতের পিঠ ভেদ করে সোজা নিচে শুয়ে থাকা ছোট্ট আইরার ডান বাহুর একটু কোণ ঘেঁষে চামড়া কেটে বেরিয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে রক্তের বন্যায় ভেসে গেল আয়াতের পিঠ এবং বিছানায় শুয়ে থাকা দুধের শিশুর কচি শরীর!
ঠিক তখনই আরভানের গাড়িটা এসে সশব্দে বাড়ির সীমানার ভেতর ঢুকল। এরই মধ্যে আরভানের গাড়িটা যখন বাড়ির কাছাকাছি চলে এল, ঠিক তখনই আরশাদ চৌধুরীর লোক বাইরে থেকে তাকে কল দিয়ে আতঙ্কিত কণ্ঠে জানাল, “স্যার, আরভান আসছে!”
আরভানের আসার খবর শুনে আরশাদ চৌধুরীর চেহারাটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। নিজের ছেলের সামনে পড়ার মতো সাহস বা পরিস্থিতি কোনোটাই এখন তার অনুকূলে নেই। সে কোনো কিছু চেক না করেই দিকবিদিক জ্ঞান হারিয়ে দ্রুত নিচে নেমে পালাতে উদ্যত হলো। তার সাথে সাথে তার বাকি লোকেরাও তীব্র আতঙ্কে সেখান থেকে পালিয়ে গেল, যেন কোনোভাবেই আরভানের সামনে পড়তে না হয়। মনে মনে ভাবল, আরভান এখন ভেতরে ঢুকলে তারা নিচ দিয়ে নেমে চলে যেতে পারবে, পরে না হয় সবগুলোকে একসাথে এক হাত দেখে নেওয়া যাবে।
আরভান গাড়ির ব্রেক কষে ঝড়ের গতিতে বাড়ির ভেতরে ঢুকল। ভেতরে পা রাখতেই তার কেমন যেন এক অস্বাভাবিক পরিবেশ ও নিস্তব্ধতা অনুভব হলো। বাতাসে হালকা বারুদের কড়া গন্ধ। সে তীব্র এক আশঙ্কায় ছটফট করতে করতে ওপরের দিকে তাকিয়ে কয়েকবার চিৎকার করে ডাকল, “আয়াত! আয়াত!”
কিন্তু ওপর থেকে কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। আরভানের ঠিক পেছন পেছন ফারহান এবং আরভানের পার্সোনাল সেক্রেটারি ও বিজনেসের ম্যানেজার রেহান সিদ্দিকী ভেতরে ঢুকল। ফারহান চারদিকের নীরবতা দেখে কিছুটা স্বস্তির সুরে বলল, “মনে হয় বাচ্চাদের সাথেই ঘুমিয়ে পড়েছে। শাহজাদিকেও তো দেখছি না নিচে।”
আরভান ফারহানের কথার কোনো জবাব দিল না। তার ষষ্ঠেন্দ্রিয় তাকে এক ভয়ানক বিপদের সংকেত দিচ্ছিল। সে সোজা এক ছুটে ওপরের তলায় নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। ঘরে পা রাখতেই সে এক লহমায় স্তব্ধ হয়ে গেল, তার পুরো দুনিয়া যেন এক নিমেষে ওলটপালট হয়ে গেল।
বিছানার ওপর উপুড় হয়ে নিথর পড়ে আছে আয়াত, তার পিঠের কাপড় রক্তে একদম জবুথবু হয়ে লাল হয়ে গেছে। পাশে আইরা তীব্র যন্ত্রণায় চিৎকার করে কাঁদছে, আর তার ছোট্ট কচি বাহু থেকে গলগল করে তাজা রক্ত মেঝেতে গড়িয়ে পড়ছে। শান্ত আনায়াও রক্তের মাঝে শুয়ে ভয়ে কাঁপছে।
আরভান এক গগনবিদারী চিৎকার দিয়ে দিক-বিদিক জ্ঞান হারিয়ে বিছানার দিকে ছুটে গেল, “আয়াত!!! এই আয়াত, কী হয়েছে তোমাদের? কে..কে করেছে এসব? কে এসেছিল এখানে? এই আয়াত, কথা বলো! চোখ মেলো প্লিজ!”
সে পাগলের মতো আয়াতকে সোজা করার চেষ্টা করল, কিন্তু আয়াতের শরীর তখন নিথর। আরভান নিজের দুই হাত দিয়ে বাচ্চাদের আর আয়াতকে একসাথে বুকের মাঝে টেনে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করতে করতে ডুকরে কেঁদে উঠল। তার মুখ দিয়ে তখন আবলতাবল কথা বের হতে লাগল, সে পুরোপুরি উন্মাদ হয়ে গেছে। সে মাথায় হাত দিয়ে নিজের চুল খামচে ধরে চিৎকার করে বলতে লাগল— “না! না! এটা হতে পারে না! আমার আম্মাজানেরা… আমার আম্মাজানেরা… এদের গায়ে হাত তোলার সাহস কোন জানোয়ারের হলো? আয়াত, তুমি আমায় ফেলে যেতে পারো না! আমি তোমায় যেতে দেব না! কে এসেছিল এখানে? কোন কুলাঙ্গার আমার জান কেড়ে নিতে এসেছে? আমি তাকে জ্যান্ত কবর দেব! ফারহান! তাড়াতাড়ি আয়! আমার আয়াত কথা বলছে না কেন? ওরে কে আছিস, আমার আম্মাজাদের বাঁচা!”
আয়াত নিজের অর্ধনিমীলিত চোখ জোড়া কোনোমতে একটু মেলে আরভানের এই ভয়ঙ্কর উম্মাদ দশা আর কান্না দেখল। সে ঠোঁটের রক্ত মেখেই আরভানের উদ্দেশ্যে কিছু একটা বলার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করল, তার ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল, কিন্তু তীব্র যন্ত্রণায় তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। সে শুধু একজোড়া আকুল দৃষ্টিতে আরভানের দিকে তাকিয়ে রইল। আরভানের চোখ দিয়ে তখন অনবরত পানির ধারা নেমে আয়াতের গালে আছড়ে পড়ছে।
ফারহান আর ম্যানেজার রেহান সিদ্দিকী এক ছুটে ঘরের ভেতর আসতেই তাদের চোখের সামনে ভেসে উঠল আরও এক ভয়ঙ্কর দৃশ্য।
আরভান তখন পুরোপুরি উন্মাদের মতো আয়াত আর রক্তে ভেজা বাচ্চাদের বুকে জড়িয়ে ধরে পাগলের মতো চিৎকার করে কাঁদছে। তার এই ভয়াবহ রুদ্ররূপ আর বুক ফাটানো আর্তনাদ দেখে ম্যানেজার রেহানের বুকটাও কেঁপে উঠল।
রেহান সিদ্দিকী আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে সোজা আরভানের সামনে এসে বলল, “স্যার! এখন ভেঙে পড়লে চলবে না। ওদের শরীর থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছে। এখনই আমাদের ওদের হাসপাতালে নিতে হবে, স্যার।
চলবে….

