Home "ধারাবাহিক গল্প লাল শাড়ি লাল শাড়ি পর্ব-০৮

লাল শাড়ি পর্ব-০৮

0
335

#লাল_শাড়ি
#৮
#ফারহানা_ইসলাম

____ চোখের সামনে নিজের পরিবারকে এইভাবে শেষ হয়ে যেতে দেখতে পারছি না। তাই নিজেই একটা বড় সিদ্ধান্ত নিলাম।
এক রাতে সোহেল যখন বাসায় আসলো আমি আলমারির নিচের তাকে রাখা ছোট্ট কাপড়ের পুঁটলিটা বের করলাম।
বাক্স খুলতেই একে একে বেরিয়ে এলো আমার বিয়ের সময় আব্বার দেওয়া সোনার হার, কানের দুল, বালা , আর আংটি। আবার রয়েছে সোহেলের দেওয়া দুইটা চেইন আর একটা আংটি। একটা চেইন ছিলো যেটা ইভার যেইদিন জন্ম হলো সোহেল সেদিন ইভার গলায় পরিয়ে দিয়েছিল।

সোহেল অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
___ এসব কেন বের করছ?
আমি শান্ত গলায় বললাম,,,
___এগুলো আমার গায়ে থাকলে শুধু গয়না। কিন্তু আপনার হাতে গেলে এগুলো আমাদের সংসার বাঁচানোর শক্তি হবে।

সোহেল সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।
___ না। আমি তোমার গয়নায় হাত দিতে পারব না। এইসব তোমার আব্বার দেওয়া। এইগুলি স্পর্শ করার অধিকারও আমার নাই।

আমি মৃদু হেসে বললাম,
___ কী বলছেন এইসব। গয়না গায়ে থাকলে মানুষকে সুন্দর লাগে। কিন্তু স্বামীর মুখে দুশ্চিন্তা থাকলে সেই গয়নার কী কোনো দাম থাকে?

___ তাই বলে আমার জন্য তোমার সব দিয়ে দিবা?

___ বোকা বোকা কথা বলবেন না। সংসারে ‘আমার’ আর ‘আপনার’ বলে কিছু আছে? আপনার বিপদ মানেই তো আমার বিপদ।
এই মানুষগুলো ই তো আমার আপন। ওরা বিপদে পড়বে আর আমি গয়না পড়ে বসে থাকব। আপনি এতদিনে আমাকে এই চিনেছেন?

সোহেলের চোখ ভিজে উঠল। সে পুরো গয়না না নিয়ে একটা চেইন, আংটি আর একজোড়া দুল আমার হাতে দিয়ে বলল, এইগুলা তোমার কাছে থাক।
যদিও আমি প্রথমে নিতে চাই নি।

….. পরদিন সকালে মাসুদ ভাইজানসহ বাড়ির সবাই সবটা জানার পর সকলে অবাক হয়ে গেল।
মাসুদ ভাইজান নিঝুম ভাবীকে বললেন,,

__ নিঝুম নাজিয়া যেহেতু নিজের গয়না দিয়েছে, তুমিও তোমার কিছু গয়না দাও। তাহলে একটা কিছু করা যাবে!!

__ তুমি কী বললা? আমি আমার গয়না দেব!!

__ হ্যাঁ, দাও। এটা তো তোমারও সংসার।

__ কখনও না। আমি আমার গয়না দেব না। আমার গয়না দিলে যে তা ফেরত পাব এর কোনো নিশ্চয়তা তুমি দিতে পারবে?

__ কী বলছ এইসব?

__ আমি ঠিকই বলছি।

—- °°—-
কিন্তু ভাগ্য যেন তখনও আমাদের প্রতি সদয় হয়নি।

আমার গয়না বিক্রি করে যে টাকা ব্যবসায় দেওয়া হয়েছিল, তাতে সাময়িকভাবে কিছু কাজ হলেও লোকসান আর ঋণের বোঝা কমল না। বাজারের অবস্থা আরও খারাপ হতে লাগল। একের পর এক পাওনাদার টাকা চাইতে শুরু করল। দোকানে মাল থাকলেও বিক্রি হচ্ছিল না।

রাতের পর রাত সোহেল আর মাসুদ ভাইজান ঘুমাতে পারত না। হিসাবের খাতা খুলে বসে থাকত। কিন্তু যত হিসাব মিলাত, ততই লোকসানের অঙ্কটা বড় হয়ে উঠত।

এক রাতে সোহেলকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে আমার বুকটা কেঁপে উঠল।

আমি আস্তে করে জিজ্ঞেস করলাম,

___ কী হয়েছে?

সোহেল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

___ নাজিয়া, মনে হয় আর পারব না। তোমার গয়নাগুলোও ব্যবসাকে বাঁচাতে পারল না। এখন কী করব, কিছুই বুঝতে পারছি না।

সেদিন আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না। পরদিন সকালে বাড়িতে কল করে আব্বা-আম্মার কাছে সব খুলে বললাম। এতদিন তাদের কিছু জানাইনি। ভেবেছিলাম, নিজের কষ্ট নিজেই সামলে নেব। কিন্তু এবার আর লুকিয়ে রাখা সম্ভব হলো না।

আমার কথা শুনে আম্মার খুব চিন্তায় পড়ে গেল।তিনি আমাকে অনেক বকাবকি করলেন, এতদিন কেনো জানালাম না।
আর আব্বাও আমার উপর অনেক রাগ দেখালেন। তিনি বললেন বিয়ের পর বাবা মাকেও পর করে দিলি মা।

আমি বললাম আব্বা আমি আপনাদের চিন্তায় ফেলতে চাই নি।

তারপর তারপর তারা দুজনে বললেন,

___মা, তুই কোনো চিন্তা করিস না। আল্লাহ বড়। আমি বেঁচে থাকতে তোর সংসার ভাঙতে দেব না।

আব্বা বললেন আমি কয়েকদিনের মধ্যে আসছি।

আমি তাড়াতাড়ি বললাম,

___ আব্বা, আপনার কাছে টাকার জন্যে ফোন করিনি। শুধু মনটা খুব ভারী হয়ে গিয়েছিল। তাই সব বললাম।

আব্বা হেসে হেসে বললেন,

___ মারে, মেয়েরা কখনো বাবার কাছে ভিক্ষা চাইতে আসে না। বাবারা নিজেই মেয়েদের কষ্ট বুঝে যায়।

এরপর পুরো এক সপ্তাহ তাদের সাথে আর কোনো যোগাযোগ হলো না। তারা কী করছেন, কেউ জানত না।

ঠিক সাত দিন পর এক সকালে আব্বা আর বড় ভাইজান আমাদের শ্বশুরবাড়িতে এসে হাজির হলেন। তাঁর হাতে একটি কাপড়ে মোড়ানো বড় ব্যাগ।

বাড়ির সবাই অবাক হয়ে গেল।

আব্বা সবার সামনে ব্যাগটা মাসুদ ভাইজানের হাতে তুলে দিয়ে বললেন,

___ এখানে কিছু টাকা আছে। ব্যবসায় লাগাও। দেনা শোধ করো।

মাসুদ ভাইজান বিস্ময়ে বললেন,,,

___ মামা আপনি এত টাকা কোথায় পেলেন?

আব্বা শান্ত গলায় উত্তর দিলেন,,,

___আমার গ্রামের রাস্তার পাশের যে বড় জমিটা রয়েছে, তার অর্ধেক বিক্রি করে দিয়েছি। জমি আবার কেনা যায়, কিন্তু মানুষের সম্মান আর একটি ভাঙতে বসা সংসার সহজে ফিরিয়ে আনা যায় না বাবা।

আব্বার কথাটা শুনে পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

সোহেল দৌড়ে এসে আব্বার পা জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ল।

___ মামা, আমি আপনার এই ঋণ কোনোদিন শোধ করতে পারব না।

ফুফু আম্মা আব্বার হাত ধরে বললেন,,

… হাশেম তুই আমার সংসারের জন্যে এত কিছু করলি?

… কী বলেন আপা? আপনি আমার বড় বইন। সোহেল আর মাসুদ আমার নিজের ছেলের মত। আমি ওদের বিপদের দিনে পাশে না দাঁড়ালে কী রাস্তার মানুষ এসে দাঁড়াবে?

শশুর আব্বা বললেন,,
… হাশেম তুমি আমাকে তোমার কাছে ঋণী করে দিলে। কিন্তু আমি কথা দিচ্ছি তোমার এই ঋণ আমি শোধ করবই।

__ দুলাভাই, আপনি কিন্তু আমারে পর ই ভাবছেন এখনও।

__ না, হাশেম। আমি তোমাকে না আমার নাজিয়ে মাকে বিশেষ পুরস্কার দিব। শুধু এই সংকট কেটে যাক।

আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব দেখছিলাম। সেদিন বাবার প্রতি অনেক ভালোবাসা অনুভব করলাম। মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সব বাবাই যেন এমন ছায়া হয়ে সন্তানের পাশে দাঁড়াতে পারেন।

ব্যবসায় ধীরে ধীরে লাভের মুখ দেখতে শুরু করল সোহেল আর মাসুদ। প্রথমে ছোট ছোট অর্ডার, তারপর নতুন নতুন ক্রেতা। যেসব পাওনাদার একসময় টাকা নিয়ে চাপ দিচ্ছিল, তারাও ধীরে ধীরে সব টাকা পেয়ে গেল। কয়েক মাসের মধ্যেই ব্যবসা আবার আগের ছন্দে ফিরতে শুরু করল।

সোহেল দিন-রাত এক করে পরিশ্রম করত। মাসুদ ভাইজানও নিজের সর্বোচ্চটা দিতেন। আল্লাহর রহমতে তাদের পরিশ্রম বৃথা গেল না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসা আরও বড় হতে লাগল।

ফুফু আম্মা আর ফুফা সব সময় জায়নামাজে বসে নিজেদের সন্তানদের জন্য দোয়া করতেন। নফল নামাজ আদায় করতেন

একদিন সন্ধ্যায় সোহেল আমার হাতে একটি ছোট্ট বাক্স তুলে দিল।

আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,,,

___ এটা কী?

সোহেল মুচকি হেসে বলল,,,

___ খুলে দেখো।

বাক্স খুলতেই আমার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। ভেতরে ছিল নতুন সোনার হার, কানের দুল, বালা আর আংটি।

আমি অবাক হয়ে বললাম,,,

___ এগুলো কেন?

সোহেল আমার দিকে তাকিয়ে বলল,

___ তুমি যেইদিন তোমার সব গয়না আমার হাতে তুলে দিয়েছিলে, সেদিনই মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম—একদিন সব ফিরিয়ে দেব। কিন্তু শুধু ফিরিয়ে দিলে তো হবে না। তুমি যা দিয়েছিলে, তার দ্বিগুণ তোমার প্রাপ্য। তুমি আমাকে বিশ্বাস করেছ।

আমি চোখের পানি লুকিয়ে বললাম,

___ আমার গয়না তো সেই দিনই ফিরে পেয়েছি, যেদিন আপনার আর পরিবারের সবার মুখে আবার হাসি দেখেছি।

সোহেল মৃদু হেসে বলল,,,

___ তবুও এগুলো তোমার। তোমার ত্যাগের মূল্য কোনোদিন শোধ করতে পারব না।

আমি আর কিছু বলতে পারলাম না। শুধু আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করলাম।

এরপর সময় যেন আমাদের পক্ষে কথা বলতে শুরু করল। একটি দোকান থেকে দুটি, দুটি থেকে তিনটি, দেখতে দেখতে পাঁচটি দোকানের মালিক হয়ে গেল সোহেল আর মাসুদ ভাইজান। বাজারে নয় শুধু চারদিকে তাদের ব্যবসার সুনাম ছড়িয়ে পড়ল।

কিন্তু সুখ যেন কখনো একা একা আসে না, আবার দুঃখও কাউকে ছেড়ে কথা বলে না।

সবকিছু যখন সুন্দরভাবে চলছিল, ঠিক তখনই আমাদের সংসারের উপর আবারও নেমে এলো এক কালো ছায়া।

হঠাৎ একদিন শ্বশুর আব্বা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন।

চলবে