#লাল_শাড়ি
#৯
#ফারহানা_ইসলাম
…. শ্বশুর আব্বা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ার পর পুরো বাড়ির পরিবেশ মুহূর্তেই বদলে গেল।
যে মানুষটা ভোরবেলা উঠেই সবাইকে ডাকাডাকি করতেন, হাঁটাহাঁটি করতেন, আজ তিনি বিছানা থেকে উঠতেই পারছেন না। সারাক্ষণ জ্বর, শ্বাসকষ্ট আর বুকের তীব্র ব্যথায় ছটফট করছেন।
সোহেল আর মাসুদ ভাইজান তাড়াতাড়ি করে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে গেল।
সারাদিন আমি আর ফুফু আম্মা আল্লাহর কাছে শুধু দোয়া করলাম।
সন্ধ্যার দিকে তারা হাসপাতালে থেকে ফিরে এলো। সোহেল আর মাসুদ ভাইজানের মুখটা অদ্ভুত রকম ফ্যাকাশে।
আমি ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম,,,
___ কী বলছে ডাক্তার?
সোহেল কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,,,
___ নাজিয়া আব্বার হার্টে সমস্যা ধরা পড়ছে। ডাক্তার বলছে খুব সাবধানে রাখতে হবে। নিয়মিত চিকিৎসা আর বিশ্রাম দরকার।
কথাটা শুনেই ফুফু আম্মা চেয়ারে বসে পড়লেন।
চোখ বেয়ে নীরবে পানি গড়িয়ে পড়ছে।
তিনি শুধু বললেন,
___ হে আল্লাহ, উনার অসুখটা আমারে দিয়ে দাও। ওদের আব্বারে ভালো কইরা দাও।
আমি এগিয়ে গিয়ে ফুফু আম্মার হাত ধরে বসে রইলাম।
নিঝুম ভাবী বললেন,,,
মা, আপনি এত চিন্তা করবেন না। এত চিন্তা করলে তো আপনার শরীর আরও বেশি খারাপ হয়ে যাবে। ইনশাআল্লাহ বাবা ঠিক হয়ে যাবে।
সেদিন রাতের খাবার কারও গলায় নামল না। বড় ভাইজানের ছেলে নীল আর মেয়ে নোভা দুজনে দাদুর জন্যে কান্না করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ল। বাচ্চাগুলো অবধি কিচ্ছু খায়নি।
এদিকে ব্যবসার দায়িত্বও পুরোপুরি সোহেল আর মাসুদ ভাইজানের কাঁধে।
পরিবার, দোকান আর হাসপাতাল — দুই ভাই যেন নিজেদের কথা ভুলেই গেল।
কয়েকদিন পর শ্বশুর আব্বাকে বাসায় নিয়ে আসা হলো।
তিনি আগের মতো আর কথা বলতেন না। চুপচাপ বারান্দায় বসে থাকতেন। মাঝে মাঝে ইভাকে কোলে নিয়ে আদর করতেন, তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন। কিন্তু নীল আর নোভা জেদ ধরে বসে থাকত তারা দাদুর কাছ থেকে ভূতের গল্প শুনবে। তারা দুই ভাই বোন সবসময় দাদুর কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করত।
____ আব্বা একদিন আমাকে কাছে ডেকে বললেন,,,,
___ নাজিয়া মা!! এইদিকে আয়।
___ জি আব্বা।
___ আমার যদি কিছু হইয়া যায়, এই সংসারটা তুই আগলাইয়া রাখিস। আমার দুই পোলা অনেক ভালো। কিন্তু মানুষ যত বড় হয়, তত বড় পরীক্ষা আসে।
আমি কেঁদে ফেললাম।
___ আব্বা, আপনি এমন কথা কইয়েন না। আল্লাহ চাইলে আপনি একদম ভালো হয়ে যাবেন।
তিনি শুধু মুচকি হেসে আমার মাথায় হাত রাখলেন বললেন,,,
___ আল্লাহ চাইলে সব সম্ভব। আর তোরা দুই জা কখনও একে অপরকে শত্রু মনে করবি না। সবসময় নিঝুমকে বইন মনে করবি। ও একটু রাগী। কিন্তু দেখবি একদিন নিঝুম ও ধৈর্যশীল হয়ে যাবে।
শ্বশুর আব্বার শারীরিক অবস্থা দিন দিন আরও খারাপ হতে লাগল। দেশের নামকরা ডাক্তার দেখানো হলো, ওষুধ চলল, সবাই প্রাণপণ চেষ্টা করল। কিন্তু মৃত্যুকে আর থামানো গেল না।
মৃত্যুর ঠিক তিন দিন আগে তিনি একজন আইনজীবীকে বাড়িতে ডেকে পাঠালেন।
সবাই অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিল।
তিনি শান্ত গলায় বললেন,
আমি সুস্থ থাকতেই আমার শেষ দায়িত্বটা পালন করে যেতে চাই।
আইনজীবীর সামনে তিনি তাঁর সমস্ত সম্পত্তির অর্ধেক নাজিয়ার নামে লিখে দিলেন। শুধু তাই নয়, গ্রামের পৈতৃক বাড়িটাও নাজিয়ার নামে রেজিস্ট্রি করে দিলেন।
নিঝুম ভাবী যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না। তাঁর চোখ-মুখ রাগে বিকৃত হয়ে গেল। কিন্তু শ্বশুর আব্বার সামনে একটি কথাও বলার সাহস পেল না।
সব কাগজপত্রে স্বাক্ষর শেষ করে তিনি নাজিয়াকে কাছে ডাকলেন।
নাজিয়া কাঁদতে কাঁদতে তাঁর পাশে বসতেই তিনি মাথায় হাত রেখে বললেন,,,
মা, এই সম্পত্তি আমি তোকে দান করছি না। এটা তোর প্রাপ্য। এই সংসারকে নিজের সংসার মনে করে যেভাবে আগলে রেখেছিস, তার কোনো মূল্য টাকা দিয়ে হয় না। আজ আমি নিশ্চিন্ত মনে চোখ বন্ধ করতে পারব।
নাজিয়া এইবার কান্নায় ভেঙে পড়ে তাঁর হাত জড়িয়ে ধরে বলল,,,
আব্বা, আমার এইসব কিছু লাগবে না। আপনি শুধু সুস্থ হয়ে যান।
তিনি শুধু মৃদু হেসে বললেন,,,
মানুষের চাওয়া আর আল্লাহর ফয়সালা সবসময় এক হয় নারে মা।
—-
তিন দিন পর ফজরের আজানের কিছুক্ষণ আগে তিনি খুব জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছেলেন। ফুফু আম্মা ঘরের সবাইকে ডাক দিলেন।
উনার দুই ছেলে রুমে এসে উনার হাত পা মালিশ করতে লাগল। আমি আর ভাবী দোয়া পড়তে লাগলাম।
আমাদের কান্নাকাটিতে বাচ্চারাও উঠে কান্না শুরু করে দিল।
হঠাৎ করে আব্বা ফুফু আম্মার ডান হাতটা নিজের বুকের কাছে নিয়ে এসে ফুফু আম্মার দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ, মনে হচ্ছিল তিনি যেন নিজের সহধর্মিনিকে কিছু বলতে চাচ্ছেন। কিন্তু পারছেন না।
ফুফু আম্মার দিকে তাকিয়েই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।
এক মুহূর্তে পুরো বাড়িতে শোকের ছায়া নেমে এলো।
সোহেল আর মাসুদ ভাইজান ছোট শিশুর মতো কাঁদছিল। নাজিয়া যেন নিজের বাবাকেই হারিয়েছে। তাঁর জানাজায় অনেক মানুষ উপস্থিত হয়েছিল। সবাই বলছিল, এমন ন্যায়পরায়ণ মানুষ খুব কমই জন্মায়।
______∆______
শ্বশুর আব্বার মৃত্যুর ছয় মাস পর ফুফু আম্মাও হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
মৃত্যুর কয়েক দিন আগে তিনি নাজিয়াকে একা কাছে ডাকলেন।
নাজিয়া তাঁর হাত ধরে বসতেই তিনি দুর্বল কণ্ঠে বললেন,,,,
___ মা নাজিয়া, আমার কেনো জানি মনে হয় আমার সময় শেষ হয়ে আসছে। তোর কাছে আমার দুইটা কথা আছে।
নাজিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলল,,,
এমন কথা বলবেন না ফুফু আম্মা।
তিনি মৃদু হেসে বললেন,,,
…. আমার প্রথম কথা হলো _____
…. জীবনে যত ঝড়ই আসুক না কেন, তুই কোনোদিন সোহেলকে ছেড়ে যাইবি না। ও বাইরে থেকে শক্ত, কিন্তু ভেতরে খুব নরম। তুই ছাড়া ওকে আর কেউ বুঝবে না।
তিনি আবার একটু থেমে আবার বললেন,,,,
আর আমার দ্বিতীয় কথা হইলো _____
…. মাসুদকে সবসময় নিজের বড় ভাইয়ের সম্মান দিবি। আমার দুই ছেলে যেন কোনোদিন আলাদা না হয়। এই সংসার ভেঙে গেলে আমি যে ওপারেও শান্তি পাব না।
নাজিয়া চোখের পানি মুছতে মুছতে বলল,,,
“আমি কথা দিচ্ছি আম্মা। আপনার একটা কথাও অমান্য করব না।”
ফুফু আম্মা তৃপ্তির হাসি দিয়ে নাজিয়ার মাথায় হাত রাখলেন।
কয়েক দিন পর,,,
ফুফু আম্মা ফজরের নামাজ পড়ে মুখে একটু পান দিলেন। কিন্তু হঠাৎ করে তিনি বিছানায় শুয়ে পড়লেন। নোভা দাদির রুমে গিয়ে দেখল দাদী বিছানায় শুয়ে আছেন। নোভা চিৎকার করে সবাইকে ডাক দিল।
আমরা সবাই রুমে গিয়ে দেখি উনি বিছানায় পড়ে আছেন।
মাসুদ ভাইজান তড়িঘড়ি করে ডাক্তারকে কল করলেন।
কিছুক্ষণের মধ্যে ডাক্তার এসে ফুফু আম্মাকে স্যালাইন দিলেন।
কিন্তু স্যালাইন মাত্র দুই ফোঁটা শেষ হয়েছে। হঠাৎ আমার চাচী শাশুড়ি খেয়াল করলেন স্যালাইন আর চলছে না। তিনি মাসুদ ভাইজানকে বললেন,,
…. মাসুদ ভাবী আর নাই।
চাচীর কথা শুনে মাসুদ ভাইজান আর সোহেল চিৎকার করে উঠলেন।
দুই ভাই বিলাপ করে করে কান্না করতেছে। ভাবী আর আমিও একে অন্যকে ধরে কান্না করতেছি।
সোহেল আর মাসুদ ভাইজান কান্না করতে করতে বলতেছে,,,
__ মা, ও মা! তুমি কই চলে গেছ? আমার মা লাগবো তো। এক্ষুনি লাগবে। আমার প্রতি মুহূর্তে মা লাগবে।
ওদের দুই ভাইয়ের কান্না দেখে উপস্থিত কেউ চোখের পানি আটকাতে পারল না।
তিনিও (ফুফু আম্মা) পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে গেলেন।
এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে পরিবারের দুই অভিভাবককে হারিয়ে বাড়িটা যেন প্রাণহীন হয়ে গেল।
—
বর্তমানে,,,
আম্মার মুখে এতগুলো কথা শুনে ঘরের ভেতর যেন নিস্তব্ধতা নেমে এলো। মোমবাতির ক্ষীণ আলোয় দেখলাম, আম্মার চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু চিকচিক করছে। তিনি দ্রুত আঁচল দিয়ে চোখ মুছে নিলেন, যেন তিনি কাউকে নিজের দুর্বলতা দেখাতে চান না।
মাজেদা খালা অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন,,,
___ আপা, এমন স্বামীও শেষ পর্যন্ত বদলাইয়া যায়?
আম্মা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মৃদু হেসে বললেন,
___ মানুষ বদলায় না রে মাজেদা, সময় আর পরিস্থিতি মানুষকে বদলাইয়া দেয়। তবে সবাই না। কেউ কেউ আবার নিজের ইচ্ছাতেই বদলাইয়া যায়।
আমি মায়ের দিকে তাকিয়ে রইলাম। বুকের ভেতর কেমন একটা চাপা কষ্ট অনুভব করলাম।
যে মানুষটার কথা শুনে বড় হয়েছি, যে মানুষটা আমাদের আম্মাকে এত ভালোবাসত! আর আজ সেই মানুষটাই অন্য একজনকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে এসেছে!
মনে মনে শুধু একটা প্রশ্নই ঘুরপাক খেতে লাগল!!
আব্বা কেন এমন করলেন?
কোন পরিস্থিতি তাকে এতটা বদলে দিল?
চলবে

