#লাল_শাড়ি
#১৩
#ফারহানা_ইসলাম
___ হাজেরার পায়ের নিচে মেঝেতে রক্তের দাগ দেখে আমার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
আব্বা এক মুহূর্ত দেরি না করে হাজেরাকে ধরে গাড়ির দিকে নিয়ে গেলেন।
আম্মা, আমি আর ইভা আপুও পেছন পেছন ছুটলাম।
হাজেরার মা কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করছিলেন,
___আমার মাইয়ার কী হইবো গো! আমার নাতির কী হইবো!
হাজেরা কাঁপছিল।
বারবার শুধু বলছিল,,,
___আমার বাচ্চা! আমার বাচ্চাটারে বাঁচান।
আব্বা কোনো কথা বলছিলেন না।
তাঁর মুখটা এতটাই ভেঙে পড়েছিল যে আমি প্রথমবার বুঝতে পারলাম, মানুষ কখনও কখনও নিজের ভুলের শাস্তি পাওয়ার আগেই ভয়ের শাস্তি পেতে শুরু করে।
হাজেরাকে কোনোমতে নদীর ঘাট অবধি নিয়ে গিয়ে নৌকায় তোলা হলো।
—
হাসপাতালে পৌঁছানোর পর হাজেরাকে দ্রুত ভেতরে নিয়ে যাওয়া হলো।
আমরা সবাই বাইরে দাঁড়িয়ে রইলাম।
এক ঘণ্টা।
দুই ঘণ্টা।
সময় যেন কিছুতেই কাটছিল না।
হাজেরার মা একবার বসছেন, আবার উঠে দাঁড়াচ্ছেন।
___ ডাক্তার এত দেরি করতেছে ক্যান?
আব্বা চুপচাপ বসে ছিলেন।
আম্মা এক কোণে দাঁড়িয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলেন।
আমি আম্মার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম।
___ আম্মা।
তিনি আমার দিকে তাকালেন।
___কী রে মা? তোরা দুইজন আমার পেছন পেছন চলে আসলি কেনো? আমার মেয়েটা একা একা কী করছে জানি না।
___ আম্মা মাজেদা খালা আর মুন্নী আছেন তো।আচ্ছা আম্মা হাজেরা ভালো হয়ে যাবে তো?
আম্মা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,,,
___আল্লাহ যা করেন, ভালোর জন্যই করেন।
আমি জানতাম, আম্মা নিজেও উত্তরটা জানেন না।
তবুও তিনি আমাদের ভয় পেতে দিচ্ছেন না।
—
প্রায় তিন ঘণ্টা পর ডাক্তার বেরিয়ে এলেন।
সবাই একসঙ্গে তাঁর দিকে এগিয়ে গেল।
আব্বা উৎকণ্ঠিত গলায় বললেন,
___ ডাক্তার সাহেব, আমার স্ত্রী কেমন আছে? আমার ছেলে ঠিক আছে তো?
ডাক্তার কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,,,
___আপনারা রোগীর আত্মীয়?
___জি।
ডাক্তার গভীর শ্বাস নিয়ে বললেন,
___ রোগীর পেটে কোনো বাচ্চা নেই।
কথাটা শুনে সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল।
হাজেরার মা যেন কিছুই বুঝতে পারলেন না।
___ মানে?
ডাক্তার শান্ত গলায় বললেন,,,,
___আল্ট্রাসনোগ্রাম আর অন্যান্য পরীক্ষায় দেখা গেছে, রোগীর জরায়ুতে একটি বড় টিউমার রয়েছে।
আব্বার মুখ সাদা হয়ে গেল।
___ টিউমার?
___ জি। আর আরও কিছু পরীক্ষা করার পর আমরা নিশ্চিত হয়েছি, রোগীর জরায়ুতে ক্যান্সার হয়েছে।
মনে হলো, কথাগুলো শুনে হাসপাতালের করিডোরটা হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেছে।
হাজেরার মা একবার ডাক্তারের দিকে, একবার আব্বার দিকে তাকালেন।
তারপর হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন,,,,
___ না! এইডা মিথ্যা! আমার মাইয়া তো মা হইতে চলছিল!
ডাক্তার শান্ত গলায় বললেন,,,,
___ আপনার মেয়ে গর্ভবতী নন। পেটের টিউমারের কারণেই পেট বড় হচ্ছিল। অনেক সময় এমন হয় যে মানুষ ভুল করে গর্ভধারণ মনে করেন।
আব্বা যেন পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।
আমি আম্মার দিকে তাকালাম।
তাঁর মুখে কোনো আনন্দ নেই।
কোনো বিজয়ের হাসি নেই।
শুধু গভীর বিষাদ।
কারণ একজন মানুষ অসুস্থ।
আর অসুস্থ মানুষের কষ্টে আনন্দ পাওয়ার মতো এত ছোট মনের মানুষ আমার আম্মা নন।
—
কিছুক্ষণ পর ডাক্তার আবার বললেন,
___ রোগী এখন খুব দুর্বল। ক্যান্সার কতটা ছড়িয়েছে, সেটা জানতে আরও পরীক্ষা করতে হবে। তবে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা দরকার।
আব্বা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলেন,,,
___ ডাক্তার সাহেব, ও কি ভালো হবে?
ডাক্তার একটু থেমে বললেন,,,,
___ চিকিৎসা শুরু করলে আশা আছে। কিন্তু সময় নষ্ট করা যাবে না।
আব্বা মাথা নিচু করে ফেললেন।
আমি দেখলাম, তাঁর দুই হাত কাঁপছে।
হাজেরার মা তখনও কাঁদছেন।
কিন্তু হঠাৎ তাঁর চোখ আম্মার দিকে গেল।
সেই চোখে অদ্ভুত এক দৃষ্টি। যেন জমে আছে অনেকদিনের ক্ষোভ।
আমি বুঝতে পারলাম, ঝড় এখনও শেষ হয়নি।
—
রাতে হাজেরাকে কেবিনে নেওয়া হলো।
কিছুক্ষণ পর ডাক্তার আমাদের ভেতরে যেতে দিলেন।
হাজেরা বিছানায় শুয়ে ছিল।
মুখটা ফ্যাকাশে।
চোখ দুটো গভীর। চোখের নিচে কালি।
আমাদের দেখেই সে আম্মার দিকে তাকাল।
তারপর খুব আস্তে বলল,,,
___ আপা।
আম্মা থেমে গেলেন।
___ কী?
হাজেরার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
___ আমারে মাফ করেন আপা।
আম্মা চুপ করে রইলেন।
আব্বা হঠাৎ এগিয়ে এসে বললেন,,,
___ নাজিয়া!
আম্মা তাঁর দিকে তাকালেন।
আব্বার গলা কেঁপে উঠল।
___ আমিও তোমার কাছে ক্ষমা চাই।
আম্মা স্থির চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন।
___ কিসের জন্য?
আব্বা মাথা নিচু করলেন।
___ তোমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য। তোমার জীবনটা নষ্ট করার জন্য। ওদের তিন বোনের মাথার ওপর থেকে বাবার ছায়া সরিয়ে দেওয়ার জন্য।
আমার বুকটা হু হু করে উঠল।
আব্বা আবার বললেন,,,
___ আমি ভুল করছি নাজিয়া। অনেক বড় ভুল। আমি বংশধর চাইতে গিয়ে নিজের সন্তানদের ভুলে গেছিলাম।
আম্মার মুখ শক্ত হয়ে গেল।
হাজেরা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
___ আপা, আমি জানি আমি আপনার জায়গা নিতে পারব না। আমি জানি আমার জন্য আপনার সংসার ভাঙছে। কিন্তু আমি কখনও ভাবি নাই আমার জীবনটা এমন হয়ে যাবে।
আম্মা এবার খুব ধীরে বললেন,,,
___ তোমার অসুস্থতার জন্য আমি দুঃখিত।
হাজেরা চোখ তুলে তাকাল।
আম্মা বললেন,,,
___ কিন্তু তোমাদের আমি মাফ করতে পারব না।
ঘরের সবাই নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
আব্বা কাঁপা গলায় বললেন,
___ নাজিয়া!
___ না সোহেল। আমাকে আজ থামাবেন না।
আম্মার চোখে পানি জমে উঠল।
___ আমি তোমাকে ক্ষমা করতে পারছি না। কারণ তুমি শুধু আমার সংসার ভাঙো নাই। তুমি আমার সন্তানদের বুক ভেঙেছো। ওরা বাবাকে বেঁচে থেকেও হারিয়েছে।
আব্বা চোখ নামিয়ে ফেললেন।
আম্মা হাজেরার দিকে তাকিয়ে বললেন,,,
___আর তোমার জন্যও আমার মায়া হয়। তুমি অসুস্থ। তোমার জন্য আমি দোয়া করব। তোমার চিকিৎসায় যতটুকু পারি সাহায্য করব।
হাজেরা কাঁদতে কাঁদতে বলল,,,
___তাহলে আমাকে মাফ করবেন না?
আম্মা ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন।
___ না।
কথাটা খুব ছোট ছিল।
কিন্তু সেই একটা শব্দের ভেতর ছিল জমে থাকা অপমান, কান্না, একাকিত্ব আর ভাঙা বিশ্বাস।
—
হঠাৎ হাজেরার মা চিৎকার করে উঠলেন,,,
___ সব তোর জন্য হইছে!
আমরা সবাই তাঁর দিকে তাকালাম।
তিনি সরাসরি আম্মার দিকে আঙুল তুলে বললেন,,,
___ তুই আমার মাইয়ার সর্বনাশ করছিস!
আম্মা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন।
___ আমি?
___ হ! তুই কালাজাদু করছিস আমার মাইয়ার উপর!
আমি রাগে কাঁপতে লাগলাম।
___ আপনি কী বলছেন?
হাজেরার মা আরও জোরে চিৎকার করে বললেন,,,
___ তুই আমার মাইয়ার সুখ সহ্য করতে পারস নাই! তুই ওরে কালাজাদু করছিস। তাই ওর পেটে বাচ্চা নাই, টিউমার হইছে, ক্যান্সার হইছে!
ইভা আপু সামনে এগিয়ে গেল।
___ আপনি চুপ করবেন!
___ না আমি চুপ করমু না! আমার মাইয়ার জীবন শেষ কইরা দিছে এই বেডি!
আব্বা এবার কঠিন গলায় বললেন,,,,
___ আপনি নাজিয়াকে আর একটা কথাও বলবেন না।
হাজেরার মা চিৎকার করে বললেন,
___ তুমিও ওর পক্ষ নিচ্ছো?
___ কারণ আপনি অন্যায় কথা বলছেন।
___আমার মাইয়া অসুস্থ। আর তোমার আগের বউ ভালো আছে। এইটা কীভাবে হয়? নিশ্চয়ই কিছু করছে!
আম্মা এতক্ষণ চুপ ছিলেন।
হঠাৎ তিনি ধীরে ধীরে বললেন,,,
___ আপনার মেয়ে অসুস্থ হয়েছে। আমি দুঃখিত। কিন্তু এই অসুখের জন্য আমাকে দোষ দেওয়ার কোনো অধিকার আপনার নেই।
হাজেরার মা কিছু বললেন না।
আম্মা আবার বললেন,,,
___ আর কালাজাদু যদি এত সহজ হতো, তাহলে পৃথিবীতে কোনো হাসপাতালের দরকার হতো না।
সব নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
—
ঠিক সেই সময় আম্মার ফোন বেজে উঠল।
তিনি ফোনটা কানে ধরলেন।
___ হ্যালো?
ওপাশ থেকে বড় চাচীর কণ্ঠ ভেসে এলো।
___ নাজিয়া, আমরা কাল তোমাদের বাড়িতে আসতেছি।
আম্মা কিছুটা অবাক হয়ে বললেন,
___ আপনারা আসবেন ভাবী?
___ হ্যাঁ। নোভা মেয়েটার বিয়ে ঠিক হয়েছে।
কথাটা শুনে আম্মার মুখে দীর্ঘদিন পর সামান্য হাসি ফুটে উঠল।
___ সত্যি?
___ হ্যাঁ। তাই সবাই মিলে তোমাদের বাড়িতে কয়েকদিন থাকব। বিয়ের কিছু কাজও আছে। বিয়েটা গ্রামের বাড়িতেই হবে নোভার ইচ্ছে।
আম্মা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,,,
___ আচ্ছা ভাবী। আপনারা আসেন।
ফোন রাখার পর আব্বা আম্মার দিকে তাকালেন।
___ নাজিয়া!
আম্মা তাকালেন না।
আম্মা অন্যদিকে ফিরে ধীরে ধীরে বললেন,,,
___ বড় ভাইজান কাল আসতেছে। নোভার বিয়ে ঠিক হয়েছে।
আব্বা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর শুধু বললেন,,,
___ ভালো খবর।
আমি আর ইভা আপু একে অপরের দিকে তাকালাম।
হাসপাতালের এই অন্ধকার, হাজেরার অসুখ, আব্বার অনুতাপ আর আম্মার জমে থাকা অভিমান!!
সবকিছুর মাঝখানে হঠাৎ যেন নতুন এক খবর এসে দাঁড়াল।
নোভা আপুর বিয়ে।
চলবে

