Home "ধারাবাহিক গল্প লাল শাড়ি লাল শাড়ি পর্ব-১৫ এবং শেষ পর্ব

লাল শাড়ি পর্ব-১৫ এবং শেষ পর্ব

0
624

#লাল_শাড়ি( শেষ)
#১৫
#ফারহানা_ইসলাম

…. হাসপাতালের লোকটার কথা শুনে উঠানজুড়ে যেন নিস্তব্ধতা নেমে এল।

আব্বা অনেকক্ষণ রিপোর্টের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর হাত কাঁপছে।

বড় চাচা ধীরে রিপোর্টটা নিয়ে পড়লেন। তারপর গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,,,,

___ সোহেল, আর দেরি করা যাবে না। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বড় হাসপাতালে নিতে হবে।

আব্বা মাথা নাড়লেন।

___ আমি আজই ব্যবস্থা করছি ভাইয়া।

হাজেরার মা এতক্ষণ চুপ ছিলেন। হঠাৎ কান্নায় ভেঙে পড়লেন।

___ আমার মাইয়ারে বাঁচান। আমার মাইয়ারে কিছু হইতে দেওন না।

প্রথমবার তাঁর কণ্ঠে অহংকার ছিল না, ছিল শুধু একজন অসহায় মায়ের আর্তনাদ।

আম্মা ধীরে ধীরে তাঁর কাছে গিয়ে বললেন,,,

___ কান্না করলে হবে না। এখন সাহস রাখতে হবে। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হবেন না।

হাজেরার মা চোখ মুছতে মুছতে মাথা নাড়লেন।

সেদিন বিকেলেই আব্বা হাজেরাকে শহরের বড় হাসপাতালে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।

নীল ভাইয়া বললেন,,,

___ চাচা, আমি আপনার সঙ্গে যাব।

বড় চাচাও বললেন,,,

___ তুই একা সব সামলাতে পারবি না। আমিও চলি।

আব্বার চোখ ভিজে উঠল।

___ ভাইয়া, আমি আপনাদের অনেক কষ্ট দিছি।

বড় চাচা তাঁর কাঁধে হাত রেখে বললেন,,,,

___ ভুল মানুষই করে। কিন্তু ভুল বুঝে ঠিক পথে ফিরতে পারাটাই বড় কথা।

দূরে দাঁড়িয়ে আম্মা সব শুনছিলেন। তাঁর মুখে কোনো কথা নেই, শুধু নীরবতা।

এদিকে বাড়িতে নোভা আপুর গায়ে হলুদের প্রস্তুতি চলছে।

উঠানজুড়ে রঙিন কাগজ ঝোলানো হচ্ছে।

মুন্নী আর নিশা ফুল গাঁথতে গিয়ে নিজেরাই ফুলের মালা পরে হাসাহাসি করছে।

কিন্তু সেই হাসির মাঝেও একটা শূন্যতা রয়ে গেছে।

নোভা আপু আমার পাশে এসে বসল।

___ ইরা, মন খারাপ?

আমি মুচকি হেসে বললাম,

___ না।

নোভা আপু আমার হাতটা ধরে বলল,

___ ছোটবেলা থেকে তোকে চিনি। তুই কাঁদতে না পারলেও তোর চোখ সব বলে দেয়।

আমার চোখ ভিজে উঠল।

___ আপু, একটা বাড়িতে একসঙ্গে এত সুখ আর এত দুঃখ কেন আসে?

নোভা আপু আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,

___ হয়তো আল্লাহ মানুষকে পরীক্ষা করেন—সে সুখে কৃতজ্ঞ থাকে কিনা, আর দুঃখে ধৈর্য ধরে কিনা।

রাতে হাসপাতাল থেকে আব্বার ফোন এলো।

আম্মা ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে ক্লান্ত গলায় আব্বা বললেন,,,,

___ নাজিয়া, ডাক্তার কাল সকালেই আরও কিছু পরীক্ষা করবেন।

আম্মা শান্ত স্বরে বললেন,,,,

___ আল্লাহ ভরসা। সাহস রাখেন।

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর আব্বা বললেন,,,,

___ তুমি আমার জন্য দোয়া কইরো।

আম্মা কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে শুধু বললেন,

___ আমি সবসময় সবার জন্য দোয়া করি।

ফোন কেটে গেল।

আমি বুঝতে পারলাম, আব্বা আসলে নিজের জন্য নয় নিজের ভুলের ক্ষমা চাওয়ার শক্তির জন্য দোয়া চাইছেন।

পরদিন সকালে গায়ে হলুদের আয়োজন শুরু হলো।

গ্রামের মহিলারা একে একে আসতে লাগলেন।

উঠানে ঢোলের তালে গান আর হাসির শব্দ উঠল।

নোভা আপুকে হলুদ শাড়ি পরিয়ে মাঝখানে বসানো হলো।

ইভা আপু, আমি আর মুন্নী মিলে প্রথমে তাঁর গায়ে হলুদ মাখালাম।

নোভা আপু হেসে বলল,,,,

___ বেশি হলুদ দিস না কিন্তু!

মুন্নী দুষ্টুমি করে পুরো গালেই হলুদ মেখে দিল।

সবাই হেসে উঠল।

অনেকদিন পর আম্মার মুখেও একটুখানি হাসি ফুটল।

সেই হাসিটুকু দেখে আমার বুকটা ভরে গেল।

ঠিক তখনই,,

আঙিনার বাইরে একটা গাড়ি এসে থামল।

নীল ভাইয়া দ্রুত বাইরে গেলেন।

কয়েক মুহূর্ত পর তাঁর গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো,

___ চাচী হাসপাতাল থেকে লোক এসেছে।

হাসির শব্দ মুহূর্তেই থেমে গেল।

লোকটি ধীরে ধীরে ভেতরে এসে বললেন,,,

___ রোগীর অবস্থা হঠাৎ খারাপ হয়েছে। ডাক্তার সাহেব এখনই পরিবারের কাউকে হাসপাতালে যেতে বলেছেন।

আম্মার হাতে থাকা হলুদের থালাটা কেঁপে উঠল।

আব্বা হাসপাতালে একা।

আর এদিকে নোভা আপুর গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান মাঝপথে।

একদিকে জীবনের নতুন শুরু।

অন্যদিকে মৃত্যুর সঙ্গে এক কঠিন লড়াই।

দুই বিপরীত মুহূর্তের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমাদের পরিবার আবারও এক নতুন পরীক্ষার মুখোমুখি হলো।

…. হাসপাতালের করিডোরে সবাই উৎকণ্ঠিত হয়ে অপেক্ষা করছিল।

অপারেশন শেষ হওয়ার পরও অনেকক্ষণ কোনো খবর এলো না।

আব্বা করিডোরে মাথা নিচু করে বসে আছেন।

হঠাৎ অপারেশন থিয়েটারের দরজা খুলে ডাক্তার বেরিয়ে এলেন।

আব্বা দৌড়ে গিয়ে বললেন,,,

___ ডাক্তার সাহেব, আমার স্ত্রী কেমন আছে?

ডাক্তার গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

___ আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি।

আব্বার বুকটা ধক করে উঠল।

___ মানে?

___ অপারেশনের সময় বুঝতে পারি ক্যান্সার অনেক দূর ছড়িয়ে গেছে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং জটিলতার কারণে, আমরা রোগীকে আর বাঁচাতে পারিনি।

মুহূর্তের মধ্যে পুরো করিডোর নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

আব্বা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।

তারপর ধীরে ধীরে মাটিতে বসে পড়লেন।

___ না। এটা হতে পারে না।

হাজেরার মা চিৎকার করে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লেন।

___ আমার মাইয়া। আমার মাইয়ারে ফিরাইয়া দেন!

নীল ভাইয়া আর বড় চাচা তাঁকে সামলানোর চেষ্টা করলেন।

আম্মা চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন।

তাঁর চোখ বেয়ে নীরবে পানি গড়িয়ে পড়ছিল।

একজন মানুষের মৃত্যুতে তাঁর মনে কোনো প্রতিশোধ ছিল না, ছিল শুধু গভীর মায়া।

কিছুক্ষণ পর নার্স হাজেরার শেষ ব্যবহারের জিনিসপত্র এনে দিলেন।

একটি ওড়না একটি ক্লিপ আর একটি ছোট্ট কাগজ।

নার্স বললেন,,,

___ অপারেশনের আগে উনি এই কাগজটা লিখে স্বামীর হাতে দিতে বলেছিলেন।

আব্বা কাঁপা হাতে কাগজটা খুললেন।

লেখা ছিল,,,

সোহেল, আমি যদি আর বেঁচে না থাকি, নাজিয়া আপা আর তিনটা মেয়ের যত্ন নিয়েন। আমার জন্য ওদের আর কষ্ট পাইতে দিয়েন না। আপারে বলবেন, উনি যদি কোনোদিন না-ও মাফ করেন, তবুও আমি তাঁর জন্য দোয়া করব।

চিঠিটা পড়ে আব্বা আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না।

তিনি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন।

পরদিন সকালেই হাজেরার জানাজা সম্পন্ন হলো।

গ্রামের অসংখ্য মানুষ উপস্থিত হয়েছিল।

দাফন শেষে বাড়ি ফিরে পুরো বাড়িটা আবার শোকে স্তব্ধ হয়ে গেল।

হাজেরার মা এক কোণে বসে নির্বাক।

কাঁদার শক্তিটুকুও যেন হারিয়ে ফেলেছেন।

আম্মা নিজ হাতে তাঁর সামনে এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিলেন।

তিনি কিছু না বলে পানিটা হাতে নিলেন।

প্রথমবার তাঁর চোখে নাজিয়ার প্রতি ঘৃণার বদলে অসহায়ত্ব দেখা গেল।

কিন্তু জীবন থেমে থাকে না।

দুই দিন পরই ছিল নোভা আপুর বিয়ে।

অনেক আলোচনা শেষে বড়রা সিদ্ধান্ত নিলেন, নোভা আর তাঁর পাত্রপক্ষের ভবিষ্যতের কথা ভেবে বিয়ে নির্ধারিত দিনেই হবে।

তবে সব আয়োজন হবে খুবই সাদামাটা।

কোনো উচ্চস্বরে গান বাজবে না।

শুধু প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা।

বিয়ের দিন নোভা আপুকে লাল শাড়িতে দেখে আমার চোখ ভিজে উঠল।

মনে হচ্ছিল, একদিকে নতুন জীবনের শুরু।

অন্যদিকে একটি জীবনের সমাপ্তি।

কাবিনের সময় নোভা আপু মাথা নিচু করে কবুল বলতেই চারদিকে আলহামদুলিল্লাহ ধ্বনি উঠল।

বড় চাচী মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন।

আম্মার চোখেও অশ্রু।

আব্বা দূরে দাঁড়িয়ে সব দেখছিলেন।

মেয়ের মতো স্নেহের ভাতিজির বিয়ের আনন্দেও তাঁর চোখে আজ শুধু অনুতাপ।

বিদায়ের সময় নোভা আপু আম্মাকে জড়িয়ে ধরে বলল,,,

___ চাচী, নিজের খেয়াল রাখবেন।

তারপর আমার আর ইভা আপুর দিকে তাকিয়ে বলল,

___ তোরা দুজন কখনো আম্মাকে একা ছেড়ে যাস না।

গাড়ি ধীরে ধীরে উঠান ছেড়ে চলে গেল।

আমি অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলাম।

একই সপ্তাহে আমাদের বাড়ি দেখল,,

একটি মৃত্যু।

আর একটি নতুন সংসারের শুরু।

কিন্তু আমি জানতাম, ঝড় এখনও পুরোপুরি থামেনি।

কারণ হাজেরার মৃত্যুর পর আব্বাকে এখন এমন একটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যা আমাদের পুরো পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলে দেবে।

কয়েক বছর পর…

সময় অনেক কিছু বদলে দিয়েছে।

বাড়ির উঠোনে আগের মতো আর কান্নার শব্দ শোনা যায় না। এখন সেখানে বিকেলে শিশুদের হাসির শব্দ ভেসে আসে। একসময় যে বাড়িটা দুঃখে ভারী হয়ে থাকত, আজ সেখানে শান্তির ছোঁয়া।

নাজিয়া এখনও আগের মতোই শান্ত।

সোহেলের সঙ্গে প্রয়োজন ছাড়া কোনো কথাই বলে না। একই বাড়িতে থেকেও দু’জনের মাঝখানে একটা অদৃশ্য দূরত্ব রয়ে গেছে। সোহেল আর কখনো সেই দূরত্ব জোর করে কমানোর চেষ্টা করেনি। কারণ সে বুঝে গেছে ভালোবাসা জোর করে পাওয়া যায় না, আর ভাঙা বিশ্বাস জোড়া লাগাতে কখনো কখনো একটা জীবনও কম পড়ে যায়।

তবে নিজের দায়িত্ব থেকে সে একদিনও পিছিয়ে যায়নি।

হাজেরার ছোট্ট মেয়েটা এখন স্কুলে পড়ে। প্রতিদিন তাকে নিজের মেয়ের মতো করে স্কুলে পৌঁছে দেয়, পড়াশোনার খোঁজ রাখে। হাজেরার বৃদ্ধ মাও এখন সোহেলকে নিজের ছেলের মতোই ডাকেন।

নাজিয়া দূর থেকে সব দেখে।

তার চোখে আর রাগ নেই, অভিযোগও নেই।

শুধু একরাশ নীরবতা।

ইভা এখন অনার্সে পড়ছে।

কলেজে ঢোকার সময় গেটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পরিচিত মুখটা এখনও তার জন্য অপেক্ষা করে।

অনিম।

আজও ইভাকে দেখলে সেই আগের মতোই মিষ্টি করে হাসে।

একদিন ইভা নিজেই সামনে গিয়ে বলল,,,

এতদিন ধরে শুধু হাসছেন কেন?

অনিম হেসে উত্তর দিল,

কারণ আমি জানতাম, একদিন না একদিন তুমি নিজেই এসে এই প্রশ্নটা করবে।

ইভা লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল।

সেদিন থেকেই হয়তো তাদের গল্পের নতুন অধ্যায় শুরু হলো।

ইরা উচ্চমাধ্যমিকে উঠেছে।

নিশাও অনেক বড় হয়ে গেছে। এখন সে বুঝতে পারে, মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় সম্পদ টাকা নয় বিশ্বাস, সম্মান আর ভালোবাসা।

সন্ধ্যায় নাজিয়া আবার সেই পুরোনো লাল শাড়িটা বের করল।

জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আকাশের লাল আভা দেখছিল।

তার ঠোঁটে একটুখানি হাসি ফুটে উঠল।

সে মনে মনে বলল,,,

সব গল্পের শেষ সুখে হয় না। কিন্তু প্রতিটি গল্প মানুষকে কিছু না কিছু শিখিয়ে যায়। আমার জীবনের শিক্ষক ছিল এই লাল শাড়ি।

দূরে মসজিদ থেকে মাগরিবের আজান ভেসে এলো।

নাজিয়া আলতো করে লাল শাড়িটা আবার ভাঁজ করে আলমারিতে রেখে দিল।

কিন্তু তার জীবনের গল্প সেটা থেকে গেল হাজারো পাঠকের হৃদয়ে।

সমাপ্ত