#ক্লান্তিহীন_তুই_আমার_ফরিয়াদ
#পর্বঃ১৩
#সুমাইয়া_জান্নাত_ইলমা
সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই সানজিদাকে পার্লারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে আজ তাদের ওয়ালিমা। ইমরান আগে থেকেই কনভেনশন সেন্টারে উপস্থিত। সে দাড়িয়ে থেকে উপস্থিত আত্মীয়দের স্বাগত জানিয়ে আলাপ করছে আর ক্যাটারারদের সঠিক ভাবে খাবার পরিবেশনের নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছে। আসিফও তার সাথে সাহায্য করছে। তখন সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ করলো সানজিদা, ইশাত আর আদিবা তাদের পেছনেই রয়েছে আসিয়া বেগম। তিনি ধীরে সুস্থে আসছেন।
সানজিদা আজ খয়েরী রঙের জামদানি শাড়ি পড়েছে। সাথে কনট্রাস্ট করে সোনালী রঙের হিজাব আর উপরে কাজ করা সোনালী দুপাট্টা সেট করে দেওয়া হয়েছে। হিজাবের উপর হালকা পাতলা গহনা সেট করে পরিয়ে দেওয়া হয়েছে তাকে পার্লার থেকে। তার হাত ভর্তি চুড়ি। সাথে পরিমিত একটা সাজ দেওয়া হয়েছে। ইমরান নিজেই আগে থেকে জানিয়ে দিয়েছিল অতিরিক্ত সাজ না দিতে। তার আবার মাত্রাতিরিক্ত সাজ পছন্দ না। ইমরান তার সাথে মিলিয়ে মারুন কালারের স্যুট সেট পড়েছে। ইমরানকে দেখা মাত্র সানজিদা মুখ চেপে লজ্জা নিয়ে হালকা হাসলো। ইমরানও প্রত্যুত্তরে তাকে স্মিথ হাসি উপহার দিলো।
সানজিদাকে স্টেজে গিয়ে বসানো হলে আসিফও ইমরানকে পাঠিয়ে দিলো স্টেজে গিয়ে বসতে বাকিটা সে সামলাবে বলে আশ্বস্ত করলো। ওদিকে ইশাত আজ অনেকটা চুপচাপ। সে আজ অলিভ কালারের একটা লং হাতা পাকিস্থানি থ্রি পিস সাথে নুড কালারের হিজাব পড়েছে। আদিবা বারবার তাকে খুঁচিয়ে যাচ্ছে। তবুও ইশাত তেমন কিছুই বলছে না। তার আসিফের সাথে একটু কথা বলা দরকার। সেই ভেবে সে আসিফকে ম্যাসেজ করতে ফোন হাতে তুলল।
অকস্মাৎ তখন হলের বাহিরে একনাগাড়ে সারি সারি কয়েকটা কালো গাড়ি এসে থামলো। দ্রুততার সাথে গাড়ি থেকে বেড়িয়ে এলো কিছু কালো পোশাকধারী গার্ডস। তাদের একেকটা পদচালনা এতটাই ক্ষিপ্র আর সুনিপুণ যে দেখে মনে হবে তারা বিশেষ কোনো সংগঠনের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত লোক। দুজন গার্ডস সামনের গাড়িটির দরজা খুলে মেলে ধরতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো এভিয়ান। পাশাপাশি সিয়াম বেড়িয়ে এসে তার কালো কোটটা মেলে ধরতেই সে অনায়াসে সেটা পড়ে নিলো। চোখে রোদচশমা আর কালো ফরমাল স্যুট পরিহিত পুরুষটিকে দেখে উপস্থিত সকলের মনোযোগ ক্ষুণ্ন হলো।
এভিয়ান সামনে দৃষ্টিপাত করে অভিজাত ভঙ্গিতে মেরুদন্ড সোজা রেখে সম্মুখে হাটা ধরলো। তার প্রত্যেকটা ভারী পদক্ষেপের সাথে প্রকাশ পাচ্ছে কাঁধের দোলাচল। অভিব্যক্তিতে দৃঢ়তা এবং গাম্ভীর্যের সংমিশ্রণ। সাথেই তাল মিলিয়ে সিয়ামও এগিয়ে যাচ্ছে। পেছনেই গার্ডসরা গাড়ির ট্রাঙ্ক থেকে একেক করে র্যাপিং পেপারে মোড়ানো বক্স বের করে হাতে হাতে নিয়ে আসছে।
হলের ভেতরে ইশাতের সাথে কথা বলতে বলতে আদিবা হঠাৎ লক্ষ্য করলো সদর দরজা দিয়ে দলবদ্ধভাবে প্রবেশ করা লম্বা লম্বা কিছু লোকের অস্তিত্ব। ইশাত বিপরীতমুখী হয়ে দাড়িয়ে থাকাতে এতসব কিছু লক্ষ্য করলো না। তার মনোযোগ আপাতত আসিফকে ম্যাসেজ করায়। অন্যদিকে আদিবা তাদের দেখে অবাক হলো সাথে আরো বেশি বিমোহিত হলো নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে আভিজাত্য আর গাম্ভীর্যের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ ধরে রেখে এগিয়ে আসা পুরুষটিকে দেখে। তার প্রত্যেকটা অঙ্গভঙ্গি আর দৃঢ়তা জানান দিচ্ছে সবার মাঝে উচ্চবাচ্য না করেও তার অতুলনীয় উপস্থিতি। তাকে দেখা মাত্র আশেপাশের যুবতী মেয়েগুলো কেমন উঁকিঝুঁকি দিয়ে যাচ্ছে কৌতূহলী চোখে। তখন আদিবা ইশাতের এক হাত ঝাকিয়ে বলল।
— দেখ দেখ ইশাত ছেলেটা কি সুন্দর রে। আমি আমার পুরো জীবনে এতো সুন্দর ছেলে দেখি নি। পুরো বিদেশীদের মতো। ঐযে টিভিতে দেখি না উচু, লম্বা,হ্যান্ডসাম বিদেশী নায়কদের ঠিক সেই রকম।
আদিবার কথায় ইশাত নিজ কাজে অবিচল থেকে কপাল কুঁচকে বলল।
— তোর জীবনই বা কতটুকু, নিজের নজর সংযত কর আদিবা। তোর না বিয়ে হলো কিছুদিন আগে।
— ধুর বিয়ে করলে কি সুন্দর সুন্দর ছেলেদের দিকে তাকানো যায় না নাকি?…
ইশাত বিস্মিত হয়ে বলল।
— আস্তাগফিরুল্লাহ, তুই কি জেনে শুনে জিনার গুনাহ কামাতে চাচ্ছিস? তুই কি তোর স্বামীকে ভালবাসিস না?
আদিবা মুখটা ছোট করে বলল।
— শুধু একটু ক্রাশই তো খেলাম বেশি কিছু তো আর করি নি। তুই নিজেই একবার তাকিয়ে দেখ ছেলেটাকে। তুইও ক্রাশ খাবি।
ইশাত দুশ্চিন্তার মাঝেও হেসে বলল।
— একটা কথা কি জানিস? মিস্টার গোল্ডেনকে দেখার পর থেকে দুনিয়ার কোনো ছেলেকেই আমার আর চোখে ধরবে না। সে চাই যতই রাজপুত্রের মতো হোক না কেন।
আদিবা মুখ বাঁকিয়ে ভেংচি কেটে বলল।
— এই বয়সে এমন দুই একটা ক্রাশ সবারই থাকে। আমি সিওর তুইও ক্রাশই খেয়েছিলি তার উপর।
ইশাত আদিবার কথা অগ্রাহ্য করে বলল।
— মিস্টার গোল্ডেন আমার ক্রাশ নয় আদিবা।
— কিভাবে বুঝলি সে তোর ক্রাশ না? দেখবি সময় তোকে সব ভুলিয়ে দিবে। একটা সময় তুই আর তাকে মনে রাখবি না।
— ভুলে গেছিস তুই আমাকে সেদিন কি বলেছিলি?
— না তো মনে নেই, কি বলেছিলাম?
— তুই আমাকে বুঝিয়েছিলি জীবনে যখন দমকা হাওয়ার মত সেই মানুষটার আগমন ঘটবে যাকে দেখে হৃদয়ে ব্যাকুলতার সৃষ্টি হবে তখন আর চাইলেও নিজের মনের অনুভূতি দমিয়ে রাখতে পারব না। আসলেই পারি নি। তুই ঠিক বলেছিস ক্রাশ সহজেই ভোলা যায় কিন্তু ভালোবাসা ভোলা যায় না।
— হ্যা সেটা তো বলেছিলাম। কিন্তু…..
আদিবা বাকি কথা শেষ করার আগেই পেছন থেকে আসিফের গলার আওয়াজ এলো।
— বল ইশাত, কেন ডেকেছ আমায়?
____________________
ইমরান স্টেজের কাছাকাছি দাড়িয়ে পরিচিত ব্যক্তিদের সাথে কথা বলছিল তখন হঠাৎ একটা গম্ভীর পুরুষালী কন্ঠ কানে এসে লাগতেই সে পেছনে ঘুরে তাকিয়ে এভিয়ানকে দেখে তাজ্জব বনে গেলো। দুজন মুখোমুখি হতেই ইমরানের মুখের হাসি মিলিয়ে গেলো। এভিয়ানের মুখে তখন স্বতঃস্ফূর্ত হাসি দেখা গেল। সিয়াম বুকে হাত বেঁধে তার বসের পাশেই অটল ভঙ্গিতে দাড়িয়ে। আশেপাশের মানুষজন সরে যেতেই এভিয়ান ইমরানের সাথে করমর্দনের জন্য তার ডান হাত এগিয়ে ধরে বলল।
— কংগ্রাচুলেশন মিস্টার ইমরান হাসান।
ইমরান লক্ষ্য করলো এভিয়ানের পেছনে তার সারিসারি গার্ডসরা যান্ত্রিক মেসিনের মতো হাতে অনেকগুলো গিফট বক্স নিয়ে দাড়িয়ে। সে কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থাতেই চাপা রাগ নিয়ে জানতে চাইলো।
— মিস্টার জারিয়াথ, আপনি এখানে? আমি তো আপনাকে ইনভাইট করি নি। আর এসব কি?
উত্তরে এভিয়ান তার বাড়িয়ে ধরা হাত ফিরিয়ে নিয়ে পেন্টের পকেটে গুঁজে নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল।
— আ স্মল গিফট ফর ইউ। আর ইনভাইট করেন নি বলেই তো জরুরি কাজ ফেলে সোজা চলে এলাম আপনার শুভ দিনের অংশীদার হতে। ভাবলাম আপনি যতটা পরিশ্রম দিয়ে আমার পিছনে লেগেছেন সেই ক্ষেত্রে আমারও তো কিছু দায়িত্ব রয়েছে আপনার প্রতি। বাই দ্যা ওয়ে গিফট কোথায় রিসিভ করা হচ্ছে?
ইমরান সাফসাফ নাকচ করে বলল।
— কোথাও কোনো গিফট রিসিভ করা হচ্ছে না। দয়া করে এগুলো ফিরিয়ে নিয়ে যান তাহলে উপকৃত হব।
— টেক ইট অর থ্রো ইট আওয়ে। ইটস আপ টু ইউ।
— কি করতে চাইছেন? আপনাকে যতটা জানি আপনি নিশ্চই কোন উদ্দেশ্য ব্যতীত আসেন নি এখানে তাই না? নিশ্চই কোন স্বার্থে এসেছেন!
এভিয়ান বিদ্রূপ হেসে বলল।
— ইমপ্রেসিভ! আপনার বুকের পাটা বেশ বড়। তবে কতটা বড় সেটাই মাপতে এলাম। আর বড় না হলে কি কোনো সাধারণ অফিসারের ক্ষেত্রে আমার বিরুদ্ধে একশন নেওয়া সম্ভব ছিল?
ইমরান তাচ্ছিল্য হেসে বলল।
— আপনি আমার সাহসের কিছুই দেখেন নি এখনো পর্যন্ত। সবে মাত্র তো শুরু। এবার বলুন কোন উদ্দেশ্য সাধন করতে আপনার অশুভ কদম ফেললেন আমার এই শুভ দিনে?
এভিয়ান হাসি মুখে ঠান্ডা মাথায় কৌশলে হুমকি দিয়ে জানালো।
— ইউ হ্যাভ আ শার্প মাইন্ড। একদম ঠিক ধরেছেন। বলতে পারেন ছোটখাটো একটা ওয়ার্নিং দিতে এসেছি। এইযে আমার পেছনে যে আপনার অফিসারদের লাগিয়ে রেখেছেন এতে কিন্তু আপনারই লস। আপনি তো জানেনই আমি মানুষটা ভালো নই। এমনও তো হতে পারে নিজের ভুলের মাশুল দিতে গিয়ে জীবনের মূল্যবান কাউকে হারিয়ে বসলেন। তাই আগে থেকেই সাবধান করতে এলাম। বিষয়টা মাথায় রাখবেন।
শেষের কথাটা এভিয়ান চোয়াল শক্ত করে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল। এভিয়ানের এমন কৌশলে দেওয়া হুমকিতে রাগে ইমরানের চোখ লাল হয়ে এলো সে পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে বলল।
— মূল্যবান কেউ মানে? আপনি কার কথা বলছেন?
এভিয়ান ফিরে যেতে নিয়ে বলল।
— সেটা আপনি ঠিক করুন হারিয়ে বুঝতে চান নাকি সময় থাকতেই! আসি তবে এন্ড ইয়াহ্! এগেইন কংগ্রাচুলেশন।
ইমরান সাথে সাথে প্রত্যুত্তর করলো।
— যা ইচ্ছা করুন, যত জোড় লাগানোর লাগিয়ে দিন আমি এক চুলও টলব না। এসব তুচ্ছ হুমকিতে অন্যায় মেনে নেব না। ইনসাফের জন্য লড়ে যাবো। এতে জীবন চলে গেলেও দুবার ভাববো না।
এভিয়ান প্রত্যুত্তরে পেছনে না ফিরেই নিঃশব্দে বাকা হাসলো। গার্ডসদের আঙ্গুলের ইশারা করতেই তারা গিফট বক্সগুলো পাশের এক টেবিলে রেখে এভিয়ানকে অনুসরণ করে বেরিয়ে গেল। ইমরান স্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে রইলো।
ওদিকে আসিফ আর ইশাতের কথাকাটাকাটি চলছে। আদিবা পাশেই দাড়িয়ে ব্যাপারটা সাম্ভাল দিচ্ছে। ইশাত আসিফকে ডেকেছিল বুঝিয়ে বলার জন্য যেন আসিফ তাকে সাহায্য করে তাদের মায়েদের তার আর আসিফের বিয়ে নিয়ে সিদ্ধান্ত বদলানোর জন্য। কিন্তু আসিফ সেখানে দ্বিমত করে বলল।
— আমি আমার মায়ের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যেতে পারবো না ইশাত।
ইশাতও রেগে গিয়ে বলল।
— এমন তো না যে আপনি আমার মত জানতেন না? তাহলে কিভাবে তাদের কথা এগোতে দিলেন? আপনার সামনেই তো তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আমি তো ছিলাম না সেখানে। এখনো সময় আছে দয়া করে তাদের বুঝিয়ে বিয়েটা আটকান। আমার বিশ্বাস তারা আমাদের দুজনের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে কিছুই করবেন না।
আসিফ ইশাতের অনুরোধ অগ্রাহ্য করে বলল।
— দুঃখিত ইশাত আমার এতে কিছুই করার নেই।
ইশাতের চোখ এবার অশ্রুতে ভরে এলো।
— তাহলে কি আপনি বলতে চাইছেন আমার মতের বিরুদ্ধে গিয়ে আমাকে জোর করে বিয়ে করবেন?
আসিফ নির্বিকার রইলো। ইশাতের রাগ এতে আরেক ধাপ বেড়ে গেলো সে বুঝলো আসিফকে বলে লাভ নেই সে নিজেই চাচ্ছে যেন বিয়েটা হোক এতে ইশাতের ইচ্ছে থাকুক আর নাই থাকুক সেটার ধার সে ধারে না। ইশাত আশাহত হয়ে ঘুরে সেখান থেকে যেতে নিলে মুহূর্তেই ঘটে গেলো এক অপ্রীতিকর ঘটনা সে তার দুপাট্টায় টান অনুভব করলো। বিষয়টা অনুভূত হতেই ইশাত না ফিরেই ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলল।
“আসিফ আপনার সাহস কি করে হলো এমনটা করার?দুপাট্টা ছাড়ুন বলছি।”
কয়েক মুহূর্ত কেটে গেলো কিন্তু ইশাত কোনো পরিবর্তন উপলব্ধি করলো না ফলস্বরূপ পেছনে ফিরে তাকাতেই সে থমকে গেলো। তার সম্মুখে থাকা গভীর সমুদ্রের মতো চোখের অতলে হারিয়ে গেলো তার হৃদয়। ঢেউয়ের মাতাল দোলায় স্তব্ধ হলো সময়, হৃদয়ের গতিবেগ হারালো।
এভিয়ান তার সেই সোনালী গভীর চোখে তাকিয়ে আছে ইশাতের দিকে। যেন আকাশের বুক চিরে সূর্য ডোবে ওই সোনালী চোখে। এই প্রথমবারের মতো ইশাত তার মিস্টার গোল্ডেনকে এতটা কাছ থেকে দেখছে। কাছ থেকে লোকটা আরো বেশি মোহনীয়। ইশাত নিজের অবাধ্য মন সামলে দৃষ্টি নামিয়ে তাকাতেই দেখলো তার দুপাট্টা এতক্ষন এভিয়ানের হাতের ঘড়িতে আটকে ছিল। সে তাড়াহুড়োতে হাসফাস করতে করতে সেটা টানাটানি করতে গেলে বিরক্তিতে এভিয়ানের কপালে কয়েকভাঁজ পড়লো।
সে চোখে মুখে বিরক্তি নিয়ে তার ঘড়ি থেকে দুপাট্টা ছাড়াতে গিয়ে দেখলো কাপড়ের সূক্ষ্ম সুতো ঘড়ির চেইনে বাজে ভাবে আটকে গেছে। সাথে সাথে সে অধৈর্য হয়ে শক্তপোক্ত হাতের টানে ঘড়ির চেইন ভেঙে ফেললো। তখন ইশাতের দুপাট্টার সাথে সেই চেইনও ছুটে এলো। এভিয়ান আর এক মুহূর্তও সেখানে দাড়ালো না পকেটে হাত গুজে নিজের মতো করে জায়গা ত্যাগ করলো। বসের পেছনে পেছনে ছুটলো সিয়ামসহ বেশ কয়েকজন গার্ডস। তাদের যাওয়ার পর আবহ হালকা হলো।
আসিফ পাশেই দাড়িয়ে এতক্ষন সব লক্ষ্য করছিল। লোকটার দিকে ইশাতের ভিন্ন চাহনি দেখে রাগে তার হাত আপনা আপনি মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেল। সে তীক্ষ্ম নজরে এভিয়ানের দিকে তাকিয়ে ছিল এতক্ষন। আদিবা তখন ইশাতের হাত টেনে তাকে সাইডে নিয়ে বলল।
— কিরে তুই না বললি মিস্টার গোল্ডেনকে ছাড়া অন্য কোনো ছেলের দিকে তুই তাকাস না। তাহলে ওনার দিকে যে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে ছিলি? আমি বলেছিলাম না ক্রাশ খাবি। লোকটা সুন্দর আছে।
ইশাত তখন বিজয়ের হাসি নিয়ে বলল।
— উনিই আমার মিস্টার গোল্ডেন।
আদিবা যেনো ঝটকা খেলো। সে ইশাতের কথায় অবিশ্বাস নিয়ে বলল।
— পাগল হয়ে গেলি নাকি? যাকে দেখিস তাকেই এখন তোর মিস্টার গোল্ডেন মনে হচ্ছে?
— সত্যি বিশ্বাস কর উনিই সেই ব্যক্তি।
এবারে আদিবা মুখে হাত রেখে উত্তেজনা দমিয়ে বলল।
— সত্যি? আমার অনেক ইচ্ছা ছিল তোর মিস্টার গোল্ডেনকে দেখার ভাবি নি এতো জলদি তা পূরণ হবে।
ইশাত খুশিতে মাথা দোলালো বলল।
— এই নিয়ে তিনবার হলো তাকে দেখলাম।
— তোর চয়েস দেখে বলতেই হয় দারুন। তাকে পেলে তুই জিতবি রে দোস্ত।
— তুই যেমনটা ভাবছিস তেমনটা নয়। আমি ওনার বাহিক্য দেখে নয় বরং তার ভেতরটা দেখে তার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছি।তার অন্যের প্রতি সদয় ব্যবহার আমাকে আকৃষ্ট করেছে। এমন খাদে পরিপূর্ণ মরীচিকার জগতে তিনি নিখাদ।
— বুঝেছি, তবে তোর জন্য কিন্তু ব্যাপারটা অনেক সহজ হয়ে গেল আজ।
— কিভাবে?
— ভেবে দেখ যেহেতু সে আজ তোর ভাইয়ার অনুষ্ঠানে এসেছে নিশ্চই সে কোনোভাবে ইমরান ভাইয়ের পরিচিত।
আদিবার কথায় ইশাতের টনক নড়লো সে তাড়াহুড়োতে যেতে যেতে বলল।
— তুই থাক আমি একটু ভাইয়ার সাথে দেখা করে আসি।
ইশাত অস্থির হয়ে ইমরানের কাছে ছুটে গেলো। ইমরান বোনকে দেখে প্রশ্ন করলো।
— ইশাত কোথায় ছিলি তুই এতক্ষন?
— তোমার কাছেই আসছিলাম ভাইয়া। একটা কথা জিজ্ঞাসা করার ছিল।
— হুম বল?
— এখানে না একটু সাইডে এসো।
ইশাতের কথায় ইমরান তাকে কোলাহলমুক্ত জায়গায় নিয়ে বলল।
— এবার বল।
ইশাত বড় করে নিশ্বাস টেনে জিজ্ঞাসা করলো।
— সেই লোকটা কে যে মাত্র এসে গেলো? তুমি কি তাকে চেন?
— তুই কার কথা বলছিস ইশাত? এখানে তো অনেকেই আসাযাওয়া করছে।
— ঐযে যার সাথে অনেকগুলো গার্ড ছিল। সে কি কোনো বড় মাপের ব্যক্তি?
ইশাতের কথার ইঙ্গিত এভিয়ানের দিকে যাচ্ছে বুঝতেই ইমরান হকচকিয়ে প্রশ্ন করলো।
— হঠাৎ তুই কেন জানতে চাচ্ছিস তার কথা?
— দরকার ছিল ভাইয়া আগে বল সে কে?
ইমরান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল।
— এভিয়ান জারিয়াথ, যার কেসের কথা সেদিন বললাম তোকে। ক্রি’মিনিলটা আমাকে হুমকি দিতে এসেছিল। ভেবেছিল আমাকে ভয় দেখিয়ে দমিয়ে ফেলবে।
ইমরানের ছোট্ট একটা কথায় যেন ইশাতের দুনিয়া হেলে উঠলো। সে নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। কাপা কাপা কন্ঠে সে ভাইয়াকে বলল।
— তিনি কি ভিন্ন ধর্মাবলম্বী? তার নামটা এমন…
ইশাতের কথা শেষ হওয়ার আগেই ইমরান বলল।
— বংশভূতভাবে সে খ্রিস্টান তবে যতটুকু জেনেছি সে কোথাও তার বাবার পরিচয় ব্যবহার করে না। আন্ডার ওয়ার্ল্ড হোক কি ব্যবসায়িক সূত্রে সম্পূর্ণ নিজের পরিচয় তৈরি করে নিয়েছে সে।
ইশাতের সবকিছু কেমন অবাস্তব মনে হলো। এতো এতো সাজানো স্বপ্ন তার মুহূর্তে ভেঙে চুরমার হয়ে গেলো। ধোঁয়াশা কাটিয়ে যখন এক এক করে সত্যগুলো তার সামনে স্বচ্ছ কাচের ন্যায় প্রকাশ পাচ্ছে তখন মুহূর্তেই তার মুখের ভাবভঙ্গিতে পরিবর্তন দেখা দিল। ইমরান সন্ধিহান গলায় জিজ্ঞাসা করলো।
— কি হয়েছে ইশাত তোকে হঠাৎ মলিন দেখাচ্ছে কেন?
ইশাত নিজেকে সামলে বলল।
— কিছু না ভাইয়া বাসায় যাবো শরীরটা খারাপ লাগছে।
ইমরান কেন যেন বোনের কথা মানতে পারলো না। সে পুনরায় প্রশ্ন করে বলল।
— কথা ঘুরাস না ইশাত। কি হয়েছে ভাইয়াকে বল। আমার থেকে কিছু লুকাস না। তুই জানিস আমি তোর মুখ দেখেই সব বুঝে যাই।
ভাইয়ের ভরসায় ইশাত যেন নিজের ভঙ্গুর হৃদয়ের যন্ত্রণা আর লুকিয়ে রাখতে পারল না। সে অঝোরে কেঁদে ভাইয়ের বুকে মাথা গুঁজে বলল।
— আমাকে মাফ করে দাও ভাইয়া আমি অনেক বড় একটা অপরাধ করে ফেলেছি। তোমার বিশ্বাস আমি টিকিয়ে রাখতে পারি নি।
ইমরান ব্যাথাতুর হেসে বলল।
— নিজেকে শুধু শুধু দোষারোপ করা বন্ধ কর। আমার বোনের উপর আমার পুরো বিশ্বাস আছে। সে কখনও কোনো অন্যায় করতেই পারে না।
— করেছি ভাইয়া আমি করেছি। না জেনে না বুঝে সেই অচেনা লোকটাকে আমার মন দিয়ে দিয়েছি। আমি যদি জানতাম তিনি অন্য ধর্মাবলম্বী আর একটা ক্রি’মিনাল তাহলে কখনো এমনটা করতাম না। তুমি কি জানো? তোমার যে বোন আগে নামাজের প্রতি অনিহা দেখাত সে নিয়মিত নামাজ পড়া শুরু করলো প্রত্যেকটা মোনাজাতে তাকে আল্লাহর কাছে চাইতে শুরু করলো। কেন আমি না জেনে এমনটা করলাম ভাইয়া বলো? সব দোষ তো আমারই ছিল। আল্লাহ কি আমাকে ক্ষমা করবেন?
ইশাতের মুখে এমন কথা শুনে ইমরান আঁতকে উঠলো। মনের কোণে জমা দুশ্চিন্তা নিয়ে বলল।
— এসব কিভাবে হলো ইশাত?
— সেদিন আদিবার কাবিনের দিন তাকে প্রথম দেখেছিলাম একটা ছোট বাচ্চার জীবন বাঁচাতে। তখন থেকেই তার জন্য মনে ভিন্ন একটা অনুভূতির জায়গা তৈরি হয়েছে।
— ইশাত তুই ভুলে যা ওকে। আসিফের সাথে বিয়েটা করে নে। ছেলেটা অনেক ভালো তোকে যত্নে রাখবে। আমি চাই আমার বোন সুখী হোক। দেখবি বিয়ের পর সব ঠিক হয়ে যাবে। ওকে ভুলে যাবি। ভাইয়া কখনো তোর খারাপ চাইবে না বিশ্বাস আছে তো ভাইয়ের উপর? আমি চাই না কারো কু’নজরে আমার বোনের জীবনটা নষ্ট হোক।
ইমরানের ভুলে যা বলা কথাটা যেনো ইশাতের কানে বেশ ভারী শোনালো। তবুও সে নিজের অন্যায় বিচার বিবেচনা করে বলল।
— ভাইয়া আমাকে একটু সময় দাও। আমি এখন বিয়ে করতে চাচ্ছি না। আমি কিছুটা সময় চাই তাকে ভুলতে।
ইমরান বোনের মতের গুরুত্ব দিয়ে বলল।
— ঠিকাছে, সময় লাগল নে আগে অনার্সটা শেষ কর তারপর নাহয় বিয়ে করিস।
— আমি বাসায় চলে যাচ্ছি ভাইয়া। আমার এখানে দমবন্ধ লাগছে। একটু একা থাকতে চাই। মাকে তোমরা তোমাদের সাথে নিয়ে এসো।
ইমরান আদূরে হাতে ইশাতের চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল।
— আমরা শীগ্রই ফিরছি তুই বাসায় গিয়ে রেস্ট কর। আর প্লীজ কদবি না তোর চোখের পানি আমি একদমই সহ্য করতে পারি না।
ইশাত বাধ্যগত হয়ে মাথা দোলালো। ইমরান তাকে নিয়ে সেন্টার থেকে বেরিয়ে সাবধানে গাড়িতে তুলে দিয়ে বলল।
— বাসায় পৌছে কল করিস। নাহলে দুশ্চিন্তা করবো।
— হুম।
কথা মতোই ইশাত বাসায় পৌছে ভাইকে কল করে জানিয়ে দিয়েছিল। বাসায় ফেরার পর থেকে সে নিজেকে নিজের ঘরে বন্ধ করে রেখেছে। এক মুহূর্তের জন্যও তার চোখ থেকে অশ্রু পড়া থামে নি। রাতে আসিয়া বেগম তাকে ডেকেছিল খাবার খাওয়ার জন্য ইশাত তখন শরীর খারাপ বলে মাকে বুঝিয়ে ফিরিয়ে দেয়। আসিয়া বেগম জোরাজুরি করতে গেলে ইমরান মাকে বুঝিয়ে নিয়ে আসে। বোনকে স্বাভাবিক হওয়ার জন্য সময় দেয়। ইশাত সারারাত চোখের পাতা এক করতে পারে নি। একান্তে জায়নামাজে বসে রবের কাছে নিজের মনের ব্যথা জাহির করেছে। নিজের করা ভুলের জন্য রবের কাছে সারারাত অনুশোচনা থেকে ক্ষমা চেয়েছে।
সকালে আসিয়া বেগম ইশাতকে ডেকে বলল ইমরান নাকি ফিরে যাচ্ছে। ভাইয়ের যাওয়ার খবর শুনে ইশাত ঝটপট নিজেকে পরিপাড়ি করে বেরিয়ে এলো রুম থেকে। ইমরান ডাইনিংয়ে বসে ইশাতের অপেক্ষা করছিল। বোন আসতেই সে নিজের হাতে বোনকে নাস্তা খাওয়াতে প্লেটে খাবার তুলল। ইশাতের খেতে একটুও ইচ্ছে করছিল না কিন্তু ভাইয়ের কথা ভেবে সে চুপচাপ ভাইয়ের হাতে খেয়ে নিলো। সানজিদাও পাশে বসে চুপচাপ নাস্তা করছিল। আসিয়া বেগম তখন বললেন।
— কিরে নতুন বিয়ে করেছিস শুধু বোনকে খাওয়ালে হবে এখন থেকে তো বউকেও যত্ন নিতে হবে।
— ঠিকাছে।
মায়ের কথায় সাবলীল উত্তর দিয়ে ইমরান সানজিদার মুখের সামনে লোকমা তুলে ধরলো। সানজিদা প্রথমে লজ্জা পেলেও পরে স্বামীর হাতে সানন্দে খেয়ে নিলো।
আসিয়া বেগম ইশাতকে লক্ষ্য করে বললেন।
— কিরে তোর চোখ মুখ এমন ফোলা কেন?
তখন ইমরান ইশাতের হয়ে উত্তর দিলো।
— ও তো বলল কাল ওর দুর্বল লাগছে তাই হয়তো লম্বা একটা ঘুম দেওয়ার পর চোখমুখ এমন ফোলা লাগছে। আমার বিয়ের এতো এতো কাজ নিয়ে বোনটার উপর কি কম ধকল গেছে? আমি চলে গেলে ওকে একটু যত্নে রেখো আম্মু।
আসিয়া বেগম মন খারাপ করে বললেন।
— তুই না দুই সপ্তার জন্য ছুটি নিয়েছিলি। বিয়েটা করেও সারলি না আবার ফিরে যাচ্ছিস।
— ছুটি তো নিয়েছিলাম কিন্তু দরকারি কাজ পড়ে গেছে আম্মু আমাকে যেতে হবে।
— সাবধানে যাস বাবা আর ফোন করিস।
— ঠিকাছে।
ইশাত আর সানজিদাকে খাইয়ে নিজেও কিছুটা খেয়ে নিলো ইমরান। সারাটাক্ষণ বোনের দিকে একবারের জন্যও সে তাকাতে পারে নি। বোনের এমন বিধ্বস্ত চেহেরা তার সহ্য হয় না। সে ঠিক করেছে বোনের সুরক্ষায় আপাতত এভিয়ানের কেসটা সে বন্ধ রাখবে পড়ে নাহয় সময় বুঝে আবারো খুলবে।
সবার সাথে বিদায় নিয়ে ইমরান যাওয়ার পূর্বে আসিয়া বেগমকে বলল।
— শুনো মা বাসায় কোনো কিছু ফুরোলে তুমি অথবা ইশাত কাউকেই বাজারে যেতে হবে না। আমি রহিম ছেলেটাকে বলে দিয়ে গেছি তোমাদের কিছু প্রয়োজন হলে ওকে কল করে দিবে ও তোমাদের প্রয়োজনে যা লাগবে এনে দিবে। এর বদলে ওকে মাসে মাসে টাকা পাঠিয়ে দিব।
— এসব কেন করতে গেলি বাবা। আমরাই তো পারতাম। শুধু শুধু বাড়তি খরচ করিস না এখন তোর নিজের একটা সংসার হয়েছে।
— এগুলো বাড়তি খরচ না মা আর তোমরা যেতে পারলেও আমি তোমাদের বাজারে যেতে দেব না। কোনো গায়রতবান পুরুষ সক্ষম থাকতে কখনো তার পরিবারের মহিলাদের এভাবে বাজারে যেতে দিতে পারে না। আমি যেহেতু বাসায় থাকি না তাই ব্যবস্থা করে দিয়ে গেলাম।
আসিয়া বেগম ছেলের দায়িত্ববোধ দেখে আপ্লুত হলেন। তিনি ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করে দিলেন। ইমরান সানজিদার কাছে বিদায় নিয়ে বলে গেল।
— বউ ফোন করিয়ো।
সানজিদা লজ্জায় মাথা নুইয়ে ফেলল। প্রত্যুত্তরে শুধু মাথা নাড়িয়ে হ্যা বুঝালো। ইমরান সন্তুষ্ট হয়ে লাগেজ হাতে বেরিয়ে গেল।
চলবে ( ইনশাআল্লাহ )…………………
#ক্লান্তিহীন_তুই_আমার_ফরিয়াদ
#পর্বঃ১৪
#সুমাইয়া_জান্নাত_ইলমা
চার বছর পর………
দেখতে দেখতে চারটি বছর স্রোতের টানে হারিয়ে গেল স্মৃতির ভিড়ে। সময় যেন এক অদৃশ্য নদী, যে নদীর স্রোতে বছরগুলো জীবন থেকে নিরবে বয়ে যায়। সেই স্রোতে ভেসে যায় ক্যালেন্ডারের পাতা। সময় বয়ে যায় ঠিকই তবে থেকে যায় কিছু দুঃসহ স্মৃতি, রয়ে যায় কিছু আক্ষেপ। শত বছর পেরিয়ে গেলেও কিছু অনুভূতির গভীরতা কমে না থাকে অপরিবর্তনীয়। শুধু বদলায় মানুষ আর পরিস্থিতি।
কম্পিউটার টেবিলে বসে এক মনে ইশাত তার কিছু টাস্ক পূরণ করছে। তিনমাস যাবত সে আইটি কোর্সে জয়েন করেছে। অনার্স কমপ্লিট হতে না হতেই সে তার অবসর সময় কাজে লাগিয়ে কোর্সে জয়েন করেছে। তার ইচ্ছে এখন বড় কোনো আইটি কোম্পানিতে চাকরি করার। যখন ইশাতের মনোযোগ মনিটরের স্ক্রিনের উপর স্থির তখন অকস্মাৎ একটা দুই বছরের বাচ্চা ছেলে গুটিগুটি কদমে অপটু পায়ে হেঁটে এসে ইশাতের পা জড়িয়ে ধরলো। হঠাৎ ইশাত পায়ে কারো স্পর্শ পেতেই চমকে গিয়ে মনিটরের স্ক্রিন থেকে দৃষ্টি সরিয়ে মাথা নিচু করতেই দেখলো বাচ্চাটাকে। সঙ্গে সঙ্গে তার ঠোঁটে বিস্তৃত এক হাসি ফুটে উঠল। মনে বয়ে গেল প্রসান্তির পবন। ইশাত চোখে মমতা নিয়ে দুহাত বাড়িয়ে বাচ্চাটিকে কোলে তুলে তার ফোলাফোলা গালে চুমু একে দিয়ে বলল।
— কি হয়েছে আমার বাবার? চোখে পানি কেন? আব্বু তোমাকে আবারো বকেছে? দাড়াও আমি আব্বুকে বকে দিব কেমন?
মুহূর্তেই শিশুটির টলটল চোখের পানি মিলিয়ে গিয়ে এক চিলতে হাসিতে রূপ নিল। সে ইশাতের চুল নিয়ে খেলা করতে করতে অপক্ব ভাষায় বলল।
— আমি দুদ কাবো না। বাবা আমাকে শুধু দুদ কেতে জোল কলে।
ইশাত বাচ্চাটার মাথায় আদুরে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল।
— না বাবা দুধ খেতে হবে। তুমি না বড় হয়ে বাবার মতো স্ট্রং হতে চাও? না খেলে তো দুর্বল হয়ে যাবে।
কথার মাঝেই ইমরান ঘরে প্রবেশ করলো হাতে দুধের গ্লাস তার। সেটা দেখে বাচ্চাটা ইশাতের কোলে আরো জড়সড় হয়ে চেপে গেলো। ইমরান কপাল কুঁচকে বাচ্চাটার উদ্দেশ্যে বলল।
— আহনাফ, নাও এটা খেয়ে শেষ করো দিন দিন অনেক দুষ্টু হচ্ছো। কোনো কথাই শুনছো না বাবার।
ইশাত ভাইকে থামিয়ে চোখের ইশারায় আশ্বস্থ করে আহনাফকে বোঝানোর ভংগিতে বলল।
— তুমি যদি এটা খেয়ে শেষ করো তাহলে আজকে রাতে ফুপ্পির সাথে ঘুমাতে পারবে। ফুপ্পী সুন্দর সুন্দর গল্প শোনাবো তোমাকে।
ইশাতের কথা শুনে বাচ্চাটার চোখ খুশিতে চিকচিক করে উঠলো। সে তার ছোট ছোট হাত দুটি বাড়িয়ে দিতেই ইমরান দুধের গ্লাসটা এগিয়ে দিলো। আহনাফ গ্লাস হাতে নিতেই ইশাত তাকে সতর্ক করে বলল।
— খাওয়ার আগে বিসমিল্লাহ বলে নাও আহনাফ। নাহলে পঁচা শ’য়তান এসে তোমার খাবারে ভাগ বসাবে।
আহনাফ আতঙ্ক নিয়ে চোখ বড় বড় করে তড়িৎ শব্দ করে বিসমিল্লাহ পড়ে সম্পূর্নটুকু দুধ গটগট করে শেষ করে বাবাকে গ্লাসটা ফেরত দিলো। ইশাত মিষ্টি হেসে তার মুখের আশপাশে লেগে থাকা দুধটুকু মুছে দিলো। ইমরান সন্তুষ্ট হয়ে ফেরত চলে যেতে নিলে ইশাত তার হাতে বাম দেখে বলল।
— তোমার হাতে বাম কেন ভাইয়া? কার মাথা ব্যথা?
— তোর ভাবির নাকি মাথাটা প্রচন্ড ব্যথা তাই ভাবলাম ম্যাসাজ করে দেই।
— ঠিকাছে, তুমি ভাবির খেয়াল রাখো আহনাফকে আমি ঘুম পাড়িয়ে দেব।
ইমরান মৃদু হেসে মাথা দুলিয়ে চলে গেলো। আহনাফ ইশাতের কাছে থাকলে তাকে আর বাড়তি কোনো চিন্তা করতে হয় না। ইমরান আর সানজিদার একমাত্র আদরের ছেলে আহনাফ। তাদের বিয়ের দুই বছর পরই সানজিদার কোল আলো করে এসেছে তাদের ছেলে সন্তান। আহনাফ জন্মের পর থেকে যখন একটু একটু বুঝতে শিখেছে তখন থেকেই সে ইশাতের জন্য পাগল। ইশাতও নিজের সন্তানের মতো করে আগলে যত্ন নিয়ে বড় করেছে তাকে। এতটা নিখাদ ভালোবাসা দিয়েছে বলেই বাচ্চাটা ইশাত বলতে অন্ধ। ইশাত যাই বলুক না কেন সে তাই শুনবে, করবে। বলতে গেলে আহনাফের উসিলায় ইশাতও তার পুরোনো তিক্ততা ভুলে নিজেকে প্রাণবন্ত রেখেছে।
ইশাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো রাত ১০ টার উপরে বেজে গেছে আহনাফকে ঘুম পাড়িয়ে দিতে হবে। বাচ্চা মানুষের এতো রাত জাগা ঠিক না। শরীর খারাপ করবে। সেটা ভেবেই সে কম্পিউটার বন্ধ করে আহনাফকে কোলে নিয়ে বিছানায় শুয়িয়ে দিলো। নিজেও তার পাশে শুয়ে পড়লো। অহনাফ ডেবডেব করে তাকিয়ে আছে। তার চোখে কোনো ঘুম নেই। ইশাত তখন মুচকি হেসে বলল।
— বাবা চল ঘুমানোর আগে ঘুমের দোয়া পড়ি।
আহনাফ খিলখিল করে হেসে মাথা দুলিয়ে বলল।
— আমি তো ভুলে গেথি।
— ফুপ্পীর সাথে বলো তাহলে “আল্লাহুম্মা বিসমিকা আমুতু ওয়া আহইয়া”।
আহনাফ ইশাতের কাছে দোয়া শুনে শুনে তার মতো করে অপক্ব ভাষায় পড়ে নিলো। মাঝ দিয়ে উচ্চারণ ভুল হলে ইশাত তাকে সহজ করে বুঝিয়ে দিলো। আহনাফও ঠিক করে পড়ে নিলো। ইশাত তার মাথায় হাত বুলিয়ে তাকে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করছিল তখন আহনাফ বায়না ধরে বলল।
— আমাকে সুন্দল সুন্দল গপ্প শুনাও না পুপ্পি।
ইশাত আহনাফের ভাঙ্গা ভাঙ্গা শব্দে হেসে ফেলল। তার কাছে বেশ আদুরে লাগে আহনাফের বায়নাগুলো তাই সে তার চুলে হাত বুলাতে বুলাতে নবীদের জীবনী বলা শুরু করলো। আহনাফ বেশ মনোযোগ নিয়ে শুনলো মাঝে এটা ওটা প্রশ্নও করলো। ইশাত বেশ ধৈর্য নিয়ে সাবলীলভাবে তার প্রত্যেকটা প্রশ্নের উত্তর বুঝিয়ে বলল। একটা সময় আহনাফ ঘুমের দেশে তলিয়ে গেলো। ইশাত তার কপালে চুমু একে ফোনটা হাতে নিলো আদিবা একটা ভিডিও পাঠিয়েছে। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে একটা ফুটফুটে আট মাসের শিশু ঘুমের মাঝে পায়ের আঙুল মুখে পুড়ে চু চূ শব্দে চুষছে। কি আদুরে লাগছে দেখতে। আদিবার আট মাসের মেয়ে অহনা। দুই এক বছর যাবত আদিবা শ্বশুরবাড়িতেই থাকছে। ইশাত ভিডিওটা দেখে আনমনে হেসে কিছু লিখছিল তখন চপল পায়ে ঘরে প্রবেশ করলেন আসিয়া বেগম। মেয়েকে ফোনের দিকে তাকিয়ে হাসতে দেখে তিনি পাশে বসে প্রশ্ন করলেন।
— এতো হাসি কিসের? কার সাথে কথা বলছিস?
ইশাত মাকে আদিবার মেয়ের ভিডিওটা দেখালো আসিয়া বেগম সেটা দেখে বললেন।
— আল্লাহুম্মা বারিক লাক, কি ফুটফুটে হয়েছে আল্লাহ নেক হায়াত দান করুক।
আদিবা আরো কিছু ভিডিও পাঠাচ্ছিল ইশাত ঠোঁটে মুচকি হাসি নিয়ে ছোট্ট অস্তিত্বটার দুষ্টুমিমাখা ভিডিও গুলি মনোযোগ দিয়ে দেখছিল। আসিয়া বেগম বিছানায় শুয়ে থাকা আহনাফের নিষ্পাপ ঘুমন্ত মুখটার দিকে একবার দৃষ্টি দিয়ে পুনরায় ইশাতের দিকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে বললেন।
— এতদিনে বিয়ে করলে তোরও এমন একটা ফুটফুটে বাচ্চা থাকতো।
হঠাৎ মায়ের কথার ইঙ্গিতে ইশাতের মুখের হাসি উবে গেলো। মলিন মুখে সে মাকে প্রশ্ন করলো।
— কিছু বলতে এসেছিলে?
— কাল আসিফরা আসছে তোকে দেখতে।
ইশাত যেন কথাটা শুনে অসন্তুষ্ট হলো। সেভাবেই সে বলল।
— এমন তো না যে তারা আমাকে কখনও দেখে নি। তাহলে এতো দেখা দেখির কি আছে আম্মু?
— আসিফের দাদি নাকি তোকে দেখতে চেয়েছেন। এবার এলে তারা একেবারে বিয়ের তারিখ ঠিক করে যাবে।
— এখনি কেন আম্মু?….
— তো আর কখন? আসিফ চারটে বছর ধরে তোর জন্য অপেক্ষা করছে। ছেলেটা সব দিক দিয়ে পারফেক্ট পারিবারিক শিক্ষার কোনো কমতি নেই। তাকে ফিরিয়ে দেওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। ছেলেটা পড়ালেখা শেষ করে বাবার কোম্পানিতে জয়েন করলো এক বছর হলো এর মধ্যেই তাদের ব্যবসা দার করে ফেলেছে বড় বড় গণ্যমান্য ব্যবসায়ীদের সাথে তার নাম যোগ হয়েছে। এই অল্প সময়েই কতটা সাফল্য অর্জন করেছে একবার ভেবে দেখেছিস? এমন যোগ্যতা সম্পন্ন ছেলে মিলা ভাগ্যের ব্যাপার। আর মেয়েদের সময় থাকতে বিয়ে দিতে হয় নাহলে বেশি বয়স বাড়লে আত্মীয়স্বজনেরা কানাঘুষা করে। এখন যা ভালো ছেলে পাওয়া যায় তখন তাও পাওয়া যাবে না। সময় কারো জন্য থেমে থাকে না।
ইশাত মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে রইলো। একবার বিশ্বাস ভাঙার পর বিয়েশাদী নিয়ে তার মনে তিক্ততা এখনো কমে নি। বিয়ে বলতেই তার মনে আতঙ্ক কাজ করে। আসিয়া বেগম মেয়ের মলিন চেহরা পরখ করে বুঝিয়ে বললেন।
— মা আমার, মন খারাপ করিস না তুই তো জানিস আমরা তোর ভালোর জন্যই সব করছি। মা কি কখনো সন্তানের খারাপ চায় বল? কাল ওরা তোকে দেখতে এলে সুন্দর করে সেজেগুজে সামনে গিয়ে সালাম দিয়ে কথা বলবি কেমন?
ইশাত মাথা নাড়িয়ে ব্যাথাতুর হেসে মায়ের আবদারে সম্মতি জানালো। মুখে অসস্থ করে বলল।
— তুমি চিন্তা করো না আম্মু তোমারা যা চাইবে তাই হবে আমি দ্বিমত করবো না।
আসিয়া বেগম সন্তুষ্ট হেসে উঠে চলে গেলেন। ইশাত আনমনা হয়ে গভীর ভাবনায় তলিয়ে গেল। সেদিনের পর থেকেই সে তার মিস্টার গোল্ডেনকে আল্লাহর কাছে চাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। নিজের করা ভুলের জন্য রবের কাছে অনুশোচনা নিয়ে ক্ষমা চেয়েছিল। তবে সে মিস্টার গোল্ডেনের জন্য দোয়া করা থামায় নি। আজও মেয়েটা রোজ মোনাজাতে হাত তুলে তার হেদায়েতের দোয়া করে যায়। রোজ তাহাজ্জুদ পড়ে রবের দরবারে ফরিয়াদ করে যায় যেন মানুষটা তার সঠিক পথ খুঁজে পায়। নিজের করা অন্যায়গুলো উপলব্ধি করতে পারে। যেন হেদায়েতের মূল্যবান নেয়ামত তার নসীব হয়। হেদায়েত তো একমাত্র আল্লাহরই ইচ্ছাধীন। ইশাত চায় না তার মনের কোণে থাকা মানুষটি পথভ্রষ্ট হয়ে মৃত্যুবরণ করুক আর মৃত্যুর পর ওই দুনিয়াতে নির্মম সত্যের মুখোমুখি হোক।
আটপাঁচ ভাবতে ভাবতে তার চোখ লেগে গেল। মাঝ রাতে ঘুমে ঘুমে ছটফট করছে সে। ঘুমের ঘোরে খুব ভয়ানক একটা স্বপ্ন দেখছে। স্বপ্নে একটা ঘন কালো আঁধার জঙ্গল পেরিয়ে সে প্রাণ পনে দৌড়াচ্ছে। যেন ধরা পড়লেই আর রক্ষা নেই। শুধু এক নাগারে ছুটে যাচ্ছে সে কোথায় যাচ্ছে তা জানা নেই। পেছনে সরু রাস্তায় চাঁদের ধীর আলোয় প্রতীয়মান লম্বা দানবীয় অন্ধকারাচ্ছন্ন একটা প্রতিবিম্ব স্থির দণ্ডায়মান। ইশাত ছোটার সময় জঙ্গলের জংলী লতা পাতা আটকে তার হাত পা কেটে ছিলে র’ক্তাক্ত হয়ে যাচ্ছে তবুও তার দৌড়ানোর গতি কমছে না। ভেতরে এতটাই ভয় কাজ করছে যে শরীরের ব্যথা পর্যন্ত তুচ্ছ মনে হচ্ছে।
দৌড়াতে দৌড়াতে অকস্মাৎ তার শরীর শূন্যে ভেসে গেলো। সেকেন্ডের ব্যবধানে কেউ ঝরের বেগে এসে এক থাবায় তাকে ঝাপটে ধরে শূন্যে তুলে রেখেছে। হাত পা ছুঁড়ে ইশাত নিজের আত্মরক্ষার চেষ্টা চালালো। কিন্তু কিছুতেই সেই অশুভ শক্তির সাথে পেরে উঠলো না। তাকে কোনো সুযোগ না দিয়েই আচমকা একটা ভারী পুরুষালী কন্ঠ এসে কর্ণগোচর হতেই থেমে গেলো সব নড়াচড়া। নিস্তব্ধ রজনীতে তার ধারালো কন্ঠ বেশ ভয়ানক শোনালো, গায়ে কাটা দিয়ে উঠলো তার, শরীরের ক্ষুদ্র পেশিগুলো সংকুচিত হয়ে টেনে ধরলো প্রত্যেকটা লোমকূপ। শিরদাঁড়া বেয়ে বয়ে গেলো এক শীতল স্রোত। হু’মকি মিশ্রিত কন্ঠটা কানে বারবার এসে বারি খেতে লাগলো।
“Take one more step and watch how I destroy you.”
ইশাত স্তম্ভিত হয়ে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে সেই ব্যক্তিটাকে দেখার প্রচেষ্টা চালাল। অযাচিত বিভৎস অন্ধকারের মাঝে তার ঝাপসা দৃষ্টিপটে অস্পষ্টভাবে ভেসে উঠলো এক ভয়ানক বক্র হাসি যা দেখে তার পিলে চমকে উঠলো। সেই হাসিতে ছিল হিং”স্রতা। লোকটা তাকে শূন্য থেকে নামিয়ে সজোড়ে আছাড় মেরে ফেলে দিলো। ছিন্নভিন্ন র’ক্তাক্ত দুর্বল শরীর টেনে ইশাত উঠে দাড়াতে চাইলে তাকে সময় না দিয়ে লোকটা তার লম্বা লম্বা আঙুল জোরে চেপে ধরলো ইশাতের বাহুতে তীব্র ব্যথায় ইশাত ককিয়ে উঠলো। এতটুকুতে যেন লোকটা ক্ষান্ত হলো না। উল্টো সে ইশাতের যন্ত্রণা বাড়াতে আরো কয়েকধাপ এগিয়ে গিয়ে তার চিরাচরিত নৃশং”সতা দেখিয়ে হাতের আঙুলের ভাঁজে একটা সিগারেটের শলা নিলো তাতে লাইটারের আ”গুণ ধরিয়ে সেই জ্বলন্ত সিগারেট দাবিয়ে দিলো ইশাতের সমগ্র কায়ায়। অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে ইশাতের ভেতর চিরে বেরিয়ে এলো মর্মভেদী আত্মচিৎকার।
ঠিক তখনই ইশাত ধড়ফড়িয়ে ঘুম ভেংগে উঠে বসলো,
অনুভব করলো তার সারা শরীরসহ জামা কাপড় সব ঘেমে নেয়ে ভিজে একাকার হয়ে গেছে। স্বপ্নের রেশ এখনো কাটে নি বুকের ভেতরটা জোরালো গতিতে ধড়ফড় করে চলেছে। যেন হৃদপিণ্ডটা বেড়িয়ে আসবে এই মুহুর্তেই। পাশেই আহনাফ আমোদে ঘুমিয়ে আছে। ইশাত পাশে ফিরে সতর্ক ভঙ্গিতে একবার সেই নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে আওরালো।
“ইয়া রব এই দুঃস্বপ্নের অকল্যাণ থেকে আমাকে রক্ষা করুন এবং তা আমার জন্য কল্যাণকর করে দিন।”
এভাবেই কিছুক্ষণ মনকে বুঝ দিয়ে সেটাকে নিছক দুর্শ্বপ্ন ভেবে সময় নিয়ে নিজেকে শান্ত করলো ইশাত। মসজিদে তখন ফজরের আযান পড়ে গেছে। নিস্তব্ধ রাতে চারিপাশে ধ্বনিত হচ্ছে সেই সুমধুর সুর। আহনাফ তখন চোখ পিটপিট করে ঘুম থেকে উঠে বসেছে কেবল। আধো আধো চোখে ইশাতকে খুঁজছে সে। ডিম লাইটের মৃদু আলোতে হাতড়ে ইশাতকে খুঁজে পেতেই সে আধখোলা চোখে বলল।
— পুপ্পি বাথলুম যাবো।
ইশাত ভ্রম কাটিয়ে সেই আদুরে মুখে চেয়ে দুহাত বাড়িয়ে তাকে কোলে তুলে বলল।
— আসো ফুপ্পি নিয়ে যাই।
আহনাফকে বাথরুম থেকে বের করে বিছানায় শুইয়ে দিতেই সে চোখ ভর্তি ঘুম নিয়ে আবারো গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়লো। ইশাত তখন তাকে কমফোর্টারে ঢেকে দিয়ে ওযু করে এসে নামাজে দাড়িয়ে গেলো।
___________________
ইশাতদের ড্রয়িং রুমে বসে আছে আসিফ, তার মা আর দাদি। সানজিদা আর আসিয়া বেগম নাস্তা পানি এগিয়ে এনে টেবিলের সামনে দিচ্ছে তাদের। আহনাফ খেলার ছলে রুমজুড়ে ছোটাছুটি করছে। এখানে কি চলছে ছোট্ট মস্তিষ্কে তার কোনো ধারণা নেই। ইমরান কাজে বাহিরে আছে। অন্যদিকে আসিফের দাদি এসেছে পর থেকে মুখ খুলছে তো এটা ওটা নিয়ে সমালোচনা করে যাচ্ছে। আসিফের মা আসিয়া বেগমকে আড়ালে নিয়ে আগেই বলেছিল ওনার শাশুড়ির চিন্তাধারা সেকেলে তিনি অনেকটা খুঁতখুঁতে স্বভাবের। স্বভাবগতভাবে কথায় কথায় মানুষের দোষ ত্রুটি ধরে কথা বলেন তিনি। তাই আসিয়া বেগম সচেতন হয়ে ইশাতের ঘরে গিয়ে আগে থেকেই তাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে বাহিরে নিয়ে এলেন। ইশাত সুন্দর একটা পেস্ট কালারের থ্রিপিস পড়েছে সাথে সবুজ রঙের হিজাব জড়িয়েছে।
আসিফ মাত্র শরবতের গ্লাসটা হাতে তুলে নিয়েছিল ইশাতকে দেখে তার হাত থেমে গেলো। রোকেয়া বেগম উঠে ইশাতকে এনে তার সঙ্গে বসালেন। অমনি শুরু হয়ে গেলো আসিফের দাদীর দোষ ধরা তিনি ইশাতকে আগাগোড়া অবলোকন করে মুখ চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন।
— এই মাইয়া মাথায় ওইটা কি পিনসো। চুল কি নাই মাথায়? এতো ঢাকাঢাকি কিসের। আমরা তো দেখতেই আইসি। দেখি কত বড় চুল তোমার খুইলা দেখাও।
এমন প্রশ্নের সম্মুখে পড়ে ইশাত অপ্রস্তুত হয়ে গেলো। মুখ খুলে কিছু বলবে তার আগেই আসিফ জবাব দিলো।
— তোমাকে দেখতে হবে না আমি আগেই দেখেছি।
ভদ্র মহিলা আসিফের কথায় কান না দিয়ে ইশাতকে উদ্দেশ্য করে আবারো বললেন।
— হাইটা দেখাও তো দেখি খোড়া নাকি ঠিকঠাক হাটো।
ইশাত কথা মান্য করে উঠে দাঁড়িয়েছে হাঁটার জন্য তখন আসিফ বাদ সেধে বলল।
— ইশাত তুমি বসো তোমাকে হেঁটে দেখাতে হবে না। আর দাদি তুমি কি শুরু করেছ এই যুগে এসেও কেউ এইভাবে মেয়ে দেখে?
আসিফকে অগ্রাহ্য করে তার দাদি বলল।
— চুপ কর ছেলে এমনিতেই মাইয়ার বয়স বেশি তার উপর বেশি পড়ালেখা করসে। তোরে যে ভাইজা খাইবো না এর কোনো গ্যারান্টি আছে?
তিনি আবারো ইশাতের দিকে ফিরে প্রশ্ন ছুঁড়ে বললেন।
— এই মেয়ে তুমি কি আবার চাকরি বাকরির ধান্ধায় আছো নাকি? আমাগো বাড়ির বউদের এসব চলবো না। ঠিকঠাক স্বামী সংসারের খেদমত করতে হইবো।
ইশাত প্রথমে অপমানবোধ করলেও মুরব্বী ভেবে সেটা গায়ে মাখলো না। সে মুখে দৃঢ়তা আর আত্মবিশ্বাস নিয়ে উত্তরে বলল।
— ইনশাআল্লাহ, সেটা স্ত্রী হিসেবে আমার দায়িত্ব হবে তবে সংসার ঠিক রেখে যদি আমি চাকরি করতে পারি নিজের যোগ্যতা প্রমাণের জন্য তাহলে তো কোনো সমস্যা হওয়ার কথা না।
ইশাতের এমন কথায় যেন ভদ্র মহিলা ক্ষেপে গেলেন তিনি উগ্র হয়ে কিছু বলতে যাবেন তার আগেই আসিফ পরিস্থিতি সাম্ভাল দিয়ে বলল।
— আমি পরশুই ইশাতকে বিয়ে করতে চাইছি। এতো আনুষ্ঠানিকতার কোনো দরকার নেই শুধু কাজী এনে কবুল পরিয়ে নেব পড়ে নাহয় আত্মীয়স্বজন নিয়ে বড় করে অনুষ্ঠান করা যাবে। আমি কালই সব শাড়ি গহনা পাঠিয়ে দিব ইশাতের জন্য। শুভ কাজে আর বিলম্ব করতে চাচ্ছি না।
আসিফের এতো তাড়াহুড়োর কারণ ধরতে পারলো না ইশাত সে এই নিয়ে কোনো প্রশ্নও করলো না উল্টো মায়ের দিকে বাক্যহীন দৃষ্টিপাত করলো। আসিয়া বেগম সম্মোহনী হেসে বললেন।
— ঠিকাছে বাবা তুমি যেটা ঠিক মনে করো, আমিও মনে করি এটা মোক্ষম সময় ইমরানও বাড়িতেই আছে।
আসিফরা কথা পাকাপাকি করে ফিরে গেল। আসিফের দাদিও আর কিছু বললেন না এ নিয়ে। এদিকে সানজিদা খুশিতে ইশাতকে জড়িয়ে ধরে বলল।
— আমার মিষ্টি ননদটার অবশেষে বিয়ে হয়ে যাচ্ছে তাহলে!
উত্তরে ইশাত মলিন হাসলো। সবার মুখে হাসি থাকলেও ইশাতের মুখে কোনো হাসি নেই। নিজেকে তার মূল্যহীন মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে। সে তার অনুভূতিগুলো বহু আগেই মনের ভেতরের চাপা দিয়ে আল্লাহর ভরসায় নিজেকে সামলেছে এখনো সেই বিশ্বাসে সব আল্লাহর হাতে ছেড়ে নিজেকে যথেষ্ট শান্ত রাখলো সে।
চলবে ( ইনশাআল্লাহ )……………………

