Home "ধারাবাহিক গল্প ক্লান্তিহীন তুই আমার ফরিয়াদ ক্লান্তিহীন তুই আমার ফরিয়াদ পর্ব-৫০ এবং শেষ পর্ব

ক্লান্তিহীন তুই আমার ফরিয়াদ পর্ব-৫০ এবং শেষ পর্ব

0
317

#ক্লান্তিহীন_তুই_আমার_ফরিয়াদ
#পর্বঃ৫০ (অন্তিম পর্ব )
#সুমাইয়া_জান্নাত_ইলমা

সময়ের স্রোতে ভেসে কয়েকটা মাস চোখের পলকে অতিবাহিত হয়ে গেলো। সময়ের সাথে ইশাতের মনের ক্ষত একটু একটু করে সারতে শুরু করেছে। আরিয়ান এখন ইশাতের প্রতি আগের তুলনায়ও বেশি যত্নশীল হয়ে উঠেছে। সে সারাক্ষন ইশাতকে নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকে। আরিয়ান অফিসে যাওয়ার পর এখন আর ইশাত বাসায় একা থাকে না। সে তার দিনের বেশিরভাগ সময় তাসকিয়াকে দ্বীনের শিক্ষা দিতে ব্যয় করে। তাজকিয়া আর ইশাত দুবোনের মতো একসাথে নামাজ আদায় করে, হাদিস চর্চা করে। এভাবেই ইশাত নিজেকে সারাক্ষণ ব্যস্ত রাখে।

কিন্তু সে সবার সামনে নিজেকে স্বাভাবিক দেখালেও এখনো বাচ্চাদের কথা মনে করে সবার আড়ালে চোখের পানি ফেলে। মায়ের মন কোনো কিছুতেই যেন মানতে চায় না। তাই সে রোজ নিজের সন্তানদের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করে। অন্যদিকে কিছুদিন আগেই আসিফের ফাঁ’সি কার্যকর হয়েছে। সেদিন আসিফের মায়ের আর্তনাদ সকলের বুক কাপিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ইশাতের হাতে কিছুই করার ছিল না।

নিজ কেবিনে ধ্যানমগ্ন হয়ে বসে এসব ভাবছে আরিয়ান। চিন্তায় তার চোখের নিচ নীলচে বর্ন ধারণ করেছে। এমন সময় রিজভী ভেতরে ঢুকে আরিয়ানকে দেখে বলল।
— আর কত এভাবে ধুকে ধুকে কষ্ট পাবি?

আরিয়ান রিজভীর দিকে সৃষ্টি রেখে বলল।
— ইশাতের জন্য আমার ভেতরটায় পুড়ে যায়। ও অনেক শক্ত মনোবলের একটা মেয়ে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে ঠিকই যন্ত্র’ণা ভোগ করছে কিন্তু আমাকে বুঝতে দিতে চাইছে না। ইদানিং ওর হাসিটাও আমার নকল মনে হয়।

রিজভী তখন শান্ত হয়ে তার পাশে বসে বন্ধুকে সান্তনা দিয়ে বলল।
— তুই একটা কাজ করতে পারিস।

আইয়ান উৎসুক হয়ে জানতে চাইলো।
— কি কাজ?

রিজভী পরামর্শ দিয়ে বলল।
— তুই আবারো একটা বাচ্চা নিয়ে নিতে পারিস, এতে ওর শূন্য কোল পূর্ণ হতেই দেখবি ইশাতও ওভারকাম করে উঠতে পেরেছে।

আরিয়ান কিছুক্ষণ ভেবে বলল।
— হুম, ঠিক বলেছিস।

পুনরায় আরিয়ান বলল।
— আচ্ছা শোন, আরেকটা বিষয় নিয়ে আমাকে পরামর্শ দে, তাজকিয়ার বিয়ের জন্য একটা ভালো ছেলের খোঁজ করতে হবে। তোর জানাশোনা কোনো ভালো ছেলে হাতের কাছে আছে? ভাই হিসেবে তো আমার দায়িত্ব নিজের বোনকে ভালো কারো হতে তুলে দেওয়া তাই না?

রিজভী একটু ভেবে বলল।
— আমাদের সিয়াম কেমন হয়? ছেলেটা কিন্তু সব দিক থেকে সৎ। তোর বোনকে ভালো রাখবে।

রিজভীর বুদ্ধিটা আরিয়ানের পছন্দ হলো। তখন সে সিয়ামকে তার কেবিনে ডাকলো। সিয়াম আসতেই আরিয়ান গাম্ভীর্য নিয়ে তাকে প্রশ্ন করলো।
— নিজের বিয়ে সাদির বিষয়ে কিছু ভেবেছ? কাউকে কি পছন্দ হয় তোমার?

সিয়াম মাথা নিচু করে বলল।
— এসব নিয়ে কিছুই ভাবা হয়নি বস।

আরিয়ান কপাল কুচকে বলল।
— এখন না ভাবলে আর কখন ভাববে? বয়স পাড় হয়ে গেলে?

সিয়ামের মনে হলো তার বস তার ইন্টার্ভিউ নিচ্ছে। তাই সে উদ্বিগ্ন হয়ে আমতা আমতা করে বলল।
— না…ইয়ে.. মানে বস।

আরিয়ান তাকে থামিয়ে বলল।
— হয়েছে আর আমতা আমতা করতে হবে না। আমি স্ট্রেইট কথার মানুষ তাই সরাসরি বলে দেই, আমার বোনকে তোমার কেমন লাগে?

বসের মুখে কথাটা শুনে সিয়াম চোখ বড় বড় করে তাকালো। আরিয়ান তখন এক ব্রু উঁচিয়ে তাকে বলল।
— এতো অবাক হওয়ার কিছু নেই। বোন তো আমার আর আগেই মতো নেই। তাছাড়া ওর সিদ্ধান্ত এখনো আমার জানা হয়নি। তোমরা দুজনে মত দিলে কথা এগোবো। নাহলে না।

সিয়াম উদাস মনে বলে উঠলো।
— তিনি কি আমাকে বিয়ে করতে চাইবেন?

সিয়ামের কথাবার্তা শুনে আরিয়ান অদেখা হেসে বলল।
— তাহলে তুমি চাও আমার বোনকে বিয়ে করতে?

সিয়াম মাথা নিচু রাখা অবস্থায় বলল।
— আপনি আদেশ করলে কি মানা করতে পারি বস।

আরিয়ান হেসে সিয়ামকে তার কাছে ডাকলো। সিয়াম এগিয়ে যেতেই আরিয়ান তার পিঠ চাপড়ে বলল।
— এই একটা কথাই এতো ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বলতে হলো?

সিয়াম লজ্জা পেল। তবে মুখে আর কিছু বলতে পারলো না। সে বসের সামনে মাথা নামিয়ে রাখলো। রিজভীও এটা দেখে শব্দ করে হেসে ফেলল। সন্ধ্যার পর আরিয়ান বাসায় ফিরে দেখলো ইশাত আর তাজকিয়া হলরুমে একসাথে বসে কোনো একটা মুভি দেখছে। স্ক্রিনে একশন সিন চলছে। আরিয়ানকে দেখা মাত্র ইশাত তড়িৎ এগিয়ে এসে নিজ উদ্যেগে স্বামীর গায়ের কোর্ট আর অফিস ব্যাগ হাতে নিয়ে বলল।
— আপনি ফ্রেশ হয়ে আসুন আমি খাবার গরম করছি।

আরিয়ান সম্মতিসূচক মাথা দুলিয়ে উপরে চলে গেল। কিছুক্ষন পর ফ্রেশ হয়ে সে নিচে নেমে সে দেখলো। তার বোন আর তার স্ত্রী ডাইনিং টেবিলে বসে তার জন্য অপেক্ষা করছে। আরিয়ান এসে বসতেই তারা খাবার বেড়ে দিয়ে একসাথে খাওয়া শুরু করলো। আরিয়ান এক পর্যায়ে তাজকিয়াকে প্রশ্ন করলো।
— তাজকিয়া একটা বিষয় নিয়ে তোমার সঙ্গে পরামর্শ করার দরকার ছিল।

তাজকিয়া খাওয়া থামিয়ে বলল।
— হ্যা বলো ভাইয়া?

আরিয়ান প্রথমে বুঝিয়ে কথাটা শুরু করলো।
— দেখো যেহেতু আমাদের বাবা মা জীবিত নেই তাই ভাই হিসেবে আমাকেই দায়িত্বটা নিতে হচ্ছে। তুমি বিনাদ্বিধায় তোমার মতামত জানাতে পারো। তোমার ইচ্ছার উপরই সব হবে।

তাজকিয়া ভাইকে আশ্বস্ত করে বলল।
— তুমি এতো দ্বিধা করো না। তোমার যা বলার বলো আমাকে।

আরিয়ান এতক্ষনে আসল প্রশ্নটা করলো।
— তুমি কি এখন বিয়ে করতে চাও নাকি পরে?

তাজকিয়া তার মত জানিয়ে বলল।
— ভাবি আমাকে বলেছিল স্বামী স্ত্রী নাকি একে অন্যের দ্বীনকে পূরণ করে। তাই আমিও পরিপূর্ণ দ্বীন অর্জন করতে চাই।

আরিয়ান বোনের কথা মন দিয়ে শুনে বলল।
— ঠিকাছে, সিয়ামকে তোমার কেমন লাগে? তোমার জন্য আমার সিয়ামকে উপযুক্ত মনে হলো। বাকিটা তোমার মতের উপর নির্ভর করে।

তাজকিয়ার তখন মনে পড়লো সিয়াম কীভাবে তার ভুল বুঝতে তাকে সাহায্য করেছিল। তাই সে সোজাসাপ্টা তার সম্মতি জানিয়ে বলল।
— সে যদি রাজি থাকে তাহলে আমার কোনো আপত্তি নেই।

ইশাত এতক্ষন নীরব দর্শক হয়ে তাদের কথা শুনছিল। আরিয়ান তখন তাকে প্রশ্ন করলো।
— তুমি কিছু বলছো না যে?

ইশাত তখন মুখে হাসি ধরে রেখে প্রত্যুত্তর করলো।
— আমারো প্রস্তাবটা পছন্দ হয়েছে। এমনটা হলেই ভালোই হবে।

কথাবার্তা বলে তারা রাতের খাবার শেষ করে যে যার রুমে ফিরে গেলো। আরিয়ান ইশাতকে নিয়ে রুমে আসতেই দরজা লক করে ক্লোজেট থেকে একটা গোল্ডেন কাজ করা শাড়ি বের করলো। ইশাত ঘুমানোর জন্য বিছানা ঝাড়তে ঝাড়তে প্রশ্ন করে বলল।
— শাড়ি কেন বের করলেন?

আরিয়ান তখন আরো কিছু গহনা বের করে ইশাতের হাত ধরে নিয়ে তাকে সোজা দাড় করিয়ে বলল।
— আজকে আমি তোমাকে সাজাবো।

ইশাত অবাক হয়ে মুখ ফুটে বলতে গেলো।
— হঠাৎ…

কিন্তু কথাটা সম্পূর্ণ বলে উঠার আগেই, আরিয়ান তাকে আর কিছু বলতে না দিয়ে তার তর্জনী ইশাতের ঠোঁটে রেখে তাকে চুপ করিয়ে বলল।
— চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকো, আজ মনের তৃপ্তি নিয়ে তোমাকে সাজাবো। অনেকদিন তোমায় আগের মতো সাজে দেখি না।প্রাণবন্ত সেই হাসিটা দেখি না। আমি আমার আগের ইশাতকে ফিরিয়ে আনতে চাই।

আরিয়ানের কথা শুনে ইশাত আর কোনো নড়াচড়ায় করলো না, আর কোনো কথাও বলল না। আরিয়ান সুন্দর করে ভাঁজে ভাঁজে তাকে শাড়িটা পড়িয়ে দিলো। ইশাত শুধু কর্মব্যস্ত আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে রইলো। শাড়িতে ইশাতের নারী সৌন্দর্য যেন কয়েক গুনে বেড়ে গেলো। আরিয়ান সেই সৌন্দর্যে অনায়াসে আকৃষ্ট হলো। শাড়ি পড়ানো শেষ করে সে ইশাতকে নিয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসালো। ইশাত আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে দেখলো শাড়ি পড়ানোটা বেশ নিখুঁত হয়েছে। তার জানতে ইচ্ছে হলো এর আগে আরিয়ান কি কখনো কাউকে শাড়ি পড়িয়েছে কিনা। এমন সময় আরিয়ান নিজে থেকেই বলল।
— ছোটবেলায় আমার আম্মুকে পড়তে দেখে শিখেছি, ছোট থেকেই আমার স্মৃতিশক্তি তুখোড় ছিল বলে মেথডটা এখনও মনে আছে।

প্রত্যুত্তরে ইশাত প্রোজ্জ্বল হাসলো। আরিয়ান তাকে সাজিয়ে এক এক করে মাথায়, গলায়, কানে, নাকে, হাতে, কোমরে গহনা পড়িয়ে ডেকে দিল। এমনকি শেষে নিজের পকেট থেকে একটা নুপুর বের করে ইশাতের সামনে হাঁটু মুড়ে বসে সে ইশাতের পা নিজের উরুর উপর তুলে রাখলো। আরিয়ানকে এমনটা করতে দেখে ইশাত নিজের পা সরিয়ে আনতে চাইলে আরিয়ান তার পা ধরে ফেলল, এবং ইশাতকে ইশারায় নড়তে বারন করলো। ইশাত বাধ্য স্ত্রীর মতোন স্বামীর বারন শুনল। আরিয়ান তখন তার পায়ের অংশের শাড়ির কাপড় সরিয়ে উপরে তুলতেই দৃশ্যমান হলো ইশাতের কোমল মসৃণ পা টা। আরিয়ান হাতের নুপুরটা তার পায়ে পড়িয়ে দিয়ে সেখানে গভীরভাবে চুমু খেল। ইশাত হকচকিয়ে উঠলে আরিয়ান তাকে টেনে এনে নিজের উরুর উপর বসিয়ে দিয়ে তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল।
“আজ সবকিছু নতুন করে শুরু করবো।”

ইশাত তাদের বিয়ের প্রথম রাতের মতো আরিয়ানের আলিঙ্গনে নেতিয়ে গেল। তখন আরিয়ান তাকে পুনরায় টুলে বসিয়ে বারান্দার পর্দাগুলো এক টানে মেলে দিতেই পূর্ণিমার জোসনার আলো এসে ইশাতের মুখের উপর পড়লো। আরিয়ান এই মায়াবী দৃশ্য দেখার জন্যই পর্দা মেলে দিয়েছিল। সে দুনয়ন ভোরে ইশাতকে দূর থেকে দেখতে লাগলো। আরিয়ানের গভীর দৃষ্টি উপেক্ষা করতে না পেরে ইশাত লজ্জায় আঁটসাঁট হয়ে বলে উঠলো।
— ইদানিং এতো ভারী সাজসজ্জা আর আগের মতো করতে ইচ্ছে করে না। এতকিছু না পড়ালেও পারতেন। এখন এসব ভারি গহনা, শাড়ি খুলতে গিয়ে বেগ পোহাতে হবে আমায়।

আরিয়ান নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল।
— তোমাকে খুলতে কে বলেছে?

ইশাত অবুঝ মনে প্রশ্ন করলো।
— তাহলে কি সারারাত এগুলো পড়ে থাকবো?

তখন হুট করে তাকে অবাক করে দিয়ে আরিয়ান বলল।
— উহু, যে পড়িয়েছে খোলার দায়িত্বটাও তার উপরেই।

কথাটা বলে আরিয়ান ব্যালকনির পর্দা পুনরায় টেনে রুমের লাইট অফ করে একটা ডিম লাইট জ্বালিয়ে দিল। পুরো ঘর তখন আধারে ছেয়ে গেলো। ইশাত টুল থেকে উঠে দাড়ালো।তাদের মধ্যে একটা মোহাবিষ্ট মুহূর্ত তৈরি হলো। আরিয়ান কাছে এসে ইশাতকে গভীর প্রণয়ের আলিঙ্গনে জড়িয়ে নিলো। এমন ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে আরিয়ান ফিসফিসানো গলায় বলে উঠলো।
“আমি বেঁচে থাকতে তোমার কিসের এতো কষ্ট? আইল ফিক্স এভরিথিং মাই লাভ।”

——————

তাজকিয়া আর সিয়ামের বিয়ে নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে কথা পাকাপাকি হলে, কয়েক সপ্তাহ পরে আরিয়ানের বাসায় ঘরোয়া ভাবে জাঁকজমক করে বিয়ের আয়োজন করা হলো। আরিয়ানের উদ্যেগে পুরো বাড়ি আধুনিক লাইটিংয়ে সাজানো হয়েছে। ইশাত, আদিবা, সানজিদা আর জেরিন মিলে এটা ওটা করে তাজকিয়াকে সাজিয়ে দিতে শুরু করেছে। একজন তাকে মেহেদী পড়াচ্ছে, আরেকজন মেকাপ করে দিচ্ছে, আরেকজন জামা সেট করে দিচ্ছে, তো আরেকজন গহনা বাছাই করে দিচ্ছে। মোট কথা তারা সবাই আপাতত তাজকিয়াকে নিয়ে ব্যস্ত। তাজকিয়া বিষয়টা বেশ উপভোগ করছে।

কিছুক্ষন পর কবুল পড়ানোর সময় হলে তাজকিয়াকে নিয়ে বসানো হলো হল রুমে। সকল মহিলারা সেখানে উপস্থিত। এতক্ষনে ইশাতের মা আসিয়া বেগম আর সিয়ামের মায়ের মাঝে ভালোই ভাব জমে উঠেছে। তারা একসাথে দাড়িয়ে তাজকিয়ার কবুল পড়ানো দেখলেন। এরপর সবাই একসাথে মোনাজাতের জন্য হাত তুললেন। তাজকিয়া কবুল পড়ানো হলে সিয়ামকে মসজিদে কবুল পড়ানো হলো। পুরুষরা সকলে সিয়ামের সঙ্গে মসজিদেই রয়েছে। তাদের বিয়ে সম্পন্ন হতেই সবাই সবাইকে অভিনন্দন জানিয়ে মিষ্টি মুখ করালো। এমন সময় জেরিনও সখ করে ইশাতকে মিষ্টি খাইয়ে দিলো। কিন্তু মিষ্টিটা মুখে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইশাত অসস্তিতে মুখে হাত চেপে ধরলো। মিষ্টির স্বাদ আর গন্ধ দুটিতেই যেন তার ভেতরটা উগরে আসতে চাইছে।

ইশাত আর সহ্য করতে না পেরে তড়িৎ ওয়াশরুমের দিকে ছুটে গেলো। জেরিন চিন্তিত হয়ে তার পিছু গেল। এতো কোলাহলের মাঝে তাদের কেউ খেলার করলো না। এদিকে ইশাত ওয়াশরুমের বেসিনের টেপ ছেড়ে পেটের ভেতরে থাকা সব খাবার গড়গড় করে উগরে দিলো। জেরিন কাছে গিয়ে তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিলো। পরমুহুর্তে সে কিছু একটা ভেবে শঙ্কিত হলো। তাই ইশাতকে প্রশ্ন করলো।
— তোমার টেস্ট কিটটা কোথায় রেখেছ ইশাত?

ইশাত চোখে মুখে পানির ঝাপটা দিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করে বলল।
— বেড সাইড ড্রয়ারে।

জেরিন দ্রুত গিয়ে সেটা এনে ইশাতের হাতে দিলো। ইশাত কিছুক্ষণ পর পরীক্ষা করে জানতে পারলো সে আবারো সন্তানসম্ভবা। তার ভেতরে তখন আনন্দ এবং পূর্বের ভয় একসাথে জেঁকে বসলো। জেরিন তখন রুমে অপেক্ষা করছিল। ইশাত ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এসে জেরিনকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল। জেরিন তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে জানতে চেয়ে বলল।
— পজিটিভ?

ইশাত উপর নিচ মাথা দোলালো। জেরিন আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করলো না, সে খুশিতে আরিয়ানকে কল করে সুসংবাদটা জানিয়ে দিল। আরিয়ান খবর পেতেই বাড়িতে ছুটে চলে এলো। ততক্ষণে বাড়িতে সবার মাঝে জেরিন এই সুসংবাদ ছড়িয়ে দিয়েছে। আরিয়ান ফিরতেই আসিয়া বেগম তাকে অনুরোধ করে বললেন।
— বাবা বলছিলাম কি মেয়েরা তো এই সময়টাতে মায়ের বাসায় থাকে। তাদের বিশেষ একটা যত্নের প্রয়োজন হয়। আমি চাইছি ইশাতকে এই সময়টাতে আমার কাছে নিয়ে রাখতে।

আরিয়ান তখন আপত্তি জানিয়ে বলল।
— না আম্মু, এর আগে যে ভুলটা করেছি সেটা আমি আর দ্বিতীয়বার করতে চাই না। এর আগে ইশাতের এই সময়ে আমি ওর থেকে দূরে ছিলাম। কিন্তু এখন থেকে ওর মনের শক্তি হয়ে আমি ওর পাশে থাকতে চাই। দরকার হলে আপনারা এসে আপনার মেয়েদের সাথে এখানে থেকে যাবেন, এতে আমার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু এই সময়টাতে আমি ওকে চোখের আড়াল করতে চাইছি না। আমার স্ত্রীর যা যা যত্নের প্রয়োজন হবে আমি করবো।

আসিয়া বেগম মেয়ের জামাইয়ের মনের হাল বুঝতে পেরে সম্মতি দিয়ে বললেন।
— ঠিকাছে বাবা, তুমি যেমনটা ভালো মনে করো।

আরিয়ান তখন জেরিনের দিকে ঘুরে প্রশ্ন করলো।
— ইশাত কোথায়?

জেরিন তাকে জানালো।
— রুমেই আছে।

তখন আরিয়ানও ইশাতের সঙ্গে তার খুশি ভাবাভাগী করতে রুমের দিকে চলে গেল। বাহিরে সবাই আবারো সবার মতো আনন্দ জুড়ে দিলো।

দুই বছর পর
—————–

ছোট একজোড়া হাত পবিত্র কাবা শরিফের কালো গিলাফ স্পর্শ করার প্রয়াসে হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু ছুঁতে পারছে না বলে মুখ ভার করে রেখেছে। তার এই ইচ্ছেটুকু পূরণ করতে তার বাবা তাকে এগিয়ে ধরতেই বাচ্চাটা খিলখিলিয়ে হেসে পবিত্র গিলাফ স্পর্শ করলো। নিষ্পাপ ছোট শিশুটার গোলগাল মুখটা হাসিতে খিলখিল করছে। বাচ্চা মেয়েটা দেখতে একদম আরিয়ানের মতো হয়েছে। কেউ দেখলে বলবে একদম বাবার ফটোকপি। এই মুহূর্তে ইশাত, আরিয়ান আর তাদের ভালোবাসার একমাত্র নিশানি তাদের মেয়ে ইনাম আল্লাহর পবিত্র ঘরের সম্মুখে উপস্থিত। আরিয়ান এক হাতে মেয়েকে কাঁধে তুলে অন্য হাতে ইশাতকে জড়িয়ে ধরে আছে। আরিয়ান আর ইশাত কৃতজ্ঞতা স্বরূপ আল্লাহর পবিত্র ঘরের দিকে অন্তর শীতল করা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে মেয়ের হাস্যজ্জল মুখশ্রীর দিকে পুনরায় তাকালো।

এমন সময় অদূর থেকে এক দম্পত্তির কথপোকথন ভেসে এলো। ইশাত সেদিকে তাকিয়ে খেয়াল করলো তাদের কোলে যমজ দুটো ফুটফুটে ছেলে মেয়ে। তাদের কথোপকথন শুনে ইশাত জানতে পারলো, মেয়েটার নাম জাফরীন আর তার স্বামীর নাম জুবরান। লোকটা তার স্ত্রী সন্তানদের দুহাতে আগলে রেখেছে যেমনটা আরিয়ান তাকে আগলে রেখেছে। লোকটা ঠিক একই মোহগ্রস্ত দৃষ্টিতে নিজের স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে আছে যেমনটা আরিয়ান তার দিকে তাকিয়ে থাকে। তাদের ভালোবাসার মাঝে নিজেদের উদাহরণ খুঁজে পেতেই আনমনে হাসিতে ইশাতের ঠোঁট প্রশস্ত হয়ে গেলো। পরক্ষণে তাদের কোলে যমজ বাচ্চাদের দিকে পুনরায় দৃষ্টি পড়তেই তার নিজের হারানো সন্তানদের কথা মনে পড়ে গেলো। এমন সময় আরিয়ান ইশাতকে সেদিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে প্রশ্ন করলো।
— কি দেখছো?

ইশাত ব্যাথাতুর হেসে বলল।
— দেখুন তাদের কোলে কি সুন্দর ফুটফুটে দুটো যমজ ছেলে মেয়ে বারাকাল্লাহু ফিক। নজর না লাগুক। আজ আমাদের বাচ্চারা দুনিয়াতে জীবিত ভূমিষ্ঠ হলে নিশ্চই তারাও এমন থাকতো তাই না?

আরিয়ান স্ত্রীকে সান্তনা দিয়ে তার কপালে চুমু এঁকে বলল।
— মন খারাপ করো না জান, আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন। তারা নিষ্পাপ, জান্নাতের পাখি তারা। আল্লাহ চাইলে আমাদের মৃ’ত্যুর পর তারা আমাদের জন্য সাফায়েত করবে। আমরা কত ভাগ্যবান ভেবে দেখেছ? ওদের চলে যাওয়ার পরই আল্লাহ আমাদের মেয়ে ইনামকে উপহার হিসেবে দিয়েছেন আমাদের জীবনে।

ইশাত মাথা নাড়িয়ে সন্তুষ্টিতে আলহামদুলিল্লাহ বলে, পুনরায় সেই দম্পতিদের দিকে তাকিয়ে বলল।
— তাদের পরিবারটা অনেক সুন্দর তাই না?

ইশাতের কথায় আরিয়ান সেদিকে তাকালো। তাদের থেকে কিছুটা দূরেই সেই দম্পতি দাড়িয়ে। সেই লোকটার পিঠে ঈগল খচিত ট্যাটু, সঙ্গে হাতের কব্জিতে মিউজিকাল ইন্সট্রুমেন্ট ট্যাটু করা। আরিয়ান তখন বলতে শুরু করলো।
— সে একটা সময় ফেমাস হলিউড সিঙ্গার ছিল। মুসলিম হওয়া শর্তেও সে ছিল অবাধ্য। নানান ধরনের হারামে লিপ্ত ছিল। যেমনটা আমি মুসলিম হওয়ার আগে ছিলাম। কিন্তু বিয়ের আগে এনাউন্স করে সে সব ছেড়ে দিয়ে ধর্মে মন দিয়েছে।

ইশাত অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো।
— আপনি কি করে এতসব কিছু জানলেন তার সম্পর্কে?

আরিয়ান স্পষ্ট করে জানালো।
— সে একজন মিডিয়া পারসন ছিল। এসব তথ্য সোশ্যাল মিডিয়াতে তখন ভাইরাল টপিক ছিল। তাই আমারও নজরে আসে। কিন্তু আমার কি মনেহয় জানো? তুমি যেমন আমার জীবনে এসে আমার অগোছালো জীবনটাকে শুধরে নিয়েছ, হয়তো তারও জীবনে এমন কেউ এসেছে বলেই এটা সম্ভব হয়েছে।

আরিয়ানের কথা শুনে ইশাত তখন লোকটার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বলল।
— হয়তো তাদের জীবনেও আমাদের মতো দীর্ঘ কোনো এক গল্প রয়েছে। আল্লাহ তাদের সম্পর্কে আরো বরকত দান করুক। তাদেরকে সারাজীবন এভাবেই একসাথে হাসিখুশি জীবন যাপন করার তাওফিক দান করুক। তাদের সন্তানদের নেক হায়াত দান করুক এবং ঈমানদার হিসেবে গড়ে তুলুক।সাথে আমাদেরও আল্লাহ একই নেয়ামত দান করুক।

আরিয়ান তখন ইশাতকে আরো ভালো মতন জড়িয়ে নিয়ে বলল।
— আমিন।

পরক্ষণে আরিয়ান উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল।
— আল্লাহর বরকতে তুমি কিন্তু চাইলে আমি তোমাকে পুরো ফুটবল টিম উপহার দিতে পারি। আমার কোনো আপত্তি নেই এতে।

আরিয়ানের এমন কথায় ইশাত লজ্জা পেয়ে তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বলল।
— উফ, চুপ করুন। সব জায়গায় শুরু হয়ে যান একদম।

ইশাতের এমন নাজেহাল অবস্থা দেখে আরিয়ান ঠোঁট টিপে হাসলো। ইশাত লজ্জায় আশেপাশে তাকালো। এমন সময় জাফরীন নামের মেয়েটা ইশাতের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। সেটা লক্ষ্য করে প্রত্যুত্তরে ইশাতও আন্তরিক হাসলো। দুদিকে দুই দম্পতি আজ মনে আন্তরিকতা নিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির উপর অবিচল থেকে জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন পূরণ করতে যাচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আরিয়ান আর জুবরান নিজেদের স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনায় সফল ভাবে হজ্জ পালনের নিয়তে অগ্রসর হলো। উপর থেকে আল্লাহর রহমতও তাদের উপর বর্ষিত হতে থাকলো।

( সমাপ্ত )