#ক্লান্তিহীন_তুই_আমার_ফরিয়াদ
#পর্বঃ১৫
#সুমাইয়া_জান্নাত_ইলমা
[🚫ভায়োলেশন এলার্ট ]
বিয়ের সাজে আয়নার সামনে বউ সেজে বসে আছে ইশাত। নিজেকে এই সাজে আজ বেশ অপরিচিত মনে হচ্ছে তার। ভাবতেই তার বেশ অবাক লাগছে আর কিছুক্ষণের মাঝেই তার নাম জুড়ে যাবে অন্য কারো নামের সাথে। প্রত্যেকটা মেয়ের জীবনে এই দিনটা নাকি বিশেষ একটা দিন। কিন্তু তার ক্ষেত্রে যেন ব্যাপারটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিয়ের কনের ন্যায় তার মধ্যে বিশেষ কোনো ভাবান্তর নেই। তার গায়ে লেপ্টে আছে মারুন রঙের কারুকাজ করা ফুল স্লিভস হাতার লেহেঙ্গা। প্রায় ঘন্টাখানেক সময় নিয়ে সানজিদা বেশ যত্ন সহকারে তাকে হিজাব আর গহনা পরিয়ে সাজিয়ে দিচ্ছে। ইশাত কোনরূপ নড়চড়বিহীন চিনির পুতুলের মতো চুপচাপ টুলে বসে আছে। সানজিদা সাজানো শেষ করে তাকে ভালোমতন একনজরে দেখে বলল।
— আল্লাহুম্মা বারিক লাক, কি সুন্দর লাগছে তোমাকে দেখতে! একদম যেন জীবন্ত একটা পুতুল।
সানজিদা মুখের কথা শেষও করতে পারলো না তার আগেই ইশাতের ফোনের নোটিফিকেশনের আওয়াজে সানজিদার নজর তার ফোনে চলে গেলো। স্ক্রিনে ভাসছে আসিফের দেওয়া ম্যাসেজ যেখানে লিখা।
“এই মুহূর্তে গিয়ে মনে হচ্ছে অপেক্ষা সবচেয়ে কঠিন একটা কাজ। আমার হবু বউটাকে দেখার তর যে সইছে না। আর মাত্র কিছুক্ষণ বাকি এরপর আর পালাতে পারবেন না আপনি আমার থেকে। আপনাকে চিরজীবনের জন্য আমার করে নিব মেডাম।”
সানজিদা ফোন হাতে নিয়ে দুষ্টুমি করে ম্যাসেজটা পড়ে ইশাতকে শুনিয়ে বলল।
— বাবাহ্ এখন থেকেই কি আহ্লাদ। বিয়ের পরে দেখবে একেবারে আদরে মাখিয়ে রাখবে তোমাকে।
ইশাত কিছু বলল না। সানজিদা তখন বেরিয়ে যেতে নিয়ে বলল।
— তুমি বসো আমি একটু বাহিরটা দেখে আসি।
ইশাত বেখেয়ালি হয়ে বসে আছে তখন তার ফোনে আদিবা ভিডিও কল দিলো। সে সময় নিয়ে সেটা তুলল। ওপাশ থেকে আদিবা মন খারাপ করে সালাম দিয়ে বলল।
— তোর জীবনের এই বিশেষ দিন নিয়ে কত শখ ছিল আমার অথচ আসতে পারি নি। দোয়া করি তুই সুখী হ।
ইশাত দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সালামের উত্তর নিয়ে বলল।
— সমস্যা নেই পরে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়েটা হলে তখন নাহয় থাকবি।
আদিবা ইশাতকে মনোযোগ দিয়ে পরখ করে বলল।
— বিয়ের দিন মেয়েদের মনে কত কৌতুহল থাকে আনন্দ থাকে তোর এমন মরামরা দেখাচ্ছে কেন? একটা কথা সত্যি করে বল তো, তুই কি নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে আসিফকে বিয়ে করছিস তাই না? তুই কি এখনো ওই লোকটাকে ভালবাসিস?
— আমার ইচ্ছা অনিচ্ছা এখানে কোনো বিষয় না আদিবা। আমি ভেবে নেব আমার হেদায়েতের পথে ফেরার অনিহা ছিল বলেই আল্লাহ এমন এক জারিয়া তৈরি করেছিলেন যাতে আমি তার কাছে ফিরতে বাধ্য হই। আমি তার ইচ্ছেতেই সন্তুষ্ট। আর সেই পথেই অবিচল। দুনিয়ার কোনো চাওয়াই আমার রবের থেকে বড় হতে পারে না। আমি নাহয় আমার রবের জন্য নিজের অবাধ্য চাহিদাগুলো ত্যাগ করলাম। প্রত্যেকটা ছেলে মেয়ের উচিত নিজের হৃদয়ের সকল ভালোবাসা, অনুভূতি, আবেগ নিজের মাহরামের জন্য বাঁচিয়ে রাখো। আর আমি কি করেছি? মরীচিকার পেছনে ছুটে সময় নষ্ট করেছি। আল্লাহ পূর্বেই আমার জন্য একটি নির্দিষ্ট রুহু সৃষ্টি করে রেখেছিলেন। আমার অর্ধেক দ্বীনকে আমার জন্য নির্ধারণ করে রেখেছিলেন। আমার গল্পের লেখক তো তিনি নিজেই। তাকেই সব সামলে নিতে দে। শুধু সময়ের অপেক্ষা তিনি সব ঠিক করে দিবেন।
সানজিদা মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানালো ইশাতকে নতুন জীবন শুরু করার অভিনন্দন আগেই জানিয়ে দিলো। কথার একটা পর্যায়ে আদিবা লক্ষ্য করলো ইশাতের মুখটা কেমন শুকিয়ে আছে। সে কল কাটার পূর্বে বলল।
— একটু পানি খেয়ে নে তোর মুখটা কেমন শুকিয়ে আছে।
ইশাত হ্যাসূচক মাথা দুলিয়ে ফোন কেটে ড্রেসিং টেবিলের উপর রাখা বোতলটা থেকে পানি পান করে নিলো। পানি গলা দিয়ে নামতে না নামতেই তার মাথা চক্কর দিয়ে চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। কয়েকমুহূর্তেই ঝাপসা চোখে অন্ধকার নেমে এলো।
ওদিকে কিছুক্ষণ হলো আসিফ পরিবারসহ ইশাতদের বাসায় এসে পৌঁছেছে। কাজীও ইতিমধ্যে উপস্থিত। আসিয়া বেগম সানজিদাকে বললেন ইশাতকে তার রুম থেকে নিয়ে আসতে। সানজিদাও এগিয়ে গেলো তাকে আনতে। তবে রুমে ঢুকেই কোথাও পেলো না সে ইশাতকে। ওয়াসরুমে খুঁজে দেখলো সেখানেও নেই। এরপর যখন বারান্দায় খুজতে গেলো তখন তার নজরে আটকালো অপ্রত্যাশিত কিছু। বারান্দার রেলিংয়ে একটা সরু দড়ি শক্ত করে বাধা যা একদম নিচ পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে। সেটা দেখার সঙ্গে সঙ্গে দুর্ভাবনায় তার মনে ভয় জেঁকে বসলো। ওদিকে বাইরে থেকে আসিয়া বেগমের ডাক পড়ছে সানজিদা কি উত্তর দিবে ভেবে পাচ্ছে না। একপর্যায়ে আসিয়া বেগম হন্তদন্ত পায়ে নিজেই চলে এলেন। তিনি রুমে কাউকে না পেয়ে বারান্দায় গিয়ে দেখলেন সানজিদা কাঠকাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সানজিদার দৃষ্টি অনুসরণ করে যখন তিনিও ঝুলে থাকা দড়িটা দেখলেন তখন অচেনা আশঙ্কায় তার মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো।
ওদিকে স্ত্রী আর বউকে না ফিরতে দেখে ইমরানও কিছুক্ষণের মধ্যে চলে এলো। বাহিরে আসিফের দাদি আর ধৈর্য ধারণ করে থাকতে পারলো না তিনিও পিছু পিছু চলে এলেন। কিন্তু যখন তিনি রুমে ঢুকে এই অপ্রত্যাশিত দৃশ্যটি দেখলেন সাথে সাথে কপালে হাত দিয়ে হাঁক ছেড়ে বলে উঠলেন।
“আয়হায় রে মাইয়া তো পলাইসে।”
তার চিৎকার শুনে বাকিরাও ছুটে এলো। আসিফ এসে থ মেরে দাড়িয়ে রইলো। ইশাত তাকে বিয়ে করবে না বলে এভাবে পালিয়ে যাবে ভাবতেই তার বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠলো। ইমরান তো বিশ্বাসই করছে না তার বোন এমন কোনো কাজ করতে পারে। তার অটুট বিশ্বাস তাদের চোখের আড়ালে কিছু একটা ঘটেছে এখানে। বোনের চিন্তায় সে মাথার চুল খামচে ধপ করে বসে পড়লো।
_______________________
বনভূমি বা জঙ্গলের কিছু অঞ্চল মা’ফিয়াদের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত যেমন অ্যামাজন রেইনফরেস্টও তাদের অন্যতম। দক্ষিণ আমেরিকার এই বিশাল জঙ্গলের অনেকটা অংশজুড়ে মা’দক সম্রাট এবং অ’বৈধ কাঠুরে মা’ফিয়াদের গোপন আ’স্তানা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বলা চলে এটি মা’ফিয়াদের জন্য বর্তমানে সবচেয়ে বড় স্বর্গরাজ্য। তারা সাধারণত এসব রেস্ট্রিক্টের জায়গাগুলোতে অনায়াসে নিজেদের অ’পকর্ম চালিয়ে যায়। বিভিন্ন গোষ্ঠীর অ’পরাধী দলগুলো মা’দক পা’চার, অ’বৈধ স্বর্ণ খনন এবং কাঠ পা’চারের কাজ অবলীলায় চালিয়ে যাচ্ছে এই দুর্গম জঙ্গলের গহীনে।
তারা জঙ্গলের গহীনে গোপন বিমানবন্দর তৈরি করে মা’দক পরিবহনের জন্য। দুর্গমতা পেরিয়ে ঘন জঙ্গলের কারণে পুলিশ বা সেনাবাহিনী সহজেই সেখানে পৌঁছাতে পারে না। যা তাদের কাজ আরো সহজ করে দেয়। এমনকি বড় বড় গাছের ছাউনি জঙ্গলকে এমনভাবে ঢেকে রেখেছে যে উপর থেকে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে তাদের আ’স্তানা অথবা গোপন বিমানবন্দর দেখা প্রায় অসম্ভব। ভৌগলিক দিক দিয়ে জঙ্গলটি এসব অপ’রাধীদের জন্য নিখুঁত একটা জায়গা।
কালো আঁধারে আচ্ছাদিত একটা রুমের বিছানায় জ্ঞান হারিয়ে পড়ে আছে ইশাত। অকস্মাৎ এক ভয়ানক হৃদয়বিদারক চিৎ”কারে তার জ্ঞান ফিরলো। ভয়ে সে বিছানার চাদর খামচে ধরলো। আশেপাশে দৃষ্টি দিতেই নিজেকে অচেনা একটা জায়গায় আবিষ্কার করলো। অচেনা আতঙ্কে তার ভেতর ধড়ফড়িয়ে উঠলো। সে স্বপ্ন দেখছে নাকি বাস্তবে এমনটা হচ্ছে তা বন্ধগম্য হলো না। বাহিরে চিৎকারটা ক্রমশই তীব্র হচ্ছে। ইশাত ভয়ার্ত কদমে একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছে দরজার দিকে। রুমের দরজা তখনও আধখোলা। দরজার ফাঁক গলিয়ে দৃষ্টি দিতেই ভয়ে তার চোখ দুটি পূর্বের তুলনায় আরো বড়বড় হয়ে এলো।
বাহিরে বিশাল বিশাল দানব আকৃতির অনেকগুলো গার্ড একযোগে বলিষ্ঠ কায়াকে কেন্দ্র করে দাড়িয়ে আছে। যেন কোনো এক স্বতন্ত্র সত্তার আদেশ ব্যতিত তারা তাদের জায়গা থেকে এক চুলও নড়বে না। তাদের কেন্দ্রবিন্দুতে ডিভানে পায়ের উপর পা তুলে স্বাচ্ছন্দ্যে বসে আছে ফর্মাল স্যুট পরিহিত এক মানব। পরমুহুর্তে অবস্থান পরিবর্তন করে দুই পায়ের মাঝে যথেষ্ট দূরত্ব রেখে প্রশস্ত হয়ে বসলো সে। উল্টোপাশে ফিরে বসার কারণে তার মুখায়ব দেখা দায়। তার এক হাতে ধরে রাখা একটা হা’তুর। আর অন্যহাত অনায়াসে বুলিয়ে দিচ্ছে একপাশে দুটি বিশাল আকৃতির চিতাবাঘের গায়ে। যেন তারা তার পোষা বিড়াল। হিং’স্র পশু দুটিও যেন মালিকের স্পর্শ পেয়ে তাদের চিরাচরিত সত্ত্বা ভুলে পোষ মেনে মাথা নুইয়ে রেখেছে।
তাদের মধ্যে একটি পার্সিয়ান লিওপার্ড এবং অন্যটি জাগুয়ার। দুটি প্রাণীই হিং”স্রতায় সেরা। জাগুয়ার চিতাবাঘের চেয়ে বড় এবং সব বিড়াল প্রজাতির মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী চোয়াল বা কাম’ড়ের শক্তি এদের। এরা কচ্ছপের শক্ত খোলস বা কুমিরের চামড়াও চিবিয়ে ফেলতে পারে। অন্যদিকে পার্সিয়ান লিউপার্ড তাদের ওজনের চেয়ে কয়েকগুণ বড় শিকার অনায়াসে কাবু করতে পারে। এদের শক্তিশালী চোয়াল এবং ঘাড়ের পেশি শিকারের শ্বাসনালী চপে ধরে দ্রুত মে’রে ফেলার জন্য পরিচিত।
লোকটার পায়ের কাছে দুজন গার্ড একজন বয়স্ক লোককে চেপে ধরে রেখেছে। সে পাশ”বিকতা নিয়ে তার পায়ের কাছে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা লোকটার হাতের প্রত্যেকটা আঙুলে একটা করে খিল মেরে দিচ্ছে তার হাতে থাকা হাতুরের সাহায্যে। অসহায় লোকটার আঙুল ভেঙে চুরমার হয়ে ফিনকি দিয়ে লাল লাল তরল বেরিয়ে আসছে অনায়াসে। ফ্লোর ভেসে যাচ্ছে সেই তরলে। আশেপাশে ছড়িয়ে যাচ্ছে উৎ’কৃষ্ট র”ক্তের গন্ধ। বয়স্ক লোকটা বিপরীত ব্যক্তির এমন পাশ”বিক নি”র্যাতনে সহ্য করতে না পেরে ভুবন কাঁপিয়ে চিৎকার করে যাচ্ছে সেই তখন থেকে। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো কেউই সেই চিৎকার শুনে ছুটে আসছে না। অবশেষে অতিরিক্ত র”ক্ত ক্ষরণে লোকটা জ্ঞান হারালো। গার্ডরা টেনে হিঁচড়ে তার অচেতন দেহ সেখান থেকে নিয়ে গেল।
ইশাত এ কোথায় এসে পড়লো? সে এই দৃশ্য আর সইতে না পেরে চিৎকার করে স্বশব্দে বলে উঠলো।
“ওনাকে ছেড়ে দিন। নয়তো খুব খারাপ হয়ে যাবে।”
কথাটা বলে যেনো ইশাত বোকামি করে বসলো। আওয়াজ পেয়ে হাতুর হাতে নিয়ে বসা লোকটি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই তাকে দেখে ইশাতের হৃদয় এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে গেলো। চারটি বছর পর মিস্টার গোল্ডেনকে সে এরূপে দেখবে তা কখনো কল্পনাও করে নি। তার চোখ চাতকের ন্যায় লোকটাকে নীরবে দেখে যাচ্ছে। ভেতরের পুরোনো ক্ষতগুলো নতুন করে জেগে উঠছে। পরক্ষণেই তার এমন নি”সংশতার কথা উপলব্ধি করে ইশাতের মনে ছেয়ে গেলো তিক্ততা।
এভিয়ান বাজ পাখির ন্যায় তার নজর তাক করলো ইশাতের উপর। হুংকার ছেড়ে বলে উঠলো।
“ভাই বোন দুজনেরই সাহস দেখছি আকাশচুম্বী।”
এভিয়ান তার ভাইয়ের কথা উল্লেখ করাতেই ইশাত যেন কিছু একটা ধারণা করতে পারলো। সে চোখমুখ শক্ত করে বলল।
“আপনি নিশ্চই আমার ভাইয়ের সাথে প্রতিশোধ তুলতে আমাকে অপ'”হরণ করে নিয়ে এসেছেন?”
এভিয়ান বিদ্রূপাত্মক হেসে পরমুহুর্তে মেকি হতাশা দেখিয়ে ইশাতকে বলল।
“গ্রেট ক্যালকুলেশন। বাই দ্যা ওয়ে মাত্র যে লোকটাকে দেখলে সে কিন্তু তোমার ভাইয়ের পাঠানো স্পাই ছিল। সেদিন কত করে বললাম আমার পেছনে না লাগতে সে আমার কোনো কথা শুনলো কোথায়? তাই আমাকে একপ্রকার বাধ্য হয়েই কাজটা করতে হলো।”
ইশাত থ মেরে দাড়িয়ে রইলো। এতদিন তার চোখে দেখা সবচেয়ে সুদর্শন পুরুষটিকে যেন এই মুহূর্তে সবচেয়ে নি”কৃষ্টতম মানুষ মনে হচ্ছে। ঘৃ’ণা আর বিতৃষ্ণা নিয়ে সে জোড় গলায় বলল।
“আপনি একটা নি”কৃষ্ট, পশুর থেকেও নি”কৃষ্ট। আমার ভাইয়া জানতে পারলে আপনাকে ছাড়বে না।”
“ওহ তাই নাকি? কই বলো আসতে তোমার ভাইয়াকে! এতদিনে তো তোমাদের পুরো এলাকায় রটিয়ে গেছে আইজিপি ইমরান হাসানের বোন বিয়ের আসর ছেড়ে পালিয়েছে।”
“মানে! কি করেছেন আপনি? আর এতদিনে মানে? আজ কতদিন পর আমার জ্ঞান ফিরলো?
“তোমাকে খুঁজে পাওয়া তোমার ভাইয়ের পক্ষে অসম্ভব, তার সাধ্যের বাইরে।”
“কোথায় নিয়ে এসেছেন আমাকে?”
প্রত্যুত্তরে এভিয়ান কুটিল হেসে ইশাতকে উপেক্ষা করে টপ ফ্লোরে যাওয়ার জন্য সবে মাত্র স্টেয়ারকেসে পা রেখেছে তখন পেছন থেকে ইশাত এসে তাকে থামিয়ে বলল।
“দাড়ান বলুন আমাকে আগে, কোথায় নিয়ে এসেছেন? উত্তর না দিয়ে এক পাও নড়বেন না আপনি।”
ইশাতের সাহস দেখে এভিয়ান প্রভাবিত হলো। ইশাতের চোখের উষ্মায় জ্বলে উঠলো তার সত্ত্বা। এমন দুঃসাহসের দায়ে গার্ডরা ইশাতের দিকে এগিয়ে এলে সে চোখের ইশারায় তাদের পিছিয়ে যেতে বলল তারাও সেটাই করলো। এভিয়ান এক পা এক পা করে ইশাতের দিকে এগিয়ে আসছে ইশাত সেটা দেখে আতঙ্কিত হয়ে পিছিয়ে যাচ্ছে। এভিয়ানের তীক্ষ্ম গভীর দৃষ্টিতে দৃষ্টি রাখতেই তার ভেতরের সব সাহস মুহূর্তেই মিলিয়ে যাচ্ছে। একপর্যায়ে পেছাতে পেছাতে ইশাত দেয়ালের সাথে ঘেষে গেল। ভাগ্যক্রমে তার নজর গিয়ে ঠেকলো এভিয়ানের পেন্টের পকেটে গুঁজে রাখা বন্দু’কের দিকে। সে কোনো উপায়ন্তর না পেয়ে আত্মরক্ষার খাতিরে কৌশলে সেই ব’ন্দুক হাতে তুলে নিয়ে ট্রিগারে আঙুল রেখে এভিয়ানের বুক বরাবর তাক করলো।
এভিয়ান সেটা দেখে তাচ্ছিল্য হেসে বলল।
— শুট।
ইশাতের ঠোঁট তিরতির করে কাপছে। সেটা দেখে এভিয়ান আবারো জোরালো গলায় হুংকার ছাড়লো।
— কি হলো? শুট মি!
ইশাত রক্তিম চোখে শুধু চেয়ে আছে। তার ব’ন্দুক ধরা হাত থরথর করে কাপছে। তাকে কোনোরূপ পদক্ষেপ নিতে না দেখে এভিয়ান ছৌ মেরে বন্দুকটি নিজের হাতে ফিরিয়ে নিয়ে সেটা তার আঙুলের ডগায় ঘুরাতে ঘুরাতে ভ্রুকুটি করে বলল।
— সব তেজ কি শুধু মুখে মুখে?
ইশাত সঙ্গে সঙ্গে তেজি গলায় উত্তর দিলো।
— আমি আপনার মতো অ’মানুষ নই যে মানুষ খু’ন করতে হাত কাপবে না।
এভিয়ান তাকে তাচ্ছিল্য করে এড়িয়ে যেতে নিলে ইশাত আবারো পেছন থেকে প্রশ্ন করলো।
— বলুন কোথায় এনেছেন আমায়? বলতে কি ভয় হচ্ছে? এটুকু কলিজা নিয়ে আমাকে গু’ম করেছেন?
এভিয়ান বুঝলো ঠিকই ইশাত যে কথার কৌশলে তার থেকে সবটা জেনে নিতে চাইছে। এতে অবশ্য তার কোনো যায় আসে না তাই সে ইশাতকে প্রজ্বলিত করতে বলল।
— জেনেও তো কোনো উপকারে আসবে না তোমার।
ইশাত মুখে দৃঢ়তা টেনে বলল।
— তবুও শুনতে চাই।
তখন এভিয়ান যেতে যেতে নিষ্ক্রিয় ভঙ্গিতে উত্তর দিয়ে গেলো।
— আমাজন রেইনফরেস্ট।
চলবে ( ইনশাআল্লাহ )………………….
#ক্লান্তিহীন_তুই_আমার_ফরিয়াদ
#পর্বঃ১৬
#সুমাইয়া_জান্নাত_ইলমা
আমাজন রেইনফরেস্টের গহীনে বিশাল এলাকা জুড়ে জনমানবহীন সাধারণ লোকচক্ষুর আড়ালে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে একটি বিলাসবহুল কাঠের কটেজ। অত্যাধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার সমন্বয়ে এই দূর্ভেদ্য এবং গোপন আস্তানাটি বেষ্টিত। কটেজের চারপাশে ভারী অ’স্ত্রধারী পাহারাদাররা অটল ভঙ্গিতে যন্ত্রের মতো দাড়িয়ে। এ ধরনের কটেজকে অধিকতর পর্তুগিজ ভাষায় ফাজেন্দা বলা হয় যা মূলত ব্রাজিল ও দক্ষিণ আমেরিকায় বিশাল খামারবাড়ি বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
যেহেতু জঙ্গল এলাকা, তারউপর বড় দালান বানালে স্যাটেলাইট বা ড্রোন ইমেজে ধরা পড়ার আশঙ্কা থাকে।তাই বহু আগে এভিয়ান তার তীক্ষ্ণ মস্তিষ্ক কাজে লাগিয়ে আমাজনের নির্জন এই স্থানে বিলাসবহুল কাঠের কটেজটি তৈরি করেছিল। এই পর্যন্ত সে এই কটেজকে তার হাইড-আউট হিসেবে ব্যবহার করে এসেছে। এর ভেতরের কাঠের কাজ অনেক দামী হলেও বাইরে থেকে জঙ্গল বা গাছের আড়ালে এমনভাবে রাখা হয় যেন সহজে চোখে না পড়ে।
সহজ কথা বাইরে থেকে দেখতে কটেজটা হয়তো সাধারণ কাঠের তৈরি মনে হতে পারে, কিন্তু ভেতরে সব ধরনের আধুনিক সুযোগ-সুবিধাই সে রেখেছে। বাইরের জগতের সাথে যোগাযোগ রাখতে সে অত্যাধুনিক শক্তিশালী স্যাটেলাইট ফোন এবং রেডিও যোগাযোগ ব্যবস্থা নেয়। বৈদ্যুতিক নিয়ন্ত্রণের ব্যবহার করা হয় সোলার প্যানেল। এখানে যাতায়াতের জন্য সে ছোট একটা রানওয়ে ব্যবহার করে। এভিয়ান তখন গার্ডদের ড্রা’গ সাপ্লাইয়ের বিষয়ে তদারকী করছিল। তার গার্ডরা দাড়িয়ে তাকে ফ্যাক্টরীর তথ্য দিচ্ছিল।
এভিয়ান সকল প্রক্রিয়া নিশ্চিত করে তাদের সাপ্লাইয়ের কাজে পাঠালো। গার্ডরা হুকুম পাওয়া মাত্র পা বাড়ালো। সারিবদ্ধভাবে বাধ্য গোলামের মতো বসের দেওয়া আদেশ সম্পন্ন করতে অগ্রসর হলো। গার্ডরা যেতেই এভিয়ান ফিরে এলো তার রুমে। জানালার পাশে চেম্বারে রাখা কিছু অ’স্ত্র নিয়ে সেগুলো পরিষ্কার করতে লাগলো। নিজ কাজে অবিচল থাকা অবস্থাতেই হঠাৎ অ্যালুমিনিয়াম ফ্রেমের জানালা গলিয়ে তার চোখ গেল অদূর বাকরুদ্ধ হয়ে দাড়িয়ে থাকা ইশাতের উপর।
ইশাত উপুর তলার উঁচু পোর্চের খুঁটিতে হাত রেখে বিস্মিত চোখে দাড়িয়ে আশপাশটায় সেই তখন থেকে চোখ বুলিয়ে অনুধাবন করে যাচ্ছে। চারপাশে আকাশচুম্বী গাছপালা ও ঘন জঙ্গল, যা সূর্যরশ্মি প্রায় মাটিতে পৌঁছাতে দিচ্ছে না। পরক্ষণে তার নজর গিয়ে আটকাল কটেজের সামনে দিয়ে বয়ে চলা স্থলভাগে বেষ্টিত প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট বিশাল স্থির জলাশয়ের উপরে। যেখানে ভোরের কুয়াশা এসে হ্রদ ঢেকে দিয়েছে।
অদূর হতে পাখির কলরব শোনা যাচ্ছে। থেকে থেকে বন্যপ্রাণীর ডাক কানে ভেসে আসছে। বাঁদরের ডাক, এবং মাঝে মাঝে ম্যাকাও আর অন্যান্য বিরল প্রজাতির প্রাণীর দেখা মিলছে। দিনের বেলা হওয়াতে কিছুটা হলেও সেই ডাকে মনে আতঙ্ক কম কাজ করছে তার। সবকিছু মিলিয়ে সে বুঝতে পারলো তাকে জঙ্গলের বেশ গভীরে এনে রাখা হয়েছে যেখানে থেকে নিজ চেষ্টায় বেঁ চে ফেরা অসম্ভব প্রায়। তবুও সে তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে এই নি”সংশ জায়গা থেকে বেরিয়ে আসার। সেদিন রাতের পর তার আর কিছু মনে নেই। তাকে কিভাবে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে সেটারও কোনো ধারণাই নেই তার।
ভাবনা থেকে বেরিয়ে নিজের দিকে একবার লক্ষ্য হতেই সে বুঝলো তার অঙ্গে এখনো লেপ্টে আছে বিয়েরদিনের সেই ভারী লেহেঙ্গা আর গহনাগুলো। এগুলো পড়ে থেকে তার অনেক অসস্থি অনুভব হচ্ছে কিন্তু এই মুহূর্তে সে নিজের সকল অশান্তি ভুলে দুশ্চিন্তা করছে তার নামাজ নিয়ে। আল্লাহই ভালো জানেন, না জানি প’শুটা তাকে কতদিন যাবত অজ্ঞান করে এখানে ফেলে রেখেছিল। এভাবে অচেতন অবস্থায় থেকে না জানি কত ওয়াক্তের নামাজ তার কাযা হয়েছে। ভাবতেই বুক ভার হয়ে এলো তার।
এমনিতে তার হাতে নেই কোনো ফোন অথবা ডিভাইস এখানে তো আযানও সে শুনবে না। সেসব ভেবে আপাতত সে সূর্যের অবস্থান দেখে ধারণা করে নিল যুহরের ওয়াক্ত চলমান। সে আর সময় নষ্ট না করে কোনো মতে তার ভারী লেহেঙ্গা সামলে সেই রুমের দিকে এগুলো যেখানে তাকে ফেলে রাখা হয়েছিল। সেখানেই একটা ওয়াশরুম আছে সে দেখেছিল তখন। সে সেই ওয়াসরুমে গিয়ে হিজাব খুলে বেসিনের ট্যাপ ছেড়ে পানি দিয়ে ধীরেসুস্থে ওযু করে নিল। ওযু শেষ করে করে হিজাবটা আবারো ভালো মতন পড়ে নিলো।
ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসতেই দেখলো তার রুমে অনুমতি ব্যতীত একজন গার্ড এসে ঢুকেছে সবে মাত্র হাতে তার কিছু ব্যাগ। লোকটা ব্যাগগুলো তার বিছানায় রাখতে রাখতে বাংলাতেই বলল।
“বস এগুলো পাঠিয়েছেন আপনার জন্য, খুলে দেখুন।”
ইশাত অনিচ্ছা সত্ত্বেও বিছানার কাছে এগিয়ে গিয়ে ব্যাগগুলো খুলে দেখল কিছু ফ্রগ। সেগুলো মেলে ধরতেই সে খেয়াল করলো হাঁটু সমপরিমাণ শর্ট হাতার ফ্রগ গুলো। ইশাত ফিরে গার্ডকে বলতে যাবে যে এগুলো সে পড়বে না। কিন্তু তার আগেই সে দেখলো লোকটা সেখান চলে গেছে।
ইশাত অসহায় হয়ে সেগুলো সেভাবেই অবহেলায় ফেলে রাখলো বিছানায়। আপাতত তার নামাজের জন্য একটা জায়নামাজের দরকার কিন্তু যেহেতু এখানে সে জায়নামাজ পাবে না তাই রুমের ভেতর জায়নামাজের পরিবর্তে বিছিয়ে নামাজ পড়ার জন্য কোনো কাপড়ের টুকরা খুজতে লাগলো কিন্তু কিছুই পেলো না। রুমে শুধু মাত্র একটি খাট ছাড়া আর কিছুই নেই। উপায়ন্তর না পেয়ে কাপড়ের ব্যাগগুলো সে ফ্লোরে এক কোণে রেখে বিছানার চাদর খুলে ভাঁজ করে বিছিয়ে নিয়ে সেটাতেই নামাজে দাড়ালো। সূর্যের অবস্থান বুঝে পশ্চিম দিক কোনটা সেটা অনুমান করে নিয়ত বাঁধলো।
ইশাত আগে তার ফজরের নামায কাযা পড়ে যুহরের নামাজ শুরু করলো। সে যখন সুন্নত শেষ করে যুহরের ফরজ নামাজে দাড়ালো তখন হঠাৎ রুমে কারো ভারী পদক্ষেপ অনুভব করলো। তবুও সে কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে নিজের মতো শান্তশিষ্টভাবে নামাজ পড়ে গেলো।
এভিয়ান ইশাতের রুমের পাশ দিয়েই যাচ্ছিল তার চোখ তখন পড়ে নামাজরত ইশাতের উপর। ইশাতকে এভাবে দেখে সে বিভ্রান্ত হয়ে যায়। সে ভাবতে লাগলো এই মেয়ে কি করছে। তার মাথায় কি চলছে সেটা উদঘাটন করতে সে সোজা রুমের ভেতরে চলে আসে। ইশাত যখন সোজা হয়ে দাড়িয়ে নিয়ত বেঁধে মৃদু আওয়াজে শেষ রাকাতের কিরাত পাঠ করছে তখন তার মুখে অন্যরকম উজ্জ্বলতা আর প্রশান্তি কাজ করছিল। ব্যাপারটা এভিয়ানকে একটু অবাক করলো। তখন তার ভেতরের পৈশাচিক সত্ত্বা আবারো জেগে উঠল সে ইশাতের ঠিক সামনে গিয়ে দাড়ালো। কিন্তু সে দেখলো এতে ইশাত একটুও অপ্রস্তুত হলো না বরং সে তার কাজে অবিচল রইলো।
এতে এভিয়ান চরম অসন্তুষ্ট হলো। তাকে পাত্তা না দিয়ে ইশাত যখন সিজদা দিতে গেলো এভিয়ান তখন তার মাথার সামনে পা এগিয়ে দিলো যেনো ইশাতের মাথা তার পায়ে এসে লাগে। কিন্তু ইশাত তাকে আরেক দফা অবাক করে সতর্কতার সাথে নামাজের মধ্যেই তার পা রাখা জায়গা থেকে সরে গিয়ে সিজদা দিলো। ইশাত যখন দ্বিতীয় সিজদা দিতে যাবে তখন দেখলো তার সামনে বিছানো সেই চাদরটা আর নেই নিশ্চই এভিয়ানই সেটা সরিয়েছে। ইশাত তখন দুহাত ফ্লোরে রেখে তার উপর মাথা রেখে সিজদা দিলো।
এভিয়ান ক্ষিপ্ত চোখে ইশাতের এক একটা কর্মকান্ড দেখতে লাগলো। ইশাতের কাছে অপদস্ত হয়ে যেন সে তার অসফলটা মেনে নিতে পারল না। ইশাত যখন নামাজ শেষ করে দুপাশে ঘাড় ঘুরিয়ে সালাম ফেরালো তখন মাথা উঁচু করে দেখলো এভিয়ানের অপদস্ত মুখ খানা। এভিয়ান তখন কর্কশ কন্ঠে বলল।
— এই মেয়ে, এসব কি করছিলে তুমি? তোমার মতলব কি?
এমন প্রশ্নে ইশাত কিছুটা অবাক হলো। পর মুহূর্তে কিছু একটা মনে করে বলল।
— আপনি কি কখনো কাউকে নামাজ পড়তে দেখেন নি? আমি তো নামাজ পড়ছিলাম।
এভিয়ান এক ব্রু উঁচু করে প্রশ্ন করলো।
— নামাজ কি?
ইশাত বুঝিয়ে বলল।
— রবের এবাদত। মানে আমরা মুসলিমরা আমাদের সৃষ্টি কর্তাকে সন্তুষ্ট করতে নামাজ পড়ি। ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম প্রধান ইবাদত হচ্ছে এই নামাজ অথবা সালাত। যা দৈনিক পাঁচবার নির্দিষ্ট সময়ে বিশেষ নিয়মে রুকু ও সিজদার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য আদায় করা হয়।
এভিয়ান যেনো বিরক্ত হলো সে ফিরতি প্রশ্ন করে বলল।
— এসব করে কি লাভ?
ইশাত সংক্ষেপে উত্তর দিয়ে বলল।
— নামাজ একজন মুসলমানকে আল্লাহর সাথে সরাসরি সংযুক্ত করে এবং অ’শ্লীল ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে।
ইশাতের কথা শুনে এভিয়ান তাচ্ছিল্য হাসলো। উপহাস করে বলল।
— হোয়াট ননসেন্স! নামাজ কি করে একজন মানুষকে অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখবে?
— এর কারণ আছে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মানুষকে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, ফলে মানুষ আল্লাহর ভয়ে গুনাহ করার আগে ভয় পায়। নামাজ মানুষের আত্মাকে পবিত্র করে এবং মনের মধ্যে অন্যায় কাজের প্রতি ঘৃ”ণা তৈরি করে।
এভিয়ান ইশাতের কথার বিরোধিতা করে বলল।
— এসব অযৌক্তিক, এই নি’ষ্ঠুর দুনিয়াতে চলতে হলে এত সৎ হলে চলে না। তুমি যেহেতু তার ইবাদত করছো তোমার সৃষ্টি কর্তার তো উচিত ছিল তোমাকে রক্ষা করার। সে তো তা করে নি। এসবই মিথ্যা। বানোয়াট আমি কোনো সৃষ্টি কর্তার উপর বিশ্বাস করি না।
এভিয়ানের এরূপ উক্তিতে ইশাত বিস্মিত কন্ঠে বলল।
— আস্তাগফিরুল্লাহ, আপনি বিশ্বাস করেন না বলে এভাবে বানোয়াট বলতে পারেন না। আমাদের ইসলামের সৌন্দর্যের কথা যদি জানতেন তাহলে এভাবে বলতে পারতেন না। আচ্ছা আপনি কি সত্যি কোনো ধর্মেই বিশ্বাস করেন না?
এভিয়ান সঙ্গে সঙ্গে কাঠকাঠ গলায় জবাব দিলো।
— না করি না! আশ্চর্য এতো কথা আমি তোমাকে কেন বলছি! আমার চোখের সামনে তোমাকে যেন এসব আর না করতে দেখি। রাবিশ যত্তোসব।
কথাটুকু উগরে দিয়ে এভিয়ান হনহনিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যেতে নিলে ইশাত তাকে পিছু ডাকলো। এভিয়ান ফিরে তাকালো না তবে স্থির হয়ে দাঁড়ালো। ইশাত তখন ইতস্ততা নিয়ে ফ্লোরে পড়ে থাকা ব্যাগগুলোর দিকে আঙ্গুল তাক করে বলল।
— শুনুন, আমি ওগুলো পড়বো না।
এভিয়ান ফিরে ইশাতের দেখানো ব্যাগগুলোর দিকে তাকিয়ে কপাল কুঁচকে বলল।
— কেন? কিছু না পড়ে এভাবেই থাকতে চাও?
এমন উত্তর ইশাত মোটেও আশা করে নি। প্রত্যুত্তরে সে ঝাঁঝালো কন্ঠে বলল।
— আমি এসব ছোট জামা কাপড় পড়ি না। আমাকে অনুগ্রহ করে ফুল হাতার লং ফ্রগ আর হিজাব এনে দিন।
ইশাতের আবদার দেখে এভিয়ান অবাক না হয়ে পরলো না। সে চোখে মুখে অবিশ্বাস নিয়ে বলল।
— হেই! তোমাকে আমি এখানে অ’পহরণ করে নিয়ে এসেছি অপ’হরণ মানে বুঝো? কি’ডন্যাপ। ফর ইউর কাইন্ড ইনফরমেশন তুমি এখানে ঘুরতে আসো নি। আর আমি তোমার চাকর নই যে যখন ইচ্ছে যা অর্ডার দিবে তাই এনে হাজির করবো। এখানে আমি যাদের আনি তাদের উপর ভয়াবহ ট’র্চার চালাই। এদিকে তোমার চোখে মুখে দেখছি কোনো ভয়ই নেই। একটু আগের ঘটনা এতো তাড়াতাড়ি ভুলে গেছো?
ইশাত চোখে দৃঢ়তা টেনে বলল।
— আমি কেন আপনাকে ভয় পাবো? আপনি কে যাকে দেখে ভয় পেতে হবে আমায়? আমি আমার আল্লাহ ব্যতিত কাউকে ভয় পাই না।
এভিয়ান তখন দাম্ভিক হাসি নিয়ে বলল।
— তাহলে এখন থেকে অবশ্যই পাবে।
এভিয়ান কথাটা বলেই পকেট থেকে একটা ধারালো না’ইফ বের করে ইশাতের দিকে এগোতে লাগলো। ইশাত ঘাবড়ে গিয়ে পিছুতে পিছুতে বলল।
— কি করছেন?
এভিয়ান ঠোঁটের কোনে বাকা হাসি নিয়ে বলল।
— এই নাইফ দিয়ে এখন যদি তোমার হাতের প্রত্যেকটা র’গ টেনে ছিঁড়ে ফেলি তাহলে কেমন হয়? ইট উইল বি ফান রাইট?
ইশাত পেছাতে পেছাতে দেয়ালের সাথে লেপ্টে গিয়ে কাপা কাপা গলায় বলল।
— ভয় দেখাচ্ছেন আমাকে?
এভিয়ান তার দানবীয় সত্ত্বা ধরে রেখে বলল।
— কেন অবিশ্বাস লাগছে? ভয় পাচ্ছো?
— আপনার ধারা এসবই সম্ভব। আমি তবুও ভয় পাই না আপনাকে। আমাকে মে রে ফেললেও না।
কথাটা বলে ইশাত চোখ বুজে ফেলল নিজের করুন পরিণতি মেনে নিতে নিজেকে প্রস্তুত করে নিলো। কয়েক মুহূর্ত নিঃশব্দে পেরিয়ে গেলো কিন্তু কিছু কিছুই হলো না। ইশাত ধীরে ধীরে চোখ খুললো। তখন অস্পষ্ট দৃশ্যপটে ভেসে উঠলো হৃদয় নিস্তেজ করা সেই সোনালী নয়নযুগল। এভিয়ান তার উপর ঝুঁকে দাড়িয়ে বলল।
— চিন্তা করো না এতো সহজে মা’রছি না তোমায়।
কথাটা বলে এভিয়ানের চোখ গেলো ইশাতের মাথার হিজাবের উপর। সে তখন কপাল কুঁচকে বলল।
— তোমরা কিছু মুসলিম মেয়েরা মাথায় এমন কাপড় কেন পরো? নিজেকে টেন্ট বানিয়ে রাখতে কি বেশ ভালো লাগে তোমাদের?
এমন কটুক্তিকর প্রশ্নে ইশাত সঙ্গে সঙ্গে বিরোধিতা করে বলল।
— হিজাব কোনো টেন্ট না। এটা মুসলিম মেয়েদের মাথার মুকুট। হিজাব আমাদের মর্যাদা বাড়ায়। আমাদের মুল্যবান করে তুলে।
এভিয়ান পৈশাচিক হাসলো। ইশাতকে আরেক দফা হেনস্তা করতে বলল।
— ঠিকাছে তাহলে এখনি এটা খুলে ফেলো। দেখি তোমার মর্যাদা কতটুকু কমে।
ইশাত সঙ্গে সঙ্গে অগ্নি ঝড়া চোখে চেয়ে বলল।
— আপনি ঘৃ’ণারও যোগ্য না। একজন মানুষের দুর্বল দিক নিয়ে খেলতে বেশ ভালোবাসেন তাই না? দেখবেন কেউ একদিন আপনার দুর্বলতা নিয়েও এমন খেলবে।
এভিয়ান দম্ভ নিয়ে বলল।
— আমার কোনো দুর্বলতা নেই।
সে পুনরায় বলল।
— কি হলো খুলছো না কেন? ডু ইউ নিড মাই হেল্প?
এভিয়ান কাছে আসতে চাইলে ইশাত চমকে গিয়ে বলল।
— দূরে থাকুন কাছে আসবেন না একদম।
এভিয়ান ইশাতের কোনো কথাই শুনল না। উল্টো কাছাকাছি গিয়ে যখন সে ইশাতের মাথার হিজাবের উপর হাত রাখতে গেলো তখন ইশাত ছিটকে সেখান থেকে সরে গেলো। ইশাতকে আটকাতে যখন এভিয়ান তার হাত ধরতে যাবে ঠিক তখন ইশাত তার হাত মুষ্টিবদ্ধ করে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে এভিয়ানের চোয়াল বরাবর একটা জোরালো ঘুষি বসিয়ে দিলো।
ঘুষিতে এভিয়ানের মুখ পুরপুরি একপাশে ফিরে গেলো। ইশাতের এমন স্পর্ধায় সে যেন ক্ষিপ্ত সিংহের রূপ ধারণ করলো। ইশাত নিজেও ভয় পেয়ে গেলো। এতক্ষন সে শান্ত এভিয়ানকে দেখলেও ইতিমধ্যে তার এমন ভয়ানক রূপ দেখে চমকে উঠলো। এভিয়ানকে এখন দেখে মনে হচ্ছে যেন রাগের বশে এই মুহূর্তে সে যা ইচ্ছে তাই করে ফেলতে পারে ইশাতের সাথে। ইশাত তখন মনে মনে দোয়া ইউনূস পড়তে শুরু করে দিলো। তার পালানোর তো আর কোনো জায়গা নেই।
কিন্তু এভিয়ানের পরবর্তী কোনো পদক্ষেপের আগেই দরজার কাছে একজন গার্ড এসে দাড়িয়ে এভিয়ানকে কোথায় যেনো যাওয়ার জন্য তাড়া দিলো। এভিয়ান তখন ইশাতের দিকে রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে গার্ডের উদ্দেশ্যে বলল।
— পাঁচ দিনের জন্য এই মেয়ের খাবার পানি সব বন্ধ। শরীরের যা তাগদ আছে সব একদম মজিয়ে ফেলব।
পরপর আবার ইশাতকে বলল।
— আজ ভাগ্য ভালো তোর, এক মাত্র মেয়েদের গায়ে কখনো হাত দেয়নি বলে আজ তুই বেঁ চে ফিরলি। কিন্তু তাই বলে এই না যে ভাগ্য বারবার সহায় হবে। আজ থেকে তোর জীবন নিজ হাতে জাহান্নাম করে তুলবো আমি। আমার সম্পর্কে তোর বিন্দু মাত্র ধারণা নেই যে আমি প্রয়োজনে কোন পর্যন্ত নামতে পারি।
ইশাতকে শাসিয়ে এভিয়ান গার্ডসহ বড় বড় কদম ফেলে বেরিয়ে গেলো। পেছনে ইশাত দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবতে লাগলো এটা সে কাকে ভালবেসেছিল? সে যেই এভিয়ানকে দেখেছিল সেই এভিয়ান এই অচেনা লোক থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটা তো তার মিস্টার গোল্ডেন হতেই পারে না। তার ভাবনায় যে পুরুষ বিরাজ করতো তার তুলনায় এই লোক পুরো বিপরীত। সে অনেক বড় একটা ভুল করেছ বসেছে। যে ভুলের মাশুল তাকে এখন তিলে তিলে দিতে হচ্ছে।
পরমুহুর্তে পরিবারের কথা মনে পরতেই তার ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। মনে নানান প্রশ্ন জায়গা নিলো। না জানি তার আম্মু আর ভাইয়া এখন কি ভাবছে? কি করছে? তারা কি আদেতেও বিশ্বাস করেছে যে ইশাত পালিয়েছে? সবার কথা মনে করতে করতে সে বাকি নামাজ শেষ করতে আবারো নিয়ত বেঁধে দাড়ালো।
চলবে ( ইনশাআল্লাহ )……………………….

