#ক্লান্তিহীন_তুই_আমার_ফরিয়াদ
#পর্বঃ১৭
#সুমাইয়া_জান্নাত_ইলমা
বিয়ের দিন ইশাতের পালিয়ে যাওয়ার খবর পেতেই এলাকার লোকজন সব বাসায় এসে এসে আসিয়া বেগমের সামনে কটূক্তি করে চলে যাচ্ছেন, সুযোগ পেয়ে তাকে কথা শুনিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিবাদে তিনি মুখ ফুটে কোনো কথা বলার অবস্থাতেই নেই। আজ এক সপ্তাহ কেটে গেছে অথচ মেয়ের কোনো হদিস নেই। তিনি দুশ্চিন্তায় খাওয়া দাওয়া ঘুম সেই দিন থেকেই ছেড়েছেন। শুধু অসহায় হয়ে চোখের পানি ফেলছেন আর মোনাজাতে দোয়া করে যাচ্ছেন মেয়েকে সহি সালামত ফিরে পাওয়ার। ওদিকে ইমরানও বোনের খোঁজে তার পুরো টিম লাগিয়ে দিয়েছে। তাকে বাসায় খুব একটা পাওয়াই যায় না। সে দিনরাত লেগে আছে বোনের খোঁজে। ছোট অহনাফও তার ফুপ্পিকে না পেয়ে কেঁদে চলেছে। তাদের হাসিখুশি সাজানো পুরো সংসারটাই যেনো এক মুহূর্তে এলোমেলো হয়ে পড়েছে। এদিকে সানজিদা নিজের দায়িত্ব পালনে তাদের সামলাচ্ছে।
আরেকদিকে আসিফও বসে নেই সেও এলাকায় তার মানুষজন লাগিয়ে দিয়েছে ইশাতকে খুঁজে বের করতে। আসিফের মা ছেলের সময় মত বাসায় না ফেরা আর ঠিক মত অফিস না করা নিয়ে চিন্তিত। তিনি সেই তখন থেকে লিভিং রুমে পায়চারি করে যাচ্ছেন। তখন পদচরণ থামিয়ে দেয়াল ঘড়িটার দিকে আরেকদফা চোখ বুলিয়ে তিনি দেখলেন রাত প্রায় ১২ টা বাজতে চললো তবুও ছেলের বাসায় ফেরার নাম নেই। তিনি আর স্থির থাকতে পারলেন না চিন্তিত হয়ে ছেলের নাম্বারে কল লাগলেন। আসিফ লেকের পাশে দাঁড়িয়ে সবে মাত্র একটা সিগারেট ধরিয়েছিল মায়ের কল পেতেই সেটা রেখে সে কল রিসিভ করলো। ওপাশ থেকে রোকেয়া বেগম চিন্তিত গলায় বললেন।
— কিরে এখনো ফিরছিস না কেন? কোথায় তুই?
আসিফ ধরা গলায় বলল।
— বাসায় ফিরে কি করবো মা? ইশাতকে তো পেলাম না? না জানি ও কোথায় আছে, কেমন হালে আছে?
ছেলের বেহাল দশা দেখে রোকেয়া বেগম ভঙ্গুর গলায় বললেন।
— বাবা জেদ করিস না, তুই তো চেষ্টা করছিসই আর ওর ভাইও চেষ্টায় লেগে আছে। কত বড় অফিসার সে, কত বড় টিম তার। আমরা ইশাতকে ঠিক পেয়ে যাব দেখিস। এখন তুই বাসায় চলে আয়।
রোকেয়া বেগমের কথার মাঝে পেছন থেকে হঠাৎ তার শাশুড়ি এসে কোমরে হাত দিয়ে ঝাঁঝালো গলায় বললেন।
— ওই মাইয়ার লেইগা তোর পোলার এতো কিসের দরদ? মাইয়া তো ওরে বিয়া না কইরা রাইখা পলাইসে। লজ্জা সরম থাকলে ওই মাইয়ার পিছে আর ঘুরতো না ওয়। আবার নাকি খুজতে বাইর হইসে। এহহ! আজাইরা দরদ এক্কেরে বায়া বায়া পড়তাছে।
রোকেয়া বেগম অসহায় হয়ে বৃদ্ধ শাশুড়িকে হাতের ইশারায় চুপ করতে বললেন কিন্তু কোনো লাভ হলো না অপরপাশে ফোনেই আসিফ সব শুনে সঙ্গে সঙ্গে ফোন কেটে দিলো। রোকেয়া বেগম ছেলেকে চিনেন সে রাগে আজ বাসায়ই ফিরবে না আজ। তার হাতে আর করার কিছুই রইলো না। সারা রাত তিনিও লিভিং রুমের সোফায় বসে কাটিয়ে দিলেন ছেলের অপেক্ষায়। মাঝ রাতে আসিফের বাবা কয়েকবার এসে তাকে ডেকে গেছেন তবুও স্ত্রীকে ঘরে নিয়ে যেতে পারেন নি। ফলস্বরূপ তিনিও স্ত্রীর পাশে চুপচাপ বসে রইলেন।
রোকেয়া বেগম তখন অসহায় গলায় স্বামীকে বললেন ছেলেকে বাসায় ফিরিয়ে আনতে উত্তরে তার স্বামী বললেন।
— তোমার ছেলেটা হয়েছে তোমার মতোই জেদি। তুমিও যেমন জেদ করে আমার কথায় ঘরে যেতে চাইছ না ঠিক সেও কি আর আমার কোথায় ফিরবে?
স্বামীর কথায় রোকেয়া বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ওপাশে আসিফ মায়ের ফোন কেটে সিগারেটের শলাটা হাতে তুলে দুঠোঁটের মাঝে চেপে ধরলো। ক্ষণে ক্ষণে ঠোঁটের ফাঁক গলিয়ে দৃশ্যমান কালো ধোয়া ছাড়ল। রাতের অন্ধকারে সেই কালো ধোয়া আকাশে মিলিয়ে গেলো। দেখে মনে হচ্ছে যেন ধোয়াগুলো তার মনের গভীরে জমে থাকা কালো মেঘের বহিঃপ্রকাশ। চরম উদাসীনতা নিয়ে আসিফ তাচ্ছিল্য হেসে মৃদু স্বরে বলল।
— তোমাকে পাওয়ার এক সমুদ্র সমপরিমাণ ইচ্ছে আমার অথচ বিপরীতে আমায় নিয়ে এক আকাশ সমপরিমাণ অনিহা তোমার। কেন ইশাত কেন?
হাতের সিগারেটের শলাটা তখন জ্বলে প্রায় শেষের দিকে সেটাকে মাটিতে ফেলে পায়ের জুতোর নিচে পিষে আসিফ ধীরেসুস্থে মাথা তুলে তাকালো আকাশে নীরবে ভেসে থাকা উজ্জ্বল চাঁদটার দিকে। চারপাশের নিস্তব্ধতা তার নিঃসঙ্গতাকে আরও তীব্র করে তুললো। মনে হলো যেন গভীর নির্জনতায় ভরা জ্যোৎস্নায় আলোকিত রাতটা তার একাকীত্বের সঙ্গী হয়ে রয়ে গেলো। মনের গভীরে থাকা অপ্রকাশিত সূক্ষ্ম আবেগগুলো বুকে চিনচিন ব্যথা জাগিয়ে তুলল। সে বিড়বিড়িয়ে একা একাই বলতে লাগলো।
— ফিরে আসো ইশাত, ফিরে আসো। তুমিহীন এই আমি শূন্য।
______________________
এভিয়ানের আদেশে আজ তিনদিন যাবত ইশাতকে এক ফোঁটা পানিও দেওয়া হয় নি। ইশাত যখন ওয়াশরুমে ওযু করতে গিয়েছিল তখন বেসিনের ট্যাপ ছেড়ে দেখলো তার ওয়াশরুমের পানি পর্যন্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে যেন সে কোনো ভাবেই পানি পান না করতে পারে। উপায়ন্তর না পেয়ে সে তায়াম্মুম করে নামাজ আদায় করেছে তবুও কোনো ওয়াক্তের নামাজ ছাড়ে নি।
পানি শূন্যতায় ইশাতের চোখ মুখ শুকিয়ে নির্জীব হয়ে আছে। গোলাপের মতো তার মসৃণ ঠোঁটজোড়া শুষ্ক হয়ে ফেটে চৌচির হয়ে আছে। চোখে মুখে দুর্বলতা স্পষ্ট ফুটে আছে। শরীর দুর্বলতা আর ক্লান্তিতে ঝিমিয়ে পড়েছে। পাশাপাশি ঠাণ্ডা হয়ে নীলাব বর্ন ধারণ করতে শুরু করেছে। এখানে আসার পর থেকে পেটে তার একটা দানাও পড়ে নি। তবুও সে যতটুকু পেরছে নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করেছে।
আজ তিনদিন যাবত সে এভিয়ানকে কটেজে দেখে নি। হয়তো আজও সে ফিরবে না। না ফিরলেই ভালো সে ফিরলেই ইশাতের আতঙ্ক। দেখা যাবে ইশাতকে হয়’রানি করতে সে কতকি করে বসবে তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই। যেহেতু এখন সে কটেজে নেই তাই ইশাত ভাবলো সেই সুযোগে একটু আশপাশটা হেঁটে দেখে আসবে আর পালানোর কোনো উপায় খুঁজে বের করবে। একটা রুমের ভেতরে এভাবে আটকে থেকে তার ভীষণ দমবন্ধ লাগছে। এটা ভেবে লক করে রাখা দরজা খুলে সে বাহিরে বেরিয়ে এলো।
উকি ঝুঁকি মেরে এভিয়ানকে কোথাও না পেয়ে সে পা বাড়ালো। আজ ভেতরে কোনো গার্ড নেই, ভেতরটা নীরব। কিছুটা অবাক লাগলো ব্যাপারটা তার কাছে তবুও সে তার পায়ের গতি থামালো না। কটেজের ভেতরটা তার কাছে একটা গোলক ধাঁধার চেয়ে কম মনে হলো না। এতদিন সে পুরোটা ঘুরে দেখার সুযোগ পায় নি আজ সেই সুযোগ সে ভালো ভাবেই কাজে লাগলো। হাঁটতে হাঁটতে একপর্যায়ে সে দূর থেকে দেখতে পেলো বাহিরে বেরোনোর দ্বার। ঠোঁটে বিজয়ের হাসি নিয়ে সে তাড়াহুড়ো পায়ে সেদিকে এগিয়ে গেলো। কিন্তু যখন বেরোতে যাবে ঠিক সেই সময় পেছন থেকে এক চিরচেনা ভারী পুরুষালী আওয়াজ তার কানে এসে বারি খেলো।
— কোথায় যাচ্ছো?
ইশাত হকচকিয়ে পেছন ফিরে দেখলো এভিয়ান আর তার সাথে দুজন লোক সেখানটায় বসে আছে। তাড়াহুড়োতে ইশাত হয়তো তাদের খেয়াল করে নি। এখন ভালো মতো তাকাতেই দেখলো এভিয়ানের সামনে রাখা টেবিলে নানান পদের মদের বোতল রাখা তার হাতে একটা গ্লাস তুলে সে সেই মদ পান করছে। ডিভানে পায়ের ওপর পা তুলে আয়েশি ভঙ্গিতে বসে ঠোঁটের কোনে সেই নিষ্ঠুর হাসিটা নিয়ে সে ইশাতের দিকে তাকিয়ে আছে। তার পাশের একজন লোক ইশাতকে দেখে যেনো ভীষণ আশ্চর্য হলো। সে চোখ বড়বড় করে বিস্ফোরিত চোখে এভিয়ানের দিকে তাকালো। ইশাত তাদের সামনে ধরা পড়ে অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে ঠাঁই দাড়িয়ে রইলো। তখন পাশের লোকটা অবিশ্বাস নিয়ে এভিয়ানকে বলে উঠলো।
— কিরে এভি! তুই না বলেছিলি কখনো বিয়ে করবি না? নারীদের তোর সহ্য হয় না? তাহলে এই মেয়ে কে??
রিজভীর এমন বোকা প্রশ্নে মুহূর্তেই এভিয়ানের ঠোঁটের হাসি মিলিয়ে গেলো। ইশাতও হতভম্ব হলো। এভিয়ান তখন রাগান্বিত চোখে তাকালো রিজভীর দিকে যেন চোখের আগুনেই সে রিজভীকে আজ ভস্ম করে ফেলবে। রিজভী অবুঝ মনে বুঝলো না হঠাৎ তার বন্ধু এভাবে রেগে কেন গেলো সে কি এমন ভুল বলেছে? একটা মেয়েকে এভাবে তার ব্যক্তিগত কটেজে এনে রাখার মানে কি হতে পারে? এর আগে তো এভিয়ান কোনো মেয়েকে এখানে নিয়ে আসে নি? তার জগাখিচুড়ী মার্কা ভাবনা ভেদ করে তখন এভিয়ান তাকে ধমকে বলে উঠলো।
— আর ইউ ইনসেন? আমি এখানে কাদের আনি?
রিজভী একটু ভেবে বলল।
— যাদের তুই ট’র্চার করিস।
— তাহলে এমন অহেতুক প্রশ্ন কেন করলি?
— আরে প্রশ্নটা তো পরিস্থিতি বুঝে করেছি। এই যেমন ধর তুই তো আমাকেও এখানে আসতে দিস এর মানে কি আমাকেও ট’র্চার করতে আনিস নাকি? আর এর আগে তো কখনো কোনো মেয়েকে তুলে আনিস নি তুই। এই মেয়েটার গায়ে বিয়ের পোশাক। তাই বিষয়টা ভিন্ন মনে হলো। সেই ধারণা থেকেই বললাম। সে যাই হোক কে এই মেয়ে?
এভিয়ান ইশাতের দিকে দৃষ্টি রেখে তাকে শুনিয়ে হাতের এল’কোহলে পূর্ণ গ্লাসটা ঘোরাতে ঘোরাতে বলল।
— আইজিপি ইমরানের একমাত্র আদরের বোন সমায়রা মেহেজাবিন ইশাত।
রিজভী তখন বিস্মিত হয়ে বলল।
— সিরিয়াসলি! তুই সত্যিই ওকে তুলে এনেছিস? তাও আবার বিয়ের আসর থেকে?
— হুম,যা বলেছিলাম তাই করেছি।
ইশাত তখন ঘৃণার দৃষ্টি নিয়ে মাথা তুলে এভিয়ানের দিকে তাকালো। এভিয়ানের দৃষ্টি তখনও ইশাতের উপর ছিল। দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলতেই ইশাত ঘৃণায় চোখ নামিয়ে ফেললো। হঠাৎ দুর্বলতায় সে মাথা ঘুরে পড়তে নিলে দেয়াল ধরে দাড়ালো। চোখজোড়া তার বারবার বুজে আসতে চাইছে। সে জোড় করে চোখ খোলা রাখার প্রচেষ্টা চালাল। রিজভী ইশাতের অবস্থা লক্ষ্য করে বললো।
— মেয়েটাকে দেখে আমার অনেক মায়া হচ্ছে, দেখ ওর চোখ মুখ কেমন শুকিয়ে আছে। ওর সাথে কি করেছিস তুই?
এভিয়ান নির্বিকার ভঙ্গিতে নিজ কাজ বহাল রেখে উত্তরে বলল।
— কিছুই করি নি, আপাতত তিন দিন যাবত ওর খাবার পানি বন্ধ আছে।
এমন উত্তরে রিজভীর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো। সে প্রতিবাদ করে বলল।
— এভি তুই কিন্তু অনেক বড় অন্যায় করছিস। এতদিন তুই যা কিছু করেছিস তোর বিরুদ্ধে আমি কিছুই বলি নি। কারণ যাদের তুই ট’র্চার করেছিস সেই লোকগুলো শাস্তি পাওয়ারই যোগ্য ছিল। কিন্তু এখানে ও একটা মেয়ে মানুষ। আর তুই যে কারণে ওকে এখানে তুলে এনেছিস সেটাতে ওর কোনো দোষই ছিল না। প্রতিশোধকে এতো বড় করে দেখিস না। সহিং’সতায় জড়াতে জড়াতে তুই ধীরে ধীরে ঠিক ভুলের বিবেক হারিয়ে ফেলছিস এভি। এখন প্লীজ অন্তত মেয়েটার খাওয়ার ব্যবস্থা কর। দেখে মনে হচ্ছে মেয়েটার অবস্থা বেশি ভালো না।
দীর্ঘ তিনদিন পানি পান করতে না পারায় ইশাতের গলা শুকিয়ে চৌচির। তখন আধখোলা চোখে তৃষ্ণায় কোনো মতে ইশাতের মুখ থেকে কিছু বাক্য বেরোলো।
— দয়া করে একটু পানি দিন আমায়!
এভিয়ান তখন আওয়াজ করে ইশাতকে ডেকে বলল।
— এই মেয়ে এদিকে এসো!
ইশাত তার জায়গা থেকে নড়লো না। এভিয়ান পুনরায় গম্ভীর গলায় বলল।
— তুমি কি চাও তোমাকে আমার বাধ্য করতে তোমার উপর নিজের পদ্ধতি খাটাই?
এবারের হুমকিতে ইশাত নিজেকে ধাতস্থ করলো। অনিচ্ছা থাকা শর্তেও সে বাধ্য হয়ে দূর্বল পদক্ষেপে এগোলো। এভিয়ান তখন তার পাশে বসা ম্যানেজার সিয়ামকে ইশারা করে বললো ইশাতের দিকে একটা মদের বোতল এগিয়ে দিতে সিয়ামও তাই করলো। ইশাত সেটা দেখে নিজের হুসে ফিরে ছিটকে সরে গিয়ে বলল।
— আস্তাগফিরুল্লাহ, দূরে সরান এসব!
ইশাতের এমন প্রতিক্রিয়া দেখে এভিয়ান কপাল কুঁচকে বলল।
— কি হয়েছে ও এমন কেন করলো?
রিজভী তখন মাথায় হাত চাপড়ে বলল।
— একজন মুসলিম মেয়ে হিসেবে তার এমনটা করাই স্বাভাবিক। এল’কোহল তো হারাম ইসলামে।
এভিয়ান তখন তার এক ব্রু উঁচু করে বলল।
— তাহলে তুই আর জেরিন কেন খাস? তোরাও না মুসলিম? সিয়ামকেও তো খেতে দেখি।
রিজভী তখন এমন প্রশ্নে থতবত খেয়ে গেলো। সিয়াম লজ্জায় মুখ ফুটে কোনো উত্তর দিতে পারল না। রিজভী তখন কাইকুই করে বলল।
— আমরা তো ইউরোপের কালচারে বড় হয়েছি তাই এতো কিছু মেনে চলি নি। আমাদের কথা ভিন্ন।
পাল্টা জবাবে এভিয়ান বলল।
— তাহলে তোরা খেতে পারলে এই মেয়ের খেতে সমস্যা কোথায়?
এভিয়ানের এমন কথায় ইশাত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল।
— আপনি আমাকে জোর করেও এসব খাওয়াতে পারবেন না। আর হারাম হালাল বোঝার মত জ্ঞানবুদ্ধি আপনার হয় নি এখনো। কারণ আপনার বাহিরটা সুন্দর হলেও ভেতরটা কু’লষিত।
এভিয়ানকে একনাগাড়ে কথাগুলো শুনিয়ে ইশাত দ্রুত পায়ে রুমের দিকে হেঁটে চলে গেল। রিজভী আর সিয়াম বিস্ময়ে হা হয়ে গেলো। তারা সচক্ষে এই প্রথম এমন দুঃসাহসীক কাউকে দেখলো কে কিনা এভিয়ানের মুখের উপর কথা শুনিয়ে দিয়ে চলে গেল। এদিকে ক্রোধে এভিয়ানের চোখ লাল হয়ে উঠেছে। অপ’মান বোধে সে হাতে থাকা গ্লাসটা এক আছাড় মেরে মেঝেতে ছুড়ে মারলো। সাথে টেবিলে রাখা সব মদের বোতল গুলো একে একে আছাড় মেরে ভাঙলো। লক্ষ্য লক্ষ্য টাকার নামি দামী এল’কোহলের বোতলগুলোর কাঁচ মুহূর্তে ভেঙে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়লো। রিজভী লাফিয়ে সরে গেলো। সিয়ামের পায়ের কাছে এসে একটা টুকরো বিধলো। তবুও সে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখলো না। এভিয়ান তখন বিক্ষুব্ধ স্বরে সিয়ামকে আদেশ করে বলল।
— মুসলিমদের জন্য আর কি কি হারাম খাবার আছে লিস্ট করো।
সিয়াম বিপরীতে কোনো প্রশ্ন করার সাহস পেলো না শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে বলল।
— ঠিকাছে স্যার।
কিন্তু রিজভী কৌতূহলবশত প্রশ্ন করেই বসলো।
— কেন তুই জেনে কি করবি?
এভিয়ান শান্ত গলায় জবাব দিলো।
— আজ থেকে সেগুলোই হবে ওর খাবার। আর আমার সাথে বেয়া’দবি করার ফল।
চলবে ( ইনশাআল্লাহ ) …………………..
#ক্লান্তিহীন_তুই_আমার_ফরিয়াদ
#পর্বঃ১৮
#সুমাইয়া_জান্নাত_ইলমা
ইশাত মুখে কোনো খাবারই তুলছে না সেই খবর পেতেই রাগে হনহনিয়ে ইশাতের রুমের দিকে তেড়ে যাচ্ছে এভিয়ান। এদিকে ইশাতের বেহাল দশা তার সামনে রাখা হয়েছে সব ধরনের হা’রাম খাবার। যার মধ্যে শূ’করের মাংসের তৈরি খাবারও ছিল যেটা দেখে তার ভেতর থেকে সব উগরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। কিন্তু পেটে কোনো খাবার না থাকায় তাও সম্ভব নয়। প্রতি’শোধ তুলতে এভিয়ান ইশাতের জন্য বিশেষ ভাবে মেডদের আনিয়ে এসব খাবার তৈরি করিয়েছে।
খিদেতে ইশাতের পেট জ্বলছে অথচ মুখে সে কোনো খাবারই তুলছে না। সব হাত দিয়ে ঠেলে সরিয়ে দিচ্ছে। দুইজন মেড মালিকের হুকুম মানতে ইশাতকে জোরজবরদস্তি করলো। ত্যক্ত হয়ে ইশাত হাতে ঠেলে সব খাবার মাটিতে ফেলে দিলো। যা এভিয়ান ভেতরে ঢোকার পরপরই তার পায়ের কাছে গিয়ে পড়লো। অগ্নি ঝড়া চোখে এভিয়ান বড় একটা ধমকে মেডদের বেরিয়ে যেতে বলল। মেড দুজন ভয়ে জড়সড় হয়ে সাথে সাথে বেরিয়ে গেলো। তারা বেরিয়ে যেতেই এভিয়ান ইশাতকে ভয় দেখাতে দরজা লাগিয়ে দিল। যেটা দেখে ইশাতের শরীর থেকে আত্মা বেরিয়ে গেলো। সে কম্পমান গলায় বলল।
— আপনি দরজা কেন লাগালেন??
এভিয়ান ভুরু দুটির মাঝখানে গভীর ভাঁজ ফেলে বলল।
— মজা দেখাবো তাই।
ইশাত আর কিছুই বলার অবস্থাতেই রইলো না। দুর্বলতা আর আতঙ্ক মিলেমিশে তার চোখ বুজে এলো শরীর হেলে পড়তে শুরু করলো। এভিয়ান দাড়িয়ে দাড়িয়ে সেটা দেখলো ঠিকই কিন্তু তাকে ধরলো না। ইশাত শরীরের ভারসাম্য ছেড়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে গিয়ে খুব বাজেভাবে খাটের এক কোণে বারি খেয়ে তার কপালের এক পাশ কেটে গলগল করে তাজা র’ক্ত বেরোতে শুরু করলো। সেই অবস্থাতেই সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে জ্ঞান হারালো।
এভিয়ানের মাঝে বিশেষ কোনো ভাবান্তর দেখা দিলো না। সে ইশাতের থেকে কিছুটা দূরেই সটান হয়ে পেন্টের পকেটে হাত গুজে স্থির দাড়িয়ে। ওদিকে ফ্লোর র’ক্তে ভিজে যাচ্ছে ইশাতের র’ক্তে। কিছুটা সময় পর তার মাঝে একটু হেলদোল দেখা দিলো। সে ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে এক পায়ে ভর দিয়ে ঝুঁকে বসলো ইশাতের মাথার কাছে। সে খুব কাছ থেকে ইশাতের মলিন মুখটা নিরীক্ষণ করতে লাগলো। যেন কোনো বিজ্ঞানী লেবে বসে তার এক্সপেরিমেন্টে মগ্ন।
হঠাৎ যেন এভিয়ানের মাঝে কিছু একটা হলো এতদিন সে ইশাতের দিকে তেমন আগ্রহ নিয়ে না তাকালেও এই মুহূর্তে তাকে নিয়ে মনে আগ্রহ কাজ করলো। গভীর দৃষ্টি দিয়ে সে ইশাতকে অবলোকন করতে লাগলো। নিশ্চুপ হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে থাকা ইশাতকে দেখতে যেন ভীষণ কোমল আর পবিত্র ঠেকলো তার চোখে। একদম প্রস্ফুটিত ফুলের ন্যায় পবিত্র।
এভিয়ানের মনে তখন অদ্ভুত একটা টান কাজ করলো। তার গম্ভীর মুখটা নরম হয়ে এলো। এই প্রথম তার মনে কারো জন্য মায়া কাজ করলো। যেন নির্জীব মরুভূমির মতো খরখরে হৃদয়ে এক পশলা বৃষ্টির দেখা মিলল। শক্তপোক্ত পাথরের ন্যায় হৃদয়টা টলতে শুরু করলো। দমকা হাওয়ার মতো মনের শূন্য কোটরে অচেনা অজানা এক অনুভব হানা দিল। যে অনুভূতির কোনো হদিস তার জানা নেই। তবে সে তার অহেতুক চিন্তাচেতনাকে অগ্রাহ্য করে পুনরায় চোখমুখ শক্ত করে এক ঝটকায় উঠে দাড়ালো।
_________________
জ্ঞান ফিরতেই ইশাত দেখলো সে বিছানায় শুয়ে আছে তার গায়ে আগের সেই লেহেঙ্গা বা ভারী কোনো গহনা নেই। পরিবর্তে আরামদায়ক, ঢিলেঢালা লম্বা গাউন এটে আছে। আর মাথায় হিজাবের পরিবর্তে লম্বা রেশমি চুলগুলোতে বেণুনি গাঁথা। ইশাত নিজেকে লক্ষ্য করে ধড়ফড়িয়ে উঠলো। তার চোখে ভেসে উঠলো জ্ঞান হারানোর পূর্বের মুহূর্তটুকু। অতি নড়াচড়ায় তার হাতে কিছু একটার সূঁচালো টান অনুভব হলো। তখন পাশ থেকে ভীষণ সুন্দর দেখতে একটা মেয়ে উঠে এসে তাড়াহুড়োতে তার হাত চেপে ধরে চিন্তিত মুখে বলল।
— কাম ডাউন, তোমাকে সেলাইন দেওয়া হচ্ছে, হাত নাড়িয়ো না।
ইশাত বিস্মিত চোখে নিজেকে পরখ করলো তার মাথায় ব্যান্ডেজ করা আর হাতে সেলাইন চলছে। সে পুনরায় অস্থিরতা নিয়ে বলল।
— কে আপনি? আর আমার জামা কাপড় হিজাব এগুলো কে বদলেছে?
মেয়েটা তখন শান্ত কন্ঠে তাকে আশ্বস্ত করে বলল।
— আমি এভিয়ানের বান্ধবী আর রিজভীর ওয়াইফ জেরিন। তুমি সেন্সলেস হয়ে যাওয়ার পর এভিয়ানই আমাকে এখানে ডেকেছে। আমি এসে তোমাকে ফ্লোরে পড়ে থাকা অবস্থায় পাই। সাথে সাথে তোমাকে ধরে উঠিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে জামা কাপড় বদলে দিয়েছি, আর আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই তোমাকে কেউ এভাবে দেখে নি।
জেরিনের কথায় মনে খচখচ করতে থাকা অনিশ্চিত আশঙ্কা কাটতেই ইশাত ফোস নিশ্বাস ছাড়লো, কিছুটা শান্ত হলো পরক্ষণে আবারো বিচলিত হয়ে বলল।
— আমার হিজাবটা প্লীজ এনে দিন। হঠাৎ কেউ এলে আমাকে এভাবে দেখে ফেললে আমার পর্দা নষ্ট হবে।
জেরিন কিছুটা অবাক হলো ইশাতের পর্দার প্রতি সচেতনতা দেখে সে উঠে ইশাতের হিজাবটা এনে দিলো। ইশাত চটজলদি তার হাত থেকে হিজাবটা নিয়ে পড়ে ফেলল। অবশেষে সে আতঙ্ক কাটিয়ে পুরোপুরি শান্ত হলো যেন তার শরীরে সে প্রাণ ফিরে পেয়েছে। জেরিন তখন তার পাশে বসে রয়েসয়ে জিজ্ঞাসা করলো।
— তোমার পরিচয় কি? এভি তোমায় কেন এখানে এনেছে? এর আগে তো সে কোনো মেয়েকে নিয়ে আসে নি। কি সমস্যা তোমার সাথে ওর? দেখ আমাকে তুমি বিশ্বাস করে বলতে পারো হয়তো আমি তোমাকে কোনো ভাবে সাহায্য করতে পারি।
সাহায্যের আশ্বাস পেয়ে ইশাত তখন চোখে প্রত্যাশা নিয়ে জিজ্ঞাসা করলো।
— আমাকে কি আপনি এখান থেকে পালাতে সাহায্য করবেন?
জেরিন ইশাতের প্রত্যাশায় এক বালতি পানি ঢেলে বলল।
— না সেটা পারবো না। এভিয়ানের অনুমতি ছাড়া এখানে একটা পাতাও এদিক ওদিক হয় না। তবে যা যা তোমার প্রয়োজন আমাকে বলো সেগুলো এনে দিতে পারব। বলো তোমার কি কি লাগবে?
ইশাত হতাশ হলো না সে জেরিনকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলল।
— জাযাকাল্লাহু খায়রান, অনুগ্রহ করে আমাকে একটা জায়নামাজ আর কুরআনের ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন? আমার সেটাতেই হবে আর কিছুর প্রয়োজন নেই।
জেরিন উপর নিচ মাথা দুলিয়ে বলল।
— ঠিকাছে কালকে সকালে পেয়ে যাবে। এবার বলো তোমার পরিচয় কি? আর কি সমস্যা ছিল তোমার সাথে এভিয়ানের?
জেরিনের করা প্রশ্নে ইশাতের চোখ মুখে আধার নেমে এলো। সে এভিয়ানের প্রতি মনে জমিয়ে রাখা রাগ আর কন্ঠে ক্ষোভ নিয়ে বলল।
— উনি একটা অ’মানুষ, নাহলে এমনটা তিনি করতে পারতেন না। উনার আমার সাথে কোনো সমস্যাই ছিল না। আমার পরিচয় আমি সামায়রা মেহেজাবিন ইশাত। আমার ভাইয়া ইমরান হাসান একজন আইজিপি অফিসার উনার কালো ব্যবসা এক্স”পোজ করা ছিল তার মিশন। সেই মিশনে ভাইয়া গোপনে তার পুরো টিম লাগিয়েছিলেন তবে একজন অফিসার আপনার বন্ধুর হাতে ধরা পড়ায় তিনি আমার ভাইয়ার উপর প্রতিশোধ তুলতে আমাকে আমার বিয়ের দিন অ”পহ”রণ করে এখানে তুলে নিয়ে আসেন। আর এমন ভাবে ঘটনা সাজান যেনো আমি বিয়ে থেকে পালিয়েছি। আমার পরিবারের সম্মান নষ্ট করতে তিনি এতো নিচু একটা খেলা খেললেন। আচ্ছা আপনাকে দেখে তো তার মতো অসৎ মনে হচ্ছে না। আপনি এমন একটা ক্রি’মিনালের ফ্রেন্ড হলেন কি করে?
ইশাতের অবুঝ প্রশ্নে জেরিন একগাল হেসে বলল।
— বলতে গেলে রিজভী এভিয়ান আর আমার পরিচয় হয় ব্যবসায়িক সূত্রে। রিজভী এভিয়ানের বিজনেস পার্টনার আর আমি একজন প্রফেশনাল সার্জেন। আমেরিকায় বড় একটা হাসপিটালে কর্মরত ছিলাম। কয়েক বছর আগের ঘটনা সেদিন নাইট শিফট থাকায় বাসায় ফিরতে বেশ রাত হয়ে যায় আমার। তাড়াতাড়ি সব গুছিয়ে শর্টকাট একটা রাস্তা ধরে বাসায় ফিরছিলাম। রাস্তাটা ছিল বেশ নির্জন তখন বাসায় ফেরার তাড়া ছিল বলে এতো কিছু মাথায় আনি নি সোজা হাটা দিয়েছি। তবে মাঝ পথে পরপর জোরালো বু’লেটের আওয়াজ কানে আসতেই চমকে উঠলাম। সাহস করে এগিয়ে দেখলাম এভিয়ান র’ক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা রিজভীকে মাটি থেকে তুলছে। যেহেতু আমি একজন ডাক্তার তাই দায়িত্ব পালনে ছুটে গেলাম। এভিয়ানকে বললাম আমি একজন ডাক্তার রোগীর চিকিৎসা করতে হাসপিটাল নিতে হবে। কিন্তু এভিয়ান নাকচ করে বলল আমাকে তার বাসায় গিয়ে চিকিৎসা দিতে হবে। এতো রাতে আমি যেতে অসম্মতি জানালে সে আমার মাথায় গা’ন ধরে এবং চিকিৎসা দিতে জোড়াজুড়ি করে। আমি নিজের জীবন বাঁচাতে বাধ্য হই তার কথা মানতে।
এতটুকু বলে জেরিন ফোস নিশ্বাস ছাড়লো। ইশাত তখন আগ্রহ নিয়ে বাকিটা জানতে চেয়ে বলল।
— তারপর?
জেরিন তখন বাকিটা বলতে শুরু করলো।
— রিজভীকে চকিৎসা দিয়ে সুস্থ করার পর এভিয়ান আমাকে প্রস্তাব দেয় তার প্রাইভেট ডক্টর হিসেবে কাজ করার। যেহেতু আমি তার সত্যটা জেনে গেছি। আমি তখন অসম্মতি প্রকাশ করি কিন্তু এভিয়ান অবশেষে আমাকে রাজি করিয়ে ফেলে। পরিস্থিতির শিকার হয়ে আমি এভিয়ানের হয়ে কাজ করতে শুরু করি। সে আমাকে এর বদলে ডাবল পারিশ্রমিক আর সকল সুযোগ সুবিধাও দিতো। ধীরে ধীরে আমি এভিয়ান আর রিজভীকে কাছ থেকে জানতে শুরু করি। তাদের সাথে আমার একটা ভালো বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরি হয়। পরে একদিন জানতে পারি রিজভী আমাকে ভালোবাসে বলে এভিয়ান তখন আমাকে এতো সুযোগ সুবিধা করে দিতো। সেদিন রিজভী আমাকে নিজে এসে প্রপোজ করে রিজভীকে আমারও পছন্দ ছিল তাই রাজি হয়ে যাই।
ইশাতের মনে কৌতূহল জাগে সে প্রশ্ন করে বলে।
— সেদিন রিজভী ভাইয়ার সাথে কি এমন ঘটেছিল? কারা তাকে গু’লি করেছিল?
— তখন আমি যতটুকু জেনেছিলাম তারা এভিয়ানের স্টেপ মমের লোক ছিল।
— স্টেপ মা?
— হ্যা, সেদিন এভিয়ান একটা মিশন থেকে ফিরছিল। দুর্ভাগ্যক্রমে তখন সে সাথে কোনো গার্ড রাখে নি। সেদিন কোনো এক দরকারে রিজভী এসেছিল তার সাথে দেখা করতে। তখন ছদ্মবেশে গোপনে কেউ এভিয়ানের উপর হামলা চালায়। এভিয়ান তখন রিজভীকে হাতের ইশারায় আড়াল হতে বলে এবং একাই দক্ষ শু’টারের মত গা’ন চালিয়ে বিপরীত ব্যক্তির উপর পাল্টা হামলা চালায়। রিজভী একটা সাদাসিধে ছেলে সে সব সময় মা’রামা’রি কা’টাকা’টি থেকে দূরে থাকতো। সেদিন সে নিজ চোখে দেখেছিল এভিয়ানের এমন অজানা রূপ। এভিয়ানকে সে এতোগুলো পারদর্শী স্নাইপারের সম্মুখে একা লড়তে দেখে আতঙ্কিত হয়ে অসতর্কতায় আড়াল থেকে উঠে আসতেই তার বাহুতে একটি বু’লেট এসে বিদ্ধ করে। এভিয়ান বিপরীতে প্রত্যেকটা স্নাইপারের উপর টার্গেট করে আ’ঘাত হানে। ভাগ্যক্রমে তারা কোনরকমে প্রাণ বাঁচিয়ে পালিয়ে যায়। এভিয়ান তাদের তাড়া করে সময় নষ্ট না করে সঙ্গে সঙ্গে রিজভীকে তুলে তার রক্তা’ক্ত হাত চেপে ধরে। তখনই ছিল সেখানে আমার আগমন।
ইশাত চোখে মুখে বৃতিষ্ণা নিয়ে বলল।
— এরমানে তিনি শুরু থেকেই একটা স’ন্ত্রাস ছিলেন।
জেরিন ইশাতের কথা শুনে প্রতিবাদ জানিয়ে বলল।
— ভুল বলছো, এভিয়ান শুরু থেকে এমনটা ছিল না। ওর একটা দুর্বিষহ অতীত আছে। এভিয়ান কখনোই আমাদের তার অতীত নিয়ে কিছু বলতো না। সে কখনো কারো সিমপ্যাথি পেতে চাইতো না। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তার অন্তরটা আপনজনদের ভালোবাসা হারিয়ে খা খা করতো সেটা আমি আর রিজভী বুঝতে পারতাম। তাইতো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খোঁজ লাগিয়ে তার অতীত সম্পর্কে জানতে পারি। ছেলেটার অতীত ছিল খুবই নি’ষ্ঠুর। তার অতীত তাকে নি’র্দয় হতে বাধ্য করেছে।
ইশাতের কপালে কয়েক ভাঁজ পড়লো। মনে আগ্রহ জাগলো এভিয়ানের অতীত জানার। সে বলল।
— এমন কি ছিল তার অতীতে?
— সেটা আমি তোমাকে বলতে পারব না ইশাত।
— কেন বলতে পারবেন না?
— ওইযে বললাম এভিয়ান তার অতীত নিয়ে আলোচনা করা পছন্দ করে না। সে যদি জানতে পারে আমি তোমাকে এসব বলেছি তখন আমার উপর ভীষণ রাগ হবে। আর সত্য জানলেও বা কি তুমি কি তাকে তোমার প্রতি করা অন্যায়ের পর ক্ষমা করতে পারবে?
ইশাত তবুও বাকিটা জানতে চাওয়ার আগ্রহ নিয়ে বলল।
— সে আমার সাথে অন্যায় করেছে সেই অর্থে আমার জানার অধিকার রয়েছে, হয়তোবা সত্যটা জেনে ভেবে দেখব সে তার অন্যায়ের ক্ষমা পাওয়ার যোগ্য কি না। আমি কথা দিচ্ছি এই ব্যাপারে সে কিচ্ছু জানতে পারবে না।
ইশাতের প্রতিশ্রুতিতে ভরসা করে জেরিন এবার বলতে শুরু করলো।
— এভিয়ানের শৈশব স্বাভাবিক বাচ্চাদের মত কাটেনি ইশাত।নানান ঝড়ঝাপটা পেরিয়ে তাকে এই পর্যন্ত আসতে হয়েছে। এভিয়ানের মা মরিয়ম রহমান ছিলেন একজন মুসলিম পরিবারের মেয়ে। ছোট ভাইয়ের পর তিনি ছিলেন বাবা মার একমাত্র আদরের কন্যা সন্তান। ছোট থেকেই আদর আবদারে বড় হয়েছিলেন তিনি। যখন তার পরিবারসহ তিনি আমেরিকায় শিফট হন, তার বাবা তাকে আমেরিকার জনপ্রিয় একটা ভার্সিটিতে এডমিশন নিয়ে দেন সেখান থেকেই শুরু হয় আসল ঘটনার সূচনা। ভার্সিটিতে গিয়ে মরিয়মের পরিচয় হয় এভিয়ানের বাবা নাথান রোজিওর সাথে। তারা একে অপরকে ভালবাসতে শুরু করে তাদের মধ্যে একটা গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়। মরিয়ম রহমান যখন তার বাবা মাকে এই ব্যাপারে জানায় তখন তারা এর ঘোর বিরোধীতা করেন কারণ নাথান উচ্চ বংশীয় ছেলে হলেও সে ছিল ভিন্ন ধর্মাবলম্বী।
কিন্তু মরিয়ম জেদ ধরে বসে বিয়ে করলে সে নাথানকেই বিয়ে করবে। তার বাবা তখন ঠিক করে তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে নিয়ে ভালো একটা ছেলে দেখে বিয়ে দিয়ে দিবেন। এই পরিকল্পনায় তিনি সবার পাসপোর্ট ভিসা সব যোগাড় করতে থাকেন। কিন্তু যেদিন তাদের দেশে ফেরার কথা ছিল সেদিন মরিয়ম রহমান পালিয়ে গিয়ে বাবার মায়ের ইচ্ছের বিরুদ্ধে নাথানকে বিয়ে করে এবং খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহন করেন। তার নাম তখন মরিয়ম রহমান থেকে পাল্টে হয়ে যায় মরিয়ম রোজিও। নিজের ধর্মের ওপর তার জীবনসঙ্গীকে বেছে নেয়ায় তার বাবা মা এই বিয়ে মেনে নিতে না পেরে তাকে ত্যাজ্য করে দেন। এতে মরিয়মের মধ্যে কোনো আক্ষেপ দেখা দেয় না। তিনি নাথানের সাথে ভালোই সংসার চালিয়ে যান। বছর দুয়েক ঘুরতেই তাদের কোল আলো করে জন্ম হয় এভিয়ানের। সেই প্রথম থেকেই এভিয়ান ছিল মায়ের পাগল বলতে গেলে মাম্মাস বয়। মা ছাড়া ছেলেটা কিছুই করতে পারতো না। মরিয়মও তার ছেলেকে আদরে আহ্লাদে রাজপুত্র তার বানিয়ে রাখতেন। তাদের হাসিখুশি জীবনে সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল, কিন্তু যখন এভিয়ান ফিফথ স্ট্যান্ডার্ডে উঠলো তখন সে প্রায় তার বাবা মার মধ্যে রোজ রোজ ঝগড়াঝাটি আর অশান্তি দেখতো।
এর মধ্যে মরিয়ম একদিন জানতে পারে নাথানের হানা নামের একটা মহিলার সাথে গোপনে গভীর সম্পর্কে জড়িয়ে। তিনি স্বামীকে বুঝানোর অনেক চেষ্টা করেন কিন্তু ফেরাতে পারেন না সেই নারীর থেকে। একটা সময় নিজের ভালোবাসার মানুষের সাথে অন্য কাউকে মেনে নিতে না পেরে তিনি আ’ত্মহত্যার পথ বেছে নেন। সেদিন দুপুরের দিকে এভিয়ান স্কুল থেকে বাসায় ফিরেছিল মুখে শিশুসুলভ উচ্ছ্বাস আর হাতে মার্ক শিট নিয়ে। সে মাকে তার ফার্স্ট ক্লাস রেজাল্ট দেখাবে আর মা খুশি হয়ে তাকে সুন্দর সুন্দর উপহার দিবে বলে আনন্দ নিয়ে সে মায়ের রুমে এসেছিল। অথচ ফিরে মায়ের কোলের উষ্ণতা পাওয়ার বদলে সে মাকে র’ক্তাক্ত হাতে নি’থর হয়ে মেঝেতে পড়ে থাকা অবস্থায় পেয়েছিল। ছোট্ট এভিয়ানের কোমল হৃদয় সেদিন প্রথমবারের মতো ভেঙে কয়েক টুকরো হয়ে গিয়েছিল। আর সেদিন থেকেই এভিয়ানের জীবনে নেমে আসে দুর্যোগ। মরিয়ম রোজিওর মৃ’ত্যুর পর তার বাবা নাথান তার প্রেমিকা হানাকে বিয়ে করে ঘরে তুলেন। বিয়ের পর হানা এভিয়ানকে মানতে না পেরে শুরু করে দেয় নানান অশান্তি। দুনিয়ার জ্ঞান তখনও এভিয়ানের মাঝে ছিল না। মা মরা অবহেলিত ছোট ছেলেটাকে নানান ভাবে অত্যাচার করতে থাকেন হানা। নাথান তখন বাধ্য হয়ে নিজের সংসার বাঁচাতে এভিয়ানকে পাঠিয়ে দেয় তার নানা নানীর কাছে।
এভিয়ানের নানা নানী তাদের মেয়ের পরিণতির কথা জেনে এভিয়ানের উপর সহানুভূতি দেখিয়ে তাকে তাদের কাছেই রেখে দেন। কিন্তু এভিয়ানকে মানতে পারে না তার মামা মামী। ছেলেটাকে নিয়ে তারা নানান ভাবে কটুক্তি করতেন, তুচ্ছ তাচ্ছিল্য অপমান আর খোটা দিতেন। এতে তার নানা নানীর কিছুই করার ছিল না কারণ তারা নিজেরাই থাকতেন ছেলের সংসারে। এভিয়ানও কিচ্ছু বলতো না শুধু ছলছল চোখে তাকিয়ে সব অপমান সহ্য করে নিত। তারা তাকে যা কাজ করতে দিত সে চুপচাপ তাই করতো। এভাবে কেটে যায় বছরের পর বছর, এভিয়ানের বাবা তার কোনো খোঁজ খবর নেয় না। এভিয়ানের মনেও বাবার প্রতি একটা জেদ রয়ে যায়।
এভিয়ান তার নানা নানীর মাঝেই মায়ের হারানো ভালোবাসা খুঁজে পেয়েছিল। সে নিজে থেকেই তার নানা নানীর সেবা করতো। এই কয়বছরে সে নানা নানীর কাছে অনেক প্রিয় হয়ে উঠেছিল। তার নানা নানীও তাদের জমানো টাকা দিয়ে এভিয়ানকে পড়াশোনা করায় কিন্তু কখনো নিজেদের ধর্মের নিয়ম তার উপর চাপিয়ে দেয় নি। এতেও তার মামা মামীর ছিল হিংসা। তাদের একমাত্র ছেলে সামির যে সব সময় এভিয়ানকে টেক্কা দিয়ে চলতো। মা বাবার মতন তাকে অপ’মান করতো কথায় কথায় নিচু করতে চাইতো। পড়ালেখা এবং অন্যান্য বিষয়ে এভিয়ান ভালো ছিল বলে সামির তাকে সহ্য করতে পারতো না। তবুও এভিয়ান পড়া শোনা থেকে শুরু করে যে কোনো বিষয়ে তাকে সাহায্য করতো।
যখন এভিয়ানের নানা নানী এক সড়ক দুর্ঘটনার মা’রা যান তখন এভিয়ান সবে মাত্র তার স্কুল শেষ করে কলেজ জীবনে পা রেখেছে। তার মামা মামী এই সুযোগে এভিয়ানকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। এভিয়ান ফিরে যায় বাবার কাছে সেদিন সে আবারো আরেক নি’ষ্ঠুরতার মুখোমুখি হয়েছিল। বাড়িতে ঢুকতেই সে দেখেছিল বাড়ি ভর্তি মানুষ। তার বাবা নাকি ফুড পয়জনিংয়ে মৃ’ত্যু বরণ করেন এবং তার সকল সম্পত্তির মালিক হন তার স্ত্রী হানা। কারণ তিনি তার থেকে আগেই সব সম্পত্তি লিখিয়ে নেন নিজের নামে। হানা ছিল প্রচুর ধূ’র্ত এবং লো’ভী একটা মহিলা। বিয়ের পরপরই তার মেয়ে ক্লারার জন্ম হয়। কিন্তু নাথান এভিয়ানের মতো ক্লারাকে ভালবাসতে পারে না। ক্লারা ছিল তার মায়ের মতোই লো’ভী। একটা সময় নিজের ভুল বুঝে নাথান যখন এভিয়ানকে নিজের সম্পত্তি লিখে দিতে চেয়েছিল তখন হানা ছ’লনার অশ্রয় নিয়ে নাথানের কাছ থেকে সম্পত্তি সব নিজের নামে লিখিয়ে নিয়ে তার খাবারে বি’ষ মিশিয়ে এক পরিকল্পিত মৃ’ত্যু ঘটায়। এবং নাথানের বড় কোম্পানি আয়ত্তে আনতে নিজে চেয়ারম্যান পদে বসে কোম্পানি সামলায়।
সেদিন থেকে এভিয়ানের মনে একটা জেদ কাজ করে হানার প্রতি। কারণ হানাই ছিল তার বাবা মার একমাত্র মৃ’ত্যুর কারণ। এভিয়ানের চোখে তখন ছিল নিজের হাতে হানার ধ্বং’স লিখার নেশা। দু চোখে আপনজনগুলোর মৃ’ত্যু দেখতে দেখতে তার হৃদয় পাথরে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। তার নানা নানী মৃ’ত্যুর আগের তার নামে ব্যাংকে কিছু টাকা উইল করে দিয়ে গিয়েছিল। এভিয়ান সেই টাকায় হাত দেয় না মামা মামীর কাছে বুঝিয়ে দিয়ে তাদের থেকে চিরবিদায় নিয়ে চলে আসে। তার নিজের কোনো ঠিকানা ছিল না। সে রেন্টের রুমে থেকে ছোট খাটো একটা জবে জয়েন হয়। দিন রাত পরিশ্রম করে নিজের টাকায় বাকি পড়াশোনা শেষ করে। শুরু হয় তার জীবন যুদ্ধ। বাবা মা পরিবার হারা ছেলে তখন বুঝতে শুরু করে দুনিয়ার কঠিনত্ব। তার কষ্টের দিনগুলোতে তাকে সামলে নেওয়ার জন্য ভরসা দেওয়ার জন্য একটা বিশ্বস্ত কাধ পর্যন্ত ছিল না। না খেয়ে তাহলেও কেউ এসে খাইয়ে দেওয়ার জন্য কেউ ছিল না। দিন এভাবেই কেটে যেতে থাকে। একাকিত্বের দহনে মদ পানির নেশা তাকে ঘিরে ধরে। একই ভাবে সে ড্রা’গও নিতে শুরু করে।
এতকিছুর পরও তার জীবনের লক্ষ্য ছিল বড় মাপের ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট হওয়ার। সে তার লক্ষ্য দৃঢ় করে। দীর্ঘ কয়েকবছর একটানা পরিশ্রমের পর সে সফলও হয়েছে কিন্তু এতটুকু তার প্রতি’শোধের জন্য যথেষ্ট ছিল না। তার সৎ মা হানাকে টক্কর দিতে তার প্রয়োজন ছিল আরো বেশি ক্ষমতার। তাই এভিয়ান উদ্দেশ্য পূরণের জন্য আন্ডার ওয়ার্ল্ডের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলে। আন্ডার ওয়াল্ডে বিশ্বাস অর্জন করতে তাকে জটিল জটিল মিশনে থেকে নিজের যোগ্যতা এবং দক্ষতা প্রমাণ দিতে হয়। টাকার বিনিময়ে হাতে ক্ষমতা ধরা দিতেই ধীরে ধীরে সফল ব্যবসায়ীর খাতায় দিনদিন তার পরিচিতি বাড়তে থাকে। অল্প সময়েই সে নিজেকে দাড় করায় বিশিষ্ট ব্যবসায়ীদের সাথে।
এভিয়ান তখন থেকে পরিণত হয় নি’ষ্ঠুর মানবে। গোপনে শুরু করে কালো ব্যবসা ড্রা’গ সাপ্লাই। যে তার পথে এসে বাধা হয়ে দাড়াত সে তাদের নিয়ে ট’র্চার করতো ঠিকই তবে মৃ’ত্যু দিত না। হয়তো এটা ছিল তার ধরন। এভাবেই সে নিজেকে তিলেতিলে গড়ছিল। একটা সময় তার ক্ষমতা আর আধিপত্যের বিস্তার হয় হানারও উপরে। ক্ষমতার জোড়ে সে হানার অফিসের কর্মীদের নিজের আয়ত্তে এনে নেয়। এতে দিনদিন হানা লসের মুখোমুখি হয়ে একে একে সব হারাতে থাকে। চিন্তায় সে মানসিক রোগে ভুগতে থাকে। নিজেকে শান্ত রাখতে সপ্তায় সপ্তায় সে সাইকোলজিস্টের শরণাপন্ন হতো। একটা সময় আর্থিক চাপে হানা বাড়ি অফিস সব হারিয়ে ফেলে। মেয়েকে পাঠিয়ে দেয় অন্য কোথাও। হানাকে নিঃস্ব বানিয়েও এভিয়ান তাকে ছাড়ে নি। দিন রাত মৃ’ত্যুর ভয় দেখাতো, ডে’থ থ্রে’ড দিতো। চারদিক থেকে এতো এতো চাপ নিতে না পেরে অবশেষে হানা মরিয়ম রোজিওর মতোই আ”ত্মহ”ত্যা বেছে নেয়।
এভিয়ানও তার সকল উদ্দেশ্য পূরণের সফল হয়। হানার একমাত্র মেয়ে ক্লারা ফিরে এসে জানতে পারে মায়ের মৃ’ত্যুর কথা। সেও ওৎ পেটে আছে এভিয়ানের উপর প্র’তিশোধ তোলার জন্য। সেদিন রাতে এভিয়ানের উপর যে অ্যা’টাক হয়েছিল সেটাও ক্লরার পরিকল্পিত ছিল। সেই পাঠিয়েছিল তার দক্ষ স্নাইপারদের। আমার অবাক লেগেছিল এইরকম সাধারণ একটা মেয়ের কি করে পারলো এভিয়ানের উপর হাম’লা করার। পরে খোজ নিয়ে জানা গেছে ক্লারা একজন গ্যাং’স্টার।
তবে এতকিছুর পর আমি বলব এভিয়ান নিজেও জানে না কবে সে হানার বিরুদ্ধে প্রতি”শোধ নিতে গিয়ে নিজেকেই হারিয়ে ফেলছে অন্ধকার জগতের গহীনে। দুনিয়ার চোখে নিজেকে শক্ত দেখালেও ভেতর থেকে সে ভেঙেচুরে গেছে। নিজের ভাঙাচোরা দিকটা সে কাউকে দেখায় না। তার নীরবে নিভৃতে আর্তনাদগুলোর সাক্ষী হয়ে আছে তার রুমের চার দেয়াল আর আমরা। বাহিরে হিং’স্রতা আর নিষ্ঠু’রতা দেখালেও এভিয়ান ভেতরে ভেতরে ভালো নেই ইশাত।
কথাগুলো বলে থেমে জেরিন হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এতক্ষন ইশাত অধীর আগ্রহ নিয়ে কথাগুলো শুনছিল তার দৃষ্টি কোমল হয়ে এলো। এভিয়ানের করুন পরিণতির কথা জেনে এভিয়ানের প্রতি তার অনুতাপ কাজ করলো। পরক্ষণে মনে পড়ে গেল এভিয়ানের করা প্রত্যেকটা আ’ঘাত আর অ”ত্যাচারের কথা।
জেরিন তখন প্রশ্নবোধক চাহনি নিয়ে ইশাতকে জিজ্ঞাসা করলো।
— বল এবার, তুমি কি এভিয়ানের অতীত জানার পর তাকে ক্ষমা করতে পেরেছো?
ইশাত তখন আনমনা হয়ে যায় শুরু থেকে এভিয়ানের করা প্রত্যেকটা আ”ঘাত ইশাতের দৃশ্যপটে ভেসে আসতে শুরু করে। তরঙ্গের আ’ঘাত থেমে গেলেও তার অনুরণন রয়ে যায় দীর্ঘক্ষণ, ঠিক যেন কোনো ভাঙা সেতারের শেষ সুরটির মতো। তবে কি সুতীব্র দহন শেষে এক পশলা প্রশান্তি আসবে? নাকি এই প্লাবনেই তলিয়ে যাবে চেনা সব অনুভূতির কিনারা?
চলবে ( ইনশাআল্লাহ )………………………

