#ক্লান্তিহীন_তুই_আমার_ফরিয়াদ
#পর্বঃ২৯
#সুমাইয়া_জান্নাত_ইলমা
রিজভী তার কেবিনে বসে ফাইল চেক করছিল এমন সময় সায়মা এসে তার কেবিনের দরজায় নক করলো। রিজভী অনুমতি দিলে সায়মা ভেতরে প্রবেশ করে সালাম জানালো। রিজভী সালামের উত্তর নিয়ে বলল।
— কিছু বলবে সায়মা?
সায়মা প্রশ্নের উত্তরে বলল।
— জ্বী স্যার, আসলে আমি অফিসের সবার পক্ষ থেকে এসেছি একটা আবদার নিয়ে।
— বলো কি আবদার।
— আমরা সবাই মিলে একটা পিকনিকের আয়োজন করতে চাচ্ছি। সব সময় তো কাজের চাপে থাকা হয়। সবাই একসাথে কোথাও ঘুরে আসলে কাজের স্ট্রেস কমবে আর মনমানসিকতাও ভালো লাগবে।
— বুদ্ধিটা ভালো দিয়েছ। আমি এভিয়ানের সাথে কথা বলে তোমাদের জানাচ্ছি।
— ধন্যবাদ স্যার।
সায়মা চলে যেতেই রিজভী উঠে এভিয়ানের কেবিনে চলে গেলো। এভিয়ান তখন ফোনে কারো সাথে কথা বলছিল। রিজভীকে দেখে সে ফোন রেখে রিজভীর দিকে মনযোগ দিয়ে বলল।
— কিছু বলবি?
— হ্যা অফিসের ওয়ার্কাররা সবাই পিকনিক করতে চাইছে। তুই চাইলে আমি পিকনিকের আয়োজন করি?
এভিয়ান এক বারেই রাজি হয়ে বলল।
— কর।
রিজভী খুশি হয়ে বলল।
— ঠিকাছে তাহলে আজকে আর কালকের মধ্যে সব ব্যবস্থা নেই,পরশু বলে দেই ওদের পিকনিকের তারিখ।
— বলতে পারিস।
রিজভী কথা ফাইনাল করে সবাইকে জানাতে গেলো। সায়মা আর ইশাত পাশাপাশি ডেস্কে বসে কাজের ফাঁকে ফাঁকে টুকটাক কথা বলছিল। তখন সেখানে রিজভী উপস্থিত হয়ে সকল কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে বলল।
— সবাই শোনো, এভিয়ানের সাথে আলোচনা করে পিকনিকের আয়োজন করেছি আমরা পরশু। পরশুদিন হলে তোমাদের কোনো সমস্যা হবে? সেদিনই কি কনফার্ম করবো?
সায়মাসহ সবাই তখন খুশিতে জোড়ে শব্দ করে বলল।
— হ্যা আমরা রাজি।
রিজভী তখন ইশাতকে চুপ থাকতে দেখে বলল।
— কী হলো তুমি কিছু বলছো না কেন ইশাত? তোমার সফল প্রেজেন্টেশনের কারণেই তো এভিয়ানকে বলে পিকনিকের আয়োজন করলাম তুমি যাবে না?
ইশাত অনিশ্চয়তা নিয়ে বলল।
— বাসায় জানাতে হবে, আম্মু অথবা ভাইয়া একা দূরে কোথাও যেতে দেবে না।
রিজভী তাকে আশ্বস্ত করে বলল।
— না দূরে কোথাও যাবো না আমরা, শহরের কাছাকাছি একটা রিসোর্টেই উঠব। একদিনের জন্যেই তো, সমস্যা হবে না। তুমি বাসায় বলে রাজি করাও। সবাই গেলে আনন্দ হবে। তাছাড়া অফিস থেকে এটা তোমার প্রথম পিকনিক।
ইশাত উপর নিচ মাথা দুলিয়ে বলল।
— ঠিকাছে, বাসায় বলে জানাবো।
———————–
সন্ধ্যায় অফিস টাইম শেষ হলে ইশাত অফিস থেকে বেরোতেই দেখলো আজও আসিফ গাড়ি নিয়ে দাড়িয়ে। ইশাত এগিয়ে গিয়ে প্রশ্ন করলো।
— আজও আমার অফিসের বাহিরে কি করছেন?
আসিফ মুখ ছোট করে বলল।
— মনটা খারাপ লাগছিল তাই তোমার সাথে দেখা করতে চলে এলাম। চল কোনো একটা কফি শপে বসে কথা বলি।
ইশাত নাকচ করে বলল।
— আমার হাতে সময় নেই বাসায় গিয়ে নামাজ পড়তে হবে।
— তাহলে তোমাকে বাড়িতে পৌঁছে দেই চলো।
— সেদিনের করা ওয়াদার কথা ভুলে গেছেন?
— মনে আছে ইশাত, আমি আসতাম না কিন্তু দাদির জন্য মনটা ভীষণ খারাপ। আমার মন তোমার সাথে কথা বললেই ভালো হবে। তুমি ভুলে গেছ আমরা যে ভালো বন্ধু ছিলাম?
ইশাত মনে মনে আসিফের জন্য কষ্ট পেলো। ছেলেটা তার দাদীকে অনেক ভালোবাসতো বিধায় এমন মনম’রা হয়ে গেছে, তাকে মানা করলে সে হয়তো অনেক আ’ঘাত পাবে সেই কথা মাথায় রেখে ইশাত তার গাড়িতে উঠলো। সারা রাস্তা সে আসিফকে বুঝ দিল সাথে দাদির নামে দোয়া আর দান করার পরামর্শ দিলো। আসিফ ইশাতের প্রত্যেকটা কথা মন দিয়ে শুনছিল তার মাথা দুলিয়ে প্রত্যুত্তর করছিল। গাড়ি যখন ইশাতের এপার্টমেন্টের সামনে এসে থামলো তখন ইশাত তাড়াহুড়ো করে গাড়ি থেকে নেমে আসিফকে বিদায় জানিয়ে চলে গেলো।
ইশাত গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আগে মাগরিবের নামাজটা পড়ে নিলো। নামাজ শেষে সে আহনাফকে ধরে পড়াতে বসালো। ইশাত যখন অহনাফকে কোলে নিয়ে আঙুল দিয়ে ধরিয়ে ধরিয়ে পড়াচ্ছিল, তখন তার ফোনে জেরিনের কল এলো। ইশাত আহনাফকে পড়া দেখিয়ে দিয়ে খুশি মুখে জেরিনের কল তুলে সালাম জানালো। জেরিন তার সালামের উত্তর নিয়ে বলল।
— পিকনিকে যাবে না তুমি? আমিও কিন্তু থাকছি।
ইশাত চিবুকে হাত রেখে বলল।
— ওহ! আমি তো আম্মুকে বলতে ভুলে গিয়েছিলাম আপু। সত্যি তুমিও যাবে?
— হ্যা, যেহেতু আমি যাচ্ছি তোমাকেও কিন্তু যেতে হবে।
— আচ্ছা আমি তাহলে এখনই আম্মুকে জিজ্ঞাসা করে আসছি।
— আচ্ছা যাও।
ইশাত ফোন কেটে মায়ের রুমে গেলো। আসিয়া বেগম কুরআন তিলাওয়াত করছিলেন। ইশাতকে দেখে তিনি কুরআন বন্ধ করে সযত্নে একপাশে রেখে বললেন।
— বাসায় এসে মাগরিবের নামাজ পড়েছিলে?
ইশাত মাথা দুলিয়ে কাছে গিয়ে বসে বলল।
— হ্যা আম্মু, একটা অনুমতি নেওয়ার ছিল তোমার থেকে।
— কোন বিষয়ে?
— আমাদের অফিস থেকে পিকনিকের আয়োজন করা হয়েছে। বেশি দূরে না কাছাকাছিই যাবে তারা। জেরিন আপুও যাবে বলেছে। তোমাকে তো বলা হয়নি অপুর হাজবেন্ড এই অফিসের সিইও। আমি কি যাব?
আসিয়া বেগম সব শুনে বললেন।
— যাওয়ার প্রয়োজন হলে যাবে।
— তাহলে আমি ওদের জানিয়ে দেই?
— ঠিকাছে জানাও রাতে তোমার ভাইয়াকেও বলে রেখো।
— ঠিকাছে।
রাতে ভাইয়ের থেকে অনুমতি নিয়ে নিশ্চিত হয়ে ইশাত অফিসে এসে জানালো তার যাওয়ার কথা। সবকিছু ঠিকঠাক চলতে লাগলো। এর মাঝে হাতে গুনে দুদিন কেটে গেলো। দেখতে দেখতে পিকনিকের দিনও চলে এলো। সেদিন সকালে উঠে ইশাত ফ্রেশ হয়ে নাস্তা সেরে তৈরি হওয়া শুরু করলো। সে আলমারি থেকে হলুদ রঙের একটা সালোয়ার কামিজের সাথে নুড কালারের হিজাব বের করে পরে নিলো। কামিজের ওড়নাটা সে পিন করে একপাশে ছেড়ে দিলো। মুখে তেমন কিছুই দিল না কারণ ওখানে গিয়ে ওয়াক্ত মত নামাজ পড়তে হবে, ওযু করতে হবে তখন এমনিতেও সব ধুয়েই ফেলতে হবে। সেই ভেবে সে মুখে একটু সানস্ক্রিন আর ঠোঁটে হালকা রঙের লিপ টিন্ট দিয়ে নিলো। তবে এক হাতে একটা সুন্দর দেখতে সোনালী রঙের ব্রেসলেট আর আংটি পড়ে নিলো। অন্য হাতে ঘড়ি পড়ে নিলো।
সে পুরোপুরি তৈরি হয়ে সবার থেকে বিদায় নিয়ে মেইন রোডের কাছে এসে দাঁড়ালো। একটু আগেই জেরিন ম্যাসেজ করেছে তারা বাস নিয়ে রাস্তায় আছে, কাছাকাছি এসে পড়েছে প্রায়। সেখানে ইশাতকে বেশিক্ষণ দাঁড়াতে হলো না। কথা মতো দু মিনিটের মাথায় বাস এসে হাজির হলো। ইশাত বাসে উঠে দেখলো জেরিন রিজভীকে এভিয়ানের সাথে বসতে পাঠিয়ে দিয়ে তার সাথে বসার জন্য জায়গা রেখেছে। ইশাত গিয়ে জেরিনকে জড়িয়ে ধরলো। হাসি মুখে বলল।
— কেমন আছো আপু।
জেরিনও মুখে প্রশস্ত হাসি নিয়ে বলল।
— আলহামদুলিল্লাহ অনেক ভালো। তোমার সাথে বসার জন্য জায়গা রেখেছি, বসো।
ইশাত তখন ইতস্ততা নিয়ে কিছু একটা বলতে চেয়েও পারছে না। জেরিন সেটা বুঝে জিজ্ঞাসা করলো।
— কি বলবে? বলো লজ্জা পাচ্ছো কেন?
ইশাত তখন মুখ খুলল।
— আপু তোমার আপত্তি না থাকলে আমি কি জানালার কাছে বসতে পারি? আসলে বাসে উঠলে আমার দমবন্ধ লাগে।
জেরিন তখন জায়গা ছেড়ে দিয়ে বলল।
— অবশ্যই বসতে পারবে। যাও বস।
ইশাত ধন্যবাদ জানিয়ে জানালার কাছের সিটে গিয়ে বসলো। জেরিন তার সামনে ওয়েফার এগিয়ে দিল, ইশাত নিলো। এতক্ষন বাসে উঠে তার অস্বস্তি লাগলেও ইতিমধ্যে জানালার বাতাস মুখে এসে লাগতেই ভালো লাগতে শুরু করলো। সারা রাস্তা জানালার বাহিরে তাকিয়ে থেকে আর গল্প করতে করতে তাদের পথ ফুরিয়ে গেল।
দুপুর একটার দিকে তারা গন্তব্যে গিয়ে পৌঁছালো। শহর থেকে কিছুটা দূরে নিরিবিলি পরিবেশে সুন্দর একটা রিসোর্টে এসে থামলো বাস। রিসোর্টের নাম পদ্মকুঞ্চ। এই রিসোর্টটা অন্যনা রিসোর্টের তুলনায় ভিন্ন কারণ এখানকার বিশেষত্ব হচ্ছে পদ্ম পুকুর। রিসোর্টের চারপাশে গাছ পালা আর ফুলের বাগান হলেও একপাশে বিশাল এক পদ্ম পুকুর যা জায়গাটার সৌন্দর্য আরো বাড়িয়ে তুলেছে। পুকুরের চারিপাশে রংবেরঙের টিনের ছাউনি। ছাউনির ভেতরে বসার সিট পাতা। সবকিছু মিলিয়ে জায়গাটাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। কাছাকাছির মধ্যে ঘোরার জন্য এই জায়গাটাকেই রিজভী সঠিক ভেবে বেছে নিয়েছিল।
প্রকৃতি প্রেমী হওয়ায় ইশাতের জায়গাটা বেশ ভালো লাগলো। ভেতরে প্রবেশ করতেই সবাই ভিলায় ঢুকে নিজ নিজ রুম নির্ধারণ করে ফ্রেশ হয়ে নিলো। ইশাত ফ্রেশ হয়ে আগে যুহরের নামাজটা আদায় করে নিল। কিছুক্ষণ পর সবাই রুম থেকে বেরিয়ে এসে দেখলো বাহিরে ক্যাটারাররা মিলে খাওয়া দাওয়ার জন্য প্যান্ডেলের নিচে টেবিল চেয়ার সাজিয়ে রেখেছে। বিশাল বিশাল পাতিলে খাবার রান্না করা হয়েছে। খাবারের গন্ধ চারিদিকে মৌ মৌ করছে। দুপুরের খাবারের সময় হয়ে যাওয়াতে সবাই নিজ নিজ চেয়ারে গিয়ে বসলো। ইশাত আর জেরিন একসাথে বসলো সায়মাও ইশাতের অন্য পাশে বসলো।
রিজভী খাবারের ওদিকটা সামলে সেও খেতে বসে পড়লো। কিন্তু এভিয়ান আসলো না। সে এখনো নিজের রুম থেকেই বের হয়নি। তার কথা সে এসব ভারি খাবার খেতে পারবে না। তার জন্য আলাদা খাবারের ব্যবস্থা করে তার রুমে নিয়ে দেওয়া হয়েছে।
রিজভী খেতে খেতে হতাশা নিয়ে জেরিনকে বলল।
— এই এভিয়ানটা না অনেক অসামাজিক। কই সবার সাথে বসে খাবে তা না। নিজের মতো একগুঁয়ে হয়ে রুমে বসে খাবে। যেন সবার সাথে খেতে বসলে নবাবের আভিজাত্য নষ্ট হয়ে যাবে। একা একা কি কোনো আনন্দ আছে?
জেরিন ভাবলেশহীন উত্তরে বলল।
— লাভ নেই, ওকে বুঝালেও এসব ও বুঝবে না।
রিজভী উদাস মনে বলল।
— তাই বলে সব সময়ই কি এরকম করা ঠিক?
জেরিন প্লেটে খাবার নিতে নিতে বলল।
— বাদ দাও, তোমার খাওয়া তুমি খাও।
—————————-
শ্যাওলা পড়া পুকুরের মাঝে ভাসমান ছাতার মত বিশাল বিশাল পাতাগুলোর মাঝে মাথা উঁচিয়ে দাড়িয়ে আছে প্রস্ফুটিত গোলাপি পদ্ম। দেখে মনে হচ্ছে যেন স্নিগ্ধ সবুজ চাদরের মাঝে উঁকি দিয়ে আছে শিশিরভেজা নৌকার মত বাঁকানো নিখুঁত গোলাপি পাপড়ির বিন্যাস। পুকুরের পানিতে সূর্যের আলো পড়ে ঝিকমিক করছে। চারপাশে ঝিঁঝিঁ ডাকছে।
পদ্ম পুকুরের পাড়ে দাঁড়িয়ে সেই সৌন্দর্যটুকু নীরবে উপভোগ করছে ইশাত। বাতাসে ইশাতের ওড়না উড়ছে। বাকি সবাই দল বেঁধে ছবি তুলছে, চা খাচ্ছে। ইশাত সেই ভিড় থেকে একটু দূরে চলে এসেছে। কেউ খেয়াল করে নি তাকে। নীরবে ছোটবেলার স্মৃতি চারণ করতে ইশাত তার ব্যাগ থেকে নোট খাটা বের করে কাগজ ছিঁড়ে ঝটপট একটা নৌকা বানিয়ে ফেলল। হাঁটু মুড়ে বসে সে সেই নৌকা হাতে ঠেলে পুকুরে ভাসিয়ে দিলো। নৌকাটা বাতাসের তালে কি সুন্দর করে ভেসে গেল। দৃশ্যটা তার চোখে বেশ মনমুগ্ধকর ঠেকলো। ঠিক তখন তার সুন্দর মুহূর্তটা নষ্ট করতে কে যেন নৌকায় পাথর ছুঁড়ে মারলো। পাথরটা লেগে নৌকাটা সঙ্গে সঙ্গে ডুবে গেলো।
ইশাত মাথা তুলে দেখলো এভিয়ান পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু কিছু বলল না। কয়েক মিনিট তাদের মাঝে নীরবতা বয়ে চললো।
ইশাত তখন পুকুরের দিকে দৃষ্টি রেখে বলল।
— এসব করে কি মজা পান?
এভিয়ান না বোঝার ভান ধরে জিজ্ঞাসা করলো।
— কোনসব করে?
— মানুষকে কষ্ট দিয়ে।
— তুমি যেমন আমাকে ঘৃ’ণা করে মজা পাও ঠিক তেমনই আমি তোমাকে কষ্ট দিয়ে পাই।
— আর আপনি যে মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগ নেন সেটার কি?
এভিয়ান পুকুরের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল।
— সুযোগ আমি নিই না। সুযোগ আসে, আমি সেটা ধরি।
তখন হঠাৎ একটা ঠান্ডা বাতাস বয়ে গেলো। ইশাত সেই বাতাসে কেঁপে উঠলো। এভিয়ান নিজের ব্লেজার খুলে ইশাতের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল।
— এটা পড়ে নাও।
প্রথমবারের মত এভিয়ানের ব্যবহারে এমন উদারতা দেখে ইশাত অবাক হলো কিন্তু পরক্ষণে এভিয়ান তার ধারণা বদলে দিয়ে বলল।
— ঠান্ডা লাগলে কাল অফিসে আসতে পারবে না। আর তুমি না আসলে আমার শত্রু কমে যাবে। সেটা আমি চাই না।
ইশাত ব্লেজারটা নিলো না। হঠাৎ পিছন থেকে রিজভী ডেকে বলল।
“এভি, এদিকে আয় গ্রুপ ছবি তুলবো!”
এভিয়ান পকেটে হাত গুজে সেদিকে চলে গেলো।
ইশাত শুধু পুকুরের দিকে তাকিয়ে রইলো। এভিয়ানের আশেপাশে থাকলে তার বুকের ভেতর কেমন যেন একটা অদ্ভুত টান কাজ করে সবসময়, যেটা সে চাইলেও মুছে ফেলতে পারে না। এই অনুভূতির নাম সে কি দিবে? মনকে সে কি করে বুঝ দিবে? তখন জেরিনের ডাকে তার ধেয়ান ফিরে। জেরিন তাকে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে গ্রুপ ছবির জন্য ডাকছে। ইশাত জেরিনের ডাকে ইশারায় নাকচ করে বলল সে তুলবে না। তখন জেরিন ছবি তোলা রেখে এগিয়ে এসে তাকে জিজ্ঞাসা করলো।
— কেন তুলবে না?
ইশাত তার নাকচ করার কারণ উল্লেখ করে বলল।
— আমি সোশ্যাল মিডিয়াতে নিজের ছবি পোস্ট করি না। এই গ্রুপ ছবি নিয়ে অনেকে তাদের সোসিয়াল মিডিয়াতে পোস্ট করবে।
জেরিন তাকে নিশ্চিন্ত করতে বলল।
— ক্যামেরা তো আমার, তুমি যে ছবি গুলোতে থাকবে ওইগুলো আমি কাউকে দিব না। তাহলেই তো কোনো সমস্যা থাকছে না, চল ছবি তুলি।
কথাটা বলে জেরিন ইশাতের হাত ধরে নিয়ে তাকে ছবি তুলতে নিয়ে গেলো। গ্রুপ ছবি তোলা শেষে কিছু খেলার আয়োজন করা হলো। যেমন হাড়িভাঙ্গা খেলা, বস্তা দৌড়, তিন পায়ের দৌড় এবং চামচ মার্বেল দৌড়। খেলায় জিতলে বিজয়ীর জন্য সুন্দর সুন্দর পুরষ্কার রাখা হয়েছে। ইশাত প্রথমে কোনো খেলায় অংশগ্রহণ করতে চায় নি কিন্তু জেরিনের মন রাখতে রাজি হয়েছে। সে হাড়িভাঙ্গা খেলায় অংশগ্রহণ করলো, সায়মা মার্বেল দৌড়ে অংশগ্রহণ করলো আর জেরিন আর রিজভী তিন পায়ের দৌড়ের খেলায় অংশগ্রহন করলো। এভাবে একেকজন কর্মী এক এক খেলা বেছে নিলো। এভিয়ান ফর্মালিটি রক্ষার্থে হাতে ড্রিংকস নিয়ে সেখানে একপাশে চেয়ার নিয়ে বসলো।
প্রথমেই শুরু হলো মার্বেল দৌড় যেখানে মুখে একটি করে চামচ ধরিয়ে দিয়ে সেই চামচে মার্বেল রেখে দেওয়া হবে। প্রতিযোগীর সেটা মুখে নিয়ে দৌড় লাগাতে হবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে যেন মার্বেল চামচ থেকে পড়ে না যায়। যে মার্বেলসহ চামচ মুখে নিয়ে আগে ফিনিশিং লাইনে পৌঁছাতে পারবে সেই হবে জয়ী।
এবার সবাইকে নিয়ম বুঝিয়ে খেলা শুরু করা হলো সায়মাসহ আরো কয়েকজন সহকর্মী স্টার্টিং লাইনে দাড়ালো। তাদের মুখে একটা করে চামচ আর মার্বেল দেওয়া হলো। সবাই প্রস্তুত হতেই স্টার্ট বলার পর সবাই সবার মতো দৌড় লাগলো। সায়মা আস্তে করে দৌড় দিলো যেন সে ঠিক মতো বেলেন্স রেখে এগিয়ে যেতে পারে। শুরুতে যারা ব্যালেন্স না রেখে জোড়ে দৌড় দিলো তাদের মার্বেল চামচ থেকে পড়ে গেলো। তারা ডিসকোয়ালিফাইড হয়ে গেল। সায়মা ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে ফিনিশিং লাইনে পৌঁছে প্রথম স্থান জিতে নিলো।
এরপর শুরু হলো তিন পায়ের দৌড়। রিজভী আর জেরিনের দুই পা একসাথে বেঁধে দেওয়া হলো। একইভাবে বাকি প্রতিযোগীদের পা বেঁধে দেওয়ার পর খেলা শুরু হলো। রিজভী আর জেরিন শুরুতে ভালোই দৌড়াচ্ছিল কিন্তু শেষের দিকে এসে রিজভীর গতির সাথে তাল মিলাতে না পেরে জেরিন ধপাস করে পড়ে গেলো। পড়ার পর তাদের পায়ের বাঁধন খুলে গেলো। রিজভী তখন মাথায় হাত চাপড়ে বলল।
— উফ, জেতার এতো কাছে থেকেও এই মেয়ের জন্য হারতে হলো।
জেরিন তখন চোখ রাঙিয়ে তেঁতে উঠে বলল।
— হাড় জিতের খেতায় আগুন আগে আমাকে তোল। আমার থেকে তোর জেতা আগে?
রিজভী তখন মজা নিয়ে বলল।
— ওইটা হাড় হবে না, সঠিক উচ্চারণ হার হবে।
জেরিন এবার রেগেমেগে একাই উঠে দাড়ালো। রিজভী তখন মা’র খাওয়ার ভয়ে দৌড় লাগালো, জেরিনও তাকে তাড়া করলো। তারা ডিসকোয়ালিফাইড হওয়াতে এই খেলায় জিতলো অন্য কর্মীরা।
রিজভী আর জেরিনের বোঝাপড়া শেষ হতেই শুরু হলো হাড়িভাঙ্গা খেলা। মাটিতে একটা মাটির হাঁড়ি রেখে ইশাতের চোখ বেঁধে দেওয়া হলো। এবং তার হাতে একটা লাঠি ধরিয়ে দেওয়া হলো। খেলায় চোখ বাঁধা অবস্থায় তাকে এই লাঠি দিয়ে হাড়ি ভাঙতে হবে। তাই চোখে কাপড় দিয়ে বাঁধা অবস্থায় ইশাত এবার এক পা এক পা বাড়িয়ে অনুমান করে হাঁড়ির দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো। ইশাত সঠিক দিকেই যাচ্ছিল কিন্তু সমস্যা বাধালো রিজভী। সে দুষ্টামি করে তাকে ভুলভাল দিক নির্দেশনা দিয়ে বলল আরেকটু ডান দিকে যেতে। ইশাত তার কথা শুনে ডান দিকে মুড়লো। রিজভী তখন তাকে অন্য দিকে ফিরতে বলবে এমন সময় ইশাত হাতের লাঠিটা দিয়ে সামনের দিকে বারি মেরে বসলো।
দুর্ভাগ্যবশত সামনে কাচের গ্লাস হাতে এভিয়ান বসে ছিল। ইশাতের হাতের লাঠির বারি লেগে তার হাতের গ্লাসটা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। সবাই এটা দেখে ভয়ে একসাথে চিৎকার দিয়ে উঠলো। সেই চিৎকার শুনে ইশাত আতঙ্কিত হয়ে লাঠি ফেলে চোখের বাঁধন খুলে দেখল, এভিয়ান দাঁত কিটমিটিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। তার হাতের গ্লাসটা ভেঙে অর্ধেক মাটিতে পড়ে আছে আর অর্ধেক তার হাতেই ধরা। ইশাত বড় করে একটা ঢোক গিললো। এভিয়ানের হাতের দিকে ভালোমত তাকিয়ে নিশ্চিত হয়ে নিলো এভিয়ানের হাতে লেগেছে কিনা। কিন্তু ভাগ্যক্রমে তার হাতে কিছু হয় নি। সেটা দেখে হাফ ছেড়ে ইশাত অনুশোচনা নিয়ে বলল।
— আমার ভুল হয়ে গেছে স্যার, আমি দুঃখিত।
এভিয়ান তখন ইশাতের থেকে চোখ সরিয়ে রিজভীর দিকে কটমটিয়ে তাকিয়ে বলল।
— একটু আড়ালে আয় রিজভী।
কথাটা বলে এভিয়ান সেখান থেকে উঠে হনহনিয়ে ভিলার দিকে চলে গেল। রিজভী তখন ভয়ে জড়সড় হয়ে জেরিনের হাত শক্ত করে ধরে তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল।
— ভেতরে গেলে এখন ও আমাকে মা’রবে। আমার হাত ছেড়ো না কিন্তু। একটু আগেই তোমার হাতের মা’র খেয়ে নেতিয়ে গেছি। ও মা’রলে বাঁচবই না। তখন খবরের কাগজে ছাপবে পিকনিক করতে এসে বন্ধুর হাতে প্রা’ণ হারালেন এজে কোম্পানির সিইও সৈয়দ রিজভী।
জেরিন তার কথা শুনে মুখে ভেংচি কেটে তার হাত ছাড়িয়ে বলল।
— তুই যে যে কাজ করিস, তোর মা’র খাওয়াই উচিত যা ভাগ। আমি বাঁচব না তোকে।
রিজভী মুখ লটকিয়ে বলল।
— নির্দয় বউ আমার।
ইশাত তাদের কাণ্ড দেখে মনে মনে হেসে ফোনের দিকে তাকালো। আসরের ওয়াক্ত পড়ে গেছে। সে নামাজের জন্য ভিলার দিকে চলে গেল। একটুপর খেলা শেষে বিজয়ীদের স্টেজে ডেকে পুরস্কার বুঝিয়ে দিয়ে বিকেলের নাস্তা শেষে সবাই বাসে উঠলো আগে আগে রওনা দেওয়ার জন্যে। বাসে উঠে সবাই নিজ নিজ জায়গায় গিয়ে বসলো। ইশাত আর জেরিনের সারা রাস্তা গল্প করতে করতে কেটে গেল। বাস যখন ইশাতের এপার্টমেন্টের সামনে এসে থামলো তখন তার হুস হলো। কথার মাঝে কখন যে সময় কেটে গেলো সে খেয়ালই করতে পারে নি। আনমনে হেসে সে সবার কাছে বিদায় জানিয়ে বাস থেকে নেমে পড়তেই বাস ছেড়ে দিলো। ইশাত তখন নামার সময় এভিয়ানের দিকে খেয়াল করে নি। যদি খেয়াল করতো তাহলে হয়তো বুঝতো কীভাবে দুজোড়া চোখ তাকে তির্যক চাহনি নিয়ে পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছিল।
চলবে ( ইনশাআল্লাহ )………………
#ক্লান্তিহীন_তুই_আমার_ফরিয়াদ
#পর্বঃ৩০
#সুমাইয়া_জান্নাত_ইলমা
সারাদিন পিকনিকে এতো ঘুরাফেরা, খেলাধুলা আর আনন্দ করার পর শরীর ম্যাজ ম্যাজ করছিল বলে, বাসায় এসে মাগরিবের নামাজের পর গোসল সেরে একটু ঘুমিয়েছিল ইশাত। ঘুমের ঘোরে কলের আওয়াজ তার কানে এলো। ঘুমঘুম চোখে ফোন হাতড়ে সে দেখলো আসিফের কল। কল তুলে কানে ধরতেই আসিফ বলল।
— তোমার অফিসের সামনে দাড়িয়ে ছিলাম তোমাকে পেলাম না।
ইশাত ঘুম কাটিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলল।
— আজ অফিস ছিল না। অফিস থেকে পিকনিকে নেওয়া হয়েছিল।
— ওহ! কাল আছে অফিস?
ইশাত আপত্তি নিয়ে তাকে বলল।
— আছে তবে আপনার আসার প্রয়োজন নেই। রোজ রোজ লোকজন দেখলে খারাপ ভাববে।
আসিফ হতাশ হয়ে বলল।
— ঠিকাছে তোমার পছন্দ না হলে নাই।
— হুম।
আসিফ কথা বাড়াতে বলল।
— রাতে ডিনার করেছ?
— না করব। আপনি?
— করি নি।
ইশাত কথা ছোট করে বলল।
— তাহলে করে নিন রাখছি। নামাজ পড়তে হবে।
— ঠিকাছে, ভালো থেকো। পরে আবার কথা হবে।
ইশাত কল কেটে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। বাইরে থেকে মায়ের ডাকে সে বিছানা ছেড়ে উঠে সবার সাথে একসাথে ডিনার করতে চলে গেল। খাবারের টেবিলে বসে সে পিকনিকে আয়োজন করা খেলার কথা আর আনন্দঘন মুহূর্তগুলোর কথা হাসিখুশি মনে সবাইকে বলল। মাঝ দিয়ে এভিয়ানের গ্লাস ভাঙার ঘটনাটা সে এড়িয়ে গেল। সবাই শুনে খুশি হলো যে ইশাত পিকনিকে গিয়ে মন খুলে সবকিছু উপভোগ করেছে। খাওয়া শেষে রুমে ফিরে সে ইশার নামাজ পড়ে আবারো ঘুমিয়ে পড়লো। পরদিন সকালে ইশাত অফিসে পৌঁছে জানতে পারলো এভিয়ান আজ অফিসে আসে নি।
সায়মা চিন্তিত গলায় ইশাতকে বলল।
— এই ফাইলটা স্যারকে দিয়ে সাইন করাতে হবে নাহয় ডিল বাতিল হলে কোটি কোটি টাকার লস হবে। স্যারকে কল করেছি, তার ফোন বন্ধ দেখাচ্ছে। এখন কি করি?
তাদের কথার মাঝে রিজভী ভেতরে প্রবেশ করলো। সায়মা তাকে দেখতেই ফাইল নিয়ে তার কাছে গিয়ে সালাম জানিয়ে বলল।
— স্যার, এভিয়ান স্যারকে দিয়ে এই ফাইলটা সাইন করানো জরুরি। আজই লাগবে এটা। স্যার তো অফিসে আসে নি কলও ধরছে না।
রিজভীকে তখন চিন্তিত দেখালো। সে চিবুকে হাত দিয়ে কিছু একটা ভেবে সায়মার হাত থেকে ফাইলটা নিয়ে ইশাতকে ডেকে বলল।
— ইশাত আমার কেবিনে একটু আসো তো।
ইশাত রিজভীর সঙ্গে তার কেবিনে গেলে রিজভী তাকে বসতে বলল। ইশাত বসতেই সে বলল।
— আজ এভিয়ান অফিসে আসবে না। কারো সাথে কথাও বলবে না। প্রত্যেক বছরের মত আজও সে এই দিনে একা রুমে বন্ধী করে রাখবে নিজেকে।
ইশাত প্রশ্নবোধক চোখে জিজ্ঞাসা করলো।
— কেন?
— আজ ওর মায়ের মৃ’ত্যুবার্ষিকী। আজকের দিনটাকে ও ওর জীবনের ব্যাডলাক মনে করে।
— ওহ।
রিজভী একটু ভেবে বলল।
— তুমি একটা কাজ করতে পারো।
— কি কাজ?
— তুমি বরং ওর বাসায় গিয়ে ওকে দিয়ে ফাইলটা সাইন করিয়ে নিয়ে আসতে পারো। আমি চাইলে যেতে পারতাম কিন্তু আমি তোমাকে একটা সুযোগ করে দিতে চাইছি।
ইশাত রিজভীর কথার অর্থ না বুঝতে পেরে প্রশ্ন করলো।
— কিসের সুযোগ ভাইয়া?
রিজভী এবার বুঝিয়ে সব বলল।
— জেরিন আমাকে সব জানিয়েছে, যে তুমি কোন উদ্দেশ্যে এখানে এসেছো। আমি তোমাকে সাহায্য করতে চাই। আমি চাই আমার বন্ধুটা এই বি’ষাময় জীবন থেকে মুক্তি পাক। আমি ওর ভালো চাই। আমি কখনোই ওর এসব কাজের সঙ্গে ছিলাম না। বরং ওকে সরিয়ে আনতে চেয়েছি, কিন্তু পারি নি। আমি সবসময় ওর সঙ্গে থেকেছি কিন্তু ওর গোপন ফ্যাক্টরির বিষয়ে ও আমাকে এই পর্যন্ত কিছুই জানায় নি। এভিয়ান কোনো কাঁচা কাজ করে না। ওর অফিসে তুমি কোনো ক্লু খুঁজে পাবে না। আমার ধারণা ও ওর বাড়িতে কোথাও রেখেছে এসবকিছুর রেকর্ড।
ইশাত আপ্লুত হয়ে বলল।
— আপনি সত্যিকার অর্থেই একজন ভালো বন্ধু।
রিজভী ভাব দেখিয়ে মাথার চুল হাতে ব্যাকব্রাশ করে বলল।
— আই নো।
ইশাত তার কর্মকান্ডে হেসে দিলো। রিজভী তখন আবারো সিরিয়াস হয়ে বলল।
— আমার কোনো ছোট বোন নেই। তুমি আমাকে যেদিন থেকে ভাইয়া ডেকেছ, সেই দিন থেকে তুমি আমার ছোট বোন হয়ে গেছ। আমি তোমাকে কোনো রি’স্ক নিতে দিব না। ওর বাড়ি পর্যন্ত আমি তোমাকে পৌঁছে দিব। তুমি যাওয়ার পর বাহিরে ড্রাইভারসহ আমার গাড়ি রেখে যাব কোনো সমস্যা হলে তুমি আমার গাড়িতেই চলে আসবে।
— কিন্তু উনি তো বাড়িতে একা থাকবেন, এভাবে যাওয়া কি ঠিক হবে?
— তুমি কি রি’স্কটা নিতে চাচ্ছ না? এছাড়া তো অন্য কোনো উপায় দেখছি না। আর তুমি তো বারবার এই সুযোগটা পাবে না। ওর বাড়িতে যারতার ঢুকার সুযোগ নেই। যা করার তোমাকেই করতে হবে। আর তাছাড়া আমি তো আছি তোমার সাথে, কোনো সমস্যা হবে না।
ইশাত কিছুক্ষণ ভেবে বলল।
— ঠিকাছে, আমি সামলে নেব।
ইশাতের সম্মতি পেয়ে তারা দুজন এভিয়ানের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো। গাড়িতে রিজভী ইশাতকে সব বুঝাচ্ছিল। কিছুক্ষণের মধ্যে একটা কালো দেওয়ালের বিশাল গেটের সামনে তাদের গাড়ি থামলো। ভেতরে বাহিরে কালো পোশাকধারী গার্ডদের টহল। তারা রিজভীকে দেখে সম্মান জানিয়ে চুপচাপ যন্ত্রের মতো অ’স্ত্র হাতে ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলো। ইশাত রিজভীর সাথে ভেতরে প্রবেশ করতেই সামনে তাকিয়ে সে অবাক হলো। ঠিক সামনে থাকা মেটালিক ব্রিকসের তৈরি চারকোল ম্যাট ব্ল্যাক বাড়িটির নকশা তাকে বিস্মিত করলো। এমন ডিজাইনের বাড়ি সে এর আগে কখনো দেখে নি। কালো ডুপ্লেক্স বাড়িটির এক্সটেরিয়র ডিজাইন অন্যান্য বাড়িগুলোর থেকে ভিন্ন। এতে বুঝা যায় এভিয়ানের রুচি অন্যদের থেকে কত ভিন্ন। বাড়িটির সাথে বড় অ্যাটাচ গ্যারেজ রয়েছে। সামনেই সবুজ বাগান। সবুজের মাঝে কালো বাড়িটি বেশ ভালোই ফুটেছে।
ইশাতকে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করিয়ে রিজভী এভিয়ানের রুম ইশাতকে দেখিয়ে দিয়ে বলল।
— এটা এভিয়ানের রুম, তুমি যাও আমি আশেপাশেই থাকব। আমার নাম্বার আছে না? লাগলে কল করো। প্রয়োজনে এসে হাজির হবো। আপাতত আমাকে এখন এভি এখানে দেখলে খবর আনিয়ে ফেলবে। তুমি ওকে বুঝিয়ে বলতে পারবে।
ইশাত পলক ঝাপটে সম্মতি দিয়ে বলল।
— ঠিকাছে।
রিজভী চলে গেলে ইশাত উপর উঠে ফাইল হাতে রিজভীর দেখিয়ে দেওয়া রুমের দিকে এগিয়ে গেল। এভিয়ানের রুমের দরজা তখন হাট করে খোলা। ইশাত দরজার কাছে দাঁড়াতেই দেখলো ফ্লোরে বসে বেডের পাশে মাথা এলিয়ে দিয়ে আছে এভিয়ান। পাশে রাখা কিছু প্যাকেট আর মদের বোতল। এখনো কোনোটায় হাত দেয় নি সে। ইশাত বুঝলো এভিয়ান নিজের য’ন্ত্রণাগুলো ভুলে থাকতে এসব নে’শার আশ্রয় নেয়। কিন্তু ইশাত ঠিক করলো সে আজ আর তাকে এসব খেতে দিবে না।
সেই ভেবে ইশাত এভিয়ানের মনযোগ পেতে দরজায় নক করলো। এভিয়ান শব্দ পেয়ে মাথা তুলে তাকালো। সে মাথা তুলতেই ইশাত লক্ষ্য করলো সব সময় গম্ভীর মুখ করে রাখা এভিয়ানকে এই মুহূর্তে কতটা অসহায় দেখাচ্ছে। তার আকর্ষণীয় সোনালী চোখ দুটোতে পূর্বের ন্যায় কঠিনত্বের ছিটেফোঁটাটুকুও নেই। উল্টো ভাসা ভাসা চোখ দুটো কি যে নিষ্পাপ দেখাচ্ছে। ইশাত নিজেকে প্রস্তুত করে রেখেছিল এটা ভেবে যে এভিয়ান হয়তো তাকে দেখে রাগারাগি করবে অথবা বকাঝকা করবে। কিন্তু তাকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে এভিয়ান পুনরায় নির্বিকার ভঙ্গিতে মাথা এলিয়ে দিয়ে শান্ত গলায় জিজ্ঞাসা করলো।
— এখানে কেন এসেছো?
ইশাত এভিয়ানের মন ঘুরাতে বলল।
— কাল আপনি বলেছিলেন না? আমি অসুস্থ হলে অফিসে আসতে না পারলে আপনার শত্রু কবে যাবে। আজ দেখুন আপনি নিজেই এলেন না।
এভিয়ান মাথা তুলে তাকিয়ে বলল।
— এই কথাটা শুনানোর জন্য এখানে এসেছো?
ইশাত তার হাতের ফাইলটা দেখিয়ে বলল।
— একটা ফাইল সাইন করানোর ছিল। অনেক জরুরি আজকের মধ্যেই লাগবে।
এভিয়ান তার কথায় পাত্তা না দিয়ে বলল।
— তোমাকে কেউ বলে নি? আজকের দিনে আমি কোনো কাজ করি না। তবুও এখানে কেন এসেছো?
— শুধু সাইনই তো, আহামরি কিছু তো আর না, দিয়ে দিন চলে যাই।
এভিয়ান মানলো। সে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল।
— ঠিকাছে দাও।
ইশাত তখন কলম আর ফাইল এগিয়ে দিলে, এভিয়ান সেটা নিয়ে একনাগাড়ে সাইন করে ইশাতকে ফাইলটা ফেরত দিল। ইশাত ফাইলটা নেওয়ার সময় খেয়াল করলো এভিয়ানের মুখটা কেমন শুকিয়ে আছে। সে করুন চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলো।
— আপনি কি কিছু খেয়েছেন?
এভিয়ান প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে বলল।
— তোমার জেনে লাভ নেই।
ইশাত এভিয়ানের এমন করুন অবস্থা আর দেখতে পারলো না। সে ঘুরে যেতে নিলে এভিয়ান তাকে অবাক করে পিছু ডেকে স্বীকারোক্তি নিয়ে বলল।
— আমাকে কি আজকে রান্না করে খাওয়াবে? তোমার হাতের রান্না আমার মমের রান্নার মতো।
এভিয়ানের আবদারটা অনেক অসহায় শোনালো। তার কণ্ঠে বোঝা গেল ভেতর থেকে সে কতটা ভেঙেচুরে আছে। ইশাত ফিরে ব্যাথাতুর হেসে বলল।
— মাকে খুব মিস করছেন বুঝি?
এভিয়ান কোনো জবাব দিল না। ইশাত তখন আগ বাড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলো।
— আপনার কিচেনটা কোনদিকে?
এভিয়ান একটা বোতল হাতে নিতে নিতে বলল।
— নিচে নেমে বাম পাশে। ফ্রিজে সব পাবে।
ইশাত তখন আঙুল উঁচিয়ে সামনে রাখা বোতলগুলো দেখিয়ে বলল।
— এগুলো সরিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসুন। এগুলো মুখে তুললে আমি রান্না করবো না।
এভিয়ান শুনল। উঠে বোতল আর প্যাকেটগুলো সরিয়ে রেখে ফ্রেশ হতে চলে গেলো। এভিয়ান যেতেই ইশাত সুযোগ পেয়ে তার কাজ শুরু করলো। সে পুরো রুমের তল্লাশি নেওয়া শুরু করলো। রুমের প্রত্যেকটা ড্রয়ার সে চেক করলো। প্রত্যেকটা কোনা চেক করলো। কিন্তু কিছুই পেলো না। হঠাৎ তার নজর গেল ক্যাবিনেটের দিকে। সে ক্যাবিনেটের দরজা স্লাইড করতেই দেখলো ভেতরে একটা লকার। লকারটায় ফিঙ্গারপ্রিন্ট সিকিউরিটি সেট করা। ইশাত ধারণা করে নিল লকারটা নিশ্চই এভিয়ানের ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়ে খুলে, আর এখানেই হয়তো সে প্রয়োজনীয় কিছু খুঁজে পেতে পারে।
তার ভাবনার মাঝে ওয়াশরুমের দরজা খোলার আওয়াজ এলো। সে সঙ্গে সঙ্গে ক্যাবিনেটের দরজা আটকে সরে দাঁড়ালো। এভিয়ান তাকে এখনো এখানে দাড়িয়ে থাকতে দেখে সন্দেহ নিয়ে প্রশ্ন করলো।
— এখনো এখানে কি করছো?
ইশাত ঘাবরালো না। তবে সে উপায়ন্তর না পেয়ে কথা ঘুরিয়ে বলল।
— ফাইলটা ভুলে রেখে গিয়েছিলাম, তাই নিতে এলাম।
এভিয়ান তাকে প্রশ্নের মুখোমুখি ফেলে বলল।
— তুমি এখনই তো চলে যাচ্ছ না, পরেও তো চাইলে নিতে পারতে?
ইশাত পরিস্থিতি সামলে বলল।
— হ্যা খেয়াল ছিল না সেটা। আচ্ছা একটা কথা বলুন তো? আপনি আপনার বাড়ির সবকিছু এতো কালো রঙের কেন করে রেখেছেন?
এভিয়ান টাওয়ালে মুখ মুছতে মুছতে বলল।
— কারণ আমার জীবনটাই অন্ধকার তাই।
ইশাত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল।
— আমি নিচে যাচ্ছি আপনি আসুন।
ইশাত কোনো মতে কথা কাটিয়ে নিচে নেমে কিচেনে চলে গেলো। ফ্রিজ থেকে যা যা প্রয়োজন তা সে বের করে রান্নার কাজ শুরু করলো। এভিয়ান নিচে এসে কিচেন কাউন্টারে উঠে বসে ইশাতের কাজকর্ম পর্যবেক্ষণ করতে লাগলো। দুজনের মধ্যে কেউই কোনো কথা বলল না। ইশাত অতি যত্নে এভিয়ানের জন্য গরুর মাংসের বিরিয়ানি রান্না করলো। পুরোটা সময় এভিয়ান বাচ্চাদের মত তাকিয়ে ইশাতের কাজ দেখছিল। যেন কোনোদিন সে কাউকে এভাবে রান্না করতে দেখে নি। মনে মনে ইশাতের হাসি পেলো। রান্না শেষ করে সে খাবার ডাইনিং টেবিলে নিয়ে রেখে এভিয়ানকে খেতে বসতে বলল।
তখন সময় দুপুর একটা বেজে গেছে। এভিয়ান চেয়ার টেনে এসে বসতেই ইশাত প্লেটে খাবার বেড়ে তার সামনে দিলো। এভিয়ান বিনাবাক্যে সেই খাবার চামচ দিয়ে তুলে খাচ্ছে। ইশাত তখন দুষ্টামি করে বলল।
— আজকে তো খাওয়ার আগে সন্দেহ করলেন না যে আমি বি’ষ মিশিয়েছি কিনা?
এভিয়ান তৃপ্তি নিয়ে খেতে খেতে বলল।
— কমন সেন্স, তুমি আমার সামনেই রান্না করেছ।
— তা অবশ্য ঠিক।
— তুমিও বসতে পারো।
ইশাত আজ এভিয়ানের ব্যবহারে আকাশ পাতাল তফাৎ লক্ষ্য করছে। আগের এভিয়ান এমনটা কখনো বলতো না। তবুও ইশাত নাকচ করে বলল।
— আমার পেট ভরা সকালে নাস্তা করে এসেছি, তাছাড়া অফিসে লাঞ্চ বক্স রেখে এসেছি। না খেলে ওগুলো নষ্ট হবে আপনি খান।
ইশাত দাড়িয়ে থেকে দেখছিল এভিয়ানের কিছু প্রয়োজন পড়ে কিনা তখন আচমকা সিলিং থেকে ইশাতের পায়ের সামনে একটা টিকটিকি এসে পড়লো। ইশাত সেটা দেখে চিৎকার দিয়ে সরে পা ফসকে সোফায় গিয়ে পড়লো। তাকে এই অবস্থায় দেখে এভিয়ান খাওয়া রেখে হাসতে হাসতে বলল।
— সবার সামনে তো বুঝাও তুমি খুব সাহসী ভেতরে ভেতরে যে এতো ভীতু জানা ছিল না।
ইশাত কপাল কুঁচকে বলল।
— এমনটা কিছুই না, আমি টিকটিকি ভয় পাই না কিন্তু ঘৃ’ণা করি। আমার ভালো লাগে না এদের, তাই রিয়েক্ট করি।
এভিয়ান তার কথা মানলো না, সে তবুও হাসতে লাগলো। ইশাত এতক্ষনে খেয়াল করলো এভিয়ান যে হাসছে। তার হাসিতে মনে হচ্ছে যেন মুক্ত ঝরছে। ইশাত মুগ্ধ হয়ে মুখ ফসকে বলে ফেলল।
— হাসলে আপনাকে এতো সুন্দর লাগে, তবুও সব সময় গম্ভীর মুখ করে কেন থাকেন?
কথাটা বলে ইশাত নিজেই বিপাকে পড়ে গেলো। এভিয়ান তখন কথা ঘুরিয়ে বলল।
— তোমার আজান তো দিয়ে দিয়েছে, নামাজ পড়বে না?
ইশাত যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। সে বিস্ময় নিয়ে বলল।
— আপনি আমাকে নামাজ পড়তে বলছেন? যে কিনা সব সময় আমাকে নামাজে দেখলো রেগে যান।
— হুম, বললাম।
— কিন্তু জায়নামাজ তো অফিসে রেখে এসেছি, অফিসে গিয়েই বরং পড়ে নেব।
এভিয়ান তখন উঠে হাত ধুয়ে ইশাতকে তার সঙ্গে আসতে বলে উপড়ে চলে গেলো। ইশাত তার পেছনে উপড়ে যেতেই এভিয়ান একটা জায়নামাজ বের করে তার সামনে রেখে বলল।
— এটা মমের জায়নামাজ। মম একসময় মুসলিম ছিলেন কিন্তু পরে ড্যাডকে বিয়ে করার জন্য তিনি খ্রীষ্টিয়ান ধর্ম গ্রহণ করেন। তখন স্মৃতি হিসেবে সে আগে মুসলিম থাকা অবস্থায় যে জায়নামাজে নামাজ পড়তেন সেটা তুলে রেখেছিলেন। আজ এটাতে তুমি পরো।
ইশাত জায়নামাজটা হাতে নিলো। মনে মনে সে এভিয়ানের মায়ের দুর্ভাগ্যের কথা চিন্তা করে আফসোস করলো। এভিয়ান তাকে কিছু ভাবতে দেখে বলল।
— কি হলো কি ভাবছো?
ইশাত মাথা নাড়িয়ে বলল।
— কিছু না, ওযু করে আসছি।
এভিয়ান সরে গিয়ে তার বেডে বসলো। ইশাত ওয়াশরুম থেকে ওযু করে এসে জায়নামাজ নিয়ে বলল।
— কোথায় নামাজ পড়ব?
— এখানেই পড়ো।
— কিন্তু এখানে তো আপনি আছেন।
— আমার সামনেই পড়ো, আমি দেখব কিভাবে নামাজ পড়ো।
ইশাত বুঝলো এভিয়ান আজ তার আগের রূপে নেই। তাই সে এভিয়ানের কৌতূহল দেখে জায়নামাজ বিছিয়ে সেখানেই নামাজে দাড়ালো। এভিয়ান দেখলো নামাজের ভেতর ইশাতের চেহারা কতটা প্রশান্ত লাগছে। বোঝা যাচ্ছে নামাজরত অবস্থায় তার ভেতরে কতটা শান্তি কাজ করছে। ইশাত যখন নামাজ শেষে সালাম ফিরিয়ে বসে তাজবীহ গুনতে শুরু করলো তখন এভিয়ান তার সামনে এসে বসে বলল।
— তুমি বিড়বিড় করে এগুলো কি বলো?
ইশাত তখন সুন্দর করে বুঝিয়ে বলল।
— আমি আরবিতে তাজবিহ্ পড়ছিলাম। সুবহান আল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার। সুবহান আল্লাহ অর্থ হচ্ছে আল্লাহ পবিত্র ও মহিমান্বিত, আলহামদুলিল্লাহ অর্থ সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ অর্থ আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই, আর আল্লাহু আকবার অর্থ হচ্ছে আল্লাহ সবচেয়ে বড়। এগুলো সবই আল্লাহর প্রশংসা।
এভিয়ান সব শুনে আবারো কৌতূহল নিয়ে প্রশ্ন করলো।
— তোমারা আজান দিলে নামাজ কেন পড়ো?
— পাঁচ ওয়াক্ত আজানে আল্লাহ আমাদেরকে তার স্মরণের জন্য ডাকেন। নামাজের মাধ্যমে আমরা সেই ডাকে সাড়া দেই।
— নামাজ কি তোমাদের ধর্মে বাধ্যতামূলক?
— হ্যা।
— কই আমি তো অনেক মুসলিমদের নামাজ পড়তে দেখি না। তাদের জন্য কি নামাজ বাধ্যতামূলক না?
— নামাজ সকল মুসলিমদের জন্য বাধ্যতামূলক। যারা জেনেও পড়ে না তারা আল্লাহর ইচ্ছা অমান্য করে। এতে তাদের গুনাহ হয়।
এভিয়ান বুঝার মতো করে মাথা দোলালো। ইশাত তখন মিষ্টি হেসে দোয়া পড়া শেষে এভিয়ানের মুখে ফু দিয়ে দিলো। এভিয়ান চোখ বুজে ফেলল। পরক্ষণে চোখ খুলে জিজ্ঞাসা করলো।
— এটা কেন করলে?
— আরোগ্য, রহমত আর সুরক্ষার আশায়।
এভিয়ান ব্রু কুঁচকালো। ইশাত উঠে জায়নামাজ গুছিয়ে ব্যাগ আর ফাইল নিয়ে বলল।
— আমি আসি। অনেক কাজ বাকি রেখে এসেছি। অফিসে ফিরতে হবে।
ইশাতের যাওয়ার কথা শুনে এভিয়ানের মন কেন যেন উদাস হয়ে গেল। এতক্ষন সে ইশাতের সাথে ছিল বলে সব যন্ত্রণা ভুলে ছিল। কিন্তু ইশাত চলে যাওয়ার পর আবারও তো তাকে হতাশা ঘিরে ধরবে। সে আবারো নে’শায় বুদ হয়ে সব ভুলার চেষ্টা করবে। ইশাত এভিয়ানকে কোনো প্রত্যুত্তর করতে না দেখে রুম থেকে বেরিয়ে যেতে নিলো। তাকে নিঃশব্দে বেরিয়ে যেতে দেখে এভিয়ান হঠাৎ তাকে পিছু ডেকে উঠল।
— ইশাত।
ইশাত পদচারণ থামিয়ে উত্তর দিল।
— জ্বী বলুন?
নিজের এমন উদ্ভট কর্মকান্ড দেখে মনে মনে নিজেকে গালি দিয়ে উঠলো এভিয়ান। সে মাথা নেড়ে জানালো।
— কিছু না যাও তুমি।
এভিয়ানকে এমন অবস্থায় ফেলে রেখে ইশাতেরও যেতে মন চাইছিল না। তাই সে ফোন বের করে হোওয়াটসঅ্যাপে এভিয়ানের নাম্বারে একটা অডিও পাঠালো। এভিয়ান ফোনে ম্যাসেজের আওয়াজ পেয়ে ফোন খুলে দেখল ইশাত তাকে একটা অডিও পাঠিয়েছে। ফোন থেকে চোখ সরিয়ে সে প্রশ্নবোধক দৃষ্টি নিয়ে ইশাতের দিকে তাকালো। ইশাত মুচকি হেসে বলল।
— এটা সূরা আর রহমান, মন বেশি খারাপ লাগলে শুনবেন। দেখবেন হতাশা আর দুশ্চিন্তা সব মুহূর্তে দুর হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ।
কথাটা বলে ইশাত হাত নাড়িয়ে বিদায় জানিয়ে চলে গেল। ইশাত যাওয়ার পর এভিয়ান অডিওটা চালু করে কানের কাছে ধরলো। অডিওতে কোন ভাষায় কি বলা হচ্ছে তার কিছু জানা নেই। কিন্তু অদ্ভুত ভাবে অডিওটা তার কাছে ভালো লাগলো। মনে অজানা প্রশান্তি কাজ করলো। সে অডিও শুনতে শুনতে ফোনের কল লিস্ট খুলে একটা নাম্বার বের করলো যেটায় নাম লিখা আছে এনি’মি (শ’ত্রু)। সে নামটা এডিট করে লিখলো “পেইনকিলার”।
নামটা লিখে আনমনে সে মৃদু হেসে ভাবতে লাগলো, ইশাত কীভাবে হুট করে এসে তার জীবনের বি’ষাদময় মুহূর্ত কাটিয়ে, তার উপর অদ্ভূত এক প্রভাব ফেলে দিয়ে গেলো। ইশাতের উপস্থিতিতে এতক্ষন তার বাড়ির আবহ ছিল প্রশান্তিময়। এখন তার অনুপস্থিতিতে কেমন যেন সব শূন্য শূন্য লাগতে শুরু করলো। একটা সময় এভিয়ান সূরা আর রহমানের তিলাওয়াত শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ল।
চলবে ( ইনশাআল্লাহ )……………..

