Home "ধারাবাহিক গল্প ক্লান্তিহীন তুই আমার ফরিয়াদ ক্লান্তিহীন তুই আমার ফরিয়াদ পর্ব-৩৯+৪০

ক্লান্তিহীন তুই আমার ফরিয়াদ পর্ব-৩৯+৪০

0
134

#ক্লান্তিহীন_তুই_আমার_ফরিয়াদ
#পর্বঃ৩৯
#সুমাইয়া_জান্নাত_ইলমা

ইমরান আর এভিয়ান পুরো টিমসহ দ্রুত লোকেশনমত পৌঁছে দেখলো সেখানে নির্জন এলাকায় একটা পুরোনো ভাঙ্গা বাড়ি। তারা সময় অপচয় না করে দ্রুত বাড়ির মেইন দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করলো। ভেতরে ঢুকতেই তারা দেখলো সেখানে মাত্র দুটো ঘর। তার মধ্যে একটা ঘরের দরজা বাহির থেকে ভাঙ্গা পড়ে আছে। সেই রুমটার ভেতর থেকে ক্রমশ জোরালো আওয়াজ ভেসে আসছে। ভেতর থেকে ভেসে আসা কণ্ঠস্বরটা এভিয়ান আর ইমরানের কাছে পরিচিত ঠেকলো। অযাচিত আতঙ্কে তাদের বুক কেঁপে উঠলো। এভিয়ান আর কারো অপেক্ষা না করে দ্রুত সেই রুমটাতে ঢুকলো। ভেতরে ঢুকতেই সে যা দেখলো তাতে ক্রোধে আপনাআপনি তার হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেলো। হাতের প্রত্যেকটা রগ ফুলে ফেঁপে উঠলো। তার দৃশ্যপটে ভাসছে আসিফ ইশাতের হাত খাটের সাথে চেপে ধরে আছে আর ইশাত নিজের হাত ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছে।

এমন সময় এভিয়ান ঝড়ের গতিতে পেছন থেকে গিয়ে এক থাবায় আসিফকে ইশাতের সামনে থেকে সরিয়ে আনলো। ইমরান এসে দ্রুত বোনকে জড়িয়ে ধরলো। আসিফ তটস্থ হলো এভিয়ান আর ইমরানকে একসঙ্গে দেখে। তাদের সঙ্গেই আবার পুলিশ টিমকে দেখে সে আরো ভড়কে গেলো। ইশাত এতদিনপর ভাইয়ের দেখা পেয়ে ইমরানকে জড়িয়ে কেঁদে দিলো। ইমরান মাথায় হাত বুলিয়ে বোনের কান্না থামালো। পরক্ষণে ইশাত মাথা তুলতেই এভিয়ানের ঝলক পেয়ে তার দিকে ব্যাকুল চোখে তাকিয়ে রইলো। কিন্তু বিপরীতে এভিয়ান তার দিকে এক পলক তাকিয়েই চোখ নামিয়ে ফেলল। সে আসিফের ঘাড় ধরে নিয়ে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়ে বলল।
— কোন উদ্দেশ্য নিয়ে আন্ডারওয়ার্ল্ডে ঢুকেছিলি?

আসিফ হিং’স্র চাহনি নিয়ে বলল।
— ক্ষমতার জন্য, তোর উপরে উঠার জন্য।

এভিয়ান কপাল কুচকে বলল।
— কেন? আমার সাথে তোর কিসের সমস্যা?

আসিফ চেঁচিয়ে উঠে বলল।
— অনেক সমস্যা! তুই না থাকলে আজ ইশাত আমাকে ভালোবাসতো।

এভিয়ান তাচ্ছিল্য হেসে বলল।
— ও এমিতেও তোকে ভালোবাসতো না।

পরক্ষণে এভিয়ান টিমকে হাতের ইশারায় বলল।
— অ্যা’রেস্ট হিম।

পুলিশ টিম আসিফকে হ্যান্ড’কাফ পড়িয়ে গাড়ির দিকে টেনে নিয়ে যেতে লাগলো। যাওয়ার আগে আসিফ চোখে প্রতিহিংসার জ্বলন্ত আ’গুন নিয়ে বলে গেলো।
— তোকে আমি ছাড়ব না এভিয়ান মনে রাখিস কথাটা!!

পুলিশ টিম আসিফকে গ্রে”ফতার করে তাদের গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে গেল। ইমরান বোনকে নিয়ে এভিয়াননের গাড়িতে উঠলো। ইমরান সারা পথ বোনকে বুকে জড়িয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। ইশাত পেছনে বসে সামনের লুকিং গ্লাসের দিকে তাকিয়ে খেয়াল করলো, এভিয়ান একবারও তার দিকে তাকাচ্ছে না। সে নিজ মনে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে।

ঘন্টাখানেকের মধ্যে ইশাতদের এপার্টমেন্টের সামনে তার গাড়ি এসে থামতেই ইমরান নেমে এভিয়ানের সাথে কুশল বিনিময় করে ধন্যবাদ জানিয়ে বোনকে নিয়ে ভেতরে চলে গেল। ইশাত লক্ষ্য করছিল এভিয়ান ইমরানের সাথে কথা বললেও ইশাতের সাথে বলল না। এমনকি একটিবার তাকালোও না তার দিকে। ইশাতের অভিমানী মন তখন ভাবলো সে হয়তো এভিয়ানের চোখে এতদিন মোহ ছিল যা সময়ের সাথে কেটে গেছে।

ইশাত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ভাইয়ের সাথে উপরে এসে দরজায় বেল দিতেই আসিয়া বেগম দরজা খুলে মেয়েকে ভেতরে টেনে নিয়ে জড়িয়ে ধরলেন। আকুতি করে বললেন।
— আমি না জেনে না বুঝে সেদিন তোকে কত কথা শুনিয়েছিলাম, মা আমাকে ক্ষমা করে দে। আমার অ’ন্যায় ছিল বলে এতবড় শাস্তি পেতে হলো আমাকে।

মায়ের এমন আকুতিতে ইশাত অবাক হলো ভাইয়ের দিকে তাকাতেই ইমরান জানালো সেদিন বাড়ি ফিরে সে মাকে বুঝিয়েছে ইশাত যে বেঁচে আছে। আসিফ তাকে লুকিয়ে রেখেছে। আসিয়া বেগম সেদিন থেকেই মেয়ের অপেক্ষায় প্রহর গুনেছে। আল্লাহর কাছে মেয়ের সহি সালামতে ফেরার দোয়া করেছেন। কলিজার টুকরো ছেলে মেয়ে দুটোকে ফিরে পেয়ে আবারো তার অন্তর ভরে গেছে। প্রাণহীন দেহে যেন আবারো প্রাণ ফিরে পেয়েছেন তিনি। সব শুনে ইশাত মাকে দুহাতে সামলে বলল।
— তোমার কোনো অ’পরাধ ছিল না আম্মু। তুমি কেন ক্ষমা চাইছ? তোমার জায়গায় যেকোনো মাই কষ্ট পেতো এমন পরিস্থিতিতে। তুমি প্লীজ ক্ষমা চেয়ো না, আমি কষ্ট পাই।

আসিয়া বেগম অনুশোচনা নিয়ে বললেন।
— আর কখনো না জেনে না বুঝে তোকে ভুল বুঝব না। শুধু আমাকে ছেড়ে যাস না মা। আমি তো ম’রেই গিয়েছিলাম তোদের হারিয়ে। এই দুনিয়ার বুকে আমার সন্তান ছাড়া নিজের বলতে আর কে আছে বল? তোরাই তো আমার কাছে আল্লাহর দেওয়া সবচেয়ে দামি উপহার। মা বেঁচে থাকতে কি করে সন্তানের মৃ’ত্যুর শোক সইতে পারে বল?

তাদের কথার মাঝে ছোট আহনাফ তখন ছুটে এসে ফুপ্পির কোলে ঝাপিয়ে পড়লো। ইশাত ক্লান্ত হয়ে আছে বলে সানজিদা দৌড়ে এসে ছেলেকে নিতে গেলে তার কোল থেকে। ইশাত সানজিদাকে বারন করলো। সানজিদাও তখন এতদিন পর ইশাতকে দেখে আবেগী হয়ে জড়িয়ে ধরলো। ইমরানও যোগ দিল। আসিয়া বেগম বাদ ছিলেন বলে ইমরান মায়ের জন্য হাত মেলে দিল। তখন আসিয়া বেগমও খুশি হয়ে দলে যোগ দিলেন। সবাই সবাইকে জড়িয়ে ধরে প্রাণোচ্ছল হাসিতে হেসে উঠলো। দীর্ঘ প্রতিকূলতার পর তাদের পরিবারের উপর থেকে এবার শোকের ছায়া কে’টে গেলো। তখন আবারো তাদের পরিবার পরিপূর্ণ হলো।

——————-

সেদিনের ঘটনার পর আরো দুইমাস কেটে গেল। এতদিনে ইশাত আবারো তার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে। এমনকি নিজেকে আগের তুলনায় সে আরো সংশোধন করার চেষ্টা করছে। এখন থেকে দুনিয়ার সব কাজ ফেলে সে নামাজ,রোজা আর তিলাওয়াতে নিজেকে সবসময় নিমজ্জিত রাখবে। তার জীবনের লক্ষ্য এখন থেকে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। সেই লক্ষ্যেই সে অবিচল।

বিকেলে আদিবা বাড়িতে এলো ইশাতের সাথে দেখা করতে। সংসারের চাপে সে কোনোমতে সময় বের করে এসেছে। তারা দুজন গিয়ে খোলা বারান্দায় বসলো একসাথে কথা বলতে। আদিবা ইশাতের কাছ থেকে ঘটনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শুনে হতবাক হলো। তার কাছে পুরোটাই একটা থ্রিলিং মুভির মতো মনে হলো। কিন্তু আসলে মানুষের জীবনটা তো সিনেমার থেকেও বেশি নাটকীয়, সেটারই প্রমাণ পেল সে আজ। তবে মনে একটা প্রশ্ন রয়ে গেল। সেই প্রশ্নের উত্তর জানতে সে ইশাতকে জিজ্ঞাসা করে বলল।
— তোর মিস্টার গোল্ডেন কি আর এর মধ্যে তোর সঙ্গে যোগাযোগ করেছে?

— এই দুমাসে একবারও না।

— আশ্চর্য বিষয় তো। যে তোর জন্য এতো পাগলামি করলো সে তোর খোঁজ পর্যন্ত নিলো না?

ইশাত দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল।
— হয়তো এতদিনে পাগলামি ফুরিয়ে গেছে। ভালোই হয়েছে, আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন। তিনি নসিবে যা রেখেছেন তাই হবে। শুধু দোয়া করি আল্লাহ তাকে হেদায়েত দান করুক। একটা কথা কি জানিস? এতকিছুর পরেও না তার প্রতি একটা অদ্ভুত টান আল্লাহ আমার মনে দিয়ে রেখেছেন। গত চার বছর যাবত আমি এই অদ্ভুত অনুভূতি মন থেকে মোছার জন্য চেষ্টার কোনো সীমানা রাখি নি। তবুও কেন ভুলতে পারি না? আর কিছুদিন পরই পাঁচ বছর পূর্ণ হবে যেদিন তাকে প্রথম দেখেছিলাম। সেদিনের পর থেকেই তো আমি তাকে মোনাজাতে চাইতে গিয়ে আল্লাহকে খুঁজে পেয়েছি। মনের ইচ্ছা আল্লাহকে বলতে গিয়ে তার কাছাকাছি গিয়েছি। নিয়মিত নামাজ পড়েছি, কুরআন তিলাওয়াত করেছি, পর্দা করতে শিখেছি, তাহাজ্জুদে পর্যন্ত চেয়েছি তাকে। এমন এমন সময়গুলোতে দোয়া করেছি যে বিশেষ সময়গুলোতে আল্লাহ দোয়া কবুল করেন। এখন আল্লাহই ভালো জানেন নিয়তিতে তিনি কি লিখে রেখেছেন। আমি তার উপর তাওয়াক্কুল করেছি, তিনি আমার জন্য যাই লিখে রাখুক না কেন আমি তাতেই রাজিখুশি। এভিয়ান যদি আমার তকদিরে নাও লিখা থাকে তাতেও আমার কোনো আপত্তি নেই। আমার রবের সন্তুষ্টি আমার কাছে সবকিছুর ঊর্ধ্বে। আমাকে এমন পরিস্থিতিতে ফেলে তিনি হয়তো আমার ঈমান পরীক্ষা করছেন, ইনশাআল্লাহ, আমি এমন কোনো কাজই করবো না যাতে আমার রব কষ্ট পাবে।

আদিবা ইশাতের হাতে হাত রেখে বলল।
— তুই নিশ্চই আল্লাহর অনেক প্রিয়, তাই তো আল্লাহ তোকে পরীক্ষা করছেন। আমি আগে তোর কথা শুনি নি, পর্দা করি নি, ঠিক মতো নামাজ পড়ি নি। এখন নিজের ভুল বুঝতে পারছি। আমিও আল্লাহর প্রিয় হতে চাই। এখন থেকে আমিও তোর মতো নামাজ আদায় করব সঙ্গে পর্দাও করব। ইনশাআল্লাহ।

ইশাত আদিবাকে অনুপ্রেরণা দিয়ে বলল।
— আমার মতো নয়, তুই যেন আমার থেকেও উত্তম ইবাদত করে আল্লাহর প্রিয় হতে পারিস দোয়া করি।

তাদের কথার মাঝে ইশাতের দরজায় টোকা পড়লো। সে আদিবাকে বারান্দায় থাকতে বলে ভেতরে গিয়ে দেখলো ইমরান মুখে হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে। ইশাতও মুখে একই হাসি ধরে রেখে বলল।
— কিছু বলবে ভাইয়া?

ইমরান মাথা দুলিয়ে বলল।
— হ্যা, আমার করা ভুল সংশোধন করতে এসেছি। আসিফের সাথে তোর বিয়ে ঠিক করে আমি ভুল করেছিলাম। সেই ভুলটা এবার সংশোধন করতে এসেছি।

ইশাত ভাইয়ের কথার অর্থ না বুঝতে পেরে কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞাসা করলো।
— কি বলতে চাইছ তুমি ভাইয়া?

ইমরান চোখে উচ্ছ্বাস নিয়ে বলল।
— একটা খুশির সংবাদ আছে। তোর জন্য একটা সম্ভ্রান্ত পরিবার থেকে বিয়ের সম্বন্ধ এসেছে। ছেলের পরিবারে কেউ নেই। ছেলেটা ইয়াতিম কিন্তু অনেক ভালো আর ধার্মিক। তার উপার্জনও হালাল। তোকে ভালো রাখবে।

ইশাত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে জিজ্ঞাসা করলো।
— আম্মুকে বলেছ?

ইমরান সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলো।
— হ্যা আম্মুকে ছেলের ছবিও দেখিয়েছি। সে খুব পছন্দ করেছে। ছেলে জানাশোনা তাই তার বিষয়ে সকল খোঁজ খবর আগে থেকেই নেওয়া। ছেলের নাম আরিয়ান, তুইও পছন্দ করবি দেখলে, দাড়া তোকে ছবি দেখাই।

ইশাত বাধা দিয়ে বলল।
— না প্রয়োজন নেই। তোমরা দেখলেই হবে। তোমরা যা করছো আমার ভালোর জন্যই করছো। আমার কোনো আপত্তি নেই এই বিয়েতে।

ইশাতের সম্মতি পেয়ে খুশি হয়ে বোনের কপালে চুমু খেয়ে চলে গেলো ইমরান। ইশাত বারান্দায় ফিরে আসতেই আদিবা তাকে প্রশ্ন করলো।
— কিরে ভাইয়া তোকে কি বলল?

— বলল বিয়ের প্রস্তাব এসেছে।

— তুই কি বললি?

— ছেলেকে সবার পছন্দ তাই সম্মতি দিয়েছি।

— কিহ!! তুই না মিস্টার গোল্ডেনকে ভালোবাসিস?

— হুম কিন্তু তুই নিজেই লক্ষ্য কর, আমি যখনই তোকে বললাম আল্লাহ আমার তকদিরে যা লিখে রেখেছেন তাই হবে এবং আমি তাই মেনে নেব। ঠিক তখনই ভাইয়া বিয়ের প্রস্তাবটা নিয়ে আমার কাছে এলেন। হতে পারে এটা আল্লাহরই কোনো ইশারা? তিনি আমার জন্য যাকে নির্ধারণ করে রেখেছেন তার সাথেই আমার জুড়ি হবে। এতে আমার চাওয়া না চাওয়া কোনো আসে যায় না।

আদিবা বোঝার ভঙ্গিতে মাথা দুলিয়ে বলল।
— ঠিকাছে, ছেলের ছবি দেখেছিস?

— না।

— ছেলের নাম কি জানিস?

— ভাইয়া তো বলল ছেলের নাম আরিয়ান।

আদিবা খুশি হয়ে বলল।
— ঠিকাছে আমি আজ থেকেই বাসায় গিয়ে তোর বিয়ের শপিং শুরু করে দেব।

ইশাত নির্বিকার গলায় বলল।
— হুম করিস।

———————-

বাড়িতে বিয়ের তোড়জোড় লেগেছে। ইমরান বোনের বিয়ের আয়োজনে কোনো কমতি রাখছে না। কিন্তু ইশাত বলে রেখেছে তার বিয়েতে কোনো গায়ে হলুদ, মেহেদী নাইট, নাচানাচি কিছুই হবে না। এমনকি সে এত এত মানুষের ভিড়ে বউ সেজে স্টেজেও বসবে না। কবুলের আগ পর্যন্ত সে বরের সামনেও যাবে না। সে বিয়েটা সম্পূর্ণ সুন্নতি নিয়মে করতে চাইছে। যেখানে বরকে কবুল পড়ানো হবে মসজিদে আর কনেকে বাড়িতে। ইমরান তাই মানলো। ওদিকে ছেলেও নাকি ইমরানকে আগে থেকেই জানিয়ে দিয়েছে উভয় পক্ষের আত্মীয়স্বজনের খাবারের আয়োজন হবে তার পক্ষ থেকে। যেখানে দাওয়াতের বদলে আত্মীয়স্বজনের কোনো উপহার অথবা টাকা গ্রহণযোগ্য নয়।

আর কনভেনশন হলে খাবারের আয়োজন হলেও কনে স্টেজে বসবে না। ইমরান দুদিক দিয়ে দুজনের মতামতের চাপে হতবাক। কি করে তাদের চিন্তাধারা এতো মিল থাকতে পারে? আট পাঁচ ভাবতে ভাবতে সে ইশাতের রুমে গিয়ে তার হাতে বিয়ের কার্ড ধরিয়ে দিল। ইশাত কার্ড হাতে অবাক হয়ে ভাইয়ের দিয়ে তাকালো। তখন ইমরান বলল।
— এক সপ্তাহ পর তোর বিয়ে। এভিয়ানকে এই কার্ডটা তার অফিসে গিয়ে দিয়ে আয়।

ইমরানের কথা শুনে যেন ইশাতের মাথায় বাজ পড়লো। সে বিস্ফোরিত নয়নে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল।
— এটা কি বলছো? তোমার মাথা ঠিক আছে ভাইয়া? আমি তার অফিসে কেন যাবো? তাকে কেন আমি আমার বিয়ের কার্ড দিয়ে আসবো?

— ওহ সরি তোকে তো বলাই হয় নি, এভিয়ান আমাকে এই কে’সটাতে অনেক সাহায্য করেছে।

— উনি আবার কি সাহায্য করেছে?

— শুধু একবার না অনেকবার করেছে। তুই জানিস না বলে বলছিস। আসিফ আমাকে যে গভীর জঙ্গলের একটা গোডাউনে নিয়ে আটকে রেখেছিল সেটার খোঁজ এভিয়ান লাগিয়ে মানুষ পাঠিয়ে আমাকে উদ্ধার করেছে। পরবর্তীতে সে আসিফকে ধরতে, আর তোকে খুঁজে পেতে আমাকে সাহায্য করেছে। যেহেতু তার উসিলায় আমি উপকৃত হয়েছি তাই আমি কৃতজ্ঞতা স্বরূপ তাকেও তোর বিয়েতে দাওয়াত দিতে চাই।

— কিন্তু সে এসব কেন করেছে?

— সেটা সেই ভালো জানে। তুই বরং ওকে গিয়ে কার্ডটা দিয়ে আয়।

— ভাইয়া তুমি জানো সে আমাকে ভালোবাসতো। আমার বিয়ে যদি সে মেনে না নিয়ে কোনো সমস্যা সৃষ্টি করে তখন?

ইশাতের কথার পারদে ইমরান হেসে দিয়ে বলল।
— চিন্তা করিস না। এমন করবে না। সে আগের তুলনায় বদলে গেছে।

— বদলে গেছে মানে? কিভাবে বদলে গেছে?

— এতসব তোর বুঝা লাগবে না। তুই যা যেটা করতে বলেছি কর।

— কাজটা তো তুমিও করতে পারো। আমাকে কেন যেতে বলছো?

— আমার হাতে আরো অনেক কাজ বাকি। পুরো এপার্টমেন্ট লাইটিং করা হচ্ছে আমাকে এখানে থেকে সব দেখতে হবে। তুই আর কথা না বারিয়ে গিয়ে দিয়ে আয়।

ইমরান ইশাতকে কার্ডটা বুঝিয়ে দিয়ে চলে গেল। ইশাত বাধ্য হয়ে অফিসে যাওয়ার উদ্দেশ্যে তৈরি হলো। কিছুক্ষণ পর সে অফিসে পৌঁছে পূর্বে একসাথে কাজ করা এমপ্লয়িদের সাথে সালাম বিনিময় করে এভিয়ানের কেবিনের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো। ভেতরে কাচের জানালার কাছে দাড়িয়ে এভিয়ান কারো সাথে কথা বলছিল। ইশাত দরজায় টোকা দিতেই সে কল কেটে তাকে ভেতরে আসতে বলল। ইশাত ভেতরে গিয়ে টেবিলের উপর কার্ডটা রেখে বলল।
— আগামী সপ্তাহে আমার বিয়ে। আপনাকে আসার আমন্ত্রণ রইলো।

এভিয়ান নজর ঝুঁকিয়ে রাখলো। এগিয়ে এসে হাত বারিয়ে টেবিল থেকে কার্ড তুলে দেখতে দেখতে খুব শান্ত গলায় বলল।
— ওহ কংগ্রাচুলেশন!! ঠিকাছে আসব।

ইশাত অবাক হলো এভিয়ানের এমন শান্ত প্রতিক্রিয়া দেখে, পরক্ষণে মনকে বুঝ দিয়ে সে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলো। পেছন থেকে এভিয়ান তার চালচলন দেখে ঠোঁট টিপে হাসলো। অন্যদিকে ইশাত নিজের আবেগ ধরে রাখতে না পেরে বাসায় এসে দরজা লাগিয়ে কেঁদে ফেলল। এতদিন এভিয়ানকে না দেখে সে নিজেকে ঠিক রাখতে পারলেও তাকে দেখার পর থেকে তার প্রতি পূর্বের অনুভূতিগুলো আবারো হৃদয়ে জাগ দিয়ে উঠছে। পরমুহুর্তে আল্লাহকে করা ওয়াদার কথা মনে করে সে তার অবাধ্য হৃদয়কে আস্কারা না দিয়ে নিজেকে পুনরায় ধাতস্থ করে নিলো।

চলবে ( ইনশাআল্লাহ )………………

#ক্লান্তিহীন_তুই_আমার_ফরিয়াদ
#পর্বঃ৪০
#সুমাইয়া_জান্নাত_ইলমা

ড্রেসিং টেবিলের সামনে টুলে বসিয়ে তৈরি করা হচ্ছে ইশাতকে। সামনেই সাজিয়ে রাখা নানা ধরনের ব্র্যান্ডেড প্রসাধনী। সানজিদা আর আদিবা মিলে তাকে সাজিয়ে দিচ্ছে। আদিবা মেকআপ ভালো করতে পারে। তাই সেই ইশাতের মেকআপের কাজটা করছে। বিছানায় গুছিয়ে রাখা ইশাতের বিয়ের গাউন। শুভ্র রঙ্গা সিল্কের গাউনটা দেখতে ভীষণ সুন্দর আর রাজকীয়। মাঝে মাঝে আবার হোয়াইট স্টোনের কাজ করা। যা দূর থেকেই জ্বলজ্বল করছে। আদিবা আর সানজিদা কাজের ফাঁকে গাউনটার দিকে বারবার তাকাচ্ছে আর তাদের চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে। আদিবা তো উজ্জ্বল হেসে বলেই ফেলল।
— তোর হবু স্বামীর রুচি আছে বলতে হবে। কি সুন্দর গাউনটা। এরকম গাউন এর আগে দেখি নি। ডিজাইনটা অনেক ইউনিক। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো বাঙালি বিয়েতে ছেলে পক্ষ থেকে সাধারণত লেহেঙ্গা অথবা শাড়ি দেওয়া হয়। এই ক্ষেত্রে তোর হবু স্বামীর কেন গাউন নিতে মন চাইলো তোর জন্য? তাও আবার সাদা রঙের?

আদিবার কথায় ইশাতের হঠাৎ পাঁচ মাস আগের সে রাতের কথা মনে পড়ে গেলো। যখন সেরাতে বিজনেস পার্টিতে ইশাত সাদা একটা গাউন পড়ে গিয়েছিল। সেরাতে এভিয়ান তাকে নাম দিয়েছিল হোয়াইট মুন। নামটা মনে পড়তেই তার ঠোঁট দুটো আনমনে প্রোজ্জ্বল হাসিতে প্রসারিত হলো। এমন সময় সানজিদা আদিবাকে বলে উঠলো।
— ইমরান বললেন ইশাতের হবু স্বামী নাকি গাউনটা বাহিরের থেকে কাস্টমাইজ করে আনিয়েছেন ইশাতের জন্য।

আদিবা তাজ্জব বনে বলল।
— বাবাহ! হবু দুলাভাইয়ের তো দেখি সখ আছে ভালোই। কিন্তু এটা পড়ে ইশাত হাটবে কি করে অনেক বিস্তৃত এটার ঘের। ভেতরে আবার ক্যান ক্যান দিয়ে ফোলানো। সামলানোই তো মুশকিল।

সানজিদা তাকে আশ্বস্ত করে বলল।
— সেটার সমস্যা হবে না। ইশাত তো আর হলে যাবে না। ওকে বাসায় কবুল পড়ানো হলে সোজা গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। ওর সাথে কিন্তু আমাদেরও যেতে হবে। বরের বাসায় তো আর কেউ নেই যে সব গুছিয়ে দিবে। ওই বাসায় গিয়ে বাসর ঘরে আমাদের ইশাতকে পরিপাটি করে বসিয়ে দিয়ে আসতে হবে।

আদিবা বোঝার মতো করে মাথা দুলিয়ে বলল।
— ঠিকাছে যাবো। কিন্তু ইশাতের বরকে তো এখনো দেখাই হলো না।

— গেলে পরে দেখতে পাবে। ইশাত তো নিজেও এখনো দেখলো না।

দুজন ইশাতকে সাজাচ্ছে আর নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনা করে যাচ্ছে এইসেই বিষয়ে। কিন্তু ইশাতের সেই দিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। তার দৃশ্যপটে বারবার ভেসে বেড়াচ্ছে এভিয়ানের সাথে কাটানো এক একটা মুহূর্ত। তার বেবাগী হৃদয় বিরহের যন্ত্র’ণায় কাতরাচ্ছে। এভিয়ানকে শেষ বারের মতো একটাবার দেখার জন্য ছটফট করছে। সেদিন তো সে এভিয়ানকেও দাওয়াত করে এসেছিল। এভিয়ান কি আসবে? এলে নিশ্চই সে একটুপর হলেই থাকবে? সে কি একটিবারও তার সাথে দেখা করবে না? পরক্ষণে এসব অহেতুক ভাবনার জন্য নিজের অবাধ্য মনকে বড় একটা ধমক দিয়ে সকল ভাবনার ইতি টেনে দিলো সে। আর মনে মনে আস্তাগফিরুল্লাহ পড়তে শুরু করলো।

সানজিদা আর আদিবা তার মেকআপ করা শেষ করে তারা বিশাল গাউনটা সামলে ইশাতকে পড়তে সাহায্য করলো। গাউন পড়ানো শেষ হলে তারা হিজাব নিয়ে সুন্দর করে পিন দিয়ে গুছিয়ে ইশাতকে পড়িয়ে দিয়ে হিজাবের উপর সাদা একটা নেটের ভেইল টেনে দিলো। ভেইলটা গাউনের সাথেই দেওয়া ছিল। ইশাতকে তৈরি করা সম্পূর্ণ শেষ হলে দুজন বাহিরে দেখতে গেলো বিয়ে পড়ানোর জন্য আলেম এসেছেন কিনা। কারণ মসজিদের বয়স্ক অভিজ্ঞ আলেম দিয়ে তাদের বিয়ে পড়ানোর কথা।

এদিকে এক একটা মিনিট এগোচ্ছে আর আতঙ্কে ইশাতের বুকের ধড়ফড়ানি বেড়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর সে ভিন্ন একটা পুরষের নামে কবুল পড়বে। সারাজীবনের জন্য তার নাম সেই পুরুষের সাথে জড়িয়ে যাবে। আর কিছুক্ষণপর তার জীবনে এভিয়ানের আর কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। যাকে ভেবে সে এতদিন দোয়া করে এসেছে। যার জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনেছে। সে তার জন্য কেবলই একজন ননমাহরাম হয়ে থেকে যাবে। ভাবতেই ভেতরটা দুমড়ে মুছড়ে যাচ্ছে।

দরজার কাছে তখন আদিবা আর সানজিদা এসে জানালো আলেম নাকি এসেছে। তিনি বাহিরে অপেক্ষা করছেন। এটা শুনে মনকে মজবুত করে ইশাত উঠে দাড়ালো। তারা ইশাতকে ধরে বাহিরে সোফায় নিয়ে বসালো। আলেমও তার কবুল পড়ানোর কাজ শুরু করলেন। তিনি আল্লাহর প্রশংসা আর দরুদ পাঠ করে বিয়ের খুতবা পড়তে লাগলেন। এরপর নিজের বক্তব্য শেষ করে তিনি ইশাতকে কবুল বলতে বললেন। এদিকে কবুল বলতে গিয়ে জড়তায় ইশাতের জিব্বা যেন বারবার আটকে যাচ্ছে। আদিবা তখন তার কানের কাছে এসে তাকে কবুল বলতে তাড়া দিলো।

ইশাত ধীরে ধীরে কবুল উচ্চারণ করতেই সকলের মাঝে উচ্ছ্বাস খেলে গেলো। আদিবা সেই প্রত্যেকটা মুহূর্ত তার ক্যামেরায় ক্যামেরাবন্দী করে নিচ্ছে। সকলের অগচরে ইশাতের চোখ দিয়ে তখন দু ফোঁটা নোনাজল গড়িয়ে পড়লো। কাপা কাপা হাতে সে নিকাহনামায় দেখিয়ে দেওয়া জায়গাতে সাইন করলো। তার বিয়ের সাক্ষী হিসেবে সই করলো সানজিদা আর আদিবা। ইশাতের মা চোখে অনন্দের অশ্রু নিয়ে মেয়ের মাথায় সেনেহের হাত বুলিয়ে দিলেন। ব্যাথাতুর হৃদয় নিয়ে ইশাত আল্লাহর নামে নিজের ভাগ্যকে মেনে নিয়ে আলেমের সাথে মোনাজাত ধরলো। মোনাজাতে সে আল্লাহকে অনুনয়ের সুরে বলল।
— হে আল্লাহ, আমার বেয়াদবি মাফ করো। নিশ্চই আমি তোমার ত্রুটিযুক্ত একজন বান্দি, তুমি জানো আমি কিভাবে বারবার দুর্বল হয়ে পড়ছি। একমাত্র তুমি অবজ্ঞ আমার ভেতরটা কীভাবে ছারখার হয়ে যাচ্ছে। শেষ মুহূর্তে এসেও আমি তার কোনো কিছুই ভুলতে পারছি না। তবে আমার হাজার কষ্ট হলেও হোক। এতকিছুর শর্তেও আমি নিজের নফসের সাথে যুদ্ধ করে তোমার সন্তুষ্টির উপর অবিচল থাকব। এভিয়ানের মা তো ভালোবাসার জন্য তার ধর্ম ত্যাগ করেছিলেন। আমি নাহয় তোমার সন্তুষ্টির জন্য, নিজের ধর্মের জন্য, ভালোবাসাকে ত্যাগ করলাম। কারণ সবার আগে তো আমি তোমাকে ভালোবাসি। তোমার দ্বীনকে ভালোবাসি, তোমার নবীকে ভালোবাসি। তোমার ভালোবাসার কাছে দুনিয়ার সকল ভালোবাসা তুচ্ছ। তোমার সন্তুষ্টির জন্য বিনা কোনো অজুহাতে আমার প্রাণটাও হাজির। তুমি আমার এই ত্যাগে রাজি খুশি হয়ে যাও রব। তোমার সন্তুষ্টিই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। আমার সহায় হও ইয়া রব। আমাকে মজবুত রাখো। আমার হৃদয়ে রহম করো।

মোনাজাত শেষ হলো, সবাই হাত নামালো। আলেম ইশাতকে কবুল পড়ানো শেষ করে এবার মসজিদে ফিরে গিয়ে বরকে কবুল পড়ানোর কার্যক্রম শুরু করলেন। দুজন সাক্ষীসহ বরকে কবুল পড়ানোর পর মসজিদে সবার মাঝে খেজুর ছিটিয়ে দেওয়া হলো। আজ বরের পক্ষ থেকে দুপুরে কনভেনশন হলে সবার জন্য খাবারের আয়োজন করা হয়েছে। দাওয়াত করা সকল আত্মীয়স্বজনরা আস্তে আস্তে সেখানে উপস্থিত হতে শুরু করেছে। দাওয়াতে হাজার হাজার লোকজনের সমাগম। খাবারের আয়োজনও অফুরন্ত। সেখানে খাবারের দিকটা একত্রে মিলে সামলাচ্ছে ইমরান, আরিয়ান, রিজভী আর সিয়াম। তারা একেকজন দাড়িয়ে থেকে ক্যাটারারদের এটা ওটা নির্দেশনা দিচ্ছে আর ফাঁকে ফাঁকে আত্মীয়দের সাথে ভাব বিনিময় করছে। তারা সারাদিন আজ এখানেই ব্যস্ত থাকবে।

———————-

আত্মীয়স্বজনরা হল থেকে ফেরার পথে বাসায় এসে এসে বিয়ের কনেকে দেখে যাচ্ছে। সবাইকে আগে থেকেই বলে রাখা কনের ছবি তোলা নিষেধ। তারা শুধু চোখের দেখা দেখে যাচ্ছে, আর ইশাতকে দোয়া করে দিয়ে যাচ্ছে। মেহমান সব এক এক করে বিদায় নিলে, আসিয়া বেগম প্লেটে খাবার নিয়ে নিজ হাতে মেয়েকে খাইয়ে দিতে লাগলেন আর চোখের পানি মুছতে লাগলেন। আর কয়েক ঘণ্টা পর মেয়েটা স্বামীর ঘরে চলে যাবে পরিবারকে ছেড়ে। যে মেয়েকে সে এতদিন চোখে হারাতো সেই মেয়েকে ছাড়া কীভাবে থাকবে সে এখন? ভাবতেই ভেতরটা দুমড়ে মুছড়ে যাচ্ছে।

মেয়েকে বিদায় দেওয়ার সময় বোধহয় প্রত্যেকটা বাবা মার বুক কষ্টে ভার হয়ে আসে। আজ সে নিজেই এটা অনুভব করছে। ছোট থেকে যত্নে বড় করা রাজকন্যাটা যখন বিয়ে করে বাড়ি ফাঁকা করে অন্য ঘরে চলে যায়, তখন মেয়ের মঙ্গলের কথা ভেবে প্রত্যেকটা বাবা মাকে বুকে পাথর রেখে সেই সত্যটা মেনে নিতে হয়। আসিয়া বেগমও সেভাবে মনকে মানিয়ে নিচ্ছে। আহনাফ তো ফুপির কোল ছাড়ছেই না। সে ফুপিকে পাহারা দিচ্ছে। যেন কেউ এসে তার ফুপিকে না নিয়ে যেতে পারে। তার আম্মু তাকে বলেছিল বিয়ের পর নাকি মেয়েদের শ্বশুরবাড়ি চলে যেতে হয়। কিন্তু সে তার ফুপিকে কোথাও যেতে দিবে না। সেই সুবাদে বিচারার মনটা আজ সকাল থেকে অনেক ভার। এসব দেখে ইশাতেরও আজ চোখের পানি বাদ মানছে না।

আসিয়া বেগম তখন সানজিদাকে ইশারা করে বললেন ছেলেকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে আসতে। সানজিদা কোনো মতে ছেলেকে বুঝিয়ে নিয়ে যেতেই আসিয়া বেগম মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে উপদেশ দিয়ে বললেন।
— বিয়ের পর এখন থেকে তোমার স্বামীই তোমার আসল অভিবাবক। মৃ’ত্যুর আগ পর্যন্ত সে তোমার পাশে থাকবে। সে তোমার অর্ধেক দিন। তাকে কখনো কোনো কাজে বা কথায় অসন্তুষ্ট করবে না, অসম্মান করবে না, কষ্ট দিবে না। তার সুখের সময়গুলোতে যেমন তার সঙ্গী হয়ে থাকবে, ঠিক তেমনই তার দুঃখ কষ্টের সময়গুলোতে ছায়া হয়ে পাশে থাকবে। তার সেবা যত্নে কোনো কমতি রাখবে না। তার ঘরে রহমত হয়ে থাকবে। যেনো সারাদিন ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরে তোমাকে দেখেই তার হৃদয় প্রশান্ত হয়ে যায়। স্ত্রী হিসেবে এখন থেকে এটা তোমার কর্তব্য। কেননা একজন স্বামী তার কষ্টের উপার্জনের সবটা দিয়ে স্ত্রীর সারাজীবনের ভরণ পোষণের এবং ভালো মন্দের দায়িত্ব নেয়। স্ত্রী সন্তানদের ভালো রাখতে নিজের পুরো জীবন অনায়াসে ব্যয় করে দেয়। পরিবারের সুখের জন্য শত শত দায়িত্ব একা কাঁধে বয়ে বেড়ায়। আমি দোয়া করি আল্লাহ তোমাদের দুজনের সম্পর্ক অটুট রাখুক। মা খাদিজা (রাঃ) এবং হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর সম্পর্কের মতো মজবুত করুক। তোমাদের উপর তার খাস রহমত বর্ষিত করুক, তোমাদের একত্রে করা নেক আমলগুলোতে তিনি তোমাদের উপর সন্তুষ্ট হোক।

ইশাত মাথা দুলিয়ে মায়ের সাথে বলল।
— আমিন।

সারাদিন আসিয়া বেগম মেয়েকে নিজের কাছে রেখেছেন। মাগরিবের নামাজের পর ইমরান বাসায় ফিরল। সে এসেই বোনকে জড়িয়ে ধরে চোখের অশ্রু লুকিয়ে বলল।
— বিয়ে হয়েছে তো কি হয়েছে? আমার বোন সবসময় আমার বোনই থাকবে। যখন মন চায় ভাইয়ের কাছে চলে আসবি। লাগলে এখানেই থেকে যাবি। যদি তোর বর আসতে না দেয় আমাকে একবার বলবি, আমি গিয়ে বেটাকে একদম সোজা করে ফেলব। তুই জানিস তোকে না দেখলে তোর ভাই ভালো থাকবে নারে। আমার কলিজার টুকরো তুই। আমার যত্নে গড়ে তোলা পুতুল তুই। আর আজ এভাবে আমার কলিজা চিরে চলে যাচ্ছিস তুই। আজকের দিনটা আমার জন্য অনেক কঠিন রে!

কথা বলতে গিয়েও কথাগুলো জড়িয়ে আছে ইমরানের মুখে। ইশাত তখন ভাইকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কান্নাজড়িত কন্ঠে বলল।
— তুমি যে কথাগুলো বলছো এই কথাগুলো একজন মেয়ের বিদায়ের সময় তার বাবা বলে থাকে। আমি জানি তোমার ভালোবাসা কতটা গভীর আমার প্রতি। তুমি নিজের হাতে আদর যত্নে নিজের প্রথম সন্তানের মতো ছোট থেকে বড় করেছ আমায়। বাবার মৃ’ত্যুর পর কখনো বাবার আদরের অভাব বুঝি নি। আমার সকল আবদার, প্রয়োজন, চাওয়া-পাওয়াগুলো তুমি পূরণ করেছ। তোমার কাছে আমি আমার বাবার আদর পেয়েছি। আমিও তোমাকে অনেক অনেক ভালোবাসি ভাইয়া। তুমি যখনই আমাকে দেখতে চাইবে আমি ছুটে চলে আসবো।

আসিয়া বেগম তখন ইমরানের কাঁধে হাত রেখে তাকে সান্তনা দিয়ে বললেন।
— শান্ত হও বাবা। বিয়ের পর এখন স্বামীর ঘরই ওর আসল বাড়ি। ওকে যেতে দাও। ওর স্বামী চাইলে ও বিয়ের পর এসে থেকে যাবে। আস্তে আস্তে আমাদেরও অভ্যাস হয়ে যাবে। এটাই মেয়েদের নিয়তি।

ইমরান আর কিছু না বলে মন ভার করে রুমে চলে গেলো। বোনের বিদায়ের সময় সে থাকতে পারবে না। নয়তো নিজেকে আর ধরে রাখতে পারবে না সে। ইশাত উদাস মনে ভাইয়ের যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলো। পরক্ষণে সে দেখলো ইমরান আবারো রুম থেকে বেরিয়ে একটা গিফট বক্স হাতে তার সামনে এসে দাঁড়ালো। ইশাত অবাক চোখে তাকাতেই ইমরান সেটা তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল।
— ওই বাসায় গিয়ে এটা খুলে দেখিস। তোর জন্য একটা উপহার আছে। আর একটা কথা, তোর ভাই তোর ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে কিছুই করবে না। তোর মুখ দেখেই আমি বলে দিতে পারি তুই কি চাস। কোনটাতে তোর খুশি লুকিয়ে। তোর ভাই দুর্বোধ্য হলেও আল্লাহর রহমতে সেটা তোর জন্য এনে হাজির করবে।

কথাটা বলে ইমরান তার মাথায় হাত বুলিয়ে আবারো ভেতরে চলে গেল। ইশাত অবুঝের মতো তাকিয়ে রইলো। সারাদিন পর মসজিদে ইশার নামাজ শেষে ইশাতদের এপার্টমেন্টের নিচে বরের গাড়ি থামালো। চকচকে সাদা গাড়িটা বেশ সুন্দর করে গোলাপ দিয়ে সাজানো। বর গাড়ি থেকে বের হলো না। আদিবা আর সানজিদা ইশাতকে ধরে নামিয়ে গাড়ির সামনের সিটে বসিয়ে দিল। গাড়িতে কোনো ড্রাইবার নেই বরই ড্রাইভিং সিটে বসে ড্রাইভ করছিল। কিন্তু মাস্ক পড়াতে তার মুখ দেখা যাচ্ছে না।

আদিবা আর সানজিদা গিয়ে পেছনের সিটে বসে পড়লো। গাড়ি চলতেই ভেতরে পিনপতন নিরবতা বইছে। গাড়ি চলার গতির সাথে তাল মিলিয়ে ইশাতের গাউনের লম্বা অংশগুলো বাতাসে বারবার উড়ে লোকটার মুখের উপর গিয়ে লাগছে। কিন্তু লোকটা একটুও বিরক্ত হচ্ছে না। সে নিজের মত আরাম করে গাড়ির স্টিয়ারিং হুইলে হাত ঘোরাচ্ছে। ইশাত সেদিকে লক্ষ্য করলো না। সে মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে রইলো। আদিবা আর সানজিদা এতক্ষন বিষয়টা লক্ষ্য করছিল। এমন অবস্থায় তারা একে অপরের দিকে চাওয়াচাওয়ি করে ঠোঁট টিপে হাসলো। ফাঁকে ফাঁকে তারা দুজন বরের সাথে এটা ওটা নিয়ে কথা বললে লোকটা শুধু মাথা নাড়িয়ে সায় জানাচ্ছে। কিন্তু মুখে কোন শব্দই করছে না।

কিছুক্ষণ পর গাড়িটা থামলো একটা সুন্দর অফ হোয়াইট রঙের বাগান বাড়ির সামনে। আদিবা আর সানজিদা গাড়ি থেকে নেমে হতবাক হয়ে দেখলো বাড়িটা। তাদের জানা ছিল না শহরের ভেতরেও এমন সুন্দর বাগান বাড়ি হয়। বাড়িটা ল্যান্ডস্কেপ ডিজাইনের আদলে তৈরি। বাড়ির চারপাশে বাগান, দুপাশে কৃত্রিম জলাশয়ের উপর সুন্দর একটি কাঠের সেতু। সেই সেতু দিয়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করা যায়। একপাশে গ্যারেজে গাড়ি ঢোকার আলাদা প্রশস্থ রাস্তা।

আদিবা আর সানজিদা মিলে ইশাতকে ধরে গাড়ি থেকে নামালো। লোকটা তাদের হাতের ইশারায় ভেতরে যেতে বলল কিন্তু নিজে গেলো না। তখন আদিবা যেতে যেতে সানজিদাকে আস্তে করে প্রশ্ন করলো।
— দুলাভাই কি বোবা নাকি? মুখে কিছু বলছে না কেন?

সানজিদা ফিক করে হেসে বলল।
— আরে না না। বোবা কেন হবে। হয়তো উনি কথা কম বলেন। অবথা মহিলাদের সাথে বেশি কথা বলেন না।

আবিদা আশ্চর্য হয়ে বলল।
— এমনও আবার হয় নাকি?

তারা বাড়িতে ঢুকেই রুম খুঁজতে গিয়ে দেখলো বাসরঘর আগে থেকেই সাজানো। তখন বাইরে থেকে একজন লোক এসে ইশাতের লাগেজ ভেতরে দিয়ে গেলো। আদিবা চট করে গিয়ে লাগেজ খুলে একটা সুন্দর মেরুন রঙের জর্জেটের শাড়ি বের করলো ইশাতকে পরিয়ে দিতে। সানজিদাও তাকে সাহায্য করলো। আদিবা শাড়ির রঙের সাথে ইশাতের মেকআপ পরিবর্তন করে তার চুলগুলো সুন্দর করে কার্লার দিয়ে কার্ল করে দিল। সারাটাক্ষণ ইশাত পুতুলের মতো বসে ছিল। মেয়েটা পরিবারকে রেখে চলে এসেছে তাই হয়তো মন খারাপ ভেবে আদিবা আর সানজিদা তাকে মনে বুঝ দিতে লাগলো। সাজানো শেষ করে তারা ইশাতকে গোলাপের পাপড়ি ছিটানো বিছানার উপর বসিয়ে নতুন বউয়ের মতো দেখাতে মুখে বড় করে ঘোমটা টেনে দিলো। ইশাতও চুপচাপ বসে রইলো। অবশেষে তাদের কাজ সম্পন্ন হলে তারা ইশাতের কাছে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে গেলো।

আদিবা আর সানজিদা বেরোতেই তারা দেখলো বর গাড়ির সামনে দাড়িয়ে তাদের অপেক্ষায়। এখন আর তার মুখে কোনো মাস্ক নেই। লোকটাকে চিনতে পেরে আদিবা তো আকাশ থেকে পড়লো। সে বিস্ফোরিত নয়নে বলল।
— আপনি না এভিয়ান?

আরিয়ান তাকে অবাক হতে দেখে হেসে বলল।
— না আমি আরিয়ান।

আদিবা অনর্গল বলে গেলো।
— আপনি নাম বদলেছেন? আপনি না অমুসলিম ছিলেন? ইশাতের ভাই তো অমুসলিম কারো সাথে তার বোনের বিয়ে দিবে না। তার মানে কি আপনি মুসলিম হয়েছেন?

আরিয়ান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে বলল।
— আলহামদুলিল্লাহ, হ্যা।

আদিবা তাজ্জব হয়ে বলল।
— অবিশ্বাস্য কীভাবে সম্ভব এটা? ইশাতের দোয়া তাহলে আল্লাহ সত্যি সত্যি কবুল করলেন? তাও এতো সুন্দর রূপে? সাথে আপনার এতবড় পরিবর্তন, বারাকাল্লাহু খাইরান। এটা একটা কুদরতি ঘটনা, আল্লাহু আকবার।

আরিয়ান প্রাপ্তির হাসি নিয়ে বলল।
— আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ চাইলে সবই সম্ভব।

পরক্ষণে আদিবা মনে প্রশ্ন নিয়ে বলল।
— কিন্তু তখন মুখ কেন ডেকে রেখেছিলেন আপনি? আর কথা বলছিলেন না কেন? ইশাত তো আমাকে আপনার ব্যাপারে কিছুই বলল না যে ওর বিয়ে আপনার সাথেই হচ্ছে। ও তো বলল ও কিছুই জানে না।

আরিয়ান সব ক্লিয়ার করে বললো।
— ও ঠিক বলেছে। ও নিজেই জানে না এই ব্যাপারে। এটা ওর ভাই ইমরানের সারপ্রাইজ ছিল ওর জন্য।

তাদের কথোপকথন শুনে সানজিদা বোকা বনে গেল। সে মৃদু গলায় আদিবাকে বলল।
— তুমি কি উনাকে আগে থেকেই চেনো আদিবা? তোমরা কি বলছো আমি কিছুই তো বুঝতে পারছি না।

আদিবা তখন মুচকি হেসে তাকে গাড়ির দিকে নিয়ে যেতে যেতে বলল।
— বাসায় যেতে যেতে বলবো সব, চলো।

আরিয়ান নিজের ড্রাইভার দিয়ে তাদের ফেরার ব্যবস্থা করে দিলো। নিজ দায়িত্বে তাদের ফেরার ব্যবস্থা করে সে মুচকি হেসে ধীর পায়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলো।

চলবে ( ইনশাআল্লাহ )…………………..