Home "ধারাবাহিক গল্প ক্লান্তিহীন তুই আমার ফরিয়াদ ক্লান্তিহীন তুই আমার ফরিয়াদ পর্ব-৪১+৪২

ক্লান্তিহীন তুই আমার ফরিয়াদ পর্ব-৪১+৪২

0
166

#ক্লান্তিহীন_তুই_আমার_ফরিয়াদ
#পর্বঃ৪১
#সুমাইয়া_জান্নাত_ইলমা

শুভ্র মখমলের বিছানার চাদর জুড়ে বিছিয়ে থাকা গাঢ় লাল গোলাপের পাপড়িগুলোর মিষ্টি সুভাষ ছড়াচ্ছে সারা ঘরজুড়ে। রুমের অফ হোয়াইট রঙটা যেন গোলাপের লাল রঙের আভাকে আরো তীব্র করে তুলেছে। পুরো রুম জুড়ে সাজানো অজস্র গোলাপগুচ্ছগুলো সেই আভায় জ্বলজ্বল করছে। এত এত গোলাপের মাঝে বিছানার মধ্যে মেরুন শাড়ি গায়ে বসে থাকা ইশাতকে দেখে মনে হচ্ছে যেন আস্ত একটা সতেজ গোলাপ। মুখ তার বড় একটা ঘোমটায় ঢেকে আছে।

নতুন জীবনে পদার্পণ করতেই তার মনে ঘুরপাক খাচ্ছে হাজারো অনিশ্চয়তারা, তবে এত অনিশ্চয়তার ঊর্ধ্বে রয়েছে আল্লাহর প্রতি প্রখর বিশ্বাস। হঠাৎ তখন দরজা খোলার মৃদু আওয়াজে তার ভ্রম কাটলো। ঘরে প্রবেশ করা ব্যক্তিটি তার স্বামী। সেটা বোধ হতেই অসস্তিতে ইশাত খানিকটা নড়েচড়ে বসলো। ধীর পায়ে লোকটা তার কাছাকাছি এসে পাশে বসতেই ইশাত সামান্য সরে গিয়ে কাপা কন্ঠে বলল।
— আসসালামু আলাইকুম, আমার কিছু কথা ছিল, আমার বিষয়ে নিশ্চই আপনি সব জানেন? আমি কোনো ভাবেই আপনাকে ঠকাতে চাই না। তাই ভাইয়াকে আগে থেকেই বলে রেখেছিলাম আপনাকে আমার বিষয়ে সব জানিয়ে রাখতে। আমি একজনকে ভীষণ ভালোবাসতাম সে মুসলিম না বলে তার জন্য অপেক্ষা করেছি। সে নিজেও জানত না যে আমি তাকে ভালোবাসি। তবে আমাদের মাঝে কোন ধরনের হা’রাম সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু ভাগ্য আমার আপনার সাথে লিখা ছিল বলে বিয়েটা আপনার সাথে হয়ে গেল। আমি আপনাকে কোনো মিথ্যার মধ্যে রাখতে চাই নি, তাই সব বলে ক্লিয়ার করলাম।

লোকটা যেন শুনেও কিছু শুনল না। উল্টো হ্যাঁচকা টানে ইশাতকে বুকে টেনে নিলো। ঘোমটার ভেতরে ইশাতের চোখ দুটো বড়বড় হয়ে গেল। লোকটা হাত দিয়ে তার ঘোমটা তোলার আগেই ইশাত অতি আতঙ্কে ঘাবড়ে গিয়ে জ্ঞান হারিয়ে লোকটার বুকে ঢলে পড়লো। এমনিতেই মেয়েটা সারাদিনের ধকলে ক্লান্ত ছিল। তার উপর তার এমন নাজেহাল অবস্থা দেখে এবার আরিয়ান চিন্তিত হয়ে পড়লো। মেয়েটাকে এভাবে আর বিপত্তিতে ফেলা ঠিক হবে না ভেবে সে ইশাতকে বিছানায় শুইয়ে গ্লাসে পানি ভরে তার মুখে ছিটিয়ে দিলো। পানির ছিটা মুখে লাগতেই ইশাত পিটপিট করে চোখ খুলল। চোখ খুলতেই তার ঘোলা দৃশ্যপটে এভিয়ানের চেহারা ভেসে উঠলো। সে ভাবলো সে বোধহয় স্বপ্নের ঘোরে আছে।

তাই ইশাত সেভাবেই শুয়ে থাকা অবস্থায় চোখে অশ্রু নিয়ে মনের সকল অনুভূতি আর অভিমান উগরে দিয়ে বলতে লাগলো।
— আপনি কেন এসেছেন আমার স্বপ্নে অসভ্য লোক কোথাকার! আমাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মন ভরে নি? কেন আপনি আল্লাহর নাফরমান হয়ে জন্মালেন? কেন মুসলিম হয়ে নয়? আপনি না আমাকে ভালোবাসতেন? তাহলে কেন আমার কথা মানলেন না? আজ স্বামী রূপে অন্য কেউ আমাকে স্পর্শ করবে, যেটা সম্পূর্ণরুপে হালাল। তাকে বাধা দেওয়ার অধিকার আমার নেই। কিন্তু আপনাকে ভালোবেসে আমি অন্য কারো স্পর্শ কিভাবে সইবো? বলুন! বলে দিন? আমার কথা কি একবারও ভেবেছিলেন? এখন কেন এসেছেন? আমার য’ন্ত্রণা আরো বাড়িয়ে দিতে? চলে যান!!

কথাগুলো বলতে বলতে ইশাত ফুপিয়ে কেঁদে ফেলল। এভিয়ান তখন মোহাবিষ্ট চাহনি নিয়ে তার দুগালে হাত বুলিয়ে চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল।
— আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি হোয়াইট মুন। আমি কেন তোমাকে অন্য কারো হতে দেব? স্বপ্নেও না!!

ইশাত তার গালে এভিয়ানের স্পর্শ পেতেই চমকে উঠলো। তার বোধ হলো এভিয়ান স্বপ্নে নয় বরং বাস্তবেই তার সামনে। তাই সে তড়িৎ উঠে বসে মাথায় আবারো ঘোমটা টেনে বলল।
— আপনি এখানে কি করছেন এভিয়ান? ভেতরে কি করে এলেন? আর আমাকে ছুঁয়েছেন কোন সাহসে? দেখুন আমার বিয়ে হয়ে গেছে চলে যান এখান থেকে।

আরিয়ান ব্যাথাতুর হেসে বলল।
— আমি এভিয়ান নই ইশাত, আমি তোমার আরিয়ান।

ইশাত বিস্ময় নিয়ে বলল।
— মানে? আরিয়ান তো আমার স্বামীর নাম।

আরিয়ান তাকে আশ্বস্ত করে বলল।
— অন্য কেউ নয় আমিই তোমার স্বামী।

ইশাত যেন সব গুলিয়ে ফেলছে। সে জড়ানো গলায় বলল।
— কিন্তু এটা কিভাবে সম্ভব? আপনি কিভাবে আমাকে বিয়ে করতে পারেন? ভাইয়া কি করে আপনার সাথে আমার বিয়েতে রাজি হবে?

আরিয়ান তাকে সত্যটা জানিয়ে বলল।
— সেদিন রাতে তোমাকে হারিয়ে পাগলের মতো খুঁজতে গিয়ে আমি আমার রবকে খুঁজে পেয়েছি, হোয়াইট মুন। তোমার আর আমার মধ্যে আর কোনো দূরত্ব নেই এখন আর। কারণ আমিও সেই রবে বিশ্বাসী যে রবে তুমি বিশ্বাসী। এবার ঘোমটা টা খোলো বউ। স্বামীর সামনে কেউ এভাবে মুখ ঢেকে বসে থাকে? কথা বলবে না আমার সঙ্গে?

ইশাত কোনো জবাব দিলো না দেখে আরিয়ান মলিন মুখে বলল।
— দেখো তোমার আমাকে ভালো না লাগলে আমি কিন্তু এবার সত্যি সত্যি চলে যাচ্ছি।

আরিয়ান কথাটা বলে উঠে যেতে নিলে ইশাত সঙ্গে সঙ্গে ঘোমটা ফেলে আরিয়ানের হাত শক্ত করে টেনে নিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলো। এটাই ছিল তাদের প্রথম স্পর্শ তবে তা সম্পূর্ণ হালাল এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির উপর অবিচল থেকে। ইশাত অঝোরে খুশির অশ্রুতে চোখ ভাসিয়ে দিয়ে বলল।
— আমার সবকিছু স্বপ্ন মনে হচ্ছে। আল্লাহ এতো সুন্দর উপায়ে আমাদের মেলাবে আমি কল্পনায়ও ভাবি নি। আল্লাহু আকবার। আল্লাহ সকল প্রশংসার অধিকারী। তিনি আমার তাহাজ্জুদের ফরিয়াদ কবুল করেছেন। আমার দোয়াকে বাস্তবিক রূপ দিয়েছেন। তিনি কুন ফায়াকুন দিয়ে আমার হৃদয়কে শীতল করে তুলেছেন। আমি আজীবন আমার রবের শুকরগুজার।

আরিয়ান ইশাতের ভুল সংশোধন করে দিয়ে বলল।
— উহু তোমার না বলো আমাদের।

ইশাত অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো।
— আমাদের?

আরিয়ান মুচকি হেসে বলল।
— হ্যা,আগে হোক আর পরে আমরা দুজন দুজনকে তাহাজ্জুদে আল্লাহর কাছে চেয়েছি। এর থেকে সুন্দর আর কি হতে পারে? আমার রাতের পর রাত তাহাজ্জুদে করা দোয়ার ফসল তুমি। আমাদের দুজনের চাওয়া আর উদ্দেশ্য ছিল বৈধ। তাই তো স্বয়ং আল্লাহ তাআলা আমাদের দোয়া কবুল করলেন।

ইশাত চোখে খুশির উজ্জ্বলতা নিয়ে বলল।
— আল্লাহর কাছে হাজার শুকরিয়া। আপনি কি জানেন আজ ৫ বছর পূর্ণ হলো যেদিন আপনাকে প্রথম দেখেছিলাম, সেদিন আপনার এই প্রবলভাবে আর্কষণ করা চোখের দিকে তাকিয়ে ব্যাকুল হয়ে পড়েছিল আমার হৃদয়। কি যেন একটা দেখেছিলাম আপনার এই সোনালী চোখে যা অন্যদের থেকে আপনাকে আলাদা করে তুলেছিল আমার চোখে। আর দেখুন না কিভাবে আজকের দিনেই আল্লাহ আমাদের হালাল মাধ্যমে মিলন ঘটালো। আপনার প্রতি সেদিনের সেই অনুভূতিটাও আল্লাহ প্রদত্ত ছিল বলেই এটা সম্ভব হয়েছে। মনে হচ্ছে যেন তিনি সব আগে থেকেই লিখে রেখেছিলেন, আর ধীরে ধীরে সেটার পূর্ণতা টানলেন। এই সময়টুকু আল্লাহ আমাদেরকে একে অপরের জন্য তৈরি করছিলেন। যেটা সম্পর্কে আমরা এতদিন অজ্ঞ ছিলাম।

আরিয়ান মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিয়ে অতি যত্নে ইশাতের চোখের পানিটুকু মুছে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে বলল।
— আল্লাহ চেয়েছেন বলে এই হুরটাকে আমি নিজের করে পেয়েছি।

পরমুহুর্তে আরিয়ানের চোখের ভাষা বদলে গেলো সে নেশাতুর চাহনি নিয়ে ইশাতকে পুরোপুরি অবলোকন করে বলল।
— আমি কেন চোখ সরাতে পারছি না তোমার থেকে? এসব কি পড়েছ তুমি? কি জাদু করলে আমার উপর? আমার মনে একদম উথাল পাথাল তাণ্ডব চালিয়ে রেখেছ তুমি।

তখন হঠাৎ করেই ইশাত চোখ মুখ অন্ধকার করে সরে গিয়ে বলল।
— দূরে সরুন। কাছে আসবেন না।

আরিয়ান কাতর দৃষ্টি নিয়ে বলল।
— এখন তো আমি তোমার স্বামী তাও দূরে সরিয়ে দিচ্ছ?

ইশাত কপাল কুচকে বলল।
— হ্যা দিচ্ছি, কারণ আপনি প্র’তারক।

আরিয়ান আশ্চর্য হয়ে বলল।
— আমি আবার কি প্রতা’রণা করলাম?

— আপনি আমাকে প্র’তারণা করে বিয়ে করেছেন। আমার কাছে সবকিছু লুকিয়েছেন।

— আমি কই প্র’তারণা করলাম? দোষ তো আপনার মেডাম। আপনাকে যখন আপনার ভাই ছবি দেখাতে চেয়েছিল দেখেন নি কেন?

— তাই বলে এমন নাটক সাজাবেন? আমার উপর দিয়ে কি গেছে সেই ধারণাটুকু আছে আপনার?

— ট্রাস্ট মি হোয়াইট মুন, আমি চাই নি তোমাকে কষ্ট দিতে, এটা তোমার আদরণীয় ভাইয়ের প্ল্যান ছিল তোমাকে সারপ্রাইজ দেওয়ার। আমাকে ঠেলা না দিয়ে বরং তাকে গিয়ে ধরো।

ইশাতের তখন মনে পড়লো ইমরানের সেইসময় বলা কথাটা। ইমরান তাকে তখন বলেছিল তার জন্য একটা সারপ্রাইজ রয়েছে। তার মানে এটাই সেই সারপ্রাইজ। কথাটা মনে পড়তেই উচ্ছ্বাসে ইশাতের ঠোঁটের আগায় প্রশস্ত হাসি ফুটে উঠলো। তখন আরিয়ান এক ব্রু উঁচিয়ে বলে উঠলো।
— তুমি তো সারা পথ আমার সাথেই বসা ছিলে, তুমিও তো আমাকে চিনতে পারলে না?

তখনকার কথা মনে করে মুখে মলিনতা নিয়ে ইশাত বলল।
— তখন আমার দিন দুনিয়ার কোনো খেয়ালই ছিল না। আমার পাশে কে আছে, না আছে, কোনো কিছুর আগ্রহ কাজ করে নি। আমার পুরো দুনিয়া উলট পালট হয়ে ছিল তখন।

— আর এখন সত্য জানার পর কেমন লাগছে?

ইশাত চোখে জ্বলজ্বল করা উচ্ছ্বাস নিয়ে বলল।
— তখন মনে হচ্ছিল আমি আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় পাড় করছি। আর এখন মনে হচ্ছে আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দরতম মুহূর্ত এটা। জানেন আপনাকে না আজ বরের সাজে ভীষণ সুন্দর লাগছে। আমার কাছে এসবকিছু স্বপ্নের মতো লাগছে।

আরিয়ান ঠোঁটের আগায় হাসি ফুটিয়ে বলল।
— তাই? কিন্তু এটা তো স্বপ্ন না।

ইশাত ব্যাকুল ভঙ্গিতে আরিয়ানের দিকে তার দুহাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল।
— নিন আমাকে আরো একবার শক্ত করে জড়িয়ে ধরুন তো। আপনার বুকে মাথা রেখে আমি সমস্ত কষ্ট এক নিমিষে ভুলে যেতে চাই।

ইশাতের কথা শেষ হতেই আরিয়ান এক টানে তাকে পরম পরিতৃপ্তিতে নিজের প্রশস্ত বুকের সাথে মিশিয়ে নিলো। ইশাত আরিয়ানের বুকে মাথা রেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো। কিছুক্ষণ পর সে মুখ উঁচিয়ে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল।
— আচ্ছা আপনি এতদিন এমন দূরে দূরে কেন পালিয়ে বেরিয়েছে আমার থেকে? কেন আমার সাথে নজর মিলিয়ে কথা বলেন নি?

— তুমি এখনো বুঝো নি কেন? আমি তো নজরের হেফাজত করছিলাম। আমি চাই নি আমাদের বিয়ের আগ পর্যন্ত আমাদের সম্পর্কে কোনো রকম হারামের সংস্পর্শ থাকুক। আমি সম্পূর্ণ হালালভাবে তোমায় পেতে চেয়েছি। যে সম্পর্কে আল্লাহর রহমত থাকবে।

— আপনি আমাকে এতটা ভালোবাসেন?

— কোনো সন্দেহ আছে?

— মুখে বলুন না। কতটা ভালোবাসেন? আমি শুনতে চাই!!

— শুধু ভালোবাসি বললে তোমার প্রতি আমার অনুভূতিগুলো পূর্ণতা পাবে না। কারণ তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা সীমাহীন যা কেবলই তরঙ্গ হয়ে আমার হৃদস্পন্দনে আছড়ে পড়ে, পৃথিবীর যেকোনো শব্দ, যেকোনো ভাষাই সেটা তুলে ধরতে ব্যার্থ। আমি শুধু এই দুনিয়াতে নয় বরং মৃ’ত্যুর পরের দুনিয়াতেও তোমাকে চাই। দরকার হলে অনন্ত কালের জন্য আল্লাহর কাছে তোমাকে চেয়ে নিব। তবুও নিজের করে নেব। তোমাকে ছাড়া আমি নিজেকে এক মুহূর্তের জন্যেও ভাবতে চাই না। তুমি আমার হৃদয়ের প্রশান্তি। আমার ক্লান্তিহীন ফরিয়াদ।

আরিয়ানের কথাগুলো শুনে ইশাতের চোখ দুটো ছলছল করে উঠলো। আরিয়ান তখন বেডসাইড ড্রয়ার থেকে একটা কালো ভেলভেটের বড় জুয়েলারি বক্স বের করলো। ইশাত সেটার দিকে অবাক হয়ে তাকাতেই আরিয়ার বক্সটা তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল।
— ওপেন ইট।

ইশাত তার কথা মান্য করলো। কোনো প্রশ্ন ব্যতীত সে বক্সটা খুলতেই দেখলো ভেতরে হোয়াইট গোল্ডের তৈরি গহনার সেট। সেখানে মাথা থেকে শুরু করে পা পর্যন্ত সব গহনা রয়েছে। ইশাত হতবাক দৃষ্টিতে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল।
— হোয়াইট গোল্ড!! এগুলো তো অনেক এক্সপেন্সিভ। এতো টাকা কেন খরচ করতে গেলেন?

আরিয়ান মাথা নেড়ে বলল।
— উহু নট মোর দ্যান ইউ। আমার যা কিছু আছে সবই তো তোমার। তাছাড়া তোমাকে সাদায় বেশ মানায়। তাই এখানে টাকাটা ম্যাটার করে না।

পরক্ষণে আরিয়ান ঠোঁট কামড়ে দুষ্ট হেসে বলল।
— এন্ড অলসো ইউ লুক হট ইন মারুন।

ইশাত আরিয়ানের এমন অভিব্যক্তিতে লজ্জায় মুখ ঘুরিয়ে নিলো। আরিয়ান তখন তার চিবুকে আঙুল রেখে তাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে বলল।
— লজ্জা পেলে আরো বেশি লাগে।

ইশাত তখন মুখ লুকিয়ে কেটে পড়তে নিয়ে বলল।
— আমি এগুলো আলমারিতে রেখে আসছি।

কিন্তু ইশাত বিছানা থেকে উঠতেই আরিয়ান তার হাত ধরে হ্যাঁচকা টানে তাকে নিজের উরুতে বসিয়ে দিলো। তখন অজান্তেই ইশাতের হাত আরিয়ানের ঘাড় জড়িয়ে ধরলো। আরিয়ান ধীরে ধীরে তার মুখ ইশাতের মুখের কাছাকাছি নিয়ে এলো। ইশাত পরম আবেশে তার চোখজোড়া বন্ধ করে নিলো। কয়েক মুহূর্ত নিস্তব্ধতায় কেটে গেলো। কিছুক্ষণ পর ইশাত অনুভব করলো আরিয়ান তার মুখের উপর ফু দিয়ে দিচ্ছে। সে তখন আশ্চর্য হয়ে চোখ খুলে বলল।
— এটা কি হলো?

আরিয়ান চোখ ছোট ছোট করে বলল।
— তোমাকে দোয়া পড়ে ফু দিয়ে দিলাম, যাতে কারো নজর না লাগে। কেন তুমি কি ভেবেছিলে?

ইশাত লজ্জায় তার মাথা নামিয়ে আমতা আমতা করে বলল।
— কই আমি কি ভাববো?

আরিয়ান তখন টুপ করে তার কপালে চুমু খেয়ে বলল।
— যাও এসব পাল্টে আরামদায়ক কিছু পড়ে ওযু করে আসো। আমরা একত্রে নামাজে দাঁড়াবো। আমাদের জীবনের এই পূর্ণতার কর্তৃত্ব সম্পূর্ণ আল্লাহর। তিনি না চাইলে আজ আমি তোমাকে পেতাম না আর না তুমি আমাকে। তাই আমাদের আজকের এই বিশেষ দিনটা আমরা আল্লাহর শুকরগুজারে কাটাব।

আরিয়ানের মুখে এমন কথা শুনে ইশাতের ঠোঁটে প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠলো। সে হ্যাসুচক মাথা দুলিয়ে লাগেজ থেকে একটা জামা বের করে ওয়াসরুমে গিয়ে পাল্টে ওযু করে বেরিয়ে এসে দেখলো, আরিয়ান তার অপেক্ষায় বসে আছে। ইশাত এগিয়ে গিয়ে বলল।
— নামাজের জন্য কোথায় দাঁড়াবো আমরা?

আরিয়ান মৃদু হেসে তার হাতের আঙুল নিজের লম্বা লম্বা আঙুলের মাঝে আবদ্ধ করে তাকে রুমের বাহিরে নিয়ে গেলো। ইশাত যেতে যেতে আশেপাশে চোখ বুলিয়ে প্রশ্ন করে বলল।
— এটাও কি আপনার বাড়ি? এর আগে যখন আপনার বাড়িতে রিজভী ভাইয়া নিয়ে গিয়েছিল তখন তো ভিন্ন একটা বাড়ি দেখেছিলাম। তাহলে এটা আবার কোন বাড়ি?

— আমার আগের বাড়ির ধরন রং কিছুই তোমার পছন্দ ছিল না। সেটা আমি তোমার মুখ দেখেই ধারণা করে নিয়েছিলাম। তাইতো তোমার পছন্দ অপছন্দ তোমার ভাইয়ের কাছে জেনে এই নতুন বাড়িটা সাজিয়েছি। ভালো লাগে নি?

— ভীষণ ভালো লেগেছে, অত্যন্ত সুন্দর আর প্রাণবন্ত এই বাড়িটা। আগের বাড়িটা তো ছিল অন্ধকারে ঘেরা।

আরিয়ান ইশাতকে একটা রুমে নিয়ে গেলো। যে রুমে নামাজের জন্য বিশেষ জায়গা তৈরি করা। রুমের ওয়াল জুড়ে আরবিতে লিখা বিভিন্ন ধরনের ক্যালিগ্রাফি। মেঝেতে ভীষণ সুন্দর ভেলভেটের একজোড়া কাপল প্রেয়ার মেট বিছিয়ে রাখা। সামনের দেওয়ালেই আরবিতে আল্লাহর নামের অক্ষরগুলো সুন্দর একটা নকশার মাঝে বিশেষ লাইটিং করে সাজানো, একপাশে বিশাল শেলফ যেখানে সকল ধরনের হাদিস থেকে শুরু করে ইসলামিক বইগুলো সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে রাখা, আর অন্য পাশে সযত্নে বিশেষ কাভারে কুরআন মুড়িয়ে রাখা। পাশাপাশি চারিপাশে ভীষন সুন্দর উজ্জ্বল লাইটিং করা। ইশাত সেদিকে তার মুগ্ধ চোখ বুলিয়ে বলল।
— এরকম একটা নামাজের রুম করা আমার স্বপ্ন ছিল।

এভিয়ান সম্মোহনী হেসে বলল।
— এসব তোমারই তো।

কথাটা বলে আরিয়ান ইশাতের ধরে রাখা হাতে চুমু খেয়ে তাকে পাশাপাশি নিয়ে জায়নামাজে দাড়ালো। আরিয়ান নামাজের নিয়ত বাঁধলো। আরিয়ানের পাশে দাঁড়িয়ে নামাজরত অবস্থায় ইশাতের গাল গড়িয়ে অনবরত প্রাপ্তির অশ্রু ঝরছে। বর্তমানের এই আরিয়ান যেন তার করা প্রত্যেকটা দোয়ার জবাব। যার জন্য ইশাত কত রাত কেঁদেছে, চোখের পানি ফেলেছে, আল্লাহর কাছে আকুতি করেছে, তার কোনো হিসাব নেই। এই নেয়ামতের জন্য সে আল্লাহকে সারাজীবন শুকরিয়া করেও শেষ করতে পারবে না।

তারা দুজন একত্রে সারা রাত আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থেকে শেষ রাতে একসাথে তাহাজ্জুদ পড়ে মোনাজাতের জন্য হাত তুলল। মোনাজাতে তারা মন উজাড় করে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলো এবং একে অপরের কল্যাণের জন্য দোয়া করলো। তারই সঙ্গে আল্লাকে সাক্ষী রেখে তারা জীবনের ভালো মন্দ প্রত্যেকটা মুহূর্তে একে অপরের পাশে থেকে আল্লাহর সন্তুষ্টির উপর চলার প্রতিশ্রুতি রাখলো।

———————

জানালার ফাঁক গলিয়ে ভোরের মিষ্টি রোদ মুখে এসে লাগতেই ইশাতের ঘুম ভেঙে গেলো। ফজরের নামাজের পর তারা কিছুক্ষণের জন্য একটু শুয়েছিল। পিটপিট করে চোখ খুলতেই ইশাত নিজেকে আবিষ্কার করলো আরিয়ানের বাহুতে। সে আরিয়ানের দিকে ফিরে দেখলো সে এখনো ঘুমের মধ্যে রয়েছে। ইশাত তখন ঠোঁট কামড়ে হেসে আরিয়ানের বাহুতে আবদ্ধ থাকা অবস্থায়তেই তাকে কাছ থেকে অবলক করতে লাগলো। আরিয়ানের এলোমেলো চুলগুলো কপালে পড়ে আছে। ঘুমের ঘোরে তাকে দেখতে একদমই নিষ্পাপ আর আরো বেশি সুদর্শন লাগছে। তাকে নিজের এতটা কাছে পেতেই সে তার ঘুমের সুযোগ নিয়ে তার সারা মুখ জুড়ে আলতো করে অজস্র চুমুতে ভরিয়ে দিতে লাগলো। কিন্তু যখনই ইশাত শেষ চুমুটা দিয়ে সরে যেতে নিলো, এমন সময় হুট করে আরিয়ান তার চোখ মেলে তাকালো। আরিয়ানকে জাগ্রত অবস্থায় দেখে ইশাত আতকে উঠে সরে গেলে, আরিয়ান তাকে এক টানে নিজের আরো কাছে নিয়ে নিলো। ইশাত লজ্জা পেয়ে আমতা আমতা করে বলতে লাগলো।
— আপনি এতক্ষন যাবত জাগ্রত ছিলেন? ঘুমোনোর ভান ধরে ছিলেন?

আরিয়ান মোহাবিষ্ট চাহনিতে পলক ঝাপটে বলল।
— পাশে এতো সুন্দরী বউ রেখে কে ঘুমায়?

ইশাত কৌতূহল নিয়ে প্রশ্ন করলো।
— তাহলে না ঘুমিয়ে কি করছিলেন?

আরিয়ান এক নিমিষে উত্তর দিলো।
— তোমাকে দেখছিলাম।

— তাহলে ঘুমের ভান ধরে ছিলেন কেন?

— দেখতে চেয়েছিলাম তুমি কি করো। এখন মনে হচ্ছে আগে আগে চোখ খুলে ভুল করে ফেলেছি। যাই হোক যা করছিলে আবারো করো।

ইশাত ঘাড় ঘুরিয়ে নিয়ে বলল।
— আমি আর করব না।

আরিয়ান দুষ্টুমির ছলে বলল।
— তাহলে আমি করলে সইতে পারবে?

ইশাত এবার সাহস দেখিয়ে আরিয়ানের ঘাড়ে হাত জড়িয়ে বলল।
— না পারার কি আছে?

আরিয়ান বাকা হেসে প্রত্যুত্তর করলো।
— রাতেই তো পালাই পালাই করছিলেন। চোখের দিকে তাকিয়ে পর্যন্ত কথা বলতে পারছিলেন না। এখন তো দেখি সাহস বেড়েছে। রাতারাতি এতো উন্নতি হলো কী করে?

ইশাত মজার ছলে বলল।
— ভেবে দেখলাম সখের পুরুষের কাছে কিসের এতো লজ্জা?

কিন্তু আরিয়ান তার কথাটা সিরিয়াসলি নিয়ে নিলো। সে ইশাতকে এক ঝটকায় তার বাহু থেকে সরিয়ে বিছানায় চেপে ধরে ইশাতের কথা মতো সেটাই করলো। ইশাতের উপর দিয়ে যেন ঝড় বয়ে গেল। একটা সময় ইশাতের নিশ্বাস ফুরিয়ে আসলে সে বারবার আরিয়ানের বুকে হাত দিয়ে ঠেলে তাকে সরিয়ে দিতে চাইলো। কিন্তু এক চুলও নড়াতে পারলো না। এদিকে ইশাতকে নাস্তানাবুদ করে তবেই আরিয়ান তাকে ছাড়লো। ইশাত তখন জোরে জোরে নিঃশ্বাস টানতে টানতে বলল।
— আমার ভুল হয়ে গেছে আর বলবো না এমন কথা। আপনি উঠুন অফিসে যান।

আরিয়ান এবার আর তার কোনো কথাই শুনল না। সে এক নিমিষে পড়নে সাদা শার্টটা টেনে খুলে ফ্লোরে ছুঁড়ে মারলো। ইশাত তখন অবাক চোখে দেখলো তার জিম করা ওয়েল ফিটেড বডি। ইশাতের সকল সাহস তখন তরতর করে নেমে গেলো। আরিয়ান তখন হিসহিসানো গলায় তার কানের কাছে এসে বলল।
— এখন অফিসে যাওয়ার মুড আর নেই। আমার পুরো অ্যাটেনশন তুমি নিজের দিকে টেনে নিয়েছ।

ইশাত তার মুখে এমন কথা শুনে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ল।

চলবে ( ইনশাআল্লাহ )………………..

#ক্লান্তিহীন_তুই_আমার_ফরিয়াদ
#পর্বঃ৪২
#সুমাইয়া_জান্নাত_ইলমা

বাংলাদেশের মাটিতে প্রথমবারের মতো পা রাখতেই সন্তপর্নে চোখের রোদচশমাটা খুলতে খুলতে আপনা আপনি প্রতি’শোধের হাসিতে প্রসারিত হলো একজন যুবতীর ঠোঁট। আশেপাশের কিছু লোকজন মেয়েটাকে দেখে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। মেয়েটা দেখতে ভীষণ লম্বাটে, সাধারণত এই দেশের মেয়েরা এতটা লম্বা গড়নের হয় না। খেয়াল করলেই বোঝা যাচ্ছে মেয়েটা ভিনদেশী। মেয়েটার শরীরের গঠন, চেহারা কাটিং তেমনটাই জানান দেয়। মেয়েটার চুলের রং হালকা বাদামি, চালচলন অনেকটাই ভিন্ন। পড়নে তার কালো লেদার পেন্ট, আর কালো স্কিন টিশার্ট। তার গায়ের রং অনেকটা আরিয়ানের মতোই। আশেপাশের লোকজন যখন মেয়েটাকে কৌতূহলী চোখে অবলোকন করতে ব্যস্ত, এমন সময় মেয়েটার পেছন থেকে একজন কালো পোশাকধারী লোক এসে তার সামনে মাথা নিচু করে জানালো।
— বস ক্লারা, সকল ফর্মালিটি পূরণ করা শেষ। এবার আপনি যেতে পারবেন।

ক্লারা তখন লোকটাকে ঠান্ডা চোখের ইশারায় গাড়ি রেডি করতে বলল। লোকটা তার কাজ বুঝে নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে জায়গা ত্যাগ করলো। কয়েক মাস পূর্বে আরিয়ান আমেরিকা থেকে চলে আসার পর থেকে ক্লারা অপেক্ষায় ছিল আরিয়ানের আবারো আমেরিকা ফেরার। কিন্তু সে যখন দেখলো আরিয়ান আর ফিরছে না, ঠিক তখন থেকে সে বাংলাদেশে নিজের লোক পাঠিয়ে আরিয়ানের খোঁজ নেওয়া শুরু করে দিয়েছিল। অবশেষে আরিয়ানের সকল খোঁজ নিয়েই দলবলসহ সে বাংলাদেশে এসে হাজির হলো, তার অপূর্ণ প্রতি’শোধ পূর্ণ করার উদ্দেশ্য নিয়ে। ক্লারার চোখে আজও স্পষ্ট সেই পূর্বের ন্যায় প্রতিহিং’সার হিং’স্রতা।

এয়ারপোর্ট থেকে বেরোতেই ক্লারা দেখলো তার অপেক্ষায় এয়ারপোর্টের বাহিরে গাড়ি দাঁড় করে রাখা। সে তার হাতের লাগেজ তার লোকজনের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে বসলো। লাগেজগুলো গাড়ির ট্যাংকে রাখা হতেই ড্রাইভার গাড়ি টান দিলো গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। কিছুক্ষণ পর গাড়িটা থামলো একটা কেন্দ্রীয় কা’রাগারের বাহিরে। গাড়ির দরজা মেলে ধরতেই ভেতর থেকে ক্লারা শান্ত ভঙ্গিতে বেরোলো। তার লোকজনকে সে বাহিরেই থাকতে বলে নিজে ভেতরে ঢুকতে নিলে ভিতরের লোকজনধারা তাকে বাধা প্রদান করা হলো। এতে ক্লারা মুখের ভাব একটুও পরিবর্তন হলো না। সে উল্টো তাচ্ছিল্য হেসে তাদের দিকে এক বান্ডেল টাকা ছুঁড়ে মারতেই তারা তরতরিয়ে সরে দাড়ালো।

সামনে থেকে বিপত্তিগুলোকে অনায়াসে সরিয়ে ক্লারা বুট জুতার ঠক ঠক আওয়াজে নির্দিষ্ট একটা সেলের কাছে যেতেই সে দেখলো, সেলের ভেতরে একজন পুরুষ দুপায়ের হাঁটুর উপর হাত ঠেকিয়ে মাথা নামিয়ে বসে আছে মেঝের এক কোনায়। মাথাটা নামিয়ে রাখার কারণে লোকটার মুখ অস্পষ্ট। ক্লারা তখন লোকটার মনোযোগ পেতে হাতে চুটকি বাজিয়ে আওয়াজ তুললো। লোকটার কানের কাছে সেই আওয়াজটা স্পষ্ট পৌঁছালো। কিন্তু লোকটা কোনো প্রতিক্রিয়া করলো না। তখন ক্লারা কড়া গলায় বলল।
— কা’ওয়ার্ড কোথাকার!! আমি নিজে সাহায্য করে তোকে আন্ডারওয়ার্ল্ডে ঢোকালাম আর তুই কিনা এভিয়ানের কোনো ক্ষ’তিই করতে পারলি না? রা’বিশ।

এতক্ষনে আসিফ মাথা তুললো। চোখ দুটো তার রক্তিম হয়ে উঠছে। সে ক্রোধ নিয়ে ক্লরার দিয়ে তাকালো। ক্লারা তখন আবারো ফুঁসতে ফুঁসতে চেঁচিয়ে উঠে বলল।
— তুই জে’লে গেলি ভালো কথা কিন্তু ওর কোনো ক্ষ’তি কেন করতে পারলি না? কথা কি ছিল? তোকে যদি আমি ইশাতকে পেতে সাহায্য করি, তাহলে তুই এভিয়ানকে শে’ষ করতে আমার সাহায্য করবি। তুই তো কিছু করার আগেই কে’স খেয়ে গেলি। আর কিছুদিনপর কোর্টে রায় হলে তোর ফাঁ’সি হবে নয়তো যাবতজীবন কা’রাদণ্ড।

আসিফ তখন রক্তিম দৃষ্টি নিয়ে বলল।
— আমি কিছু জানি না আমার শুধু ইশাতকে চাই। যদি ম’রারই হয় তবুও আমি ওকে নিয়ে ম’রবো। কিন্তু ওকে অন্য কারো হতে দেব না। কোনো ভাবেই না!

ক্লারা তখন বিদ্রপ হেসে বলল।
— হাও ফুলিশ ইউ আর! কালই ইশাতের বিয়ে হয়ে গেছে এভিয়ানের সাথে।

ক্লারা কথা কানে এসে পৌঁছাতেই আসিফের মনে বিভীষিকা জেগে উঠলো। সে বিস্ফোরিত নয়নে ক্লারাকে প্রশ্ন ছুঁড়ে বলল।
— কিহ!! কীভাবে সম্ভব!? এভিয়ান তো অমুসলিম। ইশাত ওকে কীভাবে বিয়ে করে নিলো?

ক্লারা বিরক্তিতে চোখ উল্টিয়ে বলল।
— কিছুই তো জানো না দেখছি, জানবে কি করে জেলে বসে পঁচলে।

আসিফ মাঝপথে ক্লারার কথা থামিয়ে বলল।
— আমি যেটার প্রশ্ন করেছি তার উত্তর দিন আগে।

ক্লারা গম্ভীর গলায় চোয়াল শক্ত করে উত্তর দিলো।
— হি রিভার্টেড টু ইসলাম। এভিয়ান তো এখন দিব্যি শান্তিতে আছে। এবার তাহলে তোমাকে দিয়ে আমার কি কাজ? ইউজলেস কোথাকার।

কথাটা বলে ক্লারা চলে যেতে পা বাড়ালে আসিফ তাকে ঠান্ডা গলায় থামিয়ে দিয়ে বলল।
— আমাকে পালাতে সাহায্য করো। আমি এভিয়ানকে শে’ষ করে দেব। আই প্রমিস!

আসিফের উক্তিতে ক্লারার ঠোঁটে পৈশাচিক হাসি খেলে গেলো। সে তার মাথা ডানে বামে ঘুরিয়ে ঘাড় ফুটিয়ে বলল।
— এর জন্য সময়ের প্রয়োজন। এই কাজের জন্যেই মূলত আমি এই দেশে সশরীরে এসে হাজির হয়েছি। সময় হলে পালানোর ব্যবস্থাটাও করে দিব।

আসিফ অধৈর্য হয়ে তাকে তাড়া দিয়ে বলল।
— যা করার জলদি করুন। আমি আমার ইশাতের সঙ্গে অন্য কাউকে সহ্য করতে পারছি না।

ক্লারা হাতের ইশারায় তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল।
— এতো ইমপেসেন্স হলে চলবে না। আমি বললাম তো সব ব্যবস্থা আমি নিজে করে দেব, এর মানে সময় মতো সব হয়ে যাবে।

আসিফ অগত্যা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল।
— ঠিকাছে, সঠিক সময়ের অপেক্ষায় থাকবো।

—————————

দুপুরে রান্নার কাজ শেষ হতেই ইশাত বাড়ির বাহিরে দাঁড়ানো একজন গার্ডকে লাঞ্চ বক্স দিয়ে বলল আরিয়ানের অফিসে দিয়ে আসতে। লোকটা মাথা নিচু করে বক্স হাতে নিয়ে প্রস্থান করলো। ইশাত তখন রুমে ফিরে এসে ফ্রেশ হয়ে যুহরের নামাজ পড়ে ফ্রি হয়ে বসতেই আরিয়ানকে কল করলো। কিন্তু তার ফোন বন্ধ দেখলো। তখন ইশাতের মন খারাপ হয়ে গেলো। ইদানিং সে সাময়িক সময়ের জন্য হলেও আরিয়ানের সাথে কথা না বলে থাকতে পারে না। তার ভীষণ ছটফট লাগে। যখন তারা দূরে ছিল তখন দূরত্বের কারণে হয়তো সব সয়ে যেত। কিন্তু এখন তাকে হালাল রূপে নিজের করে পাওয়ার পর থেকে যেন আরিয়ানের প্রতি তার ভালোবাসা পূর্বের তুলনায় আরও দ্বিগুণ হয়ে উঠেছে।

ইশাত যখন মন খারাপ করে এসব ভাবছিল ঠিক তখন তার ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে মিস্টার গোল্ডেন নামটা ভাসতেই তার চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে গেল। সে সঙ্গে সঙ্গে ফোন তুলে কানে দিয়ে সালাম দিয়ে বলল।
— আপনি ফোন কেন বন্ধ রেখেছিলেন? আমি ভীষণ মিস করছিলাম আপনাকে। আপনি জানেন না আপনার সাথে কথা না বললে আমার ভালো লাগে না।

আরিয়ান শান্তভাবে সালামের উত্তর নিয়ে জানালো।
— মিটিংয়ে ছিলাম তাই অফ করে রেখেছিলাম। সরি, এখন থেকে আর অফ করবো না জান।

আরিয়ানের এমন সম্বোধনে ইশাতের গাল দুটো তৎক্ষণাৎ লাল হয়ে গেল। সে লজ্জা মাখা কন্ঠ নিয়ে বলল।
— মাত্র কি বলে ডাকলেন?

— তোমাকে আমার জান বললাম।

— অনেক ভালো লাগছে আপনার মুখ থেকে এটা শুনতে।

— সামান্য একটা ডাকে যদি তুমি এতো খুশি হও তাহলে শুধু জান কেন? তোমাকে রোজ রোজ নতুন নতুন নামে ডেকে মুগ্ধ করবে তোমার আরিয়ান।

ইশাত মুগ্ধ হয়ে বলল।
— আমি এমনিতেও আগে থেকেই আপনার উপর মুগ্ধ। এতদিন ভেবে কষ্ট পেয়ে এসেছি, আমার ভালোবাসা বুঝি এক তরফা ছিল। কিন্তু আল্লাহ যে আমার জন্য এতো বড় একটা চমক তৈরি করে রেখেছেন সেটা কি আর জানতাম? জানলে হয়তো আরো সুন্দর করে ধৈর্য সহকারে তার আমল করতাম।

আরিয়ান তার আবেগ প্রকাশ করে বলল।
— আর তুমি যদি আমার জীবনে না আসতে আমি সারাজীবন এই অন্ধকারের অতলে তলিয়ে থাকতাম। আল্লাহ এসবকিছু পূর্বের থেকেই নির্ধারণ করে রেখেছিলেন। আমার জীবনে তোমার আগমন আল্লাহর তরফ থেকে পাঠানো সবচেয়ে বড় একটা নেয়ামত ছিল হোয়াইট মুন। তুমি আল্লাহর জারিয়া হয়ে এসে আমাকে এই ধ্বং’সস্তূপ থেকে তুলে নিয়ে নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছ। তাইতো আল্লাহ তার রহমত দিয়ে আমার মনে তোমার জন্য বিশেষ একটা অনুভূতির স্থান তৈরি করে দিয়েছেন। এখানে অদ্ভূত একটা বিষয় কি জানো? তোমাকে হালাল করে পাওয়ার পর থেকে তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা আগের থেকেও আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমি আগের থেকেও বেশি দুর্বল হয়ে পড়ছি তোমার প্রতি। এখন তো আমার আশেপাশে তুমি না থাকলে সব কিছুই কেমন যেন বেরঙ,নিস্তেজ মনে হয়। আর তোমার উপস্থিতিতে আমার অন্তর প্রশান্ত হয়।

ইশাত সহমত দিয়ে বলল।
— এসবই আল্লাহর করুণা, আমরা আমাদের ভালোবাসার মাঝে রবকে সাক্ষী রেখেছি বলে হয়তো তিনি আমাদের উপর সন্তুষ্ট হয়ে আমাদের ভালোবাসায় বিশেষ বরকত আর প্রশান্তি দিচ্ছেন। তাইতো পূর্বের থেকেও আমাদের মন একে অন্যের প্রতি আরো বেশি উতলা হয়ে পড়েছে। আল্লাহ সব সময় তার এই বিশেষ রহমত আমাদের সম্পর্কের উপর বজায় রাখুক। আমি আপনাকে আল্লাহর ওয়াস্তে ভালোবাসি মিস্টার গোল্ডেন।

ইশাতের মুখে এভাবে ভালোবাসার কথা শুনে আরিয়ানের হৃদয়ে প্রশান্তির ঢেউ খেলে গেলো। সে প্রশস্ত হেসে নিজেও বলল।
— আমিও তোমাকে আল্লাহর ওয়াস্তে ভালোবাসি হোয়াইট মুন। শুধু দুনিয়াতে নয় আল্লাহ আমাদের জান্নাতেও এক করুক।

— আমিন। আপনি লাঞ্চ করেছেন? আমি আপনার জন্য লাঞ্চ তৈরি করে পাঠিয়েছিলাম।

— নট ইয়েট। আমি মিটিং রুমে ছিলাম তখন। লাঞ্চ বক্স আমার কেবিনে রাখা। আমি মিটিং শেষ করেই আগে তোমাকে কল করলাম। তুমি এতো কষ্ট করে আমার জন্য রান্না করে পাঠিয়েছ আমি পরম তৃপ্তি নিয়ে খাবো। কিন্তু তুমি লাঞ্চ করেছ?

— না নামাজ পড়ে উঠলাম মাত্র। এখন করব। আপনি নামাজ পড়েছিলেন?

— হ্যা নামাজ পড়েই সোজা মিটিং অ্যাটেন্ড করেছি।

— ঠিকাছে এখন খেয়ে নিন। আর শুনুন বাসায় তাড়াতাড়ি ফেরার চেষ্টা করবেন কেমন?

আরিয়ান নাটকীয়তার সুরে বলল।
— যা হুকুম করবেন মহারানী।

ইশাত খিলখিলিয়ে হেসে ফোন রেখে নিচে চলে গেলো। দুপুরের খাওয়া শেষে সে রুমে ফিরতেই মনে পড়লো ইমরানের দেওয়া গিফট বক্সটার কথা। সে খাটের একপাশে রাখা লাগেজটা তুলে বিছানায় রাখলো। লাগেজের কোনো কাপড়ই তার এখনো গুছিয়ে রাখা হয়নি। আরিয়ানের দেওয়া গহনাগুলোও সে তাড়াহুড়োতে কোনোমতে বেড সাইড ড্রায়ারে লক করে রেখেছিল তখন। এখন সব আলমারিতে গুছিয়ে রাখার পালা।

লাগেজ খুলে প্রথমেই ইমরানের দেওয়া বক্সটা হাতে নিয়ে সে রেপার খুলতেই দেখলো ভেতরে তার পছন্দের অনেকগুলো চকলেট। ইশাতের তখন পুরোনো স্মৃতিগুলোর কথা মনে পড়ে গেলো, তার ভাই প্রত্যেকবার বাড়ি ফেরার সময় এভাবেই অনেকগুলো চকলেট এনে তার বিছানায় সাজিয়ে রাখতো। পুরোনো ভাবনায় বিভোর হয়ে সে চকলেটগুলো হাতড়াতেই চকলেটগুলোর ভেতরে একটা কিছু তার হাতে বাঁধলো। সে চকলেটগুলো সরিয়ে দেখলো একটা ছোট বক্স। কৌতুহল নিয়ে বক্সটা খুলতেই সে দেখল ভেতরে স্বর্ণ আর হীরার সমন্বয়ে তৈরি অনেক সুন্দর একটা ব্রেসলেট।

সাথে একটা চিরকুট। সঙ্গে আবার দুটো সাজেকের অনলাইন টিকিট। ইশাত আগে চিরকুটের ভেতর লিখাটা পড়লো। সেখানে ইমরানের হাতে লিখা ছিল।
“আমার আর আম্মুর পক্ষ থেকে আমাদের ছোট পুতুলের জন্য সামান্য একটি উপহার। তোর সাজেক যাওয়ার খুব ইচ্ছে ছিল, গতবার প্ল্যান করেও আম্মুর অসুস্থতার কারণে আমাদের সেটা ক্যান্সেল করতে হয়। আল্লাহ ভালো জানেন হয়তো তোর কপালে তোর বরের সঙ্গে প্রথম সাজেক ঘোরা লিখা ছিল তাই সেইবারের ট্রিপ ক্যান্সেল হয়ে গিয়েছিল। তাই এইবার আগে থেকেই অনলাইনে বুক করে ফেললাম তোদের জন্য টিকিট। যাই হোক তোর ভাইয়া তোকে অনেক ভালোবাসে আমার ছোট্ট পুতুল। তুই অনেক সুখে থাক, তোর ভাইয়ের দোয়া রইলো।”

ভাইয়ের লিখা চিঠি পড়ে ইশাতের চোখের কোণে অশ্রু জমে গেল। সে বিড়বিড় করে বলল।
“এটা সামান্য না, আমার জন্য এটা অসামান্য। ধন্যবাদ আম্মু আর ভাইয়া। তোমাদের আর আহনাফকে অনেক মিস করছি।”

ইশাত তখন ফোন হাতে নিয়ে সানজিদার ফোনে ভিডিও কল দিলো। সানজিদা তার রুমের মধ্যে ছিল। ইশাতের কল পেতেই সে রিসিভ করে ড্রয়িং রুমে গিয়ে সবাইকে ব্যাক ক্যামেরায় দেখালো। ইশাত দেখলো ইমরান ছেলেকে কোলে বসিয়ে আসিয়া বেগমের সাথে কথা বলছে। আসিয়া বেগম ছেলের পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। অন্যদিকে আহনাফ ইমরানের কোলে বসে ফোনে গেম খেলছে। ইশাত অবাক হয়ে সানজিদাকে প্রশ্ন করলো।
— ভাইয়া আজ কাজে যায় নি? এমন সময়ে তো ভাইয়া বাসায় থাকেন না।

সানজিদা তখন মন উদাস করে বলল।
— তুমি চলে যাওয়ার পর থেকে উনার মন ভীষণ খারাপ। তাই ছুটি নিয়েছেন।

ইশাত ব্যাথাতুর কন্ঠে বলল।
— ঠিকাছে ভাইয়াকে ফোনটা দাও ভাবি, আমি তাকে বুঝিয়ে বলবো।

সানজিদা তখন ইমরানের দিকে ফোন এগিয়ে দিয়ে বলল ইশাত কল করেছে। ইমরান এটা শুনে সঙ্গে সঙ্গে ফোনটা হাতে নিতেই, কলে ইশাতকে দেখা মাত্র তার চোখজোড়া জুড়িয়ে গেলো। ইশাত তখন কোমল কন্ঠে বলল।
— কেমন আছো ভাইয়া?

ইমরান প্রশস্ত হাসিতে বলল।
— এতক্ষন ভালো ছিলাম না। তোকে দেখার পর থেকে আলহামদুলিল্লাহ এখন ভালো হয়ে গেছি। তুই কেমন আছিস বোন?

— আলহামদুলিল্লাহ ভালো, আচ্ছা তুমি কাজে কেন যাচ্ছো না? আমার জন্য?

ইমরান চুপ রইলো। ইশাত তখন ভাইকে বুঝিয়ে বলল।
— ভাইয়া তোমাকে এভাবে দেখতে আমার একদমই ভালো লাগছে না। তুমি যদি এমন মনমরা হয়ে থাকো তাহলে আমিও কিন্তু ভালো থাকতে পারব না। তুমি আগে যেভাবে থাকতে এখনো তেমনি থাকবে।

ইমরান দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে স্বাভাবিক করে বলল।
— ঠিকাছে, আমার বোন যেভাবে বলবে সেভাবেই হবে। কিন্তু তুই আরিয়ানকে নিয়ে একদিন সময় করে এসে পর। তোকে সামনাসামনি দেখতে খুব ইচ্ছে করছে।

— ঠিকাছে, উনাকে বলবো।

আসিয়া বেগমও তখন ফোন নিয়ে ইশাতের সাথে কথা বলল। ইশাতের কণ্ঠের আওয়াজ পেয়ে আহনাফও ফুপির সাথে অভিমানী গলায় কথা বলতে লাগলো। পরিবারের সাথে কথা বলার পর ইশাতের মনটা এবার আরো ফুরফুরা হয়ে গেল। এবার সে লাগেজ থেকে কাপড় নিয়ে ক্লোজেটে রাখতে গিয়ে দেখলো, ক্লোজেট ভর্তি সুন্দর সুন্দর গাউন থেকে শুরু করে জুতা, ব্যাগ শাড়ি, প্রসাধনীসহ মেয়েদের যা যা প্রয়োজনীয় সেই সবকিছুই ভেতরে ভিন্ন ভিন্ন তাকে সাজানো রয়েছে। এখানে তো তার নিজের আনা কাপড় রাখারই কোনো জায়গা অবশিষ্ট নেই। ইশাত অবাক হয়ে আরিয়ানকে কল লাগালো। আরিয়ান কল তুলতেই সে অনর্গল বলল।
— লাগেজ থেকে কাপড় তুলে ক্লোজেটে রাখতে গিয়ে দেখলাম ভেতরে একটুও জায়গা অবশিষ্ট নেই। এসব কি করেছেন আপনি?

আরিয়ান নির্বিকার ভঙ্গিতে উত্তর দিলো।
— ও আচ্ছা সমস্যা নেই, জায়গা না থাকলে আরেকটা ক্লোজেট বানিয়ে দেব।

এমন উত্তরে ইশাত হতভম্ব হয়ে বলল।
— আমার কথার মানে এটা নয়। আপনি এতসব কেন করতে গেলেন? মনে হচ্ছে পুরো মার্কেট আমার রুমে রয়েছে।

— বউয়ের প্রয়োজন পূরণ করা স্বামীর দায়িত্ব। তাইতো একটা মেয়ের যা যা প্রয়োজন হতে পারে সেগুলোই এনে রেখেছি। যেন তোমার কোনো কিছুতে কোনো সমস্যা না হয়। আর এছাড়াও যদি কোনো কিছুর প্রয়োজন হয় আমাকে বলবে, আমি এনে হাজির করবো।

ইশাত আপত্তি করে বলল।
— আমার এতসব কিছুর প্রয়োজন নেই। আমার প্রয়োজন আপনাকে। আমার চাওয়া আপনি, আপনিই আমার অলঙ্কার। আমার পাশে আপনি থাকলেই হবে। আর আপনি কিন্তু বেহিসাবি টাকা খরচ করছেন আমার উপরে।

আরিয়ান এবার ইশাতকে তার দৃষ্টিভঙ্গিতে বুঝিয়ে বলল।
— প্রথমত আমি আল্লাহকে সাক্ষী রেখে তোমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি পাশে থাকার। আমি তো তোমার পাশে থাকবই। তবে আমার সবকিছুতেই তোমার অধিকার রয়েছে। তুমি আমার ঘরের রানী, আমার সখের নারী। আমি আমার সখের নারীকে রানীর মতো সাজিয়ে রেখে তার সৌন্দর্যের সবটুকু সানন্দে গ্রহন করবো। আর অতিরিক্ত খরচের বিষয় যদি তুলো তাহলে শুনে রাখো তোমাকে বিয়ের সুবাদে আল্লাহ আমার রিজিকে বরকত উজাড় করে দিয়েছেন। তাই আমিও মন উজাড় করে তোমার জন্য খরচ করছি। তাছাড়া স্ত্রীর জন্য খরচ করা টাকার কোনো হিসেব নেওয়া হয় না। সেটা সাদকা হিসেবে গণ্য হয়। আমার যেমন আছে আমি সেভাবে খরচও করি। আর কোনো প্রশ্ন করা আপনার বাকি আছে মেডাম? থাকলে করুন সেটারও উত্তর দিচ্ছি।

ইশাত আরিয়ানের কথার যুক্তিতে হেসে বলল।
— না নেই স্বামী আমার, এখন কাজ শেষ করে জলদি বাসায় ফিরুন। আপনার বউ আপনার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।

আরিয়ানের সাথে কথা বলে ফোন রেখে ইশাত কাপড় গুছানোর কাজটা শেষ করে নিলো। বাকি সময়টা তার কোনো মতে কেটে গেলো। কিছুক্ষণ পর মাগরিবের নামাজ পড়ে ইশাত আরিয়ানের ফেরার অপেক্ষা করছিল। তখন দরজায় কলিংবেল বাজতেই ইশাত ছুটে গিয়ে দরজা খুলে দিলে দেখলো আরিয়ান হাতে সাদা গোলাপের বুকে নিয়ে হাসিমুখে দাড়িয়ে। পরক্ষণে আরিয়ান হাঁটু মুড়ে বসে ইশাতের দিকে সেই বুকেটা এগিয়ে ধরে বলল।
“আনা উহিব্বুকি।”

ইশাত বিস্মিত হয়ে বলল।
— তারমানে ওইদিন অফিসে আপনি সত্যি সত্যি আমাকে এটা বলেছিলেন? আর আমি ভাবলাম আমার মনের ভুল ছিল সেটা।

আরিয়ান তখন প্রোজ্জ্বল হেসে বলল।
— তখন শুনলে কিই বা লাভ হতো? উত্তর কি দিতে পারতে? কিন্তু এখন তো পারবে।

ইশাত পুলকিত হয়ে বুকেটা হাতে নিয়ে চোখে অনুভূতিসহ উত্তরে বলল।
— আনা আয়দান উহিব্বুকা।

আরিয়ান উঠে দাঁড়িয়ে তার দুহাত মেলে ধরলো ইশাতের জন্য। ইশাত তড়িৎ গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলো। আরিয়ান তখন তার মাথায় আলতো করে চুমু খেয়ে বলল।
— কাল তোমার পরিবারকে আমাদের বাসায় দাওয়াত দাও।

আরিয়ানের কথা শুনে ইশাত আশ্চর্য হয়ে মাথা তুলে তাকাতেই আরিয়ান তার কোমল গালে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল।
— পরিবারকে রেখে এসে নিশ্চই তোমার মন খারাপ? তাদের সাথে দেখা হলে, কথা হলে তোমার ভালো লাগবে। যাও বাজারের জন্য যা যা প্রয়োজন হয় লিস্ট করে দাও। আমি সবকিছু ফ্রেশ আনিয়ে দিচ্ছি।

কথাগুলো শুনে ইশাতের চোখ দুটো মুহূর্তেই উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। আরিয়ান ঠিক ইমরানের মতো করেই তার ভালো মন্দের খেয়াল রাখছে, তার মুখ দেখেই সব প্রয়োজ বুঝে ফেলছে। নিশ্চয়ই তার ভাগ্য অনেক ভালো, নাহয় একসাথেই এমন যত্নশীল ভাই আর হাজবেন্ড পাওয়া বিশাল ভাগ্যের ব্যাপার।

চলবে ( ইনশাআল্লাহ )……………..