#ক্লান্তিহীন_তুই_আমার_ফরিয়াদ
#পর্বঃ৪৩
#সুমাইয়া_জান্নাত_ইলমা
ডুপ্লেক্স বাড়িটার প্রবেশদ্বার থেকে শুরু করে মূল কাঠামো পর্যন্ত বিছিয়ে আছে মখমলের মতো নরম সবুজ ঘাস। লনের মাঝে বিশাল সেগুন গাছটার ছায়া তলে বেতের আরামদায়ক চেয়ার টেবিল পেতে রাখা। তার চারপাশে আর হাঁটার রাস্তার দুইধারে ফুটে আছে নানান রকমের মরসুমি ফুল। গাছের ফাঁক গলিয়ে সোনালী রোদ উকি দিচ্ছে। ফুলগুলো সেই রোদের আলো আর বাতাসের তালে ঝলমল করছে আর দুলছে। ফুলগুলোর মধ্যে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন রঙের গোলাপ, গাঁদা, সূর্যমুখী, টিউলিপ, অর্কিড, ল্যাভেন্ডার, ডালিয়াসহ দেশি বিদেশি হরেক রকমের ফুল। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে সেই ফুলের মিষ্টি সুবাস।
বাগানের মাঝখান দিয়ে যে কৃত্রিম জলাশয়টা রয়েছে, তার চারপাশে এঁকেবেঁকে চলে গেছে প্রাকৃতিক পাথর আর পেভার ব্লক। জলাশয়ের একপাশে আবার রয়েছে একটি কৃত্রিম ঝরনা, ঝর্ণার পাশ দিয়েই রঙিন মাছেরা খেলা করছে। সেখান থেকে পানির কলতান ভেসে আসছে। সঙ্গে পাতার মর্মর ধ্বনি, পাখির কিচিরমিচির আওয়াজ মিলেমিশে অন্যরকম একটি প্রাণসঞ্জীবিত করার মতো পরিবেশ তৈরি হয়েছে। চারপাশের ঘন গাছপালা আর খোলা জায়গা থাকার কারণে এখানকার বাতাসটাও কয়েকগুণ বেশি বিশুদ্ধ আর শীতল মনে হচ্ছে। এক কথায় শান্ত, স্নিগ্ধ এবং শরীরের প্রতিটি ইন্দ্রিয়কে সতেজ করে তোলার মতো।
আরিয়ান রুমের ব্যালকনিতে দাড়িয়ে লনের দিকে দৃষ্টি স্থির করে ইশাতের হাতে তৈরি কফির স্বাদ নিচ্ছিল। এমন সময় তার বাড়ির ভেতরে একটা কালো চকচকে গাড়ি ঢুকতে দেখা গেলো। গাড়িটা মূলত তারই। গাড়িটা ভেতরে প্রবেশ করে থামার সঙ্গে সঙ্গে গার্ডরা ছুটে গিয়ে গাড়ির দরজা মেলে ধরলো। তখন ভেতর থেকে প্রথমে আসিয়া বেগম আর ইমরান বেরিয়ে এলো, তাদের পরে সানজিদা কোলে আহনাফ সমেত বেরিয়ে এলো। আরিয়ান নিজেই তার ব্যক্তিগত গাড়ি পাঠিয়েছিল ইশাতের পরিবারকে নিয়ে আসার জন্যে। উপরে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে তাদেরকে দেখা মাত্র তাদের দরজা থেকে এগিয়ে নিয়ে আসতে নিচে চলে গেল আরিয়ান।
আসিয়া বেগম এই প্রথমবারের মতো মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে পা রাখা মাত্র চমকপ্রদ হলেন। এতো সুন্দর বাড়ি তিনি এর আগে কোথাও দেখেন নি। মনে হচ্ছে যেন স্বপ্নপুরীতে এসে পড়েছেন তিনি। মেয়ের সৌভাগ্যের কথা চিন্তা হতেই প্রশান্তিতে তার মুখ উজ্জ্বল হলো। ইমরান গাড়ি থেকে মিষ্টির বক্সগুলো নামিয়ে সবাইকে নিয়ে ভেতরে যাবে এমন সময় সে দেখলো আরিয়ান তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। সে এসেই আগে আন্তরিকতা নিয়ে ইমরানের সাথে কুশল বিনিময় করলো। এরপর আসিয়া বেগমের দিকে ফিরে তাকে সালাম জানালো। আসিয়া বেগম এই প্রথম সামনাসামনি মেয়ের জামাইকে দেখলেন। বিয়ের সময় নিজের ছেলের সিদ্ধান্তের উপর ভরসা রেখে তার আর মেয়ের জামাইকে দেখা হয় নি। কিন্তু এখন দেখা মাত্র মনে হচ্ছে তিনি ছেলের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়ে কোনো ভুল করেন নি। তিনি মনে মনে আরিয়ানকে দেখে বারাকাল্লাহু খায়র বললেন। আসিয়া বেগম মুখে সালামের উত্তর নিয়ে এগিয়ে গিয়ে আরিয়ানের মাথায় মমতার হাত বুলিয়ে দিয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করলেন।
— কেমন আছো বাবা?
হঠাৎ আসিয়া বেগমের মুখে বাবা ডাক শুনে আরিয়ানের হৃদয়ে উষ্ণতা অনুভব হলো। মায়ের পর এই প্রথম তাকে কেউ এইভেবে বাবা বলে ডাকলো। আরিয়ান তখন ভদ্রতাসূচক জবাবে বলল।
— জ্বী আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি, আপনি কেমন আছেন?
আসিয়া বেগম চোখে সহানুভূতি নিয়ে বললেন।
— আলহামদুলিল্লাহ, বাবা আমিও ভালো আছি। ইমরান বলেছিল তুমি ছোট বয়সে বাবা মা আর পরিবার হারিয়েছো। তোমার জন্য নিশ্চই সময়টা অনেক কঠিন ছিল? কিন্তু এখন তো আমরা এসে পড়েছি। এখন থেকে আমাদেরকে নিজের পরিবারই ভাববে। আর আমি তো শুধুই তোমার শাশুড়ি নই বরং তোমার মায়ের মতন। জানি বাবা, তোমার মায়ের জায়গা নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না। তবুও এখন থেকে ইশাত, সানজিদা আর ইমরানের মতো তুমিও আমাকে আম্মু বলেই ডাকবে কেমন?
আরিয়ান ঠোঁটের মুচকি হাসি নিয়ে নিঃশব্দে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়ে তাদের ভেতরে নিয়ে গেল। ইশাত তার রুমে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে মাথার চুল আঁচড়াচ্ছিল, এমন সময় নিচের থেকে ইমরানের ডাক পড়লো।
“আমার ইশু কোথায়?”
ভাইয়ের গলার আওয়াজ পেতেই ইশাত হাতের কাজ রেখে নিচে ছুটে যেতেই দেখলো, তার পুরো পরিবার তাদের বাড়িতে উপস্থিত। ইমরান হাসি মুখে বোনের দিকে তার দুহাত বাড়িয়ে দাড়িয়ে আছে। ইশাতের খুশি আর দেখে কে। সে ছুটে গিয়ে ভাইকে জড়িয়ে ধরলো। ইমরান বোনের মাথায় অদূরে হাত বুলিয়ে দিল। ভাইয়ের সাথে ভাব বিনিময় করে ইশাত বাকিদের সালাম জানিয়ে এক এক করে জড়িয়ে ধরলো। ইমরান তার হাতের মিষ্টির বক্সগুলো বোনের হাতে ধরিয়ে দিলো। ইশাত সেগুলো একপাশে রেখে খেয়াল করলো আরিয়ানের কোলে আহনাফ মুখ ফুলিয়ে ঘাপটি মেরে আছে।
ছেলেটা ফুপার কোলে উঠে ইশাতকে এক রত্তিও পাত্তাই দিচ্ছে না। এমন সময় ইশাত কাছে গিয়ে ছেলেটার অভিমান ভাঙাতে তাকে অনবরত সুড়সুড়ি দিতে লাগলো। ছোট অহনাফ সুড়সুড়ি সহ্য করতে না পেরে খিলখিলিয়ে হেসেই ফেলল। ইশাত তখন হাত বাড়িয়ে তাকে আরিয়ানের কোল থেকে নিজের কোলে নিয়ে নিলো। আহনাফ তখন ইশাতের কোলে উঠে তাকে হাতের চকলেট দেখিয়ে অনর্গল বলে গেলো।
— আম্মু বলেছে এই সুন্দর দেখতে আঙ্কেলটা আমার ফুপ্পা হয়, আমার না এই ফুপ্পাকে অনেক ভালো লেগেছে। দেখো ফুপ্পা আমাকে চকলেটও দিয়েছেন। ফুপ্পা অনেক ভালো। একদম তোমার মতো।
ইশাত তার ছোট নাক টেনে দিয়ে বলল।
— তাই?
আহনাফ তখন হুট করে সবার সামনে ইশাতকে অপ্রত্যাশিত প্রশ্ন করে বসলো।
— কিন্তু তুমি কি এখন থেকে ফুপ্পার সাথেই এখানে থাকবে? ফুপ্পাকে পেয়ে আমাকে ভুলে যাবে না তো? ফুপ্পা কি তোমাকে আমার থেকেও বেশি আদর করে? নাহলে তুমি আমাকে রেখে ফুপ্পার কাছে চলে এলে কেন? তুমি কি এখন আমার মতো করে ফুপ্পাকেও রাতে ঘুম পাড়িয়ে দাও? তুমি কি ফুপ্পাকে অনেক বেশি ভালোবাসো?
সবার সামনে আহনাফের করা এমন অপ্রত্যাশিত প্রশ্নে ইশাত স্তব্ধ হয়ে গেলো। সানজিদা ছেলেকে চুপ করিয়ে নিজের কোলে নিয়ে নিলো। আরিয়ানের চোখে তখন কৌতূহল কাজ করলো ইশাতের উত্তর শোনার জন্য কিন্তু তাকে হতাশ করে দিয়ে ইশাত আহনাফের প্রশ্ন এড়িয়ে আরিয়ানকে বলল সবাইকে লিভিংরুমে নিয়ে বসাতে।
বউয়ের হুকুম মেনে আরিয়ানও সবাইকে লিভিংরুমে নিয়ে বসালো। ইশাত গিয়ে ডাইনিংয়ে খাবার এনে সাজাচ্ছে। তার খাবার সাজানো শেষ হলে সে সবাইকে সেখানে ডাকলো। সবাই গিয়ে বসতেই আরিয়ান ইশাতকেও জোর করে সবার সাথে বসিয়ে দিয়ে, নিজেই সবাইকে খাবার বেড়ে দিতে লাগলো। আসিয়া বেগম তখন আরিয়ানকে বাধা দিয়ে বললেন।
— তুমি এসব কাজ কেন করছো বাবা? ইশাতকে করতে দাও।
আরিয়ান তখন আপত্তি করে বলল।
— ইশাত যদি একা এতো কষ্ট করে রান্না করতে পারে, তাহলে আমি সামান্য বেড়ে দিয়ে ওকে সাহায্য করলে আহামরি কি আর যায় আম্মু?
আসিয়া বেগম ইশাতের প্রতি আরিয়ানের দায়িত্ববোধ দেখে আপ্লুত হলেন। তখন ইশাত মাঝ দিয়ে অসন্তুষ্ট গলায় বলল।
— এমনটা কেন বলছেন? আমি তো একা এসব রান্না করি নি। আম্মু জানো, উনি সকাল থেকে আমাকে প্রত্যেকটা কাজে সাহায্য করেছেন।
আসিয়া বেগম তাদের দুজনের কথা শুনে মুখে হাসি ফুটিয়ে বললেন।
— আমার মেয়ের জামাইটা তো দেখছি অনেক যত্নশীল বারাকাল্লাহু খায়র। তোমাদের দেখে আমার চোখ দুটো প্রশান্ত হয়ে যাচ্ছে। আল্লাহ তোমাদের সম্পর্কে তার বিশেষ রহমত বর্ষিত করুক।
ইশাত তার কথায় সহমত হয়ে বলল।
— আমিন।
খাবার বেড়ে দেওয়া শেষ হলে আরিয়ানও ইশাতের পাশে এসে বসলো। আসিয়া বেগম যখন খাবার মুখে তুললেন তখন তিনি অবাক হয়ে বললেন।
— খাবারের স্বাদ তো অসাধারণ হয়েছে।
ইমরানও সহমত হয়ে বলল।
— ইশাত বলল না আরিয়ানও ওকে সাহায্য করেছে। আর রান্নায় দুজনের হাত একত্রে ছিল বলে খাবারের স্বাদ দ্বিগুণ বেড়েছে।
আরিয়ান তখন মুচকি হেসে বলল।
— আমাদের নবীজি (সা.) ঘরে তাঁর স্ত্রীদের গৃহস্থালির কাজে সাহায্য করতেন। হযরত আসওয়াদ (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, “নবীজি (সা.) ঘরে থাকা অবস্থায় কী করতেন?”
হযরত আয়েশা (রা.)-এর উত্তর: “তিনি ঘরের মানুষদের কাজে সহযোগিতা করতেন (অর্থাৎ পরিবারের খিদমতে নিয়োজিত থাকতেন)। আর যখন নামাজের সময় হতো, তখন তিনি নামাজের জন্য বের হয়ে যেতেন।” (সহীহ বুখারী, হাদিস: ৬৭৬)
ইশাত মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আরিয়ানের মুখে বলা হাদিস শুনছিল। তখন সানজিদা বলে উঠলো।
— এখন তো এমন পুরুষ কমই পাওয়া যায়, যে ঘরের কাজে স্ত্রীকে সাহায্য করে। স্ত্রীর প্রতি যত্নশীল হয়। ইশাত অনেক ভাগ্যবতী বলতেই হয়।
ইমরান তখন উদগ্রীব হয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করে বলল।
— আমি তোমার কাছে কেমন?
সানজিদা প্রোজ্জ্বল হেসে উত্তরে বলল।
— আপনিও সেরা।
সবাই তখন একত্রে হেসে ফেলল। সবার খাওয়ার মাঝে আরিয়ান যখন চামচ দিয়ে মুখে খাবার তুলল, সেটা দেখে আসিয়া বেগম বলে উঠলেন।
— তুমি চামচ দিয়ে কেন খাচ্ছো বাবা?
ইশাত তখন আরিয়ানের হয়ে উত্তর দিলো।
— আম্মু উনার হাত দিয়ে খাওয়ার অভ্যাস নেই। কখনো খায় নি হাত দিয়ে।
ইমরান তখন আসিয়া বেগমকে বলল।
— তোমাকে বলেছিলাম না? আরিয়ান যে আমেরিকায় বড় হয়েছে, তাই হয়তো ওর অভ্যাস নেই।
আসিয়া বেগম বোঝার ভঙ্গিতে মাথা দুলিয়ে আরিয়ানের উদ্দেশ্যে বললেন।
— তাহলে আজ আমি তোমাকে হাতে মেখে খাইয়ে দেই। হাতে মেখে খাওয়ার স্বাদ কিন্তু চামচে পাওয়া যায় না।
আসিয়া বেগমের অভিব্যক্তি শুনে আরিয়ান অবাক হলো। মায়ের মৃ’ত্যুর পর কেউ তাকে কোনোদিন মুখে তুলে খাইয়ে দেয় নি। সে দিনের পর দিন খেয়ে না খেয়ে থাকলেও কেউ খোঁজ পর্যন্ত করে নি। আরিয়ানের এমন নিস্তব্ধতা দেখে ইশাত ভাবলো আরিয়ান হয়তো চাচ্ছে না খেতে। তাই সে আগ বাড়িয়ে মাকে মানা করতে যাবে এমন সময় আরিয়ান নিজের চেয়ার ছেড়ে আসিয়া বেগমের পাশের চেয়ার টেনে বসলো। আসিয়া বেগমও মায়ের মমতা নিয়ে তাকে খাবার মেখে খাইয়ে দিতে লাগলেন। অনেক বছর পর আরিয়ানের মনে হলো যেন সে মায়ের ভালোবাসা ফিরে পেয়েছে। ইশাত দুচোখ ভরে সেই দৃশ্যটুকু দেখতে লাগলো।
—————-
বিকেলে আরিয়ান আর ইমরান নীরবে লনে বসে কথা বলছে। কথায় কথায় ইমরান তখন মজার ছলে বলে উঠলো।
— বাজিমাতটা তাহলে আপনিই করলেন মিস্টার এভিয়ান জাড়িয়াথ ওরফে আরিয়ান জারিয়াত!
আরিয়ান এক ব্রু উঁচিয়ে তাকে প্রশ্ন করলো।
— কিসের বাজি?
ইমরান তাকে মনে করিয়ে দিতে বলল।
— আপনার আর আমার মাঝে যে হার জিতের দ্বন্দ্ব ছিল সেটার কথা বলছি।
ইমরানের কথা অগম্য ঠেকতেই আরিয়ান আবারো প্রশ্ন করলো।
— কিন্তু আমি কীভাবে জিতলাম? আমি তো আমার সকল অ’বৈধ ব্যবসা অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছি। সেই হিসেবে তো আপনি জিতেছেন।
ইমরান তখন চোখে অসহায়ত্ব নিয়ে বলল।
— নাহ, আসল জিত তো আপনার হয়েছে, আমার বোনকে পেয়ে। আমার বোন আমার জীবনে অনেক মূল্যবান একজন। আপনি তাকে জিতে পুরো বাজি জিতে নিয়েছেন।
আরিয়ান তার অসহায়ত্ব বুঝে তার কাঁধে হাত রেখে ভরসা দিয়ে বলল।
— চিন্তা করবেন না সে এখন আমার আমানত, আমার দায়িত্ব। আমি ওকে আমার সবটা দিয়ে ভালো রাখবো ইনশাআল্লাহ। ওকে যখনি আপনার দেখার ইচ্ছে হয় বিনা দ্বিধায় চলে আসবেন।
ইমরান সন্তুষ্টি নিয়ে সম্মতিসূচক মাথা দোলালো। তাদের আলাপের মাঝে সহসা ইমরানের ফোনে একটা আর্জেন্ট কল এলো। সে ফোনে কথা সেরে তাড়াহুড়োর মধ্যে উঠে দাঁড়িয়ে আরিয়ানকে বলে ইশাতের সাথে দেখা করে বের হবে, এমন সময় ইশাত প্রত্যেকের হাতে ব্যাগ ধরিয়ে দিয়ে বলল আরিয়ান তাদের জন্য খুব সখ করে এসব জামাকাপড় নিয়েছে। আসিয়া বেগম তখন আপত্তি করে বললেন।
— বিয়ের পর জামাইকে তো আমরা কিছুই দিতে পারি নি। যেখানে আমাদের দেওয়ার কথা সেখানে উল্টো জামাই আমাদের এটা ওটা দিচ্ছে। বিষয়টা কেমন দেখায়?
তখন আরিয়ান প্রশস্ত হেসে বলল।
— আমাকে আপনারা সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটাই দিয়ে দিয়েছেন, যেটা আমার সবচেয়ে বেশি দরকার ছিল। এখানে আমার আর কি চাওয়া থাকতে পারে? আপনি তো বললেনই এখন থেকে আপনারা আমার পরিবার, আর আমি আপনার ছেলে। তাই আমাকে নিয়ে কোন অহেতুক ফরমালিটিসে দরকার নেই।
আরিয়ানের কথায় আসিয়া বেগমের অন্তর জুড়িয়ে গেল। তিনি তাদের দুজনকে আবারো মন ভরে দোয়া করে দিলেন। ইমরান আরিয়ানের সাথে কুশল বিনিময় করে পরিবার সমেত রওনা দিলো। আরিয়ানও তাদের এগিয়ে দিতে গেলো।
কিছুক্ষণ পর আরিয়ান বাড়িতে ফেরত এসে দেখলো ইশাত লনের মাঝে পাতা চেয়ারে না বসে উল্টো মাটিতে বিছিয়ে থাকা পরিষ্কার ঘাসের উপর হাঁটু গেড়ে বসে আছে। সে ভাবলো হয়তো সবাই চলে যাওয়াতে ইশাতের মন খারাপ। সেই ভেবে সেও বিনাবাক্যে তার পাশে গিয়ে বসে পড়লো। কিন্তু আরিয়ানকে অবাক করে দিয়ে ইশাত ঘাসের মাঝে প্রস্ফুটিত ছোট ছোট হলুদ সাদা মিশ্রণে ফুলগুলো এক এক করে হাতে তুলে আরিয়ানের মসৃণ চুলের খাঁজে গেঁথে দিতে লাগলো। আরিয়ান ইশাতের এমন কাণ্ডে হতভম্ব হলো। পরক্ষণে সে ইশাতের হাতের কব্জি ধরে তাকে থামিয়ে জিজ্ঞাসা করলো।
— এটা কি করছো?
ইশাত তখন প্রোজ্জ্বল হেসে উত্তর দিলো।
— আমি পিন্টারেস্টে দেখেছিলাম ওয়াইফরা তাদের হাজবেন্ডের মাথায় এভাবে ফুল গেঁথে দেয়। আমারও ইচ্ছা ছিল বিয়ের পর আমিও আমার ব্যক্তিগত পুরুষের মাথায় এভাবে ফুল গেঁথে দিব। আজ লনের ফুলগুলো চোখে পড়তেই সেই ইচ্ছের কথা মনে পড়ে গেলো। দেখুন কি সুন্দর লাগছে এগুলো আপনার মাথায়! প্লীজ ঝেড়ে ফেলে দিবেন না!
আরিয়ান ইশাতের এমন বাচ্চামুতে হেসেই ফেললো। পরমুহুর্তে সে ইশাতের দিকে নিজের মাথা পেতে দিয়ে বলল।
— ডু হোয়াটএভার ইউ ওয়ান্ট, আম অল ইওরস।
আরিয়ানের অনুমতি পেতেই ইশাত প্রফুল্ল হেসে আবারো নিজ কাজে অবিচল হলো। উদগ্রীব ভঙ্গিতে ফুল ছিঁড়ে মাথায় সাজাতে ব্যস্ত ইশাতকে আরিয়ান এমনভাবে মুগ্ধ চোখে অবলোকন করতে লাগলো, যেন তার পুরো পৃথিবীর সমস্ত সুখ তার এই হৃদয়হরণীর মাঝেই আবদ্ধ।
চলবে ( ইনশাআল্লাহ )……………….
#ক্লান্তিহীন_তুই_আমার_ফরিয়াদ
#পর্বঃ৪৪
#সুমাইয়া_জান্নাত_ইলমা
সন্ধ্যায় মাগরিবের নামাজ পড়েই ইশাত ক্লোজেট থেকে কাপড় নামাতে শুরু করলো, লাগেজ প্যাকিং করার জন্য। কারণ আর কিছুক্ষণ পরেই তারা খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিবে। আরিয়ান মসজিদ থেকে ফিরে রুমে এসে দেখলো ইশাত লাগেজ বের করছে। ইশাত তাকে দেখা মাত্র ব্যস্ত ভঙ্গিতে কাপড় ভাজ করতে করতে বলল।
— আপনি কোন শার্ট প্যান্টগুলো নিবেন? আমাকে দেখিয়ে দিন আমি গুছিয়ে নিচ্ছি।
আরিয়ান ড্রেসিং টেবিলের কাছে গিয়ে চুল ব্রাশ করতে করতে বলল।
— তুমি নিজের পছন্দ মতো নিয়ে নাও।
ইশাত হাতের কাজ থামিয়ে বলল।
— আমার পছন্দ মতো?
আরিয়ান ঘাড় ঘুরিয়ে ইশাতের দিকে তাকিয়ে বলল।
— হুম, এতো ভাবার কি আছে তুমি যে রঙে আমাকে দেখতে পছন্দ করবে সেগুলোই নিয়ে নাও।
ইশাত মুচকি হেসে বলল।
— আপনি কি আমার পছন্দ মতো পড়বেন?
আরিয়ান তখন কাছে এসে তাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলল।
— আমার বউ আমাকে যেভাবে দেখতে চায় এখন থেকে আমি সেভাবেই ড্রেসআপ করব। তার পছন্দের গুরুত্ব আমার কাছে অনেক।
— একটা কথা বলি?
— হাজারটা বলো।
ইশাত চোখে গভীরতা টেনে বলল।
— তুমি যেটাই পরো না কেন, তোমাকে আমার সেটাতেই ভালো লাগে। তুমি তো মানুষটাই আমার অনেক প্রিয়।
ইশাতের মুখে তুমি ডাক শুনে আরিয়ান তাজ্জব বনে গেলো। পরক্ষণে সে ইশাতকে নিজের দিকে ফিরিয়ে বিস্ফোরিত নয়নে বলল।
— তুমি কি এইমাত্র আমাকে তুমি করে বললে?
ইশাত লজ্জায় নজর ঝুঁকিয়ে সম্মতিসূচক মাথা নাড়লো। আরিয়ান তখন নিজের বুকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল।
— তোমার এই ডাকটা আমার ঠিক এইখানটায় গিয়ে বিধলো। এখন থেকে এভাবে তুমি করেই ডাকবে।
ইশাত অসম্মতি করলো।
— উহু।
ইশাতের অসম্মতিতে আরিয়ান প্রশ্নবোধক চোখে তাকাতেই ইশাত বলল।
— যেহেতু আমি আপনাকে তুমি বললে আপনি এতটা পছন্দ করেন, তাহলে এই ডাকটা আমি আমাদের বিশেষ মুহূর্তগুলোর জন্য তুলে রাখতে চাই। রোজ রোজ তুমি ডাকলে কি আর এই একই অনুভূতি পাবেন?
আরিয়ান তুষ্ট হেসে ইশাতের নাকের সাথে নিজের নাক ঘষে বলল।
— আপনি যেমনটা ঠিক মনে করেন মেডাম।
ইশাত তখন আরিয়ানের কথায় নিজের পছন্দমতো জামাকাপড় নিয়ে লাগেজে ভরে রাখলো। সময়টা অক্টোবরের দিকে হওয়াতে সাজেকে ভীষণ শীত পড়তে পারে বিধায় ইশাত শীতের কাপড়ও সাথে নিয়ে নিলো। আরিয়ান ক্লোজেট থেকে পাওয়ার ব্যাংক, সানগ্লাস, আর কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস ইশাতকে এগিয়ে দিলো। ইশাত সেগুলোও লাগেজে নিয়ে নিলো। সবকিছু গোছানো হলে ইশাত কালো অবায়া, হিজাব, নিকাব আর সাদা কেডস পড়ে তৈরি হলো। আরিয়ানও ইশাতের অবায়ার রঙের সাথে মিলিয়ে কালো হুডি, কালো ব্যাগি জিন্স প্যান্ট আর সাদা কেডস পড়ে নিলো। ইশাত পুরোপুরিভাবে তৈরি হতেই আরিয়ান তাকে নিয়ে বের হলো।
ট্রাভেল এজেন্সি থেকে তাদের এসি বাস প্রোভাইড করা হলো খাগড়াছড়ি পর্যন্ত। বাসে উঠে ইশাতকে আরিয়ান জানালার কাছের সিটে বসালো। ইশাত তখন হেসে আরিয়ানকে বলল।
— আমি যে বাসে জানালার কাছের সিট ছাড়া বসতে পারি না, এটা বুঝলেন কি করে?
আরিয়ান পকেট থেকে ফোন বের করতে করতে বলল।
— সেদিন পিকনিকে জেরিনকে বলেছিলে তুমি।
ইশাত কৌতুহলী আবার প্রশ্ন করলো।
— আপনি খেয়াল করেছিলেন সেটা?
আরিয়ান এবার চোখ তুলে ইশাতের দিকে গভীর দৃষ্টি নিয়ে বলল।
— তোমার প্রত্যেকটা বিষয় আমি গভীরভাবে খেয়াল করি, আমার হোয়াইট মুন।
ইশাত তখন আবেগে, পরম আবেশে আরিয়ানের কাঁধে মাথা রাখলো। আরিয়ানও নিজের কাঁধ ভালো ভাবে এগিয়ে দিলো। আরিয়ানের কাঁধে মাথা রেখে চলতি বাসের জানালার বাহিরে উজ্জ্বল চাদের আলোতে রাতের দৃশ্য দেখতে দেখতে মুহূর্তটা ইশাতের কাছে স্বপ্নের মতো ঠেকলো। কয়েক ঘণ্টা পর মাঝ পথে বিরতির জন্য বাস থামলে আরিয়ান ইশাতকে নিয়ে একটা জায়গা ব্যবস্থা করে ইশার নামাজ পড়ে নিলো।
সাময়িক বিরতি শেষে আবারও বাস ছাড়লো গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। এবার সেই বাস থামলো একেবারে খাগড়াছড়িতে গিয়ে। তখন প্রায় রাত তিনটার উপরে বেজে গেছে, একটুপর ফজরের ওয়াক্ত হলে আরিয়ান আগে আগেই বাস থেকে নেমে কাছের একটা মসজিদে গিয়ে ইশাতকে নিয়ে ফজরের নামাজ পড়ে নিলো। নামাজ শেষ করে আরিয়ান এবার সাজেকে যাওয়ার উদ্দেশ্যে চাদের গাড়ি নামক জিপ রিজার্ভ করে ইশাতকে নিয়ে উঠলো। তখন বাহিরে প্রচুর ঠান্ডা বাতাস বইছে। আশপাশটা কুয়াশা আর মেঘে ঘিরে আছে। মনে হচ্ছে যেন গাড়ির জানালা দিয়ে মেঘ ছুঁয়ে যাবে। খাগড়াছড়ি থেকে সাজেক যাওয়ার পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা। রাস্তায় যাওয়ার পথে সামনে পড়লো হাজাছড়া ঝর্ণা। ইশাতের ইচ্ছায় আরিয়ান সেখানে গাড়ি থামালো।
আরিয়ানের হাত ধরে ঝর্ণার কাছে বসলো ইশাত। আরিয়ান তখন তার চোখের ভাষা বুঝে আশ্বাস দিয়ে বলল।
— তুমি চাইলে ঝর্ণার পানিতে পা ভিজিয়ে রাখতে পারো।
— কিন্তু কেউ যদি এসে পড়ে?
— কেউ আসবে না আমি আছি তো।
আরিয়ানের আশ্বাসে ইশাত জুতা খুলে ঝর্ণার শীতল পানিতে পা ভেজালো। এমন সময় ঝর্ণার পানির ছিটা এসে দুজনেই ভিজে গেল। ইশাত তখন দুষ্টামি করে আরিয়ানের দিকে পানি ছুড়ে দিল। আরিয়ান মেকি রাগ দেখিয়ে পানি ঝাড়তে ঝাড়তে বলল।
— হোয়াইট মুন, এটা তুমি কি করলে?
ইশাত কিছু না বলে আরিয়ানের হাত থেকে পালাতে হাসতে হাসতে উঠে দৌড় দিলো। আরিয়ানও তার পিছু নিয়ে বলল।
— পালাও পালাও, যাবেই বা কোথায়? ধরতে পারলে বুঝবা।
নিজেদের মধ্যে হাসি, আনন্দ আর খুনসুটির পর তারা আবারো গাড়িতে উঠে বসলো। কিন্তু গাড়িতে বসা মাত্রই আরিয়ান খেয়াল করলো ইশাত শীতে কুঁকড়ে যাচ্ছে। তবে মেয়েটা মুখে কিছুই বলছে না। আরিয়ান তখন সঙ্গে সঙ্গে লাগেজ থেকে একটা শাল বের করে ইশাতের শরীরের উপর সেটা দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলো। যেন ঠান্ডা বাতাস এসে ইশাতের গায়ে না লাগে। আরিয়ানের জড়িয়ে ধরাতে ইশাত বাচ্চাদের মতো করে আরিয়ানের বুকে ঘাপটি মে’রে রইলো।
কিছুক্ষণের মধ্যে আরিয়ানের শরীরের উষ্ণতায় ইশাতের শীত কমে আসতেই তার আরাম অনুভব হতে শুরু করলো। স্বাচ্ছন্দে ইশাত কখন যে আরিয়ানের বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লো সেই খেয়ালটুকুও তার ছিল না। অন্যদিকে আরিয়ান সারা রাত জেগে ইশাতের খেয়াল রেখেছে যেন ইশাতের ঠান্ডা না লাগে, অথবা কোনোভাবে তার ঘুমের ব্যাঘাত না ঘটে।
————————-
ভোর ৫টায় এলার্ম ছাড়াই ঘুম ভাঙল ইশাতের। চোখ খুলতেই সে লক্ষ্য করলো একটা বাঁশের তৈরি অচেনা কটেজে একা বিছানায় শুয়ে আছে সে। তার কাল রাতের পড়নে আবায়াটার বদলে শরীরে এঁটে আছে একটা নাইট স্যুট। অকস্মাৎ ঘুম থেকে উঠেই আরিয়ানকে কাছে না পেয়ে আতঙ্কে তার বুকটা ধড়ফড় করে উঠলো। তড়িৎ সে বিছানা ছেড়ে উঠে আরিয়ানকে রুমের এদিক ওদিক ঘুঁজতে লাগলো। এমন সময় সে খেয়াল করলো রুমের সঙ্গে অ্যাটাচ ব্যালকনির গ্লাসটা একপাশে খোলা। সেদিকে যাওয়ার আগে সে লাগেজ থেকে হিজাব বের করে পড়ে ব্যালকনিতে পা রাখতেই দেখলো আরিয়ান কাঠের রেলিংয়ের উপর দুহাত ভর করে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে। পড়নে তার কাল রাতের ব্যাগি প্যান্ট আর কালো ট্যাঙ্ক টপ। যেটা স্লিভলেস হওয়ার কারণে আরিয়ানের জিম করা হাতের সুউচ্চ পেশিগুলো দৃশ্যমান হয়ে আছে। ইশাত অবাক হলো এতো শীতের ভেতরেও লোকটা কিভাবে এমন খোলা কাপড়ে দাঁড়িয়ে আছে।
“গুড মর্নিং, হোয়াইট মুন।”
ইশাত এতক্ষন আনমনে আরিয়ানের মাঝে হারিয়ে ছিল। এমন সময় আরিয়ানের ভারী গলার আওয়াজে তার ধেয়ান ভাঙ্গলো। আরিয়ান পেছনে না ফিরেই তাকে কথাটা বলল।এতক্ষন ইশাত যেভাবে আরিয়ানকে অবলোকন করছিল ভাবতেই তার লজ্জা মাথা কাটা গেলো। আরিয়ান হয়তো অনেক আগেই তার উপস্থিতি টের পেয়েছিল। ইশাত তখন এগিয়ে গিয়ে তার সামনাসামনি দাড়িয়ে প্রশ্ন করলো।
— আমরা না জিপে ছিলাম? এখানে কি করে এলাম?
— তুমি অনেক ক্লান্ত ছিলে, ঘুমিয়ে পড়েছিলে। তাই ঘুমের মধ্যেই তোমাকে নিয়ে এসেছি।
ইশাত দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল।
— কি আশ্চর্য দেখুন, আমি এতোটাইগভীর ঘুমে ছিলাম যে কিছুই টের পাই নি। কিন্তু ঘুমের মধ্যে আমাকে এখানে কীভাবে আনলেন?
আরিয়ানের পক্ষ থেকে সোজাসাপ্টা উত্তর এলো।
— কোলে তুলে!
কথাটা শুনে ইশাত চোখ বড় বড় করে বিস্ফোরিত নয়নে তাকিয়ে বলল।
— আস্তাগফিরুল্লাহ, আশেপাশে মানুষ কি মনে করবে? আমাকে ডাকলেই তো পারতেন।
কথাটা যেন আরিয়ান গায়ে মাখলো না। সে বেপরোয়া উত্তরে বলল।
— মানুষের কিছু মনে করাতে আমার কোনোকিছু আসে যায় না। আমি আমার বউকে কোলে তুলেছি। তাছাড়া তখন ডাকলে তোমার ঘুম নষ্ট হতো।
ইশাত অনুশোচনা নিয়ে বলল।
— আর নিজে যে সারারাত আমার জন্য ঘুমান নি?
— আমার প্রয়োজন পড়ে নি।
ইশাত তখন ইতস্ততা নিয়ে কিছু একটা বলতে চাইলো।
— আমার পোশাক…
ইশাতের পুরো কথা শেষ করার আগেই আরিয়ান উত্তর দিলো।
— আমি বদলে দিয়েছি। তোমার কোনো আপত্তি আছে এতে?
ইশাত লজ্জায় চোখ নামিয়ে মাথা নাড়লো। এমন সময় হঠাৎ আরিয়ানের মুখে পরবর্তী অপ্রত্যাশিত কথাটা শুনে ইশাত হতভম্ব হয়ে মুখ তুলে তাকালো। আরিয়ান অপ্রত্যাশিত উত্তরে তার কানের কাছে এসে বলল।
“আপত্তি থাকলেও পরোয়া করতাম না।”
ইশাত স্তম্ভিত হয়ে গেলো। আরিয়ান তার অবস্থা বুঝে তাকে আরো অপ্রস্তুত করতে বাকা হেসে তার কোমর জড়িয়ে নিজের কাছে টেনে নিলো। ইশাত তখন অন্যপাশ মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে আরিয়ানকে বারন করে বলল।
— কি করছেন! আমরা অন্য একজায়গায় আছি, নিজেকে সংযত করুন।
আরিয়ান নির্বিকার উত্তরে বলল।
— যেখানেই থাকি না কেন, বউকে ভালোবাসতে অসংযত হলেও কোনো ক্ষতি নেই।
ইশাত তখন আরিয়ানের বুকে আলতো করে ধাক্কা দিয়ে বলল।
— মিস্টার গোল্ডেন, আপনি কিন্তু ইচ্ছে করে আমাকে লজ্জায় ফেলছেন।
ইশাতের মুখে এই নাম শুনে আরিয়ান এক ব্রু উঁচিয়ে প্রশ্ন করলো।
— মিস্টার গোল্ডেন?
ইশাত প্রোজ্জ্বল হেসে বলল।
— এই নামটা আমি আপনাকে দিয়েছিলাম। যখন প্রথমবার আপনার এই সোনালী চোখে আটকে গিয়েছিলাম। তখন তো আপনার নাম আমার জানা ছিল না, তাই এই নামে আপনাকে মনে করতাম। আপনার জন্য দোয়া করতাম। আল্লাহর কাছে আপনাকে চাইতাম।
আরিয়ান তখন ভাবনায় বিভোর হয়ে বলল।
— ভালোবাসার শুরু বোধহয় চোখ থেকেই হয়।
— হুম, হয়তো।
আরিয়ান ইশাতকে ছেড়ে দূরে সরে বলল।
— তুমি যেটার জন্য এখানে এসেছিলে সেটাই তো খেয়াল করলে না?
ইশাত অবুঝ দৃষ্টি নিয়ে বলল।
— কোনটা?
আরিয়ান চোখের ইশারায় বলল।
— সামনে তাকাও।
আরিয়ানের কথায় ব্যালকনির সামনে তাকাতেই ইশাত দেখলো, পুরো উপত্যকা মেঘে ঢাকা। চারপাশে পাহাড়ের বুক চিরে মেঘেরা উপত্যকায় উড়ে বেড়াচ্ছে। কুয়াশায় সবটা ঘোলাটে হয়ে আছে। মনে হচ্ছে যেন হাত দিতেই মেঘ হাতে চলে আসবে।
ইশাত উজ্জ্বল চোখে সেদিকে হাত বাড়িয়ে আরিয়ানকে বলল।
“এই দেখুন, মেঘ আমার হাতে চলে আসছে।”
কিন্তু আরিয়ানের পক্ষ থেকে কোনো উত্তর এলো না। ইশাত ফিরে তাকাতেই দেখলো আরিয়ান পলকহীন এক দৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। ইশাত তখন হাত বাড়িয়ে আরিয়ানকে নিজের কাছে ডাকলো। সে এক ইশারাতেই চলে এলো। আরিয়ান পেছন থেকে ইশাতকে জড়িয়ে মেঘ ধরতে নিজের হাতের উপর ইশাতের হাত রেখে সামনে এগিয়ে দিলো। সে সুউচ্চ হওয়ার কারণে ইশাতের মাথা তার বুক পর্যন্ত এসে ঠেকলো। তাই আরিয়ান ঘাড় নামিয়ে তার চিবুক আলতো করে ইশাতের মাথার রাখলো। তখন চোখের সামনে এতো সুন্দর আর মুগ্ধ করার মতো দৃশ্য দেখে ইশাতের চোখে উজ্জ্বল তারারা চকচক করতে লাগলো। সে বিড়বিড় করে বলে উঠলো।
— এতসুন্দর দৃশ্য এতক্ষন আমার চোখে পড়ে নি কীভাবে?
আরিয়ান তখন স্মিত হেসে বলল।
— কারণ এতক্ষন তোমার ফোকাস ছিল আমার উপর।
ইশাত ধরা পড়ে গিয়ে কথা পাল্টে দিয়ে বলল।
— কিছুক্ষণের মধ্যেই সূর্যদয় হবে, এই সময় কফি খেতে খেতে সূর্যদয় দেখলে মন্দ হয়না কিন্তু।
আরিয়ান বউয়ের আবদার পূরণ করতে মাথা নেড়ে বলল।
— ওয়েট, আমি নিয়ে আসছি।
আরিয়ান গিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই দুকাপ ধোয়া উঠা গরম কফি এনে ইশাতের সামনে ধরলো। ইশাত কাপটা হাতে নিতেই সামনে তাকিয়ে দেখলো কুয়াশাগুলো ধীরে ধীরে কমে আসছে। অদূর থেকে সূর্য উঁকি দিয়ে উঠতেই সোনালী রোদে চারিপাশ ঝলমল করছে। মুহূর্তেই চারপাশে কমলা রঙের একটা আভা ছড়িয়ে পড়েছে। কুয়াশা সরে গেলে সবুজ পাহাড়গুলো দৃশ্যমান হচ্ছে। আরিয়ান আর ইশাত একসাথে দাড়িয়ে সেই দৃশ্যটুকু উপভোগ করে নিচ্ছে। তাদের মাঝে আর কোনো শব্দের প্রয়োজন হলো না। নিস্তব্ধতায় যেন তারা একে অন্যের অনুভূতি পড়ে নিলো।
চলবে ( ইনশাআল্লাহ )…………….

