#ক্লান্তিহীন_তুই_আমার_ফরিয়াদ
#পর্বঃ৪৫
#সুমাইয়া_জান্নাত_ইলমা
সাজেককে “রাঙামাটির রানী” বলা হয়। কারণ এই ভ্যালি বাংলাদেশের রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলায় অবস্থিত দেশের বৃহত্তম ইউনিয়ন এবং অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি পাহাড়ি পর্যটন কেন্দ্র। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১,৮০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই উপত্যকাটি তার চারপাশের সবুজ পাহাড়, ভাসমান মেঘের মেলা এবং মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য “পাহাড়ের রানী” ও “রাঙ্গামাটির ছাদ” হিসেবেও পরিচিত। সাজেকের সবচেয়ে বড় আকর্ষণই হলো মেঘ। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এটি রাঙ্গামাটি জেলায় হলেও, যাতায়াতের সুবিধার জন্য পর্যটকদের খাগড়াছড়ি জেলা হয়ে সাজেকে প্রবেশ করতে হয়।
সাজেকে কংলাক পাহাড়ের সবচেয়ে উঁচু চূড়া থেকে চারপাশের সবুজ পাহাড়ের অবিচ্ছিন্ন দৃশ্য দেখা যায়। সাজেকে এক দিনে প্রকৃতির তিনটি রূপ দেখা যায়। ভোরবেলা ঘন মেঘ আর কুয়াশা যা দেখলে মনে হয় যেন মেঘের সমুদ্র, দুপুরে কড়া রোদ আর নীল আকাশ, আর বিকেলে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে চমৎকার সূর্যাস্ত। সব মিলিয়ে এখানকার পাহাড়, মেঘ আর সবুজের এক অপরূপ স্বর্গভূমি তৈরি করেছে।
সাজেকের ভেতরের রুইলুই পাড়া মূলত সাজেকের ঐতিহ্যবাহী লুসাই গ্রাম হিসেবেই পরিচিত। এটি সাজেকের সবচেয়ে জনপ্রিয় আর বড় পাড়া। কংলাক যাওয়ার পথ এখান থেকেই শুরু। রুইলুই পাড়ার পাশেই আদিবাসী লুসাইদের গ্রাম। এখানেই বেশিরভাগ রিসোর্ট আর কটেজ রয়েছে। এখানকার রঙিন রঙিন বাঁশের কটেজগুলোর ব্যালকনি থেকে সাজেকের ভালো ভিউ পাওয়া যায়। আরিয়ান আর ইশাতও এখানকার মধ্যে একটি কটেজে উঠেছে।
তখন দুপুর প্রায় ১টা। আরিয়ান আর ইশাত ব্যালকনিতে বসে লাঞ্চ করছে। লাঞ্চে ভিন্ন কিছু ট্রায় করতে মেনুতে তারা ব্যাম্বু চিকেন আর পাহাড়ি সবজি অর্ডার করেছে। আরিয়ান ইশাতের প্লেটে গরম গরম বেম্বো চিকেন সার্ভ করে দিলো। বাঁশের ভেতর থেকে তখনও গরম ধোঁয়া বের হচ্ছে। কিছুটা জুড়িয়ে আসলে তারা বিসমিল্লাহ বলে খাওয়া শুরু করলো। বেম্বো চিকেনে পাহাড়ি কাঁচা মরিচ দেওয়া ছিল। দুকামড় পরেই ইশাতের চোখে পানি চলে এলো। সে আর্তনাদ করে মুখে হাত রেখে বলল।
” আহ! এত ঝাল কেন!”
আরিয়ান সাথে সাথে পানির গ্লাস এগিয়ে দিয়ে হেসে বলল।
— তুমি ঝাল খেতে পারো না? আমি তো শুনেছি মেয়েরা প্রচন্ড ঝাল পছন্দ করে।
ইশাত কয়েক ঢোক পানি পান করে বলল।
— আমি তাহলে ভিন্ন। আমার অন্যান্য মেয়েদের মতো শাড়ি চুড়ি পড়তেও ভালো লাগতো না আগে।
— তাহলে কি এখন লাগে?
ইশাত মুচকি হেসে উত্তর দিলো।
— আগে সাজতাম না কারণ সাজার কোনো প্রয়োজন পড়তো না। কিন্তু বিয়ের পর আপনার মুখে প্রশংসা পাওয়ার পর থেকে মন চায় রোজ রোজ নতুন নতুন রূপে সেজে আপনাকে দেখাই। আর আপনার কাছ থেকে প্রশংসা লুফে নেই।
আরিয়ান তাকে অনুপ্রেরণা দিয়ে বলল।
— তো বারন করেছে কে? আমি তো চাই তুমি সাজো, শুধু আমার জন্য সাজো, বাহিরে তোমার সাজার কোনো প্রয়োজন নেই। তোমাকে নতুন নতুন রূপে দেখার অধিকার শুধু মাত্র আমার। কারণ তুমি আমার ব্যক্তিগত সম্পত্তি।
ইশাত তখন নাটকীয়তা নিয়ে কুর্নিশ করে বলল।
— যথা আজ্ঞা জাহাপনা!
আরিয়ান স্মিত হেসে নিজের প্লেট থেকে চামচ দিয়ে মাংসের পিস তুলে ইশাতের মুখের কাছে ধরে বলল।
— এই নাও, আমারটা খাও। এটা ঝাল কম।
ইশাত আরিয়ানের হাত থেকে খেয়ে দেখলো আসলেই আরিয়ানের প্লেটেরটা ঝাল কম। তখন ইশাত জিজ্ঞাসা করলো।
— আপনিও কি ঝাল খান না?
— তেমন একটা না।
ইশাত মাথা দোলালো। স্বামী স্ত্রী একই প্লেটে খাওয়া প্রিয় নবীর সুন্নত। তাই সেই সুবাদে তারা তাদের ভালোবাসা ভাগাভাগি করতে আলাদা আলাদা প্লেট রেখে একই পেল্টে খাবার খেলো। সারাদিন কটেজে রেস্ট করে আসরের নামাজের পর তারা বিকেলে লুসাই গ্রামে ঘুরতে বের হলো। সেখানকার হাসিখুশি মানুষ, হস্তশিল্পের দোকানসহ সুন্দর সুন্দর জায়গাগুলো ইশাতের মন ছুলো। আরিয়ান দোকান থেকে ইশাতের জন্য বাঁশের চুড়ি কিনে তার হাতে পরিয়ে দিলো। চুড়িগুলো ইশাতের অনেক পছন্দ হলো। সেও একটা কাঠের ঘড়ি পছন্দ করে আরিয়ানকে পরিয়ে দিয়ে বলল।
— এটা আপনার হাতে অনেক মানিয়েছে। এটা পড়ে থাকুন।
তারা এদিক ওদিক ঘুরতে ঘুরতে আর এটা ওটা কেনাকাটা করতে করতে তাদের সন্ধ্যা হয়ে এলো। মাগরিবের আজানের আগ মুহূর্তে আরিয়ান কটেজের দিকে না গিয়ে ইশাতের হাত ধরে কোনো এক জায়গায় নিয়ে যেতে লাগলো। ইশাত তখন তাকে প্রশ্ন করলো।
— কটেজে ফিরব না আমরা? আজান পড়ে যাবে আর কিছুক্ষণের মধ্যে, ফিরে গিয়ে নামাজ পড়তে হবে না?
আরিয়ান তখন তাকে আশ্বস্ত করে বলল।
— হ্যা সময় মতো ফিরে যাবো। আগে একটা জায়গায় তোমাকে নিয়ে যাই।
ইশাত আর কিছু জিজ্ঞাসা করলো না। আরিয়ান সেই কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছাতেই তার হাত ছেড়ে দিলো। রুইলুই পাড়ার একদম কিনারায় দুইটা হেলিপ্যাডের বড় খোলা মাঠ। সন্ধ্যায় আকাশের রঙের পরিবর্তনে পুরো ভ্যালি তখন কমলা রঙ ধারণ করেছে। সামনে থেকে কি সুন্দর সূর্যাস্ত দেখা যাচ্ছে। এখানে বসলে দূরে পাহাড়ি গ্রামের আলোসহ পুরো সাজেক ভ্যালির আলো দেখা যায়। আরিয়ান ইশাতকে নিয়ে সেখানে বসলো। ইশাত অবাক চোখে তাকিয়ে চারিপাশ অবলোকন করলো। আরিয়ান তখন তার চোখে চোখ রেখে প্রতিশ্রুতির সুরে বলল।
— তোমার এই মায়াবী মুখের দিকে তাকিয়ে সারা জীবন অতিবাহিত করে দিতে পারব আমি।
ইশাত আবেগে আরিয়ানের কাঁধে মাথা রেখে বলল।
— আপনি আমার কাছে সোনালী স্বপ্নের মতো। ঘুম থেকে উঠে গেলে এই স্বপন হারিয়ে যাবে না তো?
আরিয়ান ইশাতের মাথায় চুমু খেয়ে বলল।
— নাহ্, একদমই না।
——————————
পরদিন ভোর ৫টায় আরিয়ান আর ইশাত তৈরি হয়ে বেরিয়েছে কংলাক পাহাড় ট্রেকিংয়ের উদ্দেশ্যে। বের হওয়ার পূর্বে আরিয়ান আগে থেকে খেয়াল করে ইশাতকে ভালো একটা কেডস জুতা পরিয়ে নিয়েছে যেন উঁচু নিচু জায়গায় তার হাঁটতে সমস্যা না হয়। কংলাক যাওয়ার পথে স্টোন গার্ডেন নামে ছোট একটা সুন্দর বাগান তাদের সামনে পরে। সেখানে নানা রকম পাথর আর ফুল দিয়ে সাজানো। ছবি তোলার জন্য সুন্দর একটি জায়গা। আরিয়ান ইশাতকে সেখানে নিয়ে গিয়ে সুন্দর সুন্দর ছবি তুলে দিলো। এরপর অন্ধকার থাকতেই তারা আবার রওনা হলো।
তাদের সাথে অভিজ্ঞ গাইড ছিল। তারা একসাথে টর্চ হাতে হাত ধরে উপরে উঠতে শুরু করলো। অন্ধকার থাকতে থাকতেই তাদের উপরে উঠতে হবে, যেন তারা সূর্যোদয় আর মেঘের সমুদ্র একসাথে দেখতে পারে। পথটা অনেক দুর্গম। একটা সময় উপরে উঠতে উঠতে ইশাত হাঁপিয়ে পড়লো। অসতর্কতায় তার জুতার ফিতায় পা আটকে সে একটুর জন্য পড়তে নিলে, আরিয়ান পেছন থেকে তাকে শক্ত করে ধরে বলল।
–পড়ে যাবা না। আমি আছি।
কথাটা বলে আরিয়ান হাঁটু মুড়ে বসে ইশাতের জুতার ফিতা বেঁধে দিলো। ইশাত স্বামীর কাছে এতটা গুরুত্ব পেয়ে নিজের এমন সৌভাগ্যের জন্য মনে মনে আল্লাহকে শুকরিয়া আদায় করলো। ৩০-৪০ মিনিট ট্রেকিং শেষে, দীর্ঘ পথ অতিক্রমের পর অবশেষে চূড়ায় উঠতে সক্ষম হলো তারা। কংলাক পাহাড় সাজেকের সর্বোচ্চ চূড়া। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা প্রায় ১,৮০০ ফুট। উপরে উঠতেই ৩৬০ ডিগ্রি ভিউতে ইশাতের মনে হচ্ছে যেন সে মেঘের উপরে দাঁড়িয়ে আছে। বাতাসে তার পড়নে হিজাবের লম্বা অংশটা উড়ছে। পাহাড় দেখে ইশাত মুগ্ধ হয়ে বলল।
— মাশাআল্লাহ, কত সুন্দর না?
আরিয়ান ফোনে তার ছবি তুলতে গিয়ে বলল।
— হ্যা মাশাআল্লাহ, পাহাড়ের থেকেও তোমাকে বেশি সুন্দর লাগছে।
ইশাত লজ্জা পেয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে বলল।
— আমার মুখ নিকাবে ঢাকা, তাহলে আপনি বুঝলেন কি করে যে পাহাড়ের থেকেও আমাকে বেশি সুন্দর লাগছে?
আরিয়ান মহিমান্বিত দৃষ্টি নিয়ে বলল।
— আমার অন্তরের চোখ আছে না?
ভোরের সূর্য তখন উদয় হতে শুরু করেছে কেবল। অন্ধকার ছাপিয়ে একটু একটু করে ভোরের আলোতে চারিদিক আলোকিত হতে শুরু করেছে। আরিয়ান আর ইশাত দুজন দুজনের হাত ধরে মেঘের উপরে তাদের ভালোবাসা সাক্ষী রেখে গেল।
———————
সকাল ৯টার দিকে তারা রিসোর্টে ফিরে ব্রেকফাস্ট সেরে রেস্ট করলো। কিছুক্ষণ পর দুপুর গড়ালে তারা ফ্রেশ হয়ে নামাজ পড়ে লাঞ্চ শেষে বেরোলো জিরো পয়েন্টের উদ্দেশ্যে। জিরো পয়েন্ট সাজেকের বর্ডার এরিয়া। এখানে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত। ইশাত আরিয়ানের হাত ধরে ওয়াচ টাওয়ারে উঠে আশেপাশের পাহাড় পর্বতের দৃশ্য দেখলো। দূর থেকে পাহাড়গুলো কেমন ছোট ছোট দেখাচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন সবই তার হাতের নাগালে। ইশাত টাওয়ার থেকে নেমে নদীর পানি থেকে সানন্দে পাথর আর শামুক তুলল। আরিয়ান পেছনে দাড়িয়ে থেকে তাকে বিপরীতে কিছুই বলল না, স্বাচ্ছন্দে মুহূর্তগুলো উপভোগ করতে দিলো।
আরেকটু ঘুরাঘুরি করে বিকেল তিনটা নাগাদ তারা রিসোর্টে এসে সাজেকে শেষ সময়টা কাটিয়ে আসরের নামাজের পর, হোটেল চেক ইন শেষ করলো। এরপর খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে ফিরলো। ফেরার পথে ইশাতের মনে হতে লাগলো সাজেকে সুন্দর মুহূর্তগুলো কত দ্রুতই না কেটে গেলো। আরিয়ানের সাথে কাটানো সময়গুলো চোখের পলকেই তার স্মৃতির পাতায় তোলা রয়ে গেলো। এখন থেকে সে আরিয়ানের সাথে তার জীবনের প্রত্যেকটা মুহূর্ত দীর্ঘ সময় নিয়ে কাটিয়ে দিতে চায়।
লম্বা সফর শেষে রাত ১টার দিকে বাসায় ফিরল তারা। দীর্ঘক্ষণ মাথায় হিজাব রাখার কারণে ইশাতের মাথায় প্রচন্ড ব্যথা অনুভব হতে লাগলো। আরিয়ান তখন সব রেখে বাম নিয়ে বসলো ইশাতের কপালে মালিশ করবে বলে। আরিয়ান হাত বাড়ালে ইশাত তার হাত ধরে বলল।
— কি করছেন আপনিও তো এক জায়গা থেকে এসেছেন, আপনিও তো ক্লান্ত, শুয়ে পড়ুন জামাকাপড় বদলে। যেখানে আমার আপনার সেবা করা উচিত সেখানে উল্টো আপনি আমার সেবা করছেন। আমি কিছুই করতে পারছি না আপনার জন্য।
আরিয়ান আপত্তি করে বলল।
— আমার বউয়ের ভালো মন্দ দেখা কি আমার দায়িত্ব না? আর কে বলেছে আমার জন্য তুমি কিছু করো নি? তোমার উসিলায় আমি জীবনে অনেক বড় কিছু অর্জন করেছি, আল্লাহর কাছে হেদায়েত পেয়েছি। এর থেকে উত্তম একটা মানুষের আর কি দেওয়ার থাকতে পারে? আজ আমি যা আছি যেমন আসি সব তোমার উসিলায় হোয়াইট মুন। আমরা একে অন্যের পরিপূরক। ইউ ক্যান্ট ডেনায় ইট।
কথাটা বলে আরিয়ান আঙুলের মাঝে বাম নিয়ে ইশাতকে তার সামনে বসিয়ে তার কপালে আর ঘাড়ে ভালোমতো মালিশ করে দিলো। আস্তে আস্তে ইশাতের মাথা ব্যাথাটাও শিথিল হতে লাগলো। সে আরিয়ানকে থামিয়ে বলল তার এখন আগের থেকে ভালো লাগছে। আরিয়ান তখন উঠে ফ্রেশ হয়ে আসলো। এরপর ইশাতও জামাকাপড় বদলে ঘুমানোর জন্য বিছানা ঝেড়ে নিচ্ছে। আরিয়ান এসে বসে জিজ্ঞাসা করলো।
— ঘুমানোর আগে সূরা মুলক পড়েছিলেন মেডাম?
ইশাত বিছানা ঝাড়তে ঝাড়তে বলল।
— এতক্ষন মাথা ব্যথার জন্য পড়ি নি, এখন পড়বো।
আরিয়ান তখন ওযু থাকা অবস্থায় গিয়ে কুরআন নিয়ে আসলো। ইশাতকে সে শুয়িয়ে দিয়ে বলল।
— তুমি শুয়ে পরো আজ আমি পড়ে শোনাচ্ছি।
ইশাত কৌতুহলী হলো আরিয়ানের গলায় কুরআন তিলাওয়াত শোনার জন্য। সে অধীর আগ্রহ নিয়ে বসলো। আরিয়ান তখন পাশে বসে কুরআন খোলার আগে, আউজুবিল্লাহ বিসমিল্লাহ বলে (সূরা ত্বহা, আয়াত ২৫-২৮) থেকে দোয়াটি পড়ে নিলো।
رَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي وَيَسِّرْ لِي أَمْرِي وَاحْلُلْ عُقْدَةً مِنْ لِسَانِي يَفْقَهُوا قَوْلِي
উচ্চারণ: রব্বিশ-রাহলী ছাদরী, ওয়া ইয়াসসিরলী আমরী, ওয়ালহুল ‘উক্বদাতাম মিলিছানী, ইয়াফক্বহূ ক্বাওলী।
অর্থ: “হে আমার রব! আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দিন, আমার কাজ সহজ করে দিন এবং আমার জিহ্বার জড়তা দূর করে দিন, যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে।”
এরপর সে গুন্নাহ, মদ ও ওয়াকফের নিয়ম অনুসরণ করে সুন্দর মতো কুরআন তিলাওয়াত করতে শুরু করলো। আরিয়ানের গলায় কুরআনের তিলাওয়াত এতোটাই সুমধুর শোনাচ্ছিল যে ইশাতের মনে প্রশান্তি নেমে এলো। সে প্রশান্তির চোখে আরিয়ানকে তিলাওয়াত করতে দেখছে। তার চোখে তখন একা একাই ঘুম চলে এলো। আরিয়ানের তিলাওয়াত কোনো অভিজ্ঞ আলেমের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না। শুনে মনেই হচ্ছে যে সে মনে আল্লাহর প্রতি কতটা গভীর ভালোবাসা নিয়ে কুরআন শিখেছে। কয়েক মিনিট পর তিলাওয়াত শেষ করে কুরআন বন্ধ করতেই আরিয়ান দেখলো ইশাত ঘুমে তলিয়ে গেছে। সে মুচকি হেসে কুরআনটা জায়গা মতো রেখে এসে ইশাতের শরীরের উপর কমফোর্টার টেনে দিলো।
পরদিন সকালে আরিয়ান অফিসে চলে যাওয়ার পর, আদিবা এলো ইশাতের সাথে তার সাজেক টুর নিয়ে গল্প করতে আর তাদের তোলা সুন্দর সুন্দর ছবিগুলো দেখতে। ইশাত তাকে বসিয়ে একেক করে তাদের ছবি দেখাচ্ছিল, এমন সময় আদিবা বত্রিশটা দাঁত বের করে ইশাতকে ক্ষেপাতে বলল।
— কিরে বান্ধবী, তোর তো দেখি মাশাআল্লাহ ভালোই গ্লোআপ হয়েছে। গায়ের রং আগের চেয়েও আরো উজ্জ্বল হয়েছে। তা এই সৌন্দর্যের রহস্য কি ভাইয়ার অফুরন্ত ভালোবাসার প্রভাব নাকি?
ইশাত লজ্জা পেয়ে আদিবাকে চোখ রাঙিয়ে বলল।
— চুপ করবি তুই?
আদিবা ভেংচি কেটে বলল।
— হ্যা, ভালো কথা জিজ্ঞাসা করলে তো এমনই করবি।
ইশাত তার কথায় কান দিলো না। সে আদিবাকে বসিয়ে রেখে রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে বলল।
— বস তুই আজকে এখানেই লাঞ্চ করবি।
আদিবা নাকচ করে বলল।
— না রে দোস্ত বাবুকে শাশুড়ির কাছে রেখে এসেছি।
ইশাত অসন্তুষ্ট গলায় বলল।
— তুই কাজটা একদমই ঠিক করিস নি। বাবুকে নিয়ে এলি না কেন? আমি কবে থেকে ওকে কোলে নেই না।
— একটা কাজে বেড়িয়েছিলাম সেখান থেকেই সোজা তোর সাথে দেখা করতে চলে এলাম। সমস্যা নেই অন্য আরেকদিন নিয়ে আসবো, ইনশাআল্লাহ।
আদিবা কথাটা বলে ইশাতের থেকে বিদায় নিয়ে তাড়াহুড়োর মধ্যে উঠে দাড়ালো। আদিবা বাবুকে রেখে এসেছে বলে ইশাতও তাকে আর বাধা দিলো না। সে আদিবার জন্য সাজেক থেকে কেনাকাটা করা জিনিসগুলো তার হাতে ধরিয়ে দিলো। আদিবা যাওয়ার পর ইশাত রান্নার কাজে ফিরে গেলো।
চলবে ( ইনশাআল্লাহ )……………………….
#ক্লান্তিহীন_তুই_আমার_ফরিয়াদ
#পর্বঃ৪৬
#সুমাইয়া_জান্নাত_ইলমা
দেখতে দেখতে ইশাত আর আরিয়ানের বিয়ের ছয় মাস পূর্ণ হলো। এর মধ্যে কয়েকমাস আগেই সু’প্রিম কো’র্টে আসিফের ফাঁ’সির রায় ঘোষণা করা হয়েছিল। ইশাতও আরিয়ানের সাথে সেদিন সেখানে উপস্থিত ছিল। সেদিন যখন ইশাত আরিয়ানের হাত শক্ত করে ধরে তার সঙ্গে বসে ছিল, সেই মুহূর্তে ফাঁ’সির ঘোষণা হওয়ার পরেও আসিফ কাঠগোড়ায় দাঁড়িয়ে তৃষ্ণার্ত চোখে ইশাতকেই দেখে যাচ্ছিল। ইশাতের দিকে আসিফের দৃষ্টি লক্ষ্য করতেই আরিয়ান তাকে তীক্ষ্ণ চোখের ইশারায় হুমকি দিয়ে ইশাতকে আড়াল করে নিয়েছিল তার দৃষ্টির থেকে।
সেদিন বাসায় ফিরে ইশাত ভার্সিটির প্রথম দিনের কথা মনে করে আসিফের জন্য আফসোস করলো। যখন সে ভার্সিটির প্রথম দিন আসিফকে দেখেছিল, সেদিন তাকে দেখে সাধারণ একটা ছেলে মনে হয়েছিল। কোনো ভাবেই তাকে দেখে বোঝা যায় নি, যে সে ভবিষ্যতে এতটা জ’ঘন্য অ’পরাধ করতে পারে। পূর্বের কথা মনে করে ইশাতের আসিফের পরিবারের জন্য আফসোস হলো। যতই হোক একটা সময় তারা ভালো বন্ধু ছিল। এদিকে আরিয়ান ইশাতের মনের হাল বুঝে তাকে স্বাভাবিক ভাবনায় ফিরিয়ে আনতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।
ইদানিং ইশাত খেয়াল করছে তার শরীরটা অনেক দুর্বল অনুভব হয়। আগের তুলনায় তার ওজনও ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইশাত এসব কথা আরিয়ানকে কিছুই বলে নি। সে সারাদিন অফিস করে এসে অনেক ক্লান্ত থাকে, তার উপর ইশাত তাকে এসব বলে চিন্তায় ফেলতে চাচ্ছিল না। আবার তার নিজের মনেও এসব লক্ষণ দেখে সন্দেহ কাজ করছিল। তাই মনের সন্দেহ দূর করতে সে নিজে নিজে অনেকবার বাসায় টেস্টও করিয়েছে কিন্তু কোনো ফল পায়নি। সব স্বাভাবিক দেখাচ্ছিল।
তাই অবশেষে সে বাধ্য হয়ে ঠিক করলো হসপিটালে গিয়েই চেকআপ করাবে। কথা মতো সেদিন আরিয়ান অফিসে যাওয়ার পর ইশাত হসপিটালে গিয়ে নিজের টেস্ট করায়। টেস্টের রিপোর্ট নিতে গিয়ে ডক্টরের কথা শুনে ইশাত থমকে যায়। ডক্টর জানায় সে তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা, আর যমজ সন্তানের মা হতে চলেছে। ডক্টর তাকে আরো জানালো এতদিন সে টেস্ট করে কোনো ফল পায়নি কারণ যমজ বাচ্চা হওয়ার কারণে রেজাল্ট স্পষ্ট দেখাচ্ছিল না। প্রথমবারের মতো হৃদয়ে মাতৃত্বের অনুভূতি জেঁকে বসতেই ইশাতের চোখ দিয়ে কয়েকফোঁটা আনন্দের নোনাজল গড়িয়ে পড়লো। এই অনাগত সন্তান তাদের ভালোবাসার পূর্ণতার নিশানি। আল্লাহর দেওয়া শ্রেষ্ঠ উপহার। এসব ভেবেই ইশাত প্রোজ্জ্বল হেসে রিপোর্ট নিয়ে হসপিটাল থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠে বসলো।
সে বাড়ির কাছাকাছি এসে পৌঁছাতেই দেখলো তাদের বাড়ির গেটের বাহিরে একটা অধুকিন পোশাকধারী নারী দাড়িয়ে। গার্ডরা তাকে ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছে না বলে সে তাদের কাছে অনুরোধ করছে। ইশাতকে দেখতে পেতেই মেয়েটা তার গাড়ির কাছে ছুটে এলো। ইশাত গাড়ি থেকে নামতেই মেয়েটা তার হাত আঁকড়ে ধরে বলল।
— ইশাত আমাকে নিশ্চই চিনতে পারছো? আমি ফেলিক্সের এক্স গার্লফ্রেন্ড এমা।
ইশাত সে রাতের কথা মনে করে চোখমুখ শক্ত করে বলল।
— হ্যা চিনেছি কিন্তু আমার কাছে কেন এসেছেন?
— তুমি নিশ্চই সেদিন ফেলিক্সের মুখে শুনেছ এভিয়ান আমার সাথে কি করার চেষ্টা করেছিল? তুমি তাও কিভাবে তাকে বিয়ে করতে পারলে?
এমার ছ’লনা বুঝতে পেয়ে ইশাত তাকে সেখানেই থামিয়ে দিয়ে বলল।
— যদি আপনি আমার কাছে আমার স্বামীর নামে উল্টা পাল্টা বলে ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি করতে এসে থাকেন তাহলে এখানেই থেমে যান। আমাদের সম্পর্ক এতো ঠুনকো না যে যারতার কথা শুনে আমি আমার স্বামীকে ভুল বুঝবো। আমি আমার স্বামীকে সম্পূর্ণ রূপে বিশ্বাস করি। তিনি আমি ব্যতীত অন্য কোনো নারীর দিকে তাকিয়ে পর্যন্ত দেখে না। বরং তার ভাবনা জুড়ে শুধুই আমি, সে আমাকে ভালো রাখতে তার সর্বোচ্চটা দিয়ে দিনরাত চেষ্টা করে যায়। আর এখন থেকে সে আমার অনাগত সন্তানের বাবা। তাকে নিয়ে একটা বাজে কথা আমি সহ্য করব না। উল্টো আমার কি মনে হয় জানেন? আমার স্বামীর উপরেই কিছু মানুষ কুনজর রয়েছে। আমি চাইব না তাদের আমার বাড়ির ত্রিসীমানায় দেখতে।
কথাগুলো উগরে দিয়ে ইশাত দ্রুত ভেতরে চলে গেলো। সে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রবেশদ্বারও বন্ধ হয়ে গেলো। অপরদিকে ইশাতের কাছে অপমানিত হয়ে অগ্নি দৃষ্টি নিয়ে ঠাই দাঁড়িয়ে রইলো এমা।
—————————–
রিজভী আরিয়ানের কেবিনে ঢুকতেই দেখলো তার সামনের টেবিলটায় বান্ডেল বান্ডেল টাকায় ভর্তি একটা স্যুটকেস রাখা। রিজভী সেটা দেখে অবাক হয়ে আরিয়ানকে প্রশ্ন করলো।
— কিরে আমাকে ডেকেছিলি কেন? আর এগুলো কিসের টাকা?
— এগুলো ডোনেটের জন্য। তুই গিয়ে দিয়ে আসবি।
— কোথায় ডোনেট করবি এতো টাকা?
— ইয়াতিমখানায়, কারণ আমি চাই না অন্যান্য ইয়াতিম শিশুরা আমার মতো বাবা মার অবর্তমানে অবহেলায় বড় হোক। এই টাকাগুলো দিয়ে তাদের সব সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করে দিয়ে আসবি।
— কিন্তু টাকাটা যেহেতু তুই দিচ্ছিস তাই তুই নিজেই গিয়ে দিয়ে আসলে ভালো হতো না? তারা জানতো কে তাদেরকে টাকাগুলো দিয়েছিস।
আরিয়ান আপত্তি করে বলল।
— সেটাই আমি চাই না যে কেউ জানুক। আমি গেলে মিডিয়াতে খবর ছড়াবে, মানুষ জানবে, আর আমি দেখানো কিছু করতে চাই না। কথাটা যেন শুধু তোর আর আমার মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে।
রিজভী কপাল সংকুচিত করে বলল।
— দান করছিস অ’পরাধ তো না। এতে গোপনীয়তার কি আছে?
আরিয়ান তখন তাকে বুঝিয়ে বলল।
— গোপনে দান করা আল্লাহ তাআলার কাছে অত্যন্ত প্রিয় ও পছন্দনীয় আমল, যা মানুষের অন্তরের অহংকার ও লৌকিকতা দূর করে। আর কিয়ামতের দিন আল্লাহর বিশেষ ছায়া লাভকারী সাত শ্রেণির মানুষের অন্যতম হলো সেই ব্যক্তি, যে এমন গোপনে দান করে যে তার ডান হাত কী দান করেছে তা বাম হাতও জানে না। (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
আরিয়ান থেমে আবারো বলল।
— আমি তো তবুও তোকে জানাচ্ছি কারণ এই কাজটা সরাসরি আমি করতে পারবো না। তাই তোকেই করে দিতে হবে।
রিজভী বিষয়টা বুঝে স্যুটকেস হাতে নিয়ে বলল।
— ঠিকাছে, আমি করে দিচ্ছি।
রিজভী যেতে নিবে এমন সময় সিয়াম আরিয়ানের কেবিনে উপস্থিত হলো। আরিয়ান তাকে দেখে এক ব্রু উঁচিয়ে প্রশ্ন করলো।
— কিছু বলবে?
সিয়াম মাথা নাড়িয়ে বলল।
— মিস ক্লারা এসেছে, আপনার সাথে দেখা করতে চাচ্ছে। কি বলবো তাকে?
রিজভী বিস্মিত হয়ে বলল।
— হোয়াট! সে আমেরিকা থেকে দেশেও এসে পড়েছে?
এদিকে আরিয়ান ধারণা করলো ক্লারা নিশ্চই নিজের উদ্দেশ্যে পূরণ করতেই এখানে এসেছে। তাই সে সিয়ামকে আদেশ করে বলল।
— আসতে দাও।
রিজভী আরো আশ্চর্য হয়ে আরিয়ানকে সতর্ক করে বলল।
— তুই জানিস ও তোর ক্ষ’তি করতে এসেছে, তুই কোন বিবেকে ওকে ঢোকার অনুমতি দিস? এর আগেও ও কত কি ঘটিয়েছে।
অন্যদিকে ক্লারা অনুমতি পেয়ে অনায়াসে ভেতরে চলে এলো। কারো অনুমতির পরোয়া না করে সে চেয়ার টেনে পায়ের উপর পা তুলে আরিয়ানের মুখোমুখি হয়ে বসে ক্রুর হেসে শান্ত গলায় বলল।
— ইটস বিন আ হোয়াইল, হাউ আর ইউ ডুইং ব্রাদার?
রিজভী তাকে তীক্ষ্ণ গলায় কিছু একটা শোনাতে যাবে তার আগেই আরিয়ান তাকে হাতের ইশারায় থামিয়ে ক্লারাকে আপসের গলায় বলল।
— একটা প্রতি’শোধের পেছনে আর কত ছুটবে ক্লারা? তুমি ভালো করে জানো তোমার মায়ের মৃ’ত্যুর পেছনে সে নিজেই দায়ী ছিল। তোমার মায়ের জন্য আমার পুরোটা জীবন ন’ষ্ট হয়েছে এর দায় আমি একা বহন করেছি। এখন তুমিও আমার মতো একই সময় পাড় করছো। আমি আর তোমার সাথে কোনো ঝামেলা করতে চাইছি না। এসব আমি অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছি। তুমি আমার সৎ বোন হও, তবুও আমার বোন তুমি। তোমার কোনো ক্ষতি আমি চাই না। আমি চাই তুমি প্রতি’শোধের নেশা ভুলে নিজের জীবনটা গড়। আমাকে তোমার বড় ভাই হিসেবে পাশে পাবে।
আরিয়ানের মুখে এমন কথা শুনে উপস্থিত সিয়াম আর রিজভী বিস্মিত চোখে তাকিয়ে রইলো। তারা কখনো কল্পনাও করেনি যে আরিয়ান এসব কথা বলবে ক্লারাকে। অবাক হলো কিছুটা ক্লারাও, প্রথমবার সে আরিয়ানের কথার মাঝে বড় ভাইয়ের স্নেহ অনুভব করলো। কিন্তু পরক্ষণে মনে মনে সে এসবকিছু আরিয়ানের ম্যানুপুলেশন ভেবে তোয়াক্কা না করে বলল।
— তোমার এসব কথা আমাকে একটুও টলাতে পারবে না। আমি এখানে এসেছিলাম তোমাকে মনে করিয়ে দিতে যে মৃ’ত্যুর প্রতি’শোধ মৃ’ত্যু দিয়েই হবে।
কথাটা বলে ক্লারা হনহনিয়ে বেরিয়ে গেলো। রিজভী তখন আরিয়ানের কাঁধে হাত রেখে বলল।
— ওকে বুঝিয়ে লাভ হবে না, ও পুরোই তোর ফিমেইল ভার্সন। মনে নেই আগে তুই কতটা জেদি ছিলি? ভাগ্যিস তোর জীবনে ইশাত এসেছিল। নাহয় এখনও এমন বেপরোয়া জীবন কাটাতি।
আরিয়ান কোনো এক ভাবনায় চুপ রইলো। রিজভী তখন আবারো বলল।
— এখন থেকে আরো সবধানে থাকতে হবে তোকে। ক্লারা যেহেতু তোর পিছু নিয়ে দেশে এসে পড়েছে সেহেতু সে সব সময় ওৎ পেতে থাকবে তোর ক্ষ’তি করার জন্য।
আরিয়ান রিজভীর দিকে ঘুরে বলল।
— তুই যা আগে যে কাজ দিয়েছি করে আয়।
রিজভী মাথা দুলিয়ে বেরিয়ে গেলো। সিয়ামও চলে গেলো। কেবিন থেকে বেরিয়ে কিছুটা এগোতেই সিয়াম দেখলো ক্লারা বুকে হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে আছে। ক্লারা এতক্ষন তার জন্যেই বাহিরে অপেক্ষা করছিল। সিয়াম তখন কপাল গুছিয়ে প্রশ্ন করলো।
— আপনি যান নি এখনো?
সিয়ামের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ক্লারা উল্টো বলল।
— আমাকে সেদিন তুই তুলে নিয়ে দিয়ে এসেছিলি আমার লোকদের কাছে?
ক্লারার কথায় সিয়ামের মনে পড়লো সেদিনের কথা যেদিন আমেরিকায় তাদের গোপন কটেজে ক্লারা ঢুকেছিল আরিয়ানকে আ’ক্রমণ করতে। তখন ইশাত ডিফেন্স করে তাকে অজ্ঞান করার পর সিয়ামকে বলেছিল ক্লারাকে তাদের লোকদের হাতে তুলে দিয়ে আসছে। সিয়ামও সেটাই করেছিল। সেসব ভেবে সিয়াম বলল।
— হ্যা,আমার উপর অর্ডার ছিল তাই করেছি।
ক্লারা তাকে হু’মকি দিয়ে বলল।
— এই দুঃসাহসে ফল তোকে চুকাতে হবে।
কথাটা বলে ক্লারা দ্রুত প্রস্থান করলো। পেছন থেকে সিয়াম হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। সে ভাবলো কি সাং’ঘাতিক মেয়ে এটা। যখন তখন যাকে তাকে হু’মকি দিতে থাকে। পরক্ষণে ক্লরার এসব স্বভাবে অজান্তেই সিয়াম হেসে দুষ্টামি করে তাকে একটা উদ্ভট নাম দিয়ে বলল।
“পুরোই ম্যাজিক মামনি।”
—————————-
আধারে ঢাকা রুমটায় মোমের নরম ও হলদেটে আলোয় আলোকিত হয়ে আছে চারিপাশ। মিটিমিটি আলো ও মৃদু কম্পনে আলো ছায়ার এই খেলায় মায়াবী আর উষ্ণ এক আবহ সৃষ্টি হয়েছে। ইশাত মম দিয়ে সুন্দর করে রুম সাজিয়ে একটা ভেলভেটের কালো গাউন বের করে পড়ে নিলো। গাউনের সঙ্গে মিলিয়ে বিয়ের রাতে আরিয়ানের দেওয়া গহনাগুলোও সে সুন্দর করে পরে নিলো। পোশাকের সাথে সামঞ্জস্য রেখে সে স্মোকি আই লুকের একটা মেকআপ করে নিলো।
আজ সারা বিকেল সে আরিয়ানের জন্য তার পছন্দের খাবারগুলো তৈরি করেছে, এরপর মাগরিবের নামাজ পড়ে সে ফ্রেশ হয়ে সবকিছু গুছিয়েছে। ইশাত অধীর অপেক্ষায় বসে আছে কখন আরিয়ান ফিরবে আর সে তাকে রিপোর্টটা দেখাবে। এমন সময় তার ফোনে আরিয়ানের কল এলো। সে সঙ্গে সঙ্গে রিসিভ করতেই আরিয়ান অপরপাশ থেকে তাড়াহুড়োর মধ্যে বলল।
— হোয়াইট মুন, আমার লাগেজটা প্যাক করে দিতে পারবে? কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার আমেরিকা ফ্লাইট আছে।
ইশাত অবাক হয়ে বলল।
— আপনি আমেরিকা যাচ্ছেন? একথা আমাকে আগে জানান নি কেন?
— সরি, খেয়াল ছিল না।
— যাওয়াটা কি খুব গুরুত্বপূর্ণ?
— অনেকটাই, কিন্তু কেন?
ইশাত ভাবলো সে যদি এখন আরিয়ানকে বলে দেয় রিপোর্টটার কথা তাহলে আরিয়ান তার যাওয়া ক্যানসেল করে দেবে। আরিয়ান ফিরলে নাহয় ইশাত তাকে এই সুখবরটা জানাবে। তাই সে ব্যাপারটা চেপে গিয়ে বলল।
— কয়দিনের জন্য যাচ্ছেন?
আরিয়ান মৃ’দু গলায় বলল।
— এক মাসের জন্য। তোমার থেকে দূরে থেকে এই একটামাস আমার এক বছরের চেয়েও দীর্ঘ কাটবে।
ইশাত তখন আরিয়ানকে বুঝিয়ে বলল।
— সমস্যা নেই আমাদের তো ভিডিও কলে কথা হবেই। যেখানে আপনার যাওয়া প্রয়োজন সেখানে তো যেতেই হবে। আপনি চলে আসুন। আমি লাগেজ প্যাক করে রাখছি।
কল রাখার আগে আরিয়ান বলল।
— শুনো তুমিও তৈরি হয়ে থাকো আমি তোমাকে আম্মুর বাড়িতে রেখে আসবো। একা বাসায় থাকতে হবে না তোমাকে।
— সমস্যা নেই, আমি নাহয় আপনি যাওয়ার পরে চলে যাব।
— আমি যাওয়ার পথে তোমাকে নিজেই সেখানে পৌঁছে দিয়ে যাব। নাহলে আমি দুশ্চিন্তায় থাকবো।
ইশাত আর আপত্তি করলো না। কথা শেষে আরিয়ান কল রাখতেই ইশাত তড়িৎ উঠে আরিয়ানের লাগেজ গুছিয়ে রুমে সাজানো সব মমগুলো তুলে মুখের মেকআপ ধুয়ে, জামাকাপড় পাল্টে, রান্না করা খাবারগুলো সব ফ্রিজে তুলে রাখলো। যেন আরিয়ান বুঝতে না পারে ইশাত এতো আয়োজন করেছিল তার জন্যে। সে জানলে ইশাতের মন রাখার জন্য তার যাওয়াই ক্যান্সেল করে দিবে।
কিছুক্ষণ পর আরিয়ান চলে এলো। সে তার লাগেজ গাড়িতে তুলে ইশাতকে নিয়ে বেরোলো। আরিয়ানের গাড়ি ইশাতের এপার্টমেন্টের সামনে থামতেই আরিয়ান ইশাতের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো। পরিবর্তে ইশাত তাকে মিষ্টি হাসি উপহার দিয়ে বলল।
— নিজের খেয়াল রাখবেন, সাবধানে যাবেন আর গিয়ে আমাকে সঙ্গে সঙ্গে কল করবেন, নাহলে আমি টেনশন করবো। রিজভী ভাইয়াও কি সাথে যাচ্ছে না?
আরিয়ান ইশাতের হাত নিজের হাতে নিয়ে চুমু খেয়ে বলল।
— হ্যা যাবে। তোমাকে অনেক মিস করবো, হোয়াইট মুন।
ইশাতের মন আজ কেন যেন চাচ্ছে না আরিয়ানকে যেতে দিতে। তার ভেতরটা হঠাৎ করেই অস্থির লাগতে শুরু করেছে। কিন্তু বাহিরে থেকে সে নিজেকে স্বাভাবিক রেখে বলল।
— মন খারাপ করছেন কেন? আমাদের তো কথা হবেই।
— কথা তো হবে কিন্তু দূর থেকে কি তোমাকে ছুঁতে পারবো? আগলে নিতে পারবো নিজের বুকে?
ইশাত আরিয়ানকে আর মায়া বাড়াতে না দিয়ে, তার ব্যাগ নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে বলল।
— সাবধানে যাবেন।
কথাটা বলে আর না দাড়িয়ে ইশাত ভেতরে চলে গেলো। ড্রাইভার আরিয়ানকে জিজ্ঞাসা করলো সে গাড়ি এগোবে কিনা। কিন্তু আরিয়ান তাকে থামতে বলল। কিছুক্ষণ পর ইশাত আবারো এসে দূরে দাড়িয়ে উঁকি দিলো। তাকে দেখে আরিয়ানের ঠোঁটের কোণে আপনাআপনি এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। আরিয়ান গাড়ি থেকে নেমে গিয়ে ইশাতকে জড়িয়ে ধরলো। ইশাত ইতস্ততা নিয়ে তাকে সরিয়ে দিয়ে বলল।
— কি করছেন কেউ দেখলে কি বলবে?
আরিয়ান তখন দুনিয়ার সকল মায়া নিজের মাঝে ধরে রেখে বলল।
— তোমাকে এতটাই গভীরে জড়িয়ে নিতে চাই যতটা গভীরে জড়িয়ে নিলে আমার শরীরের সুবাসটুকুও তোমার মাঝে বিস্তার করবে, যেন আমার অনুপস্থিতিতেও তুমি নিজের মাঝে আমার উপস্থিতি খুঁজে পাও। তুমি কি সেটা চাও না?
কথাগুলো শুনে ইশাতের আবেগী মন আরিয়ানের অনুভূতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে গা ভাসাতে চাইলো, কিন্তু সে তার মনকে আস্কারা না দিয়ে বলল।
— আপনার দেরি হয়ে যাচ্ছে তো, তাড়াতাড়ি যান। পরে তো আবার কথা হবেই।
আরিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে গাড়িতে উঠে বসলো। সে ইশাতকে ইশারায় ভেতরে যেতে বলল। ইশাত ভেতরে চলে যেতেই আরিয়ানও ড্রাইভারকে গাড়ি এগোতে বলল। আরিয়ানের গাড়ি দৃষ্টির বাহিরে যেতেই আড়াল থেকে ইশাত বেরিয়ে তার যাওয়ার পানে চাতক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। মনে মনে সে আরিয়ানের সুষ্ঠ সফরের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করলো। একটুপর ইশাত উপড়ে চলে যেতেই তাকে দেখে তার মা, ভাইয়া, ভাবি আর আহনাফ খুশিতে আত্মহারা হলো। সবার সাথে কথা বলে একসাথে ডিনার করে ইশাত রুমে ফিরে ইশার নামায পড়ে যাবতীয় আমল করে শুয়ে পড়ল। কিন্তু সারারাত তার অজানা দুশ্চিন্তায় ঘুম এলোনা।
পরদিন সকালে উঠে ইশাত ড্রয়িং রুম যেতেই টিভিতে একটা সংবাদ দেখলো। স্ক্রিনে দেখাচ্ছে একটি বিজনেস ক্লাস জেট ক্র্যাশের দৃশ্য। হেডলাইনে লিখা উঠে আছে দেশের বিশিষ্ট গণ্যমান্য ব্যবসায়ী এভিয়ান জারিয়াথের প্রাইভেট জেট আমেরিকা যাওয়ার পথে মা’রাত্মকভাবে বি’ধ্বস্ত হয়েছে। এরই মাঝে ধ্বং’সস্তূপ থেকে দুজনের মৃ’ত দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। সবকিছু পর্যবেক্ষণ করে জানা গেছে ঘটনাটা ছিল পূর্বপরিকল্পিত। তখন ড্রয়িং রুমে উপস্থিত সকলেই এই সংবাদ দেখে স্তব্ধ হয়ে পড়লো। ইশাত আর নিজের জ্ঞান ধরে রাখতে পারল না। সে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ার আগেই ইমরান সতর্ক হয়ে বোনকে ধরে ফেললো।
চলবে ( ইনশাআল্লাহ )……………………

