Home "ধারাবাহিক গল্প হৃদয় হারানো বিজ্ঞপ্তি হৃদয় হারানো বিজ্ঞপ্তি পর্ব-০৭

হৃদয় হারানো বিজ্ঞপ্তি পর্ব-০৭

0
90

#হৃদয়_হারানো_বিজ্ঞপ্তি
#পর্ব_৭
#Thmina_Akhter

ফায়েজ ফাইল খুলতেই গোটা অক্ষর চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ফায়েজ এক একটি শব্দ মনোযোগ দিয়ে পড়ছে।

গল্পের শুরু…..

— কোথায় আছিস??

— এইতো গোমতি হলের সামনে আছি।

— ওখানে কি??

— কি মানে!! দ্যি সুপারস্টার ফায়েজ চৌধুরীর নতুন মুভি রিলিজ হয়েছে। আর এই মুভির একটা বিশেষ দিক হচ্ছে ফায়েজ আই মিন নায়ক নাকি একতরফা ভালোবেসেছে। তার ভালোবাসা পূর্ণতা পায়নি৷ জানিস না আমি এই নিয়ে দুবার হলে এসে ছবিটা দেখলাম৷ ফায়েজের অভিনয় এতটাই রিয়েল ছিল যে,, আমার চোখ ভিজে আসছিল বারবার।

— থাক থাক বইন আর বলতে হবে না। তুই মুভি দেখ আমি একাই শপিংয়ে যাব।

খেয়া কল কেটে দিবে এমন সময় শুনতে পেলো ওপাশে থাকা রাইসা মুখটা এইটুকুন করে বলছে,,

— তুই নিরামিষ। নয়তো,, এত সুন্দর একটা মানুষের কথা শুনতে তোর বিরক্তি হবে কেন?? তুই দাঁড়া আমি আসছি।

খেয়া বিরক্তি নিয়ে রাইসাকে বললো,,,

— এসব টপিক নিয়ে আমার সঙ্গে কথা বলবি না। পারলে ভিআইপি টাওয়ারের সামনে চলে আয়।

—ঠাসস,, ঠাসসস।

পরপর দুটো থাপ্পড়ের শব্দ শুনে পুরো শোরুমে আপাতত থমথমে অবস্থা। শো-রুমের ম্যানেজার এগিয়ে এলেন। অদূরে দাঁড়িয়ে মোবাইলে কথা বলছিল ফায়েজ৷ কিন্তু,, কারো চেচামেচি শুনে মোবাইল ফোন রেখে এগিয়ে যায় সেদিকে।

— হাউ ডেয়ার ইউ!!! কোন সাহসে আপনি আমার পিছু নিয়েছেন?

— কি হয়েছে??

ফায়েজ সেখানে এসে ওর পিএকে জিজ্ঞেস করলো। কারণ,, ওর পার্সোনাল এসিস্ট্যান্টকে একটি মেয়েকে প্রশ্নগুলো করছিল।

মেয়েটা এবার ফায়েজের দিকে তাকিয়ে বললো,,।

— কি হয়েছে মানে?? এই লোকটা আমার পিছু নিয়েছে শোরুমে ঢুকার পর থেকে। আমি ট্রায়াল রুমে ঢুকতে যাব ঠিক তখনি দেখছি উনি সেখানেও হাজির!! নিশ্চয়ই বদমতলব আছে। আমি এখনই পুলিশকে কল করব।

— মিস? আমার কথাটা শুনুন নিশ্চয়ই কোনো মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়েছে??আমার পিএ এমন নয়।

— আপনার পিএ! আপনি আবার কোন দেশের রাজকুমার যে আপনার পিএ লাগে? তাও আবারও এমন ভেড়ামার্কা পিএ?

— মুখ সামলে কথা বলবেন। আমি ভেড়ামার্কা নাকি আপনি নিজে? সিচুয়েশন না বুঝেই একশ একটা কথা বলছেন! স্যার আসলে??

ফায়েজের পিএ মেয়েটাকে শাসিয়ে ফায়েজকে কিছু বলতেই যাবে এমন সময় কেউ বলে উঠলো,,

— আরে ফায়েজ চৌধুরী আপনি এখানে??

ম্যানেজার ফায়েজকে দেখে খুশিতে আত্মাহারা হয়ে গেলেন। এতটাই খুশি হলেন যে ঝগড়ার ব্যাপারটি নিয়ে কোনো আলাপচারিতা শেষ না করেই ফায়েজের সঙ্গে সেলফি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।

— এই যে ম্যানেজার সাহেব সেলফি পরেও তুলতে পারবেন আগে এই ভেড়ামার্কা লোকটাকে শায়েস্তা করুন।

আব্দুল জব্বার এবার বেশ চটে গেল। মেয়েটার সামনে গিয়ে বললো,,

— শোনেন আমি ভেড়ামার্কা কথাটা একবারও বলবেন না। আমার ফ্যামিলি অনেক সাহসি বুঝলেন। আমাদের গ্রামে একবার মুরগি চুরি হয়েছিল। আর সেই মুরগি চোরকে আমার দাদা হাতেনাতে ধরেছে তাও আবার কখন জানেন? যখন চোর মুরগি নিয়া দৌঁড় হাপিয়ে গিয়েছিল তখন। বেচারা মুরগি চোরের নাকি পিশাব ধরছিল। মনে করছে অন্ধকার রাতে তারে কেউ দেখবে না। ব্যস সে পিশাব করতে বসছে আর ওমনি আমার দাদা চোররে ধইরা তার পিশাবের মধ্যে ফালাইয়া উত্তম মাধ্যমে কেলানি দিছে। সেই ঘটনার পর থেকে আমাদের একটা ইজ্জত তৈরি হয়েছে গ্রামে।

— আরে বাহ্ সামন্য মুরগি চোরকে ধরার পর এতটা ইজ্জত তৈরি হয়েছে??

মেয়েটা এবার হেসে ফেললো। মেয়েটার হাসি দেখে ফায়েজ একবার তাকায়৷ মেয়েটার হাসি ভীষণ সুন্দর।
ফ্

— খেয়া???

মেয়েটা পেছনে তাকালো। একটি মেয়ে ডাকছে তাকে। তার সমবয়সী হয়তো। খেয়া নামের মেয়েটা হাতের ইশারায় মেয়েটাকে আসতে বললো। মেয়েটা এসেই খেয়াকে কিছু বলার আগে ছোটখাটো চিৎকার দিয়ে বললো,,

— ও মাই গড এ আমি কাকে দেখছি? ফায়েজ চৌধুরীকে! আই এম ইউর বিগ ফ্যান । একটা সেলফি প্লিজ?

মেয়েটা ম্যানেজারকে সরিয়ে ফায়েজের সঙ্গে সেলফি তুললো। খেয়া ভীষন বিরক্ত হলো।

— রাইসা,, তুই থাক আমি গেলাম।

— আরে দাঁড়া আমিও যাব। ও মাই গড খেয়া আজ তো তোকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে ইচ্ছে করছে । তুই যদি জিদ না করতি তাহলে আজ এখানে আসতাম না। আর না এলে ফায়েজ চৌধুরীকে দেখতে পেতাম না।

খেয়া বিরক্ত হয়ে রাইসাকে রেখেই চলে যাচ্ছে। এমন সময় ম্যানেজার পেছন থেকে খেয়াকে ডাক দেয়।

—ম্যাম,, আপনার শপিং ব্যাগগুলো??

—রেখে দিন। একটুপর আমার ছোট ভাইয়া এসে নিয়ে যাবে।

মেয়েটা চলে যায়। এদিকে আব্দুল জব্বার বিরক্ত হয়ে ফায়েজকে উদ্দেশ্য করে কিছু বলতে যাবে তার আগেই ফায়েজ আব্দুল জব্বারকে থামিয়ে দিয়ে বললো,,

—থাক তোমার ফ্যামিলির যে গ্রামে আলাদা ইজ্জত আছে বলতে। সেই ঘটনার পেছনের কাহিনি শুনে আপাতত আমি ভাষাহীন হয়ে পরেছি। আমি যে কোন অপরাধে তোমাকে পিএ বানিয়েছিলাম আল্লাহ জানেন? শপিং করা লাগবে না। মিরপুর যেতে হবে। ডিরেক্টর কল করেছে৷

ফায়েজ বের হয়ে আসে শো-রুম থেকে. এদিকে
আব্দুল জব্বার মনে মনে খেয়াকে ভয়াবহ কয়েকটা গা*লি দিয়ে ফায়েজের পিছু পিছু চললো।

ফায়েজ গাড়িতে বসে আছে। আব্দুল জব্বার গাড়িতে বসে ডোর লাগাতে যাবে এমন সময় কারা যেন এসে আব্দুল জব্বারকে গাড়ি থেকে টেনে হিঁচড়ে বের করে নিয়ে যায় ফুটপাতের ওপরে।

—আরে ভাই মারছেন কেন? আরে গায়ে হাত তুলবেন না! স্যার কিছু তো করেন।

ফায়েজ গাড়ি থেকে নামতে না নামতে ওরা আব্দুল জব্বারকে মারতে শুরু করে। রাস্তার পাশে হওয়ায় মানুষজন ভীষন কৌতুহল হয়ে দেখছিল। ফায়েজ দ্রুত সেখানে গিয়ে আব্দুল জব্বারকে নিজের দিকে টেনে নিয়ে আসে৷ তাদের মধ্যে থাকা কয়েকজন ফায়েজের দিকে তেড়ে আসে।

— এই???

কারো ডাক শুনে তারা থেমে যায়। ফায়েজ এবং আব্দুল জব্বার দুজনেই তাকিয়ে দেখলো সংসদ সদস্য নিজাম খানের ছোট ভাই বাইকের ওপর বসে আছে। ডানহাতের আঙুলের ভাঁজে থাকা সিগারেটে সর্বশেষ টান দিয়ে বাইকে থেকে নেমে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় ফায়েজ এবং আব্দুল জব্বারের দিকে।

আব্দুল জব্বার ভয়ে কিছুটা জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু,, ফায়েজ সেই আগের মতোই তাকিয়ে আছে তাদের দিকে।

— আরে দি সুপারস্টার ফায়েজ চৌধুরী এখানে!! আপনি আবার ঝামেলার মাঝখানে ঢুকে পরলেন কেন? সব জায়গায় হিরো গিরি চলে না। দেখি এই শয়তানকে আমার বোনের পেছনে পেছনে ঘোরার শখ জন্মের জন্য মিটিয়ে দেই।

লোকটা আব্দুল জব্বারের দিকে হাত বাড়ায় এবং সেই হাত ধরে আঁটকে ফেললো ফায়েজ৷ লোকটাসহ বাকি উপস্থিত যারা ছিল সবাই বিস্মিত হয়ে গিয়েছে।

— আপনার বোনের পেছনে আমার পিএ যায়নি। শো-রুমে সবাই ট্রায়াল রুমে যাবে। ঘুরবে, ড্রেস পছন্দ করবে। এখন কো-ইন্সিডেন্স থেকেই হয়তো আপনার বোনের পাশাপাশি আমার পিএ ঘুরছিল এবং তার জন্য ড্রেস দেখছিল। সেই দৃশ্য দেখে আপনার অহংকারী বোন ভেবে বসেছে যে তার পেছনে পেছনে আমার পিএ ঘুরছে। হাহ্ এতটা ন্যারো মাইন্ডেড মানুষও হতে পারে। না জেনে বুঝে শোরুমের ভেতরে কতটা ইনসাল্ট করলো। আর এখন বাইরে আসার পর আপনাকে পাঠিয়েছে যাতে আপনি দলবল নিয়ে এসে মারপিট করতে পারেন! আগে ঘটনা শুনুন নিজ চোখে দেখুন তারপর এসে মারপিট করবেন। নয়তো আপনার বোনের জন্য নিরীহ মানুষ আপনার মার খেয়ে মরবে।

ফায়েজ কথাগুলো বলে লোকটার হাত ছেড়ে দেয়। তারপর আব্দুল জব্বারকে নিয়ে সেখান থেকে চলে যাওয়ার জন্য উদ্ধুত হয়। কি মনে করে ফিরে এসে লোকটার সামনে দাঁড়িয়ে ফিসফিসিয়ে বললো,,

— আপনার এবং আপনার বোনের নিজেদের ওপর হয়তো ওভার কনফিডেন্স আছে। এতটাও ওভার কনফিডেন্স থাকা ভালো না। কারণ,, আপনার বোন ওতটা সুন্দরী না যে মানুষ যত্রতত্র ফ্লার্ট করবে।

ফায়েজ আব্দুল জব্বারকে নিয়ে গাড়ি করে চলে যাচ্ছে। ফায়েজ সেখান থেকে চলে যাওয়ার পর নিজাম খানের ভাই সরফরাজ খান ওর এক লোককে কাছে ডেকে আনলো। রনি নামের লোকটা কাছে এলে পর পর দুটো থাপ্পড় মেরে বসলো সরফরাজ। থাপ্পড় খেয়ে রনি মাথা নীচু করে ফেলে। সরফরাজের ভীষন রাগ হচ্ছে। জীবনে এই প্রথমবার কেউ সরফরাজের চোখে চোখ রেখে ওর দোষ বলে গেছে। ওকে, ওর বোনকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছে। সামান্য একজন হিরো এভাবে ইনসাল্ট করে চলে গেলো আর ও শুধু তাকিয়ে গেলো। কারণ,, আজ সরফরাজের ভুল হয়েছে। নিতাই নামের একটা ছেলে আছে তাকে কাছে ডেকে বললো, সে যেন ফায়েজের দিকে নজর রাখে। তারপর,, চোখে সানগ্লাস লাগিয়ে নিজের বাইক নিয়ে রওনা হয় বাড়ির পথে।

খেয়া রাইসাকে নিয়ে কেনাকাটা শেষ করলো,, রেস্টুরেন্টে গিয়ে খাবার খেলো। তারপর,, পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের দিকে রওনা হলো। শহর থেকে সেখানে যেতে প্রায় একঘন্টার মতো সময় লেগেছে।

গাড়ি এসে থামলো। খেয়া আর রাইসা গাড়ি থেকে নামলো। চোখে সানগ্লাস লাগিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সমুদ্র সৈকতের দিকে। প্রচন্ড ভীড় সেখানে। কেউ এসেছে প্রিয়তমা নিয়ে,, কেউ এসেছে বাবা-মাকে নিয়ে,, কেউ এসেছে বউ-বাচ্চা নিয়ে। আবার কেউ কেউ এসেছে বন্ধুদের নিয়ে।

সাগরের উত্তাল ঢেউ দেখছে খেয়া। বাতাসের তীব্র তোড়ে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে খেয়ার চুল। বিরক্ত হয়ে নিজের চুলগুলো বারবার কানের পিছে গুজে দিচ্ছে কিন্তু কোনো কাজই হচ্ছে না। বিরতিহীন হাওয়া বইছে। প্রাণ ভরে শ্বাস নিলো খেয়া। চোখদুটো বন্ধ করে অনুভব করতে লাগলো সাগরের বুকে বয়ে চলা হাওয়াকে।

— খেয়া সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে। চল ফিরতে হবে। জানিসই তো বাবা দেরি করে বাড়িতে ফেরা পছন্দ করে না।

রাইসার কথায় খেয়া চোখ খুলে তাকায়। পশ্চিম আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলো সত্যি সন্ধ্যে নেমেছে ধরণীর বুকে।

— চল।

খেয়া হাঁটতে শুরু করলো। কিন্তু, রাইসা পেছন থেকে খেয়ার হাত টেনে ধরলো। খেয়া রাইসার দিকে তাকায় না শুধু বললো হাতটা ছাড়। রাইসা আরও শক্ত করে হাতটা চেপে ধরে বললো,,

– — তুই শুধু আমার দিকে একবার তাকা আমি হাত ছেড়ে দিব।

— কি সব পাগলামি করিস রাইসা!

— আমি পাগলামি করছি না তুই করছিস। মুখ লুকিয়ে রাখলেই যে তোর কান্না কেউ দেখবে না এটা তোর ভুল ধারণা।

— কাঁদ..ছি না।।।
কান্নার দমকে কথা বলতেও কষ্ট হচ্ছে খেয়ার।

— থাক আপনি কাঁদছেন না বরং আমি কাঁদছি। এখন বল না সোনা কেন কাঁদছিস? আমার কোনো কথায় হার্ট হয়েছিস? বল না খেয়ার বাচ্চা?

— আমি খেয়ার বাচ্চা না বুঝলি?

কথাটি বলার সময় খেয়া ফিক করে হেসে ফেললো। রাইসা মুচকি হাসি দেয়। এগিয়ে এসে খেয়ার চোখের জল মুছে দেয়। খেয়া রাইসার একহাত ধরে বললো,,

— পৃথিবীতে হয়তো তুই একজন আছিস যে আমাকে সত্যিকার অর্থে বুঝিস। টাকা-পয়সা,, বাড়ি-গাড়ি এগুলো থাকা ইটস নট এ বিগ ডিল। ভালো একজন বন্ধু থাকা মানেই অনেককিছু।

— তোকে ভূতে ধরেছে রে খেয়া। নয়ত এত সুন্দর করে কথা বলছিস তাও আবার আমার সঙ্গে!!

রাইসার কথায় এবার খেয়া বিরক্ত হলো। ভ্রু কুচকে বললো,,

— হ্যা ভূতে ধরেছে। এবার তোর ঘাড় মটকে দেব আমি।

কথাটি বলে দুই বান্ধবী মিলে হাসতে থাকে।

রাত আটটার দিকে খেয়া ওর নিজের বাড়িতে পৌঁছায়। গাড়ি থেকে নামতে না নামতে আব্বাসের মা দৌঁড়ে আসে খেয়ার দিকে। খেয়া উনাকে দেখে অবাক হয় কারণ উনি জানলো কি করে খেয়াই এসেছে? উনি কি খেয়ার আসার অপেক্ষায় ছিল?

— কি হয়েছে খালা? পার্স হাতে নিয়ে প্রশ্ন করে খেয়া।

— আম্মা নিজাম বাবায় বাড়িতে আইছে। আপনারে খোঁজ করতাছে কিন্তু…

— আমি এতক্ষণ বাড়িতে ছিলাম না তাই তো? তুমি যাও আমি আসছি। আর হ্যা খুব যত্ন নিয়ে আমার জন্য কফি বানিয়ে পাঠিয়ে দাও আমার ঘরে।

আব্বাসের মা চলে যায়। খেয়া স্বাভাবিক ভাবে বাড়িতে প্রবেশ করে । তখন ড্রইংরুমে খেয়ার বাবা আলতাফ খান,, ওর বড়ো ভাই নিজাম খান,, ছোট ভাই সরফরাজ খান বসে ছিল। হয়তো খেয়ার অপেক্ষায় ছিলেন তারা। খেয়াকে দেখতে পেয়ে খেয়ার বাবা উঠে এলেন। খেয়াও হাসিমুখে ওর বাবাকে সালাম দিলো। ওর বাবা সালামের জবাব দিয়ে বললেন,,

— তোর বড়ো ভাই এসেছে। কি যেন জানতে চাইছে তোর কাছ থেকে। তার সঙ্গে সুন্দরভাবে কথা বলবি।

— জি ; বাবা।

খেয়াকে সঙ্গে নিয়ে ড্রইংরুমের সোফায় বসলেন আলতাফ খান। এবার নিজাম খান প্রশ্ন করলো খেয়াকে।

— ভার্সিটিতে যাচ্ছিস না কেন?

— ভাইয়া,, ভার্সিটিতে ঝামেলা হয়েছে দুইগ্রুপের এটা তো আপনি জানেন। সেই ঝামেলার রেষ ধরেই ভার্সিটির স্টুডেন্টদের হল ছাড়া নির্দেশ দিয়েছে। হল বন্ধ তাই আমিও বাড়িতে চলে এসেছি।

— গুড। আজ সকালে শোরুমে কারো সঙ্গে তোর ঝামেলা হয়েছিল??

খেয়া অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে ওর ভাইয়ের দিকে। কারণ,, সে এই ব্যাপারে কোনো কথাই বলেনি। তাহলে উনারা ব্যাপারটা জানলো কি করে?

— প্রথমত তুই আমাদের জানাসনি। দ্বিতীয়ত,, হিরোর কি পিএ নাকি ফিএ হয় যার কারণে ফায়েজের সাথে সরফরাজের দ্বন্দ্ব হতে হতে বেঁচে গেছে। তুই ভালো থাক এটা আমরা সব ভাইয়েরা চাই। কিন্তু,, তুই যদি নিজের ভালোর ব্যাপারে গাফেল হয়ে যাস তবে আমাদের কি করার থাকবে? ভাগ্যিস শো-রুমে আমাদের লোক ছিল। নয়তো, তুই আমাদের এই ব্যাপারে কিছুই বলতি না।

— ইনাফ ভাইয়া।

খেয়ার দিকে চোখ বড়ো বড়ো করে তাকিয়ে আছে সবাই। এই প্রথম খেয়া তার বড়ো ভাইয়ের সামনে উচ্চ কন্ঠস্বরে কথা বলেছে।

— যাস্ট একটু ঝামেলা হয়েছে। আর আপনারা কিনা?? আমি আর পারছি না। আমার দম বন্ধ হয়ে আসে আপনাদের কান্ড দেখে। আমিও তো মানুষ নাকি? পথে চলতে গেলে মানুষ আমার দিকে বাঁকা চোখে তাকায়। এসবকিছুর কারণ হলো আপনারা। আপনারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে যেখানে-সেখানে মানুষকে হয়রানি করছেন। কেউ কেউ কেউ হয়তো ভুল করে ফেলেছে। কিন্তু,, কেউ কেউ তো জানেও না তারা আসলে কি অন্যায়টা করেছে? আমি আর পারছি না। আমি আমার ব্যক্তি স্বাধীনতা চাই বাবা। পান থেকে চুন খসলেই আপনার ছেলেরা গিয়ে মানুষের সঙ্গে মারপিট করে। আমি কি একবারও তাদের বলেছি ভাইয়া আপনারা গিয়ে মারপিট করু..

খেয়ার কথাটা সম্পূর্ণ হবার আগে সপাটে থাপ্পড় পরলো ওর ডানগালে। খেয়া গাল হাত দিয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো ওর বাবার দিকে। জীবনে এই প্রথম ওর বাবা ওর গায়ে হাত তুলেছে!

— তোর ভালোর জন্যই করেছে। তোর ভাইয়েরা তোকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করে কারণ বিরোধি দল যেকোনো মূহুর্তে আমাদের ক্ষতি করতে পারে। সেই ক্ষতিটা হয়তো তোরও হতে পারে খেয়া। আমাদের বাড়ি-গাড়ি, সম্পদ এসব কিছুর ক্ষতি হলে আমরা পুষিয়ে নিতে পারব। কিন্তু,, তোর ক্ষতি হলে আমরা কি দিয়ে পুষিয়ে নেব??

— একদিন দেখবে আমি মরে গেছি তোমাদের যন্ত্রণায়। আমার ভালো লাগে না এমন বন্দিদশার জীবন। আমি মুক্তপাখির ন্যায় আকাশে উড়তে চাই। কিন্তু,, তোমরা আমাকে দামি খাঁচায় বন্দি করে রেখেছো।

কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলে নিজের ঘরের দিকে চলে যাচ্ছে খেয়া। এদিকে খেয়ার কথায় ওর বাবা এবং ভাইয়েরা কেবল দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।

—————

ল্যাপটপের সামনে বসে আছে ফায়েজ। চোখে গাঢ় নীল রঙের ফ্রেমের চশমা। হাতের কাজটা সবেমাত্র শেষ করে চোখের চশমা খুলে টেবিলের ওপরে রেখে চোখদুটি হাত দিয়ে কচলে চেয়ারে মাথা এলিয়ে দেয়।

মাথার ওপর ফ্যান ঘুরছে। ফ্যানের দিকে তাকিয়ে আছে। কিছু একটা ভাবছিল যুবকটি এমন সময় মাথায় একটা দুষ্ট বুদ্ধি এলো। যেই ভাবা সেই কাজ ল্যাপটপ হাতে নিয়ে কিছু লিখে পাঠিয়ে দিলো খেয়ার কাছে। এবার অপেক্ষা ওপর পাশ থেকে কি জবাব আসে?

অপেক্ষা করতে করতে রাত তিনটা বাজে রিপ্লাই এলো,,

” স্বপ্ন দেখেছেন খুব ভালো কথা!। স্বপ্নের প্রত্যেকটা ডিটেইলস দারুণ লিখেছেন। এতটা নিখুঁত কিভাবে লিখলেন? নাকি কিছু মসলাপাতি এড করেছেন যাতে আমি দুঃখ পাই। অবশ্য আমি শেষটুকু পড়ার পর থেকে ভীষণ কষ্ট পাচ্ছি । এতটা কষ্টকর স্বপ্ন দেখার পর আপনি আবার লিখছেন কেন আমার উদ্দেশ্য ?? তবে স্বপ্নের ঘটনার সঙ্গে তো আমাদের বাস্তবজীবনের কোনো মিল নেই। শুধু একটি জায়গায় মিল আছে। আমি আর নির্বাণ মিলে আমরা হয়েছি। আপনি সেই একাই রয়ে গেছেন। একদম একা। বাস্তবে কি এমন একা থেকে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন??”

এই প্রশ্নের জবাব এবার ইমেইল নয় বরং কল করে দিবে। মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে কল দিলো কাঙ্ক্ষিত নাম্বারে। রিং পরার সঙ্গে সঙ্গে কল রিসিভ হলো,, ফায়েজ হাসে। কারণ,, সে জানে ওপর পাশে থাকা মানুষটা যে তারই কলের অপেক্ষায় থাকে।

— হ্যালো???

— এত রাতে কল দিলেন যে?

— এতরাতে কি আজ প্রথম কল দিয়েছি? রোজ কথা হয় তোমার সাথে আমার?

ওপর পাশ থেকে কোনো কথা আসে না। কেবলই কারো গাঢ় নিশ্বাসের শব্দ আসে। ফায়েজ চুপ হয়ে যায়।

— আপনি শুধু শুধু অপেক্ষা করছেন। বিয়ে করে ফেলুন। আমার চেয়েও চমৎকার মেয়ে পাবেন। কারণ,, আপনি মানুষ হিসেবে মন্দ নন। তাছাড়া,, গুড লুকিং,, ভালো লিখতে পারেন৷ একজন মানুষের এত গুন থাকতে নিশ্চিয়ই কোনো মেয়ে আপনাকে রিজেক্ট করবে না।

— কিন্তু,, তুমি আমাকে রিজেক্ট করছো খেয়া। তাও নির্বাণের জন্য।

— আমি আপনাকে নির্বাণের জন্য রিজেক্ট করছি না। অন্য কারণ আছে।

— অন্য কারণটা আমাকে বলো। এমন কি কারণ যার কারণে আমি আজ দু’বছর ধরে তোমার আগে-পিছে কাঙালের মতো ঘুরেও তোমাকে নিজের করে পাচ্ছি না।

ওপাশে থাকা খেয়া উত্তর দেয় না। ফায়েজের ভীষন অভিমান হয়৷ একসময় প্রচন্ড রেগে গিয়ে ইচ্ছেমতো বকাবকি করে কল কেটে দেয়। এটা রোজকার ঘটনা। রোজ গভীর রাতে তাদের দু’জনের কথা হয়। রোজ একই টপিক ফায়েজ খেয়াকে ভালোবাসে। কিন্তু,, খেয়া নির্বাণ নামক এক অচেনা মানুষের দোহায় দিয়ে তাকে দূরে ঠেলে দেয়৷ প্রত্যাখ্যান করে দেয় তার ভালোবাসা। রোজই এভাবেই কথা শেষে ফায়েজ বকাবকি করে কল কেটে দেয়।

ফায়েজ ল্যাপটপ খাটের ওপর ছুঁড়ে ফেলে চলে যায় ছাঁদে। ছাঁদ আজ জোছনার আলোয় আলোকিত হয়ে আছে। ব্যস্ততম নগরী ঢাকায় অসংখ্য দালানের ছাঁদে দাঁড়িয়ে অনেকেই জোছনা বিলাশ করবে৷ কেউ প্রিয়তমার কথা ভেবে, কেউ বিচ্ছেদের কথা ভাবতে ভাবতে।

পকেট থেকে সিগারেট বের করে ঠোঁটের ফাঁকে রেখে লাইটার দিয়ে আগুন জ্বালাতে গিয়েও জ্বালায় না। শা*লার এক প্রফেশনে আছে। ইচ্ছেমতো চলা যায় না। যদি ইচ্ছে মতো চলতে পারত তাহলে সবার আগে গিয়ে খেয়ার বাড়িতে যেয়ে ওর সাত ভাইয়ের সামনে গিয়ে বলতো,,

“” আপনার বোনের হাতে আমার জীবন-মরণ। আগেকার ছবিতে যেমন দেখানো হাতো দুষ্ট রাজার জীবন একটি টিয়াপাখির শরীরে থাকে ঠিক তেমনি আমার জীবন আপনার বোনের হাতে। আমি কিন্তু দুষ্ট রাজা নই। আমি একজন প্রেম পাগল। আমি আপনার বোনকে ভালোবেসে আপাতত “প্রেমে পাগল” নামক একটি সংগঠনে নিজের নাম যুক্ত করিয়েছে। ”

আফসোস হয় মাঝে মাঝে ফায়েজের। ভালোবেসে মরে যাওয়ার চেয়ে ভালোবাসা পাওয়ার আবদার নিয়ে খেয়ার ভাইদের সামনে গিয়ে দাঁড়ানো উচিত। হয়তো,, খেয়াকে পাবে নয়তো ওর ভাইদের লাইসেন্স করা বন্দুকের গুলি খেয়ে মরে যাবে। তবুও তো এর একটা বিহিত হবে।

ফায়েজের বুক চিঁড়ে দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে। দোলনায় গিয়ে বসলো। আকাশের বুকে থাকা চাঁদের দিকে তাকিয়ে অতীতের পাতায় চোখ বুলালো ফায়েজ ঠিক তখনি টুং করে মেসেজ টোন বেজে ওঠে। ফায়েজ স্ক্রীনে তাকায়। গোটা গোটা অক্ষরে লেখা।

“””আগামীকাল নির্বাণের সঙ্গে আমার এনগেজমেন্ট। আমি চাই আপনি আমার শুভদিন পাশে থাকুন। আপনি আমার স্পেশাল গেস্ট হিসেবে আসবেন। ডোন্ট ওয়ারি আমার ভাইয়েরা আপনাকে কিছু বলবে না”””

ফায়েজের মনে হলো সে এই পৃথিবীতে নেই। যেন পৃথিবীতে ভালোবেসে ব্যর্থ হওয়া প্রেমিকরা এসে ওকে এই পৃথিবী থেকে বের করে দিয়েছে। কারণ,, পৃথিবীতে এত ব্যর্থ প্রেমিকদের থাকার জায়গা কই?

কিন্তু ব্যর্থ প্রেমিক হতে রাজি নয় ফায়েজ। ভীষণ রাগ আর আত্ম অহমিকা ত্যাগ করে ফায়েজ খেয়াকে মেসেজে লিখে পাঠায়।

“আমি ভালোবাসি তোমাকে। তোমার ভাইদের ভয় পাব কেন?? তারা কি আমার ভালোবাসা প্রত্যাখান করবে?ভয় তো আমি তোমাকে পাই । কখন কি করে বসো? তবে একটা কথা জেনে রাখো খেয়া,, এনেগেইজমেন্ট হোক আর বিয়ে তোমাকে সর্বপ্রথম আমি ছুঁয়ে দেখব। তাও লাইটলি নয় একেবারে গভীর স্পর্শ যাকে বলে। তোমার হৃদয় ছুঁতে না হয় পারিনি শরীর তো পারব। তুমিই তো বলতে, তুমি না চাইলে তোমার হৃদয় আমি স্পর্শ করতে পারব না ৷ দ্যান ফাইন। আমার তোমার হৃদয় স্পর্শ করার দরকার নেই। শুধু তোমাকে স্পর্শ করতে পারলেই হলো। নির্বাণের তো তোমার শরীরটা চাই। সেই শরীরটা না হয় আগে আমি ছুঁয়ে দেখি।এন্ড আমার ক্যারিয়ারের দোহাই দিয়ে কিছু বলবে না। ক্যারিয়ার দিয়ে কি করব আমি? আগে নিজের ভালোবাসার ক্যারিয়ারটা তো বিল্ডআপ করে নেই. তারপর অন্যকিছু নিয়ে ভাবব”

ফায়েজের কাছ থেকে এমন ভয়ানক মেসেজ পেয়ে সকাল থেকে খেয়ার দুশ্চিন্তায় মাথা ব্যাথা করছে। কারণ,, সে তো জানে ফায়েজ যা বলে তাই করে।

—————–

— আচ্ছা মা কালো শার্ট পরব নাকি পাঞ্জাবি? বুঝতেই পারছি না কোনটা পরলে ভালো দেখাবে?

কনফিউজড নির্বাণ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ওপর কালো শার্ট এবং পাঞ্জাবি রেখে ওর মাকে জিজ্ঞেস করছে। ছেলের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ভাবলেন। তারপর, মুচকি হেসে বলেই ফেললেন,,

— সন্ধ্যায় এনগেজমেন্ট এখন তৈরি হয়ে কার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিস? খেয়ার সঙ্গে দেখা করবি নাকি?

নির্বাণ আয়নায় ওর মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। মাঝে মাঝে নির্বাণের ভীষন অবাক লাগে। মানে মায়েরা কি এমন জাদু নিয়ে বসবাস করে কে জানে? চট করে সন্তানের মনের খবর বুঝে ফেলে! এই যে এত আয়েজন করে কার সঙ্গে দেখা করতে যাবে এটাও ওর মা বলে ফেলেছে। ছেলেকে চুপচাপ দেখে নিলুফা কিছু বললেন না। মুচকি হেসে খাট থেকে নেমে ছেলের দিকে এগিয়ে যায়। নির্বাণের পেছনে দাঁড়িয়ে কালো পাঞ্জাবির দিকে আঙুল তাক করে বললেন,,

— অবশ্যই কালো পাঞ্জাবি পরবি। কালো পাঞ্জাবি পরলে তোকে রাজার মতো দেখা যায়। যেমন তেমন রাজা নয় একদম সুদর্শন রাজা যাকে বলে। খেয়া দেখুক সে কোন রাজ্যের রাজাকে বিয়ে করছে?

— মা তুমি বললেই তো আর আমি রাজা হয়ে যাচ্ছি না।

কালো শার্টটা আলমারিতে রাখতে রাখতে কথাটি বললো নির্বাণ। নিলুফা হাসতে হাসতে নির্বাণকে বলছেন,,

— থাক তুই রাজা না। তুই হলি পথের ভিখিরি যে কিনা একজন মেয়ের ভালোবাসা কুড়িয়ে পাওয়ার জন্য খান বাড়ির সামনে রোজ ভিক্ষা করতে যেত।

— মা???

— এখন রেগে যাচ্ছিস কেন? রাজা বলেছি ভালো লাগেনি এবার তে ভিখিরি বললাম খুশি হ। মিথ্যাও তো বলিনি। তুই খেয়াকে পাওয়ার জন্য কি কি করেছিস সব জানি আমি।

নির্বাণ পাঞ্জাবি হাতে নিয়ে ওর মায়ের সামনে এসে দাঁড়ালো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওর মায়ের বাম হাতটা ধরে বললো,,

— মা সেদিন গুলোকে মনে করিয়ে দেবার খুব কি দরকার ছিল??

— আলবাত দরকার আছে। সবসময় মনে রাখতে হয় জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস কি করে পেয়েছে। হোক মানুষ কিংবা বস্তু। মনে না রাখলি দেখবি সেই মূল্যবান জিনিসটা একসময় অপ্রয়োজনীয় কিংবা সাধারণ কিছু মনে হবে। তাই তুই সবসময় মনে রাখবি খেয়াকে পাওয়ার জন্য কত কাঠ খোর পেরিয়ে এসেছিস।

নিলুফা ছেলের মাথায় হাত রেখে কথা বলে চলে গেলেন। নির্বাণ ওর মায়ের কথাগুলো ভাবলো আসলেই তো খেয়াকে পেতে তার কত কাঠ খোর পোহাতে হয়েছে। তবুও তো দিনশেষে খেয়া তারই হতে যাচ্ছে। একান্তই নির্বাণের। ফেলে আসা দিনগুলোকে মনে করে মন খারাপের কোনো মানেই হয় না।

চট্টগ্রাম শহরের ভেতরে ছোট ছোট পাহাড় আছে। চট্টগ্রাম শহরে ঢুকতে এবং বের হতে দুটো রাস্তা ব্যবহৃত হয়। সেই দুটো রাস্তার মধ্যে একটি রাস্তা পাহাড়তলী এরিয়ার ওপর দিয়ে গেছে। পাহাড়তলী নামক এরিয়ায় তেমনই ছোট একটি পাহাড় আছে।যেখানে শেখ রাসেল নামক একটি পার্ক আছে। আছে ছোট্ট একটি জাদুঘর। যেখানে রোজ দুপুর দুটোর পরে জাদুঘরে দর্শনাথীরা প্রবেশ করতে পারে। মেইন রাস্তার পাশে জাদুঘরটি। বিশাল এরিয়া জুড়ে দেয়াল তুলে জায়গাটা বেশ সুরক্ষিত রাখা হয়েছে। গেইট খুলে ঢুকতেই একটি উঁচু রাস্তার দেখা মিলবে। পাশেই আছে শহীদ মিনারের একটি অস্থায়ী স্তম্ভ। আছে স্মৃতিসৌধ। উঁচু রাস্তা বেঁয়ে ওপরের দিকে গেলে রেলওয়ে জাদুঘরের দেখা মিলবে। জাদুঘরের ভেতরে আছে ছোটখাটো রেলওয়ে ট্র্যাক। আপাতদৃষ্টিতে ছোট বাচ্চারা এই রেলওয়ে ট্র্যাক দেখলে খেলনা ভাবতে ভুল করে না। জাদুঘরের ভেতরে আছে টেলিফোনের বিভিন্ন কালেকশন। আছে রেলওয়ের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি। ব্যস এতটুকুই ভেতরকার দৃশ্য।

বাইরে জাদুঘর থেকে একটু দূরেই ছোট একটি পাহাড় আছে। যেটা বেয়ে উঠতে কেবল বিশ থেকে পঁচিশ কদম যথেষ্ট। পাহাড়ের ওপরে বিশাল এক বট গাছ। বটগাছের সামনে সিমেন্ট দিয়ে বানানো বসার জায়গা আছে। সেই পাহাড় থেকে একটুখানি দূরে তাকালে শহরের বিভিন্ন জায়গা দেখা যায়।

— হ্যালো খেয়া কোথায় আছো???

— উপরে তাকান।

নির্বাণ মোবাইল কানে নিয়ে ওপরে তাকালো। খেয়া দাঁড়িয়ে আছে। নির্বাণ কল কেটে ছোট পাহাড়টায় উঠে খেয়ার কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়ালো তবে যথেষ্ট দূরত্ব রেখে।

— শহরে এত জায়গা থাকতে এখানেই কেন আমরা মিট করতে এলাম খেয়া?

— জায়গাটা নিরিবিলি,, দক্ষিণা বাতাস,, হৈ-হুল্লোড় নেই। আমার কাছে জায়গাটা পারফেক্ট মনে হয়েছে।তাই আপনাকে বললাম এখানে আসতে। কেন ভালো লাগছে না?

শেষের কথাটি ব্যঙ্গাতক সুরে বললো খেয়া। নির্বাণ সেদিকে খেয়াল না দিয়ে খেয়াকে বললো,,

— তুমি পাশে থাকলে আমি কবরে গিয়ে থাকতেও রাজি আছি। আর এটা তো কেবল পাহাড় মাত্র।

খেয়া হাসলো। নির্বাণ এই হাসির অর্থ বুঝলো না। খেয়া অদূরেই তাকিয়ে আছে। খেয়াকে যদি দূর থেকে কেউ দেখে তাহলে ভাববে সে হয়তো একাই এসেছে। কারণ, ওর পাশে যে নির্বাণ নামের কেউ আছে খেয়ার তাতে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই।

— কিছু বলতে চাও আমাকে নাকি?? আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নেবে?

এমন প্রশ্ন শুনে খেয়া নির্বাণের তাকালো। খেয়ার ওই এক চাহনি দেখে নির্বাণ কেমন যেন ফিল করলো! খেয়া ওকে কাছে টানছে। চুম্বকীয় আকর্ষনের ন্যায়। হলুদ রঙের থ্রি-পিছ পরা বিরক্তি চাহনি নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকা মেয়েটাকে তার চাই। পৃথিবীর সবচেয়ে চড়ামূল্য দিয়ে যদি খেয়াকে পেতে হয় তবুও নির্বাণ পেছনে হটবে না।

— অবশ্যই কিছু বলতে চাই। যার জন্য এমন একটি জায়গায় এসেছি যেন ভাইয়ার লোকেরা আমাকে দেখতে না পায়।

— ভাইদের ভয় পেয়ে কি লাভ যদি তাদের সম্মান দেখাতে না পারো?

নির্বাণের আক্রমনাত্মক কথা শুনে খেয়ার রাগ হচ্ছে কিন্তু রাগ করা যাবে না। খেয়া দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা।

— ভাইদের আমি সম্মান করি কি করি না তা নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না নির্বাণ। আপনি নিজেকে নিয়ে ভাবুন।

— সেটাই তো ভাবছি খেয়া। আজ সন্ধ্যায় আমার জীবনের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠদিন। সেই মূহুর্তটা কেমন হবে আমি কল্পনা করতে পারছি না। পারছি না বললে ভুল হবে কারণ আমার কল্পনা করতে ইচ্ছে করছে না। হয়তো সেই মূহুর্তটা আরও স্মরণীয় হতে পারে। খেয়াকে হয়তো আর সুন্দর লাগতে পারে। খেয়া আমার হতে যাচ্ছে ইত্যাদি ভাবনাগুলো কল্পনা করতে ইচ্ছে করছে না।

— আপনি যে একজন মহা পাগল আপনি জানেন?

খেয়ার বিরক্তিভরা প্রশ্ন। নির্বাণ হাসলো।

— তোমাকে চাইতে গিয়ে আমি আজ পাগল মানে মহা পাগল। কাউকে ভালোবেসে যদি মহাপাগলের তকমা পাওয়া যায় তবে মহাপাগল সেজে থাকাই ভালো।
আচ্ছা, খেয়া একটা প্রশ্ন করি??

খেয়া নির্বাণের দিকে তাকালো। নির্বাণ দুষ্ট হাসি দিয়ে খেয়ার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। একদম গা ছুঁই ছুঁই। খেয়া সরতে চায় কিন্তু পারে না। নির্বাণ খেয়ার ওড়নার কোণা ধরে ওর হাতে পেচিয়ে ধরেছে। খেয়া অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো নির্বাণের দিকে। নির্বাণ খেয়ার চোখে দৃষ্টি রেখে ফিসফিসিয়ে বলছে,,,

— মহাপাগল উপাধি দিলে আমায়। একটু তো পাগলামি সহ্য করো।

— প্লিজ ছাড়ুন।

খেয়ার বিরক্তিভরা সুর শুনে নির্বাণ খেয়ার কাছ থেকে সরে এলো। অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো খেয়ার মুখের দিকে। খেয়া কি ওকে ভুল বুঝলো? কিন্তু,, সে তো খেয়ার সঙ্গে একটু ফান করেছে।
খেয়াকে এখন কিছু বলতে ভয় করছে নির্বাণের পাছে আবার অন্যকিছু না বলে বসে।

নির্বাণ যখন আকাশপাতাল ভাবতে ব্যস্ত ঠিক তখনি খেয়া এমন কিছু বাক্য উচ্চারণ করলো যা কখনো নির্বাণ স্বপ্নেও ভাবেনি। নির্বাণ কেবল স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো খেয়ার দিকে।

—- আমাকে একজন পাগলের মতো ভালোবাসে। তাই আমি চাই না আপনার সঙ্গে আমার এনগেজমেন্ট হোক। কারণ,, তার ভালোবাসাকে আমি উপভোগ করি। তার জন্য আমি স্পেশাল কিছু ফিল ক…

— খেয়া????

খেয়া সম্পূর্ণ কথা শেষ করার আগে নির্বাণের হুংকার শুনে চুপ হয়ে গেলো। নির্বাণের চোখ দুটো রক্তিম হয়ে আসছে। বুকের মাঝে কেমন যেন অনূভুত হচ্ছে! অচেনা অনূভুতি। যেই খেয়াকে পাওয়ার জন্য জীবনে এতকিছু করলো আজ সেই খেয়া ওকে কি শোনালো? বুকভরা ভালোবাসা নিয়ে এতদিন কার অপেক্ষায় ছিল নির্বাণ?

নির্বাণ দু-হাত দিয়ে মুখটা আড়াল করে রেখেছিল এতক্ষণ। আর খেয়া নির্বাণের ঠিক হবার অপেক্ষায় ছিল। নির্বাণ মুখ থেকে হাতটা সরিয়ে নিতেই দেখলো খেয়া পর দিকে তাকিয়ে। নির্বাণ রেগে গিয়ে খেয়ার হাত চেপে ধরে বললো,,

— তুমি এত সাহস কোত্থেকে পেয়েছো? আমার হবু স্ত্রী তুমি? আমার নাম, আমার কথা তোমার মুখে থাকবে। তুমি কোন সাহসে তোমার এই মুখ দিয়ে অন্য আরেকজনের কথা আমাকে বলবে? তাও আবার তোমাকে ভালো…
আমি যে কথা সহ্য করতে পারব না তুমি সেই শব্দ আমার সামনে উচ্চারণ করলে কি করে?

—সে আমাকে ভালোবাসে। এবং আমি তার ভালোবাসাকে শ্রদ্ধা করি। ব্যাপারটা আপনি সহজ ভাবে নিন। আমাদের সবার জন্য মঙ্গল হবে।

— ব্যাপারটা আমাকে সহজভাবে নিতে বলছো? আরে সে তোমাকে ভালোবাসে আমি কি তোমাকে ভালোবাসি না খেয়া? তোমাকে আমি ভালোবাসি। তোমার অস্তিত্ব ছাড়া আমি নিজেকে কল্পনা করতে পারি না। আমি তোমাকে অনেক সুখে রাখব। প্লিজ খেয়া আমাকে নিঃস্ব করো না। ফিরিয়ে দিও না আমার ভালোবাসা।

নির্বাণের কন্ঠস্বর কাঁপছে। খেয়ার এতটা কাছে এসে দূরে যেতে হবে ভেবেই নির্বাণের মনে হচ্ছে সে আর বাঁচবে না।

—আপনি আমাকে ভালোবাসেন কিন্তু আমি তো আপনাকে ভালোবাসি না। আমি ভালোবাসি ফায়েজ চৌধুরীকে। যার এক কথায় আমি এই পৃথিবীর বাইরে যেতেও রাজি আছি। তাকে ভালোবাসার দায়ে যদি আমার কারাবাস হয় তবুও আমার আফসোস নেই মি. নির্বাণ মির্জা।

খেয়া কথাগুলো বলে পাহাড় থেকে নেমে যাচ্ছিলো কিন্তু নির্বাণ এসে খেয়ার হাত ধরে একটান দিয়ে ওকে নিজের বুকের মাঝে চেপে ধরলো। খেয়া নিজেকে নির্বাণের বুক থেকে ছাড়া পাবার জন্য ছটফট করতে থাকে কিন্তু ছাড়া পায় না। খেয়া যত ছটফট করছে নির্বাণ যেন ততই শক্ত করে চেপে ধরছে ওকে বুকের মধ্যে।

— এই বুকে আছো,, এই বুকেই তোমার বাসস্থল। তোমাকে ভালোবাসে এমন দাবি করা একশটা ফায়েজ আসলেও আমার তোমার প্রতি ভালোবাসা কমে যাবে না খেয়া। এমন কত ফায়েজ আসবে যাবে কিন্তু খেয়াকে ভালোবাসে নির্বাণ শুধু একজনই আছে এবং থাকবে।

—- আমি মরে গেলে পাবেন না তো আমায়??

নির্বাণ খেয়াকে নিজের বুক থেকে মুক্ত করে হাসি দিয়ে বললো,,

— এমন ভুল করবে না খেয়া। তুমি আত্মহত্যা করলে ওই ফায়েজকে আমি জ্যান্ত কবরে দেব। কারণ আমি চাই না তুমি অন্যকাউকে ভালোবেসে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নাও। জানো না পৃথিবীতে যাকে বেশি ভালোবাসবে তার সঙ্গেই তুমি হাশরে থাকবে। আমি চাই তুমি হাশরেও আমার সঙ্গেই থাকো।

— আমি পালিয়ে যাব ফায়েজকে নিয়ে।

খেয়ার হুমকি বার্তায় নির্বাণ রেগে তাকালো খেয়ার দিকে। তারপর,, মোবাইল বের করে কাউকে কল করে বললো,,

— ফায়েজ চৌধুরীর মৃত্যুর খবর আজ প্রতিটা নিউজ চ্যানেলে ব্রেকিংনিউজ হিসেবে দেখতে চাই।

খেয়া মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। মূর্তিমান খেয়ার দিকে তাকিয়ে নির্বাণ ডেভিল হাসি দিয়ে বললো,,

— সুইটহার্ট,, এবার আর কি করতে হবে বলো? তোমাকে পেতে যা যা করার দরকার আমি তাই করব। দরকার হলে খুনি হতেও রাজি আছি।

সবে মাত্র শুটিং শেষ করে বাড়ির পথে রওনা হচ্ছে ফায়েজ। ড্রাইভার ছাড়া আর কেউই নেই ফায়েজের সঙ্গে। আব্দুল জব্বার ছুটিতে আছে। গাড়িটা যখন নির্জন জায়গায় এলো ঠিক তখনি বিপরীতগামী একটি ট্রাকের সঙ্গে ফায়েজের গাড়ির ধাক্কা লাগে। যার ফলে ফায়েজের গাড়ি উল্টে যায়। ধীরে ধীরে রক্তে লাল হয়ে যায় পিচঢালা পথটি।

—— আপনি ফায়েজকে মারতে পারেন না। আপনার ক্ষমতা আছে বলে নিরপরাধ মানুষকে মারতে পারেন না।

খেয়া ফায়েজকে হারানোর ভয়ে কাঁপছে। খেয়াকে একপ্রকার জোর করে নির্বাণ ওর বাংলো বাড়িতে নিয়ে গেছে। খেয়ার মোবাইল ছিনিয়ে নিয়েছে নির্বাণ। খেয়া নির্বাণের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলো যে,, যেন নির্বাণ শিকারীর ন্যায় ওত পেতে আছে। সুযোগ পাওয়া মাত্র যেকোনো সময় ফায়েজকে ওর উপযুক্ত জায়গায় পাঠিয়ে দেবে। খেয়ার হাত এখনো নির্বাণের হাতে বন্দি। খেয়া হাত ছাড়াতে চেষ্টা করছে কিন্তু নির্বাণের বলিষ্ঠ হাত থেকে ছাড়া পাওয়া মুশকিল।

— ছাড়াতে পারবে না জেনেও কেন এত কষ্ট করছো সুইটহার্ট? এই হাত আর কখনোই ছাড়ব না। ওই দু’টাকার হিরোর জন্য চোখের পানি ফেলা বন্ধ করো। তোমার চোখের পানি অন্যকারো জন্য ঝড়ছে দেখলেই হৃদয় পুড়ে যাচ্ছে আমার।

নির্বাণের কথা শুনে খেয়ার গা ঘিনঘিন করছে। একটা মানুষ কতটা বেহায়া হলে এমন আচরণ করতে পারে!

—- ফায়েজ দু’টাকার হিরো না। ও আমার হৃদয়ের একছত্র মালিক। বুঝতেই পারছেন ও কতটা ধনী। আর আপনি এত টাকার মালিক অথচ আমার ভালোবাসা পাওয়ার জন্য ভিক্ষা চাইছেন। ফায়েজকে পথ থেকে সরিয়ে দিতে চাইছেন। ফায়েজ-খেয়া একে অপরের পরিপূরক। সেখানে নির্বাণ নামক একটা ঝড় শুধু তান্ডব চালাতে পারবে, ধ্বংস করতে পারবে না।

— ডোন্ট ইউ ডেয়ার খেয়া। আমার রাগ উঠাবে না।

নির্বাণ রেগে গিয়ে খেয়ার গাল চেপে ধরলো। খেয়া নড়ে না কেবল নির্বাণের দিকে ঘৃনাভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। খেয়ার ওই দৃষ্টিকে উপেক্ষা করতো চাইলো না নির্বাণ। ঘৃণাই সই তবুও তো খেয়া তাকিয়েছে তারদিকে। খেয়ার ওই একটুখানি চাহনি পেলেই নির্বাণ জীবন কেটে যাবে অনন্তকাল।

— বস,, হিরোরে ধইরা আনছি।

খেয়া এবং নির্বাণ দুজনেই সদর দরজার দিকে তাকালো। খেয়া স্তব্ধ হয়ে গেছে আর নির্বাণ নির্দয়ের ন্যায় হেসে ফেললো। খেয়াকে নিয়ে এগিয়ে চললো দরজার পানে। খেয়া কাঠ পুতুলের ন্যায় তাকিয়ে রইলো ফায়েজের দিকে। ডানপাশের ভ্রু দেখা যাচ্ছে না,, কপালের রক্ত টপটপ করে পরছে মেঝেতে । ঠোঁটের একপাশে কালসিটে পরে আছে। শরীর অসার হয়ে আসছে,, দুটো পায়ে নেই শক্তি যেন ফায়েজের । নির্বাণের দলের দুটো মানুষ ফায়েজের হাতদুটি ধরে কোনমতে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। ফায়েজ নিভু নিভু চোখে তাকিয়ে আছে খেয়ার দিকে। যদিও খেয়াকে ঝাপসা দেখছে ফায়েজ। ফায়েজের অতি নিকটে আসার পর খেয়া নিজেকে আটকাতে পারছে না। ছুটে গিয়ে ফায়েজকে ধরতে চাইলো কিন্তু নির্বাণের অসুর শক্তির কাছে দমে যায় খেয়ার শক্তি। তবুও, থেমে নেই খেয়া ছুটে যাওয়ার আপ্রান্ত চেষ্টা করছে।

— নির্বাণ… আমাকে যেতে দিন ফায়েজের কাছে। ও মরে যাবে। নির্বাণ ওকে হসপিটালে নিতে হবে । ফায়েজের শরীরের রক্ত সব ভেসে যাচ্ছে নির্বাণ। আমার ফায়েজ মরে যাচ্ছে।

খেয়া পাগলের ন্যায় ফায়েজের কাছে ছুটে যাওয়ার চেষ্টা করছে। নির্বাণ খেয়াকে দেখছে শুধু।

—খে…য়া???

খেয়া থমকে দাঁড়ালো। নির্বাণের দিকে একপলক তাকিয়ে ফায়েজের দিকে তাকালো অসহায় দৃষ্টিতে। এতটা অসহায়,, দূর্বল আগে কি কখনো হয়েছিল খেয়া?? হ্যা আগেও খেয়া দূর্বল ছিল আজও দূর্বল। শক্তিশালী হলে সেই কবে ফায়েজকে জয় করে নিত।

— বাহ্, হিরোর তারিফ করতেই হয়। এতটা জখম হওয়ার পরও জবানে খেয়ার নাম! বাহ্ চমৎকার। আরও দু’চারটা গুলি খেলে খেয়াকে কেন এই পৃথিবীকে ভুলে যাবে …

নির্বাণ ডানহাত দিয়ে পিস্তল তাক করলো ফায়েজের দিকে। খেয়ার হাত তখনও নির্বাণের বামহাতে বন্দি। খেয়া ছুটাছুটি করার চেষ্টা করতেই নির্বাণ চিৎকার করে খেয়াকে বললো,,

— ডোন্ট ইউ ডেয়ার খেয়া! ওয়ার্নিং করছি তোমাকে। আমার সামনে দাঁড়িয়ে এই হিরোর জন্য লাফাবে না। পরিণাম যা দেখছো তার চেয়েও খারাপ হবে।

— পরিণাম আর কি খারাপ হবে?? শুধুমাত্র ফায়েজ আমাকে চায় বলে তাকে আপনি মেরে ফেলতে চাইছেন??

খেয়া চেঁচিয়ে উঠলো। নির্বাণ খেয়ার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে উল্টো ফায়েজকে ধরে থাকা মন্টুকে আদেশ করলো,,

— যতক্ষণ পর্যন্ত না দেহ থেকে রুহ আলাদা না হচ্ছে ততক্ষণ অব্দি তোরা ওকে পাহারা দিবি। মরে টরে গেলে সোজা কর্ণফুলি নদীতে গিয়ে ফেলে আসবি রাতের বেলা।

নির্বাণের কথা শুনে খেয়া এবং ফায়েজের চোখাচোখি হলো। ওই এক পলকের চাহনিতে লুকিয়ে ছিল ভালোবাসা না পাওয়ার ব্যর্থতা৷ খেয়ার টলমলে চোখ দেখে ফায়েজের হৃদয় ভেঙে ভেঙে পরেছে। শরীরটা তো সেই কখনো থেকে মস্তিষ্কের ইশারায় সাড়া দিচ্ছে না।

এরপর,, খেয়ার হাত ধরে টানতে টানতে নির্বাণ একটি রুমের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু,, খেয়া নড়তে চাইছে না। যার কারণে নির্বাণ একপ্রকার খেয়াকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। নির্বাণ এবার শরীরের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে খেয়াকেনে নিয়ে যাচ্ছে। খেয়া এবার না পেরেই নির্বাণের পা জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে। খেয়ার কান্না দেখে নির্বাণ বিস্মিত হয়ে গিয়েছে। ফায়েজ তাকিয়ে আছে প্রিয়তমার দিকে। যেই প্রিয়তমার হাসির কারণ হতে চেয়েছে সবসময় আজ সেই প্রিয়তমার কান্নার কারণ হয়েছে। এতটা ভালোবাসা বুকে নিয়ে ছিল খেয়া অথচ ফায়েজ টের পেলো না। রোজই মনে হতো খেয়া ওকে চায় না,, ভালোবাসবে এটা তো ছিল কল্পনার বাইরে ছিল।

নির্বাণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে খেয়ার উদ্দেশ্য বললো,,

— আমার পা ছেড়ে দাও এবং উঠে দাঁড়াও খেয়া।

খেয়া উঠে না বরং আর কান্না করতে থাকে। নির্বাণ শেষমেশ বিরক্ত হয়ে খেয়ার ডান বাহু ধরে টেনে দাঁড় করালো। খেয়ার চোখ নাক অতিরিক্ত লাল হয়ে গিয়েছে কান্নার ফেলে। নির্বাণ হাত বাড়িয়ে খেয়ার চোখের পানি মুখে দিতে যায় কিন্তু খেয়া বাঁধা দেয়ায় পারে না। নির্বানের চোখেমুখে কাঠিন্যতা বজায় রেখে খেয়াকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করছে,,

— তুমি কি চাইছো আমি ফায়েজকে এখুনি মেরে ফেলি??

— না না নির্বাণ। এমন কাজ ভুলেও করবেন না। আমি মরে যাব ওকে ছাড়া। ফায়েজকে মুক্তি দিন। ওকে হসপিটালে ভর্তি করাতে হবে। দেখুন না ফায়েজ নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে।

খেয়া কাঁদে। পাষাণ নির্বাণ তাকায় না। ফায়েজ ততক্ষণে চেতনা হারিয়ে মেঝেতে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে।

— ওকে ; ফায়েজকে হসপিটালে পাঠাবো আমি। কিন্তু, আমার একটি শর্ত আছে।

খেয়া খুশি হয়ে নির্বাণের শর্ত মানতে রাজি হয়ে গেলো। নির্বাণ একগাল হেসে খেয়ার সম্মুখে দাঁড়িয়ে ডানহাতের তর্জনী আঙুল দিয়ে খেয়ার গালে স্লাইড করতো যায়। খেয়া পেছনে সরতে গেলে নির্বাণ বামহাত দিয়ে খেয়ার কোমড় জড়িয়ে ধরে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নেয়। খেয়া নির্বাণের সংস্পর্শ থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে কিন্তু নির্বাণের শক্তির সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে পারছে না

— কি ধরণের অসভ্যতা ??

—সুইটহার্ট,,কিসের অসভ্যতা? প্রতিদিন,, ঘন্টায়,, মিনিটে, সেকেন্ডে তোমাকে আমি এভাবে জড়িয়ে রাখতে চাই। তোমাকে ইসলামী রুল অনুযায়ী বিয়ে আজই করব আমি। তুমি বিয়ে করতে রাজি হলে ফায়েজ হসপিটালে যেতে পারবে। নয়তো..।

— দ্যাটস ইউর ড্রিম নির্বাণ মির্জা। আমি আপনাকে স্বজ্ঞানে কখনো বিয়ে করবো না।

— খেয়া তুমিই বলেছো আমার শর্ত মানবে তাই বললাম। নয়তো,, শর্ত খেলা বাদ দাই আমরা। এমনিতেই তোমার সঙ্গে আমারই বিয়ে হবে। তবে এত কসরত করে বিয়ে করার মানেই হয় না। ফায়েজ মরে যাক মাঝখান দিয়ে আপদটাও বিদায় হবে। তোমার আমার বিয়েও হবে।

— নির্বাণ????

— ডোন্ট সাউট খেয়া। আমিও চিৎকার করতে পারি। আজ এই বাড়ি থেকে ফায়েজের লাশ বের হবে। এখন তুমিই বলো তুমি কি করবে??

নির্বাণ খেয়াকে এক ঝটকায় নিজের কাছ থেকে খেয়াকে সরিয়ে দেয়। তারপর,, কোথাও যাওয়ার জন্য উদ্ধৃত হয় কি মনে করে খেয়াকে উদ্দেশ্য করে নির্বাণ বলে উঠলো,,,

— আমি হিংসুটে মানুষ। আমার ভালোবাসা অন্যকারো হবে এটা ভাবতেও আমার ভালো লাগছে না। তোমাকে পাওয়ার জন্য যদি আরও খুন করতে হয় তবে আমি সেটাও করতে রাজি আছি।

নির্বাণ চলে গেলো সেখান থেকে। নির্বাণের সাথে সাথে সেই দুজনও চলে গেলে যারা এতক্ষণ ফায়েজের পাশেই ছিল।

পুরো ড্রইংরুমে পিনপতন নীরবতা। সাদা মেঝের রঙ ফায়েজের রক্তে রঞ্জিত। খেয়া কাঁদতে কাঁদতে ফায়েজের সামনে গিয়ে বসলো। ফায়েজের গালে হাত রেখে কয়েকবার ডাক দিলো কিন্তু ফায়েজের কোনো রেসপন্স নেই। একদিকে ভালোবাসা,, অন্যদিকে ভালোবাসার মানুষের মৃত্যু। যেকোনো একটা বাছাইয়ে খেয়ার লোকসান হবে। একটামাত্র জীবনে একটামাত্র হৃদয়। সেই একমাত্র হৃদয়কে ধোঁকা দেয়া যায়? খেয়া কি করবে?

— ফায়েজ আপনার ভালোবাসাকে বুকে আগলে ধরে বাঁচতে চাইলে আপনাকে বাঁচতে দেবে না নির্বাণ। যদি আপনাকে বাঁচাতে চাই তবে আপনাকে ভুলে নির্বাণের হতে হবে। আমি এরমধ্যে কোনোটাই করতে পারব না। ও আল্লাহ আপনি আমাকে কোন পরীক্ষায় ফেললেন। আমি মরে যাব নির্বাণ,, আ..মি ফায়েজকে ভালোবাসি৷ ফায়েজ আমাকে ছাড়া বাঁচবে না। নির্বাণ…

কাঁদছে খেয়া। খেয়ার কান্না কেউ শোনার মতো নেই।ড্রইংরুমে বসে খেয়া কাঁদছে। দোতলা থেকে খেয়াকে ফায়েজের জন্য ছটফট করতে দেখছে নির্বাণ। খেয়ার বলা এক একটি শব্দ আজ নির্বাণকে ভেঙেচুরে দিচ্ছে। যাকে জীবনের চেয়েও ভালোবাসে সে অন্য একজনকে ভালোবাসে।

ধীরে ধীরে নির্বাণ এগিয়ে যায় খেয়ার দিকে। কারো পদধ্বনি শুনে খেয়ার কান্না বন্ধ হলো। তাকিয়ে দেখলো নির্বাণ এসে ওর পাশে দাঁড়িয়েছে। চোখের পানি মুছে উঠে দাঁড়ালো খেয়া। এরপর,, নির্বাণের সামনে দাঁড়িয়ে দূর্বল কন্ঠে বললো,,,

— আমি আ.পনাকে বি.. বি..য়ে করতে রাজি।

নির্বাণের মনে হলো সে ভুল শুনতে পাচ্ছে। তাই তো খেয়াকে আবারও কথাটি রিপিট করতে বললো। খেয়া দ্বিতীয়বারের মতো বলে উঠলো,,

— আমি আপনাকে বি..য়ে করতে রাজি কিন্তু আমার একটা শর্ত আছে। এবং সেই শর্ত পূরণ হলে আমি বিয়ের পিড়িতে বসব নয়তো.. ফায়েজের সঙ্গে আজ খেয়ার লাশ বের হবে এই বাড়ি থে…

খেয়ার কথাটি পূর্ণ করার আগে নির্বাণ থামিয়ে দেয়। ফায়েজের মৃত্যু হয় হোক কিন্তু খেয়ার মৃত্যু নির্বাণ সইতে পারবে না।

— আমি রাজি আছি। বলো কি শর্ত?

খেয়া ফায়েজের দিকে তাকিয়ে অনর্গল কথাগুলো বলে চুপ করে রইলো। আর নির্বাণ চোয়াল শক্ত করে তাকিয়ে আছে খেয়ার দিকে। আর খেয়া তাকিয়ে আছে অচেতন হয়ে পরে থাকা ফায়েজের দিকে। ফায়েজ তো জানে না ওর জীবন কোন মোড়ে যাচ্ছে। কখনো কি এই পৃথিবীর মুখ দেখবে নাকি হারিয়ে যাবে?

ভালোবাসার এক কঠিন সমীকরণের মাঝে আটকা পরেছে তিন তিনটি জীবন। কার হৃদয় ভেঙে কার হৃদয় জোড়া পাবে কে জানে?

— ফায়েজকে আগে হসপিটালে পাঠানোর ব্যবস্থা করবেন। ইনশাল্লাহ আল্লাহ চাইলে ফায়েজ সুস্থ হবে। ফায়েজ সুস্থ হলে আমার ওর সঙ্গে একান্তে কথা বলার ব্যবস্থা করিয়ে দিবেন। এবং ফায়েজ সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরে গেলে আমি আপনার হবো নির্বাণ মির্জা।

খেয়ার শর্ত শুনে নির্বাণের মাথায় দপ করে আগুন জ্বলে উঠে। রেগে গিয়ে খেয়াকে কিছু বলতে যাবে তার আগে খেয়া বলে উঠলো,,,

— কথা না বাড়িয়ে ফায়েজকে বাঁচান তবেই আমাকে পাবেন। নয়তো,, আমিও ফায়েজের সঙ্গে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে প্রস্তুত আছি। যেই পৃথিবীতে ফায়েজের আনাগোনা নেই সেই পৃথিবীত থেকে আমি কি করব?

নির্বাণ খেয়াকে কিছু কড়া কথা শোনাতে চায় কিন্তু পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে চুপ করে কেবল শুনেই যাচ্ছে।

— আপনি আমার শর্ত মানছেন তো ??

ভাবলেশহীন খেয়া ফায়েজের মুখের দিকে তাকিয়ে নির্বাণকে প্রশ্ন করলো। নির্বাণ রেগে গিয়ে খেয়ার হাত ধরে নিজের দিকে টেনে এনে বললো,,

— তোমার শর্ত শোনার পর এখন আমারও কিছু শর্ত রাখা জরুরি মনে হচ্ছে। এবং তোমার শর্ত আমি তখনই মানব যখন তুমি আমার শর্ত মানবে।

নির্বাণের কথা খেয়া বিদ্রুপের হাসি দেয়। সেই গা জ্বালানো হাসি দেখেও নির্বাণ না দেখার ভান করে। কারণ,, খেয়া চাইছে কথার মারপ্যাচে ফেলে ওর কাছ থেকে ছুটে যেতে। নির্বাণ কি কম বুঝে? সেও জানে কাকে কিভাবে বশে আনতে হয়?

— বলুন আপনার শর্তগুলো??

— আমাদের বিয়েতে যদি কখনো ডিভোর্সের প্রয়োজন হয় তবে সেই অধিকার শুধুমাত্র আমার থাকবে। তুমি কখনোই আমাকে ডিভোর্স দিতে পারবে না।

খেয়ার হাত ছেড়ে দিয়ে নির্বাণ মোবাইলের স্ক্রীণে চোখ রেখেই নিজের শর্ত উপস্থাপন করলো খেয়ার সামনে। খেয়া অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো নির্বাণের দিকে। নির্বাণ ষষ্ট ইন্দ্রিয় জানান দেয় খেয়া তার দিকেই তাকিয়ে আছে।

— বাই এনি চান্স বিয়ের পর যদি তুমি আমাকে ডিভোর্স দিয়ে ফায়েজের কাছে চলে যাও? তাই ছোট একটা ব্যবস্থা করে রাখছি যেন পরবর্তীতে আমার কোনো অসুবিধা না হয়।

— এতদূর অব্দি ভেবে রেখেছেন!!

—আমি ফায়েজকে সহ্য করতে পারি না তোমার পাশে। ও মরে গেলে আমার পথ ক্লিয়ার। আমাকে কেউ আটকাতে পারবে না তোমাকে আমার একান্ত বাধ্যগত স্ত্রী হিসেবে পাওয়ার জন্য। কিন্তু,, তুমি এখন কি চাইছো!! আমি যেন ফায়েজের সুস্থতার ভার নেই। তবেই তুমি আমার হবে নয়তো নয়। আমি তোমাকে পাওয়ার জন্য সবকিছুই করতে রাজি আছি খেয়া। ফায়েজের সুস্থতা তো সামান্য একটা জিনিস মাত্র। কিন্তু,, ফায়েজের সুস্থতার পর তুমি যদি আমাদের সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে যেতে চাও তখন তো তোমাকে পাওয়ার জন্য আমার এত পরিশ্রম সবকিছুই শূন্যে নেমে আসবে৷ এখন তুমিই বলো কি করবে???

— আপনি ফায়েজকে হসপিটালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করুন। ভয় পাবেন না আমি আপনার সব শর্ত মেনে নিলাম। ফায়েজের সুস্থতা আমার কাছে সবকিছুর উর্ধ্বে।

খেয়ার চোখের জল দুফোঁটা গড়িয়ে পরলো। সেই একটুখানি দৃশ্য যেন নির্বাণের জন্য বড্ড পীড়াদায়ক। প্রিয়তমার চোখে আজ আবারও নির্বাণ নীচু হয়ে গেলো। আফসোস নেই নির্বাণের ; খেয়ার দেয়া শত ঘৃনা নিয়ে নির্বাণের দিনগুলো কেটে যাবে। শুধু খেয়াকে রোজ সকালে ঘুম থেকে জাগার পর একটুখানি দেখলেই চলবে

নির্বাণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে মন্টুকে কল করে বললো গাড়ির ব্যবস্থা করতে ফায়েজকে হসপিটালে নিতে হবে।

হসপিটালের করিডরে দাঁড়িয়ে আছে খেয়া। অপারেশন থিয়েটারের দরজার দিকে তাকিয়ে অধির অপেক্ষায় আছে, কখন কে এসে ফায়েজের সুস্থতার খবর জানাবে? খেয়ার চোখের পানি জমা হবার আগে খেয়া টিস্যু দিয়ে মুছে ফেলছে। যাকে পাবে না তার জন্য চোখের জল ফেলে কি লাভ? কিন্তু,, হৃদয়ের দোষ দিয়ে কি লাভ?? হৃদয় কি জানে একটা নিষ্ঠুর,, নির্দয়,, জালেমের কাছে খেয়া আজ কতখানি বন্দি হয়ে গিয়েছে?

খেয়ার থেকে একটুখানি দূরে দাঁড়িয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে নির্বাণ। খেয়া যে লোকচক্ষুর আড়ালে নিজের চোখের জল লুকাতে ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সবটাই দেখছে। কিছুসময় আগেও খেয়ার প্রতি ভীষণ রাগ হচ্ছিল কিন্তু এখন আর সেই রাগ হচ্ছে না।

চাইলেই তো আর হৃদয়কে শরীর থেকে আলাদা করা যায় না। আমরা যাকে ভালোবাসি তারা আমাদের হৃদয় হয়ে যায়। আর সেই হৃদয়কে ভুলে অন্য কারো হয়ে যাওয়া ব্যাপারটা শরীর থেকে হৃদয়কে আলাদা করে ফেলার মতো জঘন্য একটা ব্যাপার কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ঘটে। যেমনটা খেয়ার ক্ষেত্রে হয়েছে। যদিও খেয়া কিংবা ফায়েজ অনিচ্ছাকৃত ভাবেই এমন একটা পরিস্থিতিতে পরেছে।

— ভাই,, সব ঠিক কইরা ফেলছি। মিডিয়া,, পুরো হসপিটালে আসা মানুষজন কেউ জানবে না ফায়েজ চৌধুরী এই হসপিটালে মূমুর্ষ অবস্থায় আছে। শুধু কয়েকজান ডাক্তার আছে যারা জানে এই ব্যপারটা। রোগীর খবর ডাক্তার না জানলে কেমনে হবে ভাই??

নির্বাণ যেন শুনেও শুনলো না। মোবাইল স্ক্রল করতে করতেই মন্টুকে ডাক দেয়।

— মন্টু???

—- জী ; ভাই।

— আমি ভীষণ খারাপ মানুষ তাই না রে??

নির্বাণের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে মন্টু। দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে নির্বাণের সঙ্গে আছে। খুব কাছ থেকে নির্বাণকে দেখেছে। রাজনীতির বাইরে অন্যরকম এক মানুষ। হ্যা রাজনীতির সুবাধে দু’একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা তার হাতেই ঘটেছে। কিন্তু,, পার্সোনাল লাইফে খুবই সাধারণ একজন মানুষ। হয়তো, আজকের ঘটনাকে কেন্দ্র করেই নির্বাণ বিষন্নতায় ভুগছে। মন্টু নিজেকে সামলে নিয়ে নির্বাণকে আস্বস্ত করতে বললো,,

—- ভাই ভুল-সঠিকের ক্যাটাগরি দিয়ে মানুষ তৈরি। আপনার ভালো কাজের মাধ্যমে ভুলগুলো আড়ালে থেকেই যায়। আপনি আমার কাছে ভালো মানুষ।

— তারমানে বাকিদের কাছে আমি কেমন সেটা জানিস না?

নির্বাণের এই কথার কোনো জবাব নেই মন্টুর কাছে। মাথা নীচু করে রেখেছে মন্টু। এমন সময় হসপিটালে কোত্থেকে এসে খেয়ার বড়ো ভাই হাজির। উনাকে দেখে উদ্ভান্ত্র দেখাচ্ছে। নির্বাণের সামনে এসে ওর পাঞ্জাবি কলার ধরে বললো,,

— হাউ ডেয়ার ইউ নির্বাণ! আমার বোনকে তুমি এতক্ষণ অব্দি আঁটকে রেখেছো! দুপুর পেরিয়ে, বিকেল গড়িয়ে এখন সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। তুমি বুঝতে পারছো এতক্ষণ অব্দি খেয়াকে না পেয়ে আমাদের কি অবস্থা হয়েছিল? খেয়া কোথায় এখন??

পাঞ্জাবির কলার থেকে নিজামের হাত সরিয়ে দিয়ে নির্বাণ ঠোঁটের কোণে হাসি বজায় রেখে অত্যন্ত বিনয়ী হয়ে বললো,,

— সন্ধ্যায় আমাদের জীবনের এতবড়ো একটা টার্নিং পয়েন্ট আসতে চলেছে । তাই সেই বিষয় নিয়ে আলাপ করতে করতে একটা ঝামেলায় পরেছিলাম। অবশ্য সেই সমস্যার সমাধান আমি করে ফেলেছি এবং খেয়াও ভালো আছে। ওই যে খেয়াকে দেখা যাচ্ছে।

কথাগুলো নিজামকে বলে খেয়াকে দেখিয়ে দিলো নির্বাণ। নিজাম খান নির্বাণের কাছ থেকে সরে এসে খেয়ার কাছে যাচ্ছেন। খেয়া তখন ওপর ওয়ালার কাছে ফায়েজের সুস্থতা কামনা করছিল। এমনসময় ওর ভাই নিজামের কন্ঠস্বর পেয়ে অবাক হয়। পেছনে ঘুরে তাকিয়ে দেখলো সত্যি ওর ভাই এসেছে। নিজাম দ্রুত খেয়ার সামনে এসে দাঁড়ালেন। খেয়ার চেহারা দেখেই বুঝতে পারলেন নিশ্চয়ই কোনো অঘটন ঘটেছে।

— হসপিটালে কেন এসেছিস, খেয়া??

অভিমানী খেয়া জবাব দেয় না। নিজাম দ্বিতীয় জিজ্ঞেস করলো,, খেয়া উত্তর দেয় না দেখে বিরক্তিকর শ্বাস ছেড়ে নিজাম বললেন,,

— কি এমন অপরাধ করেছি যার কারণে এভাবে আমাদের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিস??

— অপরাধ করেছো ভাইয়া। ভীষণ অন্যায় করেছো আমার সঙ্গে। আমি তোমাদের একটা মাত্র বোন। সেই একটা বোনের সুখের দিকে তাকালে না তোমরা! ঐশ্বর্য,,ধন-রত্ন দিয়ে আমি কি করব? আমার তো একটা ভালো মনের মানুষের প্রয়োজন ছিল। যার কাছে হৃদয়ের ভার দিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতাম। কিন্তু,, ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আমি কি চেয়েছিলাম আর কি পেলাম তারই হিসেব মেলাতে পারছি না। ফায়েজকে ছাড়া খেয়া অসম্পূর্ণ।

খেয়ার কথাগুলো মনেই রয়ে গেলো। ভাইকে বললো না। কারণ,, তার ভাইয়ের কাছে ফায়েজ একজন অত্যন্ত খারাপ চরিত্রের মানুষ। ওমন নায়কদের সঙ্গে কেবল রিলসে সুখী সুখী সংসার মানায়। রিয়েল লাইফে মোটেও সম্ভব না। কারণ, নায়কেরা হাজবেন্ড ম্যাটিরিয়ালে তৈরি হয় না।

— তোকে আমি কিছু জিজ্ঞেস করছি খেয়া???

— ফায়েজ ভীষণ অসুস্থ। তাই হসপিটালে এসেছি।

খেয়া নির্লিপ্ত কণ্ঠে জবাব দেয়। নিজাম কিছুটা অবাক হলো ফায়েজের অসুস্থতার কথা শুনে। কারণ,, সোশ্যাল মিডিয়ায় নায়কদের একটু কিছু হলে ফলাও করে খবর ছাপা হয়। সেখানে ফায়েজে চৌধুরী হসপিটালে ভর্তি কোনো গুঞ্জন নেই, না আছে সাংবাদিকদের মাতামাতি!

— তুই জানলি কি করে ফায়েজ চৌধুরী অসুস্থ??

নিজাম সন্দিহান হয়ে খেয়ার কাছ জানতে চাইলো। এমন সময় খেয়া দেখতে পেলো নির্বাণ ওদের দিকে এগিয়ে আসছে। খেয়া সেই সুযোগে ওর ভাইকে উদ্দেশ্য করে বললো,,

— ফায়েজের অসুস্থতার পেছনে নির্বাণ একমাত্র দায়ী। ওকে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছে শুধুমাত্র আমাকে ব্ল্যাকমেইল করে বিয়েতে রাজি করানোর জন্য।

ব্যস এই দুটো বাক্য যথেষ্ট ছিল নিজামের জন্য। আর রইলো নির্বাণ সে তে পারছে না খেয়াকে কিছু একটা বলতে । নির্বাণের সব প্ল্যানে এভাবে পানি ঢেলো দিলো মেয়েটা!

চলমান…….