Home "ধারাবাহিক গল্প হৃদয় হারানো বিজ্ঞপ্তি হৃদয় হারানো বিজ্ঞপ্তি পর্ব-১৩ এবং শেষ পর্ব

হৃদয় হারানো বিজ্ঞপ্তি পর্ব-১৩ এবং শেষ পর্ব

0
776

#হৃদয়_হারানো_বিজ্ঞপ্তি
#শেষ_পর্ব
#Tahmina_Akhter

— তুমি একজন খুনি!! আমি তো তোমাকে ভালোবাসিনি,, তোমার এই বিকৃত ব্যক্তিত্বকে ভালোবাসিনি,, তোমার চোখের এই কঠোর দৃষ্টি,,এসবের মধ্যে কোনো কিছুকেই তো আমি ভালোবাসিনি। তুমি এতটা বদলে গিয়েছো???

— তোমার কারণেই আমি বদলে গিয়েছি নির্বাণ। শুধুমাত্র তোমার কারণে। আমি তোমাকে নিয়ে বাঁচতে চেয়েছিলাম কিন্তু তুমি কি করলে? তোমার ভাইয়ের একতরফা ভালোবাসা তাকে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য সুইসাইড করলে!!! তুমি শুধু তোমার ভাইয়ের দিকটা দেখলে,, আমার কথা একটিবারও ভাবলে না? তুমি বিহীন আমার এই জীবন কাটবে কি করে একবারও ভেবেছিলে তুমি?

খেয়ার চোখে জল। চোখে কোনো কিছু হারিয়ে ফেলার ক্ষোভ। বাবার ভালোবাসা,, স্নেহ কেমন হয় কখনো অনুভব করতে পারেনি। মায়ের কাছে একাকিত্বকে পুঁজি করে বড়ো হওয়া মেয়েটা যখন কারো ভালোবাসার সংস্পর্শে এলো,, সেই ভালোবাসাকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাইল ঠিক সেই মূহুর্তে সেই মানুষটা তাকে ফেলে চলে গেল অসীম যাত্রায়। ওর চেয়ে হতভাগী এই দুনিয়াতে আর কে হতে পারে??

— আমি সুইসাইড করিনি। শুধু শুধু বানোয়াট ভ্রুম মস্তিষ্কে ধারণ করো না। লিভার ক্যান্সারের লাস্ট স্টেজে ছিলাম আমি যখন জানতে পারি। তখন চাইলেও কিছু করতে পারতাম না। ডক্টর বলেছিল আল্লাহ চাইলে তিনমাস বা বড়োজোর ছয়মাস বেঁচে থাকব। কিন্তু,, তাকদিরে হয়তো অন্যকিছুই লেখা। তাই তো অসুস্থের পনেরোদিনের মাথায় হসপিটালে এডমিট হতে হলো। তখনি বুঝতে পেরেছিলাম আমি আর বাড়িতে ফিরে যেতে পারব না। শেষবারের মত মা’কে আর তোমাকে দেখতে চাওয়ার জন্য ডক্টরের কাছে অনুরোধ করেছিলাম। ডক্টর আমার অনুরোধ রেখেছিল। আল্লাহ হয়ত আমার মনের চাওয়া পূরণের জন্য কিছু সময় বরাদ্দ করেছিলেন তখন। তুমি এলে মাকে নিয়ে,, তোমাদের দেখেই শান্তির নিঃশ্বাস ত্যাগ করলাম এই ধরণীর বুকে শেষবারের মত।

নির্বাণ কাঠ কাঠ গলায় অর্ণগল কথাগুলো বলে ক্ষান্ত হলো। খেয়া কাঁদছে। কাঁদতে কাঁদতে জিজ্ঞেস করল,,

— একটিবার কেন আমায় বুঝতে দিলে না নির্বাণ যে তুমি চিরতরে আমায় ফেলে চলে যাবে?? হুট করে এত বড় একটা দুঃসংবাদ আমি সামাল দিতে পারব কিনা একটিবারও ভাবলে না। তুমি খালি নিজের দিকটাই ভাবলে??

নির্বাণ শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে। খেয়া জানে না আদৌও সামনে বসে থাকা মানুষটা সত্যিকার অর্থে নির্বাণ কি না?? তবুও নির্বাণ ভেবে মনের সকল দুঃখকে প্রকাশ করে নিজেকে হালকা করতে চাইছে। এত এত দুঃখ,, প্রিয়জন হারানোর বেদনার ওজন বইতে বইতে বড্ড ক্লান্ত হয়ে পরেছে খেয়া। নির্বাণকে শেষবারের মত আরেকটি প্রশ্ন করল খেয়া।

— কেন সকল স্বয়-সম্পতি ভাগ বন্টনের দলিলের সঙ্গে একটি লিখিত কাগজে কেন বলে গিয়েছিলে তোমার ভাইকে জীবনসঙ্গী করার কথা?? তুমি জানতে না আমি তোমাকে ছাড়া নিজের পাশে আর কাউকে ভাবতে পারি না। কি করে তুমি আমার কাছে তোমার ভালোবাসা দাম দেয়ার বিনিময়ে তোমার ভাইকে বিয়ে করার কথা বলেছিলে??

— কারণটা আমি নয় ভাই তোমাকে বলতে পারবে। আমি শুধু চাই তুমি ভালো থাকো। আমার পরে এই পৃথিবীতে তোমাকে কেউ যদি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে তাহলে সেটা হবে ফায়েজ চৌধুরী। তোমার বর্তমান স্বামী এবং আমার ভাই। কেন কথাটি বললাম ভবিষ্যতে টের পাবে?

কথাগুলো শেষ করে নির্বাণ খেয়ার সামনে দাঁড়িয়ে চোখে চোখে রেখে বলল,,

— মানুষ হত্যা করা মহাপাপ। মানুষটা তোমাকে চায়। অতীতের সবকিছু ভুলে তার হাতে হাত রেখে নতুন করে জীবন শুরু করো দেখবে জীবনের একটি মোড়ে এসে তুমি আমাকে একেবারেই ভুলে গেছো। তখন ভাববে মৃত নির্বাণকে ভেবে কতই না পাগলামি করেছো।

খেয়া চোখ বন্ধ করে কথাগুলো শুনছিল। নির্বাণের কাছ থেকে সাড়াশব্দ না পেয়ে চোখ খুলে দেখলো অন্ধকার ঘরটায় কেউ নেই। খেয়া কয়েকবার নির্বাণের নাম ধরে ডাক দেয় কিন্তু নির্বাণের সাড়া নেই। এবার খেয়ার মাথায় রাগ চেপে বসে। ড্রেসিংটেবিলের জিনিসপত্র মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলল। তারপর,, চুলগুলো পাগলের মত টানতে টানতে বলতে লাগল,,

—তুমি শুধুই আমার কল্পনা মাত্র। তুমি ফিরে আসতে পারবে না ওই জগত থেকে। কারণ,, আজ পর্যন্ত কেউ পারেনি। তোমার কাছে ফিরে যাব আমি। রোজ রোজ একগাদা ঔষুধ খেয়েও তোমার অস্তিত্ব আমাকে পীড়া দিচ্ছে। তোমার কথাই ঠিক মানুষ মারতে পারব না কিন্তু নিজেকে তো মারতে পারব। যেই জীবন কেবল আমার সুখ ছিনিয়ে নিয়েছে সেই জীবন আর রাখব না। আমি তোমার কাছে আসছি নির্বাণ। আমার ফায়েজের ভালোবাসার প্রয়োজন নেই। আমি কেবল তোমার ছিলাম,, তোমারই থাকব।

উদ্ভান্তের ন্যায় ছুটতে ছুটতে রান্নাঘর যায় খেয়া। লাইটার হাতে নিয়ে আবার ঘরের দিকে ছুটে যায়। বিছানার কোণে দাঁড়িয়ে সর্বপ্রথম চাদরের কোণায় আগুন ধরিয়ে দিলো। ধীরে ধীরে আগুনের প্রখরতা বাড়ছে। আগুনের লাল লেলিহান দাবালনের মাঝে খেয়ার মুখটা হিংস্র পশুর ন্যায় দেখাচ্ছে। জীবনের প্রতি আজ সকল মায়া চলে গেছে। বেঁচে থাকার স্বাদ ঘুচে গেছে।

হুট করে মনে হলো ড্রইংরুমের সোফায় গিয়ে বসে থাকার দরকার। ধীরে ধীরে এই ফ্ল্যাটের প্রতিটা কোণা জ্বলবে এবং তার একমাত্র সাক্ষী খেয়া নিজেই। ড্রইংরুমের সোফার কাছেই আসতেই দেখতে পেলো পুরো ফ্ল্যাটের প্রতিটা কোনা ধোঁয়ায় ভরে যাচ্ছে। খেয়া পা বাড়াতেই কিছু একটার সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে পরে যায় ডাইনিং টেবিলের কাছে। চেয়ারের হাতলের সঙ্গে মাথায় বাড়ি লেগেছে। তৎক্ষনাৎ ব্যাথার অনুভূতি না পেলেও খেয়া ধীরে ধীরে চোখের সামনে সবটা ঝাপসা হয়ে যেতে দেখছে। এই তো মৃত্যুর মুখে আরও একধাপ এগিয়ে গিয়েছে সে। সুস্থ অবস্থায় থাকলে হয়ত আগুনের তান্ডব দেখলে পালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে জাগত মনে। এখন আর সেই পথ নেই। অচেতন দেহটাকে একসময় আগুন এসে গ্রাস করবে। চিরতরের জন্য বিলীন হয়ে যাবে এই পৃথিবীর বুকে।

শেষবারের মতো নির্বাণের মুখটা স্মরণ করে চাইল খেয়া। কিন্তু,, নির্বাণের মুখটা চেয়েও মনে করতে পারল না। নির্বাণের বদলে অন্যকারো মুখ দেখতে পেলো। বিষাদে ভরপুর,, বিষন্ন চেহারা,, ভগ্নহৃদয়,, অচঞ্চল চোখদুটো দিয়ে তাকিয়ে আছে খেয়ার দিকে। চোখদুটোর দৃষ্টি খেয়া চাইলেও উপেক্ষা করতে পারছে না। চোখের দৃষ্টি যেন বলে দিচ্ছে,,

“খেয়া তুমি এত স্বার্থপর কেন?? সবসময় নিজের দিকটাই ভাবো তুমি??”

— আপনাকে আমি কখনোই মাফ করব না ফায়েজ চৌধুরী।

অস্পষ্ট গলায় খেয়া বাক্যটি উচ্চারণ করল। তারপর,, নিস্তেজ হয়ে পরে রইলো ডাইনিং টেবিলের পাশে। ধীরে ধীরে আগুন ছড়িয়ে পরছে।

______________________

দেড় বছর পর
সময়টা তখন অক্টোবর চলছে ,,

আকাশে কালো মেঘের ভেলার সঙ্গে,, সাদা মেঘকে দেখা যাচ্ছে। প্রবাহমাণ বাতাস শীতের আগমনী বার্তা জানান দিয়ে যাচ্ছে। তপ্ত দুপুরে সূর্যের অস্পষ্ট রোদ।

সবটাই আজ টানছে রিতাকে। দীর্ঘ সতেরো বছর পর বাংলাদেশে এসেছে। বাংলাদেশের আবহাওয়ার সঙ্গে পৃথিবীর আর কোনো দেশের মিল আছে বলে জানা নেই তার। এই যেমন গ্রীষ্মের রোদ দেখলে মানুষ যখন সামান্য বৃষ্টির জন্য হাহাকার করে ঠিক তখনি বর্ষার আগমনী এসে প্রশান্তি এনে দেয় সবার মাঝে। এরপর,, আসে একটি লুকোচুরির মাস। যার নাম শরৎকার। শরৎকালে এই বৃষ্টি তো এই রোদ তাই তো রিতা এই মাসের নাম রেখেছে লুকোচুরির মাস। এরপর,, আসে হেমন্ত। কৃষকের ঘরে নতুন ধান,, পিঠার উৎসব,, সেই সঙ্গে যোগ হয় শীতকে বরণ করে নেয়ার প্রস্তুতি। তারপর,, হুট করে শীত এসে সবাইকে ঝেকে ধরে। হাড়কাঁপানো শীতে নাজেহলা মানুষ তখন বসন্তের অপেক্ষা করে। তারপর,, নাম না জানা কোনো এক বারে কোকিলের কলরব জানান দেয় বসন্তে এসে গেছে। এটাই তো তার বাংলাদেশ।

কফির মগে শেষ চুমুক দিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে বলল,,

— ফায়েজ আসবে কখন??

প্রশ্নটি শুনে নীল শাড়ি পরিহিতা নারীটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,,

— রাতে,, আমি যখন ঘুমের দেশে হারিয়ে যাব ঠিক তখন আসবে।

— ওমা এটা আবার কেমন কথা!! বিয়ে হয়েছে কতদিন হলো??

কফির মগটা টি-টেবিলের ওপর রেখে জানতে চাইলো রিতা। খেয়া কানের পিছে চুলগুলো রেখে বলল,,

— দেড় বছর হয়েছে বিয়ের।

— দেখো একটা প্রশ্ন করি মাইন্ড করো না আবার?? তোমাকে ভালোবাসে না কি?? নয়তো নতুন বৌ রেখে কে আবার এমন উদ্ভট কান্ড করে??

রিতার কথায় খেয়া মুখ গম্ভীর রেখে ছাঁদের কার্নিশের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল,,

— তার জীবনের প্রথম এবং শেষ ভালোবাসা আমি। এটা তো তারই মুখের কথা।

— এটা তো সব বিবাহিত পুরুষেরা তার স্ত্রীকে বলে। যাতে তারা স্ত্রীকে বশে রাখতে পারে। দেখো গিয়ে ফায়েজের অন্য কোথাও সেটআপ আছে।

রিতা ছাঁদ থেকে নেমে যায়। খেয়া অস্তমিত সূর্যটার দিকে তাকিয়ে মলিন হেসে ফিসফিসিয়ে বলল,,

— মানুষটাকে কখনো স্বামীর অধিকার দেইনি। সেখানে তার জীবনে কি হচ্ছে না হচ্ছে সেই ব্যাপার নিয়ে জিজ্ঞাসা করার তো আমার অধিকার নেই।

রাত একটা বাজে,,,

ফায়েজ সবে বাড়িতে ফিরে এসেছে। ঘরে ঢুকে লাইট অন করতে গিয়েও করে না। মোবাইকের ফ্লাশ অন করে এগিয়ে যায় ওয়াশরুমের দিকে। ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে সোজা বিছানায় গিয়ে ওঠল। খিদে নেই কারণ আজ রেস্টুরেন্টে বন্ধুদের সাথে খাওয়া হয়েছে। বালিশে মাথা রেখে শুয়ে পরল।

কিছু একটা মনে পরল। চট করে বেডসাইড টেবিলের ডিম লাইট অন করে তার পাশের বালিশের মানবীর দিকে তাকাল। বেঘোরে ঘুমিয়ে আছে। কপালে ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এলোমেলো চুলগুলো আলতোহাতে কানের পিছে গুঁজে দিয়ে তাকে টেনে এনে বুকে জড়িয়ে ধরে চোখ দুটো বন্ধ করল। মানবীটা আস্ত একটা ঘুমের টনিক। বুকে জড়িয়ে ধরামাত্রই চোখে ঘুমের পুরো রাজ্য চলে আসে।

ফায়েজ ঘুমিয়ে পরা মাত্রই খেয়া চোখ খুলে তাকাতেই নিজেকে আবিষ্কার করল ফায়েজের বাহুডোরে। খেয়া মাথা উঁচু দেখল ফায়েজের মুখটা। খোঁচা খোঁচা দাঁড়িতে ফায়েজকে দারুণ মানিয়েছে। হুট করে মন চাইল ফায়েজের মুখটা আঙুল বাড়িয়ে স্পর্শ করতে। কিন্তু,, সেই স্পর্ধা কি আর খেয়ার আছে?? ফায়েজ যদি টের পেয়ে যায়?? তখন লজ্জায় কাটা যাবে খেয়ার মাথা।

এমনসময় ফায়েজ নড়ে উঠল আর খেয়া ভয় পেয়ে চট করে চোখ বন্ধ করে ফায়েজের বুকে লেপ্টে রইল।

সকালের মিষ্টি রোদের পরশে খেয়ার ঘুম ভাঙল আজ। ভালো লাগায় ছুঁয়ে যায় মন। আড়মোড়া ভেঙে বিছানা থেকে নেমে ওয়াশরুম চলল। গোসল শেষে করে ওয়াশরুম থেকে বের হতেই ফায়েজের মুখোমুখি হলো খেয়া। গতকাল রাতের কথা মনে হলো দুজনের। কেউ কারো চোখের দিকে তাকায় না। যদি টের পেয়ে যায় এই ভেবে। ফায়েজ তড়িঘড়ি করে ড্রেসিংটেবিলের ওপর থেকে হ্যান্ডওয়াচ নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। চেপে রাখা শ্বাসটুকু ছেড়ে হাফ ছেড়ে বাঁচল খেয়া। ভেজা চুল টাওয়াল থেকে মুক্ত করে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। ড্রয়ার থেকে হেয়ার ড্রায়ার দিকে কাঁধ অব্দি চুলগুলো শুকিয়ে নেয়। তারপর,, চোখের কোনো কাজল রেখা টেনে,, শাড়ির আঁচল কাধের কাছে গুছিয়ে সেফটিপিন আঁটকে চলল ডাইনিং টেবিলের কাছে। তারপর,, কি মনে করে আবারও ড্রেসিংটেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। ডান কাধের ওপর ছড়িয়ে থাকা চুলগুলো সরিয়ে দিতেই গলার কাছে একটি সাদা পোড়া দাগ উন্মুক্ত হলো আয়নার প্রতিবিম্বে। হুট করে বিভৎস সেই রাতের কথা মনে পরে গেলো। যেই রাতে নিজেকে শেষ করে ফেলার অদম্য বাসনা তাকে ঠেলে দিয়েছিল মহাপাপের দিকে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুলগুলো এলোমেলো খোপায় বেঁধে বেরিয়ে এলো ঘর থেকে। মনে মনে ভাবছে,, আজ বড্ড দেরি হয়ে গেছে।
না, জানি ফায়েজ আবার কখন রেগে বসে?? আনমনা হয়ে ভাবতে ভাবতে খেয়া কারো সঙ্গে ধাক্কা খেলো।

খেয়া চট করে নিজেকে সামলে ফেলল। বিরক্তি চেপে সামনে তাকিয়ে দেখল,, রিতা দাঁড়িয়ে আছে। প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। খেয়া মুচকি হেসে বলল,,

— কিছু বলবেন,, আপা??

— অবশ্যই বলব। তবে এখানে না ডাইনিংটেবিলে চলো। ফায়েজের সামনেই বলতে হবে কথাগুলো।

রিতা খেয়ার হাত ধরে নিয়ে ডাইনিং টেবিল অব্দি। ফায়েজ ততক্ষণে টেবিলে বসে পাউরুটিতে আপেল জ্যাম লাগিয়ে খাচ্ছে। খেয়া ফায়েজের দিকে একপলকের জন্য তাকালো। ফায়েজ যেন দেখলই না খেয়াকে। একরাশ অভিমান বুকে চেপে ফায়েজের অপজিট চেয়ারে বসল খেয়া। রিতা বসল খেয়ার পাশের চেয়ার। সতেরো বছর বয়সী একটি মেয়ে রান্নাঘর থেকে রুটি,, ডাল,, অমলেট এনে টেবিলে সাজিয়ে রাখছে। রিতা একটি প্লেটে দুটো রুটি,, একটি,, বাটিতে ডাল নিয়ে বাড়িয়ে দেয় ফায়েজের সম্মুখে। ফায়েজ না করে দেয়। খেয়া অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। রিতা হাল ছেড়ে দিয়ে টেবিলের ওপর প্লেট রেখে শক্ত গলায় বলল,,

— এই তুই কি টিনেজার?? তোকে কাউন্সিলিং করতে হবে?? বাড়িতে আমাদের সঙ্গে খেতে বসলেই কেন তোর ডায়েটের কথা মনে পড়ে?? বন্ধুদের সঙ্গে রেস্তোরাঁয় বসে যখন তৈলাক্ত,, ফাস্ট ফুডের খাবার খাস তখন তোর এই নাটকীয় ডায়েটের চ্যাপ্টার কই থাকে??

রাগে ফুসছে রিতা। কপালের উপর বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। খেয়া রিতাকে কিছু বলতে গেলে রিতা হাত উঁচু করে থামিয়ে দিয়ে ফায়েজকে আঙুল উঁচু করে শাসিয়ে
বলল,,

— চাচা মরে গেছে বলে ভাবিস না যে তুই যা ইচ্ছা তাই করবি। আমি তোর চাচাতো বোন। বয়সে তোর মায়ের থেকে শুধু সাত বছরের ছোট ছিলাম। এইজ ডাজেন্ট ম্যাটার ইন ফ্রেন্ডশিপ। তোর মা মানে চাচি ছিল আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। তুই তার ছেলে। এমনিতেই তুই আমার ভাই,, তার ওপর তোর মায়ের সঙ্গে আমার আত্মিক সর্ম্পক ছিল। সেই তুই যদি এভাবে উচ্ছন্নে যাস তবে আমার কি দেখতে ভালো লাগবে বল?? জীবনটাকে গুছিয়ে নে। জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বয়সে এসে পরেছিস খেয়াল আছে সেদিকে?? বিয়ে করেছিস
ছত্রিশ বছর বয়সে এসে। এখন যদি সংসারে সময় না দিস সন্তান বা স্ত্রী নিয়ে না ভাবিস তাহলে তোর সংসার হবে কখন??

রিতা কথাগুলো বলেই গেল কিন্তু ফায়েজের কাছ থেকে কোনো সাড়াশব্দ নেই। ফায়েজ কিছু শুনেও না শোনার ভান করে পাউরুটি শেষ টুকরো খাওয়া শেষ করে এক্গ্লাস পানি খেয়ে চেয়ার ছেড়ে ওঠে দাঁড়ালো। রিতা অবাক হয়ে আছে ফায়েজের দিকে। এই ফায়েজকে তো সে চেনে না। বড়দের কথায় হ্যা তে হ্যা মানিয়ে চলা ফায়েজ কিনা আজ একটি টু শব্দ করল না!!

— আমি কিছু বলেছি ফায়েজ!! জবাব না দিয়ে কোথায় যাচ্ছিস??

রিতার প্রশ্নের জবাব বেশ শান্ত হয়ে দিলো ফায়েজ।

— আপা দেশে এসেছো মাত্র তিনদিন হলো। কিছুদিন ঘুরে বেড়াও। আমাকে নিয়ে আর আমার সংসারকে নিয়ে ভেবে মুড খারাপ করো না তুমি। ইট’স রিকুয়েষ্ট।

ফায়েজের কথার পিঠে কিছু বলতে চাচ্ছিল রিতা কিন্তু ফায়েজ হাতের ইশারায় থামিয়ে দেয়। রিতা চুপ মেরে বসে আছে। খেয়া তখনও মাথা নীচু করে বসে ছিল। ফায়েজ খেয়ার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,,

— নাশতা শেষ করে তৈরি হয়ে নাও। ডক্টরের কাছে যেতে হবে আজ।

ফায়েজ দ্রুত কথা শেষ করে চলে যায় সেখান থেকে। রিতা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আর খেয়া টলমল চোখে তাকিয়ে আছে পানির গ্লাসের দিকে। যেকোনো মূহুর্তে টুপ করে পরবে তার চোখের জল। মানুষটার এতটা পরিবর্তন এতদিন খেয়ার চোখে পরেনি। কিন্তু,, রিতা আপা আসার পর একটু একটু করে ফায়েজের বদলে যাওয়া সবটাই এখন খেয়ার সামনে দৃশ্যমান। হয়ত তার জন্যই মানুষটা বদলে গেছে!!

ফায়েজ কালো এবং সাদা মিশেলের চেক শার্ট পরেছে। শার্টের হাতা কনুই অব্দি ফোল্ড করা। কালো জিন্স পড়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পারফিউম স্প্রে করছিল। সে-সময় দরজা খুলে রুমে প্রবেশ করল খেয়া মাথা নীচু করে। দরজা বন্ধ করে কোনোদিকে না তাকিয়ে সোজা কার্বাডের কাছে চলে গেল। কার্বাড খুলে ওয়াইট বর্ডার এর স্কাই ব্লু কালারের শাড়ি,,ম্যাচিং হিজাব হাতে নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে যাচ্ছিল। ঠিক তখনি ফায়েজ খেয়াকে ডাক দিয়ে বলল,,

— আমি নীচে অপেক্ষা করছি তোম…

কথাটা সম্পূর্ণ করল না ফায়েজ। রুম থেকে বের হয়ে গেছে। খেয়া ফায়েজের আচরণে মোটেও অবাক হলো না। কারণ,, সেই ইন্সিডেন্টের পর থেকে ফায়েজ ওর সাথে খুব প্রয়োজন না হলে কথা বলে না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তৈরি হতে লাগল।

শাড়িটা খুব যত্ন নিয়ে পরল খেয়া। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখল খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। তারপর,, হাতে উঠিয়ে নিলো কাজল,, চোখের কোলে কাজল রেখা আরও গাঢ় করে টেনে নিলো,, পিংক রঙা লিপস্টিক হালকা করে ঠোঁট জোড়ায় রাঙিয়ে আয়নার সামনে নিজেকে দেখে খানিকটা সময়ের জন্য স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো। আজ সে কার জন্য সেজেছে?? নিজের মনের আত্মতুষ্টির জন্য?? মোটেও না। তবে কি ফায়েজের জন্য?? কিন্তু,, সে কি তাকাবে আজ খেয়ার পানে?? খেয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে কি বলবে?? চোখের কাজল বড্ড ছড়িয়ে গেছে বলেই টিস্যু দিয়ে যত্ন করে চোখের কাজল মুছে দেবে?? মোটেও এমনটা বলবে না ফায়েজ। খেয়াকে দেখবে তারপর বিরক্তিতে তার নাকমুখ কুঁচকে আসবে। চোখে সানগ্লাস লাগিয়ে বলবে,, যাও গাড়িতে গিয়ে বসো।

কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই খুব সুন্দর করে সাদা হিজাব নিজেকে আবৃত করে নিলো খেয়া। আয়নায় নিজেকে দেখে বলল,,

— পার্ফেক্ট।

পার্স এবং গতমাসের রিপোর্ট গুলো নিয়ে বেরিয়ে যায় খেয়া। ড্রইংরুমে রিতার সঙ্গে দেখা হলো খেয়ার। হাসিমুখে বিদায় নিয়ে বের হয়ে যায় খেয়া। সদর দরজা দিয়ে বের হবার পর মুখোমুখি হলো ফায়েজের। মোবাইলে কারো সঙ্গে কথা বলছিল। খেয়ার উপস্থিতি টের পেয়ে কল কেটে পেছনে ফিরে তাকালো ফায়েজ। তারপর,, কিছুসময়ের জন্য দুজনের শুভদৃষ্টি হলো। খেয়া লজ্জা পেয়ে চোখের দৃষ্টি নামিয়ে ফেলল আর ফায়েজ দুটো শুকনো ঢোক গিলে কোনোমতে বলল,,

— গাড়িতে প্রবলেম হয়েছে। বাইকে যেতে পারবে??

খেয়া চোখ বড় বড় করে তাকালো ফায়েজের দিকে। যেই দৃষ্টির অর্থ,, মানে কি?? ফায়েজ খেয়ার দৃষ্টিকে উপেক্ষা করেই বলল,,

— দেখো খেয়া,, আগামীকাল আমাকে সাতদিনের জন্য রাঙামাটি যেতে হবে। আর ডক্টর শায়লার সিরিয়াল পাওয়া বড্ড মুশকিল সেটা তো জানোই। আজ ডক্টরের কাছে না গেলে পরে সিরিয়াল পেতে ভোগান্তি পোহাতে হবে।

খেয়া সবটা শুনে বলল,,

— কার বাইকে যাব??

— কেন আমার বাইকে যায়।

ফায়েজের কথা শুনে খেয়া ভ্রু কুঞ্চিত করে বলল,,

— কোথায় আপনার বাইক?? এই বাড়িতে এসেছি আজ একবছর হলো একবারও তো দেখলাম না আপনার বাইক!!

— দুদিন আগেই কিনেছি। তোমার সঙ্গে তো আমার কথাই হয় না। তাই বলা হয়নি।

ফায়েজ যেন কথাগুলো ভীষন কষ্ট নিয়ে প্রকাশ করল। খেয়া কিছু বলতে গিয়েও বলে না। আসলেই তো। শেষ কবে ওরা দুজন ওরা একসাথে বসে কথা বলেছে সেটাই তো মনে নেই।

খেয়াকে অপেক্ষা করতে বলে ফায়েজ চলে যায় গ্যারেজ থেকে বাইক বের করতে। খেয়া পাঁচ মিনিটের অপেক্ষা করে তারমধ্যেই ফায়েজ এসে উপস্থিত হলো,,Suzuki GSX-R150 মডেলের একটি বাইক নিয়ে। খেয়া ফায়েজের দিকে তাকিয়ে আছে। ফায়েজ খেয়ার সামনে বাইক থামিয়ে মিষ্টি গলায় বলল,,

— উঠে এসো।

খেয়া খানিকটা লজ্জা এবং জড়তা নিয়ে ফায়েজের বাইকের সহযাত্রী হলো। যদিও ওদের বিয়ে হবার আগে ঢাকায় একবার ফায়েজের বাইকে উঠেছিল। তখন এতটা লজ্জা কিংবা জড়তা আসেনি। কিন্তু,, আজ খেয়ার নাজেহাল অবস্থা। ফায়েজের কাঁধে হাত রাখতে অস্বস্তি হচ্ছে। ফায়েজ খেয়ার অস্বস্তি বুঝলো কি না কে জানে?? খেয়াকে উদ্দেশ্য করে বলল,,

— সিএনজি ডাকব??

— না,, আমি পারব।

কথাটি বলে ফায়েজের কাঁধে হাত রাখল। ফায়েজ চোখ বন্ধ করে খেয়ার স্পর্শটুকু অনুভব করল। তার চোখের কোণে পানি চিকচিক করছে। ভালোবাসা কেন মাঝে মাঝে এত অসহায় হয়ে পরে?? চাইলেও মন খুলে ভালোবাসা যায় না,, জাহির করা যায় না। অতি সন্তর্পনে চোখের কোণে জমে থাকা জলটুকু মুছে সানগ্লাস লাগিয়ে বাইক স্টার্ট করল। ফায়েজের নতুন বাইকের প্রথম রাইড তার বৌকে সঙ্গে নিয়ে হলো।

ম্যাক্স হসপিটালের ডক্টর শায়লার চেম্বারে বসে আছে খেয়া। বাইরে ফায়েজ ওয়েটিং রুমে অপেক্ষা করছে। ডক্টর শায়লা খেয়ার রিপোর্ট গুলো দেখে হাসিমুখে বলল,,

— নির্বাণ সাহেবকে এখনও কি দেখতে পান আপনি??

— না।

খেয়া খুব স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর দেয়।

— ফায়েজ সাহেবের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি হয়েছে আপনার???

খেয়া তাকিয়ে রইল ডক্টর শায়লার পানে। ভাবছে তাদের সম্পর্কের ব্যাপারে একবার শায়লার সঙ্গে আলাপ করাই যাক। এত এত চিন্তা নিয়ে খেয়ার মাথা খারাপ হবার উপক্রম হচ্ছে। খেয়া ডক্টর শায়লাকে সবটা খুলে বলল। সবটা মনোযোগ দিয়ে শোনার পর ডক্টর শায়লা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,,,

—ফায়েজ সাহেব হয়ত চাচ্ছেন,, আপনি যেন তাকে কল করে বাড়িতে খুব দ্রুত তাকে আসতে বলুন। সে যদি বাসায় খাবার না খায় তাহলে যেন আপনি তাকে খেতে বলুন। সে আপনার সাথে প্রয়োজন ছাড়া কথা বলতে চাইছে না মানে এই না যে সে বদলে গেছে। সে চাইছে তার এই অনিয়ম গুলো আপনি চোখে দেখুন। তাকে যেন এসব বিষয়ে আপনি বারণ করেন। প্রতিটা এলোমেলো স্বামী চায় তার স্ত্রী তাকে গুছিয়ে রাখুক। ফায়েজ সাহেব হয়ত তেমন কিছুই চাইছেন। আপনি তাকে তার মত করে চলতে দিচ্ছেন,, তাকে বাইরে খাবার খেতে বারণ করছেন না,, দ্রুত বাড়িতে ফিরতে বলছেন না। তাহলে তো সে গো ধরে বসেই থাকবে। কারণ আপনাদের সম্পর্কটা আট দশটা সম্পর্কের মত নয়।

খেয়া পলকহীন চোখে তাকিয়ে আছে ডক্টর শায়লার দিকে। কিছুই বলার নেই আজ। কারণ,, দোষ তার নিজের। সে চাইলেই মানুষটা নিজেকে নিজস্ব গন্ডির মধ্যে আঁটকে ফেলত না। সে চেয়েছে বলেই ফায়েজের আজ এমন পরিণতি হয়েছে।

— দেখুন খেয়া,, আপনার কাউন্সিলিং করছি বিগত একবছর ধরে। আপনার অতীত,, বর্তমান সম্পর্কে আপনি আমাকে যতটুকু বলেছেন তাতেই যতটুকু আমি বুঝতে পেরেছি ফায়েজ সাহেব কোনোকালেই আপনার ক্রোধের পাত্র নন। সে আপনাকে ভালোবেসেছে তবে অন্তরালে। তার ভাই নির্বাণকে ভালোবেসে আপনি বিয়ে করেছেন সেটাও তাকদীরের ব্যাপার। নির্বাণ সাহেবের মৃত্যুর সঙ্গে কারো হাত নেই। উনি যে রোগে আক্রান্ত ছিলেন সেখানে বেঁচে থাকার পার্সেন্টেজ নেই বললেই চলে। আপনি নির্বাণ সাহেবের মৃত্যুর জন্য ফায়েজ সাহেবকে দোষী করতে পারেন না। ফায়েজ সাহেবের সঙ্গে আপনার বিয়ের বিষয়ে কিন্তু প্রথমে আপনি এগিয়ে এসেছিলেন। ফায়েজ সাহেব কিন্তু মোটেও আপনাকে জোর করেনি বিয়ের জন্য । উল্টো আপনি প্রতিশোধের নেশায় অন্ধ হয়ে তাকে বিয়ে করার জন্য মিথ্যা অজুহাত দেখিয়ে বলেছিলেন,, নির্বাণ আপনাকে স্বপ্ন এসে বলেছে তার ভাইকে বিয়ে করার জন্য। কতটা লেইম ছিল!! ভাবতে পারছেন আপনি?? ফায়েজ সাহেব বোকার মত আপনার কথা বিশ্বাস করেছিলেন।

খেয়া মাথা নীচু করে ডক্টর শায়লার সব কথা শুনছে। কথাগুলো শুনতে আজ মোটেও কষ্ট হচ্ছে না উল্টো অনুশোচনা হচ্ছে। এতটাই বিবেকবুদ্ধি লোপ পেয়ে গিয়েছিল তার যে,, একটা মানুষকে মেরে ফেলার জন্য বিয়ে অব্দি করেছিল!!

—- বিয়ে হয়েছিল আপনাদের। দুদিনের মাথায় আপনি নিজেই আত্মঘাতী হতে চেয়েছিলেন। ভাগ্যিস ফায়েজ সাহেব সঠিক মূহুর্তে উপস্থিত হয়েছিল সেখানে। নয়ত, আপনি সেদিন আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যেতেন। তারপরের ঘটনা হয়ত আপনার মনে নেই। আপনাকে নিয়ে মানুষটা কত কষ্ট করেছে সেটা একমাত্র আমি এবং আমার হাজবেন্ড দেখেছি। আপনার মানসিক প্রশান্তির জন্য সে আপনার কাছে থেকেও দূরে সরে গিয়েছিল। ধীরে ধীরে আপনি সুস্থ হয়েছেন ঠিকই কিন্তু ফায়েজ সাহেব আপনার কাছ থেকে পুরোপুরি সরে গেছে। আপনার কাছ থেকে ভালোবাসার বিনিময়ে ভর্ৎসনা শুনতে শুনতে সে দূরে সরে গেছে। আপনিও তো সবসময় এটাই চেয়েছিলেন যেন ফায়েজ সাহেব আপনার কাছ থেকে,, আপনার জীবন থেকে চলে যাক ??

— আগে চেয়েছিলাম ম্যাম। কিন্তু এখন চাই না ফায়েজ আমার কাছ থেকে দূরে চলে যাক।

খেয়ার কন্ঠে আকুলতা ছিল। ডক্টর শায়লা বিস্ময় নিয়ে খেয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন,,

— আপনি কি চান??

— ভালোবাসা পেয়ে হারানো অনেক কষ্টদায়ক। আমি নিজেই তো ভুক্তভোগী। নির্বাণকে হারিয়ে আজ আমার এই অবস্থা। ফায়েজ ভালোবাসে আমাকে। জানিনা তার ভালোবাসার পরিমান কতটুকু?? তার ভালোবাসাকে আর একটি সুযোগ দিতে চাই আমি।

— জানি না আপনি কিভাবে বিষয়টি হ্যান্ডেল করবেন। তবুও বলব জীবনটাকে আরেকবার সুযোগ দেয়ার জন্য যেই সিদ্ধান্ত আপনি নিয়েছেন আই রিয়েলি এপ্রিসিয়েট ইট। বেস্ট অফ লাক।

— একটা ফেভার চাইছি ম্যাম??

— বলুন না??

— ফায়েজ যেন কখনোও জানতে না পারে আমি তার খাবারে মিশিয়ে তাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিলাম। তাকে বিয়েও করেছিলাম শুধুমাত্র প্রতিশোধ নেয়ার জন্য। যদি উপকারটুকু করেন আপনার কাছে চিরদিনের জন্য ঋনী হয়ে থাকব আমি।

— পাগলি মেয়ে! আমি কিছুই বলব না ফায়েজ সাহেবকে। আপনি শুধু ফায়েজ সাহেবের মন জয় করার চেষ্টা করুন।

খেয়া হাসিমুখে বের হয়ে এলো ডক্টর শায়লার চেম্বার থেকে। খেয়াকে বের হতে দেখে ফায়েজ উঠে দাঁড়ায়।

— কি বলল?? সব ঠিক আছে??

— জি ; ঠিক আছে।

—তাহলে বের হই।

খেয়া মুচকি হেসে সায় দিলো। ফায়েজ খেয়ার হাসিতে হাসলো তবে লুকিয়ে।

পার্কিং প্লেস থেকে বাইক নিয়ে বের হয়ে এলো ওরা দুজন। বাসায় ফিরে এসে ফায়েজ কোথাও যাওয়ার জন্য উদ্ধৃত হয়। খেয়া বাঁধা দিতে গিয়েও দেয় না। মস্তিষ্কের মাঝে কেউ বলছে বারণ করিস না যদি ফায়েজ অন্যকিছু ভাবে?? কিন্তু,, খেয়ার মন বলছিল,, ফায়েজের সামনে দাঁড়িয়ে শক্ত গলায় বলতে,,

—- আপনি এই ভরদুপুরে কোথাও যেতে পারবেন না। আজ আমাদের সাথে খাবেন। আমি নিজ হাতে রান্না করব। আপনি তৃপ্তি সহকারে খাবেন আর আমি সেই দৃষ্য দেখেই তুষ্ট হব।

মনের কথা মনেই রয়ে যায়। খেয়া ফায়েজকে বাঁধা দিতে গিয়েও দেয় না। ফায়েজ চলে যাওয়ার পর খেয়া দুপুরের খাবার না খেয়ে ওর ঘরের দিকে যাচ্ছিল। এমন সময় রিতা এসে খেয়ার সামনে অগ্নিমূর্তির রুপ ধারণ করে বলল,,

— ওকে বারণ করলে না কেন?? যেদিকেই যাক দুপুরের খাবার খেয়েই যেন বের হয় এই কথা বললে না কেন??

— আমি বারণ করলে সে শুনবে না আপা।

–তুমি ওকে একবারও মানা করেছো?? আন্দাজে কথা বলা মানুষ আমি পছন্দ করি না। বুঝি না আমি কেন তোমরা এমন করছো??

রিতা রাগ দেখিয়ে কথাগুলো বলেই নিজের ঘরে চলে যায়। আর খেয়া নিজের ঘরের দিকে। ঘরে ঢুকে আলমারিতে কাগজপত্র এবং পার্স রেখে সোজা ওয়াশরুমে প্রবেশ করল । টানা আধ ঘন্টা পর গোসল শেষ করে টাওয়াল জড়িয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে এলো খেয়া।
এমন সময় দরজা খুলে ফায়েজ রুমের ভেতরে প্রবেশ করল। খেয়া নিজের জায়গায় জমে গেছে বরফের ন্যায়। কারণ,, ঠিক এই সময়টাতে কখনোই সে বাড়িতে থাকে না। আর আজ!! হায় আল্লাহ? আমি এখন কি করি?? ভাবতে ভাবতে চট করে আবারও ওয়াশরুমের ভেতরে ঢুকে পরল। দরজা ভেতর থেকে লক করে দাঁড়িয়ে রইল।

—থ্যাংক গড ফায়েজ দেখতে পায়নি নয়ত মান-সম্মান আজ কেল্লাফতে যেত ।
কিন্তু টাওয়াল পরে কতক্ষণ থাকব??

খেয়া এবার বেশ চিন্তায় পরে গেছে। এমন সময় ফায়েজের আওয়াজ ভেসে এলো। খেয়াকে ডাকছে। খেয়া ওয়াশরুমের ভেতর থেকেই জবাব দেয়।

— আমি ওয়াশরুমের ভেতরে আছি।

— বের হও জলদি।

— কেন??

— বের হলেই বলব।

— আমি বের হতে পারব না।

— ওয়াট!! বের হতে পারব না মানে কি?? তুমি সারাজীবন ভেতরে থাকবে নাকি??

— আমার সময় লাগবে।

— কেন??

— কারণ,, আমি ড্রে..স নিয়ে আসিনি।

কথাটি বলে খেয়া মাথাটা নামিয়ে ফেলল। যেন ফায়েজের মুখোমুখি হয়ে কথাটি বলল মাত্র। ফায়েজ দরজার ওপাড়ে দাঁড়িয়ে সংকোচবোধ করল। কি করা যায় ভেবেই কার্বাডের দিকে চোখ পরল। উপায়ন্তর না পেয়ে কার্বাড থেকে একটি বটল গ্রীন রঙা থ্রী-পিস নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে যায়।

ওয়াশরুমের দরজায় নক পরল। হুট করে নক পরাতে খেয়া আঁতকে উঠল।

— খেয়া দরজা খুলো ড্রেস এনেছি তো…

সংকোচ বাকি কথাও সম্পূর্ণ করতে পারল না। এমন সময় অলৌকিক ভাবে রিতা আপা ফায়েজের ঘরে এলো। ফায়েজ রিতাকে দেখে তড়িঘড়ি করে তার সামনে গিয়ে অনুরোধের সুরে বলল,,

— আপা একটা ফেভার করো??

— কি হইছে??

রিতা ভীষন ভয় পাওয়া কন্ঠ নিয়ে কথাটি বলল। ফায়েজ রিতার হাতে থ্রী-পিছের সেট দিয়ে বলল,,

— খেয়া ওয়াশরুমে আছে ওকে ডাক দিয়ে দাও। আমি ড্রেস নিয়ে একবার ডাক দিয়েছিলাম কিন্তু দরজা খুলেনি। তুমি ডাক দাও দেখবে ঠিকই দরজা খুলবে।

রিতার হাতে ড্রেস চাপিয়ে দিয়ে খুব দ্রুতই রুম থেকে বের হয়ে যায় ফায়েজ।

এদিকে রিতা ফায়েজের কান্ড দেখে হাসবে নাকি কাঁদবে বুঝতে পারছে না। তবে এটা হলফ করে বলতে পারবে যে ফায়েজের সঙ্গে খেয়ার আট দশটা স্বামী-স্ত্রীর মত সম্পর্ক নেই। রিতা হাসতে হাসতে ওয়াশরুমের দরজায় নক করে খেয়াকে ডাকল। খেয়া রিতার গলা শুনে দরজা খুলল তবে একটুখানি ফাঁক রেখে। রিতা সেদিকে না তাকিয়ে থ্রী-পিস এগিয়ে দিয়ে বলল,,

— জলদি বের হয়ে এসো। কথা আছে তোমার সঙ্গে।

রিতা এবং ফায়েজের প্রতি খেয়ার কৃতজ্ঞতায় মন ভরে উঠল। ফায়েজ সাধারণ মাঝেও অসাধারণ। আজকের ব্যাপারটা দিয়ে সে বুঝতে পেরেছে। নিজের বিবাহিত স্ত্রীকে সে বিব্রতবোধ করতে দেয়নি।

খেয়া ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে চটজলদি তৈরি হল। ভেজা চুলগুলো মাঝে সিঁথি করে ছড়িয়ে দিলো সারা পিঠময়ে। চোখের লেপ্টে যাওয়া কাগজ টিস্যু দিয়ে মুছে নিলো। তবুও যেন কাজলের রেখা রয়ে গেছে। ব্যস আর কিছু না। রুম থেকে বেরিয়ে সোজা নীচে চলে এলো খেয়া।

নীচে গিয়ে দেখল রিতা এবং ফায়েজ বেশ পরিপাটি হয়ে আছে। খেয়াকে দেখে দুজনই সোফা ছেড়ে ওঠে দাঁড়ালো। ফায়েজ বের হয়ে গেল বাড়ি থেকে। আর রিতা হাসিমুখে খেয়ার সামনে এসে বলল,,

— আজ ফায়েজ ট্রিট দিয়েছে আমাদের দু’জনকে। রেস্টুরেন্টে যাব চলো।

— কিন্তু,, আপা??

খেয়ার প্রশ্নসূচক দৃষ্টি দেখে রিতা হাসতে হাসতে খেয়ার হাত ধরে বাড়ির বাইরে এগিয়ে যেতে যেত উত্তর দেয় ,,

— সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে আঙুল বাঁকা করতে হয়।

খেয়া আর কিছু জিজ্ঞেস করার প্রয়োজনবোধ করল না। বাড়ির লন পেরিয়ে গেইটের বাইরে যেতেই খেয়া দেখতে পেলো ফায়েজ ওর কারে ড্রাইভিং সিটে বসে আছে। রিতা গিয়ে পেছনের সিটে বসল। আর খেয়া ভ্রু কুটি করে তাকিয়ে রইল খেয়ার দিকে। কারণ,, সকালেই ফায়েজ বলেছিল গাড়িতে সমস্যা,, বাইকে যেতে হবে। মাত্র দু’ঘন্টার ব্যবধানে কি গাড়ি ঠিক হয়ে গেছে তার?? তারমানে কি ফায়েজ ওর সঙ্গে মিথ্যা কথা বলেছে?? কিন্তু,, কেন?? শুধুমাত্র ওর সঙ্গে বাইকে যাওয়ার জন্য??

পুরো রাস্তাজুরে খেয়া কটমটে দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল ফায়েজের দিকে। এদিকে ফায়েজ খেয়ার সেই দৃষ্টি উপেক্ষা করে নিজের কাজে মনোযোগী হয়। কারণ,, খেয়ার কাছে যে আজ ধরা খেয়েছে এটা আর বুঝতে বাকি নেই ফায়েজের।

— আপনি মিথ্যা বলবেন আমার কাছে! আমি তা কখনোই আশা করিনি আপনার কাছে!!

ড্রাইভিংয়ের ফাঁকে খেয়ার রাগী চেহারার দিকে একপলকের জন্য তাকালো। ফের ড্রাইভিংয়ে মনোযোগী হলো ফায়েজ। খেয়া আরও ফুঁসে ওঠল। রাগ সংবরণ করার চেষ্টা চলছে ওর মাঝে। সিটে গা এলিয়ে পড়ে রইলো চোখ বুঁজে।

খাওয়াদাওয়া শেষ হবার পর রিতা রেস্টুরেন্ট থেকে ওর এক বান্ধবীর বাড়িতে চলে গেছে। ফিরতে রাত হতে পারে কিংবা আজ রাতে ফিরতে নাও পারেন বলে গেছেন।

ফিরতি পথে ফায়েজ কিংবা খেয়া কেউ আর কথা বলল না। বাড়ির গেইট দিয়ে গাড়ি যখন ঢুকছে তখন আছর ওয়াক্তের আযান চলছিল। আযানের প্রতিধ্বনি শুনে খেয়া মাথায় ওড়না তুলে গাড়ি থেকে নেমে যায়। ফায়েজ গাড়ি থেকে নেমে খেয়ার ঘোমটা টানা মুখটার দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ভাবল,, খেয়া তখনও টের পায়নি যে ফায়েজ ওর দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। খেয়া বাড়ির ভেতরে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায় তখনই ফায়েজের ডাকে থমকে দাঁড়ায়। পেছনে ফিরে তাকালো খেয়া। ফায়েজ কিছুই বলছে না কিন্তু খেয়ার দিক থেকে দৃষ্টি সরাচ্ছে না। এমতাবস্থায় খেয়া জিজ্ঞেস করে,, কি হয়েছে??

প্রতিউত্তরে ফায়েজ কিছু বলল না খেয়াকে। বাড়ির ভেতরে যাওয়ার জন্য ইশারা করে। খেয়া চলে যাচ্ছে। এদিকে ফায়েজ কপালে চুলকিয়ে শুকনো গলায় বলল,,

— তোমার গহনা বিহীন ঘোমটাপরা মুখটায় শ’খানেক চুমু খাওয়ার অদম্য ইচ্ছায় আমি তো এবার প্রতিমূহর্তে সুখেই মরব। আবার তোমাকে চুমু খাওয়ার ইচ্ছায় বেঁচে উঠব।

আনমনে হেসে উঠল ফায়েজ। মাঝেমাঝে ইচ্ছে করে ওর এই গাম্ভীর্যতাপূর্ণ খোলস থেকে বের হয়ে খেয়াকে বুকে জাপটে ধরতে। কিন্তু, আদৌও কি তা সম্ভব!! খেয়া যেই মেয়ে! আফসোসের সুরে চুচু শব্দ করল ফায়েজ।

খেয়া ঘরে এসে হাতমুখ ধুয়ে সোজা বিছানায় গিয়ে শুয়ে পরল। বড্ড ক্লান্ত লাগছে। ধীরে ধীরে মাথাব্যাথাটাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। আপাতত পুরো ঘর অন্ধকার করে শুয়ে আছে। নীরবতা পুরো ঘর জুড়ে। এমন নিরিবিলি পরিবেশে চাহিদা অনুযায়ী ঘুমাতে পারলে মাথাব্যাথাটা চড়াও হতে পারবে না। খেয়া চোখ বন্ধ করে রইল ঘুমানোর প্রচেষ্টায়।

ফায়েজ দরজা খুলে রুমের ভেতরে ঢুকতেই দিনের আলোতে মিইয়ে রাখা অন্ধকার ঘরটাকে দেখে ভ্রু কুচকে রইল।লাইট অন না করেই সোজা দক্ষিণের জানালার পর্দা সরিয়ে দিতেই আলোয়ে ভরে ওঠল ঘর।

খেয়া কপালে হাত রেখে ফায়েজকে অনুরোধের সুরে বলল,,

— পর্দা টেনে দিন। মাথাব্যাথা করছে। আলো সহ্য হচ্ছে না।

ফায়েজ খেয়ার দিকে তাকিয়ে পর্দা টেনে দিতে গিয়েও হাত গুটিয়ে নেয়। কার্বাড থেকে সাদা রঙের টিশার্ট এবং কালো ট্রাউজার নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পরল। ফ্রেশ হয়ে সোজা বেরিয়ে গেছে।

এদিকে ফায়েজের ডোন্ট কেয়ার ভাব দেখে খেয়ার ভীষন কান্না পাচ্ছিল। মানুষটা আসলেই কি বদলে গেছে?? নয়ত খেয়ার সাময়িক অসুস্থতায় যে বেশি কাতর হয়ে পরতো আজ সে খেয়ার কথাকে অগ্রাহ করে বেরিয়ে গেছে। আসলেই ফায়েজ বদলে গেছে। মানুষটার বদলে যাওয়ার পেছনে একমাত্র সে নিজেই দায়ী।

খেয়ার চোখের জলে যখন বালিশ ভিজছিল ঠিক তখনি একটি ট্রেতে করে ধোঁয়া ওঠা দুই মগ কফি নিয়ে এলো। বিছানার ওপরে ট্রে রেখে খেয়ার শিয়রের কাছে দাঁড়িয়ে নরম সুরে বলল,,

— কফি এনেছি। খেয়ে দেখো মাথা ব্যাথাটা কমতেও পারে।

ফায়েজের কন্ঠস্বর শুনে কান্নাভেজা চোখে অবাক হয়ে তাকালো খেয়া। খেয়ার ভেজা চোখ দেখে ফায়েজ ধাক্কা খেলো। খেয়া কাঁদছে! কিন্তু,, কেন??

— শরীর কি বেশি খারাপ লাগছে?? ডক্টরের কাছে যাবে??

ফায়েজ অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করছিল। খেয়া হাতের উল্টোপিঠে চোখের পানি মুছে উঠে বসল। আগ বাড়িয়ে একটি কফির মগ হাতে তুলে নেয়। ফায়েজ তখনও ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। খেয়া ফায়েজকে ইশারা দিয়ে বসতে বলল। ফায়েজ খাটের কিনারায় খেয়ার মুখোমুখি হয়ে বসল ।

— কফি খেতে খেতে কিছু কথা বলব আপনাকে?? শুনবেন আপনি??

— এখন কিছুই শুনব না আমি। তুমি এখনই চলো আমার সঙ্গে। ডক্টরের কাছে যাবে।

— সামান্য মাথাব্যাথার জন্য ডক্টরের কাছে কেন যেতে হবে?? আমি ঠিক আছি। কফি খাওয়ার পরে একটি টাফনিল ট্যাবলেট খেলেই চলবে।

— তুমি নিজেই বললে হবে নাকি??তোমার চোখ লাল হয়ে আছে। তুমি কাঁদছিলে তখন। শুধু শুধুই কি কাঁদছিলে তুমি!!

খেয়া মলিন হেসে ফায়েজকে বলল,,

— আজ কতগুলো দিন পর আপনার সাথে আমার কথা হয়েছে??

খেয়া কথায় ফায়েজ চমকালো। ফায়েজকে এবার গম্ভীর দেখালো। খেয়া কফির মগে চুমুক দিয়ে জানালার দিকে দৃষ্টিপাত করেই বলছ,,

— আপনি দূরে থেকে আমার খেয়াল রেখেছেন। আমার অসুস্থতার সময় আমাকে নিজ হাতে সুস্থ করে তুলেছেন। অসুস্থতার দিনগুলোতে আপনাকে যতটা কাছে পেয়েছি সুস্থ হওয়ার ততটা পাইনি। কারণ,, আপনি আমার কাছ থেকে দূরে সরে গেছেন। এই যে আমরা দুটো মানুষ শহরের বাইরে নির্জন বাড়িতে থাকি। কখনো কি আপনার মনে হয়নি আমার আপনার সাথে কথা থাকতে পারে?? আপনি নিজেও রাত-বিরেতে বাড়িতে ফিরতেন। আপনার কলিগ,, বন্ধু অনেকের সাথে রোজ আপনার আড্ডা হয়। কিন্তু,, আমি একা এই বাড়িতে পরে থাকি। আমি যখন আপনার অপেক্ষা করতে করতে ঘুমিয়ে পরতাম তখন আপনি ফিরে আসেন বাড়িতে।

— আজ কথাগুলো না বললেই কি হচ্ছিল না??

খেয়াকে ভীষণ ক্লান্ত দেখাচ্ছে। ফায়েজ নিজেও চাচ্ছে না আজ এই ব্যাপারে আলাপ করতে।

— আজ বলতে দিন। নয়ত আর কখনোই বলা হয়ে উঠবে না।

— কেন বলা হয়ে উঠবে না?? কাল সকালে আমি তোমার সব কথা শুনব। কিন্তু,, আজ নয়। তোমার শরীর খারাপ কোন বুঝতে চাইছো না??

শেষের কথাটি বলতে গিয়ে রেগে উত্তেজিত হয়ে যায় ফায়েজ। খেয়া ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ফায়েজের দিকে। ফায়েজ সেই দৃষ্টির মানে বুঝল কিনা কে জানে?? বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। খেয়ার মুখোমুখি হয়ে বসলো। তারপর,, খেয়ার গালে হাত রেখে শান্ত সুরে জিজ্ঞেস বলল,,

— তোমার ভালোর জন্য আমি তোমার কাছ থেকে দূরে সরে গিয়েছি। তুমি আমার উপস্থিতি সহ্য করতে পারতে না ওই সময়গুলোতে। আমাকে দেখলে তুমি উত্তেজিত হয়ে পরতে।

— এতটা ভালো আমার কে চাইতে বলেছিল আপনাকে?? সেদিন আমাকে মরতে দিলেন না কেন?? সেদিন মরে গেলে আপনি মুক্ত হয়ে যেতেন খেয়ার নামক অভিশাপ থেকে। যেই অভিশাপ কেবল মানুষ খেয়ে ফেলে। আমাকে যে আপন করে চায় সেই মরে যায়। নির্বাণ মরে গেছে,, আপনি…

বাকি কথা উচ্চারণ করতে পারে না খেয়া। কন্ঠস্বর কাঁপছে। ফায়েজ খেয়ার হাতের ওপর হাত রেখে বলল,,

— হায়াত মউত আল্লাহর হাতে। যার যাওয়ার সে এমনিতেই চলে যাবে। কখনো এ ধরণের কথা বলবে না তুমি।

খেয়া কাঁদছে। মনের ভেতরে জমে থাকা সকল দুঃখ আজ কান্নার আকারে বের আসছে। কতটা ভুল সে করেছে আজ সে সবটাই বুঝতে পারছে। ফায়েজ খেয়াকে কাঁদতে বাঁধা দেয় না। খেয়াকে একাকি সময় কাটানোর সুযোগ দিয়ে বের হয়ে সোজা ছাঁদে চলে এলো।

আকাশের বুকে তখন সূর্য চলে যাওয়ার অন্তিমসময়। পক্ষীকূলের নীড়ে ফেরার সময়। বাতাসের শনশন শব্দ,, বাতাসের দোলে গাছের পাতার শব্দ আজ কিছুই টানছে না ফায়েজকে। মনটা কেবল সেই স্মৃতিতে আঁটকে আছে। যেই স্মৃতির পাতায় খেয়াকে হারিয়ে ফেলতে যাচ্ছিল চিরদিনের জন্য । চোখ বুজতেই সেই সময়ের স্মৃতিটুকু মনের দৃশ্যপটে দেখতে পাচ্ছিল।

ফায়েজ এর স্মৃতিকাতর অতীতে,,

“দরজা খুলতেই কেবল ধোঁয়া দেখতে পেলাম। চোখের সামনে নিজের সাজানো ফ্ল্যাটকে পুড়তে দেখছিলাম। দুটো রুমে আগুনের লাল লেলিহান শিখা দেখে খেয়াকে হারিয়ে ফেলার ভয়ে তীব্র ব্যাথা অনুভব করছিলাম তখন। উদ্ভান্তের ন্যায় দৌঁড়ে সেদিন ফ্ল্যাটে ঢুকেছিলাম। খেয়াকে ডাকছিলাম। কিন্তু,, খেয়ার সাড়া নেই। পুরো ফ্ল্যাটে এতটাই ধোঁয়ায় ভরে গিয়েছিল যে,, সবকিছুই আবছা ছিল চোখের সামনে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। তবুও খেয়াকে খুঁজে পাওয়ার তীব্র তাড়নায় আমি এগিয়ে যাচ্ছিলাম ভেতরের দিকে। এমন সময় কোনোকিছুর সঙ্গে ধাক্কা লেগে পরে যাচ্ছিলাম। সঠিক সময়ে নিজেকে সামলে ফেলি। নিজেকে সামলে নীচের দিকে তাকাতেই। আবছা ভাবে যেন আমি খেয়ার মুখটাই দেখেছিলাম। আমি হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করতেই বুঝতে পারলাম,, আমি খেয়াকে খুঁজে পেয়েছি। খুশিতে আমি তখনি আল্লাহর নামে সিজদায় লুটিয়ে পরি। কারণ,,আল্লাহর মেহেরবানীতে তখন এমন এক ভয়াবহ অবস্থায় খেয়াকে সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় পেয়েছিলাম আমি। ততক্ষণে আগুন ডাইনিংয়ের কাছে ছড়িয়ে যাচ্ছিল। আমি তড়িঘড়ি খেয়াকে কোলে নিয়ে বের হয়ে গিয়েছিলাম ফ্ল্যাট থেকে। তিনতলার সিঁড়ি বেয়ে যখন আমি নীচে নেমে গেলাম তখন ফায়ার সার্ভিসের উর্দ্ধতন কর্মকর্তা আমার কোলে অচেতন খেয়াকে দেখে বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করেছিলেন,,

— উনাকে আপনি কোথায় পেলেন??

— আপনারা বলেছিলেন না থার্ড ফ্লোরে কেউ নেই। আমি খেয়াকে সেই থার্ড ফ্লোরেই খুঁজে পেয়েছি।

কথাটি বলে আর অপেক্ষা করিনি খেয়াকে নিয়ে নিজেই হসপিটালে গিয়েছিলাম। চিকিৎসা চলল। খেয়া মোটামুটি সুস্থ হলো তবে শারীরিক অর্থে। মানসিক ভাবে ভীষণ অসুস্থ হওয়া খেয়া ফায়েজ নামক মানুষটার নাম শুনলে সহ্য করতে পারত না। আর দেখলে খুন করতে চাইত। খেয়াকে পরিপূর্ণ সুস্থ করার জন্য আমি আড়ালে রয়ে গেলাম।”

অতীতের স্মৃতির জগত থেকে বেরিয়ে ফায়েজ আনমনে বলছে,,

—আজ আমি এতটাই আড়াল হয়ে গেছি খেয়া যে তুমি আমার অনুপস্থিতি নিয়ে তোমার মনে দাগ কাটে। কিন্তু,, কেন?? ফায়েজ নামক মানুষটার জন্য তোমার কোনো অনূভুতি নেই,, দায়বদ্ধতা নেই। তবুও কেন এতটা অস্থির হয়ে যাচ্ছো আমার এতটা নীরবতা দেখে?? সহ্য হচ্ছে না তাই না। সহ্য না হবারই কথা। কারণ,, মানুষ যখন প্রেমে পরে,, ভালোবাসে কাউকে,, তখন তার প্রেমিক মানুষের কাছ থেকে এটেনশন পেতে চায়। তুমি আমাকে ভালোবেসে ফেলেছো খেয়া। তুমি নিজেই বুঝতে পারছো না যে ,, তুমি কতটা ভালোবেসে ফেলেছো আমাকে!!
ইউ আর ইনি লাভ উইথ মি। খেয়া লাভ ফায়েজ। এন্ড দিজ লাভ সেন্ড টু বি হ্যাভেন।
আজ আমি বিজয়ী। খেয়ার ভালোবাসা অর্জন করতে আমি সক্ষম হয়েছি।

ফায়েজের চোখে জল চিকচিক করছে। এই কান্না দুঃখের নয়। সুখের কান্না। তার একপাক্ষিক ভালোবাসা দীর্ঘ এতগুলো বছর পর আসল ঠিকানায় পৌঁছে গেছে। আর কি চায় ফায়েজের??

সেই রাতে ফায়েজ খেয়ার ঘরে এলো না। বোধহয় খেয়া বুঝতে পেরেছিল ফায়েজ আজ এ ঘরে আসবে না। ফায়েজের জন্য অপেক্ষা করে নির্ঘুম রাত পাড় করল না। উল্টো ঘুমিয়ে ছিল। দেখা যাবে সকালে যখন তার ঘুম ভাঙবে নিজেকে ফায়েজের বাহুডোরে আবিষ্কার করবে!! এই ভেবেই নিশ্চিতে ঘুমিয়ে ছিল খেয়া।

ভোর পাঁচটা বাজে,,

ফায়েজ তৈরি হয়ে ঘর থেকে বের হলো। দুটো ব্যাগপ্যাক সঙ্গে নিয়েছে। খেয়ার সঙ্গে দেখা করল না। মনটা চাচ্ছিল একটিবার গিয়ে খেয়াকে বুকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে থাকতে। গতকাল রাতটা ফায়েজের নির্ঘুম কেটেছে। কারণ,, গতকাল রাতে যে তার বুকে ঘুমের টনিক বেঘোরে ঘুমিয়ে বিড়াল ছানার ন্যায় লেপ্টে ছিল না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে পাশের ঘরটাকে পাশ কাটিয়ে যখন চলে যাচ্ছিল ঠিক তখনি খেয়া ঘরের দরজা খুলে বের হয়ে এলো। দেখেই বুঝা যাচ্ছে মাত্রই ঘুম থেকে উঠে এসেছে। ফায়েজকে এত সকালে পরিপাটি রুপে দেখে খেয়া বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করল,,,

— আপনি কি আমাকে না বলেই বের হয়ে যাচ্ছিলেন??

খেয়ার কন্ঠ কাঁপছিল। আর ফায়েজ কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না। সত্যিটা বললে খেয়া কষ্ট পাবে আর মিথ্যা যে বলবে সেটারও তো কোনো পথ নেই। ফায়েজ কাঁধের ব্যাগটা নামিয়ে পায়ের কাছে রাখল। অভিমানী খেয়া ততক্ষণে বুঝে ফেলেছে ফায়েজ ওকে কিছু না জানিয়ে রাঙামাটির উদ্দেশ্য রওনা হতে যাচ্ছিল। যখন দেখল ফায়েজ ওর দিকে এগিয়ে আসছে ঠিক তখনি রুমের ভেতরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিলো। ফায়েজ অনবরত করাঘাত করছে দরজায়। কিন্তু,, অনড় খেয়া দরজার ওপাড়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার যেতে মন চাইছে সে চলে যাক খেয়া আর তাকে বাঁধা দেবে না । খেয়া এক ছুটে ওয়াশরুমে চলে যায়। কোনোমতে ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে এলো। কার্বাড থেকে নিজের আনুষঙ্গিক কাপড়চোপড় বের করে ব্যাগে ভরে নিলো। গায়ে বোরকা জড়িয়ে ব্যাগ হাতে নিয়ে দরজা খুলে বের হলো। নাহ্,, ফায়েজ নেই। চলে গেছে। খেয়া দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। সেই সাথে চোখের কোণে জল জমা হতে লাগল। মানুষটা যখন তাকে চেয়েছিল তখন সে কেবল দূর দূর করেছে। আর আজ খেয়া ফায়েজকে চাইছে কিন্তু ফায়েজ খেয়াকে পাত্তা অব্দি দিচ্ছে না। হয়তো একেই বলে কর্মফল। খেয়া ফায়েজ ছাড়া নিজেকে এক মূহুর্তের জন্য কল্পনা করতে পারছে না গত কয়েকদিন ধরে। ব্যাপারটা নিছক সাধারণ বিষয় নয়। আত্মিক বিষয়। যাকে এতগুলো বছর মনেপ্রাণে কেবল ঘৃনা করেছে আজ সেই মানুষটার অনুপস্থিতি তাকে পোড়ায়?? কিন্তু,, কেন?? কারণ,, সে যে তার হারানো অনূভুতি ফায়েজের মাঝে খুঁজে পেয়েছে।

মনের মাঝে কেবল ফায়েজের চিন্তাভাবনা ঘুরছে খেয়ার মস্তিষ্কে। বেশিকিছু ভাবতে পারল না। চোখগুলো বারবার ভিজে উঠছে যেটা মোটেও পছন্দ না তার। চোখের জল মুছে ঢাকায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো। যেখানে ফায়েজের কোনো হেলদোল নেই তাকে নিয়ে। সেখানে এই বাড়িতে পরে থাকার কোনো মানে হয় না।

ব্যাগ হাতে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হবার জন্য উদ্ধৃত হলো। ড্রইংরুম ক্রস করার সময় খেয়াকে কেউ পেছন থেকে জাপ্টে ধরল। খেয়া সেই বাঁধন থেকে মুক্ত হতে চাইল কিন্তু চাইলেই কি আর সেই বাঁধন থেকে মুক্তি পাওয়া যায়?? কিছুসময় অতিবাহিত হওয়ার পর খেয়া শান্ত হলো। প্রিয় মানুষের উপস্থিতি যে কতটা শান্তি দায়ক আজ আবারও বুঝতে পারল সে।

খেয়াকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে কাঁধে থুতনি রেখে ফিসফিসিয়ে বলল,,

— কোথায় যাচ্ছো আমাকে একলা রেখে??

— আমি কাউকে একলা রেখে কোথাও যাচ্ছি না। বরং অন্যকেউ আমাকে ফেলে চলে যাচ্ছে।

অভিমানী কন্ঠে জবাব দেয় খেয়া। আরেকটু নিবিড়ভাবে খেয়াকে বুকের মাঝে চেপে ধরল ফায়েজ। ফায়েজের হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানির শব্দ খেয়া টের পাচ্ছে। খেয়ার কানের কাছে মুখ বাড়িয়ে নেশাতুর গলায় ফায়েজ বলল,,

— মাত্র একটি রাত তোমাকে বুকে জড়িয়ে ধরিনি বলে ঘুমই এলো না চোখে । তুমি যদি চলেই যাও তাহলে তো আমার মরণ হবে…

ফায়েজের কথা সম্পূর্ণ হবার আগে খেয়া ফায়েজের দিকে ঘুরে ওর ঠোঁটের ওপর হাত রেখে কাতর গলায় বলল,,

— এগুলো কেন বলেন আপনি?? আপনার কিছু হলে আমি সহ্য করতে পারব না। স্রেফ মরে যাবে।

খেয়ার চোখে পানি দেখে আজ ফায়েজ চূড়ান্তের অবাক পর্যায়ে আছে। খেয়া কাঁদছে তাকে হারিয়ে ফেলার ভয়ে!! খেয়া কাঁদতে কাঁদতে ফায়েজের বুকে মাথা রেখে বলল,,

— আমার কি হয়েছে আমি জানি না?? শুধু এতটুকু বলতে পারি,, আমার বাকি জীবনে শুধু আপনাকেই চাই। আপনি নয় তো আর অন্য কেউ নয়।।

ফায়েজ খেয়াকে বুকের মাঝে শক্ত করে চেপে ধরল। এই যে আজ তার শূন্য হৃদয়ের কানায় কানায় ভালোবাসায় ভরে উঠেছে। এতগুলো বছর তো এই ভালোবাসা পাবার জন্য সাধনা করে গেছে। এত বছরের সাধনার ফল তবে আজ মিলল।

*****************

তীব্র হাওয়ার ক্ষীপ্র তান্ডবে যেন নারকেল গাছের ডাল যখন তখন আছড়ে পরবে মাটিতে। সমুদ্রের ঢেউয়ের গর্জনে মুখরিত যখন পুরো বীচ। ঠিক সেসময় ফায়েজ খেয়াতে মত্ত। সপ্তাদশী কিশোরীর ন্যায় খিলখিল করে হাসছে আর পানি ছুঁড়ে মারছে ফায়েজের দিকে। ফায়েজ মাঝে মাঝে নিজের আত্মরক্ষার জন্য খেয়ার দিকে পানি ছুঁড়ে মারছে।

একটা সময় পর দু’জনেই ক্লান্ত হয়ে হোটেলে ফিরল। খেয়া ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বের হতেই ফায়েজ ঢুকলো।
খেয়া এঁর ফাকে ভেজা টাওয়াল থেকে কেশরাশিকে মুক্ত করে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো যেখান থেকে পুরো সমুদ্রকে দেখা যায়।

চোখ বন্ধ রেখেই যখন সমুদ্রের ঢেউয়ের গর্জন শুনছিল ঠিক তখনি কেউ খেয়াকে বলল,,

— বলেছিলাম না কোনো একদিন তুমি আমাকে ভুলে যাবে। দেখেছো তো আজ তোমার হৃদয়ে আমি নেই। সেখানে শুধুই ফায়েজ বসবাস করে।

খেয়া চোখ খুলল না। কারণ,, সে জানে চোখ খুললে আজ আর নির্বাণের কথা শুনতে পাবে না। খেয়া চোখদুটো বন্ধ করে হাসিমুখে নির্বাণকে উদ্দেশ্য করে বলল,,

— কিন্তু,, তুমিই চাইতে আমি যেন তোমাকে ভুলে ফায়েজের মাঝে নিজেকে খুঁজি। একদিন তুমিই বলেছিলে তোমার পরে আমাকে এই পৃথিবীতে কেউ যদি সবচেয়ে বেশি ভালোবেসে থাকে তবে সেই মানুষটাই হবে ফায়েজ। আসলেই সে আমাকে অনেক অনেক ভালোবাসে নির্বাণ। ওকে ছাড়া নিজেকে কল্পনা করতে গেলে দমবন্ধ হয়ে আসে আমার।

নির্বাণের হাসির শব্দ শুনতে পেলো খেয়া। খেয়া চুপ করে রইল।

— ভালো থেকো আমার বৌ। তোমার জন্য আমার অপেক্ষা কবেই শেষ হয়ে গেছে। যেদিন তুমি ফায়েজের নামে কবুল বলেছিলে। তোমাকে হাশরে চাওয়ার বড্ড ইচ্ছে ছিল আমার। কিন্তু,, সেই চাওয়া আর পূরণ হলো না। আমি এতটাও স্বার্থপর নই যে আমার সামান্য একটা ইচ্ছা পূরণের জন্য তোমার পুরো একজীবনকে কেবল ওই এক সাদা রঙে আঁটকে ফেলব। তোমায় তো কেবল ভালোবাসার রঙে মানায়। বিবর্ণ রঙ কখনো তোমার গায়ে না জড়ুক। ভালোবাসায় টুইটুম্বুর সংসার হোক তোমার। আমি সবসময় তোমাকে যেমন সুখী দেখতে চাইতাম তুমি আজ তার চাইতে দশগুন বেশি সুখে আছো। তোমার সুখে আমার সুখ খেয়া। তোমাকে ভালোবাসি আমি। তোমার দেহের প্রতিটা রন্ধ্র জানে কতটা ভালোবেসেছি তোমায়।
আমার শরীরের প্রতিটা অংঙ্গে পচন ধরলেও অক্ষত হৃদয়ে কেবল তুমি ছিলে,, তুমি আছো,, তুমি রবে চির অসীম অনন্তকাল।

নির্বাণের কোনো কথাই আর শোনা হলো না খেয়ার। নির্বাণের অস্তিত্ব হারিয়ে গেছে সমুদ্রের ঢেউয়ের গর্জনের সঙ্গে।

খেয়া চোখ খুলে তাকাতেই কাউকে খুঁজে পেলো না। চোখের কোণে জল নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আনমনে বলল,,

— বড্ড ভেবেছো আমায় নিয়ে। পৃথিবীর কোনো প্রেমিক জীবদ্দশায় হয়তো তোমার মত সিদ্ধান্ত নিয়ে মরতে পারেনি। অথচ,, তুমি পেরেছো। যেই তুমি আমার পাশে কারো ছায়া সহ্য করতে পারতে না সেই তুমি আমার জন্য এমন একজনকে ভেবে রাখলে যে কিনা আমায় তোমার মত ভালোবেসে আগলে রাখে। ক’জন পারে এমন!! ওপারে ভালো থেকো। বিধাতার ওপর আর কোনো অভিযোগ নেই আমার। শুধু আফসোস রয়ে যাবে তোমার এক পাহাড়সম ভালোবাসা কেন আমার ভাগ্যে জুটেও জোটেনি।

— কি ভাবছো??

খেয়াকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে গলায় মুখ ডুবিয়ে জিজ্ঞেস করল ফায়েজ। খেয়া মুচকি হেসে ফায়েজের দিকে মুখ করে বলল,,

— সৃষ্টিকর্তা নদীর এপার ভেঙে ওপারে চড় ভাসায়। যেই নদীর পাড়ের মানুষের নদী ভাঙে তারা বিলাপ করে কাঁদে। আর নদীরে ওপারে থাকা মানুষেরা খুশি কারণ তাদের নদীর পাড়ে চর জেগেছে । আল্লাহ সবাইকে সবটা দেন না। তার সিদ্ধান্তের মাঝে নিশ্চয়ই কোনো উত্তম পুরষ্কার আছে।

— হটাৎ এই কথা!!

— আপনি আমাকে কত চাইলেন!! নির্বাণ আমাকে কত চাইল!! একটা সময় পর আমি নির্বাণকে চাইলাম। দু’জন এক হলাম ঠিকই তবে স্বল্প সময়ের মধ্যে দুজনের বিচ্ছেদ হলো চিরচায়িত প্রকৃতির নিষ্ঠুর নিয়মে। আপনি আমাকে ফের পেলেন। সবটাই কি বিধাতার ইচ্ছায় নয়??

— হুম। সব আল্লাহর ইচ্ছায়। তোমাকে আমি সবসময় চেয়েছি এটা যেমন সত্য। তেমনিভাবে আমি কখনো চাইনি নির্বাণের কিছু হোক। কিন্তু..।

ফায়েজ কিছু বলতে পারল না কন্ঠরোধ হয়ে এলো। খেয়া ফায়েজের ডানহাত ধরে বলল,,

— সবই আল্লাহ ইচ্ছা। নির্বাণের জন্য আমরা কেবল দোয়া করতে পারব আর কিছুই না।

ফায়েজ শান্ত হলো। খেয়ার হাত ধরে ঘরের ভেতরে এলো। ততক্ষনে রুমবয় এসে খাবার দিয়ে গেছে। দুজন মিলে খাবার খেয়ে নিলো। খানিকটা সময়ের জন্য বিশ্রাম নিতে হবে। কারণ ইনানি বীচে যাবে আজ। যেই ভাবা সেই কাজ। খেয়া সবে শুয়েছিল এমনসময় ফায়েজ খেয়াকে হাত ধরে টেনে বসিয়ে জিজ্ঞেস করল,,

— খেয়া,, নির্বাণ,, ফায়েজ এবং খুশবুকে নিয়ে গল্প লিখেছিলে না??

— আপনি জানলেন কি করে ওই গল্পের ব্যাপারে??

— সেটা না জানলেও চলবে তোমার। আগে এটা বলো সেই গল্পের মধ্যে খুশবু কিংবা আমি এলাম কি করে?? তখন তো আর আমাদের চিনতে না??

— খুশবুর কাছে শুনেছিলাম আপনার কথা। খুশবু নাকি আপনাকে ভালোবাসত।। কিন্তু গাধীটা আমাকে একবারও বলেনি যে আপনি নির্বাণের বড় ভাই। যদি জানতাম আপনাকে নিয়ে গল্প লেখার চিন্তাও করতাম না। নির্বাণ ভীষণ পসেসিভ ছিল আমার ব্যাপারে। সেই গল্পে ওকে ভিলেন বালিয়ে জ্বালানোর জন্য গল্পটা লিখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু,, তার আগেই…

খেয়া মাথা নীচু করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল.

—কিন্তু,, আমার নামের সঙ্গে কেন তোমার নাম জড়িয়ে গল্প লিখতে হলো তোমার??

— খুশবুর কাছে আপনার নাম শোনার পর মাথায় গেঁথে গিয়েছিল। জানি না তখন কেন জানি এই নামটা পার্ফেক্ট মনে হয়েছিল আমার।

— দুটো নাম মিশে গিয়ে একটি আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হবে এটা তো কেবল সৃষ্টিকর্তা জানতেন। তাই হয়তো,, তুমি তোমার সৃষ্ট গল্পে
খেয়া – ফায়েজ নামক চরিত্র সৃষ্টি করেছিলে। গল্পটা কি আর সম্পূর্ণ করবে না??

— না। কিছু গল্পের অসমাপ্ত অংশই চমৎকার। নির্বাণ আমার জীবনের ভিলেন নয়। আমার জীবনের একমাত্র সুখের চাবিকাঠি,, ভালোবাসার এক প্রশান্তময় রাজ্য। আমার যাকে মনে করে প্রশান্তি মিলে তাকে গল্পের চরিত্রে খলনায়ক বানাতে চাই না। সে আমার নায়ক। তাকে সবাই জানবে আমার নায়ক হিসেবে খলনায়ক হিসেবে নয়।

গর্বিত হেসে ফায়েজ খেয়াকে জড়িয়ে ধরল। আর খেয়া মনের দৃশ্যপটে নির্বাণের মুখ এঁকে তাকে কৃতজ্ঞতা জানাতে ব্যস্ত।

…সমাপ্ত…