Home "ধারাবাহিক গল্প ফিরেছি তোর আঙ্গিনায় ফিরেছি তোর আঙ্গিনায় পর্ব-৩০+৩১

ফিরেছি তোর আঙ্গিনায় পর্ব-৩০+৩১

0
383

#ফিরেছি_তোর_আঙিনায়
পর্ব —৩০
মৌমো তিতলী 🦋

সময় বড় অদ্ভুত।
কখনো এক মুহূর্তও পার হতে চায় না, আবার কখনো অজান্তেই কেটে যায় দিনের পর দিন।
আরও দুটো দিন পেরিয়ে গেল।
ডাক্তারদের নিরলস চিকিৎসা, নার্সদের আন্তরিক পরিচর্যা আর সবচেয়ে বেশি আয়াত, মৌমিতা, বিপাশা মাহমুদ ও আশালতা বেগমের অক্লান্ত সেবায় নোরার শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে।
তবে গলার ক্ষত এখনও ব্যান্ডেজে ঢাকা।
বুক আর পেটের বাম পাশেও নিয়মিত ড্রেসিং চলছে।
আগের মতো অসহনীয় ব্যথা নেই, তবে ক্ষতস্থানে জ্বালাপোড়া এখনও রয়েছে।
ডাক্তাররা ধীরে ধীরে তাকে বিছানায় উঠে বসতে চেষ্টা করতে বলেছেন।
যার দরুন আয়াত, মৌমিতা নোরা কে উঠতে,বসতে দিচ্ছে। কিছুক্ষণ দাঁড়ানোরও অনুমতি মিলেছে।
তবে সবচেয়ে বড় কষ্ট…
নোরা এখনও ঠিকমতো কথা বলতে পারে না।
অনেক চেষ্টা করলে ভাঙা, কর্কশ, অস্পষ্ট কয়েকটা শব্দ বের হয়।
প্রথম প্রথম সেই শব্দগুলো কেউই বুঝতে পারত না।
শুধু দু’জন মানুষ বুঝে ফেলতো অনাসায়ে।
আয়াত…আর মৌমিতা।
কেমন করে যেন ওরা নোরার ঠোঁট নড়া দেখেই বুঝে যায় সে কী বলতে চাইছে।

সেদিন বিকেলে…
হাসপাতালের কেবিনের জানালা দিয়ে গোধূলির রাঙা রোদ এসে পড়েছে।
নোরা ধীরে ধীরে উঠে বেডে ঠেস দিয়ে বসে।
আয়াত হাতে ফল কেটে ছোট ছোট টুকরো করছে। জুস বানানোর প্রস্তুতি। লিকুইড ছাড়া খেতে পারবে না মেয়েটা‌।
মৌমিতা পাশে বসে একটা বই পড়ে শোনাচ্ছে।
সেই মুহূর্তে নোরা খুব আস্তে ঠোঁট নাড়লো।

..পা…নি…

মৌমিতা কিছু বলার আগেই আয়াত গ্লাসটা হাতে তুলে নিল।
নোরার মুখের কাছে গ্লাস এনে বললো,,,

— পানি খাবে নোরা?

নোরা বিস্ময়ে তাকিয়ে ছিলো সেদিন আয়াতের মুখপানে।

মাথা নাড়লো।

মৌমিতা মুচকি হেসে বললো,,,

— দেখলি,তোর ভাষা আমরা শিখে ফেলেছি।

আয়াত পাশে বসেই মৃদু হেসে বললো,,,

— পৃথিবীতে যদি কেউ তোমার না-বলা কথাও বুঝতে পারে…তাহলে জানবে সে আমি আর মৌমিতা।

নোরার চোখে আবার জল এসে গেল।
আয়াত সঙ্গে সঙ্গে নোরার মুখটা দুহাতের আজলে আগলে ধরে শাসনের সুরে বললো,,,

— আবার কান্না? এত কান্না করলে কিন্তু আমি রাগ করবো।

নোরা খুব কষ্ট করে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো।

সেদিন সন্ধ্যার দিকে…

হাসপাতালের করিডোরে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে আয়াত আর আদিত্য। দুজনের হাতেই ওয়ান টাইম কফির কাপ।

দুজনেই কফিতে ধীরে ধীরে চুমুক দিচ্ছে।
আদিত্য নীরবতা ভাঙলো তখন,,,

— কি করবি কিছু ভাবছিস?

আয়াত উদাসীন হয়ে তাকালো আদিত্যর দিকে। আনমনেই বললো,,,

— আর কি ভাবার আছে! যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নোরা কে নিয়ে কানাডা যেতে হবে।

আদিত্য গম্ভীর গলায় বললো,,,

—সেটার ব্যপারে নয়,আরেকটা কাজও করতে হবে।

আয়াত প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালো।

আদিত্য খুব ধীরে বললো,,,

— নোরাকে আগে বিয়ে করে নে।

আয়াত কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো।
— এই অবস্থায়?

— হ্যাঁ এই অবস্থাতেই। কেনো তোর কি এখন নোরা কে বিয়ে করা নিয়ে সংশয় আছে?

স্তব্ধ হয়ে তাকালো আয়াত।

—এটা তুই কি বলছিস আদি? I love her. I can’t think of anything without her.

আদিত্য কাঁধে হাত রেখে বললো,,,

— তাহলে এতো চিন্তা কিসের? এমনিতেই তো তোদের বিয়েটা হচ্ছিলোই। তাহলে এখন অপেক্ষা কেন?
রেজিস্ট্রি করে ফেল। তারপর স্ত্রীকে নিয়ে কানাডা যা।
তাহলে ওর চিকিৎসার পুরো প্রোটোকল তোর নামে থাকবে। আইনগতভাবেও অনেক কাজ সহজ হবে। তা ছাড়া নোরার সাথে ২৪ ঘন্টা থাকতে হবে তোকে।

আয়াত আদিত্যর কথাগুলো মন দিয়ে শুনলো। শেষে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। দৃঢ় গলায় বললো,,

— ঠিক বলেছিস আদি। আর দেরি করা ঠিক হবে না।
আমার স্ত্রী হিসেবেই ওকে নিয়ে কানাডা যাবো। যদি পৃথিবীর শেষ প্রান্তে যেতে হয় তবুও যাবো।
দরকার হলে একটার জায়গায় দশটা সার্জারি করাবো।
তবুও আমার নোরাকে আগের মতো হাসতে দেখবো।
ওর শরীরের একটা দাগও যদি কমানো যায়…আমি সেই চেষ্টা করবো।

আদিত্য মৃদু হেসে ভাইয়ের কাঁধে হাত রেখে বললো,,,

— ব্যাস! এটাই শুনতে চেয়েছিলাম তোর থেকে।

পরের দিন…

নোরা এখন ওয়াকারের সাহায্য ছাড়া ধীরে ধীরে হাঁটতে পারে। যদিও বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে মাথা ঘুরে যায়।
তবু প্রতিদিন একটু একটু করে সাহস ফিরে পাচ্ছে।

হাসপাতালে টানা এতদিন কাটানোর পর একদিন দুপুরে বিপাশা মাহমুদ বললেন,
— আয়াত…নোরার অবস্থা তো এখন অনেকটাই ভালো। তুই একবার বাড়ি যা।

আয়াত অবাক হয়ে তাকালো মায়ের দিকে,,

— না আম্মু। আমি কোথাও যাচ্ছি না।

বিপশা এবার একটু কঠিন স্বরে বললেন,,,

— তোর চোখের নিচে দাগ পড়ে গেছে। কয়দিন ধরে ঠিকমতো ঘুমাসনি। এরপর তুই অসুস্থ হয়ে পড়লে নোরাকে দেখবে কে?

মৌমিতার দিকেও তাকালেন তিনি,,

— তুমিও যাবে মৌমিতা। দু’তিন ঘণ্টা বাড়ি গিয়ে গোসল করবে,কিছু খাবে তারপর আবার না হয় চলে আসবে।

মৌমিতা মাথা নাড়ে। বলতে চাই…

— কিন্তু…!

— কোনো কিন্তু না।
শেষ পর্যন্ত অনেক জোরাজুরির পর আয়াত আর মৌমিতা রাজি হলো।
বের হওয়ার আগে আয়াত নোরার গালে হাত রেখে আদুরে গলায় বললো,,,

— আমি কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসবো। আমার জন্য অপেক্ষা করবে কেমন?

নোরা ছোট্ট করে মাথা নাড়লো।
তারপর বহু কষ্টে অস্পষ্ট স্বরে বললো,,,

—..আ…সু…না

আয়াতের বুকটা ভরে উঠলো। কপালে চুমু এঁকে দিয়ে বললো,,,

— আসবো। খুব তাড়াতাড়ি আসবো। তুমি ততক্ষণে একটু ঘুমিয়ে নাও।

আয়াত, মৌমিতা দুজনেই বেরিয়ে এলো। আদিত্য গাড়িতেই ছিলো। দুজন গাড়িতে উঠে বসলে গাড়ি স্টার্ট দিলো আদিত্য।

কিছুক্ষণ পর…

নোরা ঘাড় ঘুরিয়ে বিপাশা মাহমুদের দিকে তাকালো।
হাত দিয়ে ইশারা করলো তাকে।

বিপাশা মাহমুদ নোরার ইশারা বুঝতে না পেরে বললো,,

—কি বলছো নোরা? ক্ষিদে পেয়েছে?

মাথা নাড়ে নোরা। ক্ষিদে পাইনি তার। হাতের ইশারা করলে বিপাশা নোরার হাতের ইশারা অনুসরণ করে তাকায়‌।

— ওয়াশরুমে যাবে মা?

নোরা মাথা নাড়লো।

তিনি খুব সাবধানে নোরাকে ধরে ধরে ওয়াশরুম পর্যন্ত নিয়ে গেলেন। সবসময় যেমন করেন…আজও তেমনই স্বাভাবিক ভাবেই নিয়েছিলেন।
কিন্তু…তার খেয়ালই রইলো না ওয়াশরুমের বড় আয়নাটার ওপর ঢাকা কাপড়টা আজ সকালে ধোয়ার জন্য আয়া এসে নিয়ে গেছে।

নোরা ওয়াশ রুমে নিজের কাজ সেরে ধীরে ধীরে মুখে পানির ঝাপটা দিয়ে ধুয়ে মাথা তুলতেই তার চোখ পড়লো আয়নায়।

পরের মুহূর্তেই…
তার পুরো শরীর যেন পাথর হয়ে গেল। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বটা দেখেই নোরার নিঃশ্বাস যেন বুকের ভেতর আটকে গেল। চোখদুটো ধীরে ধীরে বিস্ফারিত হয়ে উঠলো। এক পা…দুই পা…করে আয়নার আরও কাছে এগিয়ে গেল সে।

আয়নার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটাকে সে যেন চিনতেই পারছে না। মুখটা আগের মতোই আছে।
কিন্তু গলার বাঁ পাশ থেকে শুরু করে বুকের একাংশ, তারপর পেটের বাম দিক পর্যন্ত মোটা ব্যান্ডেজের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে শুকিয়ে আসা গভীর দগ্ধ চামড়া।
যে ত্বকটা একসময় মখমলের মতো কোমল ছিল…
সেখানে এখন দগদগে পোড়া দাগ। চামড়া কুঁচকে বিকৃত আকার ধারণ করেছে।

নোরার হাত কাঁপতে শুরু করলো। সে অবিশ্বাসের চোখে একবার নিজের দিকে, একবার আয়নার দিকে তাকাচ্ছে। মনে হচ্ছে
—না…এটা সে নয়। এটা অন্য কেউ।

তার ঠোঁট কাঁপলো। ভাঙা কণ্ঠে শব্দ বের করার চেষ্টা করলো,,

— আ…আ…কোনো শব্দই স্পষ্ট হলো না।

পরমুহূর্তেই আতঙ্ক নোরাকে পুরোপুরি গ্রাস করে ফেললো। হঠাৎ দু’হাতে গলার দাগের ওপর ঘষতে শুরু করলো নোরা। যেন একটু জোরে ঘষলেই সব মুছে যাবে।

— আ…আহ…
অস্পষ্ট গোঙানির মতো শব্দ বের হতে লাগলো তার মুখ থেকে।
বিপাশা মাহমুদ প্রথমে বুঝতেই পারলেন না কী হচ্ছে।
পরে শব্দ শুনে ওয়াশ রুমের দরজার কাছে তাড়াতাড়ি এগিয়ে এলেন তিনি ।

— নোরা…! এতক্ষণ কী করছো?

নোরা কিছুই শুনছে না।
সে আরও জোরে ক্ষতস্থানের চারপাশে হাত ঘষছে।
ব্যান্ডেজ সরে যেতে শুরু করেছে। ক্ষতস্থানে চাপ পড়তেই যন্ত্রণায় কেঁপে উঠছে শরীর। তবুও যেন ব্যথার কোনো অনুভূতিই নেই। তার চোখে শুধু একটাই আতঙ্ক ঘুরছে..

—এগুলো আমার শরীরে কেন? এটা তো আমি নই‌।

বিপাশা মাহমুদের বুকটা ধক করে উঠলো।
হঠাৎই তাঁর মনে পড়লো আয়া সকলে পর্দা খুলে নিয়ে গেছে। নোরা তো এখনও নিজেকে ঠিকভাবে দেখেইনি!
তিনি নিজের কপালে হাত চাপড়ে উঠলেন।

— হায় আল্লাহ…! আমার একদম খেয়ালই ছিল না…
তিনি তাড়াতাড়ি ওয়াশ রুমের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়লেন। নোরাকে তার শরীরে খামচাতে দেখে নোরার দুই হাত ধরে ফেললেন তিনি ।

— মা… না..নোরা এটা করোনা.এভাবে ধরো না…

কিন্তু নোরা যেন আর নিজের মধ্যে নেই। সে বারবার দু’পাশে মাথা নাড়ছে। চোখ দিয়ে অনবরত জল গড়িয়ে পড়ছে। গলা থেকে বের হচ্ছে অস্পষ্ট, ভাঙা শব্দ।
সে যেন মরিয়া হয়ে বলতে চাইছে,,

—এটা আমার শরীর না…! এটা সরিয়ে দাও।

বিপাশা মাহমুদের চোখও ভিজে উঠলো। তিনি নোরাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন…

— নোরা মা…আমার দিকে তাকাও…এসব দাগ সেরে যাবে। ডাক্তার বলেছে না? সব ঠিক হয়ে যাবে।

কিন্তু নোরা যেন কোনো কথাই শুনতে পাচ্ছে না।
সে আবার ক্ষতস্থানের দিকে হাত বাড়াতেই বিপাশা মাহমুদ ভয় পেয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে উচ্চস্বরে ডাকলেন,,,

— সিস্টার… কেউ আছেন? প্লিজ কেউ আছেন!

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই দু’জন নার্স ছুটে এলো।
পরিস্থিতি দেখে তাঁদের একজন দ্রুত ইন্টারকমে ফোন করলো…

— ডক্টর দত্তকে এখনই খবর দিন। পেশেন্ট প্যানিক করছেন।

অন্য নার্স খুব সাবধানে নোরার হাত দুটো ধরে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করতে লাগলো,,,

— ম্যাম…প্লিজ শ্বাস নিন…কিছু হয়নি।

কিন্তু নোরা বারবার মাথা নাড়ছে। তার পুরো শরীর কাঁপছে। চোখের ভেতর জমে আছে অসহায় এক আতঙ্ক।
এদিকে বিপাশা মাহমুদ কাঁপা হাতে ফোন বের করলেন। প্রথমেই আয়াতকে কল দিলেন।
ওপাশ থেকে ফোন ধরতেই তিনি প্রায় কেঁদে উঠলেন,,

— আয়াত…তাড়াতাড়ি হাসপাতালে আয় বাবা…

মায়ের কথাটা শুনেই আয়াতের মুখের সমস্ত রঙ উধাও হয়ে গেল। মাত্রই বাড়িতে ফিরে শাওয়ার নিলো
। কিছু খাওয়াও হয়নি এখনও।

— কী হয়েছে আম্মু? নোরা ঠিক আছে তো?

ওপাশ থেকে বিপাশা মাহমুদ কাঁপা গলায় সবটা জানাতেই আয়াত জানায়,,,

— আমি আসছি। এক্ষুনি আসছি।

ফোন কেটে সে আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না আয়াত। দৌড়ে বেরিয়ে এলো ঘর ছেড়ে। করিডোরেই দেখা মিললো আদিত্যর। আয়াত কে ছুটতে দেখে প্রশ্ন ছুড়লো,,

—হোয়াট হ্যাপেন আয়াত? এভাবে হন্তদন্ত হয়ে কোথায় যাচ্ছিস?

আয়াত দ্রুত সবকিছু বলে আদিত্য কে। সবটা শুনে আদিত্য কেও বেশ চিন্তিত লাগলো।

দুজনেই দ্রুত নিচে নামতেই মৌমিতার সামনে পড়লো। আদিত্য মৌমিতার দিকে তাকিয়ে শুধু বললো,,

— হসপিটালে চলো! নোরা প্যানিক করছে।

মৌমিতা কিছু না জিজ্ঞেস করেই তার সঙ্গে দৌড়ে গাড়িতে উঠে বসলো। গাড়ি হাসপাতালের দিকে ছুটে চললো। সারা রাস্তা কেউ একটা কথাও বললো না।


এদিকে ডক্টর হিমেল দত্ত দ্রুত কেবিনে এসে পৌঁছালেন। নোরার অবস্থা দেখে সব বুঝতে তাঁর এক মুহূর্তও লাগলো না। তিনি খুব শান্ত গলায় বললেন,,,

— মিস নোরা… আমার দিকে তাকান।

নোরা কোনো সাড়া দিল না।
ডক্টর ধীরে ধীরে তাঁর পাশে বসে বললেন,,,

— আপনি যে দাগগুলো দেখছেন…এগুলো আপনার শরীরের স্থায়ী দাগ নয়। এখন এগুলো আপনার বেঁচে থাকার সাক্ষী। আর আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করবো, যেন এগুলো যতটা সম্ভব মুছে যায়।

তিনি নার্সের দিকে তাকিয়ে বললেন,,

— একটা হালকা সেডেটিভ প্রস্তুত করুন।পেশেন্টকে আগে শান্ত করতে হবে।

ঠিক তখনই করিডোরে দ্রুত পায়ের শব্দ শোনা গেল।
আয়াত,আদিত্য আর তার ঠিক পেছনেই মৌমিতা।
তিনজনেই প্রায় দৌড়ে কেবিনে ঢুকলো।
নোরা মৌমিতা আর আয়াতকে দেখেই যেন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না।
চোখ ভরে জল নেমে এলো। ঠোঁট উল্টে কেঁদে উঠলো ঝরঝর করে।
সে কাঁপতে কাঁপতে নিজের গলার দিকে ইশারা করলো তারপর বুকের দিকে,আবার আয়নার দিকে।
অস্পষ্ট কণ্ঠে শুধু বলতে পারলো,,

— আ…আ…

শব্দটা শেষ হওয়ার আগেই কান্নায় ভেঙে পড়লো। আয়াত পরম মমতায় বুকে জড়িয়ে নিলো নোরা কে।
আয়াতের বুকটা যেন ভেতর থেকে ছিঁড়ে যেতে লাগলো। প্রেয়সীর এই হাল সহ্য করতে পারছে না সে।

সে কোনো কথা না বলে খুব সাবধানে নোরার দুই হাত নিজের হাতে নিয়ে কপালে ঠেকালো।
চোখের জল লুকিয়ে মৃদু স্বরে বললো,,,

— আমার দিকে তাকাও জান।

নোরা তাকালো।

— এই দাগগুলো তোমাকে একটুও অসুন্দর করেনি।
তুমি এখনও আমার সেই নোরা। যে মেয়েটার প্রেমে আমি পড়েছিলাম…আজও আমি সেই একই মানুষকে দেখছি। আমি কথা দিচ্ছি…আমরা তোমাকে আরও উন্নত চিকিৎসা করাবো। পৃথিবীর যেখানে যেতে হয়, যাবো। কিন্তু একটা মুহূর্তের জন্যও তোমাকে একা ছেড়ে দেবো না। একদম চিন্তা করো না তুমি। তোমার আয়াত আছে না!

মৌমিতাও এসে নোরার মাথায় হাত রাখলো। প্রিয় বান্ধবীর করুন অবস্থা দেখে হিঁচকি তুলে কাঁদছে মেয়েটা। কাঁদতে কাঁদতেই হাসার চেষ্টা করে বললো,,,

— তুই কি ভাবছিস আমরা তোকে ছেড়ে পালিয়ে যাবো? কখনো না। তুই যতদিন লড়বি,আমরাও ততদিন তোর সঙ্গে লড়বো।

নোরার চোখ দুটো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে এলো।
নার্স সেডেটিভ দেওয়ার পর তার শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক হতে শুরু করলো। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। কেবিনে নেমে এলো ভারী নীরবতা।

আয়াত অনেকক্ষণ নোরার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর খুব ধীরে, আদিত্যর দিকে তাকিয়ে বললো,,

— তুই ঠিক বলেছিস আদি,আর অপেক্ষা নয়। যত দ্রুত সম্ভব রেজিস্ট্রি ম্যারেজ হবে।

তারপর ডক্টর হিমেল দত্তের দিকে তাকিয়ে বলল,,,

—ডক্টর নোরা কে এই সপ্তাহেই আমি বাড়ি নিয়ে যেতে চাই। আগামি সপ্তাহেই আমি নোরা কে নিয়ে কানাডায় যাবো। আপনি প্লিজ ডক্টর মর্গানের সাথে কথা বলে অ্যাপয়নমেন্ট নিয়ে রাখুন।

ডক্টর হিমেলও একমত হলেন। এটাই এখন পেশেন্টের জন্য ঠিক হবে। তিনি আদিত্য কে বললেন তার সাথে আসতে। আদিত্যকে সহ ডক্টর মর্গানের সাথে কথা বললে বিষয়টা সহজ হবে বলে মনে হলো তার।

চলবে….

#ফিরেছি_তোর_আঙিনায়
পর্ব—৩১
মৌমো তিতলী 🦋

প্রায় তিন সপ্তাহের দীর্ঘ চিকিৎসার পর অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত দিনটা এলো।
সকালের স্নিগ্ধ রোদ্দুর জানালার কাঁচ ভেদ করে হাসপাতালের কেবিনে ছড়িয়ে পড়েছে। করিডোরজুড়ে ডাক্তার-নার্সদের ব্যস্ত পদচারণা। কিন্তু আজ যেন সেই ব্যস্ততার মাঝেও অধিক স্বস্তি কাজ করছে ৩০৯ কেবিন মেম্বারদের।

ডক্টর হিমেল দত্ত হাতে ফাইল নিয়ে কেবিনে ঢুকলেন। নোরার সর্বশেষ রিপোর্টগুলো আরেকবার ভালো করে দেখে মৃদু হেসে বললেন,,,,

— অভিনন্দন নোরা আফরিন। আপাতত আপনাকে ডিসচার্জ করা হচ্ছে।

কথাটা শুনে সবার মুখেই স্বস্তির ছাপ ফুটে উঠলো।

ডিসচার্জের ফর্মালিটিজ শেষে নোরা কে নিয়ে হসপিটাল থেকে বেরিয়ে এলো মৌমিতা।
এক হাতে নোরার কাঁধ আগলে রেখেছে, অন্য হাতে তার ছোট্ট ব্যাগ। নোরা ধীরে ধীরে হাঁটছে।
তার গলার ব্যান্ডেজ এখন আগের তুলনায় ছোট হয়েছে। ওড়নাটা এমনভাবে জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে যাতে ক্ষতগুলো খুব একটা চোখে না পড়ে।

ততক্ষণে ডক্টর আয়াত কে পরবর্তী করনীয় সম্পর্কে বিস্তারিত বুঝিয়ে দিলেন।

—যত দ্রুত সম্ভব কানাডায় পৌঁছানোর পর ডক্টর মর্গানের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা শুরু করতে হবে। নিয়মিত ড্রেসিং, স্পিচ থেরাপি, পরে প্রয়োজনে রিকনস্ট্রাকটিভ ও প্লাস্টিক সার্জারি সবকিছু ধাপে ধাপে চলবে। এ বিষয়ে ডক্টর মর্গানের সাথে আমার এবং মিঃ আদিত্যর বিস্তারিত আলাপ হয়েছে। আশা করি সমস্যা হবে না।

আয়াত দৃঢ় গলায় বলল,,,

— যত সময় লাগুক,,আর যত টাকা লাগুক আমরা সবটা করতে প্রস্তুত ডক্টর।

ডক্টর হিমেল মাথা নেড়ে মৃদু হাসলেন।

— আমি জানি আপনি করবেন।

গাড়িতে ওঠার আগে নোরা একবার হসপিটালের দিকে তাকালো। এই কয়েকটা সপ্তাহে জায়গাটা যেন তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন যুদ্ধের সাক্ষী হয়েছে।
মৌমিতা এসে নরম গলায় বলল,,,

— কি দেখছিস চল…

নোরা মৃদু হাসল। পাশ ফিরে মৌমিতার কাঁধে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে রইলো।
ড্রাইভিং সিটে বসে আদিত্য। আয়াত বেরিয়ে এসে সামনে আদিত্যর পাশের সিটে বসতেই গাড়ি স্টার্ট দিলো আদিত্য।

___________
আশাকুঞ্জে ফিরে সবাইকে যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেল।
শাহেদা খানম অনেকক্ষণ নোরাকে বুকে জড়িয়ে ধরে রাখলেন।
— আল্লাহ তোকে ফিরাইয়া আনছে বইন…কইছিলাম বাইরে যাওন ভালা না। তোরা তো শুনিসনা বুড়ো মানুষের কথা। আল্লাহ তরে ফিরায় দিছে তাই আলহামদুলিল্লাহ…

নোরাও নানির কোলে মাথা রেখে অঝোরে কাঁদছে।
আশালতা বেগম চোখ মুছতে মুছতে বললেন,,,

— এবার আর কোনো চিন্তা না। সব ঠিক হবে ইনশাআল্লাহ।

সন্ধ্যার দিকে আশালতা বেগম, বিপাশা মাহমুদ আর মৌমিতা,নোরা ড্রয়িংরুমে বসে টুকটাক কথা বলছিলো।
সেই মুহূর্তে আদিত্য আর আয়াত বাসায় ঢুকলো। ভিসার কাজে বেরিয়েছিল দুজন।

সবাইকে একসাথে দেখে আদিত্য কিছু ইশারা করলো আয়াত কে। আয়াত ঘাড় নেড়ে সায় দিয়ে হঠাৎ শান্ত গলায় বলল,,,

— ভালোই হলো তোমরা সবাই এখানে আছো,আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

আয়াতের কথায় সবাই তার দিকে তাকালো। আয়াত স্বাভাবিক ভাবেই বললো,,

— কানাডায় যাওয়ার আগেই আমি নোরাকে বিয়ে করতে চাইছি।

কথাটা বলেই আড়চোখে নোরার দিকে তাকালো আয়াত।

মেয়েটার মুখ নিচু‌। চোখ যে এই মুহূর্তে ভিজেছে তা নিশ্চিত আয়াত। মেয়েটা কথা বললেও তার দৃষ্টিভঙ্গিতেই সব উত্তর পেয়ে যায় সে।

ঘরে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা নেমে এলো। মৌমিতা খুশির চোটে কথায় বলতে ভুলে গেলো। নোরাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরলো সে।
আশালতা বেগমও বললেন,,,

— আমারও মনে হয় এটাই ঠিক হবে। সম্পর্কটা আর ঝুলিয়ে রাখা ঠিক হবে না।

কিন্তু এরমধ্যে বিপাশা মাহমুদ চুপ করে রইলেন।
তিনি কিছু বললেন না। শুধু ছেলের মুখের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন…

______

বিকেলের আলো ধীরে ধীরে নিভে আসছে। সন্ধ্যার নিয়ন বাতি জ্বলে উঠেছে ইতিমধ্যে।
আশাকুঞ্জের দ্বিতীয় তলার বারান্দায় একা দাঁড়িয়ে ছিল আয়াত। দূর আকাশে অর্ধ চন্দ্র উঁকি দিচ্ছে। হাতে ধোঁয়া ওঠা এক কাপ কফি। কিন্তু কফিতে একবারও চুমুক দেওয়া হয়নি।
পেছন থেকে ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন বিপাশা মাহমুদ।
ছেলের কাঁধে হাত রেখে ডাকলেন,,,

— আয়াত…

মায়ের কণ্ঠ শুনে ঘুরে দাঁড়ালো আয়াত।

— আম্মু তুমি!.. কিছু বলবে?

বিপাশা কয়েক মুহূর্ত ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর পাশে এসে রেলিংয়ে হাত রেখে দাড়ালেন। দুজনের মাঝেই নীরবতা বিরাজ করলো কিছুক্ষণ।
অনেকক্ষণ পর তিনি শান্ত গলায় বললেন,,,

— একটা কথা বলবো বাবা?

— বলো।

বিপাশা একটু ইতস্তত করলেন,,,

— কথাটায় মাকে ভুল বুঝিস না।

আয়াত মৃদু হেসে বললো,,,

— তোমার কোনো কথাই আমি ভুল বুঝি না আম্মু।

বিপাশা গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেললেন।

— তুই কি সত্যিই নোরাকে এখনই বিয়ে করতে চাস।

— হ্যাঁ।
একটুও দেরি না করে উত্তর দিল আয়াত।

বিপাশা এবার ছেলের চোখের দিকে তাকালেন।

— ভালো করে ভেবে দেখেছিস?

— অনেক ভেবেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি আম্মু।

— আরেকবার ভাবলে হয়না?

আয়াত ভ্রু কুঁচকে তাকালো।

বিপাশা ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন,,,

— আমিও নোরাকে খুব ভালোবাসি বাবা। নিজের মেয়ের মতোই ভালোবাসি। ওর জন্য আমারও খুব কষ্ট হয়। আমি কখনোই চাই না তুই ভাবিস, আমি ওকে মেনে নিতে চাইছি না।

একটু থামলেন।
কণ্ঠটা আরও নরম হয়ে এলো ওনার,,

— কিন্তু আমি একজন মা। আমার একটাই ছেলে তুই। তোর ভবিষ্যৎ নিয়েও তো ভাবতে হবে আমাকে।

আয়াত চুপচাপ শুনছে।

বিপাশা বললেন,,,,

— তুই শুধু আমার ছেলে না, তুই সারা দেশের পরিচিত একটা মুখ। তোর একটা হাসি নিয়েও যেখানে মানুষ আলোচনা করে, তেমনি তোর ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও হাজার রকম কথা হবে।

আয়াত কিছু বললো না। চুপচাপ মায়ের কথা শুনতে লাগলো।

বিপাশা আবার বললেন,,,

— নোরার আজকের অবস্থার জন্য ওর কোনো দোষ নেই। একটুও না। কিন্তু সমাজ কি সেটা বুঝবে?

তিনি একটু থেমে ঠোঁটে কষ্টের হাসি ফুটিয়ে বললেন,,,

—আজ তোদের বিয়ে হলে কিন্তু কাল থেকেই মিডিয়ায় গুঞ্জন শুরু হবে…
এত সুন্দর একটা ছেলে, একজন খ্যাতনামা গায়ক কেন এমন মেয়েকে বিয়ে করলো?
সহানুভূতি দেখিয়ে বিয়ে করেছে।
কয়দিন পর ডিভোর্স হয়ে যাবে। আরও কত কী…
মায়ের গলাটা কেঁপে উঠলো।

— এসব কথা শুনে তুই কি সারাজীবন শক্ত থাকতে পারবি? নিজের সিন্ধান্তে কখনো আফসোস করবি না তো? যদি কোনোদিন…বলছি না হবেই কিন্তু কোনোদিন… নিজের সিদ্ধান্তের জন্য আফসোস হয়?
তখন সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাবে কে জানিস?

আয়াত এবার ধীর গলায় বললো,,,,

— নোরা।

বিপাশা মাথা নাড়লেন।
— হ্যাঁ। এমন কিছু হলে কিন্তু মেয়েটা শেষ হয়ে যাবে। তাই শেষবারের মতো জিজ্ঞেস করছি…

তিনি আয়াতের হাতটা নিজের হাতে নিলেন,,

— এটা কি তোর হৃদয়ের সিদ্ধান্ত? নাকি আজকের ঘটনার জন্য জন্ম নেওয়া দায়িত্ববোধ?

অনেকক্ষণ কোনো কথা বললো না আয়াত।
হালকা বাতাসে তার চুল এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ সেই মৃদু হাওয়া অনুভব করলো আয়াত। লম্বা করে শ্বাস টেনে নিলো নিজের মধ্যে। কয়েক সেকেন্ড পরে খুব ধীরে মুচকি হাসলো সে। মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,,,

— আম্মু…!

— বল বাবা?

— তুমি কি জানো, আমি প্রথম নোরার প্রেমে কবে পড়েছিলাম?

বিপাশা অবাক হয়ে তাকালেন।

আয়াত দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলো,,,

— যেদিন ও প্রথমবার আমার সামনে দাঁড়িয়ে এক নিঃশ্বাসে সোহেলকে বকছিল,আমার সাথে মিসবিহেব করার জন্য। আমি স্টার বলে একটুও চিনতে পারেনি তখনও। পাত্তাও দেয়নি। কিন্তু একজন সাধারণ মানুষের জন্যও সে নিজের কলিগের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলো।
আয়াতের ঠোঁটে স্মৃতিমাখা হাসি ফুটলো।

— পরবর্তীতে ওর রাগ… ওর হাসি… ওর বাচ্চামি… ওর জেদ… সবকিছুর প্রেমে পড়েছিলাম।
একটু থামলো আয়াত।

তারপর খুব শান্ত গলায় বললো,,,

— আম্মু… আমি নোরার সুন্দর মুখের প্রেমে পড়িনি।

বিপাশা স্থির হয়ে শুনছেন।

— আমি প্রেমে পড়েছি নোরা নামের মানুষটার।
আয়াতের চোখ এবার ভিজে উঠলো।

— যে মেয়েটা নিজের সুখের থেকেও অন্যের সুখকে বড় করে দেখে… যে নিজের কষ্ট লুকিয়ে সবাইকে হাসায়… যে আমার জীবনে শান্তি এনে দিয়েছে…সে মেয়েটা আজও বদলায়নি। বদলেছে শুধু ওর শরীরের কিছু অংশ। ওর ওই শরীরের পরিবর্তনকে আমি তোয়াক্কাই করি না আম্মু। ওটা কি এতটাই বড় বিষয়, যে আমি আমার ভালোবাসাটাকেই বদলে ফেলবো?

বিপাশার চোখ ভিজে উঠলো গর্বে।
আয়াত মায়ের হাত দুটো শক্ত করে ধরলো।

— তুমি আমাকে ছোটবেলা থেকে একটা কথাই শিখিয়েছো…
“মানুষকে তার মন দিয়ে বিচার করতে হয়।”
আজ যদি আমি নোরাকে ছেড়ে দিই…
তাহলে সবার আগে তোমার সেই শিক্ষাকেই অসম্মান করা হবে।

বিপাশার চোখ বেয়ে নীরব অশ্রু গড়িয়ে পড়লো।
আয়াত আবার বললো,
— আর একটা কথা… আম্মু
ধরো… আজ যদি এই ঘটনাটা নোরার বদলে আমার সঙ্গে ঘটতো? আমার মুখটা পুড়ে যেত। আমার ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যেত।
তখন কি তুমি চাইতে, নোরা আমাকে ছেড়ে চলে যাক?

বিপাশা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়লেন।

— কখনোই না।

— তাহলে আমি কেন যাবো?

আমি যদি আজ ওর পাশে না দাঁড়াই…
তাহলে আমার ভালোবাসার মূল্যই বা কোথায়?
আমি সহানুভূতি থেকে নোরাকে বিয়ে করছি না, আম্মু।
আমি আমার স্ত্রীকে বিয়ে করছি।

যাকে আমি আজও প্রথম দিনের মতোই ভালোবাসি।
যতদিন বাঁচবো… ঠিক ততদিন ডে ওয়ানের মতই ভালোবাসবো।

বিপাশা আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না।
ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কেঁদে ফেললেন।

— আল্লাহ তোদের দুজনকে সুখে রাখুক বাবা…আমার সব দ্বিধা, সংকোচ, দুঃশ্চিন্তা দূর হয়েছে।

আয়াত মায়ের কাঁধে মাথা রেখে মৃদু স্বরে বলল,,,

— আমীন।

************

আশাকুঞ্জের প্রতিটি মানুষ ব্যস্ত। কিন্তু সেই ব্যস্ততার ভেতরেও যেন এক ধরনের বিয়ে বিয়ে গন্ধ মিশে আছে।কোনো জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন নয়। কোনো আলোকসজ্জা নেই। কোনো ব্যান্ডপার্টি নেই। নেই শত শত অতিথির কোলাহল।
শুধু পরিবারের আপন মানুষগুলোকে নিয়ে, খুব নীরবে, খুব আপন করে আয়াত আর নোরার রেজিস্ট্রি বিয়ে হবে আজ।

উপরে নিজের ঘরে বসে আছে নোরা।
আজ অনেকদিন পর তাকে শাড়ি পরানো হয়েছে। হালকা অফ-হোয়াইট রঙের একটা নরম জামদানি।
গলার ব্যান্ডেজটা খুব যত্ন করে ঢেকে দিয়েছেন মৌমিতা। যতটা সম্ভব বুকের পোড়া অংশও আড়াল করে দিয়েছেন।
মৌমিতা নিজের হাতে খুব আস্তে আস্তে নোরার চুলগুলো আঁচড়ে দিচ্ছে।
একসময় ছোট্ট একটা জুঁই ফুলের গাজরা গুঁজে দিয়ে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো। আয়নার দিকে ইশারা করে বললো,,,

— দেখ…

নোরা প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালো।
মৌমিতা মুচকি হেসে বললো,,,

— তুই কত্ত সুন্দর।

নোরা নিচের দিকে তাকিয়ে রইলো।
আপনাআপনি তার হাতটা নিজের গলার দিকে উঠে এলো।
মৌমিতা সঙ্গে সঙ্গে নোরার হাতটা ধরে ফেললো।

— না…!

তারপর নরম গলায় বললো,,,

— আজ দাগ নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগার দিন নয়। আজ তোর নতুন জীবন শুরু করার দিন নোরা।

নোরার চোখ ভিজে উঠলো। কিছু বলতে চাইলো যেন।

মৌমিতা ওর কপালে আলতো একটা চুমু দিয়ে বললো,,,

— আজ আর একদম কাদবি না দোস্ত ! আজ থেকে তুই শুধু হাসবি। কাঁদলে কিন্তু মেকআপ নষ্ট হয়ে যাবে!


ঠিক তখনই দরজায় নক পড়লো। মৌমিতা দরজা খুলতেই আদিত্য ভেতরে ঢুকে মৌমিতার দিকে শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ।

ফের নোরার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললো,,,

— আমার বোন তো আজ আয়াতের পুরো পৃথিবী কাঁপিয়ে দিবে মনে হচ্ছে।

আদিত্যর কথায় লাজে মুখ নামিয়ে নিলো নোরা।
আদিত্য নোরার সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসলো।
নোরার মাথায় আলতো হাত রেখে বললো,,,

— কেমন লাগছে এখন?

নোরা ঠোঁট নেড়ে খুব কষ্ট করে বললো,,

— ভা…লো…
যদিও শব্দটা পুরোপুরি বের হলো না।

তবুও আদিত্য বুঝে গেল।
হেসে বললো,,,

— ব্যাস… এটাই আমার সাহসী বোন।

আর একটা কথা সব সময় মনে রাখবে।
আজ থেকে তোমার জীবনে আর কোনো ঝড় একা সামলাতে হবে না। ভাইয়া সব সময় পাশে থাকবে কেমন!
তোমার বন্ধু আছে,আয়াত আছে,আমরা সবাই আছি!
সবাই।
নোরা এবার আর নিজেকে আটকাতে পারলো না। আদিত্যর ভাইয়ের মতো স্নেহ মিশ্রিত কথায় চোখ বেয়ে নিঃশব্দে জল গড়িয়ে পড়লো।
মৌমিতা দুহাতে তা স্বযত্নে মুছে দিলো।


নিচতলায় ড্রয়িংরুমটাকে খুব সাধারণভাবে সাজানো হয়েছে।
একজন ম্যারেজ রেজিস্ট্রার এসে বসে আছেন ড্রইং রুমে।
কনের দায়িত্বে পিতা হিসেবে আছেন সাদমান চৌধুরী,বড় ভাই শেহজাদ আদিত্য চৌধুরী।

আশালতা বেগম, বিপাশা মাহমুদ, সাথে শাহেদা খানমও হুইলচেয়ারে বসে এসেছেন। শরীর খারাপ হলেও তিনি নাতির বিয়ে না দেখে থাকতে পারেননি।
বৃদ্ধা মহিলার চোখে আজ শুধু পানি।
বারবার দোয়া পড়ছেন।

— আল্লাহ… এই দুইডারে সুখে রাইখো…


কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলো নোরা তার পাশে মৌমিতা।

সবাই নিঃশব্দে তাকিয়ে রইলো সেদিকে।
আয়াতও তাকিয়ে আছে অপলকে।
তার মনে হচ্ছে…
আজ পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর মানুষটা তার সামনেই দাঁড়িয়ে। সে পোড়া দাগ দেখলো না,সে ব্যান্ডেজও দেখলো না সে শুধু দেখলো…তার ভালোবাসাকে।

আয়াতের ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠলো। চোখ দুটো ভিজে উঠলেও সে হাসিটা হারাতে দিল না।

রেজিস্ট্রার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বের করলেন। এক এক করে সব পড়ে শোনানো হলো।
শেষে নোরার সামনে কাগজটা রাখা হলো।
কলমটা হাতে নিতে গিয়ে নোরার হাত কেঁপে উঠলো।
আয়াত আস্তে করে তার হাতের ওপর হাত রেখে আশ্বাস দিলো।
কাঁধে হাত রেখে সাহস দিলো মৌমিতা।

আয়াত মৃদু স্বরে বললো,,,

— ধীরে সুস্থে সাইন করো…কোন তাড়া নেই নোরা!আমি আছি তো তোমার পাশে।

নোরা একবার আয়াতের দিকে তাকালো।
তারপর কাঁপা হাতে নিজের নাম লিখে দিল তার ভালোবাসার নামে।

এরপর আয়াতও স্বাক্ষর করলো দ্রুত।
রেজিস্ট্রার হাসিমুখে ঘোষণা করলেন,,,

— অভিনন্দন। আজ থেকে আইনিভাবে আপনারা স্বামী-স্ত্রী। এক মুহূর্তের জন্য পুরো ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
তারপর…সবার হাততালিতে ভরে উঠলো ঘরটা। আদিত্য মৌমিতার খুশিতে অশ্রুসিক্ত নয়নের পানে তাকালো। ফের বিনা বাক্যব্যয়ে নিজের বাহুডোরে আবদ্ধ করলো মৌমিতা কে। আস্তে করে বললো,,,

—আলহাদুলিল্লাহ বলতে হয় বউ!

মৌমিতা হাসতে হাসতেই চোখ মুছতে মুছতে বললো,,,
,
— আলহামদুলিল্লাহ…আজ আমার কি যে খুশি লাগছে! বোঝাতে পারবো না।

আদিত্য মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল প্রেয়সী প্রিয়ার সেই মোহনীয় মুখের পানে।

বিপাশা মাহমুদ এগিয়ে এসে নোরাকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরলেন।

— আজ থেকে তুমি শুধু আমার ছেলের বউ নও… তুমি আমার মেয়েও।
নোরা কাঁদতে কাঁদতে তাঁর কাঁধে মুখ লুকিয়ে ফেললো।

আয়াত ধীরে ধীরে নোরার সামনে এসে দাঁড়ালো।
খুব আস্তে তার কপালে একটা চুমু রেখে ফিসফিস করে বললো,
— ওয়েলকাম মিসেস আয়াত মাহমুদ।

লজ্জায়, কান্নায়, ভালোবাসায় একসঙ্গে ভরে উঠলো নোরার চোখ। ফের মুখ লুকালো আয়াতের বক্ষ পিঞ্জরে।

চলবে,,,,,,