#তিমিরবসান(৯)
#তাবাসসুম_তাজ্বওয়ারী
– তুই ওই মেয়ের কথা ভুলে যা তো! আমি তো আগেই বলেছিলাম ওদের স্ট্যাটাস আমাদের সাথে যায় নাকি? আমাদের ক্লাসের একটা মেয়ের সাথে তোকে বিয়ে দিবো। দেখা যাবে ওই মেয়েকে কে বিয়ে করে! ওর বাপের বাড়িতে ওকে রাখবে নাকি হুহ!
ফাহাদ বিরক্ত এত কথা শুনে। সে কি আর স্নিগ্ধার প্রতি মুগ্ধ নাকি? ওর প্রতি মোহ তো কবেই শেষ হয়ে গেছে এখন আপদ বিদায় হয়েছে সে খুশি। আরেকটা মেয়ে আসাতে সে তো চিন্তায় পড়ে গিয়েছিল যাক এখন সেসব গেল। কিন্তু মায়ের কথা বন্ধ হচ্ছে না। একের পর এক বলতেই আছে।
– আহ মা! থামো তো তুমি! এইসব কথা আর বলিও না তো আমাকে! আমি কাল খুলনা ফিরে যাবো।
ওর মা আঁতকে উঠে বললো,
– সে কি! তুই না এক সপ্তাহের জন্য এসেছিস? তাহলে কাল কেন ফিরে যাবি? সপ্তাহ যেতে তো আরও তিনদিন বাকি!
– আমার কাজ আছে তাই ফিরে যাব। এখানে ভালো লাগছে না আমার।
সুলতানা জামান ভেবেছে স্নিগ্ধার জন্য বোধহয় ফাহাদ এমন করছে। তিনি আর্তনাদ করে বললেন,
– আহারে ওই মেয়ের জন্য ছেলেটা কেমন হয়ে গেল! বাড়িতে নাকি ভালো লাগছে না! কি করবো আমি এই ছেলেকে নিয়ে। ওরে তুই আর ভাবিস না বললাম তো এর চেয়েও সুন্দর মেয়ে এনে দিবো তোকে আমি!
ফাহাদ উঠে বেলকনিতে চলে গেল। এইসব তার কাছে অসহ্য লাগছে। তার মা সুলতানা জামান বসে এখনো কীসব বিড়বিড় করছেন, তা স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে না। তবে ফাহাদের মনের ভেতর কোনো অপরাধবোধ কাজ করছে না আর না স্নিগ্ধা বা তার মেয়ের প্রতি মায়া! ওর এখন একদিকে আনন্দ লাগছে অন্যদিকে বিরক্ত,। স্নিগ্ধার মতো এক তেজস্বী আর কড়া মেজাজের মেয়েকে প্রতিদিন সহ্য করতে হবে না। ও যে নিজের ইচ্ছায় এই বাড়ি থেকে বিদায় নিয়েছে, এটা একদিক থেকে ভালোই হয়েছে। কিন্তু বিরক্তিটা অন্য জায়গায়, স্নিগ্ধা যাওয়ার আগে তার গালে যে চড়টা মে’রেছে সেটা সে ভুলতে পারছে না। শেষমেশ ওই মেয়ের হাতে চ’ড় খেতে হলো ফাহাদ জামানকে!!
.
জামান বংশ থেকে বিদায় নিয়ে স্নিগ্ধার বহুদিন পর একটা ভালো ঘুম হলো। এমন শান্তি আর স্বস্তি নিয়ে সে যে কবে ঘুমিয়েছিল এটা তার মনে নেই। ঘড়িতে তখন ভোর ছটা বাজে! কাল দেরিতে ঘুমানোর কারণে ফজরের নামাজে সজাগ পায় নি। স্নিগ্ধা ধীরে ধীরে বিছানা ছেড়ে উঠল। আয়াত তখনো দুই হাত ছড়িয়ে মনের সুখে ঘুমাচ্ছে। স্নিগ্ধা ওর ঘুমানোর ভঙ্গি দেখে হেসে মেয়ের কপালে চুমু খেয়ে দুপাশে বালিশের বর্ডার দিয়ে ফ্রেশ হতে চলে গেল। ফ্রেশ হয়ে রুম থেকে বেরিয়ে বুঝলো সকলে এখনো ঘুমে। সে ভাবলো সকালের নাস্তা সে-ই বানাক! এমনিও এখন ঘুম আসবে না। এই ভেবে সব কাজ শুরু করলো। ঘর ঝাড় দিয়ে রান্না বসালো। আগে মোটামুটি কাজ করতো তবে ওই বাড়িতে কাজ করতে করতে অভ্যাস হয়ে গেছে সবটাই। বেশ কিছুক্ষণ পর রান্নাঘরে এলো ওর মা। স্নিগ্ধাকে এত সকালে রান্নাঘরে দেখে তিনি অবাক হলেন।
– তুই এত সকালে এখানে কি করছিস?
মায়ের গলার আওয়াজ পেয়ে পেছনে ফিরে তাকাল স্নিগ্ধা। হেসে বললো,
– নাস্তা বানাচ্ছি। বসো হয়ে এসেছে প্রায়।
– এত সকালে তোকে নাস্তা বানাতে কে বলেছে তোকে?
– কেন? আমি বানালে বুঝি খাবে না?
ওর হাত থেকে খুন্তিটা কেঁড়ে নিয়ে বললেন,
– তুই সবসময় দুই লাইন বেশি বুঝিস! নাতনী কই? ওকে রেখে এখানে কেন বসে আছিস?
– ও ঘুমাচ্ছে। আর এসব আমার অভ্যাস হয়ে গেছে। এই রান্না তো কোনো ব্যাপারই না!
স্নিগ্ধার মা অবাক কণ্ঠে বললো,
– অভ্যাস হয়েছে মানে? কিভাবে অভ্যাস হলো?
– কেন ওই বাড়িতে তো সব আমিই করতাম। এতগুলো লোকের রান্নবান্না সব!
– তোকে দিয়ে করাতো?
– হ্যাঁ এত অবাক হওয়ার কি আছে?
– তুই সত্যি বলছিস? ওখানে কাজের লোক ছিলো না?
স্নিগ্ধা ভাবলেশহীন হয়ে পাশে একটা টুলে বলে বললো,
– আমি যাওয়ার পর ছাড়িয়ে দিয়েছে। আমি থাকতে কিসের কাজের লোক? জানো মেয়েটাকে নিয়েও আমার সব কাজ করতে হয়েছে। এক দণ্ড ঘরে বসলেই শুরু হয়ে যেতো তুলকালাম!
স্নিগ্ধার মা যেন আশা করেনি এই কথাটা! স্নিগ্ধার ওনার রিয়েকশন দেখে হেসে বললো,
– আর তুমি ভেবেছিলে আমায় রাজরানি করে রেখেছে? এই হলো নমুনা বুঝলে!
স্নিগ্ধার মা আর কথা বাড়াল না। এর মধ্যে স্নিগ্ধার বাবা বেরিয়ে এসে বললো,
– বাজারের লিস্ট দাও। তাড়াতাড়ি নিয়ে আসি। দেরি হলেই খুব মানুষ হয়ে যায়।
– হ্যাঁ দিচ্ছি।
স্নিগ্ধার মা লিস্ট হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো,
– এখানে লেখা হয়নি। ভালো দেখে জ্যান্ত শিং মাছ আর দুধ নিয়ে আসবে।
স্নিগ্ধার বাবা ভ্রু কুঁচকে বললো,
– তোমরা তো শিং মাছ খেয়ে চাও না। তাহলে শিং মাছ কার জন্য?
– স্নিগ্ধার জন্য।
স্নিগ্ধা অবাক হলো বটে তবে কিছু বললো না। স্নিগ্ধার মা আবার বললো,
– তোমার মেয়ে বাচ্চা মানুষ করছে কিন্তু শরীরে তো এক ফোঁটা র’ক্ত নেই। তুমি ভালো দেখে নিয়ে এসো।
মায়ের এই লুকানো যত্নটুকু স্নিগ্ধার চোখ এড়াল না। মুখে যতই বি’ষ ঢালুক, দিনশেষে মা তো মা-ই। সে আড়ালে একটু হেসে নিল। ওর বাবা খুশি মনে বের হতেই ওর মা বলে উঠলো,
– তুই এখানে বসে আছিস কেন? যা মেয়েটাকে একা রুমে রেখে এসেছিস!
– নাস্তাটা বানিয়ে যাই?
– আমি করে নিচ্ছি বাকিটা। যা।
স্নিগ্ধা রুমে চলে এলো। রুমে ঢুকেই স্নিগ্ধা দেখল আয়াত তার ডাগর ডাগর চোখ দুটো মেলে সিলিং এর দিকে চেয়ে বিছানায় শুয়ে হাত-পা নাড়ছে। স্নিগ্ধা বিছানায় গিয়ে বসে ঝুঁকে ওর পেটে সুরসুরি দেওয়ার ভঙ্গিতে বললো,
– আমার বুড়িটা উঠে গেছে? মাকে না পেয়ে কান্না করেনি বুঝি? কত শান্ত মেয়ে আমার!
মাকে দেখেই আয়াত ঠোঁট দুটো গোল করে কেমন একটা “ভোওও” করে আধো-আধো শব্দ করল ও। স্নিগ্ধা হেসে ওর পেটে মুখ চেপে আয়াতের মতো “ভোঁওও” করে উঠলো। আয়াত খুশি হয়ে হাত পা ছড়িয়ে হেসে উঠল।
এর মধ্যে দরজায় কড়া নাড়ল কেউ। স্নিগ্ধা সোজা হয়ে বসে বললো,
– ভেতরে এসো।
সিফাত ভেতরে এলো। আয়াতকে সজাগ দেখে বোধহয় খুশি হলো সে। এগিয়ে এসে বললো,
– আরে ভাগ্নি দেখি জেগে আছে! আয় কোলে আসবি?
স্নিগ্ধা তড়িঘড়ি করে বললো,
– এখন নিস না মাত্র উঠেছে। একটু পর নিস।
সিফাত পাত্তা না দিয়ে বললো,
– এখন নিলে কি হয়েছে? উঠেই তো গেছে। মামনি আয় তো!
ওর হাত বাড়ানো আর ডাকা দেখে আয়াত হাত পা ছোড়াছুড়ি শুরু করে দিল। সিফাত নিচু হয়ে ওকে কোলে নিয়ে দুলিয়ে দুলিয়ে বললো,
– ঘুম ভালো হয়েছে হু?
সিফাত তখন মনের সুখে আয়াতকে দোলাচ্ছে। তার সমস্ত ধ্যান জ্ঞান এখন এই পুতুলের ওপর। স্নিগ্ধা ব্যাগ থেকে আয়াতের আরেকটা জামা বের করতে করতে পেছন ফিরে একবার তাকাল। তখনই বললো,
– সিফাত ওকে নামা। বিছানায় রাখ!
সিফাত কিছুই না বুঝে আয়াতকে বুকের সাথে আরও লেপ্টে ধরে বলল,
– আরে কী হয়েছে আপু? কেন নামাব? আমার মামণি তো কত সুন্দর শান্ত হয়ে আমার বুকে মাথা দিয়ে…
হঠাৎ সিফাতের কথা থেমে গেল। পরক্ষণেই সিফাতের মনে হলো তার সাদা টি-শার্টের ঠিক বুকের মাঝখানটা কেমন যেন হঠাৎ গরম এবং তরল কিছুতে ভিজে উঠছে। শুধু তাই নয় এক তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ এসে তার নাকে ধাক্কা দিল। সিফাত পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে গেল। বোকা কণ্ঠে বললো,
– আপু? আমার বুকে হঠাৎ গরম চা ঢালল কে?
স্নিগ্ধা ততক্ষণে কপালে হাত দিয়ে খাটের ওপর ধপ করে বসে পড়েছে। সে হেসে কুটিপাটি হতে হতে বলল,
– তোকে তো তখনই বারণ করলাম নিতে! ঘুম থেকে উঠলে বাচ্চারা একটু হাত-পা সোজা করে পেট খালি করে তা তো তোর জানা নেই। এখন বোঝ ঠ্যালা! আমার মেয়ে তোকে একদম খাঁটি খাঁটি উপহার দিয়ে বরণ করে নিয়েছে!
বলতে বলতে আবার হেসে উঠল সে। সিফাত আমতা-আমতা করে আয়াতকে নিজের শরীর থেকে একটু দূরে সরিয়ে ধরল। দেখলো তার টিশার্ট ভিজে সপসপে হয়ে আছে। সে আয়াতের দিকে তাকিয়ে বললো,
– তুই তো কাজ সেরে দিলি রে!
স্নিগ্ধার হাসি যেন থামছে না। সিফাত নিজের ভেজা টি-শার্টের দিকে তাকিয়ে নাক কুঁচকে বলল,
– আপু, তুই হাসছিস? তোর মেয়ে তো আমার বারোটা বাজিয়ে দিল! এটা গরম পানির পাইপলাইন নাকি? পুরো ভিজিয়ে দিয়েছে!
স্নিগ্ধা হাসতে হাসতেই আয়াতকে বিছানায় শুইয়ে দিতেই কোনো অপরাধবোধ ছাড়ায় শান্তিতে হাত-পা ছুঁড়তে লাগল যেন মামার টিশার্ট ভিজিয়ে সে খুব খুশি।
– বেশি আদিখ্যেতা করে কোলে নিতে আসছিলি না?
সিফাত নিজের বুকের দিকে তাকিয়ে এক হাত দিয়ে নাক চেপে ধরে নিজের রুমের দিকে হাঁটতে হাঁটতে বিড়বিড় করল,
– বুঝলাম না, এতটুকু একটা বাচ্চার পেটে এত বো’মাবা’রুদ কোত্থেকে আসে!
পেছন থেকে স্নিগ্ধা চেঁচিয়ে বললো,
– মামা হতে গেলে এসব অভিজ্ঞতা একটু আধতু করতে হয়! ভবিষ্যতে বাচ্চা কাচ্চা পাল্টে সুবিধা হবে।
বলেই ফিক করে হেসে ফেললো সে। আয়াত তখনো নিজের ছোট্ট দুই হাত বাতাসে ছুঁড়ে দিব্যি খেলছে।
কিছুক্ষণ পর সিফাত গা মুছে, অন্য একটা শুকনো টি-শার্ট পরে মাথা মুছতে মুছতে ঘর থেকে বের হলো। ততক্ষণে ড্রয়িংরুমে শোরগোল শোনা যাচ্ছে। স্নিগ্ধার বাবা শওকত হোসেন বাজার থেকে ফিরে ঘরে গিয়েছেন আর রান্নাঘর থেকে সুলতানা বেগম নাস্তার বাসনপত্র টেবিলে সাজাচ্ছেন। স্নিগ্ধা মেয়েকে নিয়ে আসলো রুমে। নাস্তা করতে বসে ওর বাবা বললো,
– ব্যাপার কি? যেই ছেলেকে ধরে বেঁধে দুপুরে গোসল করতে পাঠানো যায় না সেই ছেলে সকাল সকাল গোসল করেছে?
কথাটা শুনে সিফাতের মুখ কুঁচকে গেলেও স্নিগ্ধা হেসে উঠলো।
– সবই তোমার নাতনির কামাল গো বাবা! মামাকে একদম কা’বু করে নিয়েছে!
শওকত হোসেন বিষয়টা বুঝে হেসে ফেললেন। তিনি সিফাতের দিকে তাকিয়ে বললেন,
– কীরে সিফাত? মামা হওয়ার সাধ মিটেছে তো?
– বাবা, নাতনি তোমারও! বেশি হেসো না পরের বার তোমার কোলের পালা!
– সে সমস্যা নেই! তোদের কত এসব সহ্য করেছি এবার নাহয় নাতনির করলাম! সমস্যা আছে?
সবাই হেসে ফেলল। স্নিগ্ধা তো সিফাতকে খোঁচাতে ছাড়ল না।
– আপু তুই তখন থেকে হাসছিস!
– হাসব না তো কী করব? তোকে তখনই বারণ করলাম না যে মাত্র ঘুম থেকে উঠেছে, এখন কোলে নিস না। বাচ্চাদের স্বভাবই তো এটা! তুই তো আবার এক লাইনের বেশি বুঝিস, মস্ত বড় মামা হয়েছেন!
সিফাত মুখ কাঁচুমাচু করে বললো,
– আমি কি জানতাম নাকি?
– এখন তো জেনে গেছিস ভবিষ্যতে কাজে আসবে। তোর বউয়ের কষ্ট কমে!
সিফাত লজ্জা পেল এবার! স্নিগ্ধা এবার সিরিয়াস হয়ে বললো,
– এই সিফাত তোকে যে আমি চাকরির কথা বলেছিলাম কোনো খোঁজ পেয়েছিস?
– হ্যাঁ সকালে ওটাই বলতে গিয়েছিলাম আমি। শোন একটা বড় ভাইয়ের সাথে কথা বলেছি তার একটা এজেন্সি আছে। ভাই আজকে আমাদের এলাকায় আসবে তাই তাকে বাসায় আসতে বললাম যদি সম্ভব হয় তাহলে তোর জন্য একটা ব্যবস্থা করে যাবে!
স্নিগ্ধা খুশি হলো। কৌতুহলী কণ্ঠে বললো,
– কিসের এজেন্সী?
– এটা মূলত একটা ডিজিটাল পিআর অ্যান্ড ব্র্যান্ডিং কনসালটেন্সি ফার্ম। সহজ কথায়, বড় বড় কর্পোরেট কোম্পানি, স্বনামধন্য ব্যক্তিদের অনলাইন ইমেজ বিল্ড আপ করা, তাদের পিআর হ্যান্ডেল করা, ক্রিয়েটিভ ব্র্যান্ড স্টোরি আর কন্টেন্ট লিখে দেওয়া এসব ওনারা করেন। আমি ওনাকে তোর অনার্সের রাইটিং প্রোফাইল আর আগের কিছু লেখার স্যাম্পল দেখিয়েছিলাম, ওনার বেশ পছন্দ হয়েছে।
– বেশ তো! এবার একটা ব্যবস্থা হয়ে গেলেই হয়!
______
বিকেলে রুমে বসে আছে স্নিগ্ধা। সিফাতের সেই বড় ভাই এসেছে বেশ কিছুক্ষণ হলো। আগে সিফাতকে কথা বলে দেখতে বললো তারপর সে নাহয় কথা বলে দেখবে যদি প্রয়োজন হয়! একটু পর ওকে ডাকতেই ও ঘর থেকে ওর সিভির পেপারটা আর আগের কিছু লেখার ডায়েরিটা হাতে নিয়ে ড্রয়িংরুমে গেল। উপস্থিত হতেই ওয়াজেদ সিফাতের সাথে কথা বলতে বলতে হঠাৎ দরজার দিকে তাকাল। ক্ষণিকের জন্য তার চোখ দুটো গিয়ে পড়ল দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা স্নিগ্ধার ওপর। স্নিগ্ধাও এদিকে তাকাতেই দুজনের চোখাচোখি হল। ওয়াজেদ ভদ্রতার সাথে চোখ সরিয়ে নিয়ে কথায় মনোযোগ দিল।
– আপু আয়! এটা হলো যেই বড় ভাই বলেছিলাম? ওয়াজেদ ভাই! আর ওয়াজেদ ভাই? এটা আমার বড় আপু।
দুজনেই ভদ্রতার সহিত হাসলো। এর মধ্যে সিফাতের কোলে বসে থাকা আয়াত ওয়াজেদের দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে হাত নাড়িয়ে কি যেন বলছে। ওয়াজেদ এক মুহূর্তের জন্য সিফাতের কোলের ফুটফুটে বাচ্চাটির দিকে তাকাল। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো এক চিলতে হাসি।
– ও হলো আমার ভাগ্নি আয়াত। আপুর মেয়ে।
– মাশাআল্লাহ্ খুব কিউট!
আয়াত তখনো নিজের ছোট ছোট হাতগুলো বাতাসে নেড়ে ওয়াজেদের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আধো আধো গলায় কী যেন বলে চলেছে। ওয়াজেদ আলতো করে ওর একটা ছোট্ট নরম হাত নিজের তর্জনী আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দিয়ে বেশ মোলায়েম সুরে বলল,
– হ্যালো লিটল লেডি! তোমার নাম আয়াত? চমৎকার নাম তো তোমার!
মায়ের কোল আর মামার কোলের বাইরে সাধারণত কোনো অপরিচিত মানুষকে দেখলে যেখানে বাচ্চারা কেঁদে ওঠে, সেখানে আয়াত সবাইকে অবাক করে দিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল। ওর কোলেও চলে এলো। পুরোটা সময় কোল থেকে নড়লো না ডিসটার্বও করল না!
কাজের দীর্ঘ আলোচনা শেষ করে ওয়াজেদ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে উঠে দাঁড়াল।
– এবার আমাকে যেতে হবে। অফিসের কাজগুলো তো সই হয়েই গেল, আর স্নিগ্ধার কাজ নিয়ে বাকি ডিটেইলস আমি মেইলে পাঠিয়ে দেব।
ওয়াজেদ বিদায় নিয়ে দরজার দিকে পা বাড়াতে যাবেন, তখনই ঘটল এক অদ্ভুত কাণ্ড!
সিফাত সোফায় বসে আয়াতকে নিয়ে খেলা করছিল। ওয়াজেদ যাওয়ার আগে শেষবারের মতো আয়াতে দিকে তাকিয়ে একটু ঝুঁকে আঙুল নাড়িয়ে মৃদুস্বরে বললেন,
– আসি তাহলে, লিটল লেডি?
আয়াত এতক্ষণ খুব মনোযোগ দিয়ে এই দীর্ঘদেহী সুপুরুষ মানুষটির গলার গম্ভীর অথচ মোলায়েম আওয়াজ শুনছিল। ওয়াজেদ ওর দিকে ঝুঁকতেই সে হঠাৎ খিলখিল করে হেসে উঠল এবং ঝাঁপিয়ে পড়ে নিজের ছোট্ট দুটো হাত দিয়ে ওয়াজেদের শার্টের কলার খপ করে ধরে ফেলল! শুধু তাই নয়, সে এক মুহূর্তের মধ্যে সিফাতের কোল ছেড়ে সোজা ওয়াজেদের বুকের দিকে এগিয়ে যেতে চাইল।
সিফাত তো অবাক! সে আয়াতকে আলতো করে টেনে নিজের কাছে রাখতে চাইল, কিন্তু আয়াত কোনোভাবেই ওয়াজেদকে ছাড়বে না। সে উল্টো মুখ ফুলিয়ে ওনার শার্টের কাপড় আরও শক্ত করে মুঠি করে ধরে রাখল, যেন ওর কোল ছাড়া সে কোথাও যাবে না। ওনার দিকে তাকিয়ে সে চোখ বড় বড় করে একগাল হেসে আধো-আধো স্বরে ডেকে উঠল
– আআআ… উউউ!
পরিস্থিতি দেখে স্নিগ্ধা ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। ও দ্রুত এগিয়ে এসে আয়াতের হাত দুটো আলতো করে ওয়াজেদের শার্ট থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে অত্যন্ত লজ্জিত গলায় বলল,
– ইশ্, আই অ্যাম সো সরি ভাইয়া! ও আসলে সচরাচর এমন করে না। অপরিচিত মানুষের কোলে তো একদমই যেতে চায় না। জানি না আজ ওর কী হলো! প্লিজ কিছু মনে করবেন না।
অত্যন্ত মৃদু ও শান্ত কণ্ঠে স্নিগ্ধার দিকে তাকিয়ে ওয়াজেদ বললেন,
– ইটস ওকে, একদমই সরি বলবেন না। বাচ্চাদের আমি ভীষণ পছন্দ করি। তাছাড়া শিশুরা কার মন কেমন, সেটা বড়দের চেয়ে অনেক ভালো বুঝতে পারে।
#চলবে…?

