#তিমিরবসান(১৮)
#তাবাসসুম_তাজ্বওয়ারী
কেটে গেছে আরো কয়েকমাস। কাটে কেটে জমে ওঠা এই দিনগুলোতে স্নিগ্ধার জীবনে শান্ত নদীর স্নিগ্ধতা ফিরে এসেছে।
আজ শুক্রবারের ঝকঝকে সকাল। স্নিগ্ধা ড্রয়িংরুমের পর্দাগুলো সরানোর সময় আড়চোখে তাকাল সোফার দিকে। সেখানে চলছে এক মহাযজ্ঞ!
ওয়াজেদের ছুটির দিন মানেই আয়াতের উৎসব। ওয়াজেদ বাড়িতে থাকলে ওর কাছ থেকে আসেই না আয়াত! স্নিগ্ধা অবাক হলেও বেশ খুশিই হয়। মেয়েটাকে নিয়েই সবচেয়ে বেশি চিন্তা ছিলো তার।
সে ওদের রেখে রুমে গিয়ে ফোনটা হাতে নিলো। মায়ের নম্বরে ডায়াল করে বিছানায় বসলো। একটু পর রিসিভ হতেই সে হেসে বললো,
– কেমন আছো মা?
– আমরা ভালো আছি তোদের কি অবস্থা? সব ঠিকঠাক?
– হ্যাঁ ভালো আছি।
স্নিগ্ধার মায়ের দুশ্চিন্তা বোধহয় কমল না। তিনি আবার বললেন,
– সত্যি সব ঠিকঠাক তো? বলেছিলাম আয়াতকে আমাদের কাছে রেখে যা। মন দিয়ে সংসার কর মাঝে মাঝে ওকে দেখে যাবি! তা তো শুনলি না!
স্নিগ্ধা বিরক্ত হলো বেশ। কঠোর কণ্ঠে বললো,
– এসব কেন বলছো আবার? আয়াতকে ছেড়ে আমি কোথাও যাব না বলেছি না? আবার বলছো তুমি এসব কথা! আমার মেয়েকে নিয়ে আমি এখানে খুব ভালো আছি মা!
স্নিগ্ধার মা বাঁকা কণ্ঠে বললো,
– কেন তোর মেয়েকে কি আমরা খারাপ রাখতাম?
এই প্রশ্নে স্নিগ্ধার হাসি পেল। হেসেই বললো,
– আমি সহ আমার মেয়েকে তোমাদের বোঝা মনে হয় সেখানে আমি ছাড়া আমার মেয়েকে কেমন রাখবে বলে আশা করব আমি?
স্নিগ্ধার এমন জবাবে ওপাশের কণ্ঠটি মুহূর্তের জন্য একদম স্তব্ধ হয়ে গেল। নিজের মায়ের প্রতি কোনো কটু কথা বলার ইচ্ছে স্নিগ্ধার ছিল না কিন্তু পুরনো আঘা’তগুলোকে ভুলে যাওয়ার ভান করলেও অতীতের সেই অবহেলা তো মিথ্যে হয়ে যায় না!
স্নিগ্ধার মা একটু ইতস্তত করে কড়া গলায় নিজের পক্ষ সাফাই গাওয়ার চেষ্টা করলেন,
– তোকে আর আয়াতকে বোঝা কেন ভাবতে যাব? আমরা তোর মা-বাবা, তোর ভালো চাই বলেই তো বলেছি। সৎ বাপ কি কখনো অন্যের মেয়েকে নিজের করে নেয়? আজ নতুন বিয়ে হয়েছে বলে ভালো সাজছে কদিন পর যখন নিজেদের বাচ্চা হবে, তখন বুঝবি আয়াত এই বাড়িতে কতখানি পর!
মায়ের মুখে কথাগুলো শুনে স্নিগ্ধার বুকের ভেতর কষ্টের চেয়ে বেশি বিরক্তি দানা বেঁধে উঠল। ওয়াজেদের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর সম্মানকে এভাবে বারবার অপমান করার মানসিকতা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারে না।
– ওয়াজেদ ভালো সাজছে না মা, উনি সত্যিই এমন। বংশ, র’ক্ত দিয়ে কখনো বাবার পরিচয় তৈরি হয় না, ভালোবাসা আর দায়িত্ব দিয়ে হয়। আর এই কয়েকমাসে ওয়াজেদ আয়াতকে যে ভালোবাসা দিয়েছেন তা দেখার পর তোমার মুখে এ ধরনের কথা একদম মানায় না। এর পর থেকে অন্তত ওয়াজেদ আর আয়াতকে নিয়ে বাঁকা কথা বলো না। ওয়াজেদ আমাকে বিয়ের আগেই জানিয়ে দিয়েছিল তিনি আয়াতকে চান! তবুও এসব কিভাবে বলো মা? আমার মেয়ে আমার কাছেই থাকবে। পরে কি হবে সেটা আমিও দেখব!
কথাটা বলেই ওপাশ থেকে মায়ের কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করে কলটা কেটে দিল স্নিগ্ধা। মোবাইলটা বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে সে দুহাতে মুখ ঢেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নিজের জন্মদাত্রী মা-ও যে এত সংকীর্ণ মানসিকতার হতে পারে, ভাবলেই বুকটা ফাঁকা লাগে। সে উঠে দাঁড়াল। এসব নিয়ে ভাবতে থাকলে আজকে না খেয়ে থাকতে হবে। দ্রুত পা বাড়াল রান্নাঘরের দিকে। তার শাশুড়ি অলরেডি রান্নবান্না শুরু করে দিয়েছে।
.
ওয়াজেদ ল্যাপটপে কিছু মেইল চেক করার চেষ্টা করছিল, কিন্তু তার ছোট রাজকন্যার সেদিকে তীব্র আপত্তি। আয়াত হামাগুড়ি দিয়ে ওয়াজেদের কোলে চড়ে বসেছে আর খুদে দুটি হাত বাড়িয়ে ল্যাপটপের কি-বোর্ডে এলোমেলো চাপ দিচ্ছে। ওয়াজেদ হেসে বললো,
– আমার আস্ত একটা প্রেজেন্টেশন কিন্তু এক ক্লিকে উধাও হয়ে যাবে! তারপর কি হবে?
ওয়াজেদ ল্যাপটপটা একপাশে সরিয়ে রেখে আয়াতকে দুই হাতে শূন্যে তুলে ধরল। আয়াত শূন্যে ভেসে হাত-পা ছুড়ে খিলখিল করে হেসে উঠল। ওর মুখে এখন দুটো ছোট্ট মুক্তোর মতো দাঁত ফুটেছে, যা হাসলে স্পষ্ট দেখা যায়। মেয়েটা দারুণ হাসিখুশি হয়েছে। কান্নার চেয়ে বেশি হাসে!
স্নিগ্ধা একটা বাটি হাতে রুমে আসলো। ওদের এমন নাচানাচি করতে দেখে বলল,
– সকাল সকাল কি শুরু করেছেন? ওকে মাথায় তুলে নাচছেন কেন?
ওয়াজেদ স্নিগ্ধার দিকে তাকিয়ে বললো,
– মাথায় তুলার জিনিসকে কোথায় রাখব তাহলে?
– আপনার ওকে নিয়ে একটু বেশি বেশি।
বলতে বলতে সে এগিয়ে এসে বিছানায় বসলো। হাতে সুজির বাটি রেখে বলল,
– ওর খাওয়ার সময় হয়ে গেছে। আয়াত? আম্মুর কাছে আসো?
আয়াত সুড়সুড় করে ওয়াজেদের কোল থেকে নেমে মায়ের কাছে এসে গেল। স্নিগ্ধা ওকে খাওয়ানোতে মনোযোগ দিলে ওয়াজেদ আবার কাজে মনোযোগ দিলো। অর্ধেক খেয়ে আয়াত বাকিটা মুখ থেকে ফেলে দিলো। স্নিগ্ধা বলল,
– কি হলো এটা? খাবার নষ্ট করা এখন থেকেই?
ওয়াজেদ চোখ তুলে তাকালো। দেখলো স্নিগ্ধা রেগে মেগে আ’গুন! এদিকে আয়াত আর খাবেই না! আয়াতের মুখের সামনে চামচ ধরলেই সে মুখ খুলছে না আবার মাথা এদিকে সেদিক করছে অর্থাৎ সে খাবে না। এদিকে স্নিগ্ধা বকাবকি শুরু করেছে।
– ছোট্ট একটা বাচ্চার সাথে এত কড়া মেজাজ দেখাচ্ছ কেন বলো তো?
স্নিগ্ধা ভ্রু কুঁচকে তাকাল খিটখিটে স্বরে বলল,
– আপনি কিন্তু ওকে একদম মাথায় তুলে নিচ্ছেন, ওয়াজেদ! প্রতিদিন যদি এভাবে খাবার ফেলে দেওয়ার বায়না ধরে তবে তো ওর এই বাজে অভ্যাসটাই থেকে যাবে।
– তাই বলে জোর করে খাওয়াবে? এটা কি ঠিক?
– খাবে না মানে, খেতে হবে!
আয়াত মায়ের বকাবকি শুনে ওয়াজেদের দিকে তাকালো। ছলছল চোখে তাকিয়ে বুঝালো তার সাহায্য লাগবে! ওয়াজেদ সেদিকে খেয়াল করার আগেই আধো আধো বুলিতে আয়াত বলে উঠলো,
– বা…বা…. বা
আয়াতের মুখে এমন বুলি শুনে ওয়াজেদ স্নিগ্ধা থেকে চোখ সরিয়ে স্তব্দ নয়নে তাকালো। স্নিগ্ধাও বাটি হাতে বরফ হয়ে জমে গেল। আয়াত তখনও মুখটা একদম ছোট করে চোখে ছলছল জল নিয়ে ওয়াজেদের দিকে তাকিয়ে দুই হাত বাড়িয়ে তাকে ডাকার চেষ্টা করতে লাগল। সাহায্য চাই তার! সম্বিৎ ফিরে পেতেই ওয়াজেদ ওকে এক টানে নিজের কোলে এনে বললো,
– কি বললে? আবার বলো তো আম্মু?
আয়াত এবার চোখের পানি ছেড়ে দিল। মুখে ফের আওড়ালো,
– আবা..বা
এর আগে আয়াত আধো আধো শব্দ তুললেও এত স্পষ্ট করে কখনো মা কিংবা বাবা বলেনি! ওয়াজেদের প্রতিক্রিয়াটাও যেন থমকে যাওয়া ঢেউয়ের মতো। পরক্ষণেই ওয়াজেদের খুশি দেখে কে। একবার স্নিগ্ধার দিকে তাকিয়ে হাসলো। তারপর আয়াতকে বুকে চেপে ধরে মাথায়, গালে অসংখ্য ভালোবাসার চুমু এঁকে দিতে লাগল। তারপর বিড়বিড় করলো,
– আমার মা! আমার সোনা রাজকন্যা!
বেশ কিছুক্ষণ আয়াতকে নিয়ে খুশি প্রকাশ করে ওকে কোলে নিয়ে সোজা হয়ে বসে স্নিগ্ধার দিকে তাকাল। লোকটার মধ্যে তখন এক অদ্ভুত দীপ্তি আর জমানো একরাশ গর্ব। সে স্নিগ্ধাকে উদ্দেশ্য করে আনন্দপ্লুত কণ্ঠে বলে উঠল,
– শুনলে স্নিগ্ধা? ও আমাকে কী বলল? ও আমাকে ‘বাবা’ বলেছে! স্পষ্ট শুনতে পেয়েছো তো?
স্নিগ্ধা আদ্র চোখে একটু হাসলো। তারপর বাটিটা টি-টেবিলে রেখে একটু দুষ্টুমির ছলেই বলল,
– হ্যাঁ, শুনেছি। আমি এত কষ্ট করে ওকে রোজ এত সেবা করি অথচ ও প্রথম স্পষ্ট ডাকটাই ডাকল আপনাকে? আর তা-ও আবার বকা থেকে বাঁচার জন্য আপনার কাছে নালিশ জানাতে!
ওয়াজেদ গা দুলিয়ে হেসে উঠলো। আয়াতের গালে চুমু দিয়ে বললো,
– হক আছে ওর! মেয়ে যখন বুঝে গেছে এই বাড়িতে বকা দেওয়ার মানুষ একজন আর ঢাল হয়ে রক্ষা করার মানুষ আরেকজন, তখন তো ডাকার সময় সঠিক মানুষকে ডাকবেই!
ওয়াজেদ আবারও ঝুঁকে আয়াতের গালে নিজের গাল ঘষে দিতেই আয়াত খিলখিল করে হেসে উঠল। একটু আগে যে মেয়ে চোখে পানি নিয়ে মুখ থমথমে করে রেখেছিল সে এখন বাবার গলার সাথে লেপ্টে মহা শান্তিতে আছে। স্নিগ্ধা কোমড়ে হাত দিয়ে বললো,
– বেশ নাটক শিখেছে তো! আপনি এভাবে আসকারা দিলে কিন্তু ও আর কখনোই টাইমমতো খাওয়া-দাওয়া করবে না, ওয়াজেদ। আর এখন খিচুড়িটা ঠাণ্ডা হয়ে পুরো জমে যাচ্ছে।
ওয়াজেদ এবার নিজে হাত বাড়িয়ে সুজির বাটি আর চামচটা তুলে নিল।
– আমি খাওয়াচ্ছি।
স্নিগ্ধা চ্যালেঞ্জ দেওয়ার মতো করে বললো,
– দেখি খাওয়ান আপনার আদরের মেয়েকে!
ওয়াজেদ হাসল যেন বোঝালো চ্যালেঞ্জ একসেপ্টেড। সে আয়াতের দিকে চামচ বাড়িয়ে দিয়ে আদুরে গলায় বলল,
– নাও তো মা, একটুখানি খেয়ে নাও। বাবা খাইয়ে দিচ্ছে তো! এরপর কিন্তু আমরা একদম আম্মুর কাছে যাব না, দুজনে মিলে ল্যাপটপে কার্টুন দেখব!
আশ্চর্যের বিষয়, এতক্ষণ স্নিগ্ধা যে খাবার মুখে পোড়াতে হাপিত্যেশ করছিল ওয়াজেদ চামচটা সামনে ধরতেই আয়াত অনায়াসে ফোকলা মুখে হা করে দিল! কোনো বায়না নেই, কোনো জেদ নেই সোজা বাকিটুকু খেয়ে নিল।
স্নিগ্ধা গালে হাত দিয়ে অবাক হয়ে দৃশ্যটা দেখছিল। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওয়াজেদের দিকে তাকিয়ে বলল,
– আমি তো দেখছি এই সংসারে আমার পজিশন এখন দুই নম্বরে চলে গেছে! মেয়ে আর বাপের ভিড়ে মা এখন পুরো পর!
ওয়াজেদ আয়াতের মুখ মুছিয়ে দিয়ে হেসে বললো,
– ভুল বললেন, স্নিগ্ধা। আপনি পর হতে যাবেন কেন? এই ছোট্ট সংসারটার ভিত তো আপনারই তৈরি। আপনি আছেন বলেই তো আমার এই অসম্পূর্ণ জীবনটা আজ এত সম্পূর্ণ! আমার এই মেয়ে, আয়াতকেও আমি পেয়েছি!
রাতে আয়াত ঘুমিয়ে গেলে ওয়াজেদ কাজ শেষ করে রুমে আসলো। স্নিগ্ধা কিছুক্ষণ হাঁসফাস করল। ওকে এমন ছটফট করতে দেখে ওয়াজেদ বললো,
– কি হয়েছে? কোনো সমস্যা?
স্নিগ্ধা তড়িৎ মাথা নাড়লো। ওয়াজেদ ভ্রুকুটি করে বললো,
– আমাকে বলতে পারো! কিছু হয়েছে?
কিছুক্ষণ আইঢাই করে বলে বসলো,
– একটা প্রশ্ন করতে পারি আপনাকে?
ওয়াজেদ ওর সামনা সামনি এসে বসে বললো,
– বলে ফেলো। এত হেসিটেট করার কি আছে?
স্নিগ্ধা একটু ইতস্তত করে শুকনো ঢোক গিলল। ওয়াজেদের সোজা আর স্থির চাহনির সামনে কথাটা বলতে গিয়েও কেমন যেন দ্বিধা হচ্ছিল।
স্নিগ্ধা দৃষ্টি নিচু করে মৃদু স্বরে বলল,
– আপনি… আপনি এত দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠিত একটা মানুষ। অথচ এতদিন বিয়ে করেননি কেন? আপনার জীবনে কি কখনো কেউ ছিল না, ওয়াজেদ?
প্রশ্নটা শুনে ওয়াজেদের মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল। ঘরের আবহাওয়াটা যেন এক মুহূর্তে থমথমে হয়ে উঠল। ওয়াজেদ বেশ কিছুক্ষণ নীরব থেকে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর বিছানা থেকে উঠে গিয়ে বারান্দার স্লাইডিং ডোরটা একটু সরিয়ে দাঁড়িয়ে বাইরের অন্ধকার রাতের দিকে তাকাল।
স্নিগ্ধা মনে মনে একটু ভয় পেয়ে গেল তবে কি ভুল কিছু জিজ্ঞেস করে ফেলল? সে ধীরপায়ে উঠে গিয়ে ওয়াজেদের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। তড়িঘড়ি করে বলতে চাইলো,
– আমি আসলে…
ওকে থামিয়ে দিয়ে ওয়াজেদ বলে উঠলো,
– ছিল স্নিগ্ধা। আজ থেকে তিন বছর আগে আমার জীবনেও একজন ছিল।
স্নিগ্ধার কথা থেমে গেল। বিস্ফো’রিত চোখে তাকাল তার মানে ওয়াজেদের অতীত আছে! সে ঠিকই ভেবেছে!
ওয়াজেদ আবার বললো,
– পরিবারের ইচ্ছে অনুযায়ী একজনকে জীবনে আনার চিন্তা করেছিলাম। সবকিছুর আয়োজনও হয়েছিল কিন্তু…
ওয়াজেদ থামতেই স্নিগ্ধা চট করে বললো,
– কিন্তু…?
ওয়াজেদ ছোট্ট করে বললো,
– বিয়ের মাত্র দুদিন আগে সে আমার বিশ্বাস ভেঙ্গে আমাকে আর আমার পরিবারকে এক নির্মম বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়ে চলে যায়।
স্নিগ্ধা বড় একটা ধাক্কা খেল! ওয়াজেদের মতো শক্ত আর সৎ একজন মানুষের সাথে এমন বিশ্বাসঘা’তকতা? সে স্তব্ধ হয়ে ওয়াজেদের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
স্নিগ্ধাকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ওয়াজেদ বললো,
– যার সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছিল, মেহজাবীন সে শুধু আমাকে মানসিকভাবেই ঠকায়নি, আমার ভালোবাসার সুযোগ নিয়ে আমার ব্যবসার কিছু গোপন ডকুমেন্ট আর জমানো সমস্ত মূলধন আত্মসাৎ করে তার এক পুরনো প্রেমিকের সাথে বিদেশে পালিয়ে যায়।
স্নিগ্ধা আরও ধাক্কা খেলো। ওয়াজেদ ওর দিকে চেয়ে ফ্যাকাশে হেসে স্নিগ্ধার দিকে ফিরল,
– শুধু চু’রি আর ধোঁ’কাবাজি করেই ক্ষান্ত হয়নি সে। যাওয়ার আগে সমাজে আমার চরিত্র আর সামর্থ্য নিয়ে এমন কিছু জঘন্য অপবাদ ছড়িয়ে দিয়ে গিয়েছিল, যা সামলে উঠতে আমার আর আমার পরিবারের বহু সময় লেগেছিল। এমনকি এমন কিছু রটিয়েছিল যে আমি কোনদিন বাবা হতে পারবো না!
একটু থামল ওয়াজেদ। একটা শ্বাস ছেড়ে বলল,
– সেই অপমান আর বিশ্বাসঘা’তকতার পর নারী জাতি আর বিয়ের ওপর থেকে আমার সমস্ত বিশ্বাস উঠে গিয়েছিল। আমি নিজেকে একটা শক্ত খোলসের ভেতর বন্দি করে ফেলেছিলাম। পণ করেছিলাম, কোনো নারীকে আর কখনোই আমার জীবনে জায়গা দেব না। এত বছর ধরে আমি সেই ট্রমা বয়ে বেড়িয়েছি স্নিগ্ধা। তাই তো আমার পরিবার যখন বিয়ের কথা বলত, আমি সোজা নাকচ করে দিতাম।
স্নিগ্ধার বুকের ভেতরটা তীব্র এক যন্ত্রণায় দুমড়ে-মুচড়ে উঠল। একটা মানুষ কীভাবে এতটা পা’ষাণ হতে পারে? যে লোকটা বাচ্চাদের এতটা ভালোবাসে, নিঃস্বার্থভাবে আগলে রাখতে জানে তাকে কিনা সমাজ আর ভালোবাসার নামে এমন একটা কদর্য অপবাদ দিয়ে গুঁ’ড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল! ওয়াজেদ আবারও বললো,
– আমি বাচ্চাদের কতটা ভালোবাসি তা আমার পরিবার আর ঘনিষ্ঠ সবাই জানত। নিজের একটা সন্তানকে কোলে নিয়ে বাবা ডাকার সেই মিষ্টি মুহূর্তটার স্বপ্ন আমিও তো দেখতাম! কিন্তু মেহজাবীন যাওয়ার আগে সমাজ আর চারপাশের মানুষের মুখে এমন এক অপবাদের তকমা লেপে দিয়ে গেল, যা আমাকে মানসিকভাবে পঙ্গু করে ফেলেছিল। যখনই কোনো বাচ্চার দিকে তাকাতাম, বুকের ভেতরে এক মারাত্মক কষ্ট দানা বাঁধত। মনে হতো, এই চাওয়াটা হয়তো আমার জীবনে আর কোনোদিন পূর্ণ হবে না। এই অপবাদটা সইতে না পেরে নিজেকে আরও বেশি একা করে নিয়েছিলাম। মনে হতো আবার যদি কাউকে বিশ্বাস করি, সেও হয়তো একদিন এই ঘা-তেই আবার আঘা’ত করবে!
স্নিগ্ধা এগিয়ে আসলো। ওয়াজেদের পিঠে এক হাত রেখে বললো,
– আর কখনো অতীতের কথা ভাববেন না, ওয়াজেদ! যারা নিজের স্বার্থের জন্য একটা মানুষের বিশ্বাস আর অনুভূতি নিয়ে ছিনিমিনি খেলে, তারা মানুষ পদের যোগ্যই নয়। সে আপনাকে চিনতে পারে নি আপনার ভালোবাসার যোগ্যই ছিল না সে!
স্নিগ্ধা একপলক থামল। ওয়াজেদের চোখের দিকে তাকিয়ে বললো,
– আজ দেখুন, সেই নিষ্ঠুর অপবাদ কতটা মিথ্যে! আপনার মেয়ে, আপনার আয়াত আজ আপনাকে প্রথম স্পষ্ট ‘বাবা’ বলে ডেকেছে। কোনো র’ক্তের সম্পর্ক ছাড়াই ও যেভাবে আপনাকে আঁকড়ে ধরে সাহায্য চায় সেটা দেখে কেউ বলবে আপনি ওর নিজের বাবা নন? র’ক্তের সম্পর্কের চেয়েও ভালোবাসার টান কত গভীর হতে পারে তা আপনি প্রমাণ করে দিয়েছেন ওয়াজেদ। আয়াত আপনারই মেয়ে আর আপনিই ওর বাবা।
ওয়াজেদ স্নিগ্ধার চোখের দিকে চেয়ে রয়। খানেক বাদে হেসে বললো,
– আপনাকে আমার জীবনে আনার আর বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে সত্যি বলতে আশি ভাগ জুড়ে ছিল এই আয়াতই!
স্নিগ্ধার চোখ বেয়ে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়লো। এই লোকটার হাত ধরার জন্য সে আয়াতকে নিয়ে চিন্তা করছিলো! যে কি না আয়াতের জন্যই তাকে চেয়েছে!
ওয়াজেদ হাত বাড়িয়ে স্নিগ্ধার চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে বললো,
– আমি চেয়েছিলাম ওর একটা চিরস্থায়ী পরিচয় হোক আর আমি যেন বুক উজার করে ওকে নিজের মেয়ের মতো ভালোবাসতে পারি।
আবার স্নিগ্ধার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে গভীর চোখে তাকাল,
– তবে জানো স্নিগ্ধা? প্রথমটা আয়াতের জন্য হলেও, এখন তুমি ছাড়া আমার এই সংসার, আমার এই অস্তিত্ব একমুহূর্তও অসম্পূর্ণ! আয়াত আর তুমি এখন আমার জীবনের অবলম্বন হয়ে উঠেছো!
#চলবে…?

