#তিমিরবসান(১৯)
#তাবাসসুম_তাজ্বওয়ারী
– চলো গাড়ি এসে গিয়েছে।
– আপনি যান আমি আয়াতকে নিয়ে আসছি।
স্নিগ্ধার কথা শুনে আয়াতকে নিতে না দিয়ে ওয়াজেদ টেনে নিয়ে বলল,
– আয়াতকে আমি নিচ্ছি তুমি গাড়িতে উঠে বসো।
স্নিগ্ধা অবাক কণ্ঠে বললো,
– ব্যাগ আর আয়াতকে দুইটাই কিভাবে নিবেন? হয় ব্যাগ দেন নাহয় আয়াতকে আমি নিচ্ছি!
– কোনো দরকার নেই। এমনিতেই হুটহাট উল্টে পড়ে থাকো তারউপর কাউকে নিলে যে কি হবে! আগে নিজেকে সামলাতে শিখো।
স্নিগ্ধা মুখ কুঁচকে নিলো। বিড়বিড় করে বললো,
– একই খোঁচা বারবার দেয়!
ওয়াজেদ অবশ্য স্নিগ্ধার এই ফিসফিসানি কানে না নেওয়ার ভান করে ঠোঁটের কোণে মিটিমিটি হাসল। গত কয়েকমাসে স্নিগ্ধার এই এক স্বভাব সে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে, অন্যমনস্ক হয়ে হাঁটতে গিয়ে হুটহাট হোঁচট খাওয়া!
একবার তো ড্রয়িংরুমের কার্পেটে পা আটকে পড়তে গিয়ে ওয়াজেদ একদম শেষ মুহূর্তে হাত না ধরলে ভালোই চোট পেত। আর কিছুদিন আগে ব্যালকনির দরজায় ধাক্কা খেয়ে পায়ের আঙুল ব্যথায় নীল বানিয়ে ফেলেছিল। সেদিন থেকেই ওয়াজেদ পণ করেছে, কোলে বাচ্চা বা ভারী কিছু নিয়ে স্নিগ্ধাকে একা হাঁটতে দেওয়া যাবে না!
বাসা থেকে বেরিয়ে নিচে নেমে স্নিগ্ধা ওয়াজেদের দিকে একপলক রেগে মেগে তাকিয়ে গাড়ির ড্রাইভিং সিটের পাশের দরজাটা খুলে ধুপ করে বসে পড়ল। ওয়াজেদ আয়াতকে খুব যত্ন করে স্নিগ্ধার কোলে বসিয়ে দিয়ে শপিং ব্যাগগুলো পেছনের ট্রাঙ্কে রেখে এসে ড্রাইভিং সিটে বসল। গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে সে লুকিং গ্লাসে স্নিগ্ধার ভার হয়ে থাকা মুখটার দিকে তাকিয়ে রসিকতা করে বলল,
– সত্যি কথাটা বললেই ম্যাডামের মুখটা আমসির মতো শুকিয়ে যায়! দু-দুবার হোঁচট খেয়ে পড়ে যাওয়ার ইতিহাস তো এখনো তাজা! এখনো মনে আছে, কার্পেটের সাথে কুস্তি লড়তে গিয়ে কার কোলে গিয়ে পড়েছিলে?
স্নিগ্ধা চট করে আয়াতের কানে হাত দিয়ে ওয়াজেদকে ধমকের সুরে বলল,
– আরে! বাচ্চার সামনে এসব কি বাজে কথা বলছেন? আমি মোটেই উল্টে পড়িনি, ব্যালেন্স হারিয়ে গিয়েছিল একটু!
– একই কথা, স্নিগ্ধা! ব্যালেন্স হারানো আর উল্টে পড়া আলাদা কিছু নয়। তাই রিস্ক না নিয়ে মেয়েকে আমার দায়িত্বে রাখাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।
ওয়াজেদের জবাব শুনে স্নিগ্ধা রাগ করে একপাশে মুখ ফিরিয়ে নিল। কিন্তু মনের অজান্তেই ওর মুখে একচিলতে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। লোকটা যতই খোঁচা দিক না কেন, এই ছলে যে কেবলই প্রকাণ্ড আগলে রাখার অধিকার লুকিয়ে থাকে তা বুঝতে স্নিগ্ধার আর বাকি নেই।
ওরা ঘুরতে যাচ্ছে। অনেকদিন ধরে প্ল্যান করছিল কোথাও ঘুরে আসার। আজ অনেকদিন পর ওয়াজেদ সব কাজ একপাশে সরিয়ে রেখে এই ট্যুরের প্ল্যানটা করেছে। গন্তব্য, সবুজে ঘেরা এক নিরিবিলি রিসোর্ট। যেখানে দু-এক দিন অন্তত শহরের এই কোলাহল থেকে দূরে গিয়ে একটু নিঃশ্বাস ফেলা যাবে। আয়াত মায়ের কোলে বসে জানালার বাইরের দৃশ্য দেখে বেশ উৎফুল্ল। ছোট ছোট আঙুল দিয়ে কাচ ছুঁতে চাইছে আর নিজের ভাষায় কি যেন বলে চলেছে।
ওয়াজেদ আড়চোখে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে হাসি এঁটে বলল,
– ম্যাডাম, রেগেমেগে মুখ ঘুরিয়ে রাখলে কিন্তু মিস করবেন! পরিবেশ এবং আমি কিন্তু বেশ দারুণ। একদম রোমান্টিক!
স্নিগ্ধা থতমত খেলো। চোখ গরম করে তাকালো। আজকে ওয়াজেদকে ড্রাইভিং সিটে বেশ হ্যান্ডসাম লাগছে, যা স্বীকার করতে স্নিগ্ধার মনের ভেতর এক অদ্ভুত ভালোলাগা কাজ করে। তবুও মুখে আলতো ভাব জমিয়ে রেখে বলল,
– যেই না চেহারা নাম রাখছে পেয়ারা! আমি মোটেও রেগে নেই। আয়াতের সাথে প্রকৃতি দেখছি, আপনার আর কী?
স্নিগ্ধার মুখের অভিব্যক্তি দেখে ওয়াজেদ ড্রাইভিং সিটে বসেই হো হো করে হেসে উঠল। স্টিয়ারিংয়ে এক হাত রেখে অন্য হাত দিয়ে সানগ্লাসটা একটু নিচে নামিয়ে স্নিগ্ধার লাল হয়ে যাওয়া গাল দুটো দেখে নিচু স্বরে বলল,
– বাহ! পেয়ারা পেয়ারা চেহারার প্রশংসাটাও কিন্তু মন্দ নয় স্নিগ্ধা! থাক আমার চেহারা আর নাম দুটোই নাহয় পেয়ারা থাকুক। আমার এই পেয়ারা চোখ তো ইতিমধ্যেই সুন্দর একটা দৃশ্য ফ্রেমবন্দি করে নিয়েছে!
স্নিগ্ধার গাল দুটো মুহূর্তে ঈষৎ লাল হয়ে গেল। নিচু স্বরে বললো,
– দিন দিন কথার প্যাঁচ বাড়ানো শিখছেন!
– যার সঙ্গ যেমন, প্রভাবে তো একটু পরিবর্তন আসবেই, স্নিগ্ধা!
ওয়াজেদের সাবলীল উত্তর। স্নিগ্ধা বললো,
– আপনার সাথে কথায় পারা যায় না!
.
– তোমার আগের বউটা ভালো আছিলো না?
এমন প্রশ্নে অপ্রস্তুত হলো ফাহাদ। চাইলেই এখন স্নিগ্ধার দোষ দিতে পারবে না। পুরো পরিবার এবং সমাজে রটে গিয়েছে তার কুকর্ম। নিজের অপকর্মের জন্য তাকে এখন প্রতিনিয়ত সবার সামনে ছোট হতে হচ্ছে। প্রশ্নকর্তা ফাহাদের কাঁচুমাচু চেহারা দেখে হাসলো। খোঁ’চা মে’রে বললো,
– কী হলো রে ফাহাদ? চুপ মা’ইরাগেলি কেন? তোর মা-ই তো সেদিন বলছিল, স্নিগ্ধা নাকি খারাপ ছিল, সংসার করতে জানে না! তা এখন স্নিগ্ধা চইলা যাওয়ার পর তোর সংসারের হাল কী? সত্যি করে বল তো, স্নিগ্ধা থাকতে কি কোনো দিক দিয়ে তোর কোনো অভাব আছিলো?
– আহ তুই চুপ থাক! তোর এত কিছু কেন জানা লাগবে?
ছেলেটা আবার হেসে বললো,
– জানা লাগবে না আসলে ভাবি… উপস না সে তো এখন অন্য কারো বউ! স্নিগ্ধাকে হারিয়ে কিছু বুঝছিস কি না ওটাই জানতে চাইছি।
ফাহাদ জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে একটা গভীর ও দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। বুক চিরে একটা হা-হুতাশ বেরিয়ে এল ওর। এত দিন পর, যখন স্নিগ্ধা ওর জীবন থেকে হাজার মাইল দূরে সরে গেছে তখন প্রতিদিন প্রতিটা মুহূর্তে ফাহাদ হাড়কষ্টে টের পাচ্ছে সে আসলে কী হারিয়েছে! কিন্তু জবাবে কিছু বলার জন্য খুঁজে পাচ্ছে না সে। এখন জীবনটা কেমন হয়ে গেছে তার। জীবনে না পাচ্ছে সুখ আর না তো সফলতা! ভেতরে অনুশোচনায় দ’গ্ধ হয়ে গুমড়ে ম’রছে সে! মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয় একটা বার আয়াতকে নিজের মেয়ে বলে কোলে নেওয়ার! একটা বার ‘বাবা’ বলে ডাকতো ও ফাহাদকে! একবার অবশ্য চেষ্টা করেছিল। ফাহাদ ওদের কাছে গিয়েছিল আয়াতকে দেখতে। স্নিগ্ধা রাজি না থাকলেও ওয়াজেদ ওকে আয়াতকে দেখার সুযোগ দিয়েছিল। ওকে কোলে নিয়ে ফাহাদ বলেছিল “একটাবার বাবা ডাকো তো মা!”
আয়াত চোখ বড় বড় তাকিয়ে ছটফটই করছিল। এক সময় সে ওয়াজেদের দিকে ছলছল চোখে তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে ডাকলো,
– বা…ব্বা…!
কথাটা যেন ফাহাদের কলিজায় বিঁধল। র’ক্তের বন্ধন থেকেও যে ভালোবাসার বন্ধন কত শত গুণ শক্ত আর সত্য হতে পারে, সেই সত্যিটাই যেন সেদিন ফাহাদকে সেদিন গুঁড়িয়ে দিয়েছিলো। নিজের জন্মদাত্রী বাবার কোল থেকে রেহাই পেয়ে অন্য এক পুরুষের দিকে হাত বাড়িয়ে ‘বাবা’ বলে ওঠা… এর চেয়ে বড় অপমান, এর চেয়ে বড় শাস্তি হয়তো ফাহাদের জন্য আর কিছুই হতে পারত না! সে আর কিছু বলার বা আয়াতের কাছে আর যাওয়ার কথা চিন্তা করার চিন্তা করলো না!
ওর ভাবনার ছেদ ঘটিয়ে ওর কাজিন বললো,
– কদর না করলে ওপরওয়ালা ঠিক এভাবেই জিনিস কেড়ে নেয়, ফাহাদ!
ফাহাদের বুকের ভেতরের অনুশোচনার আগুনটা আরো জ্বলে উঠল। স্নিগ্ধা যখন ওর ঘরে ছিল তখন সে ওর জীবনকে যন্ত্রণার পাহাড় বানিয়ে তুলেছিল। স্নিগ্ধার নীরব সহ্যশক্তি আর সহনশীলতাকে সে দুর্বলতা ভেবে ভুল করেছিল। আর আজ? স্নিগ্ধা আজ এক রাজার রানীর মতো সম্মান আর আদরে আছে। ওয়াজেদ শুধু স্নিগ্ধাকে নয়, ওর মেয়েকে পর্যন্ত নিঃস্বার্থভাবে আপন করে নিজের নাম দিয়েছে।
.
প্রায় তিন ঘণ্টার পথ পেরিয়ে অবশেষে গাড়ি এসে থামল পাহাড়ের কোলে ঘেরা চোখজুড়ানো সেই রিসোর্টটির সামনে। রিসোর্টের চারিদিকে সবুজ গাছগাছালি, পাহাড়ি ফুলের বাগান আর দূরে আবছা মোঘের খেলা। গাড়ি থেকে নামতেই এক পশলা হিমশীতল হাওয়া এসে গায়ে দোলা দিয়ে গেল।
ওয়াজেদ ডোর খুলে নেমে আগে ট্রাঙ্ক থেকে ব্যাগগুলো বের করে নিল। তারপর একহাতে ট্রাভেল ব্যাগ ঝুলিয়ে অন্য হাতটা বাড়িয়ে দিল স্নিগ্ধা আর আয়াতের দিকে।
– স্বাগতম, লেডিজ! আগামী দু’দিনের জন্য দুনিয়ার সব চিন্তা-ভাবনা ক্যানসেল।
স্নিগ্ধা গাড়ি থেকে নেমে চারপাশের অপরূপ দৃশ্য দেখে এক মুহূর্তের জন্য যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। এত সুন্দর শান্ত পরিবেশ! বুকের ভেতরের সমস্ত ক্লান্তি নিমেষেই ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গেল ওর। তার মনে পড়ে ফাহাদকে মেনে নিয়ে যখন সে ঘুরতে নিয়ে যেতে বলেছিল তখন ফাহাদ তাকে যা নয় তা বলে অপমান করেছিল! সেসব মনে করে সে চোখ বন্ধ করে একটা বড় শ্বাস ছাড়লো। চোখ খুলে ওয়াজেদের দিকে তাকালো। যে তাকে এবং তার মেয়েকে সর্বোচ্চ সম্মান আর ভালোবাসা দিয়ে আগলে রেখেছে!
ওরা কটেজে গিয়ে একটু রেস্ট নিয়ে বেরিয়ে পড়লো ঘুরতে। ওয়াজেদ স্নিগ্ধার পাশাপাশি হাঁটছিল। হঠাৎ সে আয়াতকে নিজের কোলে তুলে নিয়ে স্নিগ্ধার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল।
– হাতটা ধরো স্নিগ্ধা। এই পাহাড়ি ঢালু রাস্তায় আবার যেন কার্পেটের সাথে কুস্তি লড়ার মতো হোঁচট খেয়ে না বসো।
স্নিগ্ধা একটু চোখ পাকিয়ে তাকাল কিন্তু মনের ভেতরের গভীর অনুরাগকে আর চেপে রাখতে পারল না। সে ওয়াজেদের বাড়ানো হাতটা আঁকড়ে ধরল। ওয়াজেদের হাতের উষ্ণ ছোঁয়া আর থিতু হওয়া এক অলিখিত নিরাপত্তার অনুভূতি স্নিগ্ধার পুরো অস্তিত্বকে এক অদ্ভুত ভালোলাগায় ভরিয়ে দিল।
অনেকক্ষণ ঘুরাঘুরি করে আজকের দিন কেটে সন্ধ্যা হয়ে এল। স্নিগ্ধা বেঞ্চে বসে ওয়াজেদের কাঁধে নিজের মাথাটা আলতো করে রাখল। রক্তিম সূর্যাস্তের আলো তখন ওদের তিনজনের ওপর পড়েছে। স্নিগ্ধা ধীরকণ্ঠে বলল,
– জানেন ওয়াজেদ? একসময় মনে হতো আমার জীবনের সব আলো হয়তো চিরতরে নিভে গেছে। কিন্তু আপনার এই নিরবচ্ছিন্ন আবেগ আর সম্মান আমাকে আবার নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছে। আজকের এই মুহূর্তটাকে সত্যি স্বপ্নের মতো লাগছে।
ওয়াজেদ নিজের শক্ত বাঁধনে স্নিগ্ধাকে একটু চেপে ধরল। ওর চোখে চোখ রেখে এক অপূর্ব প্রগাঢ়তায় বলল,
– এটা কোনো স্বপ্ন নয় স্নিগ্ধা, এটাই আমাদের সত্যি। আঁধার কেটে যে নতুন আলো আসে, তা চিরকাল ধরে রাখাই আমার আমৃত্যু দায়িত্ব। তুমি আর আয়াতই আমার এই ছোট পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পূর্ণতা।
হঠাৎ ওয়াজেদের ফোনের রিং বেজে উঠলো। স্নিগ্ধা নড়েচড়ে বসে বললো,
– ফোনটা রিসিভ করুন!
ওয়াজেদ ভ্রু কুঁচকে ফোন বের করে দেখলো আননোন নম্বর। সে কেটে দিতে চাইলে স্নিগ্ধা বলল,
– ইম্পর্টান্ট কিছু হতে পারে! রিসিভ করুন।
ওয়াজেদ কল ধরে সালাম দিতেই ওপাশ থেকে রিনরিনে কণ্ঠে করুন সুর ভেসে এলো,
– কেমন আছো ওয়াজেদ? আমায় চিনতে পেরেছো? তোমার মেহজাবীন বলছিলাম!
#চলবে…?

