Home "ধারাবাহিক গল্প তিমিরবসান তিমিরবসান পর্ব-১০

তিমিরবসান পর্ব-১০

0
324

#তিমিরবসান(১০)
#তাবাসসুম_তাজ্বওয়ারী

[নোট: আয়াতের বয়স ছয়মাস। পর্ব ৭ এ বয়স রিলেটেড কিছু সংযোজন এনেছি]

আয়াতকে নিয়ে বসে বসে ইমেল চেক করছে স্নিগ্ধা। দুইদিন পর তার জয়েনিং। খুব চিন্তায় আছে কাজটা নিয়ে। ভাইয়ের পরিচিত তিনি, ঠিক মতো কাজ করতে না পারলে ভাইয়ের মুখ ছোট হবে এইটাই হলো চিন্তার আসল কারণ। তাই সব কাজ আয়ত্তে আনার চেষ্টা করছে। কোলের উপর বসে থাকা আয়াত ল্যাপটপের দিকে হাত বাড়িয়ে ছুঁতে চাইছে শুধু। একবার স্ক্রিন তো একবার কি বোর্ড

– আরে আম্মু, করো কি! কি বোর্ডে ওভাবে চাপ দিলে তো সব ডিলিট হয়ে যাবে। ওদিকে হাত দেয় না মা!

স্নিগ্ধা আয়াতের ছোট্ট হাত দুটো চেপে ধরে নিজের এক হাতের মুঠোই। আয়াত তা ছাড়ানোর চেষ্টা করে। কিন্তু ব্যর্থ হয়ে ঠোঁট ফুলিয়ে মায়ের দিকে তাকালো। চোখ টলমল করছে। যেন বলছে আমার হাত ছাড়ো! ধরে আছো কেনো? আমি খেলবো!

স্নিগ্ধা মেয়ের ওমন মুখভঙ্গি দেখে আর হেসে না ফেলে পারল না। হাতের মুঠি ছেড়ে দিয়ে আয়াতের নাকটা আলতো করে টেনে দিয়ে বলল,

– ইশ্‌রে! আমার রাজকন্যার রাগ দেখেছো? একটু হাতটা ধরেছি কী ওমনি চোখ দিয়ে পানি পড়ার জোগাড়! একদম বাবার স্বভাব পেয়েছে, যা চাই তা এখনই চাই!

কথাটা মুখ থেকে বেরিয়ে আসতেই স্নিগ্ধার বুকের ভেতরটা কেমন যেন একটু খচখচ করে উঠল। আর কিছু ভাবার আগেই টুং করে একটা মেসেজ আসলো। স্নিগ্ধা তড়িঘড়ি করে দেখলো সেন্ডারের নামের জায়গায় লেখা “Wazed Sarowar”। আর মেইলের সাবজেক্ট লাইনে বড় বড় অক্ষরে লেখা “Official Offer & Joining Letter”

মেইলটা ওপেন করতেই স্নিগ্ধার চোখের সামনে ভেসে উঠল অফিশিয়াল অফার লেটারটি। যেখানে অত্যন্ত পেশাদার এবং সম্মানজনকভাবে তাকে ওনাদের এজেন্সিতে স্বাগত জানানো হয়েছে। দুইদিন পর ঠিক কটায় তাকে অফিসে উপস্থিত হতে হবে, কার সাথে দেখা করতে হবে সব নিখুঁতভাবে উল্লেখ করা আছে সেখানে। স্নিগ্ধা কোল থেকে আয়াতকে আলতো করে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে ওর দুপাশে বালিশ দিয়ে দিলো যেন পড়ে না যায়। ওর নরম গালে একটা চুমু খেয়ে বললো,

– তুমি এখানে খেলা করো আম্মু এক্ষুনি আবার কোলে নিবো হ্যাঁ?

তারপর মেইলের নিচে থাকা প্রজেক্টের গাইডলাইন আর কিছু স্যাম্পল ওয়ার্কের এটাচমেন্টগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে ডাউনলোড করতে লাগল। ঠিক এই সময়েই সিফাত হাতে একটা কফির মগ নিয়ে রুমে ঢুকল। স্নিগ্ধাকে ওভাবে চিন্তিত মুখে ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে সে হেসে ফেলল। কফির মগটা টেবিলের ওপর রেখে আয়াতের গাল টিপে দিয়ে বলল,

– কীরে আপু? জয়েন করার আগেই তো তুই দেখি পুরো অফিসের কাজ নিয়ে দিন রাত এক করে গম্ভীর হয়ে বসে আছিস! সমস্যা কী?

স্নিগ্ধা ল্যাপটপ থেকে চোখ না সরিয়েই বলল,

– ঠাট্টা করিস না তো সিফাত! আমি সিরিয়াস কাজ নিয়ে!

সিফাত মুখ বাকিয়ে আয়াতকে কোলে তুলে নিয়ে বললো,

– চলো তো মামু! আমরা খেলবো তোমার মা যা ঘোড়ার ডিম করবে করুক!

সিফাত ওকে নিয়ে বিছানায় বসলো। স্নিগ্ধাও আয়াতকে সিফাতের সাথে থাকতে দেখে সুযোগ পেল।

পরের দুই দিন স্নিগ্ধা যেন দিন রাত এক করে ফেলল। আয়াত যখন ঘুমাতো সেই সুযোগে স্নিগ্ধা তখন ল্যাপটপ নিয়ে বসে ব্র্যান্ড স্টোরি আর পিআর রাইটিংয়ের টোন বোঝার চেষ্টা করত। ওয়াজেদের পাঠানো প্রতিটা গাইডলাইন সে অন্তত দশবার করে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ল। এই কাজের ব্যাপারে ভীষণ সিরিয়াস হয়ে গেল সে।

দেখতে দেখতে সেই কাঙ্ক্ষিত দিনটি চলে এলো। আজ স্নিগ্ধার জয়েনিং। সকালেই রেডি হয়ে আয়াতকে রেডি করিয়ে নিয়েছে। ওয়াজেদকে আগেই বলেছে আয়াতকে নিয়ে অফিস করতে হবে তার। সেদিন সিফাতের সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা থাকায় স্নিগ্ধাকে একাই সবকিছু সামলাতে হচ্ছিল। বাসা থেকে বেরিয়ে একটা সিএনজি নিয়ে যখন স্নিগ্ধা অফিসের দিকে যাচ্ছিল তার বুকের ভেতর কেমন ধুকপুক হচ্ছিল। প্রথমবার এমন অভিজ্ঞতা তার। আগে চাকরির কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতায় তার নেই।
অফিসে প্রবেশ করে প্রথমেই সে রিসেপশনের দিকে গেল। রিসেপশনের মেয়েটি স্নিগ্ধার কোলে ওমন কিউট একটা বাচ্চা দেখে বেশ মিষ্টি করে হাসলো। স্নিগ্ধা নিজেই বললো,

– সেহরিশ জাহান স্নিগ্ধা…

আর কিছু বলার আগে রিসেপশনের মেয়েটি বললো,

– ওহ আপনিই সেহরিশ! স্যার আপনার কথা আমাদের আগেই ইনফর্ম করে রেখেছেন। এই করিডোর দিয়ে সোজা গিয়ে ডানদিকের শেষ কেবিনটা।

স্নিগ্ধা সৌজন্যে হেসে বললো,

– ধন্যবাদ।

এগিয়ে যেতে যেতে স্নিগ্ধা মেয়ের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললো,

– আম্মু? একটু শান্ত থেকো কেমন?

আয়াত জবাবের বদলে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে আশপাশ দেখছে। নতুন জায়গা দেখে সে খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছে।
একটু পরই স্নিগ্ধা কাঙ্খিত দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। যার ওপর রুপোলি নেমপ্লেটে খোদাই করে লেখা “ওয়াজেদ সরওয়ার”

স্নিগ্ধা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হালকা করে টোকা দিয়ে মৃদু কণ্ঠে প্রশ্ন করলো,

– মে আই কামিং?

ভেতর থেকে একটা পুরুষ কণ্ঠ ভেসে এলো,

– ইয়েস, কাম ইন।

.

অন্যদিকে ফাহাদের যেন বিপদ সব একসাথে এসেছে। চাকরিতে বর্তমানে তার টানাপোড়ন চলছে। ও প্রতিমাসে কোম্পানি থেকে কিছু টাকা ভু’য়া ভাউচার আর জা’ল সইয়ের মাধ্যমে নিজের পেছনে আর যারিনের পেছনে খরচ করেছে এখন সে ধ’রা পড়েছে। এখন সে পুরো কোম্পানির চোখে দোষী। এখন তার বাবা খুলনা এসেছে। সব রাগ এখন ফাহাদের উপর ঝাড়ছে।

– তুই আমার মান সম্মান শেষ করে দিলি! কি করলি তুই এসব? আমার কি কম ছিলো যে তোকে কোম্পানি থেকে টাকা চু’রি করতে হলো??

ফাহাদ চুপ করে আছে। যারিনও এখন ওর থেকে দূরে। এই বিপদে পড়ার পর যারিন ফিরেও তাকায়নি বরং চো’র বলে অপবাদ দিয়েছে! অথচ বেশি টাকা ওর পেছনেই ঢেলেছিল ফাহাদ! এখন তাকে চেনেই না এই মেয়েটা! রাগ হচ্ছে ফাহাদের নিজের উপর। মেয়েটার পেছনে না ঢেলে নিজের কাজে লাগালেও হতো! আগে এই বিপদ থেকে উঠুক তারপর ওই মেয়েকে দেখে নেবে সে।

– বাবা ওটা একটা ক্লায়েন্ট ডিল…

– মুখ বন্ধ কর তোর!

ধমকে উঠলো আকবর জামান। ক্ষীপ্ত কণ্ঠে বলল,

– আমাকে বোকা ভাবিস না। অডিটররা সব চেক করে বের করেছে। আমাকে কিছু বুঝাতে আসবি না! আমার মান সম্মান শেষ করে এখন কথা বলতে এসেছে!

বেশ কিছুক্ষণ ফাহাদকে ধমকাধমকি করে উঠে গেলেন। ফাহাদও পিছু পিছু গেল। আজই ঢাকা ফিরবে সে। চাকরি তো যাবে এটা সে জানে কিন্তু তার বাবা কি করবে বুঝতে পারছে না। তবে সে আবার আসবে এখানে। যারিনকে দেখে নিবে সে। এই জেদ দেখিয়েই সে খুলনা ছাড়লো।

.

স্নিগ্ধার সাথে বেশ কিছু সময় কাজ সম্পর্কে আলোচনা করে ওয়াজেদ টেবিল থেকে একটা নতুন ফাইল তুলে নিয়ে স্নিগ্ধার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন,

– এটা আমাদের নতুন প্রজেক্টের প্রাইমারি ড্রাফট। এই প্রজেক্টের বাকি ডিটেইলস আর ডিজিটাল পিআর এর রাইটিং ফরম্যাটটা আপনাকে আমাদের সিনিয়র কনসালট্যান্ট রুবি বুঝিয়ে দেবে। এই কেবিনের পরে চার নম্বর কেবিনটা ওনার। আপনি ওনার কাছে গিয়ে ব্রিফিংটা একটু বুঝে নিন।

স্নিগ্ধা উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

– জি আচ্ছা, স্যার।

স্নিগ্ধা আয়াতকে কোলে নিয়েই ফাইল হাতে নিয়ে যেতে নিলেই ওয়াজেদ ডাকলো। স্নিগ্ধা ঘুরে দাঁড়িয়ে বললো,

– জ্বি?

– ব্রিফিংটা বুঝতে আপনার অন্তত আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা সময় লাগবে স্নিগ্ধা। ফাইলপত্র আর ল্যাপটপ সামলে বাচ্চা নিয়ে কাজ বোঝা আপনার জন্য কঠিন হবে। আয়াতকে আমার কাছেই রেখে যান। ওকে আমি দেখছি।

ওয়াজেদের মুখে এই কথা শুনে স্নিগ্ধা পুরো আকাশ থেকে পড়ল! শেষমেশ বস কি না একটা বাচ্চার বেবিসিটিং করবে? স্নিগ্ধা ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে আমতা আমতা করে বলল,

– না না, স্যার! তার কোনো প্রয়োজন নেই। ও আসলে খুব চঞ্চল, সারাক্ষণ হাত পা ছোড়ে আর ল্যাপটপ কাগজপত্র পেলেই টান দেয়। এখানে থাকলে আপনাকে খুব ডিস্টার্ব করবে। আমি ওকেই সাথে নিয়ে যাচ্ছি, সমস্যা হবে না।

ওয়াজেদ ল্যাপটপের ফ্ল্যাপটা অর্ধেক বন্ধ করে উঠে দাঁড়িয়ে বললো,

– কোনো ডিস্টার্ব করবে না, আপনি কোনো চিন্তা না করে রুবির কেবিনে যান আর কাজটা ভালো করে বুঝে নিন। আপনার অ্যাসিস্ট্যান্ট আমার কাছে একদম সেফ থাকবে।

বলেই ওয়াজেদ হাত বাড়িয়ে আয়াতকে ডাকলো। স্নিগ্ধা অবাক হয়ে দেখলো আয়াত ঝুঁকে পড়ে ওয়াজেদের কোলে যাওয়ার জন্য রাজি! ওয়াজেদ ওকে কোলে তুলে বললো,

– লিটল লেডি? তুমি আমার কাছে থাকবে না? তোমার মাকে টাটা দিয়ে দাও তো!

আয়াত মায়ের দিকে মুখ ফিরিয়ে ডাগর ডাগর চোখ দুটো পিটপিট করে তাকাল আবার ওয়াজেদের দিকে তাকিয়ে ছোট্ট ছোট্ট দাঁত দেখিয়ে হেসে উঠলো। স্নিগ্ধা প্রথমদিন থেকে দেখেছে সাধারণত অপরিচিত কারও কোলে যেতে যেখানে আয়াত কান্নাকাটি জুড়ে দেয়, সেখানে প্রথম দিনের দেখাতেই ওনার কাঁধে মাথা ঠেকিয়ে সে একদম শান্ত! অথচ সিফাতের কোলেও প্রথমবার যেতে কত কসরত করতে হয়েছে!

– দেখলেন তো? আপনার অ্যাসিস্ট্যান্ট আমার কাছে আরামেই থাকবে আপনি কাজ কমপ্লিট করে আসুন।

স্নিগ্ধা মাথা নাড়িয়ে চলে গেলে ওয়াজেদ আয়াতকে নিয়ে নিজের চেয়ারে এসে বসলো। স্নিগ্ধা চলে যাওয়ার পর প্রথমে আয়াত কিছুক্ষণ চুপচাপ ছিল। সে গোল গোল চোখে চারপাশটা দেখল তারপর যখন বুঝল মা আশেপাশে নেই, ওমনি তার ছোট্ট ঠোঁট দুটো উল্টে গিয়ে কান্না আসার উপক্রম হলো।
ওয়াজেদ ল্যাপটপে একটা জরুরি মেইল টাইপ করছিল। আয়াতের ওমন মুখভঙ্গি দেখে সে চট করে ল্যাপটপ বন্ধ করে ফাইলপত্র একপাশে সরিয়ে রাখল। ওর সমস্ত গাম্ভীর্য তখন জানলা দিয়ে হাওয়া! সে আয়াতকে সোজা করে নিজের কোলের ওপর দাঁড় করানোর ভঙ্গিতে ধরে বলল,

– এই যে ম্যাডাম! নো কান্না। হু? তোমার মা তো জাস্ট পাশের রুমে গেছে। এখন আমি আর তুমি ওয়ান-টু-ওয়ান মিটিং করব, ওকে?

আয়াত ওয়াজেদের মুখের দিকে তাকাল। ওয়াজেদ তখন নিজের চশমাটা নাক থেকে একটু নামিয়ে চোখ বড় বড় করে একটা মজার ফেস করল। ব্যস! ওমনি আয়াতের কান্নার মেঘ কেটে এক্কেবারে রোদ ঝলমলে হাসি! সে ওর চশমাটা ধরার জন্য দুই হাত বাড়িয়ে দিল। ওয়াজেদ একটু পিছিয়ে গিয়ে বললো,

– উহু! বাচ্চারা যে এই চশমায় কি খুঁজে পায় বুঝতে পারি না!

ওয়াজেদ চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রাখতেই আয়াত ওনার নাকের ওপর নিজের পিচ্চি হাতটা চেপে ধরল।
ওয়াজেদ নাক টেনে হাঁচি দেওয়ার ভঙ্গি করে বলল,

– হাঁচ্চোওওও!

বলার সাথে সাথে আয়াত খুশিতে এত জোরে হাত পা ছুঁড়ল যে ওর কোলের ওপর রীতিমতো লাফালাফি শুরু করে দিল। ওয়াজেদ ওকে কোলে বসিয়ে এক আঙুল দিয়ে গালে দাবিয়ে গুনগুন করে বললো,

– প্রিটি লিটল বেবি, হুউ ইউ আর প্রিটি লিটল লেডি রাইট?

আয়াত গোলগোল চোখে ওর দিকে তাকিয়ে রইল খানিক। তারপর তার চোখ গেল ওয়াজেদের গলায় ঝুলানো সিল্কের টাইটার দিকে। সে টাইটা চিবানোর জন্য মুখের কাছে নিয়ে যেতেই ওয়াজেদ আলতো করে ওটা ওর হাত থেকে ছাড়িয়ে নিলো। ওর দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বললো,

– মিস লিটল লেডি এসব মুখে দেন কেন হ্যাঁ?

আয়াত সেসব না শুনে ওটা ধরে একটা টান দিলে ওয়াজেদ ঝুঁকে এসে বললো,

– বসের টাই ধরে এভাবে টানলে তো চাকরি থাকবে না লিটল লেডি!

আয়াত অবশ্য বসের এই গম্ভীর হুমকির বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করল না। সে টাইটা হাত দিয়ে মোচড়াতে মোচড়াতে বড় বড় চোখ করে ওয়াজেদের ফর্মাল শার্টের মেটালিক বোতামগুলোর দিকে তাকাতে লাগল। ওর বুকপকেটে গোঁজা ফাউন্টেন পেনটার ক্লিপে হাত দিয়ে সে ওটা টেনে বের করার চেষ্টা করতেই ওয়াজেদ নিজেই সেটা সাবধানে ওর পকেট থেকে বের করে আয়াতের ছোট্ট হাতের মুঠোয় গুঁজে দিল। তবে ওটার ক্যাপটা টাইট করা আছে কি না, তা একবার পরখ করে নিতে ভুলল না। অবধারিতভাবেই সেটা আবার মুখের কাছে নিয়ে চিবানোর চেষ্টা করল আয়াত। ওয়াজেদ তড়িঘড়ি করে ওর খালি হাতটা আয়াতের মুখের সামনে পেতে দিয়ে পেনটা সরিয়ে নিল। আয়াত পেন চিবানোর সুযোগ না পেয়ে কা’মড় বসাল ওয়াজেদের শক্ত তর্জনীতে। আয়াত কেমন করে যেন তাকালো তার দিকে। ওয়াজেদ বাচ্চাটার মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবলো, এমন একটা পবিত্র ফুলকে কোন পা’ষাণ হাত অবহেলা করতে পারে? কোন বাবা এমন একটা বাচ্চার মায়া উপেক্ষা করে দূরে থাকতে পারে? ওর প্রশ্নের উত্তর পেলো না।

আয়াত পেনটা দিয়ে টেবিলে ধুমধাম বা’ড়ি দিচ্ছে। ওয়াজেদ বসে বসে ওর এই কাণ্ডকারখানা দেখছিল। সব কাজ যে ফেলে রেখেছে সেই নিয়ে কোনো মাথা ব্যথায় নেই তার! বেশ কিছুক্ষণ খেলার পর আয়াতের এবার একটু ক্লান্তি এলো। সে কলমটা ফেলে দিয়ে একটা বড় হাই তুলল। চোখ দুটো তার ঘুমে জড়িয়ে আসছে। সে আর ওয়াজেদের কোলের ওপর বসে না থেকে ওনার চওড়া বুকের ওপর ধপ করে মাথাটা এলিয়ে দিল। ওয়াজেদ হেসে ওকে আগলে নিলো। চোখ দুটো পিটপিট করতে করতে আয়াত একসময় ওয়াজেদের শার্টের একাংশ নিজের ছোট্ট মুঠোয় শক্ত করে ধরে ওর বুকেই নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ল।

ঘণ্টাখানেক পর মিটিং শেষ করে স্নিগ্ধা যখন ফাইল হাতে একটু তাড়াহুড়ো করেই দরজা নক না করেই কেবিনের দরজাটা খুলল তখন ভেতরের দৃশ্যটা দেখে ও দরজাতেই থমকে দাঁড়িয়ে গেল। আয়াত ওয়াজেদের বুকে ঘুমিয়ে আছে। আর ওয়াজেদ এক হাতে মাউস নাড়ছে। স্নিগ্ধার বুকের ভেতর কেমন যেন করে উঠলো। ফাহাদ নিজের সন্তানকে, তার মেয়েটাকে কোনোদিন বুকে জড়িয়ে ঘুম পাড়ানো তো দূর ঠিকমতো ভালোবেসে কোলেও নেয়নি। ফাহাদের কাছে আয়াত যেন ছিল এক অনাকাঙ্ক্ষিত দায়। আর এই সম্পূর্ণ বাইরের একজন মানুষ ওর মেয়েকে কতটা আগলে রেখেছে!

ওয়াজেদ পাশে তাকিয়ে স্নিগ্ধাকে দাড়িয়ে থাকতে দেখেই মুখে আঙুল দিয়ে চুপ থাকার ইশারা করল যেন আয়াতের ঘুম ভেঙ্গে না যায়। স্নিগ্ধাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ফিসফিস করে বললো,

– ভেতরে আসুন স্নিগ্ধা তবে একদম আওয়াজ করবেন না। ম্যাডাম মাত্র ১৫ মিনিট হলো গভীর ঘুমে তলিয়েছেন।

স্নিগ্ধা হাসলো। এই মেয়েকে ঘুম পাড়ানো কত কষ্টের এটা তো সে জানেই! স্নিগ্ধা এগিয়ে এসে আয়াতকে ওয়াজেদের বুক থেকে নিজের কোলে তুলে নিল। মায়ের চিরচেনা সুবাস পেতেই আয়াত ঘুমের ঘোরেই একটু নড়েচড়ে উঠে স্নিগ্ধার গলার কাছে মুখটা গুঁজে দিল তবে আর চোখ খুলল না। স্নিগ্ধা একটু ইতস্তত করে বলল,

– ও কি আপনাকে খুব বেশি জ্বালিয়েছে?

ওয়াজেদ সোজা হয়ে বসে বললো,

– একদমই না। ও যথেষ্ট শান্ত, বাচ্চারা একটু আধটু দুষ্টুমি না করলে হয়?

স্নিগ্ধা হাসল। ওয়াজেদ আবার বলল,

– তো, রুবি যা বোঝাল সব ক্লিয়ার? কাল থেকে কাজ শুরু করতে পারবেন?

– জ্বি স্যার পারবো। রুবি আপু খুব সহজ করে বুঝিয়ে দিয়েছেন। আমি আজ রাতেই ড্রাফটের কাজটা গুছিয়ে নেব যাতে কালকের মধ্যে আপনাকে ফার্স্ট কপিটা দেখাতে পারি।

– গুড। কাজের কোয়ালিটির ব্যাপারে আমি নো কমপ্রোমাইজ, সিফাত নিশ্চয়ই আপনাকে বলেছে। তবে হ্যাঁ, আয়াতের জন্য যদি কোনো স্পেশাল ফ্লেক্সিবিলিটি লাগে আপনি অবশ্যই জানাবেন।

– ঠিক আছে স্যার।

– আচ্ছা, আজ তাহলে আপনি আসতে পারেন।

– ওকে।

স্নিগ্ধা সালাম দিয়ে বেরিয়ে এলো। আজকে তার একটা কাজ আছে। খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ। যেটা সে করে তবেই বাসায় ফিরবে। এই ভেবে নিজের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা দিল সে।

#চলবে….?