Home "ধারাবাহিক গল্প বকুলের মালা শুকাবে বকুলের মালা শুকাবে পর্ব-০১

বকুলের মালা শুকাবে পর্ব-০১

0
552

#বকুলের_মালা_শুকাবে—১
#শার্লিন_হাসান

“” সাইজ কত তোমার?”

দেখতে আসা পাত্রের থেকে এরকম একটা কথা শুনে রাগিনী কী প্রতিক্রিয়া দিবে বুঝতে বেশ সময় লাগলো। লোকটার দিকে ঘৃণাভরা চাহনি নিক্ষেপ করলো। মূহুর্তে মাথায় রাগ চড়ে বসে। সেটাকে দমিয়ে রেখে ভদ্রমেয়ের মতো জিজ্ঞেস করে,

“কিসের কথা বলছেন?”

“চেস্ট….

ঠোঁটের ফাঁকে জ্বলন্ত সিগারেট ধরে সেটায় একটান দিয়ে বলে, “হিপস…

” আপনি আমার মেজারমেন্ট জিজ্ঞেস করছেন? এতো বড় আস্পর্ধা!”

“বিয়ে করব যেহেতু, এসব বিষয়ে জানাটাও ইমফরট্যান্ট।”

“আপনার মতো অ সভ্যকে আমি ম’রে গেলেও বিয়ে করব না। শুনেছেন আপনি?”

“না শুনতে পাইনি। আরেকবার বলো?”

” দেখে তো বয়স্ক বুড়ো লাগে তাও এতো লু”চ্চামি? শোনে রাখুন অভিদ সিদ্দিকী আপনাকে আমি কখনোই বিয়ে করব না। তোর পর্দা সবার সামনে টেনে খুলব।”

“আপনি থেকে সোজা তুই?”
রাগিনীকে কথার মাঝখান দিয়ে থামিয়ে দেয় অভিদ সিদ্দিকী তাতেই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে রাগিনী দাঁতে দাঁত চেপে শুধায়,

“লজ্জা করেনা আমার মতো ষোলো বছরের মেয়েকে বাল্যবিবাহ করতে চাচ্ছেন?”

“ও হ্যালো! বয়স কম হলেও কথাবার্তায় বেশ ঝাঝ আছে। সবচেয়ে বড়কথা তোমাকে দেখে মোটেও ছোট লাগেনা। সব ফিটফাট আমায় সামলাতে পারবে। বেটার।”

“তোকে আমি খু’ন করে জেলে যাব অস’ভ্য লোক। আমি দাদুর কাছে বিচার না দিয়েছি। মনে রাখিস। তোর কিসের জানি চাকরী ওটা নিয়েই তো এতো দাপট। ওটাও আমি নট করে দেব।”

“হুম বেশ ভালো। অসভ্যদের সাথে অসভ্যামী করতে হয় নাহলে পছন্দের তালিকায় যাওয়া যায়না মিস রাগিনী মেহেরজান।”

রাগিনী অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে শাড়ির আঁচল আঙুলে পেঁচাতে থাকে। তা দেখে অভিদ ভ্রু জোড়া সংকুচিত করে ফেলে। সিগারটটা বাড়িয়ে দিয়ে বলে, “এক টান দিতে পারো রাগ কমে যাবে।”

রাগিনী চোখ ফিরিয়ে তাকায়। ভয়ংকর রাগে হাত-পা কাঁপা শুরু করে দিয়েছে ওর। তা দেখে অভিদ সিদ্দিকী কী জেনো মজা পেলো। দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “রাগ হচ্ছে ভীষণ তাইনা? আমারও সেদিন রাগ হয়েছিলো প্রচুর। যার শাস্তিস্বরূপ আজ থেকে আগামীদিন গুলোতে তোমাকে প্রতিনিয়ত ভুগতে হবে। সবচেয়ে বড় ব্যপার আমাদের এইজ ডিফ্রেন্ট। আই হোপ, ইউ ক্যান আন্ডারস্ট্যান্ড।”

“বুড়ো লোক আপনাকে কখনোই বিয়ে করব না আমি।”

“জাস্ট শাট আপ সুইটহানি।”

জোরে দেওয়া ধমকে রাগিনী মৃদু কেঁপে উঠে। অভিদ প্যান্টের পকেটে দু-হাত গুঁজে বলে, “ফেইভরেট কালার?”

রাগিনী জবাব দিলোনা। অভিদ আশেপাশে তাকিয়ে বলে, “তোমার কানে প্রব্লেম আছে?”

“আপনি আমার আংকেল বয়সী হবেন। আমার ফুফি এখনো বিয়ে করেনি আমি কেন বিয়ে করব? তাও আপনাকে?”

“সেটা তোমার পরিবারকে জিজ্ঞেস কর নিও। মিস রাগিনী মেহেরজান একটা কথা সবসময় মাথায় রাখবে, সবসময় সবজায়গায় ক্ষমতা,দাপট এবং বেয়াদবি খাটে না। এলাকায় প্রভাবশালী পরিবারের একটি তোমাদের হলেও পুরো এলাকা তোমাদের না।”

“আপনি আমাকে জোর করে বিয়ে করতেই পারেন বাট বুড়ো বয়সে উপসস মিস্টেক এখনি তো আপনার বুড়ো বয়স চলছে তো বলছি কী এখন থেকে লিখে রাখুন পরবর্তী দিনগুলোতে আপনি অপমান,অপদস্ত, হেনস্তা হবেন। কখনো শান্তি কী চোখে দেখবেন না। বুঝেছেন আপনি? এবার আসুন। বেরিয়ে যান আমাদের বাসা থেকে।”

কথাটা বলে রাগিনী হেঁটে নিচের দিকে যাওয়া ধরে। পেছন দিয়ে অভিদ সিদ্দিকী আসে। সিঁড়ি বেয়ে নেমে লিভিং রুমটায় প্রবেশ করে দু’জন। তখন বসে থাকা বেশ কয়েকজন ওদের দিকে নজর দিয়ে ফিসফিস করে বলে, “দু’জনকে পাশাপাশি সুন্দর লাগছে তো।”

অভিদ সিদ্দিকী সোফায় বসে সবার দিকে একনজর তাকায়। রাগিনীর বাবা রাসেল চৌধুরী এবং দাদা রফিকুল ইসলাম চৌধুরীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “আপনাদের মেয়ের কোন আপত্তি নেই এই বিয়েতে। সে নিজেই জানালো আমায়। যেখানে কনে রাজী সেখানে আমার আপত্তি করার মানে নেই। আগামী কালকেই বিয়েটা সারতে চাচ্ছি আমি। আপনাদের আপত্তি আছে?”

পাশ থেকে দাদী শান্তিসুধা বলেন, “আমাদের আপত্তি নেই। ও যে মানুষ হবে এটাই বেশি।”

রাগিনী কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয় দাদীর দিকে। ওর বাবা-দাদা দুজনই খুব খুশি মনে কথাবার্তা বলছেন। রাগিনী সবার খুশি দেখছে তো রেগে ফেটে যাচ্ছে প্রচুর। শান্তিসুধা মিষ্টি এনে হবু নাত জামাইকে মিষ্টিমুখ করান। রাগিনী একপাশে ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে সবার কান্ড দেখছে এবং জ্বলেপুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে। লোকটার বয়স বত্রিশ তেত্রিশ তো হবেই! তার চেয়ে ষোল বছরের বড়! এতো এইজ ডিফ্রেন্ট কোনভাবে মানা যায়না। তারউপর লোকটার কথাবার্তায় তো তার ভয়ই লাগছে। কীভাবে তার মেজারমেন্ট জিজ্ঞেস করলো ভাবতেই রাগিনীর ইচ্ছে হলো, মাটি ফাঁক হয়ে যাক সে গা ঢাকা দিবে। ওই লোকটার কী লাজলজ্জা বলতে কিছুই নেই? ঘুমে বুড়ো হয়েছে? তাও এতোটা নির্লজ্জ!
সে তো চেয়েছে, হাসবেন্ড হিসেবে পাঁচ বছরের গ্যাপ কাউকে পাবে। যে তাকে বন্ধুর মতো বুঝবে,আগলে নিবে। সম্পর্ক হবে, ‘মেইড ফর ইচ আদার’ যেটা এই বুড়ো বয়ষ্ক লোকটার সাথে সম্ভব না। কোনভাবেই না। রাগিনীর প্যানিক হচ্ছে। দম বন্ধ লাগছে৷ মনে হচ্ছে এই যে মাথাটা ঘুরে পড়ে যাবে ও। সবাই যখন কথাবার্তা বলায় ব্যস্ত তখন রাগে ফুলেফেঁপে ওঠা রাগিনীর দুচোখে তখন আঁধার নেমে এলো। কারোর নজর তার দিকে নেই। হুট করে মেঝেতে দপ করে কিছু পড়ার শব্দে সবার নজর রাগিনীর দিকে আসে। সে ফ্লোরে পড়ে আছে নিথর হয়ে। কুসুমকলি মেয়ের দিকে ছুটে আসেন। ফ্লোরে বসে রাগিনীর মাথাটা নিজের কোলে নিয়ে ডাকেন, “রাগিনী চোখ খুলো আম্মু। কী হয়েছে তোমার?”

উপস্থিত সকলে এগিয়ে আসে রাগিনীর দিকে। রাফিকুল ইসলাম চৌধুরী নাতনির পাশে বসে বলেন, “দাদুভাই কী হয়েছে তোমার? অসুস্থ তুৃমি?”

“আই থিংক ওনার বেড রেস্ট প্রয়োজন। ডক্টরকে ডেকে প্রেসার চেক করে নিবেন। দেখে মনে হয়, রাগ বেশি আপনাদের মেয়ের। সেজন্য এই অবস্থা।”

প্যান্টের পকেটে দু-হাত গুঁজে ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বক্তব্যটুকু পেশ করে অভিদ সিদ্দিকী। রাগিনীকে ধরাধরি করে তার রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। তার সেবায় নিয়োজিত হয়ে পড়ে মা কুসুমকলি এবং ওনার ছোট জা। শান্তিসুধা নাতনিকে একনজর দেখে আসেন। অভিদ সাইডে দাঁড়িয়ে ফোনে কাজ করছিলো কিছু একটা। শান্তিসুধা এগিয়ে এসে বলেন, “তোমাকে কিছু বলার ছিলো।”

“জ্বী বলুন।”

“তুমি কী বউ সাথে রাখবা নাকি পরিবারের সাথে থাকবে?”

“আমি প্রতি বৃহস্পতিবার বাসায় ফিরি আবার শনিবারে কাজে চলে যাই। রাগিনী পড়াশোনা কন্টিনিউ করবে সেজন্য বাসায় থাকবে আমার পরিবারের সাথে।”

“ওহ্। শোন ওকে একটু কাজকর্ম শিখিও। একটু উগ্র মেয়েমানুষ ও। মানিয়ে নিও।”

“আপনি চিন্তা করবেন না, সময় লাগবে ওকে ঠিক করতে।”

শান্তিসুধা বেশ খুশি হোন। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলেন, “তোমার হাতে তুলে দিচ্ছি ভরসা করে।”

অভিদ মৃদু হাসার চেষ্টা করে। শেষ আড্ডায় কফিতে চুমুক দেয় উপস্থিত সবাই। সাথে অভিদের কর্মজীবন নিয়েও টুকটাক কথাবার্তা হয়। সন্ধ্যা সাতটার দিকে অভিদ সিদ্দিকী এবং তার বড় ভাই বিদায় জানায় চৌধুরী পরিবার থেকে।

অভিদ সিদ্দিকী যাওয়ার পেছন দিয়ে চৌধুরী পরিবারে তুমুল ঝড় উঠে। রাগিনীর জ্ঞান ফিরতে ও ভাজ একটা ছুঁড়ে মেরেছে দাদীর দিকে। চিৎকার করে বলেছে, “আমি ওই বুড়োকে বিয়ে করব না। কোনভাবেই না। ওর সাথে আমার যাবে নাকী? ওদের বংশের নামকাম আছে নাকী? থার্ডক্লাশ ফ্যামিলি। আমি চৌধুরী বংশের মেয়ে। আমি কেন ওকে বিয়ে করতে যাব? আমার বিয়ের বয়স হইছে?”

“চড়িয়ে দাঁত ফেলে দেব বেয়াদব। তোমার বিয়ে ঠিক হয়েছে এবং আগামী কালকেই বিয়েটা হচ্ছে। নিজের উগ্রতার জন্যই আজ তোমার এই অবস্থা। অভিদ ভালো ছেলে। লাখে একজন, তোমাকে যে বিয়ে করছে এটা তোমার ভাগ্য বলতে পারো।”

মায়ের কথায় রাগিনী বিছানা থেকে নেমে হিসহিসিয়ে তেড়ে যায় তার দিকে। তার রাগে ভাঁটা পড়ে উচ্চশব্দে ফোন বেজে উঠতেই। রাগিনী সবাইকে পরখ করে ফোনের দিকে ছুটে যায়। আননোন নাম্বার দেখে কলটা রিসিভ করে কানে দিতে ওপাশ থেকে অভিদ বলে, “তোমার হোয়াটসঅ্যাপে কিছু পিকচার্স দিয়েছি। দেখে বিয়েতে মত দাও। অযথা কারোর উপর চিৎকার করবেনা তুমি।”

“বুড়ো তোকে আমি খু ন করে ফেলব।”

“আচ্ছা সমস্যা নেই।”

ঠান্ডা মাথায় জবাব দেয় অভিদ। রাগিনী কল রেখেই ছবিগুলো চেক দিয়ে চ্যাঁচিয়ে বলে, “এটা কিসের অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ এটা তো রীতিমত ফোর্স ম্যারেজ।”

কথাটা বলে কলটা কেটে হোয়াটসঅ্যাপে আসা ছবিগুলো আবারও দেখে নেয়। মূহুর্তে মিইয়ে যায় সমস্ত রাগ,জেদ এবং উগ্রতা। সবাই ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। রাগিনী ফোনটা সুইচড অফ করে বেডের পাশে এসে বসে। কিছুক্ষণ থম মেরে বসে থেকে মায়ের দিকে তাকায়। সবার দিকেই একবার করে দৃষ্টি বুলিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি টেনে বলে, “আমার রুমে কী ড্রামা হচ্ছে? ওটা দেখার জন্য সবাই বসে আছ?”

কেউ কোন জবাব দিলোনা। একে একে সবাই বিদায় নেওয়া শুরু করে। যাওয়ার সময় রাসেল চৌধুরী জিজ্ঞেস করেন, “তুমি কী বিয়েতে রাজী নও?”

“ওই বু ড়ো যেহেতু বলেছে আমি রাজী তাহলে আর জিজ্ঞেস করছেন কেন?”

মেয়ের কথায় রাসেল চৌধুরী আর কিছু বললেন না। দরজা আটকে সোজা প্রস্থান করে নেন তিনি। তারা যেতে রাগিনী জোরে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে।

চলবে।