Home "ধারাবাহিক গল্প "হৃদয় জানে মনের কথা হৃদয় জানে মনের কথা পর্ব-১৮ এবং শেষ পর্ব

হৃদয় জানে মনের কথা পর্ব-১৮ এবং শেষ পর্ব

0
763

#হৃদয়_জানে_মনের_কথা
#পর্ব_১৮ (অন্তিম পর্ব)
#লেখনীতে_মারিয়া_আক্তার_মাতিন

স্রোত ভয়ে ভয়ে অন্বয়ের দিকে এগিয়ে গেল। তার চোখভর্তি পানি। বুকের ভিতর জমে থাকা ভয় যেন এক নিমিষেই বেরিয়ে গেল তার। সে ছুটে গিয়ে অন্বয়ের পিছনে দাঁড়িয়ে তার শার্টটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। কাঁপা কণ্ঠে বলল,
-“আ..আপনি, আপনি এসেছেন, অন্বয় ভাই! জানেন, আমার খুব ভয় লাগছিল!”

অন্বয় চোখদুটো বন্ধ করে শ্বাস ছাড়লো। চোখ খুলে মাথাটা কাঁধ বরাবর এনে বলল,
-“আমি থাকতে তোর কিছু হবে না। নিজের জীবন দিয়ে হলেও তোকে রক্ষা করব।”

ব্যস! এই দুটো বাক্যই স্রোতের মনের সাহস বাড়িয়ে দিতে সক্ষম হলো। বুকের ভিতর জমে থাকা আতঙ্ক হাওয়া হয়ে গেল তার। অন্বয় সামনে এগিয়ে গিয়ে নিচে পড়ে থাকা অর্কের কলার ধরে উঠালো। তারপর ফের এক ঘুষি বসালো তার মুখে। অন্বয়ের চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরছে। সে দাঁত চিবিয়ে বলল,
-“তোর সাহস কী করে হলো আমার কলিজায় হাত দেওয়ার?”

অর্ক ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল,
-“আ..আপনি আমায় ভুল বুঝছেন। আমি আসলে তেমন কিছু…

-“শাট আপ! আর একটা মিথ্যা কথা বললে দাঁত ভেঙে তোর হাতে ধরিয়ে দিব। তুই নিজেও জানিস না, তুই আজ কতো বড় অপরাধ করেছিস!”

-“ভ..ভুল হয়ে গেছে, মাফ করে দিন!”

-“মাফ? তাও তোকে? তোর দিন শেষ, এবার দেখ আমি কী করি!”

এই বলে সে অর্কের দিকে এক পা এক পা করে এগোতে লাগল। নিচে ছিটকে পড়া অর্ক দুহাতে ভর দিয়ে ধীরে ধীরে পিছাতে থাকে। অন্বয় একটানে নিজের বেল্ট খুলে হাতে নিয়ে ঘুরাতে লাগলো। স্রোত ক্রমাগত ঢোক গিলছে। অন্বয় এখন কী করতে যাচ্ছে, সে তা স্পষ্ট বুঝতে পারছে। অন্বয় এবার দিক বিদিক না ভেবে বেল্ট দিয়ে সজোরে আঘাত করতে থাকে অর্কের গায়ে। এই আঘাতে সে নিজের শরীরের সবটুকু বল প্রয়োগ করছে। অর্কের অবস্থা নাজেহাল। অন্বয় একের পর এক বেল্ট দিয়ে আঘাত করেই যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে তো ছেলেটা মরে যাবে! স্রোত দৌড়ে গিয়ে অন্বয়কে পিছন থেকে ঝাপটে ধরলো। কান্নামিশ্রিত কণ্ঠে বলল,
-“আর মারবেন না। মরে যাবে ও।”

-“মরুক। এসব জা’নো’য়া’রদের বেঁচে থাকার কোনো প্রয়োজন নেই।”

-“ আপনি থামুন অন্বয় ভাই, প্লিজ!”

অন্বয়ের হাত থামলো। বেল্টটা পড়ে গেল নিচে। সে নিজের থেকে স্রোতকে ছাড়িয়ে ওর দিকে ফিরে বলল,
-“তুই এখনো এর জন্য দয়া দেখাচ্ছিস?”

-“আপনি যেভাবে মার’ছিলেন, ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। তাই আর কী…

-“ ও তোর সাথে কী করতে যাচ্ছিল তুই বুঝতে পারছিস? ওর সাহস কী করে হলো তোর গায়ে হাত দেওয়ার? বল! ওর সাহস কোন পর্যায়ে গেলে সে তোকে মিথ্যে বলে তোকে অপহরণের চেষ্টা করে! সে ভুলে গেছে সে কার কলিজায় হাত দিয়েছে! একে তো আমি আস্ত রাখবো না!”

এই বলে অন্বয় জোরে বেল্ট দিয়ে ফের এক ঘা বসালো অর্কের গায়ে। অর্ক ব্যথায় কুঁকড়ে উঠে। তার শরীরের বিভিন্ন জায়গা থেকে রক্ত ঝরছে। সে আর না পেরে শেষে অন্বয়ের দু পা জড়িয়ে ধরলো। জোরে জোরে শ্বাস নিতে নিতে বলল,
-“আমায় আর মারবেন না। আমার অনেক বড়ো ভুল হয়ে গেছে। আমি স্রোতকে ভালোবেসে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। ভুল পথে পা বাড়াতেও দুবার ভাবিনি। আমি তো এসব নিজের বুদ্ধিতে করিনি, বিশ্বাস করুন। আমি তো এসব..

-“মেহেরের বুদ্ধিতে করেছিস?”

অন্বয়ের কথা শুনে অর্ক অবাক হয়ে গেল। আশ্চর্যের সাথে বলল,
-“আপনি কীভাবে জানেন?”

অন্বয় হাসলো। সে হাসি শরীর হিম করে দেওয়ার মতো। ঠোঁটের কোণে সে হাসি বজায় রেখে বলল,
-“চোরের খবর পুলিশই তো ভালো জানবে। তাই না?”

মেহেরের গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। সে তার বড়ো ভাই হাবিবকে বলল,
-“ভাইয়া, এখান থেকে পালা!”

মেহের ও হাবিব চুপিচুপি বের হয়ে চলে যাচ্ছিল, তখনই পুলিশের দল এসে ঘেরাও দিল। একজন বলল,
-“কোথায় পালাচ্ছিস? তোদের খুঁজতে অনেক কসরত করতে হয়েছে। যাক, আজ দুটোকে একসাথে পেয়েই গেলাম!”

মেহেরের চোখদুটো বড়ো বড়ো হয়ে গেল। সে নিজের জান বাঁচাতে বলল,
-“যা করার আমার ভাই করেছে, সে চুরি করেছে, সেদিন লোক পাঠিয়ে অন্বয় স্যারকে রাস্তায় হাম’লা করেছে, আরও যা যা করার আমার ভাই-ই তো করেছে। আমি তো এসব কিছু করিনি। আপনারা কীসের ভিত্তিতে আমাকে এরেস্ট করবেন? কোনো প্রমাণ আছে?”

-“প্রমাণ ছাড়া পুলিশের দল কাজ করে না। আপনি যে সকল কিছুর মূল তার প্রমাণ আছে। চলুন এবার।”

এই বলে তাদের একজন আসলো হ্যান্ডকাফ পরাতে। হাবিবের এসবে মন নেই। সে আপাদত নিজের বোনের স্বার্থপরতা দেখে অবাক হয়ে গেছে। নিজেকে বাঁচানোর জন্য ভাইকে ফাঁসাতেও দুবার ভাবলো না? তার বোনটা এতো স্বার্থপর? অবশ্য সে ও তঁ কম নয়। দুজন মিলেই তো কতকিছু করল! মেহের ছটফট করছে ছুটার জন্য কিন্তু তার হাতে ইতিমধ্যে হ্যান্ডকাফ পরানো শেষ। অন্বয় অর্ককে ধরে এনে বলল,
-“এই বাস্টা’র্ডকেও আপনাদের হাতে ছেড়ে দিলাম।”

অর্ক ছলছল চোখে স্রোতের দিকে তাকিয়ে বলল,
-“পারলে আমায় মাফ করে দিস, স্রোত।”

স্রোত অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল,
-“আমার তোর মুখটাও দেখতে ইচ্ছে করছে না। বন্ধুত্বের এই প্রতিদান দিলি তুই? আমি তোর কাছ থেকে এসব আশা করিনি।”

-“দয়া করে হলেও মাফ করে দিস।”

-“দয়া করেই তখন অন্বয় ভাইকে তোকে মা’রতে না করেছিলাম। তুই আর কথা বলিস না। চলে যা এখান থেকে।”

অর্ক আর কিছু বলতে পারল না। তার আগেই পুলিশের দল তাদের ধরে নিয়ে গেল। স্রোত অন্বয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
-“তার মানে সেদিন আপনার অবস্থার জন্য মেহেরের ভাই দায়ী ছিল?”

-“হ্যাঁ, মেহেরেরও হাত ছিল।”

-“আচ্ছা, আপনি জানলেন কীভাবে আমি এখানে?”

-“সেদিন চা খাওয়ার সময় অর্কের হাবভাব দেখেই বুঝতে পেরেছিলাম সে খারাপ কিছু করবে। তাই মাকে বলে রেখেছিলাম আমি যতক্ষণ বাসায় না থাকি, ততক্ষণ তোর উপর যেন কড়া নজর রাখে। তোর সকল আপডেট যেন মা আমাকে জানায়। তুই আজ মাকে বলেছিলি যে তোর এক বান্ধবীর সাথে দেখা করতে যাচ্ছিস কিন্তু আমার জানামতে দেখা করার মতো তোর কোনো বান্ধবী নেই। তখনই বুঝে ফেলি, তুই অর্কের সাথে দেখা করতে গেছিস। মা আমাকে এটা জানানোর পর আমি দ্রুত বাসায় ফিরে আসি। ফেরার পথে পুলিশকেও ইনফর্ম করে রেখেছিলাম। বাসায় এসে দেখি তুই ফোন রেখে গেছিস। এ কাজটা অবশ্য তোকে খুঁজে পেতে সাহায্য করেছে। তোর ফোন থেকে অর্কের নাম্বার ট্র্যাক করে এসে দেখি ওই জায়গাটাতে কেউ নেই। তখন আরও সামনে এগিয়ে যেতেই এ জায়গাটা চোখে পড়ে। আমার মন তখন কেমন যেন অস্থির লাগছিল। সেই অস্থিরতার জন্যই এখানে আসি আর এসে যা দেখলাম তাতে আমার মাথায় রক্ত উঠে যায়। তুই না আটকালে আজ আমি অর্ককে খু’নই করে ফেলতাম।”

স্রোত এবার শক্ত করে অন্বয়কে জড়িয়ে ধরল। ফুঁপিয়ে উঠলো ফের। বন্ধুকে বিশ্বাস করে ঠকে যাওয়ায় ভীষণ অনুতাপ নিয়ে বলল,
-“সরি,অন্বয় ভাই, সরি! আমি আপনাকে না জানিয়ে, আপনার অনুমতি ছাড়াই অর্কের সাথে দেখা করতে এসেছিলাম। জানেন, ও আমায় বলেছিল যে ওর নাকি আমার সাহায্যের প্রয়োজন, আমি তারপরও দোটানায় ছিলাম যাব কিনা। তখন সে আমাকে বন্ধুত্বের দোহাই দিয়ে কত কী বলতে লাগলো যার কারণে আমার এখানে আসতে হলো৷ আমি কি জানতাম যে ও আমার সাথে এমন করবে? আপনি প্লিজ আমায় ভুল বুঝবেন না, আমার উপর রাগ করবেন না।”

অন্বয় স্রোতের মাথায় একহাত রেখে বলল,
-“আমি তোর উপর রাগ করিনি। আমি জানি, তুই এখানে পরিস্থিতির শিকার। আমি তোকে বিশ্বাস করি স্রোত। তোর উপর আমার দৃঢ় বিশ্বাস আছে। আমি কেন রাগ করব বোকা?”

-“আপনি সত্যিই রাগ করেননি?”

-“রাগ করলে কি আর এখন তোর সাথে এতো ভালো করে কথা বলতাম? তবে হ্যাঁ, এরপর যদি আমাকে না জানিয়ে কিছু করেছিস, তখন কিন্তু খুব রাগ করব।”

-“আমি আপনাকে রাগ করার সুযোগই দিব না।”

______________________

রাতের প্রহর চলছে। খাওয়াদাওয়া শেষে সবাই যার যার রুমে এখন। স্রোত কিছু একটা বলতে চাচ্ছে কিন্তু কেমন যেন জড়তা কাজ করছে তার৷ অন্বয় বিষয়টা খেয়াল করল। সে স্রোতের কাছে এসে বলল,
-“কিছু বলবি?”

স্রোত কীভাবে কথাটা বলবে বুঝতে পারছে না। লজ্জা লাগছে ভীষণ। তারপরও মনে সাহস জুগিয়ে লাজলজ্জা দূরে রেখে বলল,
-“আপনি চাইলে আমার সাথে এক বিছানায় থাকতে পারেন।”

অন্বয় বাঁকা হেসে বলল,
-“কেন আদর চাই বুঝি?”

এমন কথায় স্রোতের মুখ লাল হয়ে গেল। সে দূরে সরে গিয়ে বলল,
-“এজন্যই আপনাকে কিছু বলতে মন চায় না। বিয়ের পর থেকে আপনি সোফায় ঘুমাচ্ছেন, দেখতেও তো কেমন খারাপ লাগে। তাই বলেছিলাম আর আপনার মুখে যতো অসভ্য কথা!”

-“আমি মানুষটাই তো তোর কাছে অসভ্য। তাহলে আমার কথাবার্তা অসভ্য হবে না?”

-“অসভ্য হয়েও লাভ নেই। আপনাকে ছুঁতে দিলে তো!”

-“কেন? তোর উপর আমার সম্পূর্ণ অধিকার আছে।”

-“আপনি কী বলেছিলেন মনে নেই? আমার প্রশ্নের উত্তর কিন্তু আপনি এখনো দেননি।”

-“ও আচ্ছা। এই কারণ তাহলে? তোর প্রশ্নের উত্তর দিলে তুই আমায় আদর করতে দিবি?”

স্রোত লজ্জায় শেষ হয়ে যাচ্ছে। লোকটা এমন কেন? সব কথা কি মুখো বলা যায়? অন্বয় বলল,
-“নীরবতাই সম্মতির লক্ষণ। ওকে তাহলে আমি তোর প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি। তোর প্রশ্ন তো একটাই যে বাসর রাতে আমি কেন তোর সাথে খারাপ ব্যবহার করেছিলাম তাই না?”

-“হ্যাঁ।”

-“বিয়ের দিন আমার নজর কিন্তু তোর উপরই ছিল। শুরু থেকেই লক্ষ করছিলাম তোর মন অনেক খারাপ। মুখে কোনো হাসি নেই। তাই মামিকে আড়ালে জিজ্ঞেস করেছিলাম তোর মন খারাপের কারণ। তখন মামি বলল যে অর্ক না আসায় নাকি তোর মন খারাপ। ব্যস, তখন থেকেই আমার রাগ। এই অর্কটাকে তো আমার একদমই সহ্য হতো না, তার উপর তুই ওর জন্য মন খারাপ করেছিলি। যার জন্য আমার সমস্ত রাগ তোর উপর গিয়ে পড়ে। ভাবলাম আমি যে তোর উপর রেগে আছি সেটা বুঝানোর জন্য কিছু একটা করতে হবে। তাই সে রাতে তোকে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে বলেছিলাম। এর পিছনে অবশ্য আরও একটা কারণ ছিল। আমি চাচ্ছিলাম তুই আমার উপর অধিকার খাটা। অধিকার খাটিয়ে বল যে না আমি কেন এ রুম হতে বের হবো? এ রুম আজকে থেকে আমারও। কিন্তু তুই রুমে থেকে গেলি ঠিকই কিন্তু অধিকার খাটিয়ে না, লোকলজ্জার ভয়ে। কেন তুই সেদিন আমার উপর অধিকার খাটালি না, স্রোত? উল্টো বলছিলি, তোর নাকি এ রুমে থাকার কোনো অধিকার নেই!”

স্রোত অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে অন্বয়ের দিকে। এই তাহলে মূল কারণ? কিন্তু এখানে তার দোষটাই বা কী? সে কি জানতো যে তার অন্বয় ভাই তাকে সেই ছোট থেকে ভালোবাসতো? সে বলল,
-“শুনুন, প্রথমত আমার মন খারাপ অর্কের জন্য ছিল না। আমি আসলে এই বিয়েতে রাজি ছিলাম না। কেবলমাত্র ফুফু আর মায়ের জোরাজুরিতে রাজি হয়েছি। কারণ, আমার ধারণা ছিল যে আপনি আমায় দেখতে পারেন না। কিন্তু আপনি যে আমায় সেই ছোট থেকে ভালোবাসতেন তা কি আমি জানতাম?”

-“এখন তো জানিস।”

-“জানি তো!”

-“ভালোবাসিস আমায়?”

-“আমাকে দেখে আপনার কী মনে হয়?”

-“আমার তো মনে হয় তুই আমায় ভালোবাসিস না।”

-“কেন? আমি আপনার সাথে কী এমন করেছি যে আপনার এমন মনে হলো?”

-“তুই সবসময় আমাকে দূরে সরিয়ে রাখিস।”

-“দূরে সরিয়ে রাখলেই আপনার কেন দূরে থাকতে হবে?”

-“তাহলে কাছে আসতে বলছিস?”

এ পর্যায়ে স্রোত কিছু না বলে লাজুক ভঙ্গিতে হাসলো। অন্বয় দ্রুত কদমে এগিয়ে এসে স্রোতকে পাঁজা কোলে তুলে নিল। লাইট অফ করে ডিম লাইট জ্বালিয়ে বিছানার দিকে এগোতে লাগলো। স্রোতকে আলতো করে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে নিজেও স্রোতের উপর আধশোয়া হলো। স্রোতের গালে স্লাইড করতে করতে বলল,
-“আজ তুই সম্পূর্ণরূপে আমার হবি। আমাদের মাঝে আর কোনো দূরত্ব থাকবে না।”

স্রোত কিছু বলতে যাচ্ছিল তার আগেই ওর ঠোঁটের উপর এক আঙুল রেখে অন্বয় বলল,
-“কোনো কথা নয়।”

তারপর মুহূর্তের মাঝেই স্রোতের অধরে নিজের অধর মিলিয়ে দিল অন্বয়। সেই স্পর্শ ছড়ালো সর্বাঙ্গে। দুটি দেহের মিলনের পাশাপাশি দুটি হৃদয়, দুটি মনেরও যেন মিলন ঘটলো পূর্ণাঙ্গরূপে। দুটি হৃদয়ের ভালোবাসা পূর্ণতা পেল আজ।

______________________

সময় ও স্রোত কারো জন্য অপেক্ষা করে না। দেখতে দেখতে কেটে গেল বেশ কয়েক বছর। এর মাঝে অন্বয় ও স্রোতের কোলজুড়ে এসেছে এক কন্যাসন্তান। অন্বয়ের নামের সাথে মিলিয়ে নাম রাখা হয়েছে অন্বেষা। বয়স পাঁচ বছর। গুটি গুটি পায়ে সে সারা বাড়ি মাতিয়ে রাখে। ভীষণ চঞ্চল ও দুষ্টু এই মেয়েটা পরিবারের সকলের চোখের মণি। সকলে যেন তাকে চোখে হারায়।

দুপুরে খাবারের সময় টেবিলে সকলে উপস্থিত থাকলেও আলতাফ নেই। এদিকে সবাই থাকলেও দাদাকে ছাড়া কোনোমতেই খাবে না অন্বেষা। স্রোত ও ফারজানা বেগম মিলে টেবিলে খাবার সাজাচ্ছিলেন। অন্বেষা স্রোতকে জিজ্ঞেস করল,
-“মা, দাদা কোথায়? দাদাকে দেখছি না তো!”

স্রোত গোস্তের তরকারির বাটিটা টেবিলে রেখে বলল,
-“আমিও তো দেখছি না, মা। মনে হয় রুমে গেছে। তুমি গিয়ে দেখে আসো তো।”

ফারজানা বেগমও বললেন,
-“হ্যাঁ, দাদুভাই যাও। গিয়ে একদম ধরে নিয়ে আসবে। আমিও তো আর উপরে যাই নি, খেয়াল করিনি তেমন।”

অন্বেষা একছুটে আলতাফের রুমে এসে থামলো। দেখলো তার দাদাভাই বিছানায় শুয়ে আছে। ঘুমাচ্ছে মনে হয়। এই দুপুরবেলা কেউ ঘুমায়? বিষয়টা তাকে ভাবালো খুব। সে একবার ভাবলো ঘুমের মধ্যে ডাকা ঠিক হবে না, পরক্ষণেই মনে পড়লো দাদাভাই তো খায়নি। না খেয়ে থাকলে তো অসুস্থ হয়ে পড়বে। না, না দাদাকে ডাকতে হবে। সে আলতাফের কাছে গিয়ে মাথার কাছে বসে ডাকলো,
-“দাদাভাই, ও দাদাভাই! উঠো, খাবে না? দুপুরের খাওয়ার সময় হয়ে গিয়েছে তো!”

আলতাফ ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালেন। উনার তাকাতেও ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। মাথাটা কেমন ভারী হয়ে আছে। অন্বেষা দাদার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে ফের ডাকলো। একসময় তার হাত এসে কপালে লাগে। কপালে হাত রাখতেই সে অনুভব করলো কপাল ভীষণ গরম হয়ে আছে। একদম পুড়ে যাচ্ছে যেন। সে আঁতকে উঠে বলল,
-“এ কি দাদাভাই! তোমার তো অনেক জ্বর! মনে হচ্ছে শরীর একদম পুড়ে যাচ্ছে!”

আলতাফ ধীর কণ্ঠে বললেন,
-“দাদুভাই, তোমার দাদুকে একটু ডেকে নিয়ে এসো।”

খুবই ধীর কণ্ঠে বলায় অন্বেষা শুনতে পায়নি। সে এবার চট করে আলতাফের রুমে থাকা ওয়াশরুমে ঢুকল। তার মনে আছে, কিছুদিন আগে তার যখন অনেক জ্বর উঠেছিল, তখন মা তাকে সারারাত জেগে জলপট্টি দিয়েছে। এখন সে ও তার দাদাকে জলপট্টি দিবে। মা যেমন তাকে ভালোবেসে তার সেবা করেছে, তেমনি সে ও তো তার দাদাকে খুব ভালোবাসে। তাহলে সে সেবা করবে না?

কিন্তু সে কীসে করে পানি নিবে? মাকে দেখেছিল একটা বড়ো বাটিতে করে পানি নিয়ে এসেছিল। এখন সে বড়ো বাটি পাবে কোথায়? তার জন্য এখন রান্নাঘরে গিয়ে খুঁজাখুঁজি করতে হবে। তার চেয়ে বরং এক কাজ করা যাক, এই পানি ভর্তি বালতিটাকেই রুমে নিয়ে জলপট্টি দেওয়া যাবে। বালতি রুমে আনতে তাকে বেশ কসরত করতে হয়েছে। ধাক্কাতে ধাক্কাতে আনতে হয়েছে তাকে। পথে বেশ কয়েক জায়গায় পানিও পড়েছে। বালতি খাটের কাছে এনে এবার সে কাপড় খুঁজতে লাগলো। কিন্তু জলপট্টি দেওয়ার মতো কোনো কাপড় পাচ্ছে না সে। তখনই মাথায় এলো তার, আচ্ছা, মায়ের ওড়না দিয়ে জলপট্টি দিলে কেমন হয়? ওড়না দিয়ে তো দেওয়ায় যায়। সে ফের একছুটে বাবা-মায়ের রুমে গিয়ে স্রোতের একটা ওড়না নিয়ে আসলো। তারপর ওড়না ভিজিয়ে কোনোমতে জলপট্টি দিতে লাগলো।

কপালে ঠাণ্ডা কিছু অনুভব হতেই আলতাফ ফের চোখ খুলে তাকালেন। দেখলেন উনার ছোট্ট নাতনি খুব যত্নের সাথে উনার কপালে জলপট্টি দিচ্ছে। উনার মন জুড়িয়ে যায় এতে। তিনি বললেন,
-“দাদুভাই, তুমি কষ্ট করে জলপট্টি দিচ্ছো কেন? তোমার দাদুকে বলো আসতে।”

-“কেন? দাদুর কেন আসতে হবে? আমি আছি না? আমার দাদার জন্য তার নাতনি আছে। বুঝেছো?”

আলতাফ হেসে বললেন,
-“বুঝেছি। আমার সোনা দাদুভাই! অনেক বড়ো হও জীবনে।”

অনেকক্ষণ হয়ে গেল অন্বেষা, আলতাফ কেউই আসছে না দেখে স্রোত এলো নিজের ফুফার রুমে। এসে এমন দৃশ্য দেখে সে থমকে গেল। অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল সে। তার ছোট্ট সোনাটা কবে এতো বড়ো হয়ে গেল? নিজের সন্তানের এমন দায়িত্বশীলতা দেখে মন জুড়িয়ে গেল তার। সে দ্রুত কদমে এগিয়ে এসে বলল,
-“বাবা, আপনার কি জ্বর এসেছে? আমাদের একবার ডাকবেন না!”

আলতাফ বললেন,
-“তোমার শাশুড়িকে ডাকতে বলেছিলাম কিন্তু তোমার পাকনী মেয়ের কাণ্ড দেখো। নিজে বালতি টেনে এনে আমায় জলপট্টি দিচ্ছে।”

স্রোত হাসলো। অন্বেষাকে সরিয়ে বলল,
-“অনেকক্ষণ তো দিলে, এবার আমি দেই? তুমি নিচে গিয়ে খেতে বসো।”

অন্বেষা জেদ ধরে বলল,
-“না, আমি দাদাকে ছাড়া খাব না। তুমি যতক্ষণ জলপট্টি দিবে, ততক্ষণ আমি এখানে বসে থাকবো।”

-“আচ্ছা, সোনা।”

____________________

অন্বয় অফিস থেকে ফিরলো রাত আটটার পর। এসে ফ্রেশ হয়ে রাতের খাবার খেয়ে এখন নিজের রুমে ল্যাপটপে কাজ করছে। এর মাঝেই অন্বেষা ছুটে এসে অন্বয়ের গলা জড়িয়ে ধরলো। বলল,
-“পাপা, আমার জন্য আজ তুমি কিছু আনোনি?”

অন্বয় ল্যাপটপটা সাইডে রেখে মেয়েকে কোলে বসিয়ে বলল,
-“আনবো না কেন? আমার মায়ের জন্য আমি কিছু না এনে থাকতে পারি? আজ তোমার জন্য স্পেশাল কিছু এনেছি।”

অন্বেষা উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
-“কী এনেছ? তাড়াতাড়ি বলো, পাপা!”

অন্বয় এবার সেই কাঙ্ক্ষিত জিনিসটা নিয়ে এসে বলল,
-“এই দেখো, তোমার পছন্দ হয়েছে?”

অন্বেষার চোখদুটো চিকচিক করে উঠলো। অন্বয়ের হাতে বিশাল এক টেডিবিয়ার। অন্বেষা অতিমাত্রায় আনন্দিত হয়ে বলল,
-“ওয়াওও! কী সুন্দর! থ্যাংকিউ পাপা! ইউ আর দ্যা বেস্ট!”

এই বলে সে অন্বয়ের গালে চুমু দিল। অন্বয়ও মেয়ের কপালে চুমু দিয়ে বলল,
-“তোমার দাদা, দাদুকে দেখাবে না, মা?”

-“হ্যাঁ, অবশ্যই। আমি এক্ষুণি যাচ্ছি।”

অন্বেষা ছুটে গেল। তখনই রুমে প্রবেশ করল স্রোত। অন্বয়ের কাছে এসে বলল,
-“মেয়েকে দেখলাম টেডিবিয়ার পেয়ে সেই খুশি!”

-“হুম, ওর পছন্দের জিনিস। আমি আমার মেয়ের খুশির জন্য সব করতে পারি। আমি সবসময় ওর মুখে হাসি দেখতে চাই।”

এই বলে সে উঠে দাঁড়ালো। স্রোতের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
-“আপনার জন্যও গিফট আছে, ম্যাডাম।”

স্রোত অবাক হয়ে বলল,
-“আমার জন্য?”

-“ইয়েস!”

এই বলে সে স্রোতের হাত ধরে টেবিলের কাছে এনে বলল,
-“এই দেখুন, এই অধমের গিফট পছন্দ হয়েছে?”

স্রোত তাকিয়ে দেখলো টেবিলের উপর একগাদা ডায়েরি। একটার উপর একটা রাখা। পাশেই কতগুলো কলম। এতো এতো ডায়েরি দেখে স্রোত বিস্মিত হয়ে গেল। সে বিস্ময় নিয়ে বলল,
-“এতোগুলো ডায়েরি?”

অন্বয় বলল,
-“হুম, তোর গল্প লেখার জন্য।”

-“আমি তো অনেকদিন ধরে লেখালেখি করি না। এসবের কী প্রয়োজন ছিল?”

-“আমি চাই তুই আবার লেখালেখি কন্টিনিউ কর। তুই তোর শখের কাজ থেকে দূরে থাকবি, এটা আমি চাই না। তুই একটা গল্প লিখবি আমাদের তিনজনকে নিয়ে।”

স্রোত হেসে বলল,
-“আচ্ছা। সেই গল্পে আপনাকে গম্ভীর, আনরোমান্টিক চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করব।”

-“কীহ? আমি গম্ভীর, আনরোমান্টিক?”

-“একদমই তাই।”

-“আচ্ছা? তাহলে তো প্রুভ করতেই হয় যে আমি আসলে কতোটা রোমান্টিক!”

এই বলে অন্বয় দরজার ছিটকিনি তুলে দিল। স্রোত সেদিক চেয়ে বলল,
-“এই, একদম কাছে আসবেন না। আমি তো আপনার সাথে মজা করেছি।”

অন্বয় স্রোতের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলল,
-“বাট আ’ম সিরিয়াস।”

তারপর এক নিমিষেই স্রোতকে কোলে তুলে নিল সে। রচিত হলো এক ভালোবাসাময় মুহূর্তের, দুটো হৃদয় কাছে আসার গল্পের।
এখন মাঝরাত। বেলকনিতে অন্বয় স্রোতকে নিজের কোলে বসিয়ে রেখেছে। স্রোত ছুটাছুটি করছে কিন্তু অন্বয়ের সাথে পেরে উঠছে না। অন্বয় একটু রাগ হয়ে বলল,
-“চুপ করে বসে থাক, স্রোত!”

-“কী সমস্যা আপনার? তখনও আপনার অত্যাচারে ঘুমাতে পারিনি, এখন আবার এসব কী ঢং শুরু করেছেন?”

-“আমার সাথে থাকতে হলে এসব ঢং সহ্য করতে হবে।”

তারপর কিছুক্ষণ নীরবতা। অন্বয় স্রোতের চুলে মুখ ডুবিয়ে রেখেছে। হঠাৎ সে আদুরে স্বরে ডাকলো,
-“স্রোওওওত!”

এমন ডাকে স্রোতের শরীর কেমন কেঁপে উঠে। সে জবাব দেয়,
-“জ..জি?”

-“ভালোবাসি। আমার এই স্রোতরাণীকে ভীষণ ভালোবাসি। তোকে ছাড়া আমি নিজেকে কল্পনা করতে পারি না, দম বন্ধ হয়ে আসে। তুই আমার বড্ড শখের নারী, আমার কলিজা।”

কেন জানি, স্রোতের দুচোখ অশ্রুসজল হলো। সে অন্বয়ের বুকে মাথা রেখে বলল,
-“এতো ভালোবাসেন কেন আমায়?”

-“ভালোবাসার কোনো কারণ হয় না। আমি তোকে কোনো কারণ ছাড়াই ভালোবাসি, সারাজীবন বাসব। একটা কথা জানিস, আমাদের মনে কখন কার প্রতি ভালোবাসা জন্মে তা আমরা নিজেরাও টের পাই না। সেক্ষেত্রে আমি তো ছোট ছিলাম, বুঝতে পারিনি। তখন শুধু এটাই মনে হতো যে তোর উপর শুধু আমার অধিকার থাকবে। অন্য কেউ তোর উপর আমার মতো অধিকার খাটাক, এটা আমি একদমই সহ্য করতে পারতাম না। তারপর, যতো বড় হতে লাগলাম ততোই বুঝতে পারলাম যে আমি আসলে তোকে কতোটা ভালোবাসি। তুই শুধু আমার, আমি কখনো কোনোদিন তোকে কারোর হতে দিব না।”

-“আমি অন্য কারোর হবোও না!”

-“তুই যেদিন থেকে আমায় ভালোবাসতে শুরু করলি, বিশ্বাস কর আমার তখন নিজেকে বিশ্বের সবচেয়ে সুখী মানুষ মনে হচ্ছিল।”

স্রোত কিছু না বলে হাসলো। অন্বয় স্রোতকে আরও শক্ত করে নিজের সাথে মিশিয়ে রাখলো। স্রোত গুটিশুটি হয়ে অন্বয়ের বুকে লেপ্টে আছে। কাছাকাছি সংস্পর্শে দুটো হৃদয়ই পরম শান্তি অনুভব করছে। ভালোবাসা কখনো পুরোনো হয় না বরং দিনকে দিন বৃদ্ধি পায়। স্রোতের প্রতিও অন্বয়ের ভালোবাসা বেড়েই চলেছে। এভাবেই চলতে থাকুক তাদের ভালোবাসার গল্প, প্রেমময় মুহূর্ত।

(সমাপ্ত)