#বকুলের_মালা_শুকাবে—৪ (এইজ ডিফারেন্ট)
#শার্লিন_হাসান
রাগিনী হাতের কাছে থাকা লোশনের বোতলটা অভিদের মুখ বরাবর ছুঁড়ে মেরে চিৎকার করে বলে,”বুড়ো তোর সংসার আমি করব না। অসভ্য কোথাকার।”
অভিদ পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে তাতে আগুন জ্বালিয়ে ফুঁকতে শুরু করে। সিগারেটের বাজে গন্ধে রাগিনীর কাশি উঠে যায়। ও এই গন্ধটা একদমই সহ্য করতে পারেনা। রাগে জেদে অভিদকে খু ন করতে ইচ্ছে হচ্ছে। একে তো বুড়ো লোক তারউপর তার অপছন্দের কাজ, সিগারেট খাচ্ছে হরহামেশাই। রাগিনী গহনাগুলো খুলে নেয়। জামাকাপড় তো আনেনি নিজের। অভিদ দিয়েছে কি-না দেখা হয়নি ওর। কিছুক্ষণ চুপ থেকে জিজ্ঞেস করে, “আমার শাড়ি চেঞ্জ করব?”
“আমি কী হেল্প করব?”
চোয়াল কুঁচকে জবাব দেয় অভিদ। রাগিনী রাগে গিজগিজ করতে করতে বলে, “তোর সাহায্য আমার প্রয়োজন নেই বুড়ো। আর কোন ড্রেস আছে কী?”
“ড্রেস দিয়ে কী করবে তুমি?”
“নাচব।”
“শাড়ি খু লে নাচতে পারো। তোমার বেটার ফিল হবে, আমার দেখতেও সুবিধা হবে।”
রাগিনী এবার তেতে উঠে। এগিয়ে এসে অভিদের কলার চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “মনে রাখিস বেঁচে থাকলে আমি একদিন তোকে খু ন করব।”
“হুম করিও। এখন কী সিগারেটে একটা টান দিয়ে মাথা ঠান্ডা করবে?”
“তোকে দেখলেই আমার মাথা গরম হয়ে যায় বুড়ো। কথা বলবিনা তুই।”
“লাগেজে ড্রেস আছে। কম্ফোর্ট অনুযায়ী পছন্দ মতো একটা নিয়ে চেঞ্জ করো। রাত অনেক হয়েছে ঘুমাতে হবে।”
“তোর সাথে আমি ঘুমাব না।”
অভিদ জবাব দেয়না। রাগিনী তার কলার ছেড়ে দিয়ে লাগেজ থেকে জামা বের করে চলে যায় চেঞ্জ করতে। অভিদ সিগারেট অর্ধেক টেকে বাকীটা ফেলে দেয়। রাগিনী আসতে ও আড়মোড়া ভে’ঙে , গায়ে কমফোর্টার টেনে শুয়ে পড়ে। রাগিনী হতভম্ব হয়ে আসলে, অভিদ ডান হাতে বালিশটা তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে, “বেড ছাড়াও রুমে অনেক জায়গা আছে,নিজের পছন্দ মতো একটা চুজ করে নিও।”
“আমার বেড লাগবে। বেড ছাড়া ঘুমাতে পারিনা আমি। আপনি বেড ছাড়া অন্য জায়গা চুজ করুন।”
“বউয়ের সাথে এক বেডে ঘুমাতে আমার কোন আপত্তি নেই। তোমার থাকলে সেটা তোমার সমস্যা আমার না। আর হ্যাঁ,ঘুমানোর সময় কথাবার্তা বা শব্দ করা আমার পছন্দ না। কথাটা মাথায় রাখবে। গুড নাইট।”
রাগিনী বিরক্ত হয়ে তাকিয়ে রয় অভিদের দিকে। বজ্জাত লোক রুমে একটা মাত্র সোফা রেখেছে তাও একসীটের। ও বিরক্ত হয়ে অভিদের গা থেকে কম্ফোর্টার টেনে নিয়ে, সেটা মেঝেতে অর্ধেক বিছিয়ে নেয়। বাকী অর্ধেক গায়ে টেনে শুয়ে পড়ে।
অভিদ সিদ্দিকী নাক মুখ কুঁচকে পাশ ফিরে রাগিনীর দিকে তাকায়। সে তাকে পিছ দিয়ে শুয়ে আছে। অভিদ আর কিছু বলেনি। চোখ মেলে এসির দিকে দৃষ্টি স্থির করে। মূলত অপেক্ষা করছে, রাগিনী কখনো ঘুমাবে।
মেঝেতে শুয়ে রাগিনীর স্বস্তি পাচ্ছেনা। এছাড়া হুটহাট তার কী যে ভীষণ কান্না পাচ্ছে। যার হারায়, যে হারায় সেই তো বুঝে কষ্ট বাকীরা কী বুঝবে? অভিদের সাথে বাকী জীবনটা এভাবে একঘেয়ে কাটিয়ে দিতে হবে? সত্যি কী তাই? ও কী করে অভিদকে বাকী জীবন সহ্য করবে। ব্যাটা বুড়ো লোক একটা। কার চোখে কীরকম রাগিনী সেটা জানেনা কিন্তু নিজের বয়সের ফারাক দেখলে অভিদকে তার কাছে নিত্যান্ত বুড়ো লোকই মনে হয়। চোখের পানি মুছে ঘুমোনোর চেষ্টায় মত্ত হয় রাগিনী। কিন্তু দুঃখের বাঁধ আজ আর থামছে না। ও বিরক্ত হয়ে শোয়া থেকে উঠে যায়। একা একাই ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ায়। মধ্যরাতের ঠান্ডাটা ভালো ভাবেই তার গায়ে লেগে যায়। দু-হাতে নিজেকে জড়িয়ে ধরে দূর আকাশের দিকে তাকায় ও। হাউমাউ করে কান্না করতে মন চাচ্ছে। ভীষণভাবে কান্না পাচ্ছে, ভীষণ রকমের কান্না পাচ্ছে। মেঝেতে দপ করে বসে পড়ে দুই হাঁটুতে মুখ গুঁজে কাঁদতে থাকে ও। অভিদ সিদ্দিকী নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থেকে রাগিনীর কান্না দেখছে। কিছু মূহুর্ত কাটিয়ে দিয়ে ও গলা খাঁকারি দিলে রাগিনীর কোন হুশ জ্ঞান ফিরে না। অভিদ দু-হাত পেছনে গুঁজে বলে, “কিছু না করেই কান্না করছ? লোকে শুনলে কী ভাববে বলো তো? আমায় কুৎসিত মানসিকতার মানুষ ভাববে যে, অভিদ সিদ্দিকী বাসর রাতেই সব উশুল করে নিয়েছে।”
“আমি ম রে যাব। আপনাকে আমি মানিনা। এই বিয়ে মানি না। আপনার সাথে বাকি জীবন আমি কাটাতে পারব না।”
“এখনি ম র তে চাও নাকি ক’দিন পর প্ল্যান করে? তুমি চাইলে শর্টকাটে ম রার পদ্ধতি বের করে দিতে পারি আমি।”
“আপনার থেকে এসবের কিছু জানতে চেয়েছি আমি?”
রাগিনী রাগ দেখিয়ে জবাব দেয়। অভিদ নিঃশব্দে অন্ধকারের মাঝে রাগিনীর পাশে এসে মেঝেতে বসে যায়। অন্ধকারে দু’জন মানুষ দু’জনের দিকে একনজর তাকায়। অভিদ সিদ্দিকী চোখ বন্ধ করে ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে বলে, “আমি তোমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে কখনোই তোমাকে স্পর্শ করব না রাগিনী। আমার সাথে ভালো না লাগলে তুমি সময় নিতে পারো। তবে আমার বাঁধন ছাড়ার ভাবনা মাথায়ও আনিও না।”
রাগিনী জবাব দেয়না। কেবল তাকিয়ে থাকে অভিদের দিকে। অভিদ মাথা নাড়িয়ে বলে, “আগামী কালকে তোমায় চৌধুরী বাড়িতে দিয়ে আসব। তুমি খুশি তো?”
“না। আমি ওই বাড়িতে যাব না। কখনোই না। ম রে গেলেও না।”
“তাহলে কোথায় যাবে তুমি?”
“জানি না আমি।”
নিরবতা বসতে অভিদ জবাব দেয়, “এখানে থাকবে?”
“ভেবে দেখব।”
অভিদ জবাব দিলোনা। রাগিনী উঠে দাঁড়ায় । অভিদ তার পেছন দিয়ে রুমে আসে। বিছানা গুছিয়ে দু’টো বালিশ দু’দিকে রেখে মাঝ দিয়ে কোলবালিশ এবং কুশন দিয়ে বিরাট দূরত্ব তৈরি করে। রাগিনীর দিকে তাকিয়ে বলে, “তোমার যেটা ভালো লাগে।”
রাগিনী জবাব দেয়না। একপাশপ শুয়ে কম্ফোর্টার গায়ে টেনে নেয়। অভিদ সূক্ষ্ণ দীর্ঘ শ্বাস ফেলে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ে।
★★★
বেলা সাড়ে দশটায় ঘুম ভেঙেছে রাগিনীর। উঠে অভিদকে আশেপাশে কোথাও পায়নি সে। আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসতে দেখে নাশতা রেখে দেওয়া হয়েছে তার জন্য। তা দেখে মৃদু হাসে রাগিনী। উঠে ফ্রেশ হয়ে আসতে অভিদের আগমন হয়। সাদা একটা শার্ট গায়ে জড়ানো। তাও উপরের দু’টো বোতাম খোলা। একদম সাদামাটা টাইপের চলা। রাগিনী নাশতা নিয়ে বসতে অভিদ ফোন স্ক্রোল করতে করতে বলে, “বউকে প্রথম দিন বড় মাছ কাটতে হয়। যেকোন একটা আইটেম রান্না করতে হয় সবার জন্য। এটা আমাদের ওইদিকের নিয়ম।”
“আমি মাছ কা টতে জানি না।”
“রান্না?”
“কখনো রান্না করিনি তাই আইডিয়া নেই।”
“আচ্ছা আমি হেল্প করব।”
“মাছের গন্ধ আমার সহ্য হয়না। বমি আসে। শুনেছেন আপনি? আমি এসব থার্ডক্লাশ রীতিনীতি পালন করতে পারব না। বিয়েটা আমি করিনি, আপনি জোর করে করিয়েছেন সেজন্য আপনার সব কথা আমি শুনতে পারব না। কখনই না।”
“ঠিক আছে তাহলে তোমাকে একাই মাছ কেটে রান্না করতে হবে। কেউই হেল্প করবে না।”
“পারব না আমি।”
অভিদ সিদ্দিকী জবাব দেয়না। সকালে তার নানী, খালারা এসেছে। বিয়েটা হুট করে হওয়ায় কারোরই আসা হয়নি। রাগিনী নাশতা সেরে নিতে অভিদের নানী হোসনে আরা আসেন। রাগিনী তার দিকে একনজর তাকাতে অভিদ মৃদু ধমক দিয়ে বলে, “সালাম দাও।”
“আসসালামু আলাইকুম।”
রাগিনী সালাম দেয়। হোসনে আরা সালামের জবাব দিয়ে বলেন, “বউ তো মাশাআল্লাহ সুন্দর। একবারে চাঁদের মতো। ফাহমিদা কেন যে কান্নাকাটি করছে।”
দু’জন চুপচাপ কথাগুলো শোনে। রাগিনী অবশিষ্ট থাকা একটু ভদ্রতা থেকে বলে, “বসুন আপনি। বুড়ো মানুষ এতোক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে আবার অজ্ঞান হয়ে যেতে পারেন।”
“ম্যানার্স শেখোনি?”
আবারো ধমকে বলে অভিদ। রাগিনী মুখ বাঁকিয়ে বলে, “না শিখিনি। তাতে আপনার কী?”
“এরকম অভদ্রতা আমার বাড়িতে চলবে না। শুনেছ তুমি?”
হোসনে আরা ধমকে বলেন, “আহ্, ওর বয়স অল্প বুঝেনি। আর আমি তো বুড়ো হয়েছি এ আর এমন কী কথা?”
অভিদ তাও রাগিনীর দিকে চোখ গরম করে তাকিয়ে রুম থেকে বেরোয়। হোসনে আরা রাগিনীকে নিয়ে রুমের বাইরে আসেন। এক ঝাঁক মহিলা দল দেখে রাগিনী চোখমুখ কুঁচকে ফেলে একদম। তখন একজন ঠেস মেরে বলে, “এসেছে সিদ্দিকী পরিবারের সুলতানা।!
” জ্বী ধন্যবাদ। সম্বোধনটা আপনার মনের থেকেও হাজারগুণ সুন্দর। এতো সুন্দর নাম সিলেক্ট করলেন কীভাবে?”
তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে অভিদের ফুপি আফিয়া সিদ্দিকী। তিনি নাক-মুখ কুঁচকে বলেন, “ভদ্রতা শেখোনি কখনো?”
“আপনি শিখাবেন তাই শিখিনি আন্টি।”
তখন অভিদের আগমন হয়। ও রাগিনীকে ধমকে বলে, “আর একটা কথাও নয়। এতো শর্ট টেম্পার কারোর হয়? ফুপিকে স্যরি বলো।”
“আমি কখনো কাউকে স্যরি বলিনি। এছাড়া ঠেস মেরে কথার শুরুটা উনি করেছেন আমি না।”
“ছিঃ,ছিঃ অভিদের বউয়ের ব্যবহার এতো খারাপ কেন? এই জন্যই বলে, জাতের মেয়ে কালোও ভালো।”
“তো আপনাদের ছেলেকে বলতেন জাতের মেয়ে কালোই বিয়ে করতে। আমার মতো সুন্দরীকে বিয়ে করতে কে বলেছে? সেই তো সেধে সেধে বিয়েটা করতে গিয়েছিল।”
“আপা এই মেয়ের যা কথা। তোমার সাথে বনিবনা করে খেতে পারবেনা।”
বোনের কথায় ফাহমিদা সিদ্দিকী ভেতরে ভেতরে আরো জ্বলছেন। অভিদ এটা কী মেয়ে বিয়ে করে এনেছে? আদব কায়দা কিছু নেই মেয়েটার। এরকম উশৃংখল, উগ্র মেয়ে মানুষও হয়? এতোটা মুখের উপর বেয়াদবি ঘরের বউয়ের শোভা পায়? তাও বিয়ের যায়নি একদিন। ফাহমিদা তেতে উঠে বলেন, “রুপ নিয়ে অহংকার সবারই কম বেশি থাকে নতুন না। কিন্তু রুপের সাথে গুণ না থাকলে ওই রুপ কোন কাজেই আসেনা। তা মা রাগিনী, মাছ কাটতে পারো তো? এটা আমাদের রীতি।”
“চেষ্টা করতে পারি।”
বাজারের বড় কাতলামাছটা আনা হয়েছে। সেটা দিয়ে বসানো হয়েছে রাগিনীকে। রাগিনী দু’হাতে মাছটা ধরতে হিমশিম খাচ্ছে। এতো ভারি এটা। তারউপর শক্তি প্রয়োগ করে কা ট তে হবে। মাছের গন্ধে বমি আসার উপক্রম তার। তবুও চেষ্টা করে দা য়ে মাছের মাথা কা’ ট তে বল প্রয়োগ করতে অসাবধানতায় হাতটাই কে টে ফেলে রাগিনী। মূহুর্তে রক্তে ভেসে যায়। আফিয়া সিদ্দিকী মুখ বাঁকিয়ে কানাঘুষা করে বলেন, “বেয়াদবি র ফল।”
#চলবে

