#বকুলের_মালা_শুকাবে—৯
#শার্লিন_হাসান
রাগিনী বসতেই অভিদ সিদ্দিকী তার উপর নিচ ভালো মতন পরখ করে বলে, “তোমাকে যা ভেবেছিলাম তার কোন অংশে কম নও তুমি।”
“মানে?”
ব্রু জোড়া কুঁচকে আসে আপনাআপনি। অভিদ সিদ্দিকী এবার বেহায়ার মতো করে বলে, “আমাকে সামলানোর কথা বলছি। বাই দ্যা ওয়ে, তোমার ম্যাজার্মেন্ট জানি আমি।”
মূহুর্তে রেগে উঠে রাগিনী। অসভ্য ব্যাটা ছেলে ও ওর জীবনে কোনদিনও দেখেনি। মেজাজ প্রচন্ড খিটখিটে হয়ে থাকায় ও নিজেকে সামলাতে পারলোনা। আকস্মিক অভিদের ঘাড়ে কামড় বসিয়ে দেয়। এতো জোরে কামড় বসিয়েছে যে অভিদ একমুহূর্তের জন্য নড়তে ভুলে গেছে। রাগিনী ক্ষ্যাপা বাঘিনীর মতো আঙুল তুলে বলে, “ফা*ক ইয়্যু।”
অভিদ একমুহূর্তের জন্য খুশি হয়ে জিজ্ঞেস করে, “হুয়াট্স ইউর ফেইভরিট ফ্লেভার?”
রাগিনী এবার চিৎকার শুরু করে দেয়। অভিদ ভরকে যায়। রাগিনী ওর দিকে টেবিল ল্যাম্পটা ছুঁড়ে মারে। পরক্ষণে বুঝে, এখানে থাকলে রাগ কমবে বৈকি বেড়ে যাবে। সেজন্য ও দেরি না করে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। ওইদিকে অভিদের মনে জেনো প্রেম বসন্ত লেগেছে। ও তড়িঘড়ি রুম গুছিয়ে নেয়। দ্বিতীয় বার বাসর করার প্রস্তুতি হিসেবে। রাগিনী মুখ ফুটে বলেছে, বাসর সাজাতে ফুল না আনলে খারাপ দেখায়। সেজন্য ও ব্যাললনিতে চলে যায়। যেখানে সদ্য ফোটা বেলী এবং লাল ও গোলাপী রঙের অনেকগুলো গোলাপ রয়েছে। ও সেগুলো ছিঁড়ে রুমে নিয়ে আসে। প্রায় সাত আটটার মতো গোলাপ ও বেডের উপর রাখে। আর কয়েকটা পাপড়ি ছাড়িয়ে , খাটের উপর ছড়িয়ে দেয়। অপেক্ষা করতে থাকে রাগিনী কখন আসবে।
রাগিনী রুম থেকে বাইরে আসতে না আসতে আফিয়া সিদ্দিকী হুকুম করেন, “কী গো নতুন বউ, সকালে উঠে যে সবার জন্য নাশতা বানাতে হয় জানোনা?”
“আপনার বেশি প্রয়োজন হলে নিজে বানিয়ে খেয়ে নিন। আমি এই বাড়ির চাকর না যে সবার জন্য নাশতা বানাব।”
“বেয়া দব মেয়ে। ভদ্রতা শেখোনি জীবনে?”
“ভদ্রতা শিখেছি বলেই তো চুপ আছি। নাহলে আপনার চাপার দাঁত আর আমার জুতা দুটোই হাঙ্গা বসতো।”
আফিয়া সিদ্দিকী এবার মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যাওয়ার অবস্থা। ফাঁকা রুমটায় উনি আর রাগিনী ছাড়া কেউ নেই। রাগিনী অভিদের উপর থাকা এবং এই পরিবারের প্রতিটি সদস্যের উপর থাকা রাগ সবটা আফিয়া সিদ্দিকীর উপর ঢেলে দিয়েছে। মন অনেকটাই শান্ত মেজাজ খুবই ফুরফুরে। রাগিনী খেয়াল করে আফিয়া সিদ্দিকী চোখমুখ উল্টেপাল্টে নিচ্ছে। বোধহয় পড়ে যাবে। সত্যিই মহিলা পড়ে যেতে নিলে রাগিনী তাকে ধরে ফেলে।
আফিয়া সিদ্দিকী অস্পষ্ট স্বরে বলে, “এমন রাগী ধানিলংকা বাপের জন্মেও দেখিনি। নামের সাথে ব্যবহারটা পুরো মিলে গেছে।”
রাগিনী এবার প্রতিত্তোর করলো না। আফিয়া সিদ্দিকীকে বহু কষ্টে ধরে, সোফায় বসিয়ে দেয়। পানির জগ থেকে পানি নিয়ে চোখেমুখে হালকা ছিটা দেয়।
রান্না ঘর থেকে বেরুতে আফিয়া সিদ্দিকীর অবস্থা দেখে ফাহমিদা সিদ্দিকী দৌড়ে আসেন। এসে পাশে বসে জিজ্ঞেস করেন, “আফিয়া, চোখ খোলো কী হয়েছে তোমার?”
কোন সাড়াশব্দ দেয়না আফিয়া সিদ্দিকী। ফাহমিদা সিদ্দিকী চিৎকার করে বাড়ি ঘর তুলে ফেলছেন। যে যেভাবে পারছে ছুটে আসছে। এসে দেখে এই অবস্থা। ফাহমিদা সিদ্দিকী রাগিনীকে দোষারোপ করে বলেন, “এই মেয়ে কিছু একটা করেছে।”
“উনি সুস্থ হলে ওনার মুখ থেকে শুনে নিয়েন।”
“দেখেছো, মুখে মুখে কীভাবে কথা বলে।”
“কই! আমার মুখ তো আমার মুখের জায়গায় আছে কারোর মুখে মুখ লাগিয়ে কথা বলিনি। আপনি অযথা, হ্যারেস করা বন্ধ করুন শাশুড়ী আম ম্মুউউ।”
ফাহমিদা সিদ্দিকী চোখ গরম করে তাকালে রাগিনী হাসে। অভিদ সিদ্দিকী এবার রেগে ধমকে বলেন,”রাগিনী আমার পরিবারে এরকম মুখে মুখে তর্ক চলে না। কেউই এমন করেনা। বেয়াদ ব মেয়ে।”
রাগিনী তার কথা পাত্তা দিলোনা। আয়ান সিদ্দিকী ডাক্তারকে ডেকে আনলে, ডাক্তার আফিয়া সিদ্দিকীর প্রেসার মাপতে কপালে হাত দিয়ে বলেন, “প্রেসার অত্যান্ত হাই। কোন কারণে মাথা গরম হয়ে গেছে।”
“আপনি, মাইন্ড ফ্রেশ করার ঔষধ থাকলে লিখে দিন।”
রাগিনীর কথায় বাকিরা তার দিকে তাকায়। ডাক্তার মাথা নাড়ায়। একটা প্রেসক্রিপশন ধরিয়ে দিয়ে কিছুক্ষণ জ্ঞান বিধি দিয়ে তিনি চলে গেলেন। আয়ান ঔষধ আনতে চলে গেলে, ফাহমিদা সিদ্দিকী আফিয়া সিদ্দিকীর মাথায় তেল পানি দিয়ে দিয়ে তাকে নিয়ে রুমে চলে যায়। আদিবা কিচেন থেকে নাশতা আনে, আফিয়া সিদ্দিকীর জন্য। ও নিজেও মায়ের পিছু হাঁটে। এখন সবার নাশতা খাওয়া সময়। কিন্তু সবাই কাজে ব্যস্ত। আফিয়া সিদ্দকীর সেবা শেষে, একটু পর নাশতা দেওয়া হবে। রাগিনী দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে সবকিছু।
অভিদ তাকে বলে, “হাতে হাতে দু’টো কাজ করা যায়না? আক্কেল জ্ঞান নেই নাকি!”
“না নেই। আক্কলে বেছে একজনকে বেডে এনেছি। আর কিছু?”
“ইউ সিডিউসড মি বাই সেইং ‘ফাক ইউ’ অ্যান্ড দেন ওয়াকড আউট অভ দ্য রুম। লায়ার গার্ল।”
“কাম টু দ্য রুম,ইউ ওয়োন্ট মেইক ইট আউট অ্যালাইভ। মাইন্ড ইট।”
“এতো সময় ধরে ওসব করার মতো সময় নেই।
পরে ভেবে দেখছি কেমন? আপাতত মুড নেই।”
রাগিনী রাগে জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়ে। ও দাঁতে দাঁত চেপে দু’টো বিশ্রী গালি দেয় অভিদকে। মূহুর্তে ওর হাতটা খপ করে ধরে ফেলে অভিদ। খুব জোরে শক্ত করে হাত ধরায় রাগিনী ভীষণ ব্যাথা পায়। অভিদ রক্তচক্ষু করে বলে, “তোমাকে লাস্ট ওয়ার্নিং দিলাম, ব্যবহার আর মুখের ভাষা দুটো ঠিক করতে না পারলে কী করবো তোমার ধারণার ও বাইরে।”
রাগিনী মিডেল ফিঙ্গার দেখিয়ে পুনরায় বলে,
“ফা*ক ইয়্যু। ফা*ক ইয়্যুর ওয়ার্নিং। ফা*ক ইয়্যুর ম্যানার্স।”
অভিদ ঠাস করে চ ড় বসিয়ে দেয় রাগিবীর নরম গালে। রাগিনীও পাল্টা চ ড় বসাতে গেলে অভিদ ওর হাত ধরে জোরে ধাক্কা দিতে রাগিনী নিচে পড়ে যায়। তবে রাগ তেজ কোনটাই কমেনি তার। রেগে চিৎকার করে বলে, “খোদা তোদের সব কয়টার বিচার করবে। আমার জীবন ধ্বংস করেছে যারা খোদা তাদের জীবন নর ক বানাবে। অভিশাপ দিলাম তোদের সব কয়টাকে। আমাকে আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে জোর করে বিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতো পড়াশোনা করেছিস এটাও জানতে পারলি না, ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে দেওয়া হারাম। বেয়া দব সবগুলো। সব গুলোকে আমি খু ন করব খু ন।”
কথাটা বলে ও সেন্স লেস হয়ে পড়ে যায় সেখানে। অভিদ কল করে রাসেল চৌধুরীকে। দু’বার রিং হতে অভিদ সিদ্দিকী ঠান্ডা মাথায় সালাম জানায়। ওপাশ থেকে রাসেল চৌধুরী সালামের জবাব দেন। খোঁজ খবর জিজ্ঞেস করা হতে অভিদ জানায়, “আজকে দুপুরে আমাদের বাসায় দাওয়াত সবার। আসতে হবে সবাইকে। আপাতত আমি কোন অজুহাত বা কিছু শুনতে চাচ্ছিনা। রাগিনীকে কন্ট্রোল করা সাধ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে। ও সবার সাথে খারাপ ব্যবহার করে। আমার ফুফিকে কী বলেছে খোদা জানে! উনার প্রেসার হাই হয়ে, বিছানায় পড়ে আছে। আপনারা প্লিজ আজকে দুপুরে আসুন।”
রাসেল চৌধুরী না করেননি। আশ্বাস দেন, দুপুরে আসবে তারা। অভিদ সিদ্দিকী ফোন রেখে রাগিনীকে পাজ কোলে তুলে রুমে চলে যায়। ফুল দিয়ে সাজানো বিছানার একপাশটায় ওকে শুইয়ে দিয়ে কপালে হাত রাখে। প্রচণ্ড জ্বর চলে এসেছে। সেই সাথে নাক-মুখ লাল হয়ে আছে। ও রাগিনীর গায়ে কম্ফোর্টার টেনে, কপালে ছোট্ট করে পরশ দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়।
বাইরে এসে সোজা আফিয়া সিদ্দিকীর কাছে চলে যায়। ওনার জ্ঞান ফিরেছে। ফাহমিদা সিদ্দিকী জিজ্ঞেস করেন, “ওই মেয়ে তোমায় কিছু বলেছে? বলো আমায়। কী বলেছে তোমায়?”
ভীত চোখে তাকিয়ে আফিয়া সিদ্দিকী বলেন, “তোমার ছেলের বউ নিয়ে কিছু বলবনা আমি। প্লিজ, তোমার বউ তুমি আগলে রাখো। আমি হলাম দুইদিনের অতিথি।”
“কী বলেছে সেটা তো বলো?”
“বলেছে, ভদ্র না হলে ওর জুতা আমার চাপার দাত নাকি বিয়ে বসত।”
অভিদ সিদ্দিকীর মুখশ্রী লাল হয়ে গেছে। তার মান সন্মান ধূলোয় মিশাতে রাগিনী একাই যথেস্ট। চৌধুরী বাড়ির মিসাইল নিজের বাড়িতে এনে, না নিজে শান্তিতে আছে না অন্যকে শান্তিত রাখতে পারছেনা। আজকের মধ্যে একটা সিদ্ধান্তে এসে, ঝামেলা মিটমাট করতে হবে। এই মেয়েকে সামলানো মুশকিল। অভিদ নিজের মান সন্মান আর খোয়ানোর মতো ইচ্ছে নেই। সবার উর্ধ্বে তার সন্মান। যা তার বেয়া দব বউ শেষ করে দিচ্ছে। একে আর একমাস রাখলে, অভিদ সিদ্দিকীর মান সন্মান ধূলিসাৎ করে দিবে। হয় বিদায় করতে হবে নাহয় অন্য ব্যবস্থা। তার দ্বারা এই মেয়েকে কন্ট্রোলে আনা দুষ্কর ব্যপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সবাই মিলে সকালের নাশতা শেষ করতে, অভিদ জানায় রাগিনীর পরিবার আসবে। আয়ানকে টাকা দিয়ে বাজারে পাঠিয়ে দেয়। সেই সাথে বাবুর্চি ঠিক করে নেয় রান্নার জন্য। বাড়ির কয়েকজন মহিলাকে বলা হয়, কাজ করে দিয়ে যাওয়ার জন্য। মূহুর্তে সিদ্দিকী বাড়ির উঠানের রঙ পরিবর্তন হয়ে যায়। সবার সাথে কথায় জথায় কাজ সারতে সিদ্দিকী পরিবার আনন্দ বোধ করছে। এক মূহুর্তের জন্য রাগিনীর ব্যবহার সবটাই মাথা থেকে সরে গেছে সবার। অভিদ সিদ্দিকী দাঁড়িয়ে থেকে এটা ওটা তদারকি করছে। ফাহমিদা সিদ্দিকী কাজের জন্য অভিদকে কিছু জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেছেন।
ঘন্টা খানেক বাদে, অভিদ নাশতা নিয়ে রুমে আসে। রাগিনী ভার হয়ে থাকা মাথা নিয়ে উঠে বসে। পায়ে ফুল দেখে মনটা ভালো হয়ে যায় খানিকটা। এতোগুলা গোলাপ, তাও কী সুন্দর করে কাটা বেছে স্ক্যচটেপ মেরে রাখা। রাগিনী সেগুলোর ঘ্রাণ নেয়। অভিদ গলা খাঁকারি দিয়ে রুমে প্রবেশ করে। নাশতার প্লেট এগিয়ে দিতে রাগিনী তা প্রত্যাখ্যান করে। অভিদ চুপচাপ ওর সামনে বসে পরোটা ছিঁড়ে, ওর মুখের সামনে ধরে। পেটে প্রচন্ড ক্ষুধা সেই সাথে কেউ যত্ন করে খাবার তুলে ধরেছে। রাগিনী প্রত্যাখ্যান করার সাহস পেলো না। পরোটা মুখে নিতে, দেখতে পেলো সামনে বসে থাকা ব্যক্তির চোখেমুখে আলাদা তৃপ্তি। জেনো তাকে খাওয়াতে পেরে বেশ আনন্দিত। রাগিনী এই আনন্দটা তার বাবার চোখে দেখত সবসময়। তার পছন্দের খাবার কিংবা তাকে পেট ভরে খেতে দেখলে একই রকম তৃপ্তি নিয়ে তাকাত। অভিদ সিদ্দিকী রাগিনীকে খাইয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করেন, “পছন্দের ফুল?”
“সানফ্লাওয়ার।”
অভিদ মৃদু হাসে। রাগিনীকে খাইয়ে দিয়ে, ঔষধ দেয়। জ্বর সাথে একটা পিল খাইয়ে দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় রাগিনী তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে, ” চ ড়ের শোধ কিন্তু তোলা হবে।”
“ঠিক কীভাবে?”
“খু ন করে।”
“প্রিয়তমার হাতে খু ন ও মঞ্জুর।”
কথাটা বলে ও বেরিয়ে আসে রুম থেকে। রাগিনী অভিদের যাওয়া দেখছে একনজরে।
বাইরে আসতে ফাহমিদা সিদ্দিকী অভিদকে বলেন, “এতো আয়োজন করে, ওকে কী একবারে পাঠিয়ে দিবে?”
#চলবে

