Home "ধারাবাহিক গল্প বকুলের মালা শুকাবে বকুলের মালা শুকাবে পর্ব-১১+১২

বকুলের মালা শুকাবে পর্ব-১১+১২

0
617

#বকুলের_মালা_শুকাবে—১১
#শার্লিন_হাসান

রাগিনীকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা। সমস্ত বাড়ি তন্ন তন্ন করে খোঁজা শেষ কিন্তু কোথাও রাগিনীর হদিস মিলাতে পারেনি কেউ। রফিকুল ইসলাম চৌধুরী এবং রাসেল চৌধুরী বেশ ক্ষুব্ধ তাঁদের মেয়ের এরকম আচরণের প্রতি। এবার ধরে আনতে পারলে ঠিক না করে শ্বশুর বাড়ি পাঠাবেন না বলে মনস্থির করেন রাসেল চৌধুরী। সবার জোরাজোরিতে মেয়ের চিন্তা নিয়ে খাবার খেতে বসে, কুসুমকলির সাথে টুকিটাকি নিঃশব্দে রাগ ঝেড়েছেন তিনি। একটা মেয়ে তাও ঠিকঠাক মানুষ করতে পারলেন না।

অভিদ বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ লাগিয়ে দিয়েছে রাগিনীর জন্য। কিন্তু পায়ের রক্ত মাথায় উঠে গেছে তার। জানলে, জীবনেও এমন মেয়ে সে বিয়ে করতো না। মূহুর্তে মূহুর্তে তাকে নাকানিচুবানি খাওয়াচ্ছে। মেয়েটা শুরুতে ঠিকই বলেছে, তাকে বিয়ে করে শান্তি পাবেনা অভিদ সিদ্দিকী।

খাবার দাবার সব তার কাছে পানসে আর ফিকে রুপে ধরা দিয়েছে। এই মূহুর্তে মাথায় একটাই চিন্তা রাগিনীর খোঁজ পাওয়া।
রফিকুল ইসলাম চৌধুরীও নিজের পরিচিত মানুষদের মধ্যে খোঁজ লাগিয়ে দিয়েছেন। যেখান থেকে হোক রাগিনীকে খুঁজে বের করে দিতে।

খুব আশা নিয়ে সিদ্দিকী পরিবারে এসেছে চৌধুরী পরিবার। একটু খানি গল্প করবে, সময় কাটাবে। কিন্তু রাগিনীর মতো বদের হাড্ডি থাকলে সেটা বুঝি সম্ভব।

অভিদ রুমে এসে রাগিনীর ফোন পায়। সেটাও সাথে নেয়নি মেয়েটা। এই মেয়ের চিন্তায় কবে জানি, সে হসপিটালে এডমিট হয়। বিয়ের বয়স পেরিয়ে গেছে অনেক আগে। লাস্টে এসে উইকেট পতন হলেও থাকার কথা মালদ্বীপ হানিমুনে কিন্তু তার বউ তাকেই নাকানিচুাবানী খাওয়াচ্ছে।

সবাই যখন চিন্তিত মুখে বসে আছে তখন ফাহমিদা সিদ্দিকী পান দানী টা এগিয়ে দিতে দিতে বলেন, “ঘরের বউ এমন হলে মান সন্মান থাকে? না আপনাদের সন্মান বাকি রেখেছে না আমাদের সন্মান।”

“রাগিনীকে খুঁজে পাই আগে বাকিটা পরে।”

জবাব দেন রাসেল চৌধুরী। আফিয়া সিদ্দিকী বলেন, “মেয়েমানুষ হবে, ঘরকুনো। ঘর থেকে বেরুতে ঘোর আপত্তি থাকবে তাঁদের। নম্রতা ভদ্রতা চেহারায় মুক্তর মতো জ্বলজ্বল করবে তা না এক নাম্বারের বেয়া দব আর ছেলেমানুষ।”

“আমার ছেলে কী জন্যে যে টেনশন মাথায় নিলো।”

“আমি তো আমার ছেলেকে লাগলে, গরিব ঘরের কালো মেয়ে বিয়ে করাব তাও এমন বেয়াদব না। কথায় আছেনা, জাতের মেয়ে কালোও ভালো। শুধু গায়ের রঙ ফর্সা হলেই হয়না,আদব-কায়দা শিষ্টাচার ও লাগে।”

“আমিও আমার নাতিপুতিদের শিক্ষা দেব, যেচে বেয়াদব মেয়ে ঘরে তোলার জন্য মরিয়া হয়ে উঠার প্রয়োজন নেই।”

শান্তি সুধার কথায়, ফাহমিদা সিদ্দিকী ক্ষিপ্র দৃষ্টিপাত করেন। আফিয়া সিদ্দিকর তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেন। পরিবার এক নাম্বারের ঝগড়ুটে মেয়ে আর কেমন হবে। আফিয়া সিদ্দিকীও ছেড়ে দেবার পাত্রী নন। তিনি হাসিমুখে বলেন, “এক হাতে তালি বাজেনা জানি কিন্তু ছেলের থেকে বেশি মেয়ের পরিবারই উঠেপড়ে লেগেছে মেয়েটাকে বিদেয় করতে। এতো যন্ত্রণা আর কতবছর সহ্য করবে। মানুষেরও তো একটা সহ্য ক্ষমতা আছে তাইনা?”

শেষের কথাগুলো অভিদের কর্ণপাত হতে ও কড়া গলায় বলে, “দয়া করে, রাগিনীকে নিয়ে ঝগড়াঝাঁটি বন্ধ করুন। ও কী অবস্থা আছে নাকি হারিয়ে গেছে জানিনা। এখনকার যুগ অনেক খারাপ। আমি তাকে নিয়ে কারোর মুখে কোনরকম চিন্তা দেখছিনা উল্টো ঝগড়াঝাঁটি দেখছি। মনেহয়, ওর হারিয়ে যাওয়াতে কারোর কিছু যায় আসেনা।”

“মেয়ে এরকম বেয়াদ ব হলে কারই বা কী যায় আসবে!”

ফাহমিদা সিদ্দিকীর কথায় অভিদ সিদ্দিকী ভীষণ চটে ওঠে। বাজখাঁই গলায় বলে, “রাগিনী আমার বউ। ও খারাপ হোক বা ভালো সেটা এখন থেকে আমি বুঝব। কেউ ওকে নিয়ে ঝগড়া,ঝামেলা করে ওকে কটু কথা বলবেন না। এরপর থেকে ও কারোর সাথে বিন্দু মাত্র বেয়াদবি করলে, আমি বুঝব কী করা লাগে। তবুও দয়া করে থামুন আপনারা। এইরকম পরিস্থিতিতে মাবুষ ঝগড়া করে?”

এবার সবাই নিশ্চুপ হয়ে যায়। চার দেওয়াল ঘিরে নিরবতা আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে যায়। অভিদ রুম জুড়ে পায়চারি করছে। একের পর এক কল দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কেথাও রাগিনীর খোঁজ মিলাতে সক্ষম হচ্ছেনা। ওইদিকে পেটের ইঁদুর দৌড়াচ্ছে অনবরত। ও সেসব পাত্তা না দিয়ে বেরিয়ে আসে। যাওয়ার আগে তার মাকে বলে, “অতিথি এসেছে সুন্দর মতো আপ্যায়ন করবে কোনরকম তর্কাতর্কি, ঝামেলা করবেনা। আমি যাতে কোন বিচার না শুনি। মনে রাখবে, উনারা অতিথি। খারাপ ব্যবহার করা যাবেনা।”

“কিন্তু অভিদ তুমি খাবারটা তো খেয়ে যাও।”

“রাগিনীকে পাই,এসে খাবার খাব।”

কথাটা বলে ও গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যায়। যেতে যেতে ভাবে, এতো কিসের রাগ মেয়েটার? সে তো রক্তে মাংশে গড়া। মেয়েমানুষের মন হয় নরম। কিন্তু তারটার কী এমন হয়েছে যে এতো অল্পতে ভীষণ কঠোর? এতো রাগ কেন? জোর করে বিয়ে দেওয়ায়? তার কী উচিত রাগিনীর প্রতি আরেকটু নমনীয় হওয়া? কিন্তু মেয়ের যা ব্যবহার এর চেয়ে বেশি নমনীয় হলে, ঝামেলা। কিন্তু এবার এটার একটা ব্যবস্থা করতে হবে।

★★★

তপ্ত দুপুরে সূর্যটা মাথার উপর দাঁড়িয়ে নিজের সমস্ত তেজ ঢেলে দিচ্ছে মানবকূলে। একটু পরপর গলাটা শুকিয়ে আসছে রাগিনীর। কিন্তু পানি কিনার টাকা নেই তার কাছে। মাথা কাজ করছেনা একদমই। ও জানেনা কেন পালিয়ে এসেছে। জানেনা কেনো এসেছে। শুধু এতোটুকু জানে, ওখানে ফিরতে চায়না ও। একদমই না। চৌধুরী বাড়িটা তার জন্য কেবলই ন রক। আর কিচ্ছুনা।
ও ফুটপাতের রাস্তায় দপ করে বসে পড়ে। পা এগুচ্ছেনা একদমই। মাথাটা ঝিমঝিম করছে। ভীষণ রকমের কান্না পাচ্ছে ওর। এই পৃথিবীটা বিষাদ রুপে ধরা দিয়েছে। নিজেকে লাগে সবচেয়ে অসহায়। ছোটোবেলার কথা মনে পড়লে ট্রমাটাইজ হয়ে যায় রাগিনী। তারউপর জোর করে নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে বিয়ে দিয়েছে তাকে। ও পুরুষ জাতিকে প্রচন্ড ঘৃণা করে। প্রচন্ড রকমের। শুধু একজন মানুষ ছিলো যে তার মনে জায়গা করে নিয়েছিলো কীভাবে, সেটা রাগিনী জানেনা। গতবার সে তাকে খালি হাতে ফিরিয়েছে কিন্তু এবার নিশ্চয়ই সে আসবে। রাগিনী বিশ্বাস করে, এবার তাকে আশাহত করবে না তার ভরসা যোগ্য মানুষটা। অভিদ সিদ্দিকীকে ও প্রচন্ড ঘৃণা করে। তাকে জোর করে বিয়ে করেছে, জোর করে স্পর্শ করে নিয়েছে। আর কী বাকী রেখেছে অভিদ সিদ্দিকী। নিজের কাজ শেষ হতে তাকে বিদায় করে দিতে চেয়েছে। ঠিক এসব কারণে রাগিনী পুরুষ জাতিকে প্রচন্ড ঘৃণা করে। কখনোই এই মন থেকে ঘৃণা কাটবে না ওর।

একের পর এক গাড়ি চলে যাচ্ছে সামনে দিয়ে। রাগিনীর হুশ নেই। গলাটা শুকিয়ে চৌচির। এক ফোঁটা পানি জেনো, তার কাছে অমূল্য এখন। কোথায় পাবে পানি? তার কাছে তো টাকাও নেই। কীভাবে উঠে দাঁড়াবে ও? মাথা কাজ করছেনা। নিজেকে পাগল লাগছে। পরক্ষণে মনে পড়ে, সে তো পাগলই। রাস্তার পাগলের থেকেও জঘন্য তার মস্তিষ্কের অবস্থা। মনে করার চেষ্টা করে, ও কী সত্যি কাউকে আসতে বলেছিলো তাকে নিতে? নাকি সবটাই নিজের ভ্রম ছিলো?

অভিদ সিদ্দিকী হিসেব কষছে সবকিছুর। রাগিনীর পালিয়ে যাওয়ার হলে বিয়ের পরপরই যেতে পারত। কিন্তু ঝগড়াঝাঁটি বাদ দিলে, আজকে সকালে তো ভালোই ছিলো সে। পরিবারের লোক আসলে, অপমান করতে পারত। সে যে মেয়ে এতো সুন্দর সুযোগ মেয়ে অপমান করা মিস করত নাকি। কিন্তু সে সেসবের কিছুতেই আগ্রহ দেখালো না। উল্টো পালিয়ে গেলো। এই মেয়ে সত্যি সুস্থ স্বাভাবিক তো? নাকি মানসিক কোন রোগে আক্রান্ত? প্রশ্ন আসে মনে। রাগিনীর সবগুলো ব্যবহার অভিদ সিদ্দিকী ভাবনায় নিয়ে আসে। কথাবার্তায় অতিরিক্ত বেয়াদবি ছিলো। আবার আজকে তার সাথে আহামরি বেয়াদবি করেনি। কেমন অদ্ভূত মেয়েমানুষ ও।

ধীরে ধীরে রাগিনীর দুচোখ বন্ধ হয়ে আসে। কিছুই ভাবতে পারছেনা ও। কোথায় এসেছে, কেনো এসেছে এমনকি কাকে আসার জন্য বলেছে নাকি বলেনি খেয়াল করতে পারছেনা ও। শুধু গলাটা শুকিয়ে চৌচির হয়ে আছে। একটু খানি পানির প্রয়োজন। কিন্তু কীভাবে উঠে দাঁড়িয়ে, পানির খোঁজ করলে পানি মিলবে সেসব তার মাথায় খেলছেনা।

#চলবে

#বকুলের_মালা_শুকাবে—১২
#শার্লিন_হাসান

গোধূলির শেষ আলোটুকু অনেকক্ষণ আগে নিভে গেছে। চারদিকে এক অচেনা অন্ধকার ঝুম বৃষ্টির ন্যায় ঝড়ে পরছে। । সেই অন্ধকারের মাঝেই নিথর পড়ে আছে রাগিনী। চোখদুটি বন্ধ, তার দেহ অবশ, কিন্তু চেতনা তখনো পুরোপুরি নির্বাপিত হয়নি। যেন গভীর জলের তলদেশে ডুবে থেকেও সে উপরিভাগের শব্দগুলো শুনতে পাচ্ছে। তনে অনুভব করলো তার মাথার ভেতর অসহ্য যন্ত্রণা। তবুও ভেসে আসা কথাগুলো কানের ভেতর ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে লাগল।
কোন এক মহিলার কন্ঠ ভেসে আসে,

“মেয়েটাকে আনছ তো?”

তখন একটি কর্কশ কণ্ঠস্বর জবাব দেয়,

“হ্যাঁ। এখনো অচেতন। কিছুই বুঝতে পারছে না। আমার টাকা পেয়ে গেলে আমি চলে যাব তাকে দিয়ে।”

উত্তরদাতার কণ্ঠ শুনতে রাগিনী চমকে উঠে।
তার অন্তর কেঁপে উঠল। এ তো পলাশ। তার পছন্দের পুরুষ, ভালোবাসার মানুষটি। যাকে ছাড়া বাকী সব পুরুষ তার কাছে বি ষ। দুচোখে সহ্য হয়না। তার ভালোবাসা, তার হৃদয়ের অত্যন্ত সুপুরুষ। যে কিনা তাকে বিক্রি করে দিচ্ছে তাও কোন এক পতি তা লয়ে। মূহুর্তে ঘৃণায় মন মস্তিষ্ক ভরে উঠে। কান্না পাচ্ছে ভীষণ। কিন্তু সে তো পানির অভাবে, রাস্তায় অচেতন হয়ে পড়েছিলো। এরপর এই জা নো য়ার তাকে নিয়ে এসেছে? তার সমস্ত অস্তিত্ব যেন মুহূর্তের মাঝে হিমশীতল হয়ে গেল।
সে চোখ খুলতে চাইল, শরীর নড়াতে চাইল, কিন্তু অবশ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করল। সে কেবল শুনে যাচ্ছে,

“টাকা গুনে নাও। এরপর থেকে মেয়েটার আমাদের দায়িত্বে চলে আসবে।”

কয়েক মুহূর্ত নীরবতা ওম পেতে বসে যায়। তারপর কাগজের নোট ওলটানোর মৃদু শব্দ ভেসে আসে।
রাগিনীর বুকের ভেতর তখন এক অদ্ভুত শূন্যতা জন্ম নিচ্ছে। ভয়, বিস্ময়, বিশ্বাসঘাতকতা সব অনুভূতিকে ছাপিয়ে এক নির্মম সত্য ধীরে ধীরে তার সামনে উন্মোচিত হচ্ছে। তার ভালোবাসা, এই পলাশ তাকে বিক্রি করে দিয়েছে তাও সমাজের সবচেয়ে নিম্নস্তর স্থান, পতি তালয়ে।
যে মানুষটির কথায় সে নির্দ্বিধায় পথ চলেছে, ভরসা করেছে। হেসেছে, কলে ঘন্টার পর ঘন্টা গল্প করেছে, যার ভরসার দুটি হাত ধরে ঘুরতে চেয়েছে, যার প্রতি বিশ্বাসের শেষ কণাটুকুও সে সমর্পণ করেছিল, সেই মানুষটিই আজ তার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ অন্ধকারের দ্বার খুলে দিয়েছে।
মহিলাটি পান চিবুতে চিবুতে বলে,
“জ্ঞেয়ানন ফিরলে আবার ঝামেলা কইরবে না তো? ছেড়ি কেমন চুন্দর?”

“করলেও কোনো লাভ হবে না, আর তার সৌন্দর্য ওই পূর্ণিমার চাঁদের মতোই। চাঁদের থেকে আলাদা করলে সাক্ষাৎ পাপ হবে।”

ক্রর হেসে জবাব দেয় পলাশ। তার কণ্ঠে বিন্দুমাত্র দ্বিধা ছিল না।
মহিলাটি হাসতে হাসতে বলে,
“এইহানে আইসা কেক্ষই নিজের ইচ্ছায় আর ফেরতে পারে না।”

সে বাক্যগুলো রাগিনীর কানে নয়, যেন সরাসরি হৃদয়ের গভীরে আঘাত হানল।তার বন্ধ চোখের কোণ বেয়ে নীরবে একটি অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়ল। বুকটা শূন্য হয়ে উঠলো। এই মূহুর্তে তার অসভ্য ঠোঁট লাটা অভিদ সিদ্দিকীকে মনে পড়ছে। খুব করে, ভীষণ করে। জীবন তাকে আর কোথায় কোথায় নিয়ে দাঁড় করাবে? এই পতি তা লয়ে বিক্রি হওয়ার চেয়ে মৃ ত্যু ভীষণ সম্মানজনক ছিলো। এই জীবনে কী সবচেয়ে জঘন্য জিনিসগুলো তার সাথে পরিচিত হতে চায়? তার প্রতি এতো ক্ষোভ কেন, এই জীবনের। রাগিনী কান্না করছে। পরের জন্মে জন্মানোর সুযোগ হলে, ও প্রজাপতি হয়ে জন্মাত। ডানায় বাহারি রঙের আলপনা নিয়ে দুপুরের খা খা রোদে ফুলে ফুলে ঘুরে বেড়াত।
সেদিন প্রথমবার রাগিনী উপলব্ধি করেছে, কেবল মানুষের হাতে ছুরি থাকলেই সে বিশ্বাসঘাতক হয়না; কখনো কখনো সবচেয়ে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে সেই মানুষ, যার হাতে একদিন আমরা নিজেরাই বিশ্বাস তুলে দিয়েছিলাম। আর সেইসব মানুষ নিজেদের স্বার্থে আমাদের বিশ্বাস খুব যত্ন করে পুড়িয়ে দিতে দ্বিধা করেনা।

★★★

পাগলের মতো অলিতে গলিতে রাগিনীকে খুঁজে চলেছে অভিদ। কোনভাবে তার খোঁজ মিলাতে পারছেনা। কোনভাবে তা সম্ভব হয়ে উঠছেনা। সে একপ্রকার ভেঙে পড়েছে। বাসায় এসে অনেকক্ষণ যাবত চিল্লাচিল্লি শুরু করে দিয়েছে। রাগিনী পালানোর সময় কেনো কেউ, দেখলো না। কেন কেউ তার খেয়াল রাখল না।

নিজের রুমে অনেকক্ষণ বসে থেকে মাথা ঠান্ডা করে অভিদ। রাগিনীর ফোনটা হাতে নেয় ও। কী ভেবে হোয়াটসঅ্যাপে ঢুকে। কিন্তু রিসেন্ট কোন মেসেজ পায়না। ও খুঁজতে থাকে রাগিনীর কোন ক্লোজ ফ্রেন্ডের আইডি। কিন্তু কীভাবে কী খুঁজবে মাথা কাজ করছেনা। তার চেয়ে ভালো ওর বাড়িতে গিয়ে জিজ্ঞেস করা। সবাই অন্তত বলতে পারবে। অভিদ বেরিয়ে যায় চৌধুরী বাড়ির উদ্দেশ্যে। সেদিকেও রাসেল চৌধুরী খোঁজ খবর নিচ্ছে। অভিদ দ্রুত গতিতে গাড়ি চালিয়ে চৌধুরী বাড়িতে পৌঁছায়।

কুসুমকলির কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করে, “রাগিনীর বন্ধুবান্ধবের ডিটেইলস লাগবে আমার।”

“ও বন্ধু বানায়নি কখনো।”

কুসুমকলির কথায় অভিদ সিদ্দিকী খুব রকমের অবাক হলো। কিন্তু মেয়েকে দেখে তো মোটেও এরকম মনে হয়না। মনে তো হয়, এক গাদা বন্ধু বান্ধব নিয়ে ঘুরে। সবচেয়ে বড় কথা এই মেয়ে তো আড়ায়-পাড়ায় ছেলে ইভটিজিং করার মতো দুঃসাহস দেখাতো তাহলে বন্ধুবান্ধব ছিলোনা? আর বন্ধুবান্ধব না থাকলে সেদিন কার সাথে কক্সবাজার গিয়েছিলো? অভিদের মনে এক গাদা প্রশ্ন এক্কাদোক্কা খেলছে। ও জিজ্ঞেস করে, ” কিছুমাস আগে, রাগিনী কক্সবাজার গিয়েছিলো। বন্ধুদের সাথে যায়নি?”

“না, ও তো ওর ফুফির সাথে গিয়েছিলো। ফুফির ফ্রেন্ডদের সাথে।”

“ওহ। সত্যি ওর কেন ভালো বন্ধুবান্ধব নেই?”

“কখনো কারোর নাম বলেনি, বা বাসায় আনেনি।”

“এটা কী করে সম্ভব?”

“তুমি ওর খোঁজ পেয়েছ?”

কথা ঘুরায় কুসুনকলি। অভিদ ওনার দিকে সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, “সব জায়গায় লোক লাগিয়ে দিয়েছি আশা করি শীঘ্রই খোঁজ পাব।”

“খোদা যে কী এক আপদ দিয়েছে আমাদের। ছোটো বেলায় ম রে গেলে অন্তত বেঁচে যেতাম আমরা সবাই। সেই ছোটো থেকে প্রতিবন্ধীর মতো জ্বালিয়েই যাচ্ছে। মেন্টাল মেয়ে একটা।”

“আপনার মেয়ে ও। ওকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা আর আপনি এসব কথা বলছেন?”

“না বলার কী আছে! বিয়ে দিলাম তাতে না নিজে শান্তিতে আছে না কাউকে শান্তুিতে রেখেছে। বিয়ের আগের কথা বাদই দিলাম। রোজ রোজ বিচার আসত ওর নামে। এমনকি এই বিচারও এসেছে, ও পরীক্ষা দিয়ে ফেরার পথে রাস্তায় নাকি কোন এক ভদ্রলোকের শার্টে,গাড়িতে কাঁদা অব্দি মেখেছে তাও কেন সেটা জানিনা। ওর দোষের শেষ নাই বুঝলা।”

“রাখুন সেসব কথা। আমি ওর রুমে যেতে চাচ্ছি।”

কুসুমকলি মাথা নাড়ায়। অভিদ সিদ্দিকীকে নিয়ে আসেন রাগিনীর রুমে। অন্ধকারে ঘেরা রুমটায় সুইচ টিপতে লাইট জ্বলে উঠে। অভিদ খেয়াল করে, রুমটা পরিপাটি আবার অগোছালো। টেবিলের উপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বই,ডায়েরি,খাতায় ধূলো পড়ে গেছে। দেখে মনে হচ্ছে গত এক সপ্তাহ কেউ রুমে আসেনি।

খাটের উপর বেশ কিছু পুতুল রাখা। আবার একটা ল্যাপটপও দেখতে পায় ও। অভিদ সব রেখে সবার আগে ল্যাপটপ ধরে। ভাগ্যবশত কোন পাসওয়ার্ড দেওয়া নেই। মেয়ে যা রাগী, কেউ তার ল্যাপটপ ধরার সাহস পাবে নাকি! অভিদ সিদ্দিকীর কপাল বেয়ে বিন্দু বিন্দু ঘাম ঝরে পরছে। মন শক্তি পাচ্ছে। আশার আলো দেখতে পাচ্ছে ও। জেনো এই ল্যাপটপে রাগিনীকে নিয়ে সমস্ত কিছু সে পাবে। ক্রোমে গিয়ে ওর সার্চ লিস্ট চেক করে। বেশ কিছুক্ষণ পর দেখতে পায়, ডার্ক ওয়েবসাইট নিয়ে ওর আগ্রহ তুখোড় ছিলো কিন্তু কীভাবে সে সাইটে প্রবেশ করতে হয় সেসবের উপায় বেশ কিছুদিন ধরে খুঁজছিলো। এ ব্যপারটা অভিদ পাত্তা দেয়নি। যে কেউ এটা নিয়ে আগ্রহ দেখাতে পারে। কিন্তু কী করে কী বের করবে কিছুতেই বুঝতে পারছেনা ও। সবার আগে রাগিনীর গুগল একাউন্টের পাসওয়ার্ড চেঞ্জ করে।

মূহুর্তের মাঝে বেরিয়ে আসে ওর সবগুলো ফেসবুক আইডি। একটা আইডি তার রিয়েল নামে খোলা, ” মেহের রাগিনী” নামে। সে সেটায় প্রবেশ করে। মেসেঞ্জার একদম ফাঁকা পড়ে আছে। সবচেয়ে বড় কথা রাগিনীর লিস্টে পাঁচজন ব্যক্তি ছাড়া আর কেউ নেই। অভিদ এবার সে পাঁচটা আইডি ঘাটা শুরু করে দেয়।

দম বন্ধ হয়ে আছে রাগিনীর। তাকে পানি মেরে জাগিয়ে তোলা হয়েছে। হাত দু’টো বেঁধে দেওয়ার জন্য দু’টো মেয়ে এগিয়ে আসতে রাগিনী নিজের সমস্ত রাগ উগলে দেয়। দু হাতে মেয়ে দুটোর চুল এতোটা জোরে টেনে ধরেছে যে, মেয়ে দু’টো মাটিতেই লুটিয়ে পড়েছে। পান খাওয়া মহিলাটি বেজায় বিরক্ত রাগিনীর উপর। তাকে উপর নিচ পরখ করতে খুশি হয়ে যায়। মেয়ে যা সুন্দর কেবল টাকা আর টাকা আসবে। তিনি ঠান্ডা মাথায় বলেন, “বসো চুন্দরি। কমলার মতোন দেখতে। খুবই মিস্টি। কাস্টমার তোমারে দেখলে পাগল হইয়া যাইব।”

” খা * মা** আমাকে দিয়ে খারাপ কাজ করানোর কথা ভাবলেই তোর তেজ ভেজে আমি রোদে শুকাব।”

“বৃষ্টি, এই হারাম জা দীরে দুইডা থাপ্পাড় দেসেন, আমার মুখে মুখে তর্ক। তোরে কচকচা নোটের বিনিময়ে কিন্না নিসি।”

গৃহকত্রীর আদেশে, বৃষ্টি নামের মেয়েটি এগিয়ে আসতে রাগিনী ডানে বামে তাকায়। তাকে থা প্পড় মা র তে গেলে রাগিনী তার পেট বরাবর লা থি বসিয়ে দেয়। কাউকে কিছুতেই নিজের কাছে আসতে দিচ্ছে না ও। অসহায়ত্ব ও আতঙ্কের অতল গহ্বরের মধ্যেও, তার অন্তরের কোথাও একটি ক্ষীণ এবং অবিনাশী স্ফুলিঙ্গ জেগে উঠেছে। এখান থেকে বেরুতে হলে, ভেঙে পড়া না, নিজেকে প্রটেক্ট করতে হবে যেকোন মূল্যে। কারণ কিছু বিশ্বাসঘাতকতার বিচার আদালতে হয়না, রিভেঞ্জ অব ন্যাচারের মাধ্যমেও হয়।

#চলবে