Home "ধারাবাহিক গল্প "যেখানে মন ভেজে চুপচাপ যেখানে মন ভেজে চুপচাপ পর্ব-১৩

যেখানে মন ভেজে চুপচাপ পর্ব-১৩

0
7

#যেখানে_মন_ভেজে_চুপচাপ
#পর্ব_১৩
#লেখনিতে_খুশবু_আকতার

কোন এক জরুরী কথা বলার জন্য মৃদুল কে আজ বাড়িতে ডেকে পাঠিয়েছেন মনির সাহেব। মৃদুল কে বলা হয়নি জরুরী কথাটা কি। তবে মৃদুল আন্দাজ করতে পারল। নিশ্চয়ই এই জরুরী কথাটা মৃত্তিকার বিয়ে সম্বন্ধীয়। হয়ত ওনারা সম্বন্ধ ঠিক করেই ফেলেছেন। পাকা কথা হবে। মূলত এই কারণেই মৃদুল এসেছে। কেননা বিয়েটা তো ভাঙতে হবে। ওদিকে সমীরণ আর মৃত্তিকার মাঝে তো সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে গেছে। এখন যদি বাড়ির লোকজন আবার এর মাঝে বাঁধা দিয়ে বসে তাহলে তো ব্যাপারটা পুরো ঘেটে ঘ হয়ে যাবে।

তবে অদ্ভুত ব্যাপার হলো মৃদুল বুঝে উঠতে পারছে না বাড়িতে মুরুব্বীরা থাকতে ওকে কেন মৃত্তিকার বিয়ের ব্যাপারে এত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে যে আসতে না আসতেই পুরো পরিবার ওকে নিয়ে বসে পড়েছে। সবার মুখভঙ্গি কেমন যেন গুরুতর। কারো কারো মুখ দেখে তো আবার চিন্তিতও মনে হচ্ছে। কেউ কিছু বলছেও না। মৃদুল আর অপেক্ষা করতে না পেরে নিজেও একটু চিন্তিত ভঙ্গিতে মৃত্তিকার বাবা কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“চাচা, কি হয়েছে বলবে? চিন্তা হচ্ছে এখন আমার। এত তাড়াহুড়ো করে আমায় ডেকে আনলে কেন?”

মনির সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন,

“মৃত্তিকার বিয়ের ব্যাপারে কথা ছিল।”

এতক্ষণে মৃদুল নিশ্চিত হলো যা সন্দেহ করেছিল সেটাই ঠিক। মৃত্তিকার বিয়ের জন্য ওকে ডেকে পাঠিয়েছে। বিয়েটা তো আজ মৃদুল ভেঙেই যাবে। নয়ত বন্ধু আর বোনকে মুখ দেখাবে কি করে। হালকা একটু কেঁশে গলাটা পরিষ্কার করল। পিঠ টান করে বসে গুরু গম্ভীর ভঙ্গিতে বলল,

“দেখো চাচা, মৃত্তিকা আমাদের বাড়ির একমাত্র মেয়ে। ওকে এত দূরে পাঠানো যাবে না। তাছাড়া এতদিন হলো বিদেশ থাকে ওই ছেলে। ওর স্বভাব চরিত্র সম্পর্কে তো আমরা তেমন কিছুই খোঁজ পাবো না। ওখানে কি করে না করে কে জানে। এমন ছেলের সাথে বিয়ে দেওয়া যাবে না। ভালো কোন সম্বন্ধ আমি খুঁজে দেব মৃত্তিকার জন্য। ওদের নিষেধ করে দাও।”

মনির সাহেব কোন উত্তর দিলেন না। পাশ থেকে মৃদুল এর বাবা খানিকটা বিরক্তি মিশ্রিত গলায় বললেন,

“আগেই এত বাড়তি কথা বলছিস কেন? তোর চাচার কথাটা তো শোন।”

“না বাবা আমি কোন কথা শুনতে চাইছি না। আমি যখন বলেছি মৃত্তিকার ওখানে বিয়ে হবে না তখন ওর জন্য তোমাদের এত ভালো ছেলে খোঁজার চিন্তা করতে হবে না। আমি ভালো ছেলে খুঁজে দেব। আমার নজরে অনেক ভালো ছেলে আছে।”

“সমীরণ কে কেমন লাগে তোর মৃত্তিকার জন্য?”

মনির সাহেব প্রশ্নটা করলেন। যে প্রশ্নটা মৃদুল কে একটু অপ্রস্তুত করে তুলল। হঠাৎ করে যে উনি সরাসরি সমীরণের কথা জিজ্ঞেস করবেন সেটা মৃদুল মোটেই আশা করেনি। ওর বাড়ির লোকজন যে সমীরণ আর মৃত্তিকার বিয়ের ব্যাপারে কখনো কিছু ভাববে এই বিষয়টাই তো মৃদুলের মস্তিষ্কের ধারের মাঝে কখনো আসেনি। বরং চিন্তায় ছিল যে বাড়ির লোকজন না জানি বিষয়টাকে কেমন করে দেখে।

এখন এমন একটা ভাব দেখাল যেন কিছু বুঝে উঠতে পারেনি মনির সাহেবের প্রশ্নের। অবুঝের মতন পাল্টা প্রশ্ন করল,

“মৃত্তিকার জন্য কেমন লাগে মানে কি? বুঝলাম না।”

মনির সাহেব দুহাত একত্র করে থুতনিতে ঠেকিয়ে হালকা একটু ঝুঁকে বসে বললেন,

“মাস্টার সাহেব কল করেছিলেন গত পরশু। মৃত্তিকার জন্য সমীরণের সম্বন্ধে পাঠিয়েছেন। মৃত্তিকা কে নিজের ছেলের বউ করে বাড়ি নিয়ে যেতে চান।”

বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে মৃদুল তাকাল। এসব আবার কবে ঘটল। কই সমীরণ তো কিছু বলেনি। ও কি আদৌও এ ব্যাপারে কিছু জানে। নাকি সাদ্দাম হোসেন নিজ থেকে এসব করে ফেলেছেন। বিরাট এক কান্ড ঘটিয়ে বসেছেন তো তিনি। আর সমীরণ কিনা এসবের কিচ্ছু জানে না।

“চুপ করে আছিস কেন? বল কিছু।”

ধ্যান ভাঙল মৃদুলের। হালকা তুললে বলল,

“আগে বলো তোমরা কি বলেছ? নিষেধ করে দিয়েছো নাকি?”

“না না নিষেধ করিনি।”

“তাহলে হ্যাঁ করেছো?”

“না। তাও বলিনি।”

মৃদুল বিরক্তিকর গলায় বলল,

“হ্যাঁ বলোনি, নাও বলোনি তাহলে বলেছোটা কি?”

“আরে এত তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত নেয়া যায় নাকি। আর তাছাড়া মৃত্তিকার সাথে সমীরণের বিয়ের ব্যাপারে তো কখনো আমরা কেউ চিন্তাও করিনি।”

“তাহলে এখন চিন্তা করে। চিন্তা করতে দোষ কি। সমীরণ কত ভালো ছেলে সেটা তোমরা সবাই জানো। ও খুব ভালো রাখবে আমাদের মৃত্তিকা কে। চাচা শোন, আগে পিছে আর কোন কিছু ভাবার দরকার নেই। তুমি এক্ষুনি সমীরণের বাবাকে কল করে বল যে আমরা এই বিয়েতে রাজি। ওদের বিয়ে হচ্ছে এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তত তাড়াতাড়িই হচ্ছে।”

মনির সাহেব আপত্তি জানিয়ে বললেন,

“না না। এত তাড়াহুড়ো করা ঠিক হবে না। সমীরণ আর মৃত্তিকার সম্পর্কটা তো খুব একটা ভালো না। মৃত্তিকা তো ওকে দেখে প্রচন্ড ভয় করে। আমার মনে হয় না ওরা কেউই বিয়েটাতে রাজি হবে। বিশেষত মৃত্তিকা তো কখনোই রাজি হবে না।”

একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল মৃদুল। নিজেই নিজের কপাল চাপড়াতে ইচ্ছে করল। যদি মনির সাহেবকে দেখাতে পারত যে তার মেয়ে সমীরণের জন্য ঠিক কতটা পাগলামি করে বেড়াচ্ছে তবে নির্ঘাত মনির সাহেব জ্ঞান হারাতেন বিস্ময়ে। ওনাদের সামনে যে মেয়ে সমীরণকে দেখলে ভয়ে কাঁপে, ওনাদের আড়ালে সেই মেয়েটারই সমীরণের সামনে ঠিক কতটা সাহস জাগে সেটা বোধহয় ওনারা নিজের চোখে না দেখলে কখনো বিশ্বাসই করবেন না।

মৃদুল ওনাকে আশ্বস্ত করে বলল,

“এমন কিছুই না হবে চাচা। আমি জানি ওরা দুজন দুজনকে পছন্দ করে। ভালো থাকবে। সমীরণ অনেক ভালো ছেলে। আমি বলছি তো তোমাকে অনেক যত্ন রাখবে মৃত্তিকাকে। খেয়াল রাখবে ওর। ভালো থাকবে দুজনে। তোমরা আগে পিছে এত ভেবো না তো। এত ভালো একটা ঘর থেকে সম্বন্ধ এসেছে, পরিচিত ছেলে, ঘরে শাশুড়ি ননদের মতন কোন ঝামেলা নেই আর কি চাও তোমরা।”

মনির সাহেব কিছু বলতে চাইলে মৃদুল ওনাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,

“আর কিছু বলতে হবে না চাচা। আর কিছু চেও না। বেশি লোভ করতে যেও না। আমি বলছি তো সমীরণের মত ভালো ছেলে হাজার খুঁজেও পাবেনা। আমার উপর ভরসা নেই তোমাদের? আমি আমার বোনের খারাপ চাইবো? এক্ষুণী সমীরণের বাবাকে কল করে বল যে আমরা বিয়েতে রাজি। সামনের শুক্রবার পাকা কথা হবে। বিয়ের ডেট ঠিক হবে। ব্যাস কথা শেষ। ওদের বিয়ে হচ্ছে।”

__________

চশমা চোখে দিয়ে চেয়ারে বসে সাদ্দাম হোসেন তার কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের পরীক্ষার খাতা কাটছেন। এমন সময় হুড়মুড়িয়ে ঘরে সমীরণ ঢুকল। খাতার উপর থেকে দৃষ্টি তুলে একবার তিনি ছেলের দিকে তাকালেন। সমীরণ ততক্ষণে এসে একেবারে ওনার সামনে দাঁড়িয়েছে। হাঁপাচ্ছে। কিছু একটা বলার জন্য হাঁসফাঁস করছে। খুব অস্থির হয়ে আছে বোধহয়। তবে বলতে পারছে না।

সাদ্দাম হোসেন মোটেও ব্যতিব্যস্ত হলেন না ছেলের এমন অবস্থা দেখে। বরং তিনি খানিকটা হলেও আন্দাজ করতে পারলেন যে ছেলে কেন তার ঘরে এভাবে হুরমুড়িয়ে প্রবেশ করল। আর কেনই বা এমন অস্থির হয়ে আছে। হয়তবা সাদ্দাম হোসেন যে মৃত্তিকার বাড়িতে ওদের বিয়ের সম্বন্ধ পাঠিয়েছিল সেই বিষয়ে খবর পৌঁছে গেছে সমীরণের কান অব্দি।

খাতাগুলো সামনে থেকে সরিয়ে রেখে চশমাটা খুলে সামনে টেবিলের ওপরে রেখে দিয়ে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন,

“কি হয়েছে? কিছু বলবি?”

“তোমায় আমি বলেছিলাম না মৃত্তিকার বাড়িতে সম্বন্ধ পাঠাবে না। আর তুমি আমাকে না জানিয়ে পাঠিয়ে দিলে! এটা তুমি ঠিক করোনি আব্বু।”

“আজ পঁচিশ বছর ধরে তোর মতন হাজারখানেক বাচ্চাদের ঠিক ভুল আমি শিখিয়েছি। তুইও জীবনে ঠিক ভুল আমার হাত ধরেই শিখেছিস। আর আজ তুই আবার আমাকে শেখাতে এসেছিস? আমাকে তোর থেকে শিখতে হবে এখন ঠিক ভুল?”

একটা মোড়া টেনে সমীরণ বসে পড়ল। খুব গুরুতর ভঙ্গিতে কিছুক্ষণ আপন মনে কিসব যেন ভাবল। আবারো হঠাৎ করে অস্থির হয়ে উঠল।

“না আব্বু তুমি এটা ঠিক করোনি। আচ্ছা আমায় সত্যি করে বলতো ওনারা কি বলেছেন? আমি যদিও জানি ওনারা খারাপ কিছু বলবেন না। আপত্তি জানালেও খারাপ ভাবে বলবে না। বুঝিয়ে বলবেন। কিন্তু তারপরও তোমার তো নিশ্চয়ই কষ্ট লাগবে। আচ্ছা বলো না ওরা কি খারাপ কিছু বলেছে?”

“খারাপ বলেছে না ভালো বলেছে সে সব জানি না। তবে একটু আগে কল করে অনেক কিছু বললেন আমায়।”

সমীরণের মুখটা শুকিয়ে গেল। একটু আগে মৃদুলই ওকে কল করে জানিয়েছে এ ব্যাপারটা। তবে মৃত্তিকার পরিবারের এই ব্যাপারে সম্মতি আছে নাকি অসম্মতি আছে সেই সব কিছু বলেনি। মৃদুলের কন্ঠটাও কেমন যেন বিষন্ন লাগছিল। এই থেকে সমীরণ আন্দাজ করেছিল বোধহয় ওনারা রাজি নয়। আর সেই কথাগুলো কি সাদ্দাম হোসেনকেও কল করে বলেছেন? নিশ্চয় অপমান করেছে। সাদ্দাম হোসেন নিশ্চয় অনেক কষ্ট পেয়েছে।

“কি বলেছে আব্বু?”

সমীরণের কন্ঠটা কাঁপল। দুটো কারণে। এক, নিজের বাবার অসম্মানের ভয়ে। আর দুই, মৃত্তিকাকে হারানোর ভয়ে।

সাদ্দাম হোসেন চেয়ারের সাথে পিঠ এলিয়ে দিয়ে চোখ দুটো বন্ধ করে একটা শ্বাস টেনে বললেন,

“ওনারা বললেন মৃত্তিকার সাথে তোর বিয়ের ব্যাপারে ওনারা কখনোই কিছু ভাবেননি। মৃত্তিকার বিয়ের ব্যাপারে তোর নাম কখনো ওনাদের মাথাতেই আসেনি। তোদের দুজনের সম্পর্ক তো ওনাদের সম্মুখে খুব একটা ভালো না। তাই ওনারা……”

“আপত্তি করেছেন তাইতো?”

“আপত্তি করেছিলেন। তবে তোকে অপছন্দ করে আপত্তি করেননি। ওনারা ভেবেছিলেন যে তোরা দুজন দুজনকে বোধহয় পছন্দ করিস না। তারপরে ওনারা মৃত্তিকার সাথে কথা বলেন। মৃত্তিকা তো এক বাক্যে রাজি হয়েছে। মূলত শেষে মৃত্তিকার আগ্রহ আর জোড়াজুড়িতে ওনারা নিশ্চিত হয়ে রাজি হয়েছেন এই সম্পর্কটা নিয়ে। সামনের সপ্তাহে আমরা ওনাদের বাড়ি যাচ্ছি বিয়ের পাকা কথা বলতে। মৃত্তিকা কে আংটি পরিয়ে রেখে আসবো। সেই সাথে বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করবো।”

এতক্ষণ গা এলিয়ে দিয়ে চোখ দুটো বন্ধ করে সাদ্দাম হোসেন কথাগুলো বলছিলেন। নিজের কথাগুলো বলা শেষে এবারে সোজা হয়ে বসে ছেলের দিকে তাকালেন। সমীরণ এমন অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে ওনার দিকে তাকিয়ে আছেন যেন উনি কোন অলৌকিক ঘটনা শোনালেন। এমন কোন ঘটনা ঘটা আদৌ সম্ভব না। কিন্তু সেই ঘটনাটাই যেন সাদ্দাম হোসেন সম্ভব হিসেবে বোঝালেন।

ছেলের এমন অদ্ভুত অভিব্যক্তি দেখে সাদ্দাম হোসেন হেসে ফেললেন। সমীরণের মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,

“তোর বাবা আমি। তোকে তোর থেকে ভালো বুঝি। আমি তো জানি রে বাবা তুই মৃত্তিকার ভালোবাসো বুঝতে চাস না কারণ হারিয়ে ফেলার ভয় করিস। তুই কখনো ভালোবাসা পাসইনি বলে ভালোবাসাকে ভয় করিস। কিন্তু ভালোবাসা যে প্রত্যেকটা মানুষই চায়। মৃত্তিকার সংস্পর্শে আমি তোকে বদলে যেতে দেখেছি। আমার রগচটা ছেলেটাও মৃত্তিকার সামনে শান্ত হয়ে যায়। আমার বদরাগী, অধৈর্য ছেলেটা মৃত্তিকার সামনে খুব বুঝদার, ধৈর্যশীল হয়ে যায়। তোর বাবা হয়ে আমি তো বুঝি আমার ছেলের সুখ কিসে। আমি জানতাম না যে ওরা সত্যিই রাজি হয়ে যাবে। তবে আমি মান অপমানের কথা ভাবিনি। আমার কাছে তো তোর খুশি আগে। আমার অবর্তমানে তোর খেয়াল রাখার মতন একজন মানুষকেই যে আমি খুঁজছিলাম। মৃত্তিকা তেমনই। যে আমার ছেলেটাকে একদম নিজের আঁচলে বেঁধে ঘরমুখো করতে পারবে।”

সমীরণ এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না ব্যাপারটা। আবারও অবিশ্বাস্য গলায় বলল,

“আব্বু সত্যি ওরা রাজি হয়ে গেছে! কিন্তু আমার যে মা নেই। আমার পরিবার বলতে শুধু তুমি আছো। তবুও ওরা আমার সাথে মৃত্তিকার বিয়ে দিতে রাজি হয়ে গেল!”

“হ্যাঁ হয়ে গেল। তোকে নিয়ে ওদের কোন অসুবিধা নেই। ওরা তোকে কোন নজরে দেখে সেটা আমি বুঝে গেছি। সবাই তোকে বিশ্বাস করে, ভালোবাসে। সেই সাথে আমি এটাও বুঝেছি তুই মৃত্তিকা কে কতটা ভালোবাসিস। তোর বাবাও তো কাউকে ভালোবেসেছিল। সে ভালোবাসার মর্ম বোঝে। ভালোবাসার স্পর্শে আমি শান্ত হয়ে গিয়েছিলাম। তাকে হারিয়ে আমি আরো শান্ত হয়ে গিয়েছিলাম। তবে আমি জানতাম তুই মৃত্তিকাকে হারানোর পর শান্ত হবি না। তুই আরো রগচটা হয়ে যাবি, গা ছাড়া হয়ে যাবি, সবকিছু থেকে তোর মায়া উঠে যাবে, নির্দয় হয়ে যাবি। নিজের ক্ষতি করতেও দ্বিধা বোধ করবি না। আমি যতদিন আছি ততদিন নাহয় খেয়াল রাখতাম। আমার যাওয়ার পরে আমার ছেলেটা যে এলোমেলো হয়ে যেত। ভেঙে চুরে যেত। আমি কি করে আমার ছেলেটাকে ভেঙে যেতে দিতে পারি!”

অনেকদিন পর সাদ্দাম হোসেন সমীরণের চোখে জল দেখলেন। ছেলেটা সহজে কাঁদেনা। মাঝে মাঝে অতিরিক্ত রাগের কারণে আবার কেঁদে বসে। যখন সাদ্দাম হোসেনের কষ্টের কথা মনে হয়, যখন চেয়েও ওনাকে নতুন করে আবার বিয়ে করার জন্য রাজি করাতে পারে না তখন খুব কষ্ট হয়।

তবে আজ তিনি ছেলের চোখের জলের মানে বুঝতে পারলেন না। তিনি কিছু বুঝে ওঠার চেষ্টাও করতে পারলেন না। তার আগেই সমীরণ উঠে এসে ওনাকে দুহাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। কিছু জিজ্ঞেস করলেন না সাদ্দাম হোসেন। শুধু পাল্টা জড়িয়ে ধরে থাকলেন। একটু পর সমীরণ নিজেই বলল,

“তোমাকে সব সময় বলতাম না আব্বু যে আরেকটা বিয়ে করে নাও। আমি তোমাকেও বলতাম যে আমি তোমার বিয়ে দিয়েই ছাড়বো। আমি কখনো বুঝতে পারিনি যে তুমি কেন বিয়ে করতে পারোনি এত দিনেও। তবে এখন আমি বুঝি আব্বু। ভালোবাসা কি সেটা যবে থেকে আমি নিজে বুঝতে পেরেছি তবে থেকে আমি তোমার জীবনে না এগোনোর কারণটাও ধরতে পেরেছি। আর সেদিন থেকেই ঠিক করেছি আমি আর কখনো তোমাকে বিয়ে করতে জোর করব না। কারো স্মৃতি আগলে বাঁচার মাঝেও একটা অদ্ভুত শান্তি আছে। একবার কাউকে মন থেকে ভালোবাসলে যে আর কখনো সামনে এগোনোর কথা ভাবা যায় না সেটাও আমি বুঝেছি আব্বু।”

সাদ্দাম হোসেন শুধু হাসলেন। তিনি জানতেন যেদিন তার ছেলে নিজে কাউকে ভালোবেসে ফেলবে সেই দিনই কেবল তার অবস্থানটা বুঝতে পারবে। আজ তাই হলো।

__________

বরাবরের মতো নিজের জুনিয়রদের সাথে মাঠে বসে আড্ডা দিচ্ছিল সমীরণ। মৃদুলের খোঁজ খবর তো আজকাল আর পাওয়াই যায় না। মৃত্তিকা আসেনি ভার্সিটিতে। সবার হাসি ঠাট্টায় একদম আড্ডা জমে গিয়েছে। এমন সময় মৃত্তিকা সমীরণের নাম ধরে ডাকতে ডাকতে সেখানে এল।

সমীরণ খিঁচে দুচোখ বন্ধ করে ফেলল। এখনো ভার্সিটির কেউই জানে না যে ওদের দুজনের বিয়ে ঠিক হয়েছে কিংবা দুইজন চুটিয়ে প্রেম করছে। বিয়ের আগে সমীরণ জানাতেও চাইছিল না কাউকে। ছোটরা এসব ব্যাপারে জানলে আবার মশকরা করা শুরু করবে যে ব্যাপার গুলো সমীরণের একদমই পছন্দ না। আবার ওদের সাথে ঝামেলা করাও যাবে না। কিন্তু এই মেয়েটা তো মনে হচ্ছে জানিয়েই ছাড়বে।

সমীরণের এসব ভাবনার মাঝেই মৃত্তিকা ধপ করে ওর পাশে বসে পড়ল। এক হাতে সমীরণের বাহু চেপে ধরে মাথা এলিয়ে দিয়ে বলল,

“সেই কখন থেকে তোমার ডাকছি। আমার ডাক শুনতে পাও না কেন তুমি?”

সমীরণ সম্মুখে বসা জুনিয়ারদের দিকে তাকাল। সবাই বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সমীরণ আসলে কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না। মৃত্তিকা বুঝল সমীরণের অসহায়ত্ব। সোজা হয়ে বসে ছেলে গুলোকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“এই, তোমরা বেয়াদবের মতন চুপচাপ বসে আছো কেন হ্যাঁ? দেখছো না ভাবি এসেছে। এখন ভাইকে ছেড়ে দাও। একটা সালাম পর্যন্ত দিলে না তোমরা ভাবিকে? একেই তো তোমাদের সিনিয়ার আমি তার উপরে আবার তোমাদের বড় ভাইয়ের বউ। সম্মান দিতে শেখোনি?”

ছেলেগুলো তৎক্ষণাৎ সবাই একযোগে সালাম দিয়ে উঠল,

“আসসালামু আলাইকুম ভাবি।”

মৃত্তিকা গম্ভীর গলায় বলল,

“ওয়ালাইকুম আসসালাম। এখন সবাই এখান থেকে যাও। ভাই এখন ভাবির সাথে ব্যস্ত।”

ছেলেগুলো আর এক মুহূর্ত সেখানে বসল না। চলে গেল। ওরা সেখান থেকে চলে যেতেই মৃত্তিকা এবারে কটমটে দৃষ্টিতে সমীরণের দিকে তাকিয়ে বলল,

“মুখ কি সেলাই করে এসেছো তুমি? কথা বেরোয় না কেন?”

“তুই কি একটু বেশি কথা বলছিস না? ভালোবাসি বলেছি বলে ভয়ডর কি সব একেবারে উধাও হয়ে গেল? ধমক কিন্তু আমি এখনো দিতে পারি। বেয়াদবি করলে দু একটা চড় মেরে মাড়ির দাঁত এখনো নড়িয়ে দিতে পারি আমি।”

মৃত্তিকা দাঁত বের করে হেসে এক হাতে সমীরণের গাল টেনে দিল।

“জানি সেসব তুমি কিছুই করতে পারবে না। আমি না তোমার হবু বউ। হবু বউয়ের গায়ে তুমি হাত তুলতে পারবে সমীরণ? তার থেকেও বড় কথা আমি তো তোমার ভবিষ্যতের বাচ্চার মাও। তুমি তোমার বাচ্চার মায়ের গায়ে হাত তুলতে পারবে সমীরণ? বলোনা তুমি আমার গায়ে হাত তুলতে পারবে? তুমি আমাকে ধমক দিতে পারবে? তোমার কষ্ট হবে না? আমি যদি কাঁদি তবে তোমার বুকে ব্যথা করবে না? তুমি আমার কান্না সহ্য করতে পারবে সমীরণ?”

মেয়েটার আসলে বড্ড বার বেরেছে। সমীরণ আসলেও আর এখন এসব করতে পারবে না। কিন্তু নিজের দূর্বলতা বুঝতে দেওয়া যাবে না। নয়ত আরো মাথায় চড়ে বসবে। বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

“ফট করে কানের নিচে একটা মেরে দিলেই বুঝবি আমি কি পারি আর কি পারি না। ক্লাসে যা তো। বিরক্ত করবি না। বাড়ির সম্পর্ক ভার্সিটি তে টেনে আনবি না। আগে যেমন ছিলাম এখনো তেমন আছি। লুতুপুতু প্রেম যে আমার দ্বারা হবে না সেটা তুই খুব ভালো করেই জানিস মৃত্তিকা।”

কথাটা বলে সমীরণ হাঁটা দিল। গন্তব্য কি জানেনা। আপাতত মৃত্তিকার হাত থেকে বাঁচতে চাইছে। তবে বাঁচতে পারল না। মৃত্তিকা উঠে দৌঁড়ে এসে আবারো পাশাপাশি হাটা ধরল। নিজ থেকেই সমীরণের হাতটাও ধরল।

“আমাকে একা ফেলে কোথায় যাচ্ছো হু? বলেছিলাম না সেদিন, তুমি চাইলেও আর আমার পিছু ছাড়াতে পারবে না। ভূত হয়ে ঘাড়ে চেপে বসে থাকব সারা জীবন।”

এবারে হাসল সমীরণ। মৃত্তিকার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর নিজেই মৃত্তিকার হাতটা শক্ত করে ধরল। ভুত-প্রেত যা ইচ্ছে হয় তাই হয়েই থাকুক। তবুও থাকুক।

চলমান।