Home "ধারাবাহিক গল্প "যেখানে মন ভেজে চুপচাপ যেখানে মন ভেজে চুপচাপ পর্ব-১৬ এবং শেষ পর্ব

যেখানে মন ভেজে চুপচাপ পর্ব-১৬ এবং শেষ পর্ব

0
3

#যেখানে_মন_ভেজে_চুপচাপ
#অন্তিম_পর্ব
#লেখনিতে_খুশবু_আকতার

বাসস্ট্যান্ডে প্রায় বিশ মিনিট যাবত বসে আছে মৃত্তিকা। গিয়েছিল বাপের বাড়ি। সেখান থেকেই ফিরছে। ঘড়িতে সময় তখন দুপুর সাড়ে তিনটে। মৃত্তিকা একাই বাড়ি যেতে পারত। তবে সমীরণের নির্দেশ একা যেন না যায়। বাসস্ট্যান্ডেই যেন বসে অপেক্ষা করে। সমীরণ এসে নিয়ে যাবে। সমীরণের কথা অমান্য করার ইচ্ছে নেই মৃত্তিকার। সেজন্য চুপচাপ বসে আছে।

সময়টা ডিসেম্বর মাস। বেশ ভালোই ঠান্ডা পড়েছে। মৃত্তিকার গায়ে কোন সোয়েটার নেই। একটা চাদর জড়ানো। সূর্যের দেখা সকাল থেকে পাওয়া যায়নি। এখন যদিও কুয়াশা নেই। তবে ঠান্ডা বেশ ভালোই নেমেছে। এই ঠান্ডা আবহাওয়ার মাঝে মৃত্তিকার কেন যেন গরম লাগছে। চাদরটা খুলে ভাঁজ করে হাত ব্যাগে রাখল। হঠাৎ করে আইসক্রিম খেতে ইচ্ছে করল। মৃত্তিকা জানে সমীরণ কোনমতেই ওকে ঠান্ডার দিনে আইসক্রিম খেতে দেবে না। তাই সমীরণ আসার আগেই আইসক্রিম খেয়ে নেবে ভাবল।

ব্যাগ নিয়ে উঠে দোকানের দিকে যেতে ধরলে সম্মুখে এসে কেউ একজন দাঁড়ালো। হঠাৎ করে এসে দাঁড়ানোয় মৃত্তিকা খানিকটা চমকে উঠে কয়েক কদম পিছিয়ে গেল। মাথা তুলে তাকাতেই দেখল প্রফেসর শাফায়াত কিবরিয়া দাঁড়িয়ে আছে।

বিয়ের পর থেকে শাফায়াত আর বিরক্ত করে না। তবে কেমন যেন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকায়। ক্লাসে কারণে অকারণে দুর্ব্যবহার করে। মৃত্তিকা আরেকটা ব্যাপার খেয়াল করেছে পরীক্ষার নাম্বারও কম দেয়। ফেল করায় না ঠিক। তবে অনেক কম নাম্বার পায়। টেনেটুনে পাশ করা বলে যাকে। এসব সঙ্গত কারণে মৃত্তিকা যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে। তবে মানুষটার একটু লজ্জা শরম কম। সুযোগ পেলে নিজ থেকেই সামনে এসে দাঁড়ায়। বিশেষ করে যদি দেখে সমীরণ সাথে নেই।

মৃত্তিকার কথা বলার ইচ্ছে হলো না শাফায়াতের সাথে। চুপচাপ ওকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে ধরলে শাফায়াত বলে উঠল,

“পাবলিক বাসে যাতায়াত করো?”

থামল মৃত্তিকা। অযথা শত্রুতা বাড়িয়ে লাভ নেই। ক্ষতি মৃত্তিকারই। সেই জন্য অনিচ্ছা সত্ত্বেও উত্তরে বলল,

“হ্যাঁ।”

“তোমার হাজব্যান্ড কে দেখছি না যে?”

“কাজে আছে। নিতে আসছে আমাকে।”

“কাজে আছে! চাকরি পেয়েছো? ওকে কে দিল চাকরি?”

তীব্র ব্যঙ্গ প্রকাশ পেল শাফায়াতের কন্ঠে। মৃত্তিকার রাগ হলেও নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করল।

“সমীরণ কে কি আপনার মূর্খ মনে হয়? ও ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট। টপ রেজাল্ট করে বেরিয়েছে। ও নিজের যোগ্যতায় চাকরি পেয়েছে।”

“যোগ্যতা!”

শব্দটা উচ্চারণ করে শাফায়ত আবারও ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো। ব্যঙ্গ করল বোধহয়। কিছুক্ষণ আনমনে হেসে আবারও মৃত্তিকাকে বলল,

“জানো তো মৃত্তিকা, তোমরা মেয়েরা সবসময় লাইফ পার্টনার চুজ করতে ভুল করো। আজ যদি আমার প্রস্তাবে রাজি হয়ে যেতে তাহলে পাবলিক ট্রান্সপোর্টে তোমাকে যাতায়াত করতে হত না। তোমার ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড তো সমীরণের থেকেও বেশ ভালো ছিল। তুমি এডজাস্ট করতে পারো ওর সাথে? আমার বউ হয়ে এলে সবকিছু পেতে। ওই যে দেখো, গাড়িতে আমার ওয়াইফ বসে আছে। ও আমার কাছে আবদার করেছিল ওর ইউরোপ ট্যুরে যাওয়ার খুব ইচ্ছে। নেক্সট মান্থ আমি ওকে নিয়ে ইউরোপ ট্যুরে যাচ্ছি। আফসোস হচ্ছে কি এখন? অনেক বড় একটা অপারচুনিটি মিস করে গেলে, তাই না?”

শাফায়াত সত্যি আশা করেছিল যে এত কিছু শুনে মৃত্তিকার একটু হলেও আফসোস হবে। হওয়াটা কি যৌক্তিক না? শাফায়াতের কাছে সব আছে। সব সময় সব দিক থেকে সমীরণের চেয়ে এগিয়ে ছিল। কিন্তু তারপরেও মৃত্তিকার মতন সাধারণ একটা মেয়েকে পেল না। মৃত্তিকার কি যোগ্যতা ছিল শাফায়াতের স্ত্রী হওয়ার? তারপরও শাফায়াত ওকে নিজের স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে চেয়েছিল। আর এই মেয়ে তেজ দেখিয়ে মানা করেছিল। এমন একটা ছেলেকে শাফায়াতকে ছেড়ে বেছে নিয়েছে যে শাফায়াতের নখেরও যোগ্য না।

তবে মৃত্তিকার মাঝে বিন্দুমাত্র কোন আফসোস দেখা গেল না। তাচ্ছিল্য হেসে বলল,

“আফসোস তো আপনার স্ত্রীর করা উচিত। ভাবুন তো কতটা পোড়া কপাল কিংবা ফাটা কপাল হলে আপনার মতন একজনের সাথে বিয়ে হয় যে নিজের স্ত্রীকে গাড়িতে রেখে অন্যের স্ত্রীর মনে তাকে না পাওয়ার জন্য আফসোস জাগাতে এসেছে। আপনি আপনার স্ত্রী কে নিয়ে পুরো বিশ্ব ঘুরলেও কখনো একজন ভালো স্বামী হতে পারবেন না। কারণ আপনার সবকিছুই লোক দেখানো। স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা না। টাকার গরম দেখাচ্ছেন আপনি।”

“টাকার গরমই তো সব। টাকা ছাড়া কিছু হয় নাকি! ভালোবাসা দেখাতে গেলেও টাকাই লাগে। তোমার হাজবেন্ড এর কাছে সেটা নেই জন্য টাকার গুরুত্ব কে তুমি উপেক্ষা করতে পারো না।”

মৃত্তিকা কোন উত্তর দেওয়ার আগেই ওর দৃষ্টি গেল রাস্তার অপর পাশে। সমীরণ বাইক ঘোরাচ্ছে। এখনো বোধহয় মৃত্তিকাকে দেখেনি। নতুন নতুন চাকরি পেয়েছে সমীরণ। ভীষণ ব্যস্ত থাকে। ছুটি পাওয়া প্রায় অসম্ভবই বলা যায়।

মৃত্তিকা জানে এই অসময়ে সমীরণের এখানে আসতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। এর জন্য হয়ত অনেক রাত অবধি আজ অফিসে থেকে কাজ করতে হবে। কিন্তু তবু এসেছে শুধুমাত্র মৃত্তিকাকে নিতে।

একা চলাফেরা করে না মৃত্তিকা। রাস্তাঘাট এখনো তেমন একটা চেনে না। রাস্তায় অতিরিক্ত ভিড়ভাট্টা থাকলে রাস্তা পার হতে পারে না। শুধুমাত্র মৃত্তিকার যেন কোন অসুবিধা না হয় সেজন্য নিজের সুবিধা অসুবিধাকে দূরে ঠেলে এসেছে সমীরণ।

আজ প্রায় দেড় বছরের সংসারে কোনদিন এক মুহূর্তের জন্য ভালোবাসার কমতি অনুভব করতে দেয়নি। যখন যা চেয়েছে তাই এনে দিয়েছে। মৃত্তিকার দোষ গুলো সব সময় ঢেকে রেখেছে। কারো সামনে কখনো ছোট হতে দেয়নি। না নিজে কখনো অসম্মান করেছে। বাকি রইল টাকার অভাব। সেটা তো মৃত্তিকা কখনো অনুভবই করতে পারেনি। মৃত্তিকার চাহিদাই তো ছিল খুব সামান্য। তিন বেলা খেয়ে দেয়ে সমীরণের সাথে জীবনটা কাটানো। সেটা তো খুব ভালোভাবে করতে পারছে। তাহলে আর আফসোস করবেটা কি নিয়ে!

মৃত্তিকা আঙুলের ইশারায় শাফায়াতকে সমীরণ কে দেখিয়ে বলল,

“ওই যে দেখুন আমার স্বামী আসছে। যে ভুলক্রমেও কখনো অন্য কোন মেয়ের দিকে চোখ তুলেও তাকায় না। আর একবার নিজের দিকে তাকিয়ে দেখুন। স্ত্রীকে বসিয়ে রেখে আমার মনে আফসোস জাগাতে চলে এসেছেন। এখানেই হেরে গেছেন আপনি সমীরণের কাছে। আমি সমীরণের ভালোবাসা। আর আপনার জন্য শুধুই জেদ। নিজেকে আর ছোট প্রমাণ করবেন না। স্ত্রীর কাছে যান। যার দায়িত্ব নিয়েছেন তাকে ঠকাবেন না। মানুষ হতে শিখুন।”

___________

দিনটা শুক্রবার। আজ আর অফিসে যাওয়ার কোন তাড়া নেই সমীরণের। তারপরও খুব বেশিক্ষণ ঘুমোতে পারল না সমীরণ। শীতের সময় এত সকাল সকাল সমীরণ কে ঘুম থেকে টেনে তোলা একসময় অসম্ভব ছিল বলা যায়। এখন সমীরণের বয়স বেড়েছে। দায়িত্ববোধ বেড়েছে। শরীর থেকে অলসতাও কমেছে। সকাল সকাল উঠে গেছে বাজারে।

আজ প্রায় দু মাস যাবত সাদ্দাম হোসেন অসুস্থ। চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন তিনি। তার শারীরিক অসুস্থতা যে আসলে কি সেটাই ধরা যাচ্ছে না। তিনি কোনো কাজে হাত দেন না। বলা যায় তাকে কোন কাজে হাত দিতে দেওয়া হয় না। আগে উনি যে সমস্ত দায়িত্ব পালন করতেন এখন সমীরণ সেইসব দায়িত্ব পালন করে। আর ঘর-সংসার সামলায় মৃত্তিকা।

দেড় বছরে সব ধরনের রান্না বান্নাই শিখে গেছে মৃত্তিকা। সকাল সকাল উঠে রান্নাঘরে গেছে। সমীরণকে বাজার থেকে মাংস আনতে বলেছে। ভুনা খিচুড়ি রান্না করবে। সমীরণ আসার আগে বাদ বাকি কাজগুলো সেরে রাখছে।

মৃত্তিকার এসব কাজ করতে করতেই সমীরণ চলে এল। পুরো সপ্তাহের বাজার একদিনেই করে সমীরণ। তাই বাজারের পরিমাণটাও অনেক হয়। সেইসব গোছাতে গোছাতে অনেকটা সময় লেগে যায় মৃত্তিকার। সমীরণও সাহায্য করে যতটা পারে।

কাঁচা মাছ মাংসের গন্ধ মৃত্তিকা একদমই সহ্য করতে পারে না। মাছ বাজার থেকে কেটেই আনে। তবে সেগুলো ধুঁয়ে আলাদা আলাদা বক্সে ভরে ফ্রিজে তুলে রাখার দায়িত্বটা সমীরণকেই পালন করতে হয়।

আজ বাজার থেকে আসার সময় ভাপা পিঠাও কিনে এনেছে সমীরণ। মৃত্তিকার ভীষণ পছন্দের। পিঠাওয়ালা কে বলে বেশি করে গুড় আর নারিকেল দিয়ে বানিয়ে এনেছে। মৃত্তিকা আগে কাজ সব শেষ করতে চাইল। তবে সমীরণ ওকে সেসব আগেই করতে দিল না। সামনে বসিয়ে মৃত্তিকা কে আগে ভাপা পিঠা খেতে বলল। মৃত্তিকা জানে জেদ দেখিয়ে লাভ নেই, পেরে উঠতে পারবে না।

মানুষটার রাগ কমেছে, বাউন্ডুলে ভাব কমেছে। তবে জেদ কমেনি। যেটা বলবে সেটাই করবে। সমীরণ খারাপ কিংবা অন্যায় কিছু করতে বলে না। সেজন্য মৃত্তিকারও আপত্তি থাকে না।

মৃত্তিকা কে যতটুকু সম্ভব সাহায্য শেষে সমীরণ গেল সাদ্দাম হোসেনের ঘরে। সাদ্দাম হোসেনের ঘরের সাথে একটা ছোট্ট বারান্দা আছে। শীতের সকালে বেশ ভালোই রোদের তাপ পাওয়া যায় সেখানে বসলে। একটু আগে মৃত্তিকা এক কাপ চা আর টোস্ট দিয়ে গেছেন। উনি কখন কি খান তার ঠিক নেই। এখন হয়ত টোস্ট আর চা খেলে খিচুড়ি খেতে পারবেন না। তবে ওনার ইচ্ছে হয়েছিল একটু চায়ে টোস্ট ভিজিয়ে খাওয়ার। সেজন্য সমীরণ বাধা দেয়নি। মৃত্তিকাকেও বলে রেখেছে ওর বাবা যখন যা চায় তাই যেন দেয়। কোন রকম যেন কোন কষ্ট না দেয়।

সাদ্দাম হোসেন তখন পত্রিকা পড়ছেন। সারাদিন রাত মিলিয়ে এখন তার এই একটাই কাজ। পত্রিকায় প্রথম পাতা থেকে শুরু করে শেষ পাতার প্রত্যেকটা খবর খুব মনোযোগ দিয়ে পড়া। মাঝে মাঝে একই খবর দিনে দু-তিনবারও পড়া হয়ে যায়।

সমীরণ ওনার মুখোমুখি একটা চেয়ার টেনে বসল। ছেলেকে বসতে দেখে সাদ্দাম হোসেন চোখ তুলে তাকিয়ে পত্রিকাটা ভাঁজ করে সামনের ছোট টেবিলটার উপর রেখে দিলেন।

“শরীর ভালো আছে আব্বু?”

শরীরটা আসলে খুব একটা ভালো নেই সাদ্দাম হোসেনের। রাতে জ্বর এসেছিল। সে কথা ছেলেকে জানানো হয়নি। জানালে আবার তাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে ছুটবে৷ ডাক্তার একগাদা ওষুধ লিখে দেবে। এত ওষুধ খেতে ওনার ভালো লাগেনা। তাই তিনি যতটা সম্ভব ছেলের সামনে নিজেকে সুস্থ প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। চায়ের কাপে একটা চুমুক বসিয়ে বললেন,

“আমার আবার কি হবে? এইতো দেখ দিব্যি ভালো আছি। আমি তোর থেকেও বেশি ফিট।”

“থাক আর মিথ্যে বলতে হবে না। কাল বিকেলে তৈরি থেকো। আমি অফিস থেকে এসে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো।”

সাদ্দাম হোসেন বিরক্তি মাখা গলায় বললেন,

“আবার ডাক্তারের কাছে কেন নিয়ে যেতে হবে? কোন কি উপকার পাচ্ছিস? কোন রোগই তো ধরতে পারেনা। আমি সুস্থ আছি তো।”

“সুস্থ আছো তাহলে ডাক্তারের কাছে গেলে সমস্যা কি? রেগুলার চেকআপ করাবো। আর আমি এই ব্যাপারে কোন আপত্তি শুনতে চাই না। আমি যখন বলেছি ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো তার মানে নিয়ে যাবই।”

ছেলের জেদের কাছে বরাবরই হার মানতে হয়েছে সাদ্দাম হোসেন কে। আজও তাই হার মানলেন। আর কথা বাড়ালেন না। সমীরণ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল সাদ্দাম হোসেনের মুখের দিকে। ওনার চেহারার রংটা কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। চোখের নিচে কালি জমেছে। দেখেই মনে হয় কি দুর্বল তার শরীর! যেন কোন কঠিন রোগ বাসা বেঁধেছে।

সাদ্দাম হোসেন খেয়াল করলেন ছেলে তার দিকে নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। তিনি একটু হেসে উঠে বলেন,

“এভাবে তাকিয়ে কি দেখছিস? বুড়ো হয়ে গেছে তোর বাবা। এখন আর সৌন্দর্য নেই চেহারায় যে তুই এভাবে তাকিয়ে থাকবি।”

সমীরণ চেয়ার থেকে উঠে গিয়ে সাদ্দাম হোসেনের পায়ের কাছে বসে পড়ল। শীতের দিনের মেঝে ভীষণ ঠান্ডা। তবে সেই ঠান্ডা অনুভব করতে পারল না সমীরণ। সাদ্দাম হোসেনের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে বলল,

“আচ্ছা আব্বু, বলো না তোমার কি করতে ইচ্ছে করে? তুমি কোথাও ঘুরতে যেতে চাও? তুমি বলো কোথায় ঘুরতে যেতে চাও আমি নিয়ে যাব তোমায়। আচ্ছা তোমার কোন বন্ধু বান্ধব নেই? তাদের সাথে তো একটু আড্ডাও দিতে পারো। তুমি আজকাল ঠিক করে খাও না কিছু। কি খেতে ইচ্ছে করে তোমার আমায় বলতো৷ যেখান থেকে হোক আমি সেটা আনব। সারাদিন বাসায় বসে শুধু পত্রিকাই পড়ো। তুমি বই পড়বে? কি বই পড়বে আমাকে নাম বল আমি এনে দেব। আচ্ছা চলো আজ বিকেলে আমরা তিনজন কোথাও ঘুরতে যাই। তোমার হয়ত ভালো লাগবে। তুমি বলো না কি কি করলে তোমার ভালো লাগবে, তুমি ভালো থাকবে, তুমি একটু হাসবে। তোমাকে সুস্থ কি করে করি আমি বলতো!”

সাদ্দাম হোসেন আলতো হেসে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আদুরে গলায় বললেন,

“এগুলো কিছুই করতে হবে না। রাতে কাজ শেষে বাড়ি ফিরে যখন তুই সময় বের করে আমার সাথে গল্প করতে আসিস অতটুকুই তো আমার জন্য যথেষ্ট। তুই না থাকলে সারাদিন মৃত্তিকা আমার ঘরে আসে। এটা ওটা বকবক করতেই থাকে মেয়েটা। মনে হয় আমি যেন ওর সমবয়সী। এমনিতেই তো আমার মন ভালো হয়ে যায়। আমি যখন দেখি আমার বাউন্ডুলে ছেলেটা ঘরমুখো হয়েছে তখন আপনা আপনি আমার মন ভালো হয়ে যায়। যা চেয়েছি সব পেয়েছি। বয়স বেড়েছে অসুস্থতা স্বাভাবিক। তুই এত চিন্তা করিস না।”

সমীরণ নিজের মাথাটা সাদ্দাম হোসেন হাঁটুর ওপর এলিয়ে দিল। মুখে আর কিছু বলল না। সাদ্দাম হোসেন শুধু হাত বুলিয়ে দিলেন ছেলের মাথায়।

_________

দুপুরে খাওয়া-দাওয়া শেষে সমীরণ মৃত্তিকাকে টেনেই ঘরে নিয়ে এসেছে। সপ্তাহে একটা দিনই দুপুর সময়টাতে বউকে কাছে পায়। বাকি দিনগুলোতে তো এই সময় অফিসে বসের ঝাড়ি খেতেই চলে যায়। আর এই মেয়ে এমন সময় বাড়ির কাজে ব্যস্ত। অত সহজ নাকি কাজ করা! সমীরণ টেনেই এনেছে ঘরে এবং জোর করে মৃত্তিকাকে টেনে ধরে শুইয়েছে। এখন নিজেও জাপ্টে মৃত্তিকার কোমর জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে। ইচ্ছে ঘুমোনোর। চোখটা লেগেও এসেছে। এমন সময় ফোনটা বেজে উঠলো।

বিরক্তি তে নাক মুখ কুঁচকে রিসিভ করে কানে ধরতেই মৃদুলের কন্ঠস্বর ভেসে এল।

“কিরে কোথায় তুই?”

এমন অহেতুক অদ্ভুত প্রশ্ন সমীরণের মোটেই ভালো লাগল না। ছুটির দিনেই দুপুর সময় কোথায় থাকবে? অবশ্যই নিজের বাড়িতে। তবে সহজ ভাবে উত্তরটা দিতে পারল না। ত্যাড়ামি করল,

“তোর শ্বশুর বাড়িতে। আমার বউ তো রান্নাবান্না করা ছেড়ে দিয়েছে। তাই তোর বউয়ের হাতের রান্না খেতে এসেছি।”

“একটা সহজ কথার সহজ ভাবে উত্তর দিতে পারিস না?”

“বা ল মার্কা প্রশ্ন করলে বা লে র মতনই উত্তর পাবি। ছুটির দিনে ভর দুপুরবেলা নিজের ঘরে থাকবো না তো আর কোথায় থাকবো হে!”

“আচ্ছা বিকেলে দেখা করিস। অনেকদিন হলো আড্ডা দেওয়া হয় না।”

সমীরণ আপত্তি জানিয়ে বলল,

“সম্ভব হবে না। আমি বাড়ি থেকে বেরোবো না।”

মৃদুল ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,

“কেন?”

“একটা দিন ছুটি পেয়েছি বউকে না দিয়ে তোকে দেবো কেন? তোর নাহয় বউ নেই জন্য তুই বউয়ের মর্যাদা বুঝিস না। আমার আছে। বউকে রেখে বাড়ি থেকে বের হতে ভালো লাগেনা। আর এখন ফোন রাখ। গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছি আমি।”

“কি গুরুত্বপূর্ণ কাজ?”

সমীরণ বিরক্তি ভরা গলায় বলল,

“যা করছি সেটা তোকে বলতে পারব না। তুইই লজ্জা পাবি। তারপরও যদি শোনার ইচ্ছে থাকে বল, বলছি।”

মৃদুলের রুচি হলো না আর কিছু শোনার। এই ছেলের সাথে বোনের বিয়ে দিয়েও বিপদে পড়েছে। কিছু বলতেও পারেনা। ভেবেছিল মৃত্তিকার ছোঁয়ায় বোধহয় ছেলেটা শোধরাবে। অনেকটাই শুধরেছে। তবে সেটা শুধুমাত্র মৃত্তিকার ক্ষেত্রেই। বাকিদের ব্যাপারে আগে যেমন ত্যাড়া ছিল এখনও ঠিক তেমনি ত্যাড়াই আছে। আর দিন দিন ত্যাড়ামো বেড়েই চলেছে।

এক বুক কষ্ট নিয়ে মৃদুল ফোনটা কেটে দিল। সেই সাথে অনুভব করতে পারল ছুটির দিনে শীতের দুপুরে বিছানায় পাশে একটা বউ থাকা ভীষণ দরকার ছিল। তাহলে হয়ত মৃদুলেরও বাইরে বেরোনোর তাড়া থাকত না। সমীরণও এভাবে অপমান করতে পারত না। এখন মনে হচ্ছে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শশী কে ঘরে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।

ফোনটা রেখে সমীরণ আবারো মৃত্তিকা কে জড়িয়ে ধরে ওর গলার ভাঁজে মুখ ডুবিয়ে ঘুমোনোর চেষ্টা করল। মৃত্তিকা মাথায় হাত বুলিয়ে দিল যেন তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে যায় সমীরণ আর ও উঠে বাড়ির কাজ করতে পারে। তবে সমীরণ আর ঘুমোলো না। এখন মোচড়ামুচড়ি করছে আর টেনেই মৃত্তিকাকে নিজের কাছে আনার চেষ্টা করছে। অথচ আর এগোনোর মতন জায়গা নেই। এর থেকে বেশি কাছাকাছি আসা সম্ভব নয়। মৃত্তিকা বিরক্ত হয়ে বলল,

“চুপচাপ ঘুমোবে কি তুমি নাকি আমি উঠে যাব?”

“ঘুম ধরছে না তো। ভালো লাগছে না।”

“তাহলে বাইরে থেকে ঘুরে এসো। ভাইয়া তো ডাকল। যাও দেখা করে এসো, ভালো লাগবে।”

সমীরণ আপত্তি জানিয়ে বলল,

“না। ভালো লাগে না বাইরে যেতে। সপ্তাহের ছয়টা দিন আমি অফিসে বসে বাড়ি ফেরার জন্য ছটফট করি। একদিন ছুটি পেয়ে বাইরে কাটাব না আমি। তোমায় আর আব্বু কে সময় দেব। তুমি আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরো আমায়। তাহলেই ভালো লাগবে।”

মৃত্তিকা আলতো হেসে উঠে বলল,

“বাউণ্ডুলে, ছন্নছাড়া মানুষটা হঠাৎ করে এমন ঘরমুখো কি করে হয়ে গেল বলোতো? সংসার করতে পারবে না সেই ভয়ে বারবার আমায় ফিরিয়ে দিয়েছো। আর এখন সংসারের বাইরে কিছুই বোঝ না। এতটা পরিবর্তন হলো কি করে তোমার?”

সমীরণ মৃত্তিকার গলার ভাঁজে আলতো করে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,

“ঘরে ফেরার কোন তাড়া ছিল না। তাই কখনো ঘরমুখো হতে পারিনি। ঘর টানে নাকি তুমি টানো বুঝিনা। তবে এখন সংসার, তুমি আর আব্বুর বাইরে কিছু ভাবতেই ইচ্ছে করেনা। আর এই পরিবর্তনের কারণ শুধুই তুমি।”

“সত্যি!”

গলার ভাঁজ থেকে সমীরণ মুখ তুলে তাকাল মৃত্তিকার দিকে। কপালে পড়ে থাকা চুলগুলো কানের পিঠে গুঁজে দিয়ে বলল,

“হ্যাঁ সত্যি। তুমি আমার ঘরের শোভা, এই বাড়ির প্রাণ। মাঝে মাঝে ভাবি জানোতো, তুমি না এলে কি হত আমার। এতদিনে হয়ত এলোমেলো হয়ে যেতাম। কবেই না জানি নিজেকে হারিয়ে ফেলতাম। সেই ছোট্ট স্কুল পড়ুয়া মেয়েটা যে আমায় দেখলে ভয়ে থরথরিয়ে কাঁপত। অথচ দরজার আড়ালে লুকিয়ে আমাকে দেখার সুযোগ ছাড়ত না সে আজ আমার ঘরের বউ। বিশ্বাসই হয় না আমার। ভাগ্যিস সেই ভীতু মেয়েটা সাহস করে বলেছিল যে সে আমায় ভালোবাসে। নয়ত আমার মতন ছন্নছাড়া পাগল কে, কে সামলে রাখত!”

পূর্বের মতনই আবারো জড়িয়ে ধরল সমীরণ মৃত্তিকা কে। সমীরণের কোঁকড়ানো চুলের মাঝে মৃত্তিকা একটা চুমু দিয়ে বলল,

“সারাজীবন আগলে রাখব। তুমি যে আমার অনেক সাধনার ফল। নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছি তোমার ভালোবাসায়। শেষ নিঃশ্বাস অব্দি এভাবেই ভালোবেসে যাব, সমীরণ।”

সমাপ্ত।