Home "ধারাবাহিক গল্প "তু্ই আমার তু্ই আমার পর্ব-১৮

তু্ই আমার পর্ব-১৮

0
6

#তুই_আমার
#সামিয়া
পর্ব _১৮

[কপি করা নিষিদ্ধ ]

নুহার ভরা মাস চলছিল। এতদিনের অপেক্ষার পর সেই সময়টা অবশেষে চলে এসেছিল, যার জন্য পুরো বাড়ি যেন অধীর হয়ে অপেক্ষা করছিল। বাড়ির প্রতিটা মানুষ এখন নুহাকে ঘিরেই ব্যস্ত। তার হাঁটাচলা, বিশ্রাম, খাওয়া সবকিছুর দিকেই সবার নজর ছিল।

সেদিন সকালটাও অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই নুহার শরীরটা খারাপ লাগতে শুরু করল। প্রথমে সবাই ভেবেছিল, হয়তো স্বাভাবিক কিছু অস্বস্তি। কিন্তু সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নুহার অবস্থার পরিবর্তন হতে থাকায় বাড়ির সবাই চিন্তিত হয়ে পড়ল।

ঊষান তখন এক মুহূর্তও দেরি করেনি। যে মানুষটা কঠিন পরিস্থিতিতেও মাথা ঠান্ডা রাখতে পারে, সেদিন নুহাকে নিয়ে তার চোখেমুখে স্পষ্ট দুশ্চিন্তা ছিল। নিজের সব কাজ, সব ব্যস্ততা ভুলে সে শুধু নুহার পাশেই ছিল।

দ্রুত নুহাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। পুরো পথটা ঊষানের কাছে যেন অস্বাভাবিক দীর্ঘ মনে হচ্ছিল। নুহার হাত শক্ত করে ধরে সে শুধু চাইছিল, সবকিছু যেন ঠিক থাকে।

হাসপাতালে পৌঁছানোর পর ডাক্তাররা দ্রুত নুহাকে নিয়ে গেলেন। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ঊষানের জন্য অপেক্ষার প্রতিটা মুহূর্ত যেন অনেক ভারী হয়ে উঠছিল। জীবনে অসংখ্য কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া এই মানুষটাও আজ নিজের অনুভূতির কাছে অসহায় হয়ে পড়েছিল।

কিছুক্ষণ পর হাসপাতালের করিডোরে ভেসে এলো সেই প্রতীক্ষিত খবর। ডক্টর এসে জানালো নুহা আর তার সন্তান দুজনেই ভালো আছে।খবরটা শুনে ঊষান কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। এতদিনের ভয়, দুশ্চিন্তা আর অপেক্ষার পর তার চোখে যেন স্বস্তির ছাপ ফুটে উঠল।

যখন তাকে ভেতরে যেতে দেওয়া হলো, ঊষানের প্রথম দৃষ্টি গেল নুহার দিকে। ক্লান্ত হলেও নুহার মুখে ছিল এক অদ্ভুত শান্তি। আর তার পাশে ছিল তাদের ভালোবাসার নতুন এক অংশ।

ঊষান কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারল না। শুধু নুহার দিকে তাকিয়ে রইল। এই মানুষটার সঙ্গে তার পথটা কখনো সহজ ছিল না অভিমান ছিল, ভুল বোঝাবুঝি ছিল, দূরত্বও ছিল। কিন্তু আজ সেই সবকিছুর শেষে তারা দাঁড়িয়ে আছে এক নতুন পরিচয়ের সামনে।নুহা আর ঊষান এবার শুধু দুজন মানুষ নয়, তারা একসঙ্গে একটি নতুন জীবনের দায়িত্ব নিয়েছে।আজ এই হাসপাতালের সেই ছোট্ট মুহূর্তেই তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় অধ্যায়ের শুরু হলো।

অপেক্ষার শেষ হলো। দীর্ঘ নয় মাসের প্রতীক্ষার পর অবশেষে নুহা আর ঊষানের জীবনে এলো তাদের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। তাদের ভালোবাসার অংশ হয়ে পৃথিবীতে এলো এক ছোট্ট কন্যা সন্তান।

হাসপাতালের সেই মুহূর্তটা যেন দুজনের কাছেই স্বপ্নের মতো ছিল। এতদিন যে ছোট্ট প্রাণটাকে ঘিরে তারা শুধু কল্পনা করেছে, আজ সেই প্রাণই তাদের সামনে। ছোট্ট দুটো চোখ, নিষ্পাপ মুখ আর ক্ষুদ্র অস্তিত্ব নিয়ে সে যেন পুরো পৃথিবীটাই বদলে দিল।

ঊষান, যে মানুষটা সবসময় নিজের অনুভূতি লুকিয়ে রাখতে অভ্যস্ত, সেদিন নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারল না। তার চোখে ছিল বিস্ময়, আনন্দ আর এক গভীর মায়া। জীবনে অনেক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া মানুষটা আজ প্রথমবারের মতো বুঝল, এই ছোট্ট মানুষটার সামনে তার সব শক্ত ভাব যেন অপ্রয়োজনীয়।

নুহা ক্লান্ত শরীর নিয়েও যখন নিজের সন্তানের দিকে তাকাল, তার চোখে ফুটে উঠল এক অন্যরকম শান্তি। এতদিনের কষ্ট, ভয় আর অপেক্ষার পর নিজের সন্তানকে কাছে পাওয়ার অনুভূতি যেন সবকিছুকে ছাপিয়ে গেল।

ঊষান ধীরে নুহার পাশে এসে দাঁড়াল। তার দৃষ্টি বারবার চলে যাচ্ছিল ছোট্ট কন্যার দিকে। মনে হচ্ছিল, জীবনে পাওয়া সবচেয়ে মূল্যবান দায়িত্বটা আজ তার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।

সেই ছোট্ট কন্যা শুধু তাদের ঘরেই আলো নিয়ে আসেনি, বরং নুহা আর ঊষানের সম্পর্কের মাঝেও এক নতুন বন্ধন তৈরি করেছে।

✦ ✦ ✦ ✦ ✦ ✦

হাসপাতালের কেবিনে তখন এক অন্যরকম শান্তি বিরাজ করছিল। এতদিনের অপেক্ষা, দুশ্চিন্তা আর ভয়ের পর অবশেষে ঊষান নিজের ছোট্ট পরীকে প্রথমবারের মতো কোলে নিল।

যে মানুষটা জীবনের কঠিন মুহূর্তেও নিজের আবেগ কাউকে দেখায়নি, সেই ঊষান আজ নিজের অনুভূতি ধরে রাখতে পারল না। ছোট্ট কন্যাটাকে বুকের কাছে ধরে কিছুক্ষণ শুধু তাকিয়ে রইল। এত ছোট একটা প্রাণ, অথচ তার পুরো পৃথিবীটা যেন মুহূর্তের মধ্যে বদলে দিল।

তার চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল গত কয়েক মাসের সবকিছু নুহার কষ্ট, তাদের ভুল বোঝাবুঝি, দূরত্ব, আবার ধীরে ধীরে কাছে আসা। আর আজ সেই সবকিছুর শেষে তার হাতে তাদের ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর প্রমাণ।

ঊষানের চোখ ভিজে গেল। শক্ত মানুষটা সেদিন নিজের আবেগ আর আটকে রাখতে পারল না। ছোট্ট পরীকে বুকে জড়িয়ে ধরে তার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।

নুহা অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল। এই ঊষানকে সে খুব কমই দেখেছে। যে মানুষটা সবসময় নিজেকে শক্ত রাখে, আজ সে একজন বাবার ভালোবাসায় একেবারে অন্যরকম হয়ে গেছে।

কিছুক্ষণ পর ঊষান নিজের ফোনটা হাতে নিল। স্ক্রিনে কিছু নাম দেখে তার চোখে পুরোনো কষ্টের ছায়া এক মুহূর্তের জন্য এলেও সে সেটা সরিয়ে ফেলল। নুহার পরিবারের কিছু ভুল, কিছু আচরণ তাকে অনেক কষ্ট দিয়েছিল। কিন্তু আজ তার মনে হলো, নতুন জীবনের শুরুটা পুরোনো অভিমান ধরে রেখে করা যায় না।

ঊষান নুহার বাবার কাছে ফোন ফোন করল।ওপাশে ফোন ধরতেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল ঊষান। তারপর শান্ত গলায় বলল,

~আপনাদের একটা খবর দেওয়ার ছিল।

কিছুক্ষণ থেমে আবার বলল,

~আপনারা নানা নানি হয়েছেন।

ওপাশে নীরবতা নেমে এলো।

ঊষান ছোট্ট পরীর দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

~নুহা আর আমার একটা মেয়ে হয়েছে।

কথাটা বলার সময় তার গলায় ছিল না কোনো অভিযোগ, ছিল না পুরোনো কষ্টের হিসাব। ওপাশ থেকে কি বললো বোঝা গেলো না ঊষান ফোন কাটতেই দেখতে পেলো নুহা ওর দিকে তাকিয়ে আছে চোখের পানি টলমল করছিলো।তা দেখে ঊষান জিজ্ঞেস করলো,

~কি হয়েছে এভাবে কি দেখছিস।

~জানেন আপনি তো ভাবতে পারি নাই আপনি বাড়িতে জানাবেন।

ঊষান নুহার কথা শুনে হালকা হাসলো।

~আমার মা এসেছে আর আমি ওনাদের জানাবো না এটা কি করে হয় বল পিচ্চি পাখি। আমি ওদের পছন্দ করি বা না করি আমার পরীর মায়ের জন্য তো এটুকু আমাকে করতেই হতো।

নুহা ঊষান কে জড়িয়ে ধরে সত্যি সত্যি কেঁদে দিলো।নুহা ঊষান কে ছেড়ে দিতে নাক টানতে টানতে বললো,

~আচ্ছা আমাদের ছোট্ট পরীটার কোনো নাম ঠিক করেছেন।

~হু করেছি তো।

~কি ঠিক করেছেন

~এখন বলবো না একসাথে আকিকা দিয়ে তারপর বলবো।

★ ★ ★ ★ ★

হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পর কয়েকটা দিন যেন কেটে গেল স্বপ্নের মতো। পুরো বাড়িটা এখন ছোট্ট অতিথির আগমনে অন্যরকম হয়ে উঠেছে। যে বাড়িতে একসময় ছিল নীরবতা আর কঠিন নিয়ম, সেখানে এখন সারাক্ষণ শোনা যায় ছোট্ট শিশুর কান্না আর হাসির শব্দ।
ঊষান নিজের মেয়েকে নিয়ে যেন একেবারে বদলে গেছে। কাজের ফাঁক পেলেই ছুটে আসে তার ছোট্ট পরীর কাছে। কখনো চুপচাপ বসে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে, আবার কখনো নিজের অজান্তেই মৃদু হেসে ফেলে। নুহা মাঝে মাঝে অবাক হয়ে দেখে, এত কঠিন একজন মানুষ কীভাবে এতটা কোমল হয়ে যেতে পারে।

ছোট্ট পরীর আগমনের পর দেখতে দেখতে কয়েকটা দিন কেটে গেল। পুরো বাড়িতে এখন এক অন্যরকম আনন্দের পরিবেশ। যে বাড়িতে আগে ছিল গম্ভীরতা আর নিয়মের কঠোরতা, সেখানে এখন সারাক্ষণ ঘুরে বেড়ায় এক ছোট্ট শিশুর উপস্থিতি।

আজ ঊষান আর নুহার মেয়ের আকিকার দিন। সকাল থেকেই বাড়িতে ব্যস্ততা। আত্মীয়-স্বজন বলতে ঊষান এর বন্ধুরা এবং তাদের পরিবার,পরিবারের সবাই একে একে আসতে শুরু করেছে। সবাই অপেক্ষা করছে সেই মুহূর্তের জন্য, যখন আনুষ্ঠানিকভাবে ছোট্ট পরীর নাম ঘোষণা করা হবে।

নুহা মেয়েকে কোলে নিয়ে বসে আছে। তার চোখে-মুখে মাতৃত্বের এক অন্যরকম প্রশান্তি। পাশে দাঁড়িয়ে ঊষান বারবার নিজের মেয়ের দিকে তাকাচ্ছে। এই সেই মানুষ, যে নিজের আবেগ সহজে প্রকাশ করত না আজ সে নিজের ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে একেবারে অন্যরকম।

আকিকার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর পরিবারের সবাই যখন নামের অপেক্ষায়, তখন ঊষান নুহার দিকে তাকাল। এই নামটা তারা দুজন অনেক ভেবেই ঠিক করেছে।

তাদের মেয়ের নাম উষারা ঊষান মির্জা

নামটা বেছে নেওয়ার পেছনে ছিল তাদের দুজনের অনুভূতি। ঊষান নামের “উষা” অংশের সঙ্গে মিল রেখে রাখা হয়েছে, যার অর্থ ভোরের আলো। আর তাদের কাছে এই ছোট্ট মেয়েটা সত্যিই ছিল জীবনের নতুন এক ভোর।

ঊষান যখন প্রথমবার সবার সামনে নিজের মেয়ের নাম বলল, তার কণ্ঠে ছিল এক অদ্ভুত আবেগ।

~আমাদের মেয়ের নাম উষারা।

নুহা চুপচাপ মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হচ্ছিল, এই ছোট্ট মানুষটা শুধু তাদের ভালোবাসার স্মৃতি নয়, বরং তাদের জীবনের নতুন শুরুর প্রতীক।
ঊষান নিজের মেয়েকে কোলে নিয়ে খুব যত্ন করে তার কপালে চুমু দিল। যে মানুষটা একসময় নিজের অনুভূতিগুলো লুকিয়ে রাখত, আজ সে সবার সামনে একজন বাবা ভাবা যায় ।

★ ★ ★ ★ ★

#চলবে