Home "ধারাবাহিক গল্প "গোধূলী লগ্নে তুমি গোধূলী লগ্নে তুমি পর্ব-০২

গোধূলী লগ্নে তুমি পর্ব-০২

0
1

#গোধূলি_লগ্নে_তুমি
#কলমে_ফাহিমা_ইসলাম
#পর্ব_২

[ অনুমতি ব্যতীত কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ 🚫]

আজ আমার জীবনের আর একটা নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। অথচ এই নতুন অধ্যায়ের প্রথম সকালটাই কেমন যেন অচেনা, অদ্ভুত এক শূন্যতায় আচ্ছন্ন। সকালে ঘুম ভাঙতেই প্রথমেই অভ্যাসবশত পাশে তাকিয়েছিলাম। কিন্তু কাউকে আর দেখতে পেলাম না। বিছানার অপর পাশটা নিঃশব্দ, শূন্য। বালিশে শুধু মৃদু ভাঁজ পড়ে আছে, সেখানে কারও অস্তিত্ব ছিল, সেটা জানিয়ে দিচ্ছে।

কাল ছিল আমার বাসররাত। অথচ সেই রাতেও ওনার সঙ্গে আমার তেমন কোনো কথা হয়নি। না কোনো প্রশ্ন, না কোনো পরিচয়, না কোনো হাসি, না কোনো অভিমান। দুটি অপরিচিত মানুষ একই ছাদের নিচে রাত কাটিয়েছি মাত্র। আজ সকালেও ওনাকে দেখতে পেলাম না। জানি না, নতুন জীবনের সূচনাটা সবার এমনই হয় কি না। নাকি শুধু আমার ভাগ্যেই নীরবতার এই দীর্ঘ উপাখ্যান লেখা ছিল।

ঠিক তখনই দরজায় মৃদু টোকা পড়ল। দরজার সামনে হাসিমুখে আমার ননাস ভেতরে ঢুকলেন। ওনার নাম আইরিন। অত্যন্ত ভালো মনের মানুষ। এই কয়েকদিনে ওনার সঙ্গে বেশ ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। তিনি খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললেন,

“ঘুম হয়েছে, ইনায়া? চলো, তোমায় রেডি করি। নতুন বউকে সবাই দেখবে।”

আমি নিঃশব্দে মাথা নাড়লাম। হাত দুটো তখনও অকারণে কাঁপছে। ওনার হাতে লাল রঙের একটা জামদানি রয়েছে। উনি এগিয়ে এসে হালকা হেসে বললেন,

“আমার ভাইকে পছন্দ হয়েছে তো?”

ওনার কথায় লজ্জায় মাথা নুইয়ে ফেললাম। নববধূরা এমন ধরনের প্রশ্নে বরাবরই লজ্জা পায়, আমিও পেলাম। উনি আমায় আর লজ্জা দিলেন না। কথার প্রসঙ্গ পাল্টে বলে উঠলেন,

“জানো, দাদু আশ্রম থেকে আসার পর তোমার কথা বলত খুব। তোমায় খুব ভালোবাসতেন।”

রিয়াজুল হাসানের কথা শুনে আমার মনটা খুশি হয়ে উঠল। রিয়াজুল হাসান সত্যিই অসাধারণ একজন মানুষ ছিলেন।

“দাদু যদি থাকতেন, তাহলে হয়তো সবচেয়ে বেশি সেই খুশি হতেন।”

আমি চুপ থেকে শুনলাম। উনি একে একে বাড়ির সবারই কথা বললেন। আমি শুনলাম সবটা। এর আগে কেউ আমার সঙ্গে এত নির্দ্বিধায় গল্পে মেতে ওঠেনি। কথা বলতে বলতে উনি আমায় তৈরি করলেন। আমার বুক কাঁপছে! ভয় হচ্ছে! নিজেকে মানিয়ে নিতে পারব তো এই পরিবারের সঙ্গে?

নিজেকে আয়নায় দেখে মনে হচ্ছিল, এ যেন আমি নই, অন্য কেউ।

আমি কখনো মানুষের ভিড়ে বড় হইনি। ছোটবেলা থেকেই আমার পৃথিবী ছিল সীমাবদ্ধ। অনাথ আশ্রমের চার দেয়াল, কয়েকটি লোহার খাট, পুরোনো বইয়ের গন্ধ আর অসংখ্য দীর্ঘশ্বাসের মাঝেই বেড়ে উঠেছি। জন্মের পর থেকে কোনোদিন মায়ের কোল কেমন, বাবার স্নেহ কাকে বলে কিংবা পরিবারের উষ্ণতা কেমন অনুভূতি, এসব জানার সৌভাগ্য আমার হয়নি। অন্যদের ঈদের নতুন জামা দেখে আমি পুরোনো কাপড় ভাঁজ করে রেখেছি। অন্যদের বাবা-মায়ের হাত ধরে হাঁটতে দেখে আমি দূর থেকে শুধু তাকিয়ে থেকেছি। অন্যদের জন্য অপেক্ষা করার মানুষ ছিল, আর আমার জন্য ছিল শুধু অপেক্ষাটুকুই। তাই আজ এই বিশাল বাড়ির প্রতিটি মানুষ আমার কাছে নতুন, প্রতিটি মুখ অচেনা, প্রতিটি সম্পর্ক অপরিচিত।

কিছুক্ষণ পর নিচে নামলাম। আর সিঁড়ির শেষ ধাপেই আমার বুকটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। এত মানুষ! একসঙ্গে এতগুলো মানুষের সামনে আমি কোনোদিন দাঁড়াইনি। চারপাশে শুধু মানুষ আর মানুষ। কেউ হাসছে, কেউ আমাকে দেখছে। কেউ মিষ্টি কথা বলছে। কেউ আবার দূর থেকে কৌতূহলী চোখে পর্যবেক্ষণ করছে। আমি শুধু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলাম। কেন জানি ভীষণ ভয় লাগছিল। এতগুলো মানুষ, এতগুলো সম্পর্ক, এসবের সঙ্গে তো আমি কোনোদিন পরিচিত ছিলাম না। আমার জীবনে তো কখনো কেউ ছিল না, যে আমার খোঁজ নেবে। জ্বর এলে কপালে হাত রাখার মানুষ ছিল না। কাঁদলে চোখের জল মুছে দেওয়ার মানুষ ছিল না। নিজেই নিজের চোখের জল মুছেছি। জ্বর এলে নিজেই মাথায় পট্টি দিয়েছি। কারণ আমাকে বাঁচতে হয়েছে! তাই আজ হঠাৎ এত মানুষ আমার চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে। অথচ আমার ভয়টাই যেন সবচেয়ে বেশি। হয়তো সুখের সঙ্গেও পরিচিত হতে সময় লাগে।

দুপুর গড়িয়ে গেলে আমাকে পার্লারে নিয়ে যাওয়া হলো। ওরা খুব যত্ন করে সাজিয়ে দিল। চুল, শাড়ি, অলংকার সবকিছু দিয়ে এমনভাবে সাজাল, যেন আমি সত্যিই কোনো গল্পের নববধূ। তারপর সন্ধ্যার আগেই আমাকে কমিউনিটি সেন্টারে নিয়ে আসা হলো। চারদিকে ঝলমলে আলোর উৎসব। রঙিন ফুলের সুবাস। মানুষের কোলাহল। হাসি, ক্যামেরার ঝলকানি। সবকিছু এত সুন্দর! কিন্তু সেই সৌন্দর্যের ভেতরেও আমার মনটা কেমন যেন ফাঁকা। বারবার ভিড়ের মধ্যে ওনাকে খুঁজছিলাম। অবশেষে দেখতে পেলাম। অনেকটা দূরে দাঁড়িয়ে আছেন। অনেক মানুষ তাঁকে ঘিরে আছে। আমি ভেবেছিলাম, হয়তো একবার অন্তত আমার দিকে তাকাবেন। হয়তো জিজ্ঞেস করবেন, আমি ঠিক আছি কি না। হয়তো একটিবার ডাকবেন। কিন্তু না। তিনি যেন ইচ্ছে করেই নিজের সমস্ত ব্যস্ততার ভেতরে আমাকে অদৃশ্য করে রেখেছেন। কয়েকবার আমাদের চোখাচোখি হওয়ার সুযোগ এসেছিল। কিন্তু প্রতিবারই তিনি দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়েছেন। আমার দিকেই তাকালেন না। কোনো কথাও বললেন না। আমি নীরবে দাঁড়িয়ে রইলাম। হঠাৎ করেই বুকের ভেতর অদ্ভুত এক ব্যথা অনুভব করলাম। আমি কি আবারও ভুল কোনো জীবনের দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছি? নাকি নতুন জীবনের শুরুটা এমনই হয়? জানি না। তবে আজ একটা বিষয় খুব করে অনুভব করছি, অনাথ হওয়ার কষ্ট শুধু পরিবারহীন হওয়াতে নয়। আসল কষ্টটা হয় তখন, যখন মানুষের ভিড়ে দাঁড়িয়েও নিজেকে ভীষণ একা মনে হয়। আজ চারপাশে অসংখ্য মানুষ আছে। তবু আমার নিঃসঙ্গতাটুকু যেন আগের মতোই অটুট রয়ে গেছে।

হয়তো আগামীকাল সবকিছু বদলে যাবে। হয়তো বদলাবে না। তবুও আমি অপেক্ষা করব। কারণ আমার জীবনটা অপেক্ষা করতে করতেই কেটে গেছে। আশা রাখলাম, হয়তো কোনো একদিন তিনি নিজেই আমার দিকে তাকিয়ে বলবেন,

“কেমন আছো? সমস্যা হচ্ছে না তো?”

সেই একটি প্রশ্নের অপেক্ষায় হয়তো আমার নতুন জীবনটাও ধীরে ধীরে এগিয়ে যাবে। তাঁর সঙ্গে অনেক ছবিও তুলেছি, তবে উনি বিশেষভাবে আমায় দেখেননি। ভালো লাগা কিংবা খারাপ লাগা, কোনোটাই তাঁর দৃষ্টিতে নেই। আছে শুধু এক নীরবতা।

বাড়ি ফিরলাম আবারও। আইরিন আপু আমায় ফ্রেশ হতে বললেন। রুমে শুধু আমিই রয়েছি। নিয়ম অনুযায়ী বৌভাতের পর বর-বউ বাবার বাড়িতে আসে। কিন্তু আমাদের বেলায় এমন কোনো নিয়ম পালন হলো না। কারণ আমার নিজের বলতে কোনো বাড়ি নেই। আমি ফ্রেশ হয়ে বসে আছি। কিছুক্ষণ পর উনি ঘরে প্রবেশ করলেন। আমি বসা থেকে উঠে দাঁড়ালাম। অন্তঃকরণে থাকা হৃদপিণ্ডটা দ্রুতগতিতে ছুটে চলেছে। আমায় দাঁড়াতে দেখে উনি এগিয়ে এলেন। উনি হয়তো অন্য ঘরে ফ্রেশ হয়েছেন। দীর্ঘ দুই দিনের মতো সময় পর প্রথমবার আমার সঙ্গে কথা বললেন।

“চলুন বারান্দায় বসি।”

বলেই এগিয়ে গেলেন। পিছনে আমায় স্তব্ধ করে রেখে গেলেন। ওনার কণ্ঠস্বরটা বেশ দারুণ! আমি নিজেকে সামলে ওনার পিছনে এগিয়ে গেলাম। বারান্দায় রাখা বসার চেয়ারে বসে পড়লেন। আমি আসতেই আমাকেও বসতে বললেন। আমি কম্পিত হৃদয় নিয়ে বসলাম। কেন জানি চোখ তুলে তাকানোর সাহস পাচ্ছি না। উনি এই প্রথম হয়তো আমার দিকে ভালোভাবে তাকালেন। আমি ওনার দৃষ্টি অনুভব করতে পারছি।

“পরিচয় হোক, আমি আয়াশ।”

আমি ধীর কণ্ঠে বলে উঠলাম,

“আমি ইনায়া।”

“আমি বর্তমানে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার।”

“ইডেন কলেজ থেকে অনার্স শেষ করেছি।”

আয়াশ শান্তভাবেই প্রশ্ন করল,

“মাস্টার্স করবেন না?”

ইনায়া মাথা তুলে তাকাল এবার। মাস্টার্স করার ইচ্ছে রয়েছে, কিন্তু মাস্টার্সে ভর্তির জন্য তার কাছে সেই পরিমাণ টাকা নেই। তাই ইচ্ছে থাকলেও সেটার গলাধঃকরণ করেছে।

“আপাতত ভাবছি না সেটা নিয়ে।”

“ভর্তি হন। আপনার রেজাল্ট নাকি দারুণ, আপু বলল। তাহলে ভর্তি হন।”

ইনায়া কিছু বলল না। নিজের অবস্থার কথা বলতে চাচ্ছে না। নিজের কাছে নিজেকেই ছোট মনে হবে। এই মুহূর্তে তার হাতে এত টাকা নেই ভর্তি হওয়ার জন্য। আর প্রথম দিনেই যদি সে বলে, তার ভর্তি হওয়ার টাকা নেই, সেটা তার জন্য খুবই অপমানের হবে।

“সামনে ভেবে দেখব।”

কিছুক্ষণ নীরবতায় কাটল সময়টা। কেউ কিছু বলল না। আমার কাছেও কিছু নেই বলার মতো। বসে রইলাম দুজন ওইভাবেই। কিছু সময় পর এই নীরবতা ভেঙে আয়াশ বলে উঠল,

“ইনায়া, আমরা স্বামী-স্ত্রী হওয়ার আগে বন্ধু হতে পারি?”

আয়াশের এমন কথায় আমি চমকালাম। এমন কিছু আশা করিনি। জানি না কীভাবে, উনি আমার মনের কথাটাই বলেছেন। আমিও চেয়েছিলাম জীবনসঙ্গীর সঙ্গে স্বামী-স্ত্রী হওয়ার আগে একজন বন্ধু হতে। আর উনিও একই চিন্তার মানুষ। আমি হাসিমুখে বললাম,

“অবশ্যই, আমিও এটাই চেয়েছিলাম।”

উনি কিছুক্ষণ আমার হাসিমাখা মুখশ্রীর পানে চেয়ে থেকে বলে উঠলেন,

“আমার থেকে বেশি কিছু আশা করবেন না। আমি যতটুকু পারি, সবটা দেওয়ার চেষ্টা করব। তবুও বলব, বেশি আশা রাখবেন না। তাহলে শুধু কষ্ট পাবেন।”

ওনার কথার মানে আমি বুঝিনি। কেন বললেন এমন কথা? মনের মধ্যে প্রশ্ন ঢুকে গেল। ভাবলাম, হয়তো হঠাৎ এইভাবে বিয়ে হওয়ায় এমন বলছেন। বলাটা অস্বাভাবিক কিছুই না। আমরা দুজনই পূর্বপরিচিত নই। তাই হয়তো এই কথা বলছেন। নিজেকে এই বলেই বুঝ দিলাম।

“চলুন, অনেক রাত হয়ে এসেছে।”

বলেই উঠে গেলেন ঘরে। আমিও গেলাম ওনার পিছনে। আজকে আর কালকের মতো খারাপ লাগল না। মনের ওপর থেকে পাথরটা নামতে শুরু করল। শুয়ে পড়লাম আমরা।

সময় কাটছে এইভাবেই। আমার বিবাহিত জীবন কাটছে ভালোই। এই বাড়িতে আসার পর থেকে নিজেকে একটু একটু করে মানিয়ে নিচ্ছি। এতে মানুষের সঙ্গে আগে বসবাস করিনি, তাই সবকিছু মানিয়ে নিতে কিছুটা সময় লেগেছে। বাড়ির সবাই ভালো। আমার শ্বশুর-শাশুড়ি দুজনই ভালো। ননদও ভালো। সপ্তাহে বাড়িতে বেড়াতে আসে। আমার আর ওনার সম্পর্ক রয়েছে সেই প্রথম দিনের মতো। উনি কথা খুব কম বলেন। তবে আগের থেকে এখন ওনার সঙ্গে কথা হয় রোজ। উনি সত্যি আমার বন্ধুর মতোই হয়ে উঠেছেন। উনি থাকলে নানা বিষয়ে কথা বলি। উনি বেশ বুঝদার মানুষ। নিজের মাঝে কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করছি। আজকাল উনি অফিস থেকে আসার পর লেবুজল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। ওনার প্রয়োজনগুলো বোঝার চেষ্টা করি। হয়তো নিজেকে পুরো দমে গৃহিণী হিসেবে গড়ে তুলছি। উনি আমায় মাস্টার্সে ভর্তি করিয়েছেন। কয়েকদিন হলো। হয়তো আমার অবস্থা বুঝতে পেরেছিলেন। আমার লজ্জার কারণও বুঝতে পেরেছিলেন। উনি নিজেই ফর্ম এনে আমায় দিয়েছিলেন। বাড়ির সবাই পড়াশোনা জানা। তাই আমার পড়া নিয়ে কারও সমস্যা নেই। বরং সবাই চায় আমি ভালো কিছু করি। নিজের পায়ে দাঁড়াই। আল্লাহ হয়তো আমার এত খারাপের মাঝে ওনাদের ভালো পাঠিয়েছেন।


সংসার জীবনটা বেশ ভালোই চলছে৷ আমাদের বিয়ে বিশদিন হচ্ছে, এই বিশ দিনে নিজেকে যতটা সম্ভব গুছিয়ে নিচ্ছি। আমার শ্বাশুড়ির থেকে ওনার সব পছন্দের সম্পর্কের জানছি, উনি আমার বন্ধু হলেও আমায় সেই চোখে দেখে না যেই চোখে দেখার কথা৷ তবুও আমি মানিয়ে নিয়েছি, কারণ এর আগে এতো ভালো আমি থাকিনি। একলা জীবন হলেও বড় নিঃসঙ্গে কেটেছে। তেমন কোনো বন্ধুবান্ধব জোটেনি কপালে, অনাথ বলে সবাই কেমন একটা দূরত্ব বজায় রাখতো। তাই আমি নিজেই সবার থেকে দূরে থাকতাম।

রোজকার নিয়ম অনুযায়ী আমি ওনার জন্য লেবুপানি বানাচ্ছি। পাশেই শ্বাশুড়ি তরকারি গরম করছে, টুকটাক কথা বলছি আমরা। এর মাঝেই কলিং বেল বেজে উঠলো, বুঝলাম কে এসেছে। দ্রুত গ্লাসটা নিয়ে মাথায় কাপড় দিয়ে এগিয়ে গেলাম দরজার দিকে। দরজা খুলতেই ওনার কান্ত মাখা মুখশ্রীটা চোখে আটকালো। কয়েকদিন আগে উনি ক্লিন সেভ করেছিল, আর এখন গাল জুড়ে গুঁড়ি গুঁড়ি দাঁড়ি গজাচ্ছে আবারও। লোকটার নাকটা বেশ সরু, চুলগুলো খানিকটা কোঁকড়ালো। শার্টের উপরের কয়েকটা বোতাম খোলা৷ উনি ভেতরে এসে আমার হাত থেকে গ্লাসটা নিয়ে, সেটা সম্পূর্ণ পান করলেন। এতপর প্রতিদিনের মতো কান্তিময় স্বরে বলে-

“ থ্যাঙ্কিউ ইনায়া!”

আমি হাসলাম, উনি রুমে উঠে চলে গেলেন। উনি আসার আগে ফ্রেশ হয়ে পরার জন্য জামাকাপড় বের করে বিছানার উপর রেখে দেই। আমার ভালো লাগে ওনার কাজগুলো করতে, উনি যদিও আমায় এইসব করতে না করেন। তবুও আমার ভালো লাগে, তাই করি মানা করা স্বত্ত্বেও।

খাবার খাওয়ার পর উনি বারান্দায় কিছুক্ষণ সয়ম কাটান৷ সময়টাতে উনি শুধুই আকাশ পানে চেয়ে থাকেন, ওনার চোখে কিছু একটার শূন্যতা আছে। সেটা ওনাকে পোড়ায়, ওনার নেত্রোদ্বয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে কিছু বেদনা। যেটা আমি স্পষ্ট দেখতে পাই, কিছু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন উনি। ওনার ওই বিষণ্ণতায় ঘেরা চোখ আমায় বার বার ভাবায় ওনার কিসের কষ্ট? প্রশ্ন করার সাহস হয়নি এখনো। ওনার আমি ওনার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম, তারপর আকাশের দিকে তাকিয়েই জিজ্ঞেস করলাম-

“ আজকের দিন কেমন কাটলো?”

উনি আমার উপস্থিতি টের পেয়ে, সেই দিকে তাকিয়ে থেকেই উত্তর দেয়।

“ মোটামুটি ভালো, আপনার?”

“ মায়ের সঙ্গে আজকে মার্কেটে গিয়েছিলাম, তারপর আইরিন আপুও এসেছিলো। সেইখানে অনেকক্ষণ কাটিয়েছি।”

“ ক্লাস কবে থেকে শুরু হবে?”

“ সামনের সপ্তাহ থেকে।”

“ ঘুরতে যাবেন?”

ওনার মুখ থেকে এই কথা শোনার পর কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলাম। বিশ্বাস করতে পারলাম না নিজের কানে, বিষয়টা যদিও খুব বড় কিছু নয়৷ তবুও আমার কাছে অনেক বড় কিছু।

“ হ..হুম যাবো।”

“ তাহলে কাল নামাজে পর যাবো।”

তারপর আরও নানান বিষয়ে কথা বলতে থাকালাম। ওনার প্রতিটা কথা আমি মন দিয়ে শুনছি, নিজের মধ্যে বেড়ে ওঠা ভিন্ন একটা অনুভূতির উপস্থিতি টের পাচ্ছি প্রতিনিয়ত। হয়তো বিয়ে নামক পবিত্র বন্ধনের শক্তি এটা।

—-

প্রিয় ডায়রি,

আজকের দিনটা আমার জীবনের পাতায় আলাদা করে লিখে রাখার মতো। কারণ আজ বিয়ের পর প্রথমবার ওনার সঙ্গে বাইরে বের হচ্ছি। ভোর থেকেই কেন জানি মনটা অদ্ভুত রকমের আলোড়িত। বুকের ভেতর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনুভূতিগুলো যেন নামহীন প্রজাপতির ডানায় ভর করে উড়ে বেড়াচ্ছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে আমি নিজেই অবাক হয়ে গেলাম। এত যত্ন করে শেষ কবে নিজেকে সাজিয়েছি, মনে করতে পারলাম না। আলমারির দরজা খুলে একে একে কয়েকটা শাড়ি বের করলাম। কোনটা পরলে ভালো লাগবে, সেটাও বুঝে উঠতে পারছিলাম না। শেষ পর্যন্ত খুব সাধারণ, নরম আকাশি রঙের একটা শাড়িই বেছে নিলাম। মনে হলো, আড়ম্বরের চেয়ে সরলতাই হয়তো আমার সঙ্গে বেশি মানিয়ে যায়।
ধীরে ধীরে চুলগুলো আঁচড়ালাম। কপালে ছোট্ট একটি টিপ, চোখে সামান্য কাজল, ঠোঁটে হালকা রঙের আভা। এতটুকুই। তবু আজ নিজেকে অন্যরকম লাগছে। হয়তো সাজের জন্য নয়, হয়তো অনুভূতির জন্য। বিয়ের পর এই প্রথম কোথাও যাচ্ছি ওনার সঙ্গে। এই “একসঙ্গে” শব্দটার মধ্যেই কেমন যেন এক অদ্ভুত উষ্ণতা লুকিয়ে আছে।

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের অজান্তেই মৃদু হেসে ফেললাম। তারপরই নিজেকে প্রশ্ন করলাম-

“আমি কি ধীরে ধীরে এই নতুন সম্পর্কটাকে অনুভব করতে শুরু করেছি?”

উত্তরটা নিজের কাছেও অজানা।ঠিক তখনই দরজার বাইরে থেকে ওনার শান্ত কণ্ঠ ভেসে এলো-

“রেডি?”

আমি তড়িঘড়ি করে আঁচল ঠিক করে দরজা খুললাম।
ওনাকে আজও আগের মতোই লাগছে। পরিপাটি পোশাক, স্থির দৃষ্টি, সংযত মুখাবয়ব। যেন কোনো অনুভূতিই তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না। আমি মৃদু স্বরে বললাম,

“জি… চলুন।”

তিনি শুধু মাথা নাড়লেন। অতিরিক্ত কোনো কথা নয়। কোনো প্রশংসা নয়। আমার সাজ নিয়ে একটিও মন্তব্য নয়।
অদ্ভুত মানুষ! তবুও জানি না কেন, মনটা খারাপ হলো না।
বরং মনে হলো,হয়তো উনি এমনই। বাড়ির সামনে এসে আমরা একটি রিকশায় উঠলাম। ওনি আমার পাশেই।
দুজনের মাঝখানে মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরত্ব। তবুও সেই সামান্য ব্যবধানটুকু আমার কাছে যেন বিশাল এক অজানা মহাদেশ। রিকশাটা ধীরে ধীরে চলতে শুরু করলো। লোহার চাকায় ছন্দ তুলে শহরের রাস্তাগুলো পেছনে সরে যেতে লাগলো। বিকেলের কোমল বাতাস এলোমেলো করে দিচ্ছে আমার কেশগুচ্ছ। মাঝে মাঝে বাতাসে উড়ে যাওয়া চুল মুখের ওপর এসে পড়ছে। আমি সেগুলো সরিয়ে নিচ্ছি।হঠাৎ এক ঝটকায় রিকশাটা খানিকটা দুলে উঠলো।
ভারসাম্য হারিয়ে আমি অনিচ্ছাকৃতভাবে ওনার বাহুর সঙ্গে হালকা ধাক্কা খেলাম।চমকে উঠে তড়িঘড়ি সোজা হয়ে বসলাম। মনে হচ্ছিল, বুকের ভেতর যেন শত সহস্র ঢেউ একসঙ্গে আছড়ে পড়ছে।কী ভীষণ অদ্ভুত অনুভূতি! এতটুকু স্পর্শও কেন জানি হৃদয়ের কোথাও গিয়ে আলোড়ন তুলে দিল। আমি চুপচাপ রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। নিজের হাসিটুকুও লুকিয়ে রাখলাম। আর ওনি? তিনি আগের মতোই নির্বিকার।মনে হলো, কিছুই ঘটেনি।

চন্দ্রিমা উদ্যানে এসে থামলো রিক্সা, বাসা থেকে জায়গা বেশ কাছেই।কিছুক্ষণ পর আমরা নদীর ধারের পথ ধরে হাঁটতে লাগলাম। পশ্চিম আকাশে সূর্য অস্তমুখী।সোনালি আলো নদীর জলে গলে পড়ে অসংখ্য ঝিকিমিকি রেখা এঁকে দিচ্ছে। মৃদুমন্দ বাতাসে চারপাশের ক্লান্তি যেন ধুয়ে যাচ্ছে।
রাস্তার ধারে এক বৃদ্ধ ফুল বিক্রি করছেন। রঙিন বেলুন নিয়ে ছোটাছুটি করছে কয়েকটি শিশু। ভাজা ভুট্টার গন্ধ বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। আমি সবকিছু মুগ্ধ হয়ে দেখছি।
প্রতিটি দৃশ্য আমার কাছে নতুন। কারণ এইভাবে গভীর ভাবে জায়গারাকে দেখা হয়নি আগে, সময় হয়নি কোনোদিন এতো ঘোরার। মুহূর্তগুলোই আমাকে বাঁচতে শেখাচ্ছে। একটি ছোট্ট মেয়ে দৌড়াতে গিয়ে হোঁচট খেল।
আমি অজান্তেই এগিয়ে গেলাম।ওকে উঠিয়ে দিতেই শিশুটি মিষ্টি করে হেসে বললো-

“আপা, ধন্যবাদ।”

আমার অজান্তেই মুখে হাসি ফুটে উঠলো।পেছন ফিরে দেখি, আয়াশ নীরবে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছেন। চোখে কোনো বিস্ময় নেই। তবে কেন জানি মনে হলো, তাঁর দৃষ্টিতে এক মুহূর্তের জন্য কোমলতার ক্ষীণ রেখা ভেসে উঠেছিল।
হয়তো আমি ভুল দেখেছি। হয়তো না। আমরা কাছের একটি ছোট্ট দোকানে বসে চা খেলাম। আমি ধোঁয়া ওঠা কাপে আঙুল ছুঁইয়ে উষ্ণতা অনুভব করছিলাম।
কথা বলতে ইচ্ছে করছিল। অনেক কিছু,শৈশবের গল্প। অনাথ আশ্রমের দিনগুলো। আমার ছোট ছোট ভয়। ছোট ছোট স্বপ্ন। কিন্তু শব্দগুলো ঠোঁট পর্যন্ত এসেও ফিরে গেল।
ওনিও চুপচাপ চায়ে চুমুক দিচ্ছিলেন। দুজনের মাঝখানে নীরবতা ছিল। তবে আজ সেই নীরবতাকে আর আগের মতো ভীতিকর লাগছিল না। মনে হচ্ছিল, কিছু কিছু সম্পর্ক হয়তো শব্দ দিয়ে নয়, সময় দিয়েই নিজেদের ভাষা তৈরি করে।অনেকক্ষণ নীরবতার পর সাহস সঞ্চয় করে আমি ধীরস্বরে বললাম-

“আপনি সবসময় এত চুপচাপ থাকেন?”

ওনি কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে উত্তর দিলেন-

“সব কথা বলতেই হয় না।”

আমি হেসে ফেললাম।

“তাহলে আমি একাই কথা বলবো?”

ওনার ঠোঁটের কোণে খুব ক্ষীণ একটা হাসির রেখা ফুটে উঠলো। এতটাই ক্ষীণ যে, অন্য কেউ হয়তো খেয়ালই করতো না। তিনি বললেন-

“আপনি চাইলে বলতে পারেন।”

কেন জানি কথাটুকু শুনে মনটা ভরে গেল।আমি জানি না কেন। হয়তো কোনো মানুষকে বোঝার শুরুটা এমন ছোট ছোট বাক্য দিয়েই হয়। আমি এবার হেসে ফেললাম।

“তাহলে আপনার হয়ে আমিই বেশি কথা বলবো।”

এইবার তিনি আর কিছু বললেন না। তবে মনে হলো, তাঁর চোখের গভীরে এক মুহূর্তের জন্য কঠিন নির্লিপ্ততার আবরণটা সামান্য নরম হয়ে এলো। ফেরার পথে রাস্তার পাশের ছোট্ট এক দোকান থেকে আমি রঙিন কাঁচের চুড়িগুলোর দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলাম।কিছু বলিনি।শুধু দেখছিলাম। এর আগেও কোনোদিন কোনো কিছু সখ করে কিনতে পারিনি টাকার অভাবে, খালি চেয়ে দেখে চলে গেছি। নজর ফিরিয়ে নিলাম, হঠাৎ ওনি দোকানদারের দিকে তাকিয়ে বললেন-

“ওগুলো দেখান।”

আমি বিস্মিত হয়ে ওনার দিকে তাকালাম।

“না না… লাগবে না।”

তিনি আমার কথা যেন শুনতেই পেলেন না। কয়েক মুহূর্ত পর চুড়িগুলো আমার হাতে দিয়ে শান্ত স্বরে বললেন—

“পছন্দ হয়েছে না?”

আমি ধীরে মাথা নাড়লাম।

“হ্যাঁ… খুব।”

“তাহলে রাখুন।”

শব্দ মাত্র দুটি। কিন্তু সেই দুটি শব্দের ভেতর যেন অদ্ভুত এক নির্ভরতার আভাস লুকিয়ে ছিল। আজ সারাদিনে ওনি খুব বেশি কথা বলেননি।তবুও আশ্চর্যজনকভাবে আমার মনে হচ্ছে,নীরব মানুষগুলো কখনো কখনো শব্দের চেয়েও বেশি কিছু বলে ফেলে।আজকের বিকেলটা আমার জীবনের প্রথম বিকেল, যেখানে পাশে একজন মানুষ ছিল। যিনি খুব বেশি কথা বলেন না। খুব বেশি হাসেন না। অনুভূতিও প্রকাশ করেন না।তবুও কেন জানি মনে হচ্ছে, এই নীরব মানুষটার সঙ্গেই হয়তো একদিন আমি শব্দহীন ভাষা পড়তে শিখে যাবো।

#চলবে?