#গোধূলি_লগ্নে_তুমি
#কলমে_ফাহিমা_ইসলাম
#পর্ব_৪
[ অনুমতি ব্যতীত কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ 🚫]
ঢাকার সঙ্গে ইনায়ার সম্পর্কটা সম্পূর্ণ ছিন্ন হয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক বিদায় নয়, কোনো অশ্রুসিক্ত আলিঙ্গন নয়, কোনো ফিরে তাকানোও নয়। শুধু একটি দীর্ঘশ্বাস, বুকের ভেতর জমাট বাঁধা অসংখ্য অব্যক্ত আর্তনাদ, আর একটি মাঝারি আকারের ব্যাগ যার অভ্যন্তরে ভাঁজ করে রাখা রয়েছে কয়েকটি কাপড়, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র,আর তিরিশ হাজার টাকার একরাশ অনিশ্চয়তা। বাসটি খুলনা শহরের টার্মিনালে এসে থেমে গেছে বহুক্ষণ। যাত্রীরা একজন একজন করে নিজেদের গন্তব্যের দিকে মিলিয়ে যাচ্ছে। কেউ স্বজনের বুকে আশ্রয় খুঁজে নিচ্ছে, কেউ ব্যস্ত হয়ে ফোনে জানিয়ে দিচ্ছে- “পৌঁছে গেছি।”
কিন্তু ইনায়ার জন্য এমন কোনো বাক্য পৃথিবীতে অবশিষ্ট নেই। তার ফোনটি নির্বাক। ফোনটা গত চব্বিশ ঘন্টারও বেশি ধরে বন্ধ, ফোনের সিমটাও খুলে রাখা। তার অপেক্ষমাণ কেউ নেই। উদ্বিগ্ন কোনো কণ্ঠ নেই। পৃথিবীর বিশাল জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে থেকেও সে যেন এক পরিত্যক্ত দ্বীপ,মানচিত্রে যার অস্তিত্ব আছে, অথচ কোনো মানুষের স্মৃতিতে নেই। সে ধীরে ধীরে বাস থেকে নেমে আসে। পায়ের নিচে অপরিচিত শহরের ধূলিকণা। মাথার উপর অপরিচিত আকাশ। চারপাশে শত শত মানুষের কোলাহল, অথচ সেই শব্দগুলো তার কর্ণগহ্বরে পৌঁছানোর আগেই যেন মৃ’ত হয়ে যাচ্ছে। শূন্যতারও একটি শব্দ থাকে,আজ সে সেই শব্দ শুনতে পাচ্ছে।
তার দৃষ্টি উদ্দেশ্যহীনভাবে ছুটে বেড়াচ্ছে। ডানে রাস্তা,বামে দোকানপাট। আরও দূরে মানুষের ভিড়। কিন্তু কোন পথটি তার? সে জানে না। জানার মতো কেউও নেই আঙুলগুলো ব্যাগের স্ট্র্যাপ আরও শক্ত করে চেপে ধরে। তিরিশ হাজার টাকা সংখ্যায় খুব সামান্য নয়, অথচ একটি সম্পূর্ণ জীবন পুনর্নির্মাণের জন্য ভীষণ অপ্রতুল। অর্থ কখনো আশ্রয় হয় না; কেবল সময় কিনে দেয়। আর ইনায়া জানে না, সেই সময়টুকু ফুরিয়ে গেলে সে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। বুকের গভীরে আচমকা ছুরি চালানোর মতো ব্যথা জেগে ওঠে। আয়াশ! নামটা তার শিরা-উপশিরায় বিষের মতো ছড়িয়ে পড়লো।
সেই দৃশ্যটি এখনও চোখের ভেতর অমোচনীয় অক্ষরে উৎকীর্ণ। আয়াশের দৃষ্টিতে যে কোমলতা সে বছরের পর বছর খুঁজে ফিরেছে, সেটি অন্য এক নারীর জন্য অবলীলায় ঝরে পড়ছিল। যে হাসি পাওয়ার আশায় সে নিজের সমগ্র অস্তিত্ব বিসর্জন দিয়েছিল, সেই হাসির অধিকারিণী ছিল অন্য কেউ। সেদিন ইনায়া উপলব্ধি করেছিল।কিছু মানুষ জীবনে আসে ঠিক অতিথির মতো। ঘরের প্রতিটি কোণে তাদের উপস্থিতির উষ্ণতা ছড়িয়ে থাকে, অথচ ঘরের মালিক হওয়ার অধিকার তারা কখনোই পায় না। আয়াশের জীবনেও সে ছিল তেমনই এক সাময়িক উপস্থিতি। একটা প্রয়োজন,একটা অভ্যাস। কিন্তু কখনোই ভালোবাসা নয়।
উপলব্ধির সেই নির্মম মুহূর্তে তার ভেতরের শেষ আশাটুকুও নীরবে মৃত্যুবরণ করেছে।তাই সে চলে এসেছে। অভিমান করে নয়,প্রতিশোধ নিতে নয়। বরং নিজের ভগ্ন আত্মমর্যাদার শেষ অবশিষ্টাংশটুকু বাঁচিয়ে রাখার জন্য। এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে গালে। সে তা মুছে ফেলারও প্রয়োজন অনুভব করলো না। কিছু কান্না লুকিয়ে রাখার জন্য নয়; কিছু কান্না মানুষকে নতুন করে বাঁচার জন্য অনুপ্রেরণা জাগায়। তার সেই অনুপ্রেরণা দরকার৷ সে আর একা নেই, তার গর্ভে বেড়ে উঠছে ধীরে ধীরে৷ আর একটি প্রাণ আছে তার মধ্যে, ইনায়া নিজের উদরের উপর হাত রাখলো৷ স্নেহময় স্পর্শে উদরটা বুলিয়ে দিতে দিতে বলে-
“ মা’কে একটু সময় দাও, মা তোমায় কখনো কষ্ট দিবো না৷ মায়ের উপর একটু ভরসা রাখো, মা আছি তো! তোমার আর আমার নতুন পথচলা শুরু আজ থেকে। মা’কে শক্তি দিবে কেমন?মায়ের যে তোমাকে এখন বড্ড প্রয়োজন।”
সূর্য পশ্চিম আকাশে সূর্য তার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে। সেই আলোয় ইনায়ার দীর্ঘ ছায়াটি রাস্তার উপর আরও দীর্ঘ, আরও নিঃসঙ্গ হয়ে প্রসারিত হয়। মনে হচ্ছে তার ছায়াটিও যেন তাকে ছেড়ে আরও দূরে চলে যেতে চাইছে। সে হাঁটতে শুরু করে। কোথায় যাচ্ছে?জানে না। কেন যাচ্ছে? সেটাও জানে না। শুধু জানে পেছনে আর ফেরার কোনো পথ নেই। সামনে যা আছে, তা হয়তো আরও নির্মম, আরও নিষ্ঠুর।
তবু মানুষ যখন সমস্ত আশ্রয় হারিয়ে ফেলে, তখন দিকনির্দেশনা নয়,কেবল চলে থাকার প্রবৃত্তিই তাকে বাঁচিয়ে রাখে।
আর ইনায়া এই মুহূর্তে সেই আদিম প্রবৃত্তির হাত ধরেই অচেনা খুলনা শহরের অন্তহীন রাস্তাগুলোর ভেতর নিজেকে সমর্পণ করে দিয়েছে; যেন নিয়তিই আজ তার একমাত্র ঠিকানা। একটা থাকার জায়গা খুঁজতে হবে, দূর্বল শারীরটা হাঁটার মতো শক্তি পাচ্ছে না। না খাওয়া এই চব্বিশ ঘন্টা, পানি অব্দি মুখে দেয়নি। হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে, তাই আর নিজেকে কষ্ট দিলো না। সামনে একটা খালি রিক্সাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করে-
“ মামা এখানে মেয়েদের মেস আছে কোথায়?”
লোকটা ইনায়াকে পর্যবেক্ষণ করে নিলো৷ বুঝতে পারলো ইনায়া যে শহরে নতুন৷ লোকটা হালকা হেসে জিজ্ঞেস করে-
“ নতুন নি আপা?”
“ হুম মামা।”
“ ও আইচ্ছা, সামনেই মাইয়াগো মেস আছে৷”
ইনায়া তার ব্যাগটা নিয়ে উঠে বসলো। এই শহরে কিভাবে টিকবে? পরিচিত কেউ নেই যে সাহায্য পাবে কোনো ভাবে। অনেকটা সময় পর একটা বিল্ডিং এর সামনে এসে গাড়িটা থামে। ইনায়া ভাড়া মেটালো। সকাল ক’টা বাজে সেটাও জানে না। তাই এবার ফোনটা ওপেন করলো। সকাল ৯ টায় বাজে, বেশ বেলা হয়েছে। ইনায়া বিল্ডিং এ এগিয়ে গেলো। সেখানে গিয়ে দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করে-
“ ম্যানেজারের অফিস কোথায় কাকা?”
“ ভিত্তরে যাইয়া, বাম দিকে।”
ইনায়া ভিতরে চলে গেলো। সেখানে গিয়ে ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলে খালি সিট নিয়ে নিলো। ভাগ্য ভালো আগে-ভাগে এসেছিলো; নাহলে এই সিটটাও বুক হয়ে যেতো। এখানে স্টুডেন্ট সহ আরও অনেকেই আছে। আগে থেকে মেসে থাকার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার, তাই তেমন কিছুই বেগ পেতে হলো না। ঘরে এসে নিজের বেডে বসে পরলো, পা দু’টো ব্যথায় টনটন করছে। আজকাল আর আগের মতো হাঁটতে পারেনা বেশিক্ষণ, অল্পতেই হাঁপিয়ে ওঠে। তার প্রেগ্ন্যাসির চার মাস চলছে। তেমন ভাবে বোঝা যায় না সে যে প্রেগন্যান্ট। তবুও ভালো ভাবে লক্ষ্য করলে বিষয়টা যে কারো নজরে পরবে। খাবার কিছুই নেই, রুমেও এই মুহুর্তে কেউ নেই। একজন রয়েছে সে ঘুমাচ্ছে। কাঁথা দিয়ে সম্পূর্ণ মোড়ানো সামনের জন্য৷ তার কাছে রুমের একটা চাবি দেওয়া হয়েছে, মোট চারজন রয়েছে এই রুমে।
ইনায়ার আর ওঠার ইচ্ছে জাগলো না, সেইভাবেই বিছানায় কান্ত শরীরটা এলিয়ে দিলো। পেটে খিদে তবুও ইচ্ছে করছে না খাওয়ার। তার ঘুম দরকার, নাহলে নিজের মস্তিষ্ক থেকে আয়াশকে ঝেড়ে ফেলতে হবে। বার বার মানুষটা মুখটা ভেসে উঠছে, মানুষটা এই তিন বছরে তার উপরই নির্ভরশীল হয়ে পরেছে। লোকটার খাবার থেকে শুরু করে জামাকাপড় অব্দি সেই বের করে দেয়। সবকিছু চোখের সামনে রেখে দেয়, আজকে কিভাবে মানুষটার সকাল হয়েছে? সে তো নেই, বাড়িতে তার শ্বাশুড়িও নেই। খেয়েছে তো?
ইনায়া নিজের মাথা চেপে ধরলো৷ ভাবতে চাচ্ছে না সে আয়াশের ব্যাপারে অথচ; তার মস্তিষ্ক সেই একটা মানুষের উপরই আটকে আছে। ইনায়া লম্বা একটা শ্বাস টানলো। নিজেকে সবকিছু থেকে দূরে সড়িয়ে ফেলবে সে। তবে চাইলেই কি সব সম্ভব? এতোদিন ধরে যাকে নিজের সবটা দিয়ে ভালোবেসেছে, যার সন্তান নিজের গর্ভে ধারণ করছে তাকে কি করে মস্তিষ্ক থেকে সড়াবে। লোকটা তার অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে গিয়েছে। অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে যাওয়া জিনিস কি মুছে ফেলা যায়?
—–
ঢাকা শহর আজ যেন আয়াশের সঙ্গে এক নির্মম প্রহসনে মেতে উঠেছে। সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর পেরিয়ে সন্ধ্যা, আর সন্ধ্যা ধীরে ধীরে রাত্রির কৃষ্ণবর্ণ আবরণে বিলীন হচ্ছে। অথচ একটিবারের জন্যও ইনায়ার ছায়া তার দৃষ্টিসীমায় ধরা দিচ্ছে না। শহরের প্রতিটি পরিচিত কোণ, প্রতিটি গলি, প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি স্মৃতিবাহী স্থান আজ তার পদচারণায় ক্লান্ত। যেখানে যেখানে ইনায়ার সঙ্গে কখনো এক মুহূর্তও অতিবাহিত হয়েছে, সেসব স্থান সে পুনরায় পরিভ্রমণ করছে এক উন্মত্ত অনুসন্ধানীর ন্যায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের ফুটপাত। লেকপাড়ের নির্জন বেঞ্চ। পুরোনো বইয়ের দোকানের সরু করিডোর। কতজনকে আটকিয়ে ছবি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করেছে।
“এই মেয়েটাকে দেখেছেন?”
উত্তরে কেবল অনিশ্চয়তার মাথা নাড়া। অথবা বিস্মিত দৃষ্টি।
অথবা নিঃশব্দ অস্বীকৃতি। এতো বড় শহরে কে’ই বা ইনায়াকে মনে রাখবে? ক্রমশ রাত্রি গভীর হচ্ছে। আকাশের বুকে জমাট বাঁধছে কৃষ্ণাভ মেঘ। নিয়ন আলোর নিচে ব্যস্ত মহানগর এখনও ছুটে চলেছে আপন গতিতে। কেবল আয়াশের সময় থমকে আছে। প্রতিটি মিনিট যেন তার বক্ষদেশে আরও একটি অদৃশ্য পাথর চাপিয়ে দিচ্ছে। ফোনের স্ক্রিনে আঙুল ছুঁইয়ে আবারও কল করে। একই উত্তর। আবার,আবারও বারবার। প্রতিবারই মন বলছে হয়তো এবার ওপাশ থেকে ভেসে আসবে সেই চিরচেনা কণ্ঠ;
” জ্বী বলুন শুনছি!”
কিন্তু শব্দহীনতা ছাড়া আর কিছুই ফিরে আসলো না। আজ প্রথমবার সে উপলব্ধি করছে, নৈঃশব্দ্যও মানুষের বিরুদ্ধে ভয়ঙ্কর প্রতিশোধ নিতে জানে। আয়াশ ক্লান্ত শরীর নিয়ে গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে মাথা ঠেকিয়ে বসে থাকলো। চোখদুটি রক্তাভ, অথচ অশ্রুশূন্য। কিছু কিছু দহন এতটাই তীব্র হয় যে অশ্রুও সেখানে পৌঁছানোর সাহস পায় না। নিজেকেই প্রশ্ন করছে,ইনায়া কোথায়? কোন পথে গেল?কার কাছে যাাবে? প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর নেই।
অবশেষে পরাজিত সৈনিকের মতো ইঞ্জিন চালু করে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয় সে। এই প্রত্যাবর্তনে বিজয়ের কোনো আভা নেই; আছে কেবল ব্যর্থতার অবসন্ন দীর্ঘশ্বাস। গাড়িটি ধীরে ধীরে বাড়ির সামনে এসে থামে। গেট খুলে ভেতরে প্রবেশ করতেই অদ্ভুত এক অনুভূতি তার সমগ্র সত্তাকে গ্রাস করলো। কিছু একটা নেই। কিছু একটা ভয়ঙ্করভাবে অনুপস্থিত। বাড়িটি তো একই আছে। দেয়াল একই আসবাবপত্র একই। আলোকসজ্জাও অপরিবর্তিত। তবুও কোথাও যেন জীবন নেই। মনে হচ্ছে, এই বাড়ির অন্তঃস্থল থেকে কেউ সমস্ত উষ্ণতা চুরি করে নিয়ে গেছে। দরজার সামনে এসে অন্যমনস্কভাবে থমকে দাঁড়ালো আয়াশ।অভ্যাসবশত দৃষ্টি চলে যায় প্রবেশদ্বারের দিকে।এই সময়টায় তো,এই সময়টাতেই তো ইনায়া দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকত। তার গাড়ির শব্দ শুনেই ছুটে আসত। দরজা খুলে মৃদু হেসে বলত-
“এসেছেন?”
আজ দরজাটি বন্ধ। নির্বাক,প্রতীক্ষাহীন। দুই দিন মাত্র দুই দিন। অথচ এই ক্ষুদ্র সময়ই যেন একটি যুগের সমান দীর্ঘ হয়ে উঠেছে। জুতো খুলে ভেতরে প্রবেশ করে আয়াশ।
ড্রয়িংরুম অতিক্রম করে শোবার ঘরে যায়। বিছানার উপর দৃষ্টি পড়তেই বুকের ভেতরটা কেমন নিঃশব্দে হাহাকার করে ওঠলো আবারও । প্রতিদিন অফিস থেকে ফেরার আগেই ইনায়া তার জন্য পরিচ্ছন্ন পোশাক গুছিয়ে বিছানার একপাশে রেখে দিত। আজ বিছানাটি শূন্য। অপরিচ্ছন্ন নয়।
কেবল অপেক্ষাহীন। ওয়ারড্রোবের দরজা খুলে নিজেকেই কাপড় বের করলো সে। সামান্য এই কাজটি করতে গিয়েও অদ্ভুত এক অস্বস্তি জন্ম নিলো। কারণ কোনো অদৃশ্য হাত প্রতিদিন তার জীবনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রয়োজনগুলো নীরবে পূরণ করে দিত, আর সেই হাতটি আজ চিরতরে সরে গেছে।
কাপড় বদলে বেরিয়ে আসে।
কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে থাকলো আয়াশ। অভ্যাস তাকে আবার রান্নাঘরের দিকে নিয়ে যায়। এই সময়টাতেই ইনায়া ধোঁয়া ওঠা কফির মগ হাতে এগিয়ে আসত। কিছু না বলেও বুঝে ফেলত, আজ তার কফিতে চিনি একটু কম লাগবে নাকি বেশি। আজ রান্নাঘরে কেবল রেফ্রিজারেটরের ক্ষীণ গুঞ্জন। গ্যাসের চুলা নিভে আছে। কফির কেটলি স্পর্শহীন। কাপগুলো যথাস্থানে নিস্তব্ধ হয়ে রয়েছে। আয়াশ ধীরে ধীরে একটি মগ হাতে তুলে নেয়।
নিজের জন্য কফি বানানোর চেষ্টা করলো। মগটা নিয়েও মগটি টেবিলের উপর নামিয়ে রাখে সে। সারাদিন না খাওয়া, খিদে পাচ্ছে তার প্রচন্ড। কিন্ত খাওয়ার মতো ইচ্ছে জাগলো না, তবুও শরীরটা চলানোর জন্য ফ্রিজ খুললো। সেখানে এয়ারটাইট কন্টেইনার রাখা বেশ কয়েকটা। আয়াশ একটা খুলতে দেখতে সেখানে খাবার তরকারি রাখা। বাকিগুলে খুললো এক এক করে সেখানেও রাখা। এইসব তার পছন্দের খাবার, মেয়েটা যাওয়া আগে তার খাবারের ব্যবস্থা করে রেখে গেছে। আয়াশ নির্লিপ্ত ভাবে সেখানে থাকা খাবার গুলোর দিকে তাকিয়ে রইলো, এতকিছুর পরও মেয়েটার তার খেয়াল রাখার কথা ভুলেনি। আয়াশ খাবারটা গরমও করলো না, চামুচ দিয়ে সেখান থেকে কিছুটা খেয়ে নিলো। ইনায়ার হাতের রান্না ছাড়া সে খেতে পারে না, অভ্যাসটাও ইনায়া আসার পরই হয়েছে।
হঠাৎ করেই আয়াশ উপলব্ধি করলো, কোনো মানুষ কেবল তার উপস্থিতি দিয়ে ঘর পূর্ণ করে না; তার অনুপস্থিতিও সমগ্র জীবনকে শূন্য করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। আর আজ, এই বাড়িটার প্রতিটা দেয়াল, প্রতিটি নিঃশ্বাস যেন একই বাক্য প্রতিধ্বনিত করে চলেছে ‘ইনায়া নেই’।
আয়াশ রুমে এসে বসলো, সবকিছু কেমন ধোঁয়াশায় আবৃত হয়ে যাচ্ছে। ইনায়ার ডায়েরিটা পাশেই পরে আছে, ওটার দিকে যতবার নজর যাচ্ছে ততোবার সেখানে থাকা শব্দগুলো চোখের সামনে ভাসচ্ছে। আয়াশ আর একবার সেটা হাতে নিলো, এমনি একটা ভাজ খুলতেই কয়েকটা লাইন চোখে খুব বাজে ভাবে আঁটকে গেলো।
“তিনটা বছর কি খুব কম আপনার মনে জায়গা করে নেওয়ার জন্য?”
আয়াশ টাস করে সেটা বন্ধ করে ফেললো। চোখ বন্ধ করে নিলো আয়াশ। আজকে তার মা আয়শা বেগম ফোন করে ইনায়ার কথা জিজ্ঞেস করছিলেন। সে মিথ্যে বলেছে, ইনায়া ফোন তুলছে না কেনো। তখন মিথ্যে বলেছে ইনায়ার ফোন নষ্ট হয়ে গেছে, আয়শা বেগম বিশ্বাস করে নিয়েছে আয়াশের কথা।
[ সবাই রেসপন্স করবেন পড়া শেষে, গঠনমূলক কমেন্ট করবেন সবাই।]
#চলবে

