Home "ধারাবাহিক গল্প "গোধূলী লগ্নে তুমি গোধূলী লগ্নে তুমি পর্ব-১৮

গোধূলী লগ্নে তুমি পর্ব-১৮

0
13

#গোধূলি_লগ্নে_তুমি
#কলমে_ফাহিমা_ইসলাম
#পর্ব_১৮

[ অনুমতি ব্যতীত কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ 🚫]

জীবনটা যেনো এক নাটকীয় মঞ্চ। কোন মুহূর্তে কোন দৃশ্যের অবসান ঘটিয়ে নতুন কোনো অধ্যায়ের সূচনা করবে, তা আঁচ করা বড়ো দায়। নিয়তির লিখন বুঝি এমনই, মানুষ যা চায় না, জীবন কখনো কখনো ঠিক সেটাই তার সম্মুখে এনে দাঁড় করায়। আবার কখনো এমন কিছু দিয়ে বসে, যা চাওয়ার সীমাকেও বহুদূর পেছনে ফেলে যায়। অথচ মানুষ নিজের দুঃখটাকেই সবার আগে অনুভব করে। কারণ সেই দুঃখ তার নিজের, সেই যন্ত্রণার প্রতিটা আঁচড় তার অস্তিত্বে এসে লাগে। তার প্রতিটা দীর্ঘশ্বাসের সাক্ষী সে নিজেই।অথচ একই দুঃখ যখন অন্য কারো জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়ায়, তখন সামনের মানুষটা কেবল দুঃখটুকুই দেখতে পায়। তার গভীরতা উপলব্ধি করতে পারে না। কতটা ভেতর অব্দি সেই যন্ত্রণা শেকড় ছড়িয়ে বসে আছে, কতটা নিঃশব্দে একজন মানুষকে প্রতিনিয়ত পুড়িয়ে ছারখার করে দিচ্ছে, তার হিসাব অন্য কেউ কখনোই পুরোপুরি বুঝতে পারে না।

আয়াশ এই কয়েকটা মাসেই হতাশায় ডুবে গেছে। নিজের ব্যর্থতার ভারে ক্রমশ নুইয়ে পড়ছে মানুষটা। অথচ ইনায়া তিনটা বছর ধরে হতাশার সঙ্গে বসবাস করেও বারবার নিজের ভেতর নতুন করে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা খুঁজেছে। প্রতিবার সেই অনুপ্রেরণার হাত ধরে একটু এগোতে চেয়েছে, আর প্রতিবারই সাফল্যের পরিবর্তে ফিরে পেয়েছে নতুন কোনো হতাশা। তিনটা বছর কোনো তিনটা দিন নয়, কোনো তিনটা ঘণ্টাও নয়, যে চাইলেই সেই অদৃশ্য আঘাতগুলো সময়ের স্রোতে ধুয়ে মুছে যাবে। কিছু দুঃখ সময়ের সঙ্গে ফিকে হয় না। বরং সময় পেরোতে পেরোতে তার গ্লানি আরও গভীরে জমাট বাঁধে। আমরা আসলে তখনই কোনো দুঃখের প্রকৃত ভার অনুভব করি, যখন সেই দুঃখটা এসে আমাদের নিজেদের অস্তিত্বকে স্পর্শ করে। দুঃখ সহজে মুছে যায় না। মুছে গেলেও তার রেখে যাওয়া দাগ, তার গ্লানি, তার নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস কোথাও না কোথাও থেকে যায়। ইনায়া মৃদু হাসলো। আয়াশ কয়েকটা মাসেই নিজের ব্যর্থতার কাছে নত হয়ে পড়ছে। অথচ ইনায়া কতবার যে নিজের কাছে একজন ব্যর্থ স্ত্রী হিসেবে নিজেকে আবিষ্কার করেছে, তার হিসাব নেই। কতবার নিজেকে একজন ব্যর্থ নারী মনে হয়েছে। কতবার মনে হয়েছে, তার দ্বারা বুঝি কিছুই সম্ভব নয়। তবুও শেষ অব্দি হাল ছাড়েনি সে।

তাই আয়াশও জ্বলুক। যে দহনের আগুনে এতটা সময় ইনায়া পুড়েছে, সেই আগুনের উত্তাপ এবার আয়াশও অনুভব করুক। বলা যতটা সহজ, সহ্য করা ঠিক ততোটাই কঠিন। তবে ইনায়ার এখন আর কোনো আক্ষেপ নেই। নেই কোনো অভিযোগ, নেই কোনো অভিমানও। তার অনুভূতিগুলো বুঝি অনেক আগেই ক্লান্ত হয়ে নিস্তব্ধ হয়ে গেছে।যা কিছু এখনো বেঁচে আছে, তা কেবল তার সন্তানের জন্য।তার সন্তানকে ঘিরেই এখন তার সমগ্র পৃথিবী। সেই ক্ষুদ্র প্রাণটাই তার বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ, একমাত্র অবলম্বন। বুঝ হওয়ার পর থেকেই তো ইনায়া একা। পাশে দাঁড়ানোর মতো কাউকে কোনোদিন পায়নি সে। বাবা-মা কেমন দেখতে, সেইটুকু জানার সৌভাগ্যও তার হয়নি। এতটা বছর একা একাই বড়ো হয়েছে। অসুস্থ হলে নিজের মাথায় নিজেই জলপট্টি দিয়েছে। জ্বরের ঘোরেও নিজের যত্ন নিজেকেই নিতে হয়েছে। শরীর ভেঙে গেলেও কাজ করেছে, কারণ শরীরের অসুস্থতার চেয়ে পেট চালানোর দায়টা তখন অনেক বড়ো হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দুটো টাকার আশায় অসুস্থ শরীর নিয়েও ছুটেছে সে।

মাঝখানে তিনটা বছর হয়তো তার জীবনে কিছু পরিবর্তন এসেছিলো। হয়তো ভাগ্য সাময়িক সময়ের জন্য তার দিকে একটু কোমল হয়েছিলো। কিন্তু সেই কোমলতা ক্ষণস্থায়ীই ছিলো। তাই হয়তো শুরু থেকেই নিয়তি তাকে নিঃশব্দে সতর্ক করে দিয়েছিলো, ইনায়া, “বেশি নির্ভর হয়ে পরিস না।”
হয়তো ক্ষণিকের মায়াটাকে আজীবন নিজের করে রাখার লোভেই সে আশায় বুক বেঁধেছিলো। ভেবেছিলো, এবার বুঝি জীবনের সমস্ত একাকিত্বের অবসান ঘটবে। এবার বুঝি কারো ছায়ার নিচে একটু নিশ্চিন্তে দাঁড়ানো যাবে।
তাই সব ছেড়ে আসতে এতটা কষ্ট হয়েছিলো। এখন আর আয়াশের কাছ থেকে পালাতে চায় না ইনায়া। পালিয়ে থাকারও কোনো কারণ নেই। যে মানুষটা তার জীবনের এক বিশাল অধ্যায়, তাকে এড়িয়ে গিয়ে নিজের অস্তিত্বকে আর কতদিন অস্বীকার করা যায়?ঠিক তখনই হঠাৎ ইনায়ার ফোনটা বেজে উঠলো। অপ্রত্যাশিত শব্দে তার চিন্তার জাল ছিন্ন হলো। পাশে থাকা ফোনটার দিকে তাকাতেই পর্দায় জ্বলজ্বল করে উঠলো পরিচিত একটা নাম।আয়শা বেগম।

ইনায়া কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে নামটার দিকে তাকিয়ে রইলো। বুকের কোথাও অদৃশ্য এক টান অনুভূত হলো। শেষ অব্দি ধীর হাতে ফোনটা তুলে নিলো।

“ আসসালামু আলাইকুম!”

“ ওয়ালাইকুম সালাম! কেমন আছিস?”

“ এতো আলহামদুলিল্লাহ! তুমি?”

“ জানিস ভালো নেই, তবুও বলছিস কেমন আছি?”

“ ভালো না থাকার কারণ দিচ্ছো কেনো নিজেকে? নিজেকে আগে ভালো রাখো, তাহলে তো বেঁচে থাকতে পারবে।”

“ আমার কাছে একবার বলতে পারতি, তুই ভালো নেই। আমি তোর সুখ বেচে আমার ছেলের সুখকে বেছে নিতাম না অবশ্যই। এই বুঝলি এই মাকে?”

ইনায়ার ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ এক হাসি ফুটে উঠলো। আয়শা বেগমের কাছে যাওয়ার পর থেকে কোনোদিনই মায়ের ভালোবাসার কমতি অনুভব করেনি সে। রক্তের সম্পর্কের সীমারেখা পেরিয়ে এই নারী তাকে নিজের সন্তানের মতোই আগলে রেখেছেন। আইরিন আর তার প্রতি ভালোবাসার কোনো তারতম্য ছিলো না। দুজনকেই সমান চোখে দেখেছেন তিনি।

“ বুঝি তো মা, তবুও ছেড়ে না এলে নিজেকে হয়তো বাঁচাতে পারতাম না। দম বন্ধ হয়ে মারা পরতাম।”

ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা নেমে এলো। যেনো একজন মা তার মেয়ের বলা কথাগুলো বুকের ভেতর ধারণ করে প্রতিটা শব্দের ভার অনুভব করার চেষ্টা করছেন।

“ ফিরে আয় এই মায়ের কাছে, আয়াশের সঙ্গে থাকতে হবে না। তুই চাইলে ডিভোর্স নিয়ে নিস, তবুও ঢাকা আয়। আমাদের মেয়ে হয়ে থাকবি এখানে।”

ইনায়ার বুকটা কেমন ভার হয়ে এলো।

“ থাকলাম নাহয় তোমার মেয়ে হয়ে, কিন্তু সেখানে তো আমার অতীতও বাস করবে। ওমন দমবন্ধ জায়গায় থাকলে এমনিও আমি শেষ হয়ে যাবো, যতটুকু আছি।”

“ ফিরবে না বলে পন করে নিয়েছি?”

“ পন করিনি, সিদ্ধান্ত নিয়েছি শুধু। একটু ভালো থাকার আশায়?”

“ আদৌও তুই একা ভালো আছিস?”

প্রশ্নটা শুনে ইনায়া থমকে গেলো। কিছুক্ষণ কোনো শব্দ বের হলো না তার মুখ থেকে। সত্যিই তো, সে কেমন আছে?
এই প্রশ্নের উত্তর তার নিজের কাছেই নেই। ভালো আছে কি না জানে না। খারাপ আছে কি না, সেটাও জানে না। শুধু জানে, এখনো বেঁচে আছে। আর বেঁচে থাকাটুকুই যেনো তার কাছে বর্তমানে সবচেয়ে বড়ো সত্য।

“ এখানে দমবন্ধ হয়ে আসে না। ভালো না থাকলেও খারাপ নেই!”

কণ্ঠের স্বাভাবিকতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা ক্লান্তিটুকু হয়তো একজন মা ঠিকই শুনতে পেলো।

“ ঢাকা ফির, তুই আর ইয়াশ কাছে থাকলে ছুটে দেখতে পারবো, ছুঁতে পারবো, তুই তোর মতোই জীবন পার করিস। তোমাকে বাড়ি ফিরতে বলবো না। এই বাড়ির দরজা সবসময়ই তোর জন্য খোলা, শুধু কাছে চলে আয়। এই মা’টাকে দেখার সুযোগ করে দে।”

ইনায়া আর কোনো উত্তর দিলো না। ফোনটা কানে নিয়েই নিঃশব্দ হয়ে বসে রইলো সে। সময় গড়িয়ে যায়। এক মুহূর্ত, দুই মুহূর্ত করে দীর্ঘ হতে থাকে নীরবতা। আয়শা বেগম ওপাশে উত্তরের অপেক্ষায় আছেন। হয়তো তার বুকের ভেতরেও তখন হাজারটা আশঙ্কা ঘুরপাক খাচ্ছে।কিন্তু ইনায়ার কাছ থেকে কোনো উত্তর আসে না।শেষ অব্দি নিস্তব্ধতা ভেঙে আবারও কণ্ঠ শোনা গেলো-

“ আমায় একদিনের জন্যও মা মেনেছিস?”

ইনায়ার চোখের পাতা কেঁপে উঠলো। ঠোঁট দুটো কাঁপলো অল্প। তারপর বুকের গভীর থেকে উঠে এলো উত্তর-

“ আজও মানি মা। মাকে মা মানবো না তো কাকে মানবো?”

আয়শা বেগমের কণ্ঠে এখন অদ্ভুত এক আকুলতা।

“ তাহলে ঢাকায় চলে আয়, এই মায়ের এই অবদারটার ফেলে দিস না। তোকে কোনো জোর করা হবে না, তোর ইচ্ছে হলেই তুই ফিরবি। নাহলে ফেরার দরকার নেই, তবুও এই মায়ের কাছে চলে আয়।”

আবারও নীরব হয়ে গেলো ইনায়া। কথাগুলো তার হৃদয়ের একেবারে সেই জায়গাটায় গিয়ে আঘাত করলো, যেখানে এতদিন ধরে সে নিজের সব দুর্বলতা লুকিয়ে রেখেছে। ঢাকা মানেই তার অতীত। সেই বাড়ি মানেই পুরোনো স্মৃতি। সেই মানুষটাও সেখানে আছে, যাকে এড়িয়ে চলতে চেয়েও পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। তবুও সেই একই জায়গায় একজন মা অপেক্ষা করে আছেন।কোনো দাবি নিয়ে নয়,কোনো শর্ত নিয়ে নয়। শুধু মেয়েটাকে আরেকবার কাছে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। ইনায়া ফোনটা কানের কাছে চেপে ধরে চোখ বন্ধ করলো। বুকের ভেতর কোথাও যেনো দীর্ঘদিনের জমে থাকা এক অদৃশ্য দরজা ধীরে ধীরে খুলে যাওয়ার শব্দ হলো।

“ আচ্ছা ঠিক আছে, তোমার ছেলে বলে দিও তার বাসায় ফিরে যেতে। এখানে থেকে কি আজীবন বেকার হয়ে বসে রবে?”

আয়শা বেগম মুহুর্তেই খুশি হয়ে গেলেন।

“ আমি বলে দিবো, তুই ফিরে আয় শুধু। কবে আসবি?”

“ আমায় ক’টা দিন সময় দাও।”

“ আচ্ছা দিলাম, কিন্তু বেশি না। জলদি ফিরবি কিন্তু।”

ইনায়া আয়শা বেগমের সঙ্গে কথা শেষ করে সেভাবেই বসে রইলো। কি করবে? কথা তো দিলো ফিরবে, তার ফেরা কি ঠিক হবে? হাজারটা চিন্তা মাথায় ঘুরলো। ঢাকায় ফিরলে তার সুবিধা, তবে অসুবিধাও কম নয়। একটা ভালো বাসায় থাকতে গেলে মোটা অংকের টাকার প্রয়োজন। সে একা নয়, যে যেখানে ইচ্ছে সেখানে থাকবে।

——-

সময় তার আপন গতিতে পেরিয়ে এসেছে। এবার খুলনা শহরকে বিদায় জানানোর পালা। বিগত আটটা মাস ধরে যে শহরটা ইনায়ার নিঃসঙ্গ দিনগুলোর নীরব সঙ্গী হয়ে ছিল, ধীরে ধীরে সেই অপরিচিত শহরটাই কেমন করে যেনো তার ভীষণ আপন হয়ে উঠেছে। অলিগলির পরিচিত পথ, চেনা আকাশ, বিকেলের নরম আলো, রাতের নিস্তব্ধতা, সবকিছুর সঙ্গেই জড়িয়ে গেছে কত শত স্মৃতি। অথচ আজ সেই স্মৃতিমাখা শহরটাকেই পেছনে ফেলে চলে যেতে হচ্ছে তাকে। বিদায়ের মুহূর্তে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে নাওমি, মেহরিন আর রুমাইসা। একা শহরে মেয়েগুলো কখন যে ইনায়ার আপনজন হয়ে উঠেছে, সে হিসাব হয়তো ইনায়া নিজেও জানে না। রক্তের কোনো সম্পর্ক নেই, অথচ সম্পর্কের গভীরতায় কোথাও কোনো কমতি নেই। এই শহর থেকে বিদায় নেওয়ার পর হয়তো সবচেয়ে বেশি এই তিনটা মুখই মনে পড়বে তার।নাওমি তখন ইয়াশের সঙ্গে কথা বলায় ব্যস্ত। ছোট্ট মানুষটার গালে হাত দিয়ে আদুরে স্বরে বলে উঠলো-

“ ইসস মাই ক্রাস বয়, তুমি চল যাবে আন্টি তোমায় এত্তো এত্তো মিস করবো।”

ইয়াশ অবশ্য কথার কোনো অর্থই বুঝলো না। নিষ্পাপ চোখ দুটো বড় বড় করে কেবল ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে রইলো নাওমির মুখের দিকে। শিশুর সেই নির্বাক দৃষ্টিতে যেনো কোনো প্রশ্ন নেই, কেবল অচেনা এক মায়ার বিস্ময়। ঘরে থাকা সামান্য জিনিসপত্রও ততক্ষণে গুছিয়ে নেওয়া শেষ। এতদিনের সংসার বলতে যা ছিল, তার অধিকাংশই খুব বেশি কিছু নয়। ঘরের খাটটাও আয়াশ বিক্রি করে দিয়েছে। একসময় যে ঘরের প্রতিটা কোণে ইনায়ার নিঃসঙ্গতা জমে থাকতো, আজ সেই ঘরটাই কেমন শূন্য, কেমন পরিত্যক্ত বলে মনে হচ্ছে।মেহরিন কিছুক্ষণ ইনায়ার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলে উঠলো-

“ আমাদের আবার ভুলে যেও না, রোজ ফোন করবো কিন্তু।”

ইনায়ার বুকের কোথাও হঠাৎ করেই অদৃশ্য এক শূন্যতা তৈরি হলো। এই মানুষগুলোকেও তো পেছনে ফেলে যাচ্ছে সে। কতটা আপন হয়ে গেলে বিদায়ের মুহূর্তে বুকটা এভাবে ভারী হয়ে আসে! মৃদু হেসে ইনায়া বললো-

“ তোমাদের কি করে ভুলবো বলো। তোমাদের প্রতও চির কৃতজ্ঞ আমি।”

কথাগুলো বলতে গিয়ে কণ্ঠটা কেমন নরম হয়ে এলো।
মেহরিনও আর আবেগ বাড়ালো না। চোখের কোণে জমে থাকা আর্দ্রতাটুকু আড়াল করে বললো,

“ ওসব কথা বাদ দাও, সুস্থ ভাবে যাবে। ইয়াশ সোনা আর নিজের যত্ন নিবে। আল্লাহ বাঁচিয়ো রাখলে দেখা হবে।”

বিদায়ের মুহূর্তটা এমনই হয়। মানুষ যতই শক্ত থাকার চেষ্টা করুক, কিছু বিচ্ছেদ শব্দের চেয়ে অনেক বেশি কথা বলে যায়।

*

সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে অবশেষে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে তারা। স্টিয়ারিংয়ের সামনে আয়াশ। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার দায়িত্বটাও তার কাঁধে। প্রথমে আয়াশের গাড়িতে আসতে একেবারেই রাজি ছিল না ইনায়া। এতদিনের জমে থাকা মান অভিমান এখনো পুরোপুরি মুছে যায়নি। একই গাড়ির ভেতর এতটা দীর্ঘ সময় পাশাপাশি থাকা তার কাছে অস্বস্তিরই। কিন্তু ইয়াশের কথা ভেবে শেষ পর্যন্ত আর না করেনি। ছোট্ট মানুষটা এর আগে কোনোদিন এতটা দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়নি। তাই তার স্বাচ্ছন্দ্যের কথাটাই শেষ পর্যন্ত নিজের অস্বস্তির চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে ইনায়ার কাছে। এই মুহূর্তে ইয়াশ মায়ের কোলে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। শিশুটার শান্ত মুখের দিকে একবার তাকিয়ে ইনায়া আবার জানালার বাইরে দৃষ্টি মেলে দেয়।

দ্রুতগতিতে ছুটে চলা গাড়িগুলো একটার পর একটা পেছনে পড়ে যাচ্ছে। রাস্তার দুই পাশের দৃশ্যও একই গতিতে বদলে যাচ্ছে। পরিচিত শহর ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে দৃষ্টির আড়ালে। অথচ এইদিকে আয়াশের দৃষ্টি যেনো বারবার অন্য এক জায়গাতেই ফিরে যাচ্ছে। ভিউ মিররের ভেতর দিয়ে সে বারবার ইনায়াকে পর্যবেক্ষণ করছে। ইনায়া বেশ বুঝতে পারছে, একজোড়া চোখ বারবার তার দিকেই ফিরে আসছে। সরাসরি তাকাচ্ছে না সে, তবুও আয়াশের দৃষ্টির অস্তিত্ব অনুভব করতে পারছে স্পষ্টভাবে। অস্বস্তিটা ক্রমশ বাড়তে থাকে। শেষমেশ আর নিজেকে সামলে রাখতে না পেরে ইনায়া বলে ওঠে-

“ বার বার এইভাবে তাকাবেন না, অস্বস্তি হচ্ছে আমার। সামনে তাকিয়ে ড্রাইব করুন। হাইওয়েতে রয়েছেন ভুলে যাবেন না।”

কথাটা বলেও ইনায়া তার দিকে তাকালো না। আয়াশও দৃষ্টি সরালো না। ভিউ মিররের ক্ষুদ্র পরিসরটুকুতে যেনো তার সমস্ত মনোযোগ আটকে আছে। ইনায়া অবশ্য ভুলেও সেদিকে তাকাচ্ছে না। আয়াশের চোখ দুটো অসম্ভব রকমের আকর্ষণীয়। গাঢ় কালো সেই নেত্রজোড়ার দিকে একবার তাকালে দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়া কঠিন। আর ইনায়ার দুর্বলতাগুলোর মধ্যে এই চোখ দুটোই বোধহয় সবচেয়ে ভয়ংকর। সচারাচর বেশিক্ষণ সে আয়াশের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে না। থাকলেই মনে হয়, সেই গভীরতার কোথাও গিয়ে নিজেকেই হারিয়ে ফেলবে। হঠাৎ ইয়াশ শব্দ করে কেঁদে উঠলো। ইনায়ার সমস্ত মনোযোগ মুহূর্তেই ছেলের দিকে ফিরে গেলো। দ্রুত কোলে থাকা শিশুটাকে আলতো করে নাড়িয়ে তুললো।

“ এইতো বাবা, কি হয়েছে।”

ইয়াশ তবুও থামলো না। ছন্দ তুলে কেঁদেই চললো। কান্নার স্বর ধীরে ধীরে আরও তীব্র হয়ে উঠতেই ইনায়া বুঝতে পারলো, ছোট্ট মানুষটার খিদে পেয়েছে। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই তার দৃষ্টি গিয়ে থামলো ভিউ মিররের দিকে।আয়াশের চোখ এখনো এইদিকেই। এভাবে তো ইয়াশকে খাওয়ানো সম্ভব নয়। ইনায়ার অস্বস্তি আয়াশও বুঝতে পারলো। কোনো কথা না বলে সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো সে। চোখ এবার সম্পূর্ণভাবে রাস্তার দিকে নিবদ্ধ।

ইনায়া আর দেরি করলো না। দ্রুত ইয়াশকে নিজের বুকের কাছে নিয়ে এলো। ওড়না দিয়ে নিজেকে যথাসম্ভব আড়াল করে নিলো। ক্ষুধার্ত শিশুটি খাবার পেতেই কান্না থামিয়ে শান্ত হয়ে এলো। পরম তৃপ্তিতে খেতে শুরু করলো সে।
অল্প সময়ের মধ্যেই গাড়ির নীরব পরিবেশটা ভরে উঠলো শিশুটার ক্ষীণ, আনন্দময় শব্দে। আয়াশের ঠোঁটের কোণে অতি সামান্য এক প্রশান্তির রেখা ফুটে উঠলো। সে কিছু বললো না।শুধু স্টিয়ারিংয়ে নিবদ্ধ দৃষ্টি নিয়েই গাড়ি চালিয়ে যেতে লাগলো। অথচ বুকের ভেতরটা কেমন অদ্ভুত এক তৃপ্তিতে ভরে উঠছে। নিজের সন্তানের এমন নিশ্চিন্ত তৃপ্তির শব্দ শুনে একজন বাবার হৃদয় কতটা পূর্ণ হয়ে উঠতে পারে, হয়তো সেটা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।ইনায়া ধীরে ধীরে ইয়াশকে দুলিয়ে দুলিয়ে খাওয়াতে থাকে। এতক্ষণে শিশুটার কান্না সম্পূর্ণ থেমে গেছে। ক্ষুদ্র হাত দুটোও ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে আসে। সময় গড়িয়ে যায়।

খাওয়া শেষ হতে না হতেই ইয়াশের চোখের পাতায় আবার ঘুম নেমে আসে। মায়ের বুকের নিরাপদ আশ্রয়ে মুখ লুকিয়ে ছোট্ট মানুষটা পুনরায় নিদ্রামগ্ন হয়ে পড়ে। ইনায়া নিচু দৃষ্টিতে সন্তানের শান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো।

চলবে।