Home "ধারাবাহিক গল্প "গোধূলী লগ্নে তুমি গোধূলী লগ্নে তুমি পর্ব-২৪ এবং শেষ পর্ব

গোধূলী লগ্নে তুমি পর্ব-২৪ এবং শেষ পর্ব

0
2

#গোধূলি_লগ্নে_তুমি
#কলমে_ফাহিমা_ইসলাম
#অন্তিম_পর্ব প্রথমাংশ

[ অনুমতি ব্যতীত কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ 🚫]

দিবাকরের আবির্ভাব ঘটেছে বহুকাল আগেই। প্রভাতের কোমলতা পেরিয়ে চারপাশে ততক্ষণে ছড়িয়ে পড়েছে সূর্যের তীর্যক রশ্মি। জানালার ফাঁক গলে আসা আলোকরেখাগুলো ধীরে ধীরে কক্ষের নিস্তব্ধতা ভেঙে দিচ্ছে। বাহিরের ব্যস্ত নগরজীবনও যেনো আপন ছন্দে জেগে উঠেছে। দূর থেকে ভেসে আসছে যানবাহনের ক্ষীণ শব্দ, কোথাও মানুষের কণ্ঠস্বর, কোথাও বা সকালের ব্যস্ততার মৃদু গুঞ্জন। অথচ সেই সমস্ত কোলাহলের মাঝেও ইনায়ার দুই নেত্র যেনো নিদ্রার কাছে পরাজয় স্বীকার করতে মরিয়া। যথাসাধ্য চোখ দুটো মেলে রাখার প্রয়াস করছে সে। সম্মুখে বসে থাকা ইয়াশ আপন মনে তার প্রিয় খেলনা হাতে নিয়ে নানা রকম শব্দ তুলে খেলায় মগ্ন। ফজরের সময় মায়ের সঙ্গে ঘুম থেকে উঠেছে, আর উঠেই যেনো তার খেলাধুলার সূচনা হয়েছে। এতক্ষণ পেরিয়ে গেলেও সেই খেলায় বিরতির কোনো নামগন্ধ নেই।

ইনায়াও বা কী করে ছেলেকে একা রেখে নিশ্চিন্তে চোখ বুজবে? কখন খাটের কিনার ঘেঁষে গিয়ে পড়ে যায়, সেই আশঙ্কাতেই তো তার বুকের ভেতর সারাক্ষণ কেমন অস্থিরতা জমে আছে। ফলে দু’চোখের পাতা এক করার মতো সামান্য অবকাশও যেনো তার ভাগ্যে নেই। তার উপর ইয়াশও এখন ঘুমানোর পাত্র নয়। ইনায়া যেই না অতি সামান্য সময়ের জন্য চোখ দুটো বুজে নেয়, অমনি ইয়াশের ক্ষুদ্র হাতজোড়া মায়ের সমগ্র মুখশ্রীতে বিচরণ করতে শুরু করে। যতক্ষণ না মা চোখ মেলে তার দিকে তাকাচ্ছে, ততক্ষণ নিজের অর্ধভাঙা ভাষায় অবিরত ডেকে চলবে তাকে। যেনো মায়ের চোখ বন্ধ থাকা মানেই তার ছোট্ট পৃথিবীতে কোনো এক বিরাট অবিচার ঘটে যাওয়া। পছন্দের খেলনাটা দুই হাতের মাঝে ধরে ইয়াশ আপন মনে বলে চলেছে,

“ বি..বি…বিবিববব! এ্যাইইই ব.বিবিবব!”

ইনায়া যেনো শেষ পর্যন্ত নিজের চোখ দুটোকে বশে রাখতে ব্যর্থ হলো। গতকাল গভীর রাত অব্দি কাজ করেছে সে। দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে করতে শরীরের প্রতিটা অঙ্গ যেনো বিশ্রামের জন্য আকুল হয়ে উঠেছে। অথচ মাতৃত্বের কাছে নিজের ক্লান্তির কোনো মূল্য নেই।চোখের পাতায় নেমে এলো তন্দ্রার ভার। ধীরে ধীরে নিদ্রার অতল টানে তলিয়ে যেতে শুরু করলো ইনায়া। কিন্তু সেই তন্দ্রার আয়ু দীর্ঘ হলো না। তার আগেই একজোড়া ক্ষুদ্র, কোমল হাত এসে দখল করে নিলো তার সমগ্র মুখশ্রী। হাতের সঙ্গে যোগ হলো আরেকটা ছোট্ট মুখ, মায়ের গালে যার আপন রাজত্ব কায়েম হয়ে গেছে। ইনায়া পিটপিট করে চোখ মেলে তাকালো। তার উপর এমন নির্দ্বিধায় রাজত্ব চালানো মহারাজ আর কেউ নয়, তারই ছোট্ট রাজা ইয়াশ।

ইনায়া হাত বাড়িয়ে ছেলেকে নিজের কাছে টেনে নিলো। কিন্তু মায়ের চোখ তখনো পুরোপুরি খোলা নয়। আর সেটাই যেনো ছোট্ট রাজার একেবারেই পছন্দ হলো না। তার তো চাই মা তার দিকে সম্পূর্ণ চোখ মেলে তাকাক। তাকে দেখুক, তার কথা শুনুক। মায়ের চোখ বন্ধ থাকলে ইয়াশের ছোট্ট মস্তিষ্কে কেমন এক অদ্ভুত ধারণা জন্ম নেয়, মা বুঝি তার কথা শুনছে না, তাকে দেখছেও না। আর এতেই ইয়াশ রাজার মহা নারাজি। অভিমান আর অধিকার মিশ্রিত শিশুসুলভ দুষ্টুমিতে মায়ের গালে নিজের খরগোশের মতো ছোট্ট দাঁত দিয়ে আলতো করে কামড় বসালো। অতঃপর মাথাটা সামান্য উঁচু করে আবারও মায়ের মুখপানে তাকালো। কিন্তু মায়ের চোখ তখনো তার প্রত্যাশামতো পুরোপুরি খোলা হয়নি। ব্যস, এবার আর ছোট্ট রাজার ধৈর্য রইলো না। তার সমস্ত নালিশ একে একে ভাঙা শব্দের মালা হয়ে মায়ের কাছে পৌঁছাতে শুরু করলো।

“ অ্যাইই..ম..মা মা..মা..অ্যাইই!”

ইনায়া চট করে চোখ মেলে তাকিয়ে ছেলেকে চমকে দিলো।

“ ভাউউ!”

মুহূর্তের মাঝেই ইয়াশের মুখশ্রী ভরে উঠলো নির্মল হাসিতে। খিলখিল শব্দে হেসে উঠলো সে। ঝলমলে দুই চোখে মায়ের পানে তাকিয়ে অমায়িক সেই হাসি যেনো ছড়িয়ে দিতে লাগলো চারপাশে। ইনায়াও ছেলের হাসিমাখা মুখ দেখে নিজের অজান্তেই হেসে ফেললো। বুকের আরও কাছে টেনে নিলো তার ছোট্ট রাজাকে। ইয়াশ নিজের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হাত দিয়ে মায়ের সমগ্র মুখশ্রীতে সস্নেহে হাত বুলাতে লাগলো। তারপর মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে নিজের ভাষায় সুধালো,

“ ম..মা…মা অ্যাইই!”

“ হুম সোনা।”

“ম..মমম!”

“ হুম আব্বা।”

“ ত..তাতা..তাতা!”

“ হুম তোতাপাখি।”

“গ..গুই..গুই..গুইই!”

” হুম কুচুপুচু।”

ইয়াশ যেনো তাতেই দারুণ মজা পেলো। এই ছোট্ট খেলাটাই যেনো তার নিত্যদিনের এক প্রিয় অভ্যাস। সে তার ভাঙা ভাষায় মাকে ডাকবে, আর মা তার প্রতিটা অসম্পূর্ণ শব্দের পরিপূর্ণ উত্তর দেবে। সেই উত্তর শুনে আবারও হাসবে ইয়াশ। আর ছেলের সেই হাসিতে ইনায়ার ক্লান্ত সকালটাও যেনো মুহূর্তেই প্রাণ ফিরে পাবে। ইনায়াও ছেলের প্রতিটা ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য সর্বদা প্রস্তুত। ছেলের হাসিমাখা মুখশ্রী পানে তাকিয়ে ইনায়া ধীরে ধীরে তার ছোট্ট পেটে মুখ গুঁজে দিলো। তারপর আলতো হাতে কাতুকুতু দিতে শুরু করলো। ব্যস, তাতেই ইয়াশের হাসি যেনো দ্বিগুণ হয়ে উঠলো।

সারা কক্ষ ভরে উঠলো মা আর ছেলের প্রাণবন্ত হাসির ধ্বনিতে। নিষ্পাপ সেই হাসির প্রতিধ্বনি যেনো সকালের সমস্ত ক্লান্তি, সমস্ত অবসাদকে এক নিমিষেই দূরে সরিয়ে দিলো। ইয়াশ খিলখিল করে হাসতেই থাকলো। কিছুক্ষণ পর ইনায়া থেমে গেলো। ছেলেটাকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে নিয়ে সস্নেহে তার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললো-

“ হয়েছে এখন একটু দুদু খাও তো কুচুপুচু।”

ইয়াশ হাসিমাখা মুখ নিয়ে মায়ের পানে তাকিয়ে রইলো। সেই নিষ্পাপ দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ইনায়া নিজের নাকের সঙ্গে ছেলের নাকটা আলতো করে ছুঁইয়ে দিতে দিতে বললো-

“ খিদে নেই বুঝি? ঘুম নেই চোখে? সেই কখন উঠেছো হুম?”

“ অ্যাইই ম..মা!”

“ হুম মা।”

বলেই ছেলেকে বুকের কাছে নিয়ে তাকে খাওয়াতে শুরু করলো ইনায়া। ইয়াশ খেতে খেতে আনন্দে ছোট্ট ছোট্ট পা নাড়াচ্ছে, মাঝেমধ্যে মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে তার সেই পরিচিত চো চো শব্দ। ইনায়া ধীর হাতে ছেলের পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো।বিকেলের দিকে দোকানে যাওয়ার কথা তার। কতদূর কাজ এগিয়েছে, নিজের চোখে গিয়ে একবার দেখে আসবে। যদিও আয়াশ প্রতিদিনের মতো সবকিছুর খেয়াল রাখছে, তবুও ইনায়ার নিজের মনটা যেনো একবার না গেলে শান্তি পাবে না। এই মাসের মধ্যেই সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে দোকানের উদ্বোধন করার ইচ্ছা তার। আল্লাহর অশেষ রহমতে ধীরে ধীরে সবকিছু সহজ হয়ে এসেছে। যে পথটা একসময় অসীম দুর্গম মনে হয়েছিল, সেই পথই যেনো এখন একে একে নিজের দুয়ার খুলে দিচ্ছে। কত প্রতিকূলতা, কত দুঃসহ সময়, কত না বলা কষ্ট পেরিয়ে আজকের এই জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে ইনায়া। এই পথচলা সম্ভব হয়েছে একমাত্র নিজের প্রতি বিশ্বাস আর আল্লাহর প্রতি অটুট ভরসার কারণে।

জীবনের পথে ব্যর্থতা আসবেই। কখনো দুঃখ এসে বুকের ভেতর ভারী হয়ে বসবে, কখনো পরিস্থিতি মানুষকে ভেঙে দেওয়ার সমস্ত আয়োজন সম্পূর্ণ করে ফেলবে। কিন্তু প্রতিটা কঠিন সময়ই তো শেষ পর্যন্ত একেকটা পরীক্ষা। যে মানুষ আল্লাহর উপর ভরসা রেখে ধৈর্যের সঙ্গে সেই কঠিন পথ অতিক্রম করতে পারে, একদিন না একদিন তার জন্যও অপেক্ষা করে থাকে সফলতার প্রভাত। কারণ ব্যর্থতার আড়ালেই কখনো কখনো সফলতার বীজ লুকিয়ে থাকে। শূন্যতার গভীরতম প্রান্তেই জন্ম নেয় পূর্ণতার আকাঙ্ক্ষা। আর হারিয়ে যাওয়ার পরই মানুষ বুঝতে শেখে, কোন জিনিসটা তার সত্যিকারের প্রয়োজন।

তাই জীবনে যতবারই পতন আসুক, যতবারই পথ বন্ধ হয়ে যাক, থেমে যাওয়াটা কখনোই শেষ কথা নয়। আবার উঠে দাঁড়ানোই জীবনের নতুন মোড়ের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রথম পদক্ষেপ। আর আল্লাহর উপর ভরসা রেখে সেই পদক্ষেপটা যে মানুষ নিতে পারে, তার জন্য অন্ধকারের দীর্ঘতম রাতের পরেও একদিন না একদিন নতুন আলোর সূচনা হবেই।

——-

সময় নিজের নিয়মে বয়ে চলে। কারো অপেক্ষায় থেমে থাকে না, কারো দুঃখে গতি মন্থর করে না। দেখতে দেখতে তাদের জীবনের আরও দেড়টা বছর পেরিয়ে গেছে। যে দিনগুলো একসময় দীর্ঘ প্রতীক্ষার মতো মনে হতো, সেগুলোই এখন স্মৃতির পাতায় জমে থাকা পুরোনো অধ্যায়। ছোট্ট ইয়াশও আর আগের সেই কেবল অস্পষ্ট শব্দে কথা বলা শিশুটা নেই। তার বয়স এখন দুই বছর আট মাস। ছোট্ট দু’পায়ে সারাক্ষণ ছুটে বেড়ানো, নিজের মতো করে কথা বলা, অগণিত প্রশ্ন করা আর উত্তর না পেলেও নিজের মনমতো একটা উত্তর বানিয়ে নেওয়াই যেনো তার নিত্যদিনের কাজ।

ভোরের আলো ঘরের মেঝেতে এসে পড়তেই ইয়াশও উঠে পরবো। তারপর ইয়াশ তার ছোট্ট গাড়িটা হাতে নিয়ে ছুটে বেড়াবে। দাদা-দাদি, আন্টি-আঙ্কেল সবার থেকে রোজই কিছু না কিছু বয়না করবে। আইরিনের মেয়ে হয়েছে মেয়েটা কি রাগী। একটু ধরলেই মুখ ফুলাবে। তাই ইয়াশ তার নাম দিয়েছে ফুলফুলি। বাসায় এলেই ইয়াশ আয়রার গাল টিপে দিবে। ওমনি আয়রার কান্না আরম্ভ হবে। ইয়াশ এখন মন দিয়ে তার গাড়ি নিয়ে খেলায় ব্যস্ত।
মুখে তার একটানা বকবকানি।

“মা, দেকো! দেকো না! আম্মু, গাড়ি জাচ্ছে!”

ইনায়া কাজের ফাঁকে মাথা তুলে তাকায়। ঠোঁটের কোণে আপনাআপনি ফুটে ওঠে মায়ামাখা হাসি।

“হুম, দেখছি তো। গাড়িটা কোথায় যাচ্ছে?”

ইয়াশ গম্ভীর মুখে কিছুক্ষণ নিজের গাড়িটার দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বললো-

“বাবা কাছে জাবে।”

ইনায়ার মুখে হাসি আরও প্রশস্ত হলো।

“বাবার কাছে কেনো?”

“বাবা বুম বুম তাই।”

কথাটা বলেই ছোট্ট মানুষটা আবার ছুটে গেলো। যেনো তার পৃথিবীর সমস্ত ব্যস্ততার মাঝেও এই সামান্য খেলাটার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছুই নেই।কিছুক্ষণ পরেই দরজার দিক থেকে আয়াশের কণ্ঠ ভেসে আসে-

“চ্যাম্প, কোথায় আমার সাহেব?”

শব্দটা কানে যেতেই ইয়াশ খেলনা ফেলে ছুটে যায়। ক্ষুদ্র পা দু’টো যতটা সম্ভব দ্রুত চালিয়ে বাবার কাছে পৌঁছে দুই হাত বাড়িয়ে দেয়।

“বাবা!”

আয়াশ নিচু হয়ে ছেলেকে কোলে তুলে নেয়। ইয়াশ দুই হাত দিয়ে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে নিজের দিনের সমস্ত গল্প এক নিঃশ্বাসে বলতে শুরু করে।

“বাবা,আমি গাড়ি তালিয়েছুি মা দেকছে। গাড়ি এইইই করে গেছে। তারপর আমি পড়ি নাই, একদম পড়ি নাই!”

আয়াশ মৃদু হেসে বলে-

“বাহ, এত বড় হয়ে গেছো যে এখন নিজেই গাড়ি চালাও?”

ইয়াশ চোখ বড়ো বড়ো করে মাথা নাড়ায়।

“হুম। আমি বড়ো। মা ছোট।”

ইনায়া দূর থেকে শুনে মুচকি হেসে মাথা নাড়লো।

“বেশ, তাহলে আজ থেকে মায়ের সব কাজও তুমি করবে।”

ইয়াশ মুহূর্তেই চুপ হয়ে গেলো। তারপর বাবার কাঁধে মুখ লুকিয়ে ফিসফিস করে বললো-

“না। মা কাজ কলবে। আমি খেলবো।”

আয়াশের হাসি আর আটকে থাকে না। এই ছোট্ট মানুষটার কথাবার্তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। অনেক শব্দই নিজের মতো করে উচ্চারণ করে সে। তবুও তার প্রতিটা ভাঙা বাক্যের মাঝেই যেনো এক অদ্ভুত প্রাণবন্ততা। কখনো একটা শব্দের জায়গায় দুটো শব্দ, কখনো বাক্যের মাঝখানে নিজের বানানো শব্দ, আবার কখনো কোনো প্রশ্নের এমন উত্তর, যার সঙ্গে প্রশ্নের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই।
আর ইনায়া ও আয়াশ, দুজনেই সেই অসম্পূর্ণ বাক্যগুলো শুনেই পূর্ণ আনন্দ খুঁজে নেয়। তাদের সম্পর্কও এখন আর আগের মতো দূরত্বে আবদ্ধ নয়। একই আসমানের নিচে থেকেও যে অদৃশ্য দেয়াল একসময় দুজনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকতো, সময়ের প্রবাহে সেই দেয়ালের অস্তিত্ব অনেকটাই মুছে গেছে।তারা একে অপরের সবকিছু হয়ে ওঠেনি, কিন্তু একে অপরের ভরসার জায়গাটা আবার ফিরে পেয়েছে। প্রয়োজনের সময়ে কথা হয়। কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পরামর্শ হয়। মন খারাপ হলে নীরবতাও ভাগ করে নেয় তারা। বন্ধুত্বের যে স্বচ্ছ জায়গাটা একসময় হারিয়ে গিয়েছিল, সেটাই যেনো ধীরে ধীরে নতুন করে ফিরে এসেছে।

ইনায়ার জীবনের সবচেয়ে বড়ো পরিবর্তনটাও এই সময়েই এসেছে। যে ছোট্ট ব্যবসাটার শুরুতে ছিলো অল্প কিছু পুঁজি, অগণিত দুশ্চিন্তা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা, সেটাই এখন ধীরে ধীরে একটা পরিচিত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। দোকানের পরিধি বেড়েছে, কর্মীর সংখ্যা বেড়েছে, নিয়মিত ক্রেতা তৈরি হয়েছে। অনলাইনের কাজও এখন আগের তুলনায় অনেক বিস্তৃত। ইনায়া এখন আর শুধু নিজের জন্য কাজ করে না। তার অধীনে আরও কয়েকজন মানুষ কাজ করে। কারো সংসার চলে এই প্রতিষ্ঠানের উপার্জনে, কারো সন্তানের পড়াশোনার খরচ আসে এখান থেকে। নিজের নামের পাশে ‘নারী উদ্যোক্তা’ শব্দদুটো দেখতে এখন আর অচেনা লাগে না ইনায়ার।

বরং প্রতিবার নতুন কোনো অর্জন সামনে এলে তার মনে পড়ে যায় সেই শুরুর দিনগুলোর কথা। কত রাত নির্ঘুম কেটেছে। কতবার মনে হয়েছে, আর পারবে না। কতবার হিসাব মেলেনি। কতবার একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দীর্ঘক্ষণ চুপ করে বসে থাকতে হয়েছে। তবুও থেমে যায়নি সে। আর সেই দীর্ঘ পথচলায় আয়াশও বরাবরই ছায়ার মতো পাশে থেকেছে। কখনো সামনে এসে নিজের কৃতিত্ব দাবি করেনি। কখনো বলেনি, তার জন্যই ইনায়া এতদূর এসেছে। বরং ইনায়া যখন কোনো কঠিন সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড়িয়েছে, তখন নিজের মতামতটুকু জানিয়েছে। প্রয়োজন হলে হিসাব মিলিয়ে দিয়েছে। কোনো কাগজপত্র বুঝতে অসুবিধা হলে পাশে বসেছে। ব্যবসার কোনো সমস্যায় ইনায়া যখন অস্থির হয়েছে, তখন আবেগের বদলে শান্তভাবে বিষয়টা দেখতে সাহায্য করেছে। কোনোদিন ইনায়া ভেঙে পড়লে আয়াশ তার হয়ে পথ হাঁটেনি, বরং পথটা যেনো একটু সহজ হয়, সেই ব্যবস্থা করেছে।

কারণ ইনায়ার সাফল্যটা তার নিজেরই অর্জন। আয়াশ শুধু সেই পথের পাশে থাকা মানুষটা। আজও নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ইনায়া অনেক সময় আয়াশকে ডাকে।

“শুনবে?”

আয়াশ কাজ থেকে চোখ তুলে তাকায়।

“হুম, বলুন।”

ইনায়া নিজের কথাটা খুলে বলে। আয়াশ মন দিয়ে শোনে। সবশেষে নিজের মতামত জানায়। সিদ্ধান্তটা অবশ্য ইনায়াই নেয়। এই জায়গাটাই হয়তো তাদের সম্পর্কের সবচেয়ে বড়ো পরিবর্তন। এখন আর কারো উপর কারো অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন হয় না। বিশ্বাস আছে বলেই প্রশ্ন করতে ভয় হয় না। ভরসা আছে বলেই নিজের মতামতটাও নির্দ্বিধায় বলা যায়। ইয়াশও এই দুজনের মাঝখানে নিজের ছোট্ট পৃথিবীটা সাজিয়ে নিয়েছে। কখনো মায়ের কাছে ছুটে যায়, কখনো বাবার কাছে। আবার কখনো দুজনকে একসঙ্গে বসিয়ে নিজের খেলনা সাজিয়ে বলে-

“তোমরা এইখানে বতো। আমি খেলি।”

আয়াশ মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করে-

“আমরা এখানে বসে কী করবো?”

ইয়াশ খুব গম্ভীর হয়ে উত্তর দেয়-

“আমাকে দেকবা।”

ইনায়া হেসে ফেলে।

“আচ্ছা, আমরা তোমাকেই দেখবো।”

ইয়াশ সন্তুষ্ট হয়ে নিজের খেলনায় মন দেয়।
জীবন যে সবসময় একই রকম থাকে না, সেটা ইনায়া এখন খুব ভালো করেই জানে। একসময় যে শূন্যতা তাকে প্রতিটা মুহূর্তে গ্রাস করে রাখতো, আজ সেই একই জীবনের ভাঁজে ভাঁজে ছোট্ট ছোট্ট পূর্ণতা জমে আছে। নিজের পরিচয়টা সে নতুন করে খুঁজে পেয়েছে। নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে। নিজের স্বপ্নকে বাস্তবের মাটিতে দাঁড় করিয়েছে।আর পাশে পেয়েছে এমন দুটো মানুষকে, যাদের উপস্থিতি তার জীবনের অর্থকে আরও গভীর করে তুলেছে।

*****

সন্ধ্যার আগমনী বার্তা ততক্ষণে নগরীর আকাশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। দিবাকরের তেজ ম্লান হয়ে পশ্চিম দিগন্তে রক্তিম আভা ছড়িয়ে দিচ্ছে। সারাদিনের কর্মব্যস্ততা শেষে শহরের রাজপথগুলো যেনো নতুন করে জেগে উঠেছে। একের পর এক যানবাহন ছুটে চলছে আপন গন্তব্যের পানে। সেই ব্যস্ত নগরীরই একপাশে বড় একটা খেলনার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে আয়াশ আর তার চ্যাম্প ইয়াশ। ইয়াশের দুই চোখ তখন দোকানের ভেতর সাজানো অগণিত খেলনার মাঝে ঘুরপাক খাচ্ছে। এতসব রঙিন খেলনা দেখে তার ক্ষুদ্র মুখশ্রীতে বিস্ময়ের ছাপ স্পষ্ট। কখনো একটা গাড়ির দিকে আঙুল তুলছে, তো পরক্ষণেই পাশের তাকের উপর রাখা একটা পুতুলের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকছে। আয়াশ নিচু হয়ে ছেলের সমান উচ্চতায় এসে দাঁড়ায়। পকেটে রাখা মানিব্যাগটা হাতে নিয়ে মৃদু গলায় বলে-

“ এই পোটকু, আজকে শুধু একটা খেলনা নিবো। একটার বেশি কিন্তু না।”

ইয়াশ সঙ্গে সঙ্গে বাবার দিকে তাকায়। চোখেমুখে এমন এক অভিব্যক্তি ফুটে ওঠে, যেনো আয়াশ পৃথিবীর সবচেয়ে অযৌক্তিক কথাটা এইমাত্র উচ্চারণ করেছে।ছোট্ট ভ্রুজোড়া কুঁচকে যায়।

“ দুইতা।”

আয়াশ ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বলে-

“ না, একটা।”

ইয়াশ এবার আঙুল তুলে দোকানের ভেতর দেখিয়ে বলে-

“ ওইটা।”

“ আচ্ছা, ওইটা নিবো।”

“ আর ওইটা।”

আয়াশ এবার হেসেই ফেলে।

“ এই একটা বললাম না?”

ইয়াশ বিন্দুমাত্র বিচলিত হয় না। বরং নিজের পছন্দের আরেকটা খেলনার দিকে হাত বাড়িয়ে বেশ দৃঢ় কণ্ঠে বলে-

“ এইটাও।”

আয়াশ ছেলের হাতটা আলতো করে নামিয়ে দেয়।

“ দুইটা খেলনা নিলে কিন্তু বাসায় নিয়ে গেলে, তোমার মা আমাকে আর বাসা ঢুকতে দিবে না।

মায়ের নাম শুনতেই ইয়াশ খানিকক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর অত্যন্ত গম্ভীর মুখ করে বাবার দিকে তাকিয়ে বলে-

“ মা কিনবো।”

আয়াশের হাসি আরও প্রশস্ত হয়।

“ মা টাকা দেবে?”

ইয়াশ মাথা নাড়ায়।

“ দেবে।”

“ আচ্ছা, তাহলে মাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করি?”

ইয়াশ সঙ্গে সঙ্গে বাবার হাত আঁকড়ে ধরে। মাথা ঝাঁকিয়ে বলে-

“ না।”

“ কেনো?”

“ মা বকা দিবে।”

আয়াশ এবার আর হাসি আটকে রাখতে পারলো না। ছেলের গাল টিপে দিয়ে বলে-

“ তাহলে একটাই নাও।”

ইয়াশ নিজের গালটা বাবার হাত থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে অভিমানী মুখে তাকিয়ে থাকে। তারপর একটু পরেই ধীরে ধীরে একটা গাড়ি তুলে নেয়। কিন্তু গাড়িটা হাতে নিয়েই আবার পাশের তাকের দিকে তাকায়। সেখানে রঙিন একটা ছোট্ট বল রাখা।চোখ দুটো চকচক করে ওঠে তার।আয়াশ ছেলের সেই দৃষ্টি অনুসরণ করে বলটার দিকে তাকায়। তারপর ছেলের মুখের দিকে চেয়ে বলে-

“ না ইয়াশ।”

ইয়াশের মুখটা সঙ্গে সঙ্গে মলিন হয়ে যায়।

“ বাবা…”

“ একটা খেলনা।”

“ বাবা দুইটা।”

“ না।”

“ বাবা প্লিতত।”

আয়াশ ভ্রু উঁচিয়ে তাকায়।

“ প্লিজ বলে লাভ হবে না।”

ইয়াশ কিছুক্ষণ বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর খুব ধীরেসুস্থে নিজের দুই হাত দিয়ে বাবার পা জড়িয়ে ধরে। মুখটা তুলে এমন মায়ামাখা দৃষ্টিতে তাকায় যে, আয়াশের কঠিন থাকার সমস্ত প্রচেষ্টাই মুহূর্তে দুর্বল হয়ে আসে।

“ বাবা… দুইটা।”

আয়াশ দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

“ তুমি তোমার মায়ের মতোই জেদি হয়েছো।”

ইয়াশ কথাটার অর্থ না বুঝলেও বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হেসে ওঠে। শেষমেশ খেলনা দুইটাই কেনা হয়। প্রতিদিন যার সঙ্গেই বাহিরে আসবে অপ্রয়োজনীয় সবকিছু কিনে নিয়ে আসবে ইয়াশ। সবার আহ্লাদে, আহ্লাদে এটা তার অভ্যাস হয়ে এসেছে। একদিন আয়াশ আর ইয়াশ মিলে অর্ধেক খেলনার দোকান তুলে নিয়ে এসেছিলো। ইনায়া সেদিন প্রচুর রেগে গিয়েছিলো আয়াশের উপর। তাই পুরো একদিন বাপ-বেটাকে দেখা করতে দেয়নি। আর বা ইনায়া কথা বলেছে। সেদিন থেকে আয়াশ ইনায়ার কথা মতে ইয়াশকে জিনিস কিনে। অন্যসব জিনিস আয়াশ নিজের পছন্দে কিনলেও ইয়াশের খেলনার জিনিস কিনতে দেয় না। তাই প্রতিদিন বাহিরে এলে একটা করে খেলনা কিনে দেয়। একটা রুম সম্পূর্ণ খেলনা দিয়ে ভরা। এতো খেলনা ইয়াশ ধরেও দেখে না কয়েকদিন পার হলে।

দোকান থেকে বের হওয়ার সময় ইয়াশ এক হাতে নিজের নতুন গাড়িটা আর অন্য হাতে ছোট্ট বলটা শক্ত করে ধরে রেখেছে। আয়াশ তার হাতটা নিজের মুঠোয় নিয়ে ধীর পায়ে হাঁটতে শুরু করেছে। সন্ধ্যার ব্যস্ত রাস্তা ততক্ষণে মানুষের ভিড়ে পরিপূর্ণ। চারপাশে যানবাহনের অবিরাম শব্দ, পথচারীদের ব্যস্ত পদচারণা, দোকানের আলো আর রাস্তার বাতিগুলো মিলে শহরটাকে এক ভিন্ন রূপ দিয়েছে। সেই ব্যস্ততার মাঝেও বাবার হাত ধরে ইয়াশ আপন মনে টুপটুপ পায়ে হাঁটছে। ছোট্ট পা দু’টো বাবার দীর্ঘ পদক্ষেপের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে কখনো দ্রুত হয়ে যাচ্ছে, কখনো আবার পিছিয়ে পড়ছে। আয়াশও ছেলের গতির কথা মাথায় রেখে নিজের পদক্ষেপ ধীর করে নেয়। হঠাৎ ইয়াশ থেমে যায়। আয়াশও থেমে পেছন ফিরে তাকায়।

“ কী হয়েছে?”

ইয়াশ নিচের দিকে তাকিয়ে নিজের নতুন গাড়িটার দিকে চেয়ে থাকে। তারপর বাবার দিকে তাকিয়ে অভিযোগের সুরে বলে-

“ বাবা খারাপ।”

আয়াশ বিস্মিত হওয়ার ভান করে বলে-

“ আমি আবার কী করলাম?”

ইয়াশ ঠোঁট ফুলিয়ে বলে-

“ দুইতা দিবে না বলতিলা।”

“ কিন্তু দুইটাই তো দিলাম।”

ইয়াশ একটু থামে। তারপর নিজের বলটার দিকে তাকিয়ে আবার বলে-

“ আগে দিবে না বলতিলা।”

আয়াশ হাসতে হাসতে মাথা নাড়ে।

“ তাই বলে বাবা খারাপ?”

“ হুম।”

“ তাহলে খেলনা দুইটা কার?”

“ আমার।”

“ কে কিনে দিয়েছে?”

ইয়াশ এক মুহূর্তও দেরি না করে বলে-

“ মা।”

আয়াশ থমকে যায়।

“ মা?”

ইয়াশ মাথা নাড়ে।

“ হুম। মা কিনছে।”

আয়াশ এবার ছেলের হাতটা একটু শক্ত করে ধরে বলে-

“ টাকা তো আব্বু দিয়েছে।”

ইয়াশের মুখে আবার সেই ক্ষুদ্র অভিমানের ছাপ।

“ না। মা।”

“ আচ্ছা, ঠিক আছে। মা-ই কিনেছে।”

ইয়াশ সন্তুষ্ট হয়ে আবার হাঁটতে শুরু করে। কিন্তু কয়েক পা যেতেই তার মনে হয়, বাবার সঙ্গে এই হিসাবটা এখনো শেষ হয়নি। তাই আবার মাথা তুলে বলে-

“ বাতায় গিয়া মাকে বলে দিব।”

আয়াশ মুচকি হেসে নিচু স্বরে বলে-

“ কী বলবে?”

“ বাবা বকা দিছে।”

“ আমি বকা দিয়েছি?”

“ হুম।”

“ আর তুমি?”

ইয়াশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে-

“ আমি ভালো।”

আয়াশ হেসে ফেলে।

“ বাহ! নিজের বিচার নিজেই করে ফেলেছো?”

ইয়াশ মাথা নাড়তে নাড়তে বলে-

“ হুম।”

“ বাসায় গিয়ে মাকে সব বলবে?”

“ হুম।”

“ মা তোমার কথা শুনবে?”

“ হুম।”

আয়াশ এবার ছেলের দিকে তাকিয়ে রহস্যময় ভঙ্গিতে বলে-

“ কিন্তু একটা কথা জানো?”

ইয়াশ কৌতূহলী চোখে বাবার দিকে তাকায়।

“ কী?”

আয়াশ সামান্য ঝুঁকে এসে বলে-

“ তোমার মা তো আমার বউ।”

ইয়াশ কয়েক মুহূর্ত বাবার মুখের দিকে নির্বাক তাকিয়ে থাকলো। কথাটার গভীরতা বোঝার বয়স তার এখনো হয়নি। তবুও বাবার কথার ভঙ্গিতে এমন কিছু আছে, যা তার ভালো লাগলো না। ছোট্ট ভ্রু কুঁচকে যায়।

“ আমার মা।”

আয়াশ মৃদু হেসে বলে-

“ হুম, তোমার মা।”

“ আমার।”

“ হুম, তোমার।”

ইয়াশ এবার বাবার হাতটা আরও শক্ত করে ধরে বলে-

“ বাবার না।”

আয়াশ মজা করে জিজ্ঞেস করে-

“ কী না?”

“ মা আমার।”

আয়াশ হেসে মাথা ঝাঁকায়।

“ আচ্ছা, মা তোমার। কিন্তু তোমার মা আমার বউ।”

ইয়াশ এবার বিরক্ত হয়ে বাবার দিকে তাকায়। তারপর নিজের ছোট্ট পা দিয়ে মাটিতে টুপ করে একটা শব্দ তুলে হাঁটতে হাঁটতে বলে-

“ বাসায় যেতে মাকে বলে দিব।”

“ কী বলবে?”

“ তুমি মাকে বউ বলেতো।”

আয়াশের হাসি এবার আর থামে না। ছেলের মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দেয়।

“ তো আমার বউকে বউ বলবো না?”

ইয়াশ আবারও ভ্রু কুঁচকে তাকায়। যেনো বাবার কোনো কথাই তার মনঃপূত হচ্ছে না।

“ না।”

“ কেনো?”

“ মা আমার।”

আয়াশ এবার ছেলের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় আবদ্ধ করে ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে মৃদু স্বরে বলে-

“ আচ্ছা ঠিক আছে। তোমার মা তোমার। আর আমার বউও।”

ইয়াশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর নিজের নতুন গাড়িটা বুকে চেপে ধরে আবারও টুপটুপ পায়ে বাবার সঙ্গে হাঁটতে শুরু করে।
ব্যস্ত শহরের সেই কোলাহলের মাঝেও বাবা আর ছেলের এই ক্ষুদ্র কথোপকথন যেনো তাদের নিজেদের একান্ত জগৎ তৈরি করে নিয়েছে। চারপাশে কত মানুষ, কত শব্দ, কত ব্যস্ততা। অথচ আয়াশের কাছে এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান দৃশ্যটা তার হাত ধরে হাঁটা ছোট্ট ছেলেটাই। আর ইয়াশের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়টা সেই বড়ো হাত, যে হাতটা তার ক্ষুদ্র হাতটাকে শক্ত করে ধরে রেখেছে।

সন্ধ্যার আলো ক্রমশ গাঢ় হয়ে আসছে। আকাশের শেষ রক্তিম আভাটুকুও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে রাতের নীল অন্ধকারে। রাস্তার বাতিগুলো আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠছে।
বাবার সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ইয়াশ হঠাৎ আবার মুখ তুলে বলে-

“ বাবা।”

“ হুম।”

“ মা আমার কথা শুনবো।”

আয়াশ ছেলের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলে-

“ জানি।”

“ সব কথা।”

“ সেটাও জানি।”

ইয়াশ এবার গর্বিত ভঙ্গিতে বলে-

“ মা ভালো।”

আয়াশের চোখের দৃষ্টি অজান্তেই কোমল হয়ে আসে।

“ হুম। তোমার মা খুব ভালো।” একটু থেমে আবার বলে-

“ তাই তো আমার বউ।”

ইয়াশ সঙ্গে সঙ্গে মুখ ফুলিয়ে ফেলে।

“ আব্বু!”

আয়াশ হেসে ওঠে। সেটা দেখে ইয়াশ নিজের হাত ছাড়িয়ে আগে আগে হাঁটা শুরু করে। সেটা দেখে আয়াশ আর এক দফা হেসে দিলো। ইয়াশের সঙ্গে হাঁটতে শুরু করে তার ছোট্ট ছোট্ট পদক্ষেপ অনুযায়ী। ইয়াশ সেটা দেখে মুখ ফুলিয়ে বলে-

“বাবা আমি মা’কে সবচেয়ে ভালবাতি!”

আয়াশও সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলো।

“ না আমি বাসি বেশি।”

সেটা শুনে ইয়াশের মুখটা আরও কালো হয়ে এলো। আদুরে মুখশ্রীতে রাগ এসে জমা হলো। নাক-গাল ফুলিয়ে বলে-

“নো বাবা, আমি বাতি বেশি। মায়েড কুতুপুতু ইয়াত।”

আয়াশও ছেলেকে অনুকরণ করে একই ভঙ্গিতে বলে-

“এই পোটকু চুপ, আমিও আমার বউয়ের কুচুপুচু লাগি।”

ইয়াশের রাগ যেনো আকাশ ছোঁয়া হলো। রাগী চোখে আয়াশকে ভয়ংকর ভাবে শাসলো। তার দিকে আর তাকালো না, নিজের ক্ষুদ্র পা দিয়ে বড়ো বড়ো পা ফেলে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। আয়াশ শব্দ করে হেসে দিলো, ছেলেকে এই ব্যাপারে জ্বালাতে তার দারুন লাগে। এমনি তার সঙ্গে গলায় গলায় ভাব, কিন্তু ব্যাপারটা যখন মায়ের ক্ষেত্রে হয় তখন ইয়াশ যেনো হিংসুটে হয়ে যায়। আয়াশ ছেলের ক্ষুদ্র পদক্ষেপের জন্য পা মিলিয়ে চলছে।

#চলবে

#গোধূলি_লগ্নে_তুমি
#কলমে_ফাহিমা_ইসলাম
#অন্তিম_পর্ব

[ অনুমতি ব্যতীত কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ 🚫]

ধরণীজুড়ে ততক্ষণে রাত্রির নিবিড় আঁধার নেমে এসেছে। চারপাশ অন্ধকারের গাঢ় চাদরে আবৃত। ইনায়া নিজের মতো করে টুকটাক গৃহস্থালির কাজকর্মে ব্যস্ত ছিল। এমন সময় হঠাৎ বাসার বেলটা বেজে উঠলো। মুহূর্তমাত্র বিলম্ব করলো না সে। বাহিরে যে তার মহারাজ অপেক্ষমাণ! দরজা খুলতেই ইয়াশ ছুটে এসে মায়ের দুটো পা আঁকড়ে ধরলো। হাতে থাকা খেলনাটা যে বহু আগেই বাবার হাতে গুঁজে দিয়েছে, সেদিকে আর তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। ইনায়া স্নেহভরা হাতে ছেলেকে কোলে তুলে নিতেই ইয়াশ গাল ফুলিয়ে মায়ের বুকে মুখ গুঁজে দিলো। আয়াশ দরজাটা বন্ধ করে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে সোফার উপর বসলো। এখন সে জানে, কিছুক্ষণের মধ্যেই নালিশের আসর বসবে। হলোও তাই। আয়াশ ছেলের পানে তাকাতেই ইয়াশ মায়ের বুকের আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে এক পলক বাবার দিকে তাকালো। পরক্ষণেই মুখ ভেংচি কেটে আবার মায়ের দিকে ফিরে গেলো। অতঃপর মাথাটা সামান্য উঁচু করে নিষ্পাপ দৃষ্টিতে মায়ের মুখপানে তাকিয়ে বলতে আরম্ভ করলো-

“ মা বাবা আমায় বকেতে। তুমি নাকি বাবার বউ, আমার চেয়ে বাবা নাকি বেতি ভালবাতে তোমায়।”

এক নিঃশ্বাসে নিজের সমস্ত অভিযোগ উগরে দিয়ে ইয়াশ যেনো ভারমুক্ত হলো। ইনায়া ছেলেকে কোলে নিয়েই সোফায় বসে পড়লো। ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে ইয়াশের পা দুটো থেকে জুতার জোড়া খুলতে খুলতে বললো-

“ তাই? আর কি বলেছে?”

“ আমায় খেলনা নিয়ে দিতে তায় না। বলেতে মাইল দিবে।”

কথাটা বলেই আবার আয়াশের পানে তাকিয়ে ভেংচি কাটলো ইয়াশ। ছেলের এমন ভয়াবহ অপবাদে আয়াশ যেনো মুহূর্তেই আকাশ থেকে পড়লো। বিস্ময় আর প্রতিবাদের মিশ্র স্বরে বলে উঠলো-

“ কি মিথ্যুক পোটকু! আমি কখন মারতে চাইলাম হুম?”

“ মুকে বলোনি তো কি হয়েছে, চোক দিয়ে শাতিয়েছো তো।”

ছেলের যুক্তির সামনে আয়াশের বলার মতো আর কিছুই রইলো না। কপালে হাত চাপড়াতে চাপড়াতে অসহায় কণ্ঠে বলে উঠলো-

“ একে কোলেপিঠে বড়ো করলাম? কত্ত বড়ো বেঈমান পোটকুরে।”

ইয়াশ এবার ছলছল করা আঁখি দুটো মায়ের মুখপানে মেলে ধরলো। অভিমান যেনো মুহূর্তেই তার ছোট্ট মুখটা জুড়ে বসেছে। কাঁদো কাঁদো স্বরে বললো-

“ দেকেতো কিভাবে বতে!”

ইনায়া আর হাসি সামলে রাখতে পারলো না। ছেলের গালে টুপটাপ চুমু এঁকে দিয়ে আদুরে স্বরে বললো-

“ হুম দেখেছি বাবাকে বকে দিবো। আমার কুচুপুচুকে বকা দেওয়া তাই না!”

মায়ের আশ্বাসে ইয়াশ যেনো আবারও সাহস ফিরে পেলো। সঙ্গে সঙ্গেই বাবার বিরুদ্ধে নতুন অভিযোগ হাজির করে বললো-

“ বাবা বলে বাবা নাকি তোমাল কুতুপুতু।”

ইনায়া এবার ধীরে ধীরে আয়াশের পানে তাকালো। আয়াশও স্ত্রীর দৃষ্টি টের পেয়েই নির্বিকার ভঙ্গিতে মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিলো। দৃশ্যটা দেখে ইনায়ার ঠোঁটে আবারও হাসি ফুটে উঠলো। ইনায়া ইয়াশের চুলগুলো হালকা এলোমেলো করে দিতে দিতে মমতাভরা কণ্ঠে বললো-

“ মায়ের কুচুপুচু একটাই, আর সেটা হলো ইয়াশ।”

মায়ের মুখে নিজের নাম শুনে ইয়াশের ভাব যেনো এক লহমায় বেড়ে গেলো। বিজয়ীর মতো আয়াশের দিকে তাকিয়ে গাঁ জ্বালানো একখানা হাসি দিয়ে বললো-

“ দেকেতো কে মায়েল কুতুপুতু হুহ্!”

আয়াশ ছেলের এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ বিজয়োল্লাস বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারলো না। ইয়াশের পানে তাকিয়ে গম্ভীর হওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে বললো-

“ ওটা এমনি বলেছে, আসলে আমি তোমার মায়ের কুচুপুচু। তোমাকে তো মিথ্যে মিথ্যে বলেছে।”

কথাটা শুনতেই ইয়াশের মুখের বিজয়ী হাসিটা মুহূর্তেই মলিন হয়ে গেলো। যেনো তার এতক্ষণকার অর্জিত সাম্রাজ্যটাই কেউ কেড়ে নিয়েছে। অশ্রুসজল দৃষ্টিতে মায়ের পানে তাকালো সে। বাপ-বেটার এই ক্ষুদ্র অথচ মহাগুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ আর দীর্ঘায়িত হতে দেওয়ার ইচ্ছে হলো না ইনায়ার। তাই দুজনের ঝগড়ার মাঝখানে শান্তির দূত হয়ে বলে উঠলো-

“ আপনি থামুন তো, মায়ের কুচুপুচু শুধু ইয়াশ৷ হয়েছে এবার? চলো হাত ধুবে, হাতে ময়লা লেগেছে।”

বলেই ইনায়া ছেলেকে কোলে তুলে নিয়ে উঠে গেলো। যাওয়ার সময় মায়ের কোল থেকেই ইয়াশ আবারও আয়াশের পানে তাকিয়ে মুখ ভেংচি কাটলো। তার ছোট্ট মুখের সেই অভিব্যক্তি স্পষ্ট জানিয়ে দিলো, এই যুদ্ধে জয়ী হয়েছে সে।আয়াশও ছেলের সেই বিজয়ী চাহনি এড়িয়ে গেলো না। সঙ্গে সঙ্গেই ইয়াশের উদ্দেশ্যে বলে উঠলো-

“ পোটকুরে খালি আমার কাছে এসে দেখো৷ নিবো নি তোমায় খুব বেশি করে।”

ইয়াশ অবশ্য বাবার সেই হুমকিতে বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। বরং মায়ের কোলের নিরাপদ আশ্রয়ে বসে নিজের বিজয় উপভোগ করতে লাগলো। তার জানা আছে, বাবা-মায়ের মন জয় করার কৌশল তার ছোট্ট বয়সেই বেশ ভালোভাবে রপ্ত হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ পর বাবার কাছে গিয়ে গালে একখানা চুমু দিলেই আয়াশের সমস্ত রাগ কোথায় যেনো মিলিয়ে যাবে। তারপর সেই কঠিন মুখটাই নরম হয়ে আসবে, অভিমানের বদলে ফুটে উঠবে মায়া, আর বাবার বুকের উষ্ণ আশ্রয়ে আবারও জায়গা করে নেবে তার আদরের পোটকু।

—-

গোধূলি লগ্ন

চারিদিকের নীলিমাজুড়ে তখন গোধূলি লগ্নের রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়েছে। অস্তগামী সূর্যের শেষ রক্তিম আঁচড়ে সেজে উঠেছে বিস্তৃত আকাশটা। দলবদ্ধ পক্ষীরাজরা আপন নীড়ের পানে ফিরছে, ডানার ছন্দে জানান দিচ্ছে ব্যস্ত এক দিনের অবসানের। চারপাশের উৎসবমুখর পরিবেশটা ক্রমশ জমে উঠেছে। আজ ইনায়ার তত্বীয় শোরুমের শুভ উদ্বোধন। দুপুরেই মিলাত পরানো হয়েছে, আর এখন শোরুমজুড়ে জমজমাট মানুষের আনাগোনা।
গাঢ় খয়েরী রঙের একখানা শাড়ি পরেছে ইনায়া। মাথার উপর পরিপাটি করে বাঁধা হিজাব। সাজসজ্জার বাহুল্য বলতে তেমন কিছুই নেই, নেত্রজোড়ায় গাঢ় করে টেনে দেওয়া কাজলের আঁচড়। অথচ এতটুকুতেই তার মুখশ্রী যেন চারপাশের ঝলমলে আলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিজস্ব এক দীপ্তিতে জ্বলজ্বল করছে। বারবার নিজের কষ্টে দাঁড় করানো সেই কষ্টসাধ্য অর্জনগুলোর দিকে তাকাচ্ছে ইনায়া। চোখের সম্মুখে ভেসে উঠছে কত নির্ঘুম রাত, কত অপ্রকাশিত কষ্ট, কত অসহায় মুহূর্ত। আর প্রতিবারই অন্তরের সমস্ত কৃতজ্ঞতা নিয়ে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছে। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রুকণাগুলো টলমল করছে। এতটা পথ পাড়ি দিয়ে এত বড় কিছু একদিন নিজের হাতে দাঁড় করাতে পারবে, এমনটা সে নিজেও কখনো কল্পনা করেনি।গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ার আগেই অদৃশ্য কোনো মায়াময় স্পর্শ এসে সেই অশ্রুকে থামিয়ে দিলো। ইনায়া পাশ ফিরে তাকাতেই চোখে পড়লো আয়াশকে।

“ কাঁদতে নেই, এইসব আপনার সফলতা আপনার অর্জন। তাই এই শুভ দিনে অশ্রু ঝড়াতে নেই।”

ইনায়া টলমলে দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো আয়াশের পানে। মানুষটার চোখে আজ অদ্ভুত এক প্রশান্তি। যেন ইনায়ার এই অর্জনের প্রতিটা কণায় তার নিজেরও কোনো এক অদৃশ্য অংশ জড়িয়ে আছে। ইয়াশ অন্যদিকে আয়শা বেগম আর জুয়েল সাহেবের সঙ্গে রয়েছে।

“ কিছু অশ্রু সুখেরও হয়।”

“ হোক,তবুও সে অশ্রুই রবে।”

“ কাঁদা কি বারণ?”

“ উহুম্, বারণ নয় নিষিদ্ধ।”

“ এটা কেমন কথা?”

“ আমার কথা। আপনায় অশ্রুসজল নয়নে মানায় না। আপনায় মানায় পরিপূর্ণ সুখের নয়নে।”

“ তাই নাকি? যদি জীবনটা দুঃখের হয়, তখন সুখের নয়ন কিভাবে পাবেন?”

“ দুঃখের পরই সুখ আসে। আপনার দুঃখের দিনের অবসান হয়েছে। আপনি শুধু হাসবেন, শুধুই হাসবেন। আপনার হাসিতেই আমার পরিপূর্ণতা লুকিয়ে আছে।”

ইনায়ার অধরকোণে অতি ক্ষীণ এক হাসির রেখা ফুটে উঠলো। সেই হাসিটুকুতেই যেন মানুষটার সমস্ত কথার উত্তর লুকিয়ে রইলো। আশপাশের ব্যস্ততায় নিমগ্ন মানুষগুলোর কেউ কেউ মাঝেমধ্যে কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকাচ্ছে। অথচ সেই দৃষ্টির কোনো তোয়াক্কা নেই তাদের। হঠাৎ করেই আয়াশ হাঁটু গেড়ে ইনায়ার সম্মুখে বসে পড়লো। আকস্মিক এমন ঘটনায় ইনায়া বিস্মিত হয়ে দুই কদম পিছিয়ে গেলো। মুহূর্তের মাঝেই আশপাশের মানুষের দৃষ্টি এসে আটকে গেলো তাদের দুজনের উপর। উৎসুকতা যেন মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়লো চারপাশে। কে কী হচ্ছে দেখার জন্য নীরবে অপেক্ষা করতে লাগলো।

“ কি করছেন? উঠুন!”

ইনায়া হালকা স্বরে শুধালো। কণ্ঠে স্পষ্ট অপ্রস্তুততা। একবার আশপাশে তাকাতেই দেখতে পেলো, ইতোমধ্যে চারপাশে ফিসফাস শুরু হয়ে গেছে।কিন্তু আয়াশের তাতে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই।সে নির্বিকার ভঙ্গিতে হাত বাড়িয়ে ইনায়ার এলোমেলো হয়ে যাওয়া শাড়ির কুঁচিগুলো একে একে গুছিয়ে দিতে লাগলো। শাড়ির প্রতিটা ভাঁজ যত্ন করে ঠিক করে দিচ্ছে মানুষটা। চারপাশের অসংখ্য কৌতূহলী দৃষ্টি, চাপা হাসি কিংবা ফিসফাস কোনোটাই তার মনোযোগে সামান্যতম ব্যাঘাত ঘটাতে পারলো না। যেন এই মুহূর্তে গোটা পৃথিবীতে তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ কেবল একজন মানুষই। দূরে বসে থাকা আয়শা বেগম দৃশ্যটা দেখে মৃদু হেসে স্বামীর পেটে হাতের কনুই দিয়ে গুঁতা মেরে বললেন-

“ দেখো দেখো তোমার ছেলের প্রেম। হাবাটার ঘটায় সুবুদ্ধি হলো বোধহয়৷ বাপের মতো না হলেই হলো আর।”

স্ত্রীর কথায় জুয়েল সাহেবের কপালে কয়েকটা ভাঁজ স্পষ্ট হয়ে উঠলো। ধীর দৃষ্টিতে স্ত্রীর পানে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বললেন-

“ কি বলতে চাইছো তুমি?”

আয়শা বেগমের চোখেমুখে পুরোনো দিনের অভিমান মেশানো এক চিলতে হাসি।

“ বোঝ নি কি বলেছি হুম? তোমাকে বিয়ে করে কি ভুল করেছি জানো? একদিনও ভালোবাসি বলেছো?”

জুয়েল সাহেব গম্ভীর স্বরে স্ত্রীর পানে চেয়ে চোখ ছোট ছোট করে বললেন-

“ চল্লিশ বছর সংসারে রোজ কাকে তাহলে গোলাপ এনে দিচ্ছি?”

আয়শা বেগম চোখ পাকালেন।

“ ওটাও তো আমি বলেছিলাম বলে এনে দিয়োছো।

“ তাহলে আমার কাছে আছো কেনো? যাও যেখানে ভালোবাসি শুনতে পাবে।”

স্বামীর অভিমানমাখা উচ্চারণে আয়শা বেগমের অধরজুড়ে কোমল হাসির রেখা ফুটে উঠলো। হালকা কাঁধ ভাঙিয়ে, যেনো বহুদিনের চেনা সেই অভিমানকে আদরে প্রশমিত করতে চাইলেন তিনি। মৃদু স্বরে বললেন,

“ হয়েছে বুড়ো বয়সে আর গিয়ে কি করবো বলো।”

কথোপকথনের মাঝেই ইয়াশ কৌতূহলী মুখে প্রশ্ন ছুড়ে দিলো,

“ দাদি বুলো কি?”

আয়শা বেগম নাতির পানে চেয়ে মুচকি হাসলেন। শিশুমনের সরল প্রশ্নে তাঁর চোখেমুখে যেনো স্নেহের আলো ছড়িয়ে পড়লো। মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,

“ বুড়ো মানে তোমার দাদু৷ দেখো না চুল সব পেকে গেছে।”

ইয়াশ নিষ্পাপ চোখে দাদুর দিকে তাকিয়ে ফের নিজের যুক্তি দাঁড় করালো,

“ তোমালও তো পেতে গেছে।”

নাতির সরল মন্তব্যে জুয়েল সাহেবের হাসি আর বাঁধ মানলো না। ইয়াশের মাথায় সস্নেহে হাত বুলাতে বুলাতে বললেন-

“ এই তো দাদুভাই দেখেছে কে কে বুড়ো।”

আয়শা বেগম সঙ্গে সঙ্গে চোখ পাকিয়ে স্বামীর পানে তাকালেন। অভিমানের ভান করে বললেন,

“ তুমি কি আমায় বুড়ি বললে?”

জুয়েল সাহেব নিরীহ মুখভঙ্গি করে প্রশ্ন করলেন-

“ কখন বললাম?”

আয়শা বেগম একটুও নরম হলেন না। সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন-

“ এখন।”

জুয়েল সাহেবের অধরে আবারও দুষ্টু হাসি ফুটে উঠলো।

“ বুড়িকে বুড়ি বলবো না?”

আয়শা বেগমের চোখেমুখে পুরোনো দিনের অভিমানের ছায়া নেমে এলো। স্মৃতির কোনো এক পুরোনো অলিন্দ থেকে টেনে আনলেন সেই ঘটনা।

“ ভুলে যেনো না এই বুড়ি জন্য হাত কে’টে বাথরুমে পরেছিলে।”

জুয়েল সাহেব কিছুক্ষণ স্ত্রীর পানে তাকিয়ে রইলেন। সেই দৃষ্টিতে ছিলো দীর্ঘ সংসারজীবনের অসংখ্য স্মৃতি, অভিমান, মায়া আর ভালোবাসার নিরব স্বীকারোক্তি। অতঃপর হালকা হেসে বললেন-

“ কি করার আছে বলো, আমার বুড়িকে যে ভালোবাসি তাই হাত কে’টেছিলাম।”

আয়শা বেগমের অধরজুড়ে প্রশান্ত হাসি ছড়িয়ে পড়লো। স্কুলজীবন থেকেই তাদের প্রেমের সূচনা। দীর্ঘ সময়ের পথ পেরিয়ে আজও সেই ভালোবাসার রেশটুকু মুছে যায়নি। এটাই ছিলো তাদের প্রথম প্রেম, আর শেষ প্রেমও। একদিন এই মানুষটাকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় জুয়েল সাহেব প্রায় উন্মাদের মতো হয়ে উঠেছিলেন। ভালোবাসার মানুষটার জন্য নিজের জীবন পর্যন্ত বাজি রাখতে দ্বিধা করেননি। বছরের পর বছর কেটে গেছে। চুলে রুপালি রঙের ছোঁয়া পড়েছে, জীবনের পথও দীর্ঘ হয়েছে, অথচ দুজনের মাঝে সেই পুরোনো টানটুকু আজও অমলিন।

অন্যদিকে আয়াশ শাড়িটা যথাযথভাবে গুছিয়ে নিয়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো। ইনায়া চারপাশে আরেকবার দৃষ্টি বুলিয়ে নিলো। এখনো যেনো সবার কৌতূহলী দৃষ্টি তাদের দিকেই নিবদ্ধ। আয়াশ পকেট থেকে নওজের রুমালটা বের করলো। কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই ইনায়ার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো। ইনায়া কিছুই বুঝে উঠতে পারলো না। মানুষটা হঠাৎ এমন করছে কেনো, সেই প্রশ্নটা চোখেমুখে স্পষ্ট হয়ে উঠলো।

ইনায়া কিছু বলার আগেই আয়াশ অতি যত্নে তার চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রুর চিহ্নটুকু মুছে দিতে লাগলো। কণ্ঠে মিশে রইলো মায়ামাখা কোমলতা।

“ শো মেয়ে, কাঁদলে তোমায় বড্ড বাজে লাগে। কাঁদলে তোমার কাজল লেপ্টে গিয়ে ওই নয়নের সৌন্দর্য নষ্ট করে। তাই কাঁদতে নেই মেয়ে।”

ইনায়া নিষ্পলক তাকিয়ে রইলো মানুষটার পানে।

কথাগুলোর সরলতার আড়ালে যে অগাধ মায়া লুকিয়ে আছে, তা অনুভব করতে তার এক মুহূর্তও সময় লাগলো না। অথচ চারপাশের মানুষের উপস্থিতি আর নিজের অকারণ লজ্জা তাকে স্থির থাকতে দিলো না। গালজোড়া লজ্জার আভায় রাঙিয়ে দ্রুত সেখান থেকে সরে গেলো ইনায়া। প্রায় ছুটেই অন্যদিকে চলে গেলো সে। আয়াশ তার এমন পালিয়ে যাওয়া দেখে মৃদু হেসে ফেললো। কতদিনের চেনা এই লজ্জা। অথচ আজও যেনো প্রতিবার নতুন করে ভালো লাগে।

***

নিস্তব্ধতায় ঘেরা রাস্তা-ঘাট। ছোট ছোট যানবাহনের কোলাহলও অনেকটা বিলুপ্ত হয়েছে। শহরের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে রাতের গাঢ় স্তব্ধতায় নিজেকে সমর্পণ করেছে।নিরিবিলি হাইওয়ের বুক চিরে ছুটে চললো গাড়িটা। বাইরের শীতল সিরসিরে বাতাসে ইনায়া জানালার পাশে রাখা হাতটা বাইরে মেলে রেখেছে। ঢাকার রাতের সৌন্দর্য যেনো দিনের চেনা শহরটার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ব্যস্ততার আড়ালে লুকিয়ে থাকা শহরটা রাতের নির্জনতায় অন্য এক রূপ ধারণ করে।

জটহীন রাস্তায় কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য ছাড়াই গাড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর মাঝে যে অদ্ভুত প্রশান্তি আছে, তা অনুভব করছিল দুজনেই। ইয়াশ বাকিদের সঙ্গে বাড়িতে চলে গেছে। আয়শা বেগম আর জুয়েল সাহেবের সঙ্গে থাকলে সে তুলনামূলকভাবে কম কাঁদে। তাছাড়া এখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, অচিরেই তার ঘুম ভাঙার সম্ভাবনাও নেই। আর সেই সুযোগেই আয়াশ ইনায়াকে নিয়ে বেরিয়ে এসেছে।হঠাৎই নির্জন এক জায়গায় গাড়িটা থেমে গেলো।

দুজন নেমে এলো। চারপাশে রাতের নিস্তব্ধতা। দূরে দূরে মাঝেমধ্যে কয়েকটা মালবাহী ট্রাক হাইওয়ের বুক কাঁপিয়ে চলে যাচ্ছে। তারপর আবার সবকিছু ডুবে যাচ্ছে সেই চেনা নীরবতায়। কিছুক্ষণ দুজনেই নিশ্চুপ রইলো।নীরবতার ভেতরেও যেনো কত কথা জমে ছিলো।অবশেষে আয়াশ সেই স্তব্ধতার পর্দা সরিয়ে প্রশ্ন করলো-

“ কি ভাবছেন?”

ইনায়ার দৃষ্টি তখনও দূরের অন্ধকারে নিবদ্ধ।

“ ভাবছি জীবনটা কিভাবে পেরিয়ে যাচ্ছে।”

আয়াশ ধীর পায়ে তার পাশে এসে হাঁটতে হাঁটতে বললো,

“ জীবন চললাম, কারণ সময় থেমে থাকে না।”

ইনায়ার চোখেমুখে ক্ষীণ এক বিষণ্ন হাসি ফুটে উঠলো।

“ ধন্যবাদ এই অব্দি পাশে থাকার জন্য।”

আয়াশের কণ্ঠে সঙ্গে সঙ্গে মিশে গেলো একরাশ আপনত্ব,

“ ধন্যবাদ চাই না তো।”

ইনায়া এবার তার দিকে তাকালো।

“ তবে কি চান?”

এক মুহূর্তের জন্য আয়াশের দৃষ্টি স্থির হয়ে রইলো ইনায়ার মুখে। তারপর বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে বললো,

“ আপনাকে।”

ইনায়ার অধরে হাসি ফুটে উঠলো।

“ আমি কি এখন অন্যকারো?”

আয়াশের কণ্ঠে চাপা অভিমান,

“ আমার হয়েও আমার তো নন।”

ইনায়ার চোখে এবার পুরোনো কিছু প্রশ্নের ছায়া নেমে এলো।

“ আপনিই কারণটা তৈরি করেছেন।”

আয়াশ মৃদু নিঃশ্বাস ফেললো। অতীতের ভুলগুলোর ভার যেনো এখনো তার কণ্ঠে লেগে আছে।

“ তাই তো কারণটাই সরিয়ে দিয়েছি। তবে কি এক প্রেমিক থেকে স্বামী হতে পারি ইউর হাইনেস?”

ইনায়া কোনো উত্তর দিলো না। শুধু ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করলো। এক পা, তারপর আরেক পা।আয়াশও পকেটে হাত ঢুকিয়ে তার পদক্ষেপ অনুসরণ করতে লাগলো। দুজনের মাঝখানে দূরত্ব ছিলো সামান্য, অথচ সেই সামান্য দূরত্বের মধ্যেই যেনো লুকিয়ে ছিলো অসংখ্য না-বলা কথা।

ইনায়া একবার মৃদু হেসে বললো,

“ প্রেমিকা থেকে স্ত্রীর যাত্রা শুরু করা যাবে ইউর মেজেস্টি?”

মুহুর্তের মাঝেই আয়াশের কণ্ঠে ভেসে এলো কাঙ্ক্ষিত উত্তর,

“ অফকোস ইউর হাইনেস।”

রাতের নিস্তব্ধ শহরটা সাক্ষী হয়ে রইলো দুটো মানুষের নতুন করে একসঙ্গে পথচলা শুরুর।

~সমাপ্ত~