#গোধূলি_লগ্নে_তুমি
#কলমে_ফাহিমা_ইসলাম
#পর্ব_২৩
[ অনুমতি ব্যতীত কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ 🚫]
সময় থেমে থাকে না। মানুষের জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘশ্বাসময় দিনগুলোরও একসময় অবসান ঘটে, সবচেয়ে গভীর ক্ষতগুলোও সময়ের পরিক্রমায় নতুন চামড়ায় ঢাকা পড়ে। তারপর একদিন অজান্তেই মানুষ আবিষ্কার করে, যে জীবনটাকে সে একসময় শুধুই ক্লান্তি আর অপূর্ণতার সমষ্টি বলে ভেবেছিল, সেই জীবনেই ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছে নতুন কিছু অনুভূতি। দেখতে দেখতে বেশ কয়েকটা মাস পেরিয়ে গিয়েছে। ঋতু বদলিয়েছে, দিনের আলো বদলিয়েছে। ঘরের জানালা দিয়ে প্রবেশ করা রোদের তীব্রতা বদলিয়েছে। বদলেছে ছোট্ট ইয়াশও। এখন সে দশ মাসের এক দুরন্ত ক্ষুদে মানব। যে একসময় সারাদিন শুধু মায়ের বুকের উষ্ণতায় গুটিশুটি হয়ে শুয়ে থাকতো, এখন সে গোটা ঘরময় নিজের আধিপত্য বিস্তার করে বেড়ায়। বিছানার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে হামাগুড়ি দিয়ে চলে যায় নিমিষেই। কোথাও একটু ফাঁকা জায়গা পেলেই তার ক্ষুদ্র দুটো হাত আর হাঁটুর উপর ভর দিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা শুরু হয়ে যায়।
তবে তার সবচেয়ে প্রিয় কাজ সম্ভবত হামাগুড়ি দিয়ে কারো পিছু নেওয়া। বিশেষ করে আয়াশের। মানুষটা ঘরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে হেঁটে গেলেই ক্ষুদ্র ইয়াশের চোখদুটো চকচক করে ওঠে। অতঃপর নিজের অজানা ভাষায় কিছু একটা বলে হাতদুটো মেঝেতে ঠুকে দিয়ে তার পিছু নেয়। কখনো মাঝপথে কোনো খেলনা পড়ে থাকলে সেটার প্রতি সাময়িক আকর্ষণ জন্মায়, আবার কিছুক্ষণ পর বাবাকে চোখের আড়াল হতে দেখলেই সমস্ত খেলনা ভুলে পুনরায় তার সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে। এখন সে নিজে নিজেই বসে থাকতে পারে। দুহাতে কোনো খেলনা নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ মনোযোগ দিয়ে সেটাকে নাড়াচাড়া করে। রঙিন জিনিস দেখলে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে। আয়নার সামনে বসিয়ে দিলে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে বিস্মিত হয়ে যায়। কখনো নিজের প্রতিবিম্বের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়, কখনো অকারণেই মৃদু হাসিতে ভরে ওঠে ক্ষুদ্র মুখখানা।তার মুখে এখনো অস্পষ্ট সব শব্দের আনাগোনা।
‘বা বা’।
‘মা মা’।
‘আআ’।
কখনো কখনো কোনো অর্থহীন শব্দ উচ্চারণ করেই সে নিজেই এতটা আনন্দিত হয়ে ওঠে যে, ক্ষুদ্র দেহটা দুলিয়ে দুলিয়ে হাসতে থাকে। ইনায়া তখন দূর থেকে তাকিয়ে থাকে ছেলের পানে। মনে হয়, এই সামান্য শব্দগুলোর মাঝেই বুঝি পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর কোনো ভাষা লুকিয়ে আছে।ইয়াশ এখন মানুষের মুখের অভিব্যক্তিও অনুকরণ করার চেষ্টা করে। কেউ হাসলে সেও হাসে। কেউ মুখ বাঁকালে সেও অদ্ভুতভাবে ঠোঁট বাঁকিয়ে তাকিয়ে থাকে। আয়াশ ইচ্ছে করে মাঝে মাঝে তাকে দেখে বিভিন্ন রকম মুখভঙ্গি করে। আর তার প্রতিক্রিয়ায় ইয়াশের মুখে যে বিস্ময় আর আনন্দের সমারোহ দেখা যায়, তা দেখলে ইনায়ার হাসি আটকে রাখা দায় হয়ে পড়ে। তবে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ে ইনায়া তখন, যখন ছেলেটা কোনো কিছু আঁকড়ে ধরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। বিছানার কিনারা,সোফার হাতল অথবা আয়াশের হাঁটু।
যা কিছু হাতের নাগালে পায়, তাই আঁকড়ে ধরে নিজের ক্ষুদ্র দেহটাকে উপরের দিকে তোলার চেষ্টা করে। দুটো পা এখনো পুরোপুরি স্থির নয়। শরীরটা সামনের দিকে হেলে পড়ে, কখনো পেছনে দুলে ওঠে। তবুও হাল ছাড়ার কোনো লক্ষণ নেই তার মাঝে। বারবার পড়ে যায়। আবার উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। এই বয়সেই বুঝি মানুষের মাঝে অদ্ভুত এক জেদ জন্ম নেয়। ইয়াশের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নয়।
তবে ইনায়া এখন আর তাকে এক মুহূর্তের জন্যও একা ছেড়ে যায় না। ঘরের মেঝে যতটা সম্ভব খালি রাখে। ছোটখাটো জিনিসপত্র হাতের নাগালের বাইরে সরিয়ে রাখে। আর ছেলেটা যখন কোথাও দাঁড়ানোর চেষ্টা করে, তখন একটু দূরেই বসে থাকে। নিজের ভয়টাকে লুকিয়ে রেখে ইয়াশের প্রতি আস্থা রাখে। মাঝেমধ্যে ছেলেটা তার দিকে তাকিয়ে দুহাত উপরে তোলে। সেই ইঙ্গিতের অর্থ বুঝতে এখন আর কোনো ভাষার প্রয়োজন হয় না। কোলে উঠতে চায় সে। ইনায়া তখন সমস্ত কাজ ফেলে ছেলেকে তুলে নেয় বুকে। আর ইয়াশ? বুকে উঠেই ক্ষুদ্র হাতদুটো দিয়ে মায়ের গাল আঁকড়ে ধরে। কখনো চুল টানে,কখনো ইনায়ার মুখের উপর নিজের হাত রাখে। আবার কখনো হঠাৎ করেই মায়ের গালে ভেজা একরাশ লালা মাখিয়ে দিয়ে এমনভাবে হাসে, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কোনো দুষ্টুমি করে ফেলেছে সে।
এই কয়েকটা মাসে ইনায়ার জীবনটাও অনেকখানি বদলে যায়। শুধু একজন মা হিসেবে নয়, নিজের পরিচয়েও ধীরে ধীরে নতুন এক জায়গা তৈরি করতে শুরু করেছে সে।
তার অনলাইন ব্যবসাটা এখন আর শুধুই অবসর সময়ে করা ছোটখাটো কোনো কাজ নয়। ধীরে ধীরে সেটাই হয়ে উঠছে তার নিজের স্বপ্নের একটা অংশ। প্রথমদিকে হাতে গোনা কয়েকজন ক্রেতা ছিল। পরিচিত মানুষের অর্ডার, মাঝে মাঝে নতুন কারো আগ্রহ, তারপর অপেক্ষা। অপেক্ষার দিনগুলো দীর্ঘ ছিল। তবে ইনায়া থেমে থাকেনি।
প্রতিটি অর্ডারের ছবি সে যত্ন করে প্রস্তুত করে। পণ্যের বিবরণ নিজে হাতে লিখে। ক্রেতাদের প্রশ্নের উত্তর দেয় ধৈর্য নিয়ে। প্যাকেজিংয়ের ক্ষেত্রেও সে কোনো রকম অবহেলা করে না। তার বিশ্বাস, মানুষ শুধু কোনো পণ্য কেনে না, যত্নও অনুভব করে। আর সেই যত্নটাই ধীরে ধীরে ফিরতে শুরু করেছে তার কাছে। একজন ক্রেতা সন্তুষ্ট হয়ে আরেকজনকে জানায়। একটা অর্ডারের পর আসে আরেকটা অর্ডার। ছোট ছোট কিছু প্রশংসা এসে জমা হয় তার ব্যবসার পাতায়। কেউ বলে, পণ্যটা ছবির থেকেও সুন্দর। কেউ বলে, এত সুন্দরভাবে প্যাকেট করা থাকবে ভাবেনি। আবার কেউ দ্বিতীয়বার অর্ডার দিয়ে শুধু বলে, আগের অভিজ্ঞতা ভালো ছিল বলেই আবার এসেছে।
এই ছোট ছোট কথাগুলো ইনায়ার কাছে কেবল প্রশংসা নয়। এগুলো তার পথচলার প্রমাণ।সে পারছে। ধীরে ধীরে হলেও পারছে। সামনের মাসে সামনে মলে একটা দোকান নিয়েছে, এখন চাইলেই যেকেউ তার পণ্য সরাসরি এসে ক্রয় করতে পারবে। এতে করে ক্রেতাদের মনে বিশ্বাসের জায়গা বাড়বে। এইসব দেখে প্রতিনিয়তই হেসে ওঠে সে,অজান্তেই হাসে। এই হাসিটা অন্যরকম। এই হাসির সঙ্গে কোনো দুঃখের বোঝাপড়া নেই। কোনো অপেক্ষার ক্লান্তি নেই।
আছে নিজের চেষ্টায় কিছু একটা অর্জন করার প্রশান্তি।
আর দূরে থেকেও সেই হাসির কারণগুলোর প্রতি নীরব যত্ন রেখে চলেছে আয়াশ।
মানুষটা এখন আর শুধু কথা দিয়ে ইনায়ার পাশে থাকার চেষ্টা করে না। তার উপস্থিতি যেন ধীরে ধীরে ইনায়ার প্রতিদিনের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে। কখনো সকালে ঘুম থেকে উঠে ফোনে জানতে চায়, নাশতা করেছে কি না। কখনো দুপুর গড়িয়ে গেলে একটাই বার্তা পাঠায়, সময়মতো খেতে ভুলে যাচ্ছে না তো?ইনায়া প্রথমদিকে এসব কথার খুব বেশি উত্তর দিত না। এখনো সবসময় দেয় না। তবে প্রতিবার বার্তা আসলে তার ঠোঁটের কোণে যে ক্ষীণ হাসির রেখা ফুটে ওঠে, সেটা সে নিজেও হয়তো সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করতে পারবে না। ব্যবসার কাজে ইনায়া যখন রাত পর্যন্ত ব্যস্ত থাকে, আয়াশ তখন তাকে বিরক্ত করে না। বরং নিজের মতো করে সাহায্য করে। কোনোদিন নতুন পণ্যের ছবি তোলার জন্য ভালো জায়গার কথা বলে। কোনোদিন প্যাকেজিংয়ের কিছু জিনিস দরকার হলে এনে দেয়। প্রতিদিন রোজ নিয়ম করে তার বাসায় গোলাপ আর সাদা লিলি আসবেই আসবেই। তার প্রিয় বেলিফুলের মালা সর্বদাই থাকবে। কিভাবে তার রাখলে সে খুশি হবে, তার ভালো লাগবে সেটাই করে আয়াশ। আবার কোনোদিন ইনায়া হিসাব করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে শুধু বলে-
“ আজকে এতটুকুই থাক, বাকিটা কাল করবেন।”
তার যত্নের ধরনটা এখন আর ইনায়ার কাছে ভারী মনে হয় না। বরং অদ্ভুতভাবে স্বাভাবিক লাগে। যেন এমনটাই হওয়ার কথা ছিল। যেন কোনো মানুষের জীবনে তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরেকজন মানুষের অস্তিত্ব এতটাই স্বাভাবিক হতে পারে যে, একসময় তার অনুপস্থিতির কথা চিন্তা করাই কঠিন হয়ে ওঠে। আয়াশ এখন ইনায়ার জীবনের ছোট ছোট বিষয়ও মনে রাখে। সে কখন কফি খেতে পছন্দ করে। কাজের মাঝে কখন মাথাব্যথা শুরু হয়।
অনেকক্ষণ না খেয়ে থাকলে কীভাবে মুখটা কেমন মলিন হয়ে যায়।রাতে বেশি সময় ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখদুটো কীভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এই সমস্ত সাধারণ বিষয়গুলোর মাঝেই যেন মানুষটা নিজের সমস্ত মনোযোগ রেখে দিয়েছে।আর এই মনোযোগের কেন্দ্র শুধুই ইনায়া।
কোনো তুলনা নেই সেখানে। কোনো বিভ্রান্তি নেই। কোনো অর্ধেক অনুভূতি নেই। আয়াশের ভালোবাসা এখন যেন কোনো বড় বড় প্রতিশ্রুতির অপেক্ষায় নেই। সে প্রতিদিনের ছোট ছোট কাজের মাঝেই নিজের অনুভূতিগুলো রেখে দেয়। একটা সময়মতো খাওয়ার তাগাদা। একটা ব্যস্ত দিনের শেষে বিশ্রাম নেওয়ার কথা। কাজের চাপে ক্লান্ত হয়ে পড়লে এক কাপ কফি এগিয়ে দেওয়া।নতুন কোনো অর্ডার এলে ইনায়ার চেয়েও বেশি খুশি হয়ে ওঠা।আর কখনো কখনো কোনো কারণ ছাড়াই বলে ফেলা-
“ আজকে নিজেকে খুব বেশি ক্লান্ত করবেন না।”
ইনায়া তখন উত্তর দেয় না। শুধু তাকিয়ে থাকে। তার মনে হয়, ভালোবাসা বুঝি সত্যিই সবসময় খুব বড় কোনো ঘটনা নয়।কখনো কখনো ভালোবাসা মানে, কেউ একজন দূরে থেকেও খেয়াল রাখছে তোমার দুপুরের খাবারের।তোমার ঘুমের। তোমার ক্লান্তির। তোমার স্বপ্নের। রাত্রি যত গভীর হয়, ইনায়া ততক্ষণে কাজ গুছিয়ে ইয়াশের পাশে এসে বসে। দশ মাসের দুরন্ত ছেলেটা তখন দিনের সমস্ত দুষ্টুমি ভুলে গভীর ঘুমে মগ্ন। ক্ষুদ্র একটা হাত ছড়িয়ে আছে বিছানার উপর। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কপালের উপর এসে পড়েছে। ইনায়া মৃদু হাতে ছেলের চুল সরিয়ে দেয়।ঠিক তখনই ফোনের পর্দায় আয়াশের বার্তা আসে।ইনায়া কিছুক্ষণ পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকে। অতঃপর খুব ধীরে উত্তর লিখতে শুরু করে। এই ধীরে ধীরে উত্তর দেওয়ার মাঝেও যেন অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে তারা। কোনো সম্পর্ক হঠাৎ করে পূর্ণতা পায় না। কিছু সম্পর্ককে প্রতিদিন একটু একটু করে গড়ে তুলতে হয়। একটু বিশ্বাস দিয়ে,একটু যত্ন দিয়ে,একটু অপেক্ষা দিয়ে আর অঢেল ভালোবাসা দিয়ে। ইনায়া এখনো জানে না ভবিষ্যতের পথ কতটা দীর্ঘ।
জানে না সামনে তাদের জন্য ঠিক কী অপেক্ষা করে আছে।তবে বর্তমানে দাঁড়িয়ে সে একটা বিষয় স্পষ্ট বুঝতে পারে।
তার জীবনে এখন এমন একজন মানুষ আছে, যে তাকে ভালোবাসতে কোনো অতীতের সঙ্গে লড়াই করে না। কোনো স্মৃতির সঙ্গে তার তুলনা করে না। কোনো শূন্যতার বিকল্প হিসেবে তাকে দেখে না। আয়াশের সমস্ত অনুভূতি এখন কেবল একজন মানুষকে ঘিরে।ইনায়াকে। আর সেই অনুভূতির মাঝেই ধীরে ধীরে নিজের জন্য নতুন এক পৃথিবী আবিষ্কার করছে ইনায়া।যেখানে সে শুধু কারো স্ত্রী নয়।
শুধু ইয়াশের মা নয়। সে নিজের স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলা একজন নারী। আর সেই পথের ঠিক পাশে, কখনো দূরে থেকেও অদৃশ্য ভরসার মতো, কখনো খুব কাছ থেকে নীরব ভালোবাসার মতো দাঁড়িয়ে আছে আয়াশ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে অনেক কিছু।ইয়াশ বড় হচ্ছে। ইনায়ার স্বপ্নগুলো ডানা মেলছে। আর তাদের মাঝখানে জন্ম নেওয়া অদ্ভুত সমীকরণটা?সেটাও ধীরে ধীরে নিজের জন্য একটা নীড় গড়ে নিচ্ছে। কোনো তাড়াহুড়ো নেই সেখানে। কোনো জোর নেই।শুধু আছে দুজন মানুষের নীরব সম্মতিতে একে অপরের জীবনে থেকে যাওয়ার এক অবাধ, প্রশান্ত ভালোবাসা।
**
সন্ধ্যার আবছা আলো ক্রমশ গাঢ় হয়ে ঘরের চারপাশে নেমে আসেছে। দিনের শেষ প্রহরের ব্যস্ততা পেরিয়ে ছোট্ট সংসারটায় এখন এক ধরনের প্রশান্ত নীরবতা বিরাজ করছে। তবে সেই নীরবতা বেশিক্ষণ স্থায়ী হওয়ার কোনো উপায় নেই। কারণ বিছানার উপর বসে থাকা ইয়াশ নিজের ক্ষুদ্র পৃথিবী নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। ছোট্ট দুটো হাতের মাঝে শক্ত করে ধরা রঙিন একটা খেলনা। গোলগাল মুখখানা গম্ভীর করে কখনো খেলনাটার দিকে তাকাচ্ছে, কখনো আবার সেটাকে মুখের কাছে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। ঠিক সেই মুহূর্তে সম্মুখ থেকে খেলনাটা নিজের হাতে তুলে নেয় আয়াশ।ইয়াশ কিছুক্ষণ পলকহীন তাকিয়ে থাকে। তারপর ভ্রুযুগল কুঁচকে আসে।
“আহ্!”
ক্ষুদ্র কণ্ঠের প্রতিবাদ শুনে আয়াশের অধরে হাসি ফুটে ওঠে। সে খেলনাটা নিজের পেছনে লুকিয়ে রেখে নিরীহ মুখে প্রশ্ন করে-
“কি হয়েছে চ্যাম্প?”
ইয়াশ বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে হাত বাড়ায়।
“দা…দা!”
স্পষ্ট কোনো শব্দ নয়। তবুও আয়াশের বুঝতে অসুবিধা হয় না। ছেলে নিজের খেলনাটা ফেরত চাইছে।
“কই? কি চান আপনি?”
ইয়াশ এবার আরও অস্থির হয়ে ওঠে। ছোট্ট শরীরটা সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে বাবার হাত ধরার চেষ্টা করে।
“দা! দা!”
আয়াশ এবার ইচ্ছা করেই খেলনাটা আরও দূরে সরিয়ে নেয়। ব্যস! ইয়াশের ছোট্ট, আদুরে মুখখানা মুহূর্তে গম্ভীর হয়ে যায়। সামান্য কিছুক্ষণ পূর্বে যে ছেলে নিজের জগতে মগ্ন ছিল, এখন তার সমস্ত মনোযোগ বাবার হাতে বন্দি থাকা খেলনাটার উপর। হামাগুড়ি দিয়ে আয়াশের দিকে এগিয়ে আসে সে। আয়াশ একটু পিছিয়ে যায়। ইয়াশ আবারও এগিয়ে আসে। আয়াশ আবারও পিছিয়ে যায়।
বাপ ছেলের এই অদ্ভুত খেলায় কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ইয়াশের মুখখানা আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। খেলনাটার কথা ভুলে গিয়ে বাবাকে ধরার নতুন খেলায় মেতে ওঠে সে।
আয়াশ বিছানার একপাশে গিয়ে বসতেই ইয়াশ দ্রুত হামাগুড়ি দিয়ে তার দিকে এগিয়ে আসে।
“আ…বা!”
শব্দটা শুনেই আয়াশ থমকে যায়। ছেলের দিকে বিস্মিত চোখে তাকিয়ে বলে-
“আমাকে ডাকছেন?”
ইয়াশ বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে আবারও অস্পষ্ট স্বরে বলে-
“বা…বা!”
আয়াশের মুখখানা মুহূর্তে কোমল হয়ে আসে। পৃথিবীর সমস্ত শব্দের মাঝে এই আধো আধো ডাকটুকুও যেন তার কাছে সবচেয়ে মধুর।
“আবার বলেন তো?”
ইয়াশ কি আর বাবার আবদার বোঝে? সে বরং বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে খিলখিল করে হেসে ওঠে।
আয়াশ এবার ছেলেকে ধরে নিজের কোলে তুলে নেয়। ইয়াশ আনন্দে দুটো হাত নাড়াতে থাকে। আয়াশ তাকে সামান্য উপরে তুলে আবার নিজের বুকের কাছে নামিয়ে আনে। ইয়াশের হাসি আরও বেড়ে যায়।
“এই যে, এত হাসেন কেনো?”
“হি…হি…”
অস্পষ্ট হাসির শব্দে ভরে ওঠে কক্ষ। আয়াশ এবার নিজের মুখখানা ইয়াশের গালের কাছে নিয়ে যায়।
“আমার গাল কে ধরেছিল একটু আগে?”
ইয়াশ সঙ্গে সঙ্গেই নিজের হাত তুলে বাবার গাল আঁকড়ে ধরে।আয়াশ মুখ ঘুরিয়ে নেয়। ইয়াশ আবার গাল ধরতে চায়। আয়াশ আবারও অন্যদিকে সরে যায়। এবার ইয়াশের হাসি যেন আর থামার নামই নেয় না।
“হি হি হি!”
ক্ষুদ্র শরীরটা হাসতে হাসতে বাবার বুকের উপর দুলতে থাকে। কখনো আয়াশের মুখ ধরার চেষ্টা করে, কখনো বাবার নাকের দিকে হাত বাড়াচ্ছে।অবশেষে ইয়াশের ক্ষুদ্র আঙুল এসে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আয়াশের নাক।আয়াশ সঙ্গে সঙ্গেই কপাল কুঁচকে বলে-
“আহা! আমার নাকটা নিয়ে গেল!”
ইয়াশ কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
তারপর আবারও হেসে ওঠে।
“বা…বা!”
“হ্যাঁ বাবা?”
“বা!”
“আমি বাবা?”
ইয়াশ আনন্দে হাততালি দেয়।একবার,দুইবার তারপর নিজের হাততালির শব্দ শুনেই যেন আরও খুশি হয়ে ওঠে।
আয়াশও ছেলের সঙ্গে হাততালি দিতে শুরু করে।
“বাহ! আমাদের বাপজান তো হাততালি দিতে পারে!”
বাবার প্রশংসা শুনে ইয়াশ আবারও হাততালি দেয়। যেন সে সত্যিই খুব বড় কোনো কাজ করে ফেলেছে। ঠিক সেই সময় রান্নাঘরের শেষ কাজটুকু সম্পন্ন করে কক্ষের দিকে এগিয়ে আসে ইনায়া। দরজার কাছে পৌঁছে কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো সে। তার সম্মুখে এখন এক ভীষণ পরিচিত অথচ প্রতিবারই নতুন মনে হওয়া দৃশ্য। বসে আছে আয়াশ।তার সামনে ইয়াশ। বাবার হাঁটুর উপর ভর দিয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে ক্ষুদ্র ছেলেটা। নিজের ভারসাম্য ঠিক রাখতে না পেরে বারবার সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। আর প্রতিবারই আয়াশ দুহাতে তাকে সযত্নে ধরে ফেলছে। ইয়াশের মুখে তখন বিজয়ের হাসি।
“দাঁ…দাঁ!”
নিজের অজানা ভাষায় কি যেন বলছে সে।আয়াশ মুগ্ধ দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকিয়ে বলে-
“দাঁড়াবেন? এত তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যাবে নাকি পোটকু?”
ইয়াশ বাবার কথার উত্তর দেয় না। বরং পুনরায় হাঁটুর উপর ভর দিয়ে শরীরটা সোজা করার চেষ্টা করে।ইনায়ার অধরে অজান্তেই হাসি ফুটে ওঠে। সে ধীর পায়ে এগিয়ে আসে।
মায়ের উপস্থিতি টের পেতেই ইয়াশের মুখখানা বদলে যায়। কিছুক্ষণ পূর্বে বাবার সঙ্গে খেলায় মগ্ন থাকা ছেলে মুহূর্তেই মায়ের দিকে তাকিয়ে দুটো হাত বাড়িয়ে দেয়।
“মা…মা!”
ইনায়া থমকে দাঁড়ায়।ক্ষুদ্র কণ্ঠের সেই ডাকটুকু শুনে তার সমস্ত মুখাবয়ব কোমল হয়ে আসে।
“আমার কাছে আসবে?”
ইয়াশ আরও জোরে হাত নাড়ায়।
“মামা!”
আয়াশ সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে ওঠে-
“এই যে! এতক্ষণ কার সঙ্গে খেললেন? এখন মা আসতেই আমাকে ভুলে গেলেন?”
ইয়াশ বাবার কথা শুনে আবার তার দিকে তাকায়। তারপর মায়ের দিকে।অবশেষে নিজের ক্ষুদ্র শরীরটা এমনভাবে ছটফট করতে থাকে যে, ইনায়া আর নিজেকে সামলাতে পারে না। এগিয়ে এসে ছেলেকে নিজের কোলে তুলে নেয়।
ইয়াশ মায়ের গলায় মুখ লুকিয়ে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে থাকে।
আয়াশ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকে।
“দেখেছেন? আমাকে একদম পাত্তাই দিলো না এই মীরজাফর।”
ইনায়া মৃদু হেসে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।
“আপনার ছেলে তো। আর আমার কুচুপুচুকে এইসব কি নামে ডাকেন হ্যাঁ?”
“আমার ছেলে হলে তো আমার কাছেই থাকতো। দেখছেন না মীরজাফরের মতো রং পাল্টে আপনার কাছে গেলো।
“তাহলে নিয়ে নিন।”
“না, এখন তো ও আপনাকে আঁকড়ে ধরেছে।”
ইয়াশ যেন বাবা মায়ের কথোপকথনের কিছুই বুঝল না। তবুও দুজনের কণ্ঠস্বর শুনে মুখ তুলে তাকাচ্ছে।একবার বাবার দিকে। একবার মায়ের দিকে। তারপর অকারণেই হেসে ওঠলো। আয়াশ বিছানার মাঝখানে একটু জায়গা করে বসে।
“আসুন।”
ইনায়া ইয়াশকে নিয়ে তার পাশে বসে পড়ে। অবশেষে তিনজন একই বিছানায় পাশাপাশি।মাঝখানে ইয়াশ। একপাশে আয়াশ অন্যপাশে ইনায়া। দশ মাসের ক্ষুদ্র প্রাণটা দুই পাশে দুজনকে একসঙ্গে পেয়ে ভীষণ উৎসাহী হয়ে ওঠে। কখনো বাবার জামা আঁকড়ে ধরে, আবার পরমুহূর্তেই মায়ের ওড়নার দিকে হাত বাড়াচ্ছে। ইনায়া মৃদু হেসে ঝুঁকে ছেলের গালে একটা চুমু দেয়। ইয়াশ খিলখিল করে হেসে ওঠে। মায়ের দিক থেকে সরে আসতেই অপর পাশ থেকে আয়াশ ঝুঁকে এসে ছেলের অন্য গালে আদর করে দেয়।
ইয়াশ আবারও হেসে ওঠে।
“হি হি হি!”
তারপর ইনায়া আবার আয়াশ একবার মা,একবার বাবা।
দুই পাশ থেকে আসা আদরে অবুঝ ইয়াশ যেন বুঝতেই পারছে না, সে কার দিকে আগে তাকাবে। আনন্দে তার ক্ষুদ্র শরীরটা এপাশ ওপাশ দুলতে থাকে। দুটো হাত উঁচু করে নাড়তে থাকে সে।
“হি হি! মা…মা!”
ইনায়া সঙ্গে সঙ্গেই ছেলের দিকে তাকায়।
“আমাকে ডাকছে দেখেছেন?”
আয়াশ কিছু বলার আগেই ইয়াশ বাবার দিকে ঘুরে তাকিয়ে অস্পষ্ট স্বরে বলে-
“বা…বা!”
আয়াশের মুখে বিজয়ীর হাসি ফুটে ওঠে।
“দেখলেন? এবার আমাকে ডাকছে।”
ইনায়া চোখ সরু করে তাকায়।
“ডাকলেই বেশি ভালোবাসে নাকি?”
“অবশ্যই।”
“কোথায় লেখা আছে?”
“আমার ছেলে নিজেই বলে দিয়েছে।”
“আপনার ছেলে কিছুই বলেনি।”
“বলেছে।”
“কি বলেছে?”
আয়াশ ইয়াশের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে প্রশ্ন করে-
“বলো তো বাবা, তুমি কাকে বেশি ভালোবাসো?”
প্রশ্নের অর্থ বোঝার বয়স এখনো হয়নি ইয়াশের।সে বরং বাবার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো। তারপর হঠাৎ করে ইনায়ার দিকে ঝুঁকে পড়ে। আয়াশ বিস্মিত মুখে তাকিয়ে থাকে।
“এই যে! আমাকে বাদ দিয়ে দিলেন?”
ইনায়া হেসে ওঠে।
“উত্তর পেয়ে গিয়েছেন।”
“না, এটা কোনো উত্তর না।”
আয়াশ এবার ইয়াশকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নেয়।
“মাই পোটকু বল তো কাকে বেশি ভালোবাসো। বাবা নাকি মা? বল বল মাই ব্যাডি।”
ইনায়াও এবার ইয়াশের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে-
“হেই আব্বু আগে মাকে বল তো কাকে ভালোবাসো। তোমার বাবা একটা বদ লোক বুঝলে। তাই মাকে বল।”
ইয়াশ বাবা-মা’র মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো।আয়াশ অপেক্ষা করছে।ইনায়াও অপেক্ষা করছে কয়েক মুহূর্ত নীরবতার পর ইয়াশ নিজের ক্ষুদ্র হাতটা তুলে আয়াশের গালে রাখে। আয়াশের মুখখানা আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
“এই দেখেছেন?”
কিন্তু তার আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না।কারণ পরমুহূর্তেই ইয়াশ অন্য হাতটা ইনায়ার গালে রেখে দেয়।দুজনেই থেমে যায়। ইয়াশের চোখদুটো একসঙ্গে দুজনের দিকে।অতঃপর নিজের অজানা ভাষায় অস্পষ্ট কিছু শব্দ করে সে।
“মা…বা…বা!”
ইনায়ার মুখে হাসি ফুটে ওঠে।আয়াশও ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর দুজন প্রায় একই মুহূর্তে ঝুঁকে এসে ইয়াশের দুই গালে চুমু দেয়। ইয়াশ এবার এতটাই খুশি হয়ে ওঠে যে, পুরো শরীরটা আনন্দে কেঁপে ওঠে।
“হি হি হি হি!”
তার খিলখিল হাসিতে মুহূর্তেই মুখর হয়ে ওঠে কক্ষ।
আয়াশ ছেলের পেটের কাছে আলতো করে হাত রাখতেই ইয়াশ আরও জোরে হেসে ওঠে। ইনায়া মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সেই হাসির পানে। কতটুকুই বা বয়স ইয়াশের?দশ মাসের ক্ষুদ্র একটা জীবন। এখনো পৃথিবীর কোনো জটিল হিসাব বোঝে না সে। জানে না ভালোবাসার সংজ্ঞা।জানে না কার প্রতি ভালোবাসা বেশি, আর কার প্রতি কম।তার ক্ষুদ্র পৃথিবীতে এখন শুধু দুটো পরিচিত মুখ। একটা মুখের কাছে সে নিরাপদ অনুভব করে।অন্য মুখটার কাছে সমস্ত ক্লান্তি ভুলে যায়। একজন তার বাবা,একজন তার মা আর তাদের দুজনের মাঝখানে বসে থাকা ইয়াশই যেন তাদের সমস্ত না পাওয়া, সমস্ত দুঃখ আর সমস্ত ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর পরিণতি। ইনায়া আবারও ছেলের গালে চুমু দেয়।
“আমার তোতাপাখি আমাকে ভালোবাসে।”
আয়াশ সঙ্গে সঙ্গেই ইয়াশের অন্য গালে চুমু দিয়ে বলে-
“আমাকেও ভালোবাসে।”
ইয়াশ আবারও হেসে ওঠে।তারপর নিজের ছোট্ট হাত দুটো দিয়ে দুজনের মুখ স্পর্শ করার চেষ্টা করে। আয়াশ আর ইনায়া এবার একে অপরের দিকে তাকায়। এখানে কোনো প্রতিযোগিতা নেই। নেই কে জিতলো, কে হারলো তার হিসাব।কারণ তারা দুজনেই জানে, এই ক্ষুদ্র প্রাণটার ভালোবাসায় দুজনের জন্যই সমান জায়গা রয়েছে।মাঝখানে বসে থাকা ইয়াশ আবারও হাততালি দিয়ে উঠলো। নিজের হাততালির শব্দ শুনে সে নিজেই খুশি হয়ে ওঠছে।
চলবে।

