#চিরদিনই_তুমি_যে_আমার
#নূরা_ফাতেহা
||০২||
পরদিন সকাল ছয়টা।
ঘরটা গাঢ় অন্ধকারে ডুবে আছে। জানালার ভারী কালো পর্দা ছাপিয়ে সকালের আলো ভেতরে ঢোকার কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছে না। ঠিক যেন একটা বন্ধ বাক্সের ভেতর জমে থাকা নিঝুম রাত।
বিছানার এক কোণে তারীন বাচ্চাদের মতো গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছে। কাল রাতের ঝড়-ঝঞ্ঝার পর তার শরীরটা এখন একদম নিস্তেজ, নিস্পন্দ। আযরাফ বিছানার ধারে বসে হাতটা বাড়িয়ে দিল তারীনের কপালের ওপর। একটা তপ্ত আঁচ এসে লাগলো হাতের তালুতে। হালকা জ্ব* র এসেছে। আযরাফ মনে মনে হিসাব মেলালো কালকের অপ্রত্যাশিত ট্র*মা আর মা*নসিক ধা*ক্কাটাই এই জ্বরের আসল উৎস।
মানুষের শরীর বড় অদ্ভুত জিনিস, মনের ক* ষ্ট সহ্য করতে না পারলে তা গায়ের উত্তাপ হয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে।
আযরাফ একটু ঝুঁকে তারীনের তপ্ত কপালে ঠোঁ*ট ছোঁয়ালো। পরম যত্নে লেপটে থাকা এলোমেলো চুলগুলো সরিয়ে কানের পেছনে গুঁজে দিল।
ঠিক তখনই ঘরের কাঠের দরজায় দুটো মৃদু শব্দ হলো ‘ঠক, ঠক’ করে।
আযরাফ বুঝতে পারল, তার বাবা আশরাফ চৌধুরী দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছেন। সে আর দেরি করল না। পাশে রাখা শার্টটা গায়ে চাপিয়ে নিল। যাওয়ার আগে তারীনের গায়ে চাদরটা ভালোভাবে টেনে দিল, যাতে কোনো দিক দিয়ে ঠান্ডা বাতাস ঢুকতে না পারে। তারীনের কোমল গালে হাত রেখে খুব নিচু স্বরে, বলে উঠল,
—”ঘুমাও, আমার শ্রাবণকন্যা।”
কথাটা শেষ করেই সে নিঃশব্দে দরজার দিকে হেঁটে গেল। আযরাফের নিজস্ব একটা সংসার আছে, তবে সেখানে মা নামের পরম মমতাটুকু অনেক আগেই হারিয়ে গেছে। এখন পরিবার বলতে তার বাবা আশরাফ চৌধুরী, ফুফু আর ফুফুর একমাত্র মেয়ে। বহু বছর আগে ফুফুর সংসার ভেঙে যাওয়ার পর থেকে তিনি মেয়েকে নিয়ে এই বাড়িতেই স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।
আযরাফ দরজা সামান্য ফাঁক করে বাইরে বের হলো।
করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা আশরাফ চৌধুরী ছেলেকে দেখে চশমাটা নাকের ওপর একটু ঠেলে দিয়ে বললেন,
—”বউমা ঘুমাচ্ছে?”
আযরাফ ধীরে মাথা নাড়িয়ে জবাব করল,
— “হ্যাঁ। শরীরটা ভালো নেই। জ্ব’র এসেছে।”
আশরাফ চৌধুরী মুখের ভাব মুহূর্তেই বদলে গেল,তিনি ভ্রু কুঁচকে বলে উঠলেন,
— “জ্ব’র?”
— “হুম।”
— “ডাক্তারকে খবর দিয়েছিস?”
— “এখনো না। ওকে ঘুমাতে দিয়েছি। ঘুম থেকে উঠলে দেখাব।”
—”আযরাফ, একটা কথা বলব?”
— “বলুন।”
— “মেয়েটা খুব ছোট।”
— “জানি।”
—”জানিস বলেই বলছি। ওকে সময় দে। হুট করে এত বড় একটা পরিবর্তন মেনে নেওয়া ওর পক্ষে সহজ হবে না।ভালোবাসা জোর করে পাওয়া যায় না, বাবা।”
আযরাফ ধীরে ধীরে বাবার হাতের দিকে তাকাল।
তারপর শান্ত কণ্ঠে বলল,
— “জানি। কিন্তু আমি ওকে হা*রাতে পারব না।”
আশরাফ চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ফেললে বলেন,
— “হারানোর ভয়টাই যেন তোকে এমন কিছু করতে বাধ্য না করে, যেটার জন্য একদিন নিজের কাছেই অপরাধী হয়ে যাবি।”
কথাটা বলে তিনি ধীরে ধীরে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন। আযরাফ দীর্ঘ বা*য়ু ত্যাগ করল উপর পানে তাকিয়ে।
ঘরে ফিরে এলো আযরাফ। তারীন তখনও ঘুমিয়ে আছে। কালো পর্দায় আড়ালে এক চিলতে আলো এসে ঘরের মেঝেতে দাগ টানল। আযরাফ ধীর পায়ে ব্যালকনিত চলে গেল।
কাঁচের দরজাটা নিঃশব্দে বন্ধ করে পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করল সে। লাইটারের ছোট্ট আ*গুনটুকু জ্ব*লে উঠতেই মুহূর্তের জন্য তার মুখটা আলোকিত হলো। তারপর সিগারেটটা ঠোঁ*টের ফাঁকে গুঁজে দীর্ঘ এক টান দিল।
ধোঁয়া বেরিয়ে এলো ধীরে ধীরে। ঠিক তার মনের ভেতর জমে থাকা অস্থিরতার মতো। কাল রাতে সে ভুল করেছে।
হ্যাঁ!আযরাফ চৌধুরী নিজের ভুলটা অস্বীকার করার মানুষ নয়।
রাগের মাথায় এমন কিছু করেছে, যা হয়তো তারীন কোনোদিনও ভুলতে পারবে না। কিন্তু তার নিজের কাছেও একটা প্রশ্ন আছে ‘সে কি করে সহ্য করত?’
যে মেয়েটাকে এক বছর ধরে নিঃশব্দে ভালোবেসেছে, যার হাসিকে দূর থেকে দেখেই নিজের বিষণ্ণ দিনগুলো পার করেছে, সেই মেয়েটাকেই যখন অন্য একজন পুরুষের পাশে দেখেছে তখন বুকের ভেতরটা যেন কেউ মুঠো করে চেপে ধরেছিল। ভালোবাসা মানুষকে কখনো কখনো বড় উদার করে। আবার কখনো করে তোলে ভীষণ স্বা*র্থপর।
আযরাফ দ্বিতীয় মানুষটাই। তার ভালোবাসায় ভাগ নেই। অর্ধেক নেই। সমঝোতা নেই। তারীনকে সে চায় সম্পূর্ণভাবে।
প্রয়োজনে পৃথিবীর সঙ্গে যু*দ্ধ করবে। নিজের সমস্ত স্বস্তি, শান্তি, এমনকি নিজের প্রিয় মানুষটির ভালোবাসাটুকুও বিসর্জন দেবে তবু তারীনের জীবনে অন্য কোনো পুরুষের উপস্থিতি মেনে নেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়।
মেয়েটা তাকে ঘৃ*ণা করুক। তার চোখে আযরাফ একজন নি*ষ্ঠুর মানুষ হয়ে থাকুক। তবুও সে মেনে নেবে। কিন্তু তারীন অন্য কারও হয়ে যাবে এই একটা সত্যির কাছে তার সমস্ত সহ্যশক্তি পরাজিত।
আযরাফ রেলিংয়ে দুই হাত রেখে দূরের আকাশের দিকে তাকাল। মানুষের জীবনে কত সম্পর্কই তো ভালোবাসাহীন হয়। কেউ কাউকে ভালোবাসে না, তবুও পাশাপাশি থেকে যায়। একই ছাদের নিচে সকাল হয়, রাত নামে। অভ্যাস একসময় ভালোবাসার জায়গা দখল করে নেয়। সংসার চলতে থাকে নিঃশব্দে, নিজের নিয়মে।
তাদের জীবনও হয়তো তেমনই হবে। তারীন তাকে ভালোবাসবে না।
হয়তো কোনোদিনই ভালোবাসবে না। কিন্তু একদিন হয়তো তারীন বুঝবে কেউ একজন তাকে পাওয়ার জন্য নিজের সমস্ত পৃথিবীটাকে তার পায়ের কাছে এনে রেখেছিল। আযরাফ সিগারেটের ছাই ঝেড়ে ফেলল। তার ঠোঁ*টের কোণে খুব ক্ষীণ একটা হাসি ফুটে উঠল।
তিন কবুলে মেয়েটা এখন তার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। এটাই তার কাছে অনেক। ভালোবাসা সে পায়নি, কিন্তু তার প্রিয় মানুষটা তার কাছেই আছে।
এইটুকু নিয়েই সে বাকি জীবন পার করে দিতে পারবে। আযরাফ ধীরে ধীরে ঘরের ভেতর তাকাল।
তারীন তখন এপাশ থেকে ওপাশে গেলো। আযরাফের চোখের দৃষ্টি নরম হয়ে এলো। খুব আস্তে, যেন ঘুমন্ত মেয়েটা শুনতে না পায়, সে ফিসফিস করে বলল উঠল,
— “তুই আমাকে ভালোবাসিস না, পাখি। জানি। তবুও তুই আমার জীবনের সবচেয়ে আপন মানুষ। হয়তো একদিন তুই আমাকে ভালোবাসবি। আর যদি না-ও বাসিস তবুও আমি তোকে ভালোবেসেই যাব।”
সিগারেটটা শেষবারের মতো ঠোঁটে নিয়ে টান দিল সে।
তারপর মাটিতে ফেলে পায়ের নিচে পি*ষে নিভিয়ে দিল। ধোঁয়াটা বাতাসে মিলিয়ে গেল।
———————–
বেলা দশটা বাজে।
ঘরজুড়ে এক ধরনের অলস নীরবতা। জানালার পর্দাটা অর্ধেক টানা, তাই ঘরের ভেতরটা আলো-আঁধারির এক অদ্ভুত ক্যানভাস হয়ে আছে।
তারীন চোখ মেলল। চোখের পাতা দুটি ভারী হয়ে আছে, যেন বহুযুগ পর ঘুম ভাঙল। শরীরটা একটুখানি নড়াতেই হাড়ের ভেতর থেকে একটা সূক্ষ্ম য*ন্ত্র*ণার ঢেউ উঠে এল। কালকের ঝড়টা কেবল মনকে নয়, তার শ*রী*রটাকেও নিং*ড়ে রেখে গেছে। বি*ষ*ণ্ণ একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল সে। দীর্ঘশ্বাসটা ঘরের নির্জন বাতাসে ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
পাশেই ওয়াশরুম থেকে ঝরনার পানির একটানা ‘ঝমঝম’ শব্দ আসছে। বোঝা গেল আযরাফ গোসল করছে।
তারীন শুয়ে থাকা অবস্থাতেই একটু চেষ্টা করল উঠে বসতে। কিন্তু শরীরটা তার সাথে ভারী বি*শ্বা*স*ঘা*ত*ক*তা করল। বুক চিরে একটা দুর্বলতার ধাক্কা আসতে সে আর উঠে বসতে পারল না, আবার অলসভাবে ধপ করে বালিশের ওপর ঢলে পড়ল। সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইল সে, চোখে তার অবাধ্য এক ফোঁটা অশ্রু।
ঠিক তখনই ওয়াশরুমের দরজাটা খট করে খুলে গেল।
বেরিয়ে এল আযরাফ। তার চুলগুলো ভেজা, সেখান থেকে টপটপ করে পানি ঝরছে। কোমরে স্রেফ একটা তোয়ালে জড়ানো, পুরো উ*দোম বুক। ফর্সা চওড়া বুকের ওপর এবং পিঠের দিকটায় লা*লচে ন*খের আঁ*চড়গুলো খুব স্পষ্ট হয়ে ফুটে আছে। একটা ঝোড়ো রাতের নীরব সাক্ষী যেন এই দা*গগুলো।
আযরাফ হাতে থাকা ছোট তোয়ালেটা দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে থামল। তারপর ধীরে ধীরে তাকাল বিছানার দিকে।
— “উঠে গেছো?”
আযরাফ ভেজা চুল মোছা থামিয়ে ধীরপায়ে বিছানার কাছে এগিয়ে এলো। তার কণ্ঠস্বর একদম শান্ত।
তারীন চোখ তুলে একবার তাকাল, তারপর খুব ছোট করে জবাব দিল,
— “হুম।”
আযরাফ হাত বাড়িয়ে তারীনের কপালে আবার স্প*র্শ করল। উত্তাপ আগের চেয়ে খানিকটা কমেছে, কিন্তু চেহারায় ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। সে শুধাল,
— “শ*রীর কেমন?”
তারীনের শুকনো ঠোঁ*ট দুটো কেঁপে উঠল। সত্যি বলতে, তার কণ্ঠ দিয়ে ঠিকমতো আওয়াজ বের হচ্ছিল না। বিষণ্ণ একজোড়া চোখে আযরাফের দিকে তাকিয়ে আকুতির সুর তুলে বলল,
— “পানি খাবো। একটু পানি খাওয়ান, গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। শরীরে ভীষণ ব্যথা তাই উঠতে পারছি না।”
কথাগুলো শেষ করতেই তার চোখের কোণ বেয়ে একবিন্দু তপ্ত জল গড়িয়ে পড়ে গালের ওপর আটকে রইল।
আযরাফ এক মুহূর্ত নিস্পন্দ হয়ে তাকিয়ে রইল তারীনের নিষ্পাপ, অসহায় মুখের দিকে। তারপর টেবিল থেকে পানির জগ আর গ্লাসটা তুলে নিল। গ্লাসে পানি ঢেলে, তারীনের মাথার নিচে এক হাত আলতো করে দিয়ে তাকে সামান্য তুলে ধরল। অন্য হাতে পানির গ্লাসটা তারীনের শুকনো ঠোঁ*টের কোণে স্পর্শ করিয়ে ধীরকণ্ঠে বলল,
— “আস্তে খাও।”
তারীন এক চুমুক, দু’চুমুক করে পানিটুকু গিলে নিল। তৃষ্ণার্ত ছাতি ফাটা গলায় পানির স্পর্শ পেতেই যেন প্রাণ ফিরে পেল সে। কিন্তু ভেতরের সেই বিষণ্নতার মেঘ এতটুকু কাটল না।
আযরাফ গ্লাসটা খালি করে পাশের কাঠের টেবিলে রাখল। তারপর অত্যন্ত পরম যত্নে তারীনকে আবার নরম বালিশে শুইয়ে দিল। কিন্তু তার হাতটা সঙ্গে সঙ্গে সরিয়ে নিল না। তারীনের গালে গড়িয়ে আসা একফোঁটা অবাধ্য জল বুড়ো আঙুলের আলতো ছোঁয়ায় মুছে দিল।
— “আর কিছু লাগবে?”
তারীন মাথা নাড়িয়ে বলল,
— “না।”
—”ঠিক আছে শুয়ে থাকো আমি রেডি হয়ে নাস্তা নিয়ে আসছি। দুইজন একসাথে ব্রেকফার্স্ট করবো।”
—”আমি এখানে থাকবো না, আব্বু-আম্মুর কাছে দিয়ে আসুন।”
—”বিয়ের পর থেকে এইটাই তোমার ঘর। বাপের বাড়ি কাল যাবে। কালকের পর থেকে বাপের বাড়িতে তুমি অতিথি পাখি।”
—”আপনার ল*জ্জা করচ্ছে না।”
—”নাহ্! তোমার শরীল ভালো না রেস্ট করো।”
—”আপনার জন্যই তো। এই আপনার ভালোবাসা ছিঃ!”
—”আমার ভালোবাসা মাপার ক্ষমতা তোমার নেই। আমি শুধু তোমাকে ভালোবাসতে চাই না প্রিয়তমা, তোমার সঙ্গে থেকে যেতে চাই। এমনভাবে থেকে যেতে চাই, যেভাবে সন্ধ্যার পরও আকাশের গায়ে দিনের শেষ আলোটা থেকে যায়। যেভাবে পুরোনো কোনো গানের সুর বহু বছর পরেও হঠাৎ মনে পড়ে গেলে বুকের ভেতরটা কেমন অকারণে নরম হয়ে আসে। তোমার সঙ্গে আমার স*ম্পর্কটা কোনো এক জীবনের গল্প হোক, তা চাই না। এই জীবনটা যদি কোনোদিন শেষ হয়ে যায়, তারপরও কোথাও যেন আমাদের গল্পটা পড়ে থাকে। অন্য কোনো জ* ন্মে, অন্য কোনো সময়ে, অন্য কোনো পৃথিবীতে আবার যেন তোমার সঙ্গে আমার দেখা হয়। হয়তো তখন তুমি আমাকে চিনবে না, আমিও চিনব না তোমাকে। তবু প্রথম দেখাতেই কেমন একটা অদ্ভুত পরিচিতি অনুভব হবে। তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে মনে হবে, এই চোখের দিকে আমি এর আগেও বহুবার তাকিয়েছি। তোমার পাশে দাঁড়ালে মনে হবে, এই মানুষটার পাশে দাঁড়ানোর অভ্যাস আমার বহু পুরোনো। তারপর কোনো এক অকারণ বিকেলে তোমার হাতটা ধরে ফেলব। কেন ধরেছি, তার কোনো ব্যাখ্যা থাকবে না। শুধু মনে হবে, এই হাতটা ধরার অধিকার বুঝি আমার বহু জন্মের।”
—”আপনার কি মনে হয় এইসব বলে গলে যাবো আমি।”
—”কখনোই না। তোমাকে আ*মৃ*ত্যু আমার সঙ্গীনি হয়ে থাকতে হবে। এইটাই তোমার ভবিতব্য। তুমি চুপটি করে বসো আমি ড্রেস পড়েনি।”
কথাটা বলে আযরাফ বিছানা থেকে উঠে চলে গেলো আলমারির দিকে। আলমারির পাল্লা খুলে প্রয়োজনীয় একটা শার্ট আর প্যান্ট বের করে নিলো। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই পোশাক পরে নিলো সে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভেজা চুলগুলো হাত দিয়ে একটু ঠিক করে নিলো। তারপর আর একবার পেছন ফিরে বিছানার দিকে তাকালো।
তারীন চুপচাপ শুয়ে আছে। চোখ দুটো বন্ধ, কিন্তু মুখের অভিব্যক্তি দেখে বোঝা যায় ঘুমিয়ে নেই। আযরাফ কিছুক্ষণ নীরবে তাকিয়ে থেকে দরজার দিকে এগিয়ে গেলো।
দরজা খুলে বাইরে বের হতেই করিডোরের অপর প্রান্ত থেকে ফুফুর সঙ্গে দেখা হয়ে গেলো। হাতে নাশতার ট্রে। আযরাফকে দেখেই ভদ্র মহিলার মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। তিনি বললেন,
—”কোথায় যাচ্ছিস বাবা?”
আযরাফ নিচু স্বরে বলল,
—”নাশতা নিয়ে আসতে যাচ্ছিলাম।”
ফুফু সঙ্গে সঙ্গে ট্রেটা তার হাতে তুলে দিয়ে বললেন,
—”তাহলে এটা নিয়ে যা। বউমা ঘুম থেকে উঠেছে তো?”
—”হ্যাঁ। শরীরটা এখনো দুর্বল।”
—”মেয়েটাকে সময় দিস বাবা। নতুন বাড়ি, নতুন মানুষ সবকিছু একদিনে আপন হয়ে যায় না।”
—”জানি ফুফু।”
—”জানিস যখন, তাহলে কথাটা মনে রাখিস।”
—”চেষ্টা করব।”
ফুফু আর কিছু বললেন না। স্নেহভরা চোখে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। আযরাফ ট্রেটা হাতে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে এলো। ঘরের দরজা খুলতেই তার চোখ প্রথমেই গেলো বিছানার দিকে।
তারীন আগের মতোই শুয়ে আছে। তবে এবার চোখ দুটো খোলা। ছাদের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে। আযরাফকে ঘরে ঢুকতে দেখে চোখ সরিয়ে জানালার দিকে তাকালো।
আযরাফ ট্রেটা টেবিলের ওপর রেখে ধীরে ধীরে তার কাছে এগিয়ে গেলো।
—”উঠবে?”
তারীন কোনো উত্তর দিলো না।
আযরাফ ফের ডেকে উঠল অধৈর্য হয়ে ,
—” তারীন নাশতা নিয়ে এসেছি। একটু খেয়ে নাও।”
তারীন এবার ধীরে চোখ ফিরিয়ে তাকিয়ে বলল,
—”সমস্যা কি আপনার আমি খাবো না নিয়ে যান বলছি।”
তারীনের জেদি আর তীক্ষ্ণ কণ্ঠের অবাধ্যতা শুনে আযরাফ মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার ধূসর চোখে একবিন্দু আলো এসে পড়ল, যা থেকে ঠিক বোঝা গেল না সে রাগল নাকি আনন্দ পেল। বিষণ্ণ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে ট্রে-টা পাশের কাঠের টেবিলে রাখল।
সে এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে বিছানার কাছে গিয়ে তারীনকে কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুই বাহুতে তুলে নিল। তারীন শিউরে উঠে হালকা চিৎকার দিতে চাইল, কিন্তু আযরাফ তাকে অনায়াসে নিজের কো*লে বসিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। যেন একটা অবাধ্য ছোট বাচ্চাকে সামলাচ্ছে।
— “ছাড়ুন আমাকে! আমি বললাম তো খাব না! কেন বুঝতে পারছেন না?”
আযরাফ কোনো উত্তর দিল না। তার বাম হাত দিয়ে তারীনের মাথাটা নিজের বুকের সাথে লেপ্টে রেখে ডান হাতে চামচ তুলে নিল। তারপর ঠাণ্ডা, শান্ত অথচ গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
— “চুপচাপ খেয়ে নাও, তারীন। এই বাড়িতে অকারণে ত্যাড়ামি করা নিষেধ।”
— “আমি খাব না!” তারীন মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল।
আযরাফ ধীরস্থিরভাবে তার বাম হাতের দুটো আঙুল দিয়ে তারীনের নরম চিবুক শ*ক্ত করে চে*পে ধরল। আঙুলের চাপে তারীনের মুখটা হা হতেই চামচ ভরা খাবারটা মুখে পুরে দিলো।
তারীনের চোখে তখন একরাশ ক্ষো*ভ আর অপমানের জল। সে খাবারটা না গিলে গালের একপাশে আটকে রাখল। মুখ বন্ধ করে একদম স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। চিবাচ্ছে না, নিচেও নামাচ্ছে না এক ধরনের নীরব প্রতিবাদ।
আযরাফ তারীনের ফোলা গালের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। সেই হাসিতে কোনো দয়া ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত অধিকারবোধ।
সে খুব কাছ থেকে তারীনের চোখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
— “হুমায়ূন আহমেদের বইয়ে পড়েছ কখনো? কিছু মানুষ থাকে যাদের সহজ কথা সহজে সহ্য হয় না। তুমি কি সেই দলে পড়তে চাও, শ্রাবণকন্যা? মুখে খাবার জমা করে রেখে কোনো লাভ নেই। গিলে ফেলো।”
তারীন তবুও নিস্পন্দ। তার চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে আযরাফের হাতের ওপর পড়ল।
আযরাফ অন্য হাত দিয়ে গ্লাসের পানিটা চামচে একটুখানি নিয়ে তারীনের ঠোঁ*টের ফাঁক দিয়ে সামান্য গড়িয়ে দিল। তারীনের নিঃশ্বাস আটকে এল। গলায় পানি লাগতেই অনিচ্ছা সত্ত্বেও স্বাভাবিক রিফ্লেক্সে সে ঢোক গিলতে বাধ্য হলো। মুখে আটকে রাখা খাবারটা পেটের ভেতর নেমে গেল।
— “এই তো ল’ক্ষ্মী মেয়ের মতো। ব্যাস, আর কয়েকটা লোকমা।”
আযরাফ এক হাতে ওকে কোলে ধরে রেখেই একের পর এক লোকমা জোর করে খাইয়ে দিতে লাগল। ঘরের ভেতর তখন কেবল ঘড়ির কাঁটার শব্দ আর তারীনের ভাঙা নিঃশ্বাসের শব্দ মিলেমিশে একাকার।
চলবে,,

