#চিরদিনই_তুমি_যে_আমার
#নূরা_ফাতেহা
||০৬||
তারীন আর আযরাফ এক সাথে বসে লাঞ্চ করচ্ছে। তারীনের ভেজা চুলের গন্ধ এক ধরনের মা’দ’কতা সৃষ্টি করচ্ছে রুম জুড়ে। আর সেই গন্ধ আযরাফ নে’শাক্ত বোধ করচ্ছে। যার ফলে সে খাবারের প্রতি একমদই মনোযোগ নেই। তারীন সেইটা দেখে বলল,
—”খাচ্ছেন না কেনো?”
—”তুমি আমায় খেতে দিচ্ছো না তাই?”
—”আমি কি খেতে বারণ করেছি আপনায়?”
—”নাহ্!”
—”তাহলে তুমি বুঝবে না। চোখের সামনে এমন হ’ট লেডি বসে থাকলে কি খাওয়া মন বসে তারীন পাখি।”
কথাটা শুনা মাত্র তারীন কেশে উঠল খুকখুক করে। গলায় খাবার আঁটকে গেছে তার। আযরাফ দ্রুত পানি খইয়ে গলাটা একটু ঢলে দিলো যাতে তার গলার খাবারটুকু নেমে যায় ডোর হতে। তারীন যখন শান্ত হলো তখনি সে ওকে ছেড়ে দিয়ে নিজের আসনে বসে পড়ল।
তারীন রাগে ফুঁসফুঁস করে বলে উঠল,
—”আপনার মাত্রায় সারাক্ষণ শুধু এইসবই চলে। ছিঃ! নির্লজ্জ একটা।”
আযরাফ মুরগীর পিসে কামড় বসিয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে চিবুতে চিবুতে বলল,
—”কোন গুলোর কথা বলছো লিটল বার্ড?”
থতমত খেলো তারীন। মূহুর্তে তার মুখটা ভোঁতা হয়ে গেলো। ঢোক গিলে খাবারে মন দিলো। আযরাফ তারীনের ভোঁতা মুখটা দেখে মনে মনে বেশ আনন্দ পেলো। তারীনকে জ্বালাতন করেও তার শান্তি লাগে মনে। অতঃপর লাঞ্চ শেষ হতে আযরাফ তারীনকে মেডিসিন খাইয়ে দিয়ে বলল,
—”বিশ্রাম নিন ম্যাডাম। আমি বেলকনিতে গিয়ে বসছি। লোক এসে এগুলো নিয়ে যাবে।”
—”আপনি কি আমায় সত্যি ভালোবাসেন?”
—”ভালোবাসা কি কখনো মিথ্যা হয় তারীন? আমি তোমাকে হৃদয়ের গহ্বর থেকে ভালোবাসি তারীন। যার কোনো ব্যাখ্যা হয় না! এনি ওয়ে রেস্ট নেও। আমি বেলকনিতে যাচ্ছি।”— মৃদু হেসে উত্তর করল আযরাফ।
তারীন একটু কাচুমাচু করচ্ছে। যেনো কিছু বলতে চায়ছে কিন্তু বলতে পারচ্ছে না সে। অতঃপর আযরাফ জিজ্ঞেস করল,
—”কিছু বলবে লিটল বার্ড?”
—”হুম।”
—”তাহলে বলো এতো ইতস্তত করচ্ছো কেনো? আই এম ইউর হাসবেন্ড তারীন। তুমি স্বাচ্ছন্দ্যে আমাকে সব বলতে পারো। কাম অন টেল মি।”
—”আপনার ফোনটা একটু দিবেন? মা-বাবার সাথে কথা বলব।”
—”মিথ্যে বলতে শিখে গেছো তারীন! আমি তোমার চোখের ভাষা স্পষ্ট বুঝতে পারি বলতেই পারো। ওই ছেলেটার সাথে কথা বলবে।”— কথাটা শেষ করে আযরাফ তার ফোনটা পকেট হতে বের করে ওর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে পুনরায় বলল,
—”নেও।”
তারীন কম্পিত হাতে ফোনটা ধরে আযরাফের দিকে তাকালো। আযরাফ একটু হেসে আশ্বস্ত করল ফোনটা নিতে সম্পূর্ণ ভাবে। দেরি করলা না তারীন ফোনটা সম্পূর্ণ ভাবে টেনে নিলো তার দিকে। আযরাফ সেইখানে আর এক মূহুর্ত ও দাঁড়ালো না বরং বেলকনিতে চলে এলো। সিগারেট ধরিয়ে টানতে লাগল সে।
সে এতোটা নির্বিকার আছে তার কারণ হলো সে স্পষ্ট জানে ছেলেটার ফোন বন্ধ থাকবে৷ কারণ ছেলেটা তার কাছ থেকে টাকা নিয়ে অনেক দূরে চলে গেছে। সে কি তার পাখিকে এমনি এমনি মুক্ত আকাশ দিয়েছে, উঁহুম ওর ফিরে যাওয়ার সমস্ত পথ বন্ধ করে তবেই না তাকে সময় দিয়েছে। ছেলেটা একদমই ভালো নয়। আস্ত এক প্লে বয়। একশোটা মেয়ের সাথে উঠা-বসা থেকে শুরু করে ফি’জি’ক্যা’ল পর্যন্ত করে।
আযরাফ ভেবে পায়না তারীন কি করে ওই স্কাউন্ড্রেল এর কাছে গেলো। মেয়েরা যে সবসময় ভুল লোককে ভালোবাসে তার জলজ্যান্ত প্রমান যেনো, তারীন। মাঝেমধ্যে তো মন চায় মেরে দাঁত কপাটি ভেঙে ফেলতে। আযরাফ একটু উঁকি মারল দেখলো তার বেকুব মহিলাটা ক্রমাগত ট্রাই করেই যাচ্ছে আর চোখের জলে নাকের জলে এক করচ্ছে। একবার ইচ্ছে হলো যেতে। তারপর ভাবলো না কাঁদুক। কাঁদলে ভালো লাগবে। যত কান্না তত হাসি!
সিগারেটার শেষ টান দিয়ে মেঝেতে ফেলে দিলো সে। একটু পর কাঁদতে কাঁদতে তারীন এলো বেলকনিতে। হাসি পেলো আযরাফের তবে সে হাসলো না। এখন হাসলেই কুরুক্ষেত্র বাঁধিয়ে দিবে নিশ্চয়ই মেয়েটা। হাসিটা অনেক কষ্টে চেপে রেখে ফোনটা নিয়ে পকেটে ভরে নিয়ে উল্টো দিকে ঘুরল সে বেলকনির রেলিং এর ভর দিয়ে বাইরে তাকালো। আবহাওয়াটা বেশ ঠান্ডা! আকাশে কালো মেঘ জমেছে। বাতাস ও বইছে। তারীন দাঁড়িয়ে রইলো তার পিছনে৷ অতঃপর নাক টেনে বলে উঠল ,
—”আপনি কেমন মানুষ হে? দেখতে পারচ্ছেন আমি কাঁদছি।”
—”তো! আমি তো কাঁদতে বলিনি তোমায় হাসতেই বলেছি। তাহলে কাঁদছো কেনো?”
—”আপনি বুঝবেন না। ”
—”আচ্ছা।”
—”আপনি অন্তত নির্বোধ আর বাজে লোক।”
— “জানিতো! তোমার ডিকশনারিতে নতুন কোনো ওয়ার্ড যুক্ত হলে আমায় বলো। পুরনো কোনো শব্দ শুনতে শুনতে মোটেও ইন্টারেস্ট নই আমি।”
ঠোঁট উল্টালো তারীন। লোকটা যে ত্যাড়া তা সে জানত তবে এতোটা ত্যাঁড়া তা সে বুঝতে পারেনি৷ অশ্রুসিক্ত নয়নে লোকটার পিঠের দিকে তাকিয়ে রইলো তারীন। তারীনের খুব ইচ্ছে হলো দুটো কামড় বসিয়ে দিতে তার কাঁধে। কিন্তু সে তা করল না বরং ধুপধাপ পা ফেলে চলে গেলো রুমে। আযরাফ খুব ভালো করেই বুঝতে পারলো। তার গিন্নি বেজায় চটে গেছেন৷ এই মুহুর্তে তার সঙ্গ চাইছে কিন্তু সে তার ইগুর জন্য বলতে পারচ্ছে না। কথায় আছে, ইগোর জন্য সুন্দর সম্পর্ক গুলো নষ্ট হয়। তাই সম্পর্কের মধ্যে ইগো দেখিয়ে লাভ নেই বরং ওতে ক্ষতি বেশি। একটা ১৮ বছর বয়সী মেয়ে কোথায় ভালো মন্দ বুঝবে তা না উল্টো অবুঝের ন্যায় তার আচারণ।
একে নিয়ে সে করবেটা কি? যতসব ভুলবাল ডিসিশন সে নে। একটু ভালো করে পড়লে ও তো পারে গতবার ইন্টারে ক্রস খেয়েছে তিন সাবজেক্ট এ। আবার তাকে ইন্টারে ফাইনাল এক্সাম দিতে হবে সেই চিন্তাটুকু তার ভিতরে দেখে না সে। বরং প্রেমের ভূতই বেশি চাপে।
এক জোড়া ক্লান্ত নিশ্বাস নিলো সে। অতঃপর দ্রুত গতিতে পা চালিয়ে রুমে ঢুকল। দেখলো তারীন লেপ মুরি দিয়ে শুয়ে আছে। আযরাফ ধীর পায়ে গিয়ে বসল বিছানাতে। নরম কন্ঠে বলে উঠল,
—”তারীন উঠোতো দেখি কি হয়েছে তোমার?”
—”বলব না যান তো।”
আযরাফ আর ধৈর্য ধরল না। বরাবরই সে অধৈর্য। চাদর টেনে সরিয়ে দিলো সে। অতঃপর টেনে তুলে কোলে নিয়ে বসল। তারপর জিজ্ঞেস করল,
—”কি হয়েছে? ও কল ধরেনি?”
তারীন কিছুই বলল না একদম চুপ করে রইলো। তার এই অবাধ্য মহিলাটা ঠিক কি করবে তা নিয়ে দিশেহারা। আযরাফ কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে বসে রইলো। চুল গুলোতে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে নিরেট গলায় বলল,
—”ঘুরতে যাবে?”
—”যাবো।”
—”তাহলে রেডি হও।”
—”উঁহুম! এইভাবেই যাবো ইচ্ছে হলে নিয়ে যান না হলে না।”
—”এই মেয়ে রাগ দেখাচ্ছো কাকে? একটা চড় দিবো উঠো জলদি।”
—”আপনি আমার গায়ে হাত তুলবেন?”
—”প্রয়োজন হলে তুলবো। উঠো জলদি।”
—”যাবো না আমি যান তো। নামান আমাকে নিচে।”
আযরাফ নামাল না বরং বিড়াল ছাও এর মতো আরো বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে হেঁটে রুম থেকে বের হয়ে গেলো। তারীন হতবাক! সে পিটপিট দৃষ্টিতে আযরাফের পানে তাকিয়ে বলল,
—”কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন নামান আমায় ফেলে দিবেন তো আমাকে?”
—”নাহ্! নামাতে ইচ্ছে করচ্ছে না এইভাবে নিয়ে যাবো। তুমি বড্ড অবাধ্য। কখনো একটু লক্ষ্মী মেয়ের মতো চুপটি করে বসে থাকতে পারো তো। তোমার মা-বাবা তোমাকে কি করে টলারেট করতো?তারা বোর হতো না।”
—”এ্যাঁ! আমি খুব ভালো মেয়ে আম্মু আমাকে সবসময় লক্ষ্মী বলতেন।”
—”ওটাতো তোমার মন রক্ষার্থে। আদৌও তুমি তা নও।”
রাগে ফুঁসে উঠে আযরাফের চুল টেনে ধরল তারীন। মৃদু আর্তনাদ করে উঠল আযরাফ।
—”এই ছাড়ো বলছি না হলে কিন্তু কোল থেকে ফেলে দিবো।”
—”ছাড়বো না কি করবেন?”
—”কামড় বসাবো।”
বড় বড় চোখ করে দ্রুত ছেড়ে দিলো সে। আযরাফ দ্রুত পা ফেলে একটা বিলের সামনে এসে থামল। অতঃপর একটা সুন্দর দোলনাতে বসালো। আযরাফ দোলনাটা পিছন থেকে দোল দিলো। দোলনাটা দোল দিতেই তারীনের পা টা পানিতে ছুঁলো। শীতল পানির স্পর্শে তার গা একদম শীতল হয়ে গেলো।
—”কেমন লাগছে?”
—”ভালো।”
—”তাই?”
—”হুম।”
—”আচ্ছা তারীন আমরা কি বন্ধু হতে পারি না?”
—”না!”
—”কেনো?”
—”কারণ মন থেকো তো মানতে পারচ্ছি না তাই।”
—”ঠিক আছে দ্রুত মানার চেষ্টা করো নয়তো আমি কিন্তু মানানোর অন্য উপায় খুঁজে বের করবো। তখন কিন্তু কেঁদে কুল পাবে না।”
—”আপনি কথায় কথায় থ্রে’ট দেন কেনো?”
—”কারণ আমি এইরকমই।”
তারীন আর কথা বাড়াল না। কারণ কথায় কথা বাড়ে তাই। কি সুন্দর বাতাস বইছে। সে এই পরিবেশটা বেশ উপভোগ করচ্ছে। তারীনের অবুঝ মন একটু একটু করে ভরসা করচ্ছে আযরাফকে যা সে নিজেও বুঝতে পারচ্ছে না। বিয়ের বন্ধ এতো সহজ না কি? আল্লাহ্ পবিত্র কালাম উচ্চরণ করে তারপর কবুল বলা হয়। এই বন্ধ আমৃত্যু অটুট থাকে।
——————-
আশরাফ চৌধুরী আর রোকসানা চৌধুরী বসে বসে চা খাচ্ছেন। ওনাদের মনে সারা রাজ্যের চিন্তা। ছেলে-মেয়ে দুটি একলা গেছে। ওদের মধ্যে ভাব-সাব আদৌও হয়েছে কি না তা নিয়ে চিন্তা।
—”রোকসানা শুনতো?”
—”জ্বি ভাই জান বলুন শুনছি।”
—”তারীন বাড়ি এলে ওকে ভালো করে একটু বুঝাস তো।”
—”হুম বুঝাবো। ওর সাথে আলাদা করে কথা বলার স্কোপই তো পাইনি৷ ও এসেছে পর থেকেই অসুস্থ।”
—”হ্যাঁ সেইটাই। আজ একবার তারীনের বাপের বাড়ি যাবো একটু খবর নেওয়া দরকার কেমন আছে ওরা। তারীনের সাথে আর তাদের যোগাযোগ নেই তাই আমিই যাবো খোঁজ নিতে।”
—”ভাইজান তাহলে আমাকেও নিয়ে যাইয়েন।”
—”তুই যাবি। তাহলে মায়া কি করবে?”
—”ও বাসায় থাকবে। বাসা ভর্তি সার্ভেন্ট ওর অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। ”
—”বেশ। তাহলে চা টা শেষ করে দ্রুত রেডি হয়ে নে।”
চলবে,

