Home "ধারাবাহিক গল্প "চিরদিনই তুমি যে আমার চিরদিনই তুমি যে আমার পর্ব-১৪

চিরদিনই তুমি যে আমার পর্ব-১৪

0
12

#চিরদিনই_তুমি_যে_আমার
#নূরা_ফাতেহা
||১৪||

সকালের আকাশটা আজ কেমন যেন থমথমে। মেঘের গাঢ় ঘটা দেখে মনে হচ্ছে আকাশের বুক চিরে এখনই নামবে অঝোরধারায় শ্রাবণের বৃষ্টি। ধূসর আলোর রেখা জানালার ফাঁক গলে ঘরের কাঠের মেঝেকে ছুঁয়ে আছে।
তারীন তার ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আড়ষ্ট হাতে ওড়নার পিনটা লাগাচ্ছিল। পরনে কলেজের ইউনিফর্ম কোমরে সুতির নীল বেল্টটা শক্ত করে বাঁধতে গিয়ে তারীনের হাত দুটো থমকে গেল। আয়নায় নিজের চেহারার দিকে তাকাতেই সে টের পেল, গত পাঁচ-ছয় দিনে তার রূপ-চেহারায় কেমন যেন একটা মলিনতার ছাপ চেপে বসেছে। চোখের নিচে বিষাদের কালচে ছায়া, চিবুকটা সামান্য শুকিয়ে এসেছে। বিগত এই দিনগুলোতে তার আর প্রফেসর আযরাফ চৌধুরীর মাঝে কোনো সরাসরি কথা হয়নি। লোকটা যেন এক রহস্যময় ছায়া। সারাটা দিন তার ফোন বন্ধ থাকে, কোনো খোঁজ নেই। অথচ রাতের গভীর নিস্তব্ধতায় ঠিক ১টা কিংবা ২টোর সময় মোবাইলের স্ক্রিনে ফুটে ওঠে একটা ছোট টুংটাং মেসেজের শব্দ।

বাস! এতটুকুই! তারপর তারীন মেসেজের উত্তর দিতে গেলে বা ফোন ঘোরাতে গেলে দেখে নম্বর বন্ধ, নয়তো রিং হতে হতে কেটে যায়। সারা দিনে হাজারটা ফোন দিলেও মানুষটাকে পাওয়া যায় না। অথচ রাতের আঁধারে নিঃশব্দে এসে মনের ভেতর কালবৈশাখী ঝড় তোলপাড় করে দিয়ে সে গায়েব হয়ে যায়। লোকটা ঢাকা কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রখ্যাত প্রফেসর হতে পারে, কিন্তু হৃদয়ের দিক দিয়ে একটা আস্ত পাষাণ আর কাঠখোট্টা মানুষ।
তারীনের বুকের ভেতরে জমাট বেঁধে থাকা অভিমানগুলো আজ তীব্র আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ার উপক্রম হয়েছে। এমন নাছোরবান্দা ত্যাড়া স্বামীর কাছে সে আজ সরাসরি গিয়ে উপস্থিত হবে। কলেজের ক্লাসে ঢুকুক কিংবা স্টাফ রুমে থাক, সবার সামনে আজ সাফ কৈফিয়ত আদায় করতে হবে কেন সে ফোন দিলে ধরে না? কেন প্রতিদিন রাত ১টায় নিশাচর প্রাণীর মতো একটা মেসেজ পাঠিয়ে মন খারাপের সাগরে ভাসিয়ে দেয়? সে নিজেকে কী মনে করে?
রুমের দরজায় হালকা পায়ের শব্দ হলো। তারীনের মা রেবেকা বানু ঘরে ঢুকলেন। তাঁর হাতে একটি পাঁচশত টাকার নোট। তিনি ধীরপায়ে মেয়ের দিকে এগিয়ে এসে ভ্যানিটি ব্যাগের চেইনটা আলতো করে খুলে টাকাটা ভেতরে গুঁজে দিলেন। মমতাময় হাত দিয়ে মেয়ের কপালে নেমে আসা অবাধ্য চুলগুলো কানে গুঁজে দিতে দিতে বললেন,

— “সাবধানে যাবি মা। আকাশের মুখটা ভালো না, যেকোনো মুহূর্তে বৃষ্টি নামবে।”

তারীন তোয়ালে দিয়ে হাত মুছতে মুছতে চোখ না তুলেই সংক্ষিপ্ত, ঠাণ্ডা গলায় জবাব দিলো,

— “যাব।”

রেবেকা বানু মেয়ের মুখের থমথমে ভাব দেখে একটু ইতস্তত করলেন। তিনি অভিজ্ঞ মায়ের দৃষ্টিতে মেয়ের ভেতরের অশান্ত ঝড়টা ঠিকই আঁচ করতে পারলেন। সাবধানে, একটু নরম স্বরে বললেন,

— “জামাইয়ের সাথে একদম ত্যাড়ামি বা ঝগড়া করবি না, বুঝেছিস?”

তারীন হাত দুটো বুকের ওপর শক্ত করে বাঁধল। চিরায়ত একগুঁয়ে স্বভাব নিয়ে মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে বলল,

— “করব।”

— “তারীন? এ কেমন কথা বলিস মা?”

— “শুনছি না!”

কথাটা শেষ করেই তারীন ব্যাগের চেইন আটকে কাঁধে ঝুলাল। মায়ের চিন্তিত আর অসহায় দৃষ্টি পেছনে ফেলে সে হনহন করে ঘর থেকে বের হয়ে এলো। বাইরে বের হতেই একঝলক ভেজা বাতাস তারীনের গা ছুঁয়ে গেল। পাড়ার ভেতরের কাঁচা-পাকা রাস্তাটা পার হয়ে সে মেইন রোডে এসে দাঁড়াল। ইন্টারমিডিয়েট দ্বিতীয় বর্ষের টেস্ট পরীক্ষা আর মাত্র কয়েক মাস বাকি, মাথাভর্তি পড়ালেখার চাপ। অথচ তার অবাধ্য মনটা পড়ে আছে সেই ইংরেজি প্রফেসরের পায়ের কাছে, যে লোকটা জোর করে তার জীবনের স্বত্বাধিকারী হয়ে বসে আছে।

রাস্তার মোড়ে একটা নীল রঙা লোকাল বাস থামতেই তারীন দ্রুত গিয়ে বাসে উঠল। বাসের ভেতর গাদাগাদি ভিড়, প্রচণ্ড হাঁসফাঁস অবস্থা। সিট পাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। তারীন কায়ক্লেশে লেডিস সিটের পাশে গিয়ে একটা রড শক্ত করে ধরে দাঁড়াল। বাসের ঝাঁকুনির সাথে সাথে তারীনের বুকের ভেতর জমতে থাকা রাগটাও যেন দ্বিগুণ হচ্ছিল। জানালার গ্লাস বেয়ে হু-হু করে হাওয়া আসছে, পাশে বসা দুই কলেজপড়ুয়া মেয়ে নিজেদের পড়াশোনা আর স্যারদের বকুনি নিয়ে কথা বলছে, কিন্তু তারীনের কান সেদিকে নেই। তার পুরো খেয়াল এখন ঢাকা কলেজের ইংলিশ ডিপার্টমেন্টের ওপর। সে ঠিক করে ফেলেছে, আজ ক্লাসের সবার সামনে বা ডিপার্টমেন্টের করিডোরে দাঁড়িয়েই সে প্রফেসরের সব সাহিত্যিক চালবাজি চুরমার করে দেবে।
নীলক্ষেত মোড়ে এসে বাসটা থামতেই তারীন তড়িঘড়ি করে নেমে পড়ল। ততক্ষণে হালকা গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। তারীন ওড়নার আঁচল দিয়ে মাথাটা ঢেকে দ্রুত পায়ে হেঁটে ঢাকা কলেজের ঐতিহাসিক মেইন গেটের দিকে এগোতে লাগল।

শতবর্ষী বিশাল বিশাল মেহগনি আর বটগাছের ছায়ায় ঢাকা ঢাকা কলেজের ক্যাম্পাসটা বৃষ্টির ছোঁয়ায় অদ্ভুত সুন্দর লাগছে। কলেজের কিছু ছাত্র বটতলায় দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছিল, কিন্তু সাদা-নীল ইউনিফর্ম পরা ইন্টারের এক তরুণী মেয়েকে হন্তদন্ত হয়ে প্রফেসরের ব্লকের দিকে যেতে দেখে অনেকে অবাক চোখে তাকাল। তারীন কারও দিকে নজর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করল না। সে সোজা প্রধান ভবনের দোতলার দিকে সিঁড়ি ভাঙতে শুরু করল।
দোতলার লম্বা করিডোরটা বেশ শান্ত। বাম পাশের তিন নম্বর রুমের ভারী কাঠের দরজার ওপরে পিতলের প্লেটে খোদাই করে লেখা, ‘প্রফেসর আযরাফ চৌধুরী (ডিপার্টমেন্ট অব ইংলিশ)’।

তারীন কোনো অনুমতি নেওয়া বা দরজায় টোকা দেওয়ার সৌজন্য দেখাল না। সরাসরি হ্যাণ্ডেল ঘুরিয়ে দরজায় এক ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল। রুমের ভেতরের পরিবেশটা বেশ নিস্তব্ধ। জানালার বাইরে বৃষ্টির ঝাপটা এসে কাঁচ স্পর্শ করছে। কাঠের বিশাল বড় এন্টিক টেবিলের ওপাশে গম্ভীর হয়ে বসে ছিলেন প্রফেসর আযরাফ চৌধুরী। পরনে হালকা আকাশি রঙের ফুলহাতা শার্ট, হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গোটানো। তাঁর এক হাতে খোলা মোটা ইংরেজি বই—আর্নল্ডের কবিতার সংকলন, আর অন্য হাতে ধরা একটা দামি চশমা। ঘরে আর কেউ নেই। আচমকা খট করে দরজা খোলার শব্দে আযরাফ চশমাটা নাকে চড়িয়ে চোখ তুলে তাকাল।
সামনে ইন্টার দ্বিতীয় বর্ষের নিজের স্ত্রী, সুতির ইউনিফর্ম পরে অগ্নিশর্মা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ দুটো দিয়ে যেন আগ্নেয়গিরির লাভা ঝরছে। আযরাফের গম্ভীর মুখে খুব সূক্ষ্ম এক চিলতে হাসি ফুটে উঠে নিমেষেই মিলিয়ে গেল। সে হাতের বইটা টেবিলে রাখল। তারপর নিজের দামী হাতঘড়ির দিকে একপলক তাকিয়ে একদম স্বাভাবিক, শান্ত কণ্ঠে বলল,

— “আজকে পৌঁছাতে অন্তত পঁচিশ মিনিট দেরি হয়েছে, মিসেস তারীন। ইন্টারমিডিয়েটের একজন স্টুডেন্টের প্রফেসরের রুমে এভাবে বিনা অনুমতিতে ঢোকাটা মোটেও মার্জিত আচরণ নয়। তোমাকে কি ডিপার্টমেন্টাল ম্যানার্স শেখাতে হবে?”

তারীন টেবিলের কাছে এগিয়ে এলো। দুই হাত টেবিলের ওপর শক্ত করে চেপে ধরে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিল,

— “আপনার ফালতু ইংরেজি সাহিত্যের লেকচার বন্ধ করুন, প্রফেসর! আমি আপনার ক্লাসের কোনো সাধারণ ছাত্রী হয়ে ব্যাকরণ শিখতে আসিনি। আমি এসেছি আপনার কৈফিয়ত নিতে।”

আযরাফ চেয়ারের পেছনে হেলে বসল। দুটো হাতের আঙুল পরস্পর যুক্ত করে শান্ত ভঙ্গিতে বলল,

— “কৈফিয়ত? কিসের কৈফিয়ত, শ্রাবণকন্যা?”

— “নাটক একদম বন্ধ করুন, গত পাঁচ-ছয় দিন ধরে আপনি কোথায় গায়েব ছিলেন? আমি সকাল থেকে সন্ধ্যা ফোন দিলে আপনার ফোন সারাদিন বন্ধ থাকে কেন? আর রাত ১টা কি ২টো বাজলে ভূতের মতো মেসেজ পাঠানোর রহস্যটা কী? আপনি নিজেকে কী মনে করেন? এই কলেজের প্রফেসর বলে ভাবেন যা ইচ্ছা তা-ই করবেন?”

আযরাফ ধীরে ধীরে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। সে শান্ত পায়ে টেবিলটা ঘুরে তারীনের একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। প্রফেসরের সুউচ্চ অবয়ব আর দীর্ঘ ছায়া তারীনকে এক লহমায় ঢেকে ফেলল। আযরাফ খুব নিচু, নিরেট ও গভীর স্বরে বলল,

— “হুমায়ূন আহমেদ তাঁর এক উপন্যাসে লিখেছিলেন, ‘মানুষের তীব্র ব্যাকুলতা প্রকাশের সবচেয়ে সেরা উপায় হলো নীরবতা।’ আমি দেখতে চেয়েছিলাম, আমার এই ত্যাড়া পাখিটা তার অত্যাচারী প্রফেসরকে কতটা মিস করে। খাঁচার দরজা খুলে দেওয়ার পর সে কি আকাশে উধাও হয়ে যায়, নাকি বাসে চেপে সোজা ঢাকা কলেজের প্রফেসরের রুমে এসে কৈফিয়ত দাবি করে।”

তারীনের চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা অবাধ্য জল গড়িয়ে পড়ল। সে রাগ আর অভিমানে এক ঝটকায় মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বলল,

— “আপনার এসব খামখেয়ালি সাইকোলজি আমার ওপর প্রয়োগ করবেন না। আমি আপনার কোনো ল্যাবরেটরির গিনিপিগ নই!”

— “তুমি গিনিপিগ নও, তুমি আমার বউ।”— আযরাফ খুব স্বাভাবিক গলায় জবাব দিল।

— “বউ? বউয়ের সাথে কেউ এমন অমানুষের মতো আচরণ করে? একটা ফোন করে জানা যায় না আমি কেমন আছি?”
আযরাফ আলতো করে পকেট থেকে একটা ধবধবে সাদা

রুমাল বের করে তারীনের চোখের সামনে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

— “নাও, চোখ মোছো। ডিপার্টমেন্টের অন্য প্রফেসরেরা বা ছাত্ররা দেখলে ভাববে প্রফেসর আযরাফ চৌধুরী ইন্টারের এক ছাত্রীকে বকা দিয়ে কাঁদাচ্ছে। ডিপার্টমেন্টের ইজ্জত থাকবে না।”

— “ছুঁড়ে ফেলুন আপনার ইজ্জত আর লোক দেখানো নিয়ম!”– তারীন রুমালটা এক ধাক্কায় সরিয়ে দিল।

ঠিক তখনই জানালার বাইরে গগন কাঁপিয়ে বিজলির গর্জন কেঁপে উঠল। ঝুমঝুম শব্দে শ্রাবণের প্রবল বৃষ্টি নেমে এলো ঢাকা কলেজের পুরো ক্যাম্পাসে। খোলা জানালার রেশমি পর্দা বাতাসে ডানা ঝাপটাতে শুরু করল। আযরাফ জানালার দিকে একপলক তাকিয়ে আবার তারীনের খুব কাছে এগিয়ে এলো। সে পরম যত্নে ও ভালোবাসায় তারীনের অভিমানী হাতটা নিজের শক্ত, উষ্ণ হাতের মুঠোয় পুরে নিল। নিচু কণ্ঠে বিড়বিড় করে বলল,

— “বাইরে বৃষ্টি নেমেছে, তারীন। আর আমরা দুজন এক ছাদের নিচে দাঁড়িয়ে আছি। এই ভেজা দিনে আর কত রাগ ধরে রাখবে? এসো, সব অভিমান বৃষ্টিতে ভাসিয়ে দিই।”

তারীন হাতটা ছাড়িয়ে নিতে চেয়েছিল, কিন্তু প্রফেসরের ওই গভীর চোখের মায়াবী দৃষ্টি আর হাতের নিবিড় উষ্ণতায় তার দীর্ঘদিনের জমে থাকা অভিমান নিমেষেই মোমের মতো গলে গেল। সে ফিসফিস করে কাঁপানো গলায় বলল,

— “আপনি আসলেই খুব খারাপ আর ত্যাড়া একটা মানুষ, প্রফেসর।”

আযরাফ ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি নিয়ে উত্তর দিল,

— “জানি। তবে এই খারাপ মানুষটার সমস্ত পৃথিবী কিন্তু ওই সুতির ইউনিফর্ম পরা অবাধ্য মেয়েটার ভেতরেই আটকে আছে।”

আযরাফ আর এক মুহূর্তও তৈরি করল না। তারীনের হাতটা শক্ত করে ধরে সে করিডোর পেরিয়ে পেছনের সিঁড়ি দিয়ে নিজের গাড়ির দিকে হেঁটে গেল। বাইরের বৃষ্টি তখন মুষলধারে রূপ নিয়েছে। ঢাকা কলেজের সবুজ মাঠ আর গাছপালা ঝাপসা হয়ে উঠেছে বৃষ্টিধারায়। গাড়ির লক খুলে আযরাফ তারীনকে একপ্রকার আলতো ধাক্কা দিয়ে প্যাসেঞ্জার সিটে বসিয়ে দিল। নিজে গিয়ে ড্রাইভারে বসে ব্লেজারটা খুলে পেছনের সিটে ছুঁড়ে ফেলল।

গাড়ি স্টার্ট দিতেই তারীন ভ্রূ কুঁচকে বলল,

— “কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমাকে?”

আযরাফ স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে ধীর ও শান্ত কণ্ঠে বলল,

— “যেখানে গিয়ে তোমার সব রাগ, অভিমান আর অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে জমা নেবে এই ত্যাড়া প্রফেসর, সেখানে।”

— “আমার ক্লাস আছে! ইন্টারের টেস্ট পরীক্ষা সামনে, আপনি ভুলে গেছেন?”

আযরাফ এক নজর তারীনের দিকে তাকাল। বৃষ্টিতে ভিজেই হোক কিংবা রাগে, মেয়েটার দুগাল লাল হয়ে আছে। আযরাফ হালকা হেসে বলল,

— “আজকের ক্লাসটা তোমার এই প্রফেসর নিজ দায়িত্বে স্থগিত করল। আজ তোমার একমাত্র পড়াশোনা হলো নিজের স্বামীকে একটু সহ্য করা।”

গাড়ি চলতে শুরু করল শহরের পিচঢালা রাস্তায়। বৃষ্টির পানিতে রাস্তাঘাট ডুবুডুবু। গাড়ির মিউজিক সিস্টেমে আযরাফ আলতো করে একটা সুইচে চাপ দিল। ভেসে এলো চেনা রবীন্দ্রসংগীতর,‘শ্রাবণের গগনের তায়।’

তারীন জানালার কাঁচে মাথা ঠেকিয়ে বসে রইল। ক্ষোভটা পুরোপুরি মেলেনি, কিন্তু আযরাফের এই কাছে থাকার ব্যাকুলতা তাকে কেমন যেন আচ্ছন্ন করে দিচ্ছে। সে আস্তে করে বলল,

— “ফোনটা কেন বন্ধ রাখতেন?”

আযরাফ গাড়ির এসি কিছুটা কমিয়ে দিয়ে বলল,

— “কারণ তোমার বাবা যখন তোমাকে নিজের বাড়ি নিয়ে গেলেন, তখন আমি চাইনি তুমি আমার উপস্থিতির অভ্যাসে বন্দি থাকো। আমি চেয়েছিলাম তুমি স্বাধীনভাবে নিজের মনকে প্রশ্ন করো। প্রতিদিন রাত ১টায় মেসেজ পাঠাতাম এটা মনে করিয়ে দিতে যেখানই থাকো, এই চৌধুরী সাহেবের নজর তোমার ওপর সবসময় আছে।”

তারীন চোখ ঘুরিয়ে আযরাফের দিকে তাকাল। লোকটার কথাগুলোতে কী অদ্ভুত এক সম্মোহন! সে কিছু বলতে পারল না, শুধু ওড়নার আঁচলটা আঙুলে পেঁচাতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর গাড়িটা ধানমন্ডির এক নিরিবিলি ক্যাফের সামনে এসে থামল। কাঁচের দেয়ালঘেরা ক্যাফেনায় বৃষ্টির দৃশ্য স্পষ্ট দেখা যায়। আযরাফ নেমে ছাতা মেলে ধরে তারীনের পাশের দরজা খুলে দিল।

——-

ক্যাফের ভেতরের এক নিরিবিলি কোণে দুজনে বসল। ধোঁয়া ওঠা দুটি কফি আর সিঙ্গারার অর্ডার দিয়ে আযরাফ তারীনের দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল।
— “এমন করে কী দেখছেন?” – তারীন মুখ ঘুরিয়ে শুধাল।

— “দেখছি, ইন্টারের স্টুডেন্টদের ইউনিফর্মে আমার শ্রাবণকন্যাকে কতটা মানায়। আর কতটা রাগ জমে থাকলে একটা মেয়ে ঝড়-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে প্রফেসরের ওপর চড়াও হতে পারে।”

তারীন কফির কাপে চুমুক দিয়ে বলল,

— “আপনি একদম একটা যন্ত্রনমানব। মানুষ ভালোবাসলে দিনে অন্তত একবার ফোন করে।”

আযরাফ ঝুঁকে এলো টেবিলের ওপর। খুব নিচু স্বরে বলল,

— “রোবটরা কি মাঝরাতে উঠে তোমার জন্য প্রার্থনা করে, তারীন? রোবটরা কি বাসের ভিড়ে তোমার কষ্ট হবে ভেবে দূরে থেকে ছায়ার মতো নজর রাখে?”
তারীন চমকে তাকিয়ে বলল,

— ” তার মানে? আপনি জানতেন আমি বাসে এসেছি?”

— “তুমি যাতে নিরাপদে পৌঁছাতে পারো, সে খেয়াল রাখার দায়িত্ব তো আমারই।”

কথাটা শুনে তারীনের বুকের ভেতরটা তোলপাড় করে উঠল। চোখের কোণে আবার জল জমে এলো। এই লোকটা ভালোবাসাকে ডোল পিটিয়ে জাহির করে না, বরং শান্ত নদীর মতো বয়ে নিয়ে চলে নিঃশব্দে।

তারীন কফির কাপটা দুহাতে শক্ত করে ধরে নিচু গলায় বলল,

— “আমি আর বাপের বাড়ি থাকব না। আমি চৌধুরী ভিটায় ফেরত যাব।”

আযরাফ মৃদু হাসল। প্রফেসরের চোখে তখন এক অপরূপ জয়ের দীপ্তি। সে ধীরস্বরে বলল,

— “খাঁচার পাখি তাহলে খাঁচায় ফিরতেই চায়? বেশ, তবে আজকেই তোমাকে নিয়ে যাব। তবে একটা শর্তে।”

— “কী শর্ত?”

— “আর কখনো এই ত্যাড়া প্রফেসরকে ছেড়ে দূরে যাওয়ার কথা বলা যাবে না।”

তারীন ঠোঁট চেপে হেসে মাথা নাড়ল। জানালার বাইরে তখনো শ্রাবণের অবাধ্য বৃষ্টি ঝরে পড়ছে, আর ক্যাফের ভেতর দুটো হৃদয় শেষমেশ খুঁজে পেয়েছে তাদের নিজস্ব ঠিকানা।

চলবে,,