#চিরদিনই_তুমি_যে_আমার
#নূরা_ফাতেহা
||০৭||
—”ম্যাম! আইসক্রিম খাবেন?”— আযরাফের কাঠখোট্টা কন্ঠ শুনে ঘাড় বাকি চাইলো তারীন। অতঃপর ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,
—”আজ এতো সমাদার করচ্ছেন কেনো?”
—”কি করবো? বউ আমার লাঙের আশা করে ভাতারের ভাত চাঙে উঠাতাছে তাই একটু সমাদার করচ্ছি।”
—”আপনি আমাকে খোঁচা মারচ্ছেন? আপনি না একজন প্রফেসর এই আপনার সহবোধ। ছিঃ! এমা গো।”
—”আমি কি ভুল বলেছি মিসেস আযরাফ তারীন?”
—”না আপনি কি ভুল বলতে পারেন? আপনি হচ্ছেন টিচার মানুষ!”
আযরাফ হাসলো। হেসে তারীনের হাত টা নিজের হাতের মুঠোয় পুরল। বউটা তার ক্ষেপা বাঘিনী হয়ে আছে যেইকোনো সময় এক থাবা বসিয়ে দিতে পারে তার মন্ডুতে। পৃথিবীর সব পুরুষেরাই তার বউ এর কাছে বেজা বিড়াল। এইটা যেনো আরো একবার প্রমান করলো আযরাফ। ওরা দুজন হাঁটছে। সামনে একটা আইসক্রিমের ভ্যান। আকাশের অবস্থা ভালো না৷ যেই কোনো মূহুর্তে গগন কাঁপিয়ে বৃষ্টি নামতে পারে তার সম্ভব না শতভাগ।
দুইজন এসে থামল আইসক্রিমের এর কাছে। তারপর আইসক্রিম ওয়ালাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
—”দুটো ম্যাংগো ফ্লেভারের আইসক্রিম দেও আমার বউরাগীনির জন্য।”
—”কি বললেন?”
—”কই কিছু না তো! আজ কাল কি তুমি ভুলবাল শুনতে পাও তারীন?”
—”আপনি আসলেই একটা ইতর।”
—”অসংখ্য ধন্যবাদ তোমার মূল্যবান মন্তব্যের জন্য।”
আইসক্রিম ওয়ালা দুটো ম্যাংগো ফ্লেভারের আইসক্রিম ওদের দুজনার হাতে ধরিয়ে দিলো। আযরাফ পকেট থেকে টাকা বের করে আইসক্রিম ওয়ালাকে দিয়ে তারীনকে নিয়ে বসল বেঞ্চে। তারপর বলল,
—” “নেও! বউ, আইসক্রিম খাও। তোমার হট মাথাটা একটু কুল করো তো দেখি!”
তারীন তাকিয়ে আছে। রাগে অগ্নিশর্মা। চোখ দুটো কটমট করছে। মনে হচ্ছে পারলে এখনই মানুষটাকে খেয়ে ফেলে।
আযরাফ এই দৃষ্টির সামনে একটা মেকি হাসি দিল। হাসিটা দেখে তারীনের রাগ আরও বাড়ল। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। আযরাফের ঘাড় ছুঁইছুঁই চুলগুলো মুঠো করে ধরে দিলো এক টান।
আযরাফ মৃদু চিৎকার করে উঠল।
সে চেয়েছিল বউয়ের রাগটা একটু কমুক। কিন্তু রাগ কমানোর পদ্ধতি যে এত ভয়ংকর হবে, তা তার ধারণার বাইরে ছিল। মেয়েটার মনে অনেক দিনের একটা যন্ত্রণা। প্রাক্তনের সাথে যোগাযোগ করতে পারেনি। তার উপর আযরাফের এই খোঁচা। সব মিলিয়ে সে আর ঠিক থাকতে পারেনি।
—” “বেবি, ও বেবি ব্যথা পাচ্ছি তো, ছাড়ো না।”
—”আরেকটু ধরে রাখি। মনের ভিতর শান্তি লাগছে খুব।”
— “দূর বা’ল, ছাড় বলছি চুল। নয়তো আমিও তোর চুলগুলো টেনে ছিঁড়ে ফেলব। তখন সবাই তোকে ন্যাড়া বউ বলে ডাকবে। ভালো লাগবে তো?”
কথাটা কানে যেতেই তারীন তড়াক করে ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে বসল।
ততক্ষণে আইসক্রিম গলে গেছে। প্যাকেট থেকে টুপটুপ করে পানি পড়ছে। আযরাফের চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে। সে এক হাতে চুলগুলো ঠিক করে আইসক্রিমের প্যাকেট খুলে মুখে পুরল। তারীনের দিকে তাকাল। তারীনও সবে আইসক্রিমটা মুখে দিয়েছে।
আযরাফ বলল,
— “কত কেজি ভাত খাও? শরীরে এত শক্তি?”
—”পুরো এক গামলা তাতে আপনার কি?”
—”বটে!”
তারীন আর কোনো উত্তর দিলো না। এর অর্থ তার রাগটা কমেছে। যন্ত্রণাটা একটু হলেও লাঘব হয়েছে।
দুজনের কেউ আর কোনো শব্দ করল না। দুজনেই আকাশের দিকে তাকিয়ে আইসক্রিম খাচ্ছে। একটু পরেই আসরের আজান দেবে। অথচ আকাশ দেখে মনে হচ্ছে মাগরিবের সন্ধ্যা। আকাশও বোধহয় মানুষের মতো মুড সুইং করে। তার বউয়ের মতো।
ওরা বসে আছে নদীর ধারে একটা বেঞ্চে। মাঝিরা নৌকা দিয়ে মানুষ পারাপার করছে। চারদিকটা বেশ শান্ত।
শুধু অশান্ত হয়ে আছে দুটি মন।
এই মন দুটি কবে শান্ত হবে, তা কেউ জানে না। কেউ প্রিয় মানুষকে পেয়েও সুখী হতে পারছে না। আর কেউ একতরফা একটা জিনিস আঁকড়ে ধরে আছে। রাস্তাটা বড্ড জটিল।
তবে আযরাফ মনে মনে ঠিক করে ফেলেছে। খুব শীঘ্রই সে এর একটা সমাধান বের করবে। এমন কিছু করবে, যাতে তারীন ওই ছেলেটার নাম-নিশানাও ভুলে যায়। মনে রাখে শুধু আযরাফকে।
ভালোবাসা কখনো কখনো ন্যায়-অন্যায়ের হিসেব ভুলে যায়।
———————–
রোকসানা চৌধুরী আর আশরাফ চৌধুরী বসে আছেন তারীনের বাবা-মা’র সাথে। এক মাত্র মেয়েকে জোড় করে বিয়ে দিয়ে ওনারা তীব্র মনোকষ্টে ভুগছেন। জীবন হচ্ছে খেয়া স্রোতের মতো। কখনো কোন দিকে ধাবিত হবে কেউ বুঝতে পারে না। সবই তো আল্লাহ্ ইচ্ছে। আল্লাহ্ প্রতিটা মানুষকে জোড়া জোড়া পাঠান এই ধরনীর বুকে। শুধু মানুষই অধৈর্য ন্যয় মানুষ নিজের সঙ্গী খুঁজে বেড়ায় পাগলের মতো করে। হয়তো আযরাফের বুকের বাঁ পাজর দিয়েই তৈরি হয়েছে, তারীন। তাই তারীন দিন শেষ আযরাফের ঘরের ঘরণী।
তারীনের মা রেবেকা বানু ওনাদের সামনে চা নাস্তা দিলেন। তরীনে বাবা মোশারফ হোসেন বলেন,
—”ভাই সাহেব আমার মেয়েটা ভালো আছে তো?”
—”দেখুন মোশারফ ভাই, সত্যি কথা বলতে ওর মনের গহীনে যেই ঘা তৈরি হয়েছে তা সারতে, সময় লাগবে। আযরাফ আপ্রাণ চেষ্টা করচ্ছে ক্ষত সারিয়ে তুলতে। এক ধৈর্য ধরুন সব ঠিক হবে। সময় সব ক্ষত সারিয়ে তুলে।”
মোশারফ হোসেন একটা তপ্ত শ্বাস নিলেন। ওনারা বড়ই চিন্তিত মেয়ে নিয়ে মেয়েটা তার অবুঝ। ভালো-মন্দ বুঝার জ্ঞানটুকু তার হয়নি শুধু হাতে পায়েই বড় হয়েছে। রেবেকা বানু এইবার মুখ খুলে বললেন,
—”ওদের নিয়ে আসলেন না একনজর দেখার জন্য।”
—”ওরা আপাতত ঢাকার বাইরে ঘুরতে গেছে। ফিরলেই পাঠাবো আপনাদের কাছে।”
—”তা বেশ ভালো করেছেন, ঘুরলে ও মন ভালো লাগবে।” — মোশারফ হোসেন বলেছেন।
আশরাফ চৌধুরী আর রোকসানা চৌধুরী, চায়ের কাপ হাতে নিয়ে চুমুক বসালেন। ইতিমধ্যে বৃষ্টি শুরু হলো বজ্রপাতের শব্দ কেঁপে উঠছে গগন আর সাথে কাঁপছে ধারিত্রী। তিনি মনে মনে প্রার্থনা করলে স্বয়ং আল্লাহ্ কাছে এই বৃষ্টির পানিতে যেনো তারীনের মনের ক্ষত ধুয়ে মুছে সাফ হয়। ওনারা চা খাওয়া শেষ করে কাপটা টেবিলের উপরে রেখে বললেন,
—”আজ আমরা আসছি তাহলে। কোনো প্রয়োজন হলে অবশ্য করল করবেন কোনো দ্বিধা রাখবেন না!”
রেবেকা বানু বলে উঠলেন,
—”সে কি এখনি চলে যাবেন বৃষ্টি পড়ছে। একটু থাকুন অন্তত ডিনারটা করে যান।
— “না! গাড়ি নিয়ে এসেছি সমস্যা নেই। আর রোকসানার মেয়েও বাড়িতে একা। তাই যেতে হবে অন্য কোনো দিন খাবখন। এখন তো বাড়িতে প্রায়ই আসা যাওয়া লেগে থাকবে।”
ওনারা আর আঁটকালেন না। স্বনান্দে যেতে দিলেন ওনাদের। ওনারা চলে যাওয়ার পর ঘরটা কেমন খাঁ-খাঁ করচ্ছে তপ্ত মরুভূমির মতো। মেয়েদের জীবন এমন কে? ছোটো থেকে আদরে বড় করার পর, অন্য বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে হয় ঘর সংসার করার জন্য। আল্লাহ্ এ নীতি কেনো করলেন? মেয়ে বিহীন ঘর যেনো কেমন কবরের ন্যয় অন্ধকার। অথচ মেয়েটা ওনার অন্য ঘরে আলো দিয়ে বেড়াছে।
তপ্ত শ্বাস ফেললেন রেবেকা বানু। মোশারফ হোসেন ওনার কাঁধে হাত রাখতেই ওনি চোখের জল মুছে নিলেন। মেয়ের বাবা-মাদের এতো নরম হলে চলে না শক্ত হতে হয় ঠিক পাথরের মতো। তবুও মায়ের মন তা মানে না। পুরুষ মানুষরা নিকোটিনের ধোঁয়া উড়িয়ে মনের কষ্ট রাঘব করে কিন্তু মেয়ে মানুষ কি করে করে তাদের কষ্ট রাখব করবে তার ব্যাখ্যা নেই কোথাও।
————————————-
বৃষ্টিতে বসে আছে দুটো মানব-মানবী তারা আর কেউ নয় আযরাফ আর তারীন। দু’জনের বসার মধ্যে দূরত্ব আছে বেশ বিস্তর। এতো কাছে থেকে ও যেনো দুইজন যোজন যোজন দূরে। বেঞ্চে গা’টা সম্পূর্ন হেলিয়ে বসে আছে আযরাফ। নিরবতা হচ্ছে সবচেয়ে বড় কথা। কে কি বলবে তা বুঝে উঠতে পারচ্ছে না দুই জনের কেউই।
অবশেষে ভাঙল নিরবতা!
সবার আগে মুখ খুলল আযরাফ। ভার ভার কন্ঠে বলে উঠল,
—”পাখি আমার হিংসে হচ্ছে!”
আযরাফের ভার কন্ঠ কানে প্রবেশ করতে, দৃষ্টি দিলো আযরাফের প্রতি তারীন৷ সে বিষন্ন কন্ঠে বলল,
—”কেনো?”
—”কারন তোমার এতো কাছে থেকেও আমি তোমাকে স্পর্শ করতে পারচ্ছি না । অথচ বৃষ্টির পানিগুলো কত অনায়াসে তোমায় ছুঁয়ে দিয়ে যাচ্ছে, মাই লাভ বার্ড।”
বৃষ্টি আরেকটু বাড়ল। তারীনের ওড়না ভিজে গায়ের সাথে লেগে গেছে। আযরাফ তাকিয়ে আছে, কিন্তু চোখ সরিয়ে নিল।
তারীন কাঁপা গলায় বলল,
— “আপনি এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?”
আযরাফ হাসল। বৃষ্টির মধ্যে তার হাসিটা অদ্ভুত সুন্দর লাগল। তারপর নিরট কন্ঠে বলল,
— “তোমাকে দেখছি। তুমি বৃষ্টিতে ভিজলে তোমাকে অন্যরকম লাগে। মনে হয়, তোমাকে আগে কখনো দেখিনি।”
— “আপনি সবসময় এমন অদ্ভুত কথা বলেন কেন?”
— “কারণ তুমি অদ্ভুত। অদ্ভুত মানুষদের জন্য অদ্ভুত কথা বলতে হয়।”
তারীন চুপ করে গেল। দুজনের মাঝখানে আবার নিরবতা ফিরে এলো।
কিছুক্ষণ পর আযরাফ পকেট থেকে একটা সাদা রুমাল বের করল। তারীনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
— “নাও, মাথাটা মোছো। ঠান্ডা লেগে যাবে তোমার।”
তারীন রুমালটা নিল না। বরং বলে উঠল,
— “লাগবে না। আমার বৃষ্টিতে ভিজতে ভালো লাগে।”
— “জানি। তোমার সব উল্টাপাল্টা জিনিসই ভালো লাগে।”
— “যেমন?”
— “যেমন আমাকে ভালো লাগে না।”
তারীন এবার আযরাফের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলে উঠল,
— “আপনি কি আমাকে খোঁচা না দিয়ে থাকতে পারেন না?”
আযরাফ রুমালটা তারীনের মাথার উপর আলতো করে ছুঁড়ে দিয়ে বলল,
— “পারি না। তোমাকে খোঁচা না দিলে তুমি আমার সাথে কথাই বলো না। চুপচাপ থাকাই তো তোমার রোগ।”
তারীন রুমালটা মাথা থেকে নামাল না। ভেজা রুমালটা মাথায় নিয়েই বসে রইল। আযরাফের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
— “আপনি জানেন, আপনি খুব খারাপ একটা মানুষ?”
আযরাফ মাথা নাড়িয়ে বলল,
— “জানি তো। কিন্তু খারাপ মানুষটাই তোমার পাশে বসে বৃষ্টিতে ভিজছে। ভালো মানুষটা তো খোঁজও নিল না।”
তারীনের ঠোঁট কাঁপতে লাগল। সে আর কিছু বলতে পারল না। শুধু বৃষ্টির শব্দে তার কান্নাটা মিশে গেল। কোন এক নামি লেখক বলেছিলো,
“ভালোবাসার জন্য অনন্তকালের প্রয়োজন নেই, একটি মুহূর্তই যথেষ্ট।” আজ বোধহয় আযরাফ এর জন্য সেই মুহূর্ত।
চলবে,

