Home "ধারাবাহিক গল্প "চিরদিনই তুমি যে আমার চিরদিনই তুমি যে আমার পর্ব-০৮

চিরদিনই তুমি যে আমার পর্ব-০৮

0
11

#চিরদিনই_তুমি_যে_আমার
#নূরা_ফাতেহা
||০৮||

আযরাফ আর বসে থাকলো না। এই বৃষ্টিতে অতিরিক্ত ভিজলে হিতে বিপরীত বাঁধবে। এমনিতেই দুইদিন হলো মেয়েটা ঘোর জ্বর থেকে উঠেছে। এখনো ওতোটা স্ট্রং হয়নি ও! আযরাফ তপ্ত শ্বাস ফেল গম্ভীর কন্ঠে বলল ,

—”চলো?”

—”কোথায়?”

—”কটেজ এ।”

—”না! আরেকটু থাকি ভালো লাগছে খুব।”

—”সরি! মিসেস চৌধুরী এই মূহুর্তে আপনার কোনো ওজর-আপত্তি আমি শুনবো না।”

—”আপনি জঘন্য।”

—”জানি আমি। তবুও আমার সাথে কবর অব্দি যেতে হবে তোমায়! আমার বাচ্চার মা হতে হবে, আমার সাথে সংসার করতে হবে কত কাজ তোমার। আর এখনি যদি শক্তি হারিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ো তাহলে চলবে!”

কথা বলেই দআযরাফ আর এক সেকেন্ডও দেরি করল না। তারীন কিছু বুঝে ওঠার আগেই হঠাৎ তার কোমরে আর হাঁটুর নিচে হাত দিয়ে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল।

তারীন চমকে উঠল। অতঃপর সে চিল-চিৎকার করে বলে উঠল,

— “আরে! কী করছেন আপনি! নামান বলছি! এখুনি নামান আমাকে!”

আযরাফ তার চিৎকারে কান দিল না। ভেজা বেঞ্চের সামনে দিয়ে বৃষ্টির মধ্যে হাঁটা শুরু করল কটেজের দিকে।

তারীন তার বুকে কিল দিতে লাগিয়ে, হাত-পা ছুঁড়ে বলতে লাগল,

— “আপনি অসভ্য! আপনি ইতর! নামান!”

আযরাফ তারীনের ভেজা মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,

— “চুপ। একদম চুপ। তুমি যত নড়াচড়া করবে, তত বেশি ভিজবে। আর আমি তত শক্ত করে ধরব, মাই লাভ বার্ড।”

তারীন এবার আর নড়ল না। আযরাফের শার্টটা খামচে ধরে তার বুকে মুখ লুকাল। বৃষ্টি তখনো পড়ছে। দুজনের গায়ে।
কটেজটা খুব দূরে না। তবুও আযরাফের মনে হলো, এই রাস্তাটা যদি কখনো শেষ না হতো, তবে মন্দ হতো না।

কটেজে ফিরে আযরাফ তারীনকে নামিয়ে দিলো। তারীন তখনো রেগে আছে। ভেজা চুল থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে। ওড়নাটা নিংড়াচ্ছে। আযরাফের দিকে একবারও তাকাচ্ছে না।

আযরাফ একটা তোয়ালে এনে তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

— “নাও, মাথা মোছো।”

তারীন তোয়ালেটা নিল না। বরং শক্ত গলায় বলল,

— “লাগবে না আমার। আপনি সরুন সামনে থেকে।”

— “আচ্ছা, সরলাম না। তুমি জ্বরে আবার পড়লে তখন কী হবে?”

— “আমি মরে গেলে আপনার কী? আপনি তো খুশিই হবেন।”

আযরাফ অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর খুব আস্তে বলল,

— “আমার কী হবে, সেটা যদি তুমি বুঝতে, পাখি, তাহলে এভাবে বলতে পারতে না।”

তারীনের বুকটা কেমন করে উঠল। সে আর কিছু বলল না। আযরাফ নিজেই এগিয়ে এসে তার মাথায় তোয়ালেটা দিয়ে আলতো করে মুছতে লাগল।

তারীন কেঁপে উঠে বলল,

— “আপনি কী করছেন?”

— “চুল মুছে দিচ্ছি। তোমার হাত ঠান্ডা হয়ে আছে।”

— “আমি নিজে পারব।”

— “পারো। জানি তুমি সব নিজে পারো। কারো সাহায্য তোমার লাগে না। কিন্তু আজ একটু আমার সাহায্য নাও।”

তারীন আর বাধা দিল না। আযরাফ খুব যত্ন করে তার ভেজা চুলগুলো মুছে দিচ্ছে। তারীনের চোখ আবার ভিজে উঠছে। এবার বৃষ্টির পানিতে না, অন্য কিছুর জন্য।

হঠাৎ তারীন ফিসফিস করে বলল,

— “আপনি আমাকে এত ভালোবাসেন কেন?”

আযরাফের হাত থেমে গেল। সে তারীনের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,

— “জানি না। ভালোবাসার কারণ হয় না, পাখি। কারণ থাকলে সেটা ভালোবাসা না। ওটা হিসাব।”

বাইরে বৃষ্টি তখনো পড়ছে। টিনের চালে ঝমঝম শব্দ করে। আর ভেতরে দুটো মানুষ। একজন মুছে দিচ্ছে, আরেকজন চুপচাপ ভিজে যাচ্ছে অন্য এক বৃষ্টিতে।

——————-

ড্রেস চেঞ্জ করে বেলকনিতে বসে দুজন। কাছে থেকেও দূরত্ব এইটা বড্ড অসহ্যনীয় না পারচ্ছে তার বউকে গভীর ভাবে ছুঁয়ে দিতে, না পারচ্ছে কিছু করতে! এই যেনো তার চরম ধর্মসংকট। এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে তার কি করা উচিৎ তা যেনো সে নিজেও ঠাহর করতে পারচ্ছে না। দীর্ঘ এক শ্বাস নিলো সে।

অতঃপর আযরাফ কেয়ারটেকার ছেলেটাকে ডাকল।

— “এদিকে শোনো। একটা কফি। আর এক গ্লাস গর, দুধ।”

—”আমি দুধ খাব না।”

— “তুমি তো কিছুই খাবে না। এটাই তো সমস্যা।”

— “আপনি আমার জন্য অর্ডার করবেন না।”

আযরাফ হেসে উত্তর করল,

— “তুমি আমার বউ। তোমার জন্য অর্ডার করব না তো কার জন্য করব?”

তারীন চুপ হয়ে গেল। ‘বউ’ শব্দটা শুনলে তার কেমন যেন লাগে। বউ, অথচ বউ না।

একটু পরেই দুধ আর কফি এলো। ধোঁয়া উঠছে। আযরাফ কফিটা নিল। তারীন দুধের গ্লাসটা হাতে নিয়ে বসে রইল জানালার পাশে। খাচ্ছে না।

আযরাফ বলল,

—”খাও। ঠান্ডা হয়ে যাবে।”

তারীন আস্তে করে বলল,

—”আপনি জানেন, আমি দুধ পছন্দ করি না।”

— “জানি। তুমি অনেক কিছুই পছন্দ করো না। আমাকে যেমন পছন্দ করো না। তবুও তো আমি আছি। দুধটাও থাক।”

তারীন এবার রেগে তাকিয়ে বলল,

— “আপনি সবকিছুর সাথে নিজেকে টানেন কেন?”

আযরাফ কফিতে চুমুক দিল। তারপর বলল,

— “কারণ আমার সবকিছু তোমাকে ঘিরেই। তুমি দুধ না খেলে আমার মনে হয়, আমার সংসারটা ঠিকঠাক হচ্ছে না।”

—”আমাদের সংসারটা কি আদৌও ঠিক মতো চলছে,বলে আপনার মনে হয়?”

—”চলছে তো। এখন এতো বেশি কথা না বলে চুপচাপ বসে থাকো তো তোমার আমার বৃষ্টি বিলাস পূর্ণ এক সন্ধ্যা হোক।”

—”আপনাকে আমি ঠিক বুঝতে পারিনা। আপনি এতো রহস্য ময় কেনো?”

—”কারণ তুমি আমাকে সম্পূর্ণ পড়তে পারোনি তাই। যেই দিন পড়তে পারবে সেইদিন আমি নামক বইটা তোমার জন্য বড্ড সহজ হবে।”

তারীন এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো তার পানে। আযরাফের চোখে কী আছে, সে বুঝতে পারে না। এই লোকটাকে সে আজও পড়তে পারেনি। একেক সময় মনে হয় খুব সহজ, আবার একেক সময় মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল অঙ্ক। বৃষ্টি একটু ধরেছে। বেলকনির গ্রিল বেয়ে পানি পড়ছে টুপটাপ।

আযরাফ কফির কাপে চুমুক দিল। কফিটা ঠান্ডা হয়ে গেছে।

তারীন বলল,

— “একটা কথা জিজ্ঞেস করি?”

— “করো।”

— “আপনি আমাকে ‘পাখি’ বলেন কেন?”

আযরাফ তাকাল। তারপর হাসল। খুব অল্প হাসি, তারপর বলল,

— “কারণ তুমি আমার খাঁচার পাখি। খাঁচায় আছো, অথচ উড়তে চাও। আমি দরজা খুলেই তুমি উড়ে যাবে। কারন বাইরে ভীষণ ঝড়। আর আমি চাই না সেই ঝড়ের কবল তুমি পড়ো। নেও দ্রুত দুধ টুকু খাও।”

তারীন নাক মুখ কুঁচকে এক নিঃশ্বাসে দুধটুকু খেয়ে নিলো। অতঃপর গ্লাসটা রেখে শুধালো

—”আমি যদি হারিয়ে যাই, তাতে আপনার কী?”

আযরাফ এবার তার চেয়ারটা টেনে তারীনের একদম কাছে নিয়ে এলো। এত কাছে যে তারীনের নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যায়।

তারীন পেছাতে চাইল। কিন্তু পারল না। আযরাফ ফিসফিস করে বলল,

— “তুমি হারিয়ে গেলে আমি নিজেকে ধ্বংসের অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করবো। নিজেকে বিলীন করে তোমায় খুঁজে বের করবো। সব কিছু ওতো সহজ নয় সুইটহার্ট!”

—”আপনি আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন?”

— “না। ভালোবাসছি।”

কথাটা বলেই আযরাফ তারীনের কপালে হাত রাখল। দেখল, জ্বর আছে কি না? কপালটা গরম। আযরাফের ভ্রু কুঁচকে বলল,

—”তোমার গা গরম। ভেতরে চলো। তোমার এখন ঘুমানো দরকার।”

— “আর আপনি?”

— “আমি বসে থাকি। তোমার ঘুম পাহারা দেই। এটাই তো আমার কাজ। আমার বাচ্চার মা’র ঘুম পাহারা দেওয়া।”

তারীন চোখ খুলল। অবাক হয়ে বলল,

— “বাচ্চার মা?”

আযরাফ উঠে দাঁড়াল। তারীনের হাত ধরে টান দিয়ে বলল,

— “হ্যাঁ। আমার বাচ্চার মা। যে এখনো আমার বাচ্চা হয়ে বসে আছে। চলো।”

তারীন উঠল না। বসেই রইল। আযরাফ ঝুঁকে এলো। আবার সেই আগের মতো। এক হাত কোমরে, আরেক হাত হাঁটুর নিচে।

তারীন মৃদু আর্তনাদ করে বলে উঠল,

— “আবার?”

— “হ্যাঁ। আবার। যতবার তুমি কথা শুনবে না, ততবার।”

বলেই কোলে তুলে নিল। তারীন এবার বাধা দিল না। আযরাফের বুকে মাথা রাখল। বিড়বিড় করে বলল,

— “আপনি সত্যিই জঘন্য।”

আযরাফ দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলল,

— “জানি। কিন্তু এই জঘন্য লোকটাই তোমার স্বামী।”

ঘরের ভেতরটা অন্ধকার। আযরাফ তারীনকে এনে বিছানায় শুইয়ে দিল। খুব সাবধানে, যেন ভেঙে যাবে।তারীন শুয়ে আছে। চোখ বন্ধ। নীল শাড়িটা এলোমেলো হয়ে আছে। আযরাফ পাশে বসে ফ্যানের স্পিড কমিয়ে দিয়ে তারপর শুধালো,

— “ঠান্ডা লাগছে?”

— “না।”

—”মিথ্যা বলছ।”

তারীন চোখ খুলে ফট করে বলল,

— “আপনি কী করে বোঝেন আমি মিথ্যা বলছি?”

— “কারণ তুমি যখন মিথ্যা বলো, তখন তোমার নাকটা একটু কাঁপে।”

তারীন অবাক হয়ে নাকে হাত দিয়ে ঘোর প্রতিবাদ করে বলল,

— “কই? কাঁপে না তো।”

আযরাফ হেসে ফেলল। অতঃপর তার হাতটা বাড়িয়ে আলতো করে নাক ছুঁয়ে বলল,

— “এই যে এখন কাঁপল।”

তারীন রেগে গিয়ে অন্য দিকে ফিরে শুলো। আযরাফ একটা পাতলা কাঁথা এনে তার গায়ে দিয়ে মাথায় হাত বুলাতে লাগল। আর গুনগুন করে গান করতে লাগল।

❝ভালোবাসা তোমার ঘরে বৃষ্টি হয়ে নেমে আসুক,
ইচ্ছেগুলো তোমার ইচ্ছেগুলো জ্যান্ত হয়ে বুকের ভেতর তুমুল নাচুক।
ভালোবাসা তোমার ঘরে বৃষ্টি হয়ে নেমে আসুক।
চোখের কোণে যত্ন করে জমিয়ে রাখা স্বপ্নগুলো
নতুন করে বেঁচে উঠুক,দু’চোখ ভরে দেখবে তখন আকাশ তোমার বাড়ছে কেমন।
সেই আকাশেই জন্ম নেয়ার, সূর্যটার আলো দেয়ার ইচ্ছে তোমার বুকের জমিন তীব্রভাবে স্পর্শ করুক
ভালোবাসা তোমার ঘরে বৃষ্টি হয়ে নেমে আসুক।❞

চলবে,,