Home "ধারাবাহিক গল্প "Out Of Bounds Out Of Bounds পর্ব-২৩+২৪

Out Of Bounds পর্ব-২৩+২৪

0
7

#Out_Of_Bounds
#part_23
#ishrat_jahan_jarin

বোস্টনের আকাশে মেঘগুলো গত তিন দিন ধরে ভারী হয়ে জমে আছে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতেই সেই মেঘ নেমে এলো হিমশীতল বৃষ্টি হয়ে। সাউথ বোস্টনের কলোনি রোডের পুরোনো তিনতলা ইটের বিল্ডিংটার কাঁচের জানালায় বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা এক নাগাড়ে আছড়ে পড়ছে। মিউনিখ থেকে ফিরে আসার পর এই প্রথম জ্যাক আর ক্লারা নিজেদের সেই সাউথ বোস্টনের ছোট সিঙ্গেল বেডের ডর্ম রুমটায় এসে উঠেছে।

ঘরটা খুবই ছোট। মাঝখানে একখানা সাধারণ স্প্রিংয়ের সিঙ্গেল খাট, কোণায় একটা কাঠের পুরোনো পড়ার টেবিল, আর দেয়ালের সাথে একটা ছোট স্টিলের আলমারি। পেন্টহাউসের শত কোটি টাকার শানশওকত বা রাজকীয় ঝাড়বাতি এখানে নেই, কিন্তু এই আঠারো বাই বারো ফুটের বদ্ধ ঘরটার ভেতরে কেমন নিবিড় উষ্ণতা জড়িয়ে আছে।

জ্যাক জানালার কাছে দাঁড়ায়। তার পরনে স্রেফ একটা কালো ট্রাউজার আর ধূসর রঙের ঢিলেঢালা টি-শার্ট। তার চওড়া পিঠ আর কাঁধের পেশীগুলো সুতির জামার ওপর দিয়ে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। মিউনিখের সেই হাড়কাঁপানো তুষারঝড় পার করে এসে বোস্টনের এই স্যাঁতসেঁতে বৃষ্টি যেন তার ভেতরে অস্থিরতা তৈরি করেছে। ক্লারা ঘরটার এক কোণে রাখা ছোট গ্যাসের স্টোভটায় চায়ের জন্য জল বসিয়েছে। সে তার গায়ের বড় উলের সোয়েটারটার হাতা কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে রেখেছে। চশমার কাঁচটা চায়ের ধোঁয়ায় বারবার ঘোলাটে হয়ে যাচ্ছো, আর সে প্রতিবার সাবধানে আঁচল দিয়ে তা পরিষ্কার করে নিচ্ছে।

“মিস্টার মিলার?” ক্লারা হালকা গলায় ডাকল। “চা খাবেন? নাকি আপনার আবার সেই দামি ব্ল্যাক কফি লাগবে?”

জ্যাক ঘুরে দাঁড়াল। সে আস্তে আস্তে হেঁটে চায়ের স্টোভটার কাছে এলো। ঘরটা এতটাই ছোট যে জ্যাক দুই পা বাড়াতেই একদম ক্লারার পিঠের কাছে এসে দাঁড়াল।

“আমি তোমাকে কতবার বলেছি, ক্লারা… ঘরের ভেতরেু আমাকে ‘মিস্টার মিলার’ বলবে না?” জ্যাকের গলার স্বর ভীষণ নিচু, ভারী আর কড়া শোনাল।

ক্লারা চামচ দিয়ে চা নাড়ছিল। জ্যাকের গায়ের সেই চেনা কড়া স্পোর্টস পারফিউম আর বৃষ্টির সোঁদা সুবাস একসাথে মিশে ক্লারার স্নায়ুগুলোকে এক মুহূর্তে অচল করে দিল। তার হাত সামান্য কেঁপে উঠল।

“তাহলে কী বলে ডাকব?” ক্লারা মুখ না ফিরিয়েই জিজ্ঞেস করল, যদিও তার হৃদস্পন্দন তখন দ্বিগুণ গতিতে ছুটছিল।

“জ্যাক,” সে একদম ক্লারার ডান কানের খুব কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল। তার উষ্ণ নিঃশ্বাস ক্লারার কানের পেছনের নরম চামড়ায় এসে লাগল। “শুধু জ্যাক। যে নামে কোনো শর্ত থাকে না, কোনো ফরমালিটি থাকে না।”

ক্লারা কোনো কথা বলতে পারল না। ছোট রুমটায় দুজনে একসাথে থাকা মানেই প্রতি মুহূর্তে একে অপরের অস্তিত্বকে তীব্রভাবে অনুভব করা। জ্যাকের এই হঠাৎ কাছে আসা, তার শরীরের প্রখর উষ্ণতা ক্লারার সমস্ত যুক্তি আর অংকের হিসাবকে এলোমেলো করে দিচ্ছে। চা ফুটে উঠতেই ক্লারা কাপে ঢালতে গেল, কিন্তু জ্যাক আলতো করে তার ডান হাতটা ধরে থামিয়ে দিল।

“চা পরে হবে, মিস বেনেট,” জ্যাকের নিচু গলার হুকুমের সামনে ক্লারার সমস্ত প্রতিবাদ এক নিমেষে উবে গেল। জ্যাক ক্লারার হাত থেকে চা ছাঁকনি আর চামচটা সযত্নে টেবিলের ওপর সরিয়ে রাখল। ক্লারা ঘুরে দাঁড়াতে যেতেই জ্যাক তার দুটি শক্তিশালী হাত বাড়িয়ে ক্লারার সরু কোমরটা এক ঝটকায় বেষ্টন করে নিল। ক্লারার পিঠ এসে ঠেকল জ্যাকের চওড়া, শক্ত বুকের ওপর।

“মিস্টার… আই মানে, জ্যাক! কী করছেন?” ক্লারা হালকা হাঁপিয়ে উঠে বলল। সে নিজের হাত দুটো দিয়ে জ্যাকের চওড়া বাইসেপ চেপে ধরে নিজেকে ছাড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টা করল।

“হিসেব মেলাচ্ছি,” জ্যাক ক্লারার ঘাড়ের কাছে নিজের মুখটা পুরোপুরি লুকিয়ে ফেলল। তার ভিজে চুলের গোছা ক্লারার উন্মুক্ত ঘাড়ে আর কলারবোনে এসে ছোঁয়াতে শুরু করল।

“কিসের হিসেব?” ক্লারার গলার স্বর কাঁপছে।

“গত এক মাস ধরে আমি কতটা নরক যন্ত্রণা ভোগ করেছি, তার হিসেব,” জ্যাকের ফিসফিসানিটা এবার তীব্র আবেগে ভরে উঠল। তার ঠোঁটের ছোঁয়া ক্লারার ঘাড়ে আলতো করে লেগেছিল। “মিউনিখে বরফের মধ্যে তোমার ওই বোকা চশমাটার আড়ালে লুকিয়ে থাকা চোখ দুটো দেখে আমার পাগল হয়ে যেতে ইচ্ছে করত। তোমাকে স্পর্শ করার জন্য, নিজের বুকের মধ্যে পিষে ফেলার জন্য আমার হাত দুটো কেমন ব্যাকুল হয়ে থাকত তুমি তার ১০ পার্সেন্টও টের পাওনি, তাই না?”

ক্লারা চোখ দুটো বুজে ফেলল। তার পুরো শরীর জুড়ে এক তীব্র শিহরণ খেলে গেল। জ্যাক ক্লারাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। ক্লারার চশমাটা টেবিলের ওপর অলসভাবে পড়ে রইল। চশমা ছাড়া ক্লারার চোখের সেই নীল মণি দুটো মোমবাতি আর হ্যারিকেনের হালকা আলোয় কাঁপছিল। জ্যাক ক্লারার থুতনিটা নিজের আঙুলের ডগায় তুলে ধরে খুব ধীর গতিতে, তার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। ক্লারা প্রথম কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, কিন্তু তারপর সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। তার দুটি দুর্বল হাত সজোরে আকড়ে ধরল জ্যাকের টি-শার্টের কাপড়। সে নিজের সমস্ত অস্তিত্ব নিয়ে জ্যাকের এই ব্যাকুলতাকে সাড়া দিল। বৃষ্টির শব্দ বাইরে তখন আরও প্রবল হয়ে উঠেছে। ঘরের মেঝের ওপর দুজনের ছায়া মোমবাতির আলোয় এক হয়ে মিশে যাচ্ছে।

পরদিন সকাল দশটা। বৃষ্টি কিছুটা কমলেও আকাশ জুড়ে ছিল কালো মেঘের আনাগোনা। বোস্টন ইউনিভার্সিটির সেন্ট্রাল লনের ওপর লাল ইটের রাস্তাগুলো ভেজা। ক্লারা তার ফিনান্সিয়াল ল-এর প্র্যাকটিক্যাল খাতাগুলো বগলে চেপে লাইব্রেরির দিকে হেঁটে যাচ্ছিল। তার পরনে ছিল সাধারণ একটা গাঢ় নীল রঙের লম্বা কোট আর জিন্স। ঠিক তখনই লাইব্রেরির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ইউনিভার্সিটির সকার টিমের কয়েকজন সিনিয়র ছাত্র ক্লারাকে দেখে শিস দিয়ে উঠল। তাদের মধ্যে ‘ব্রায়ান’ নামের ছেলেটি। যে বোস্টনের আরেক প্রখ্যাত টেক্সটাইল ব্যবসায়ীর ছেলে এগিয়ে এসে ক্লারার পথ আটকে দাঁড়াল।

“হে ওয়াও! মিস চশমাওয়ালি!” ব্রায়ান বাঙ্ক মেরে হাসল।

“শুনলাম মিলারদের পেন্টহাউস থেকে নাকি তোমাকে বের করে দেওয়া হয়েছে? তা এখন সাউথ বোস্টনের বস্তিতে আছো নাকি? রাজপুত্রের টাকা শেষ হয়ে গেলে আমাদের ডেকো, আমরা বেশ ভালো পে করতে পারি।”

ব্রায়ানের সাথে থাকা বাকি চার-পাঁচটা ছেলেও বিশ্রীভাবে হেসে উঠল। ক্লারা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ঠাণ্ডা গলায় বলল, “আপনার রুচি আর শিক্ষার স্তর কতটা নিচে, তা এই কথায় বোঝা যাচ্ছে, মিস্টার ব্রায়ান। পথ ছাড়ুন।”

“আরে রাগছ কেন বেনেট?” ব্রায়ান ক্লারার কোটের হাতা ধরতে হাত বাড়াল। “একটু কফি খেতে তো আপত্তি থাকার কথা নয়…..”

ব্রায়ানের হাত ক্লারার কোটে ছোঁয়ার আগেই কোত্থেকে যেন একটা প্রকাণ্ড কালো ছায়া এসে ব্রায়ানের কব্জি এক মোচড়ে ধরে ফেলল।

“আআআহ্!” ব্রায়ান যন্ত্রণায় চিৎকার করে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।

জ্যাক্সন মিলার দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনে একটা কালো চামড়ার জ্যাকেট, সে ব্রায়ানের কব্জিটা এমনভাবে চেপে ধরেছে যে হাড় ভেঙে যাওয়ার উপক্রম।

“আমার জিনিস ছুঁয়ে দেখার দুঃসাহস কোত্থেকে পেলি, ব্রায়ান?” জ্যাকের হিমশীতল গলা শুনে ব্রায়ানের সাঙ্গোপাঙ্গরা তিন পা পিছিয়ে গেল।

“জ্যাক… আই মিন, মিলার! ছাড়ো! হাত ভেঙে যাবে!” ব্রায়ান ছটফট করে উঠল।

জ্যাক তাকে এক ধাক্কায় কাদার ওপর ফেলে দিল। সে ব্রায়ানের মুখের ওপর ঝুকে পড়ে খুব নিচু গলায় বলল, “আজকে শেষবার সতর্ক করছি। ক্লারা বেনেটের দিকে যদি আর কোনোদিন তোর ওই নোংরা চোখ পড়ে, তবে বাস্কেটবল কোর্টে পা রাখা তো দূরের কথা, বোস্টন শহরে তোকে হুইলচেয়ারে ঘুরতে হবে। অ্যান্ড শি ইজ মাই ওয়াইফ। মনে থাকবে?”

ক্যাম্পাসের ডজন ডজন ছাত্র-ছাত্রী তখন গোল হয়ে দৃশ্যটা দেখছে। জ্যাক কারোর দিকে এক নজরও তাকাল না। সে অত্যন্ত কড়া আর প্রখর অধিকারবোধ নিয়ে ক্লারার কোমরটা এক হাতে শক্ত করে চেপে ধরে তাকে নিজের বুকের সাথে সেঁটে নিল।
সবাই থমকে তাকিয়ে দেখছ। যে কোটিপতি অহংকারী জ্যাক্সন মিলারকে পুরো ইউনিভার্সিটি ভয়ের চোখে দেখত, সে আজ এক সাধারণ স্কলারশিপের মেয়েকে কীভাবে বুক দিয়ে আগলে নিয়ে যাচ্ছে! ক্লারা কোনো প্রতিবাদ করল না। জ্যাকের এই হিংসা, এই উন্মাদ অধিকারবোধ তার বুকের ভেতর কেবল তৃপ্তির সঞ্চার করল।

বিকেল চারটে। ক্যাম্পাস থেকে ফিরে আসার পরই বৃষ্টি আবার মুষলধারে শুরু হলো। ভিজতে ভিজতে ডর্ম রুমে ঢোকার কারণে ক্লারার কাপড়ে জল জমে গিয়েছে। ক্লারা বাথরুমে গিয়ে দ্রুত শাওয়ার চালু করল। গরম জলের ঝরনা যখন তার শরীরে আছড়ে পড়ছিল, তখন তার মাথার ভেতর শুধু জ্যাকের সেই কড়া গলার কথাগুলোই বাজছে, “শি ইজ মাই ওয়াইফ…!”

দশ মিনিট পর, ক্লারা তোয়ালে দিয়ে নিজের ভেজা চুল মুছতে মুছতে বাথরুম থেকে বের হয়ে এলো। তার পরনে ছিল একটা সাধারণ সাদা সুতির ফুল-স্লিভ নাইটগাউন, আর গলায় জড়ানো ছিল একটা হালকা লাল রঙের উলের স্কার্ফ। ভেজা চুলের জল গড়িয়ে তার ফ্যাকাশে কলারবোন ভিজিয়ে দিচ্ছে। জ্যাক খাটের পাশে বসে একটা বাস্কেটবল হাতে নিয়ে অলসভাবে ঘোরাচ্ছে।
বাথরুমের দরজা খোলার শব্দে সে মুখ তুলে তাকাল। মোমবাতির কাঁপাকাঁপা আলোয় শাওয়ার নেওয়া ক্লারাকে দেখে জ্যাকের হাতের বলটা মেঝের ওপর গড়িয়ে পড়ে গেল। চশমা ছাড়া ক্লারার চোখের সেই অপার্থিব নীল আলো, ঠোঁটের ওপর জমে থাকা জলের ফোঁটা আর ভেজা গায়ের সুবাস। জ্যাকের রক্তে এক মুহূর্তেই আগুন জ্বালিয়ে দিল। জ্যাক ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার প্রতিটা পদক্ষেপ একটা ক্ষুধার্ত চিতার মতো।
সে কোনো কথা না বলে ক্লারার সামনে এসে দাঁড়াল। ক্লারা তার বুকজুড়ে এক তীব্র ব্যাকুলতা টের পেল। সে হালকা পিছিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেই খাটের পাশটিতে আটকে গেল।

“জ্যাক…?” ক্লারা কাঁপানো গলায় বলল।

জ্যাক কোনো জবাব দিল না। সে ধীর হাতে ক্লারার গলার লাল উলের স্কার্ফটা ধরে আলতো করে টান মেরে খুলে মেঝের ওপর ফেলে দিল। তারপর তার বড়, উষ্ণ হাত দুটো উঠে এলো ক্লারার ভেজা ঘাড়ে।

“তুমি প্রতিদিন আমাকে একটু একটু করে মেরে ফেলছ, ক্লারা। আর আমার ধৈর্য নেই। আমি আর কোনো দেয়াল চাই না।”

জ্যাক ক্লারাকে কোমর ধরে এক ঝটকায় কুড়িয়ে তুলে খাটের ওপর শুইয়ে দিল। ক্লারা হালকা আঁতকে উঠলেও তার চোখ দুটো বন্ধ হয়ে এলো। জ্যাক ক্লারার ওপর নিজের চওড়া শরীরটা সঁপে দিল। তার ঠোঁট নেমে এলো ক্লারার উন্মুক্ত কলারবোনে, তারপর ধীরে ধীরে তার সংবেদনশীল ঘাড় আর কানের লতিতে। ক্লারা আবেশে জ্যাকের পিঠের শক্ত সুতির জামাটা দুই হাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। ঘরের বাইরে ঝড়ের তাণ্ডব, আর ঘরের ভেতরে দুই পিপাসিত হৃদয়ের এক হয়ে যাওয়ার প্রবল লড়াই।
জ্যাক তীব্রতায় ক্লারার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট হারিয়ে ফেলল। তাদের দুজনের নিঃশ্বাসের উত্তাপ ঘরটার ঠাণ্ডা বাতাসকে এক মুহূর্তে গরম করে তুলল। সমস্ত দ্বিধা, সমস্ত চুক্তি আর সামাজিক আইনি বাধার রাজপ্রাসাদ ভস্মীভূত হয়ে গেল ভালোবাসার এই অগ্নিকুণ্ডে।

রাত যখন তিনটে, বোস্টনের বরফ-বৃষ্টি তখন অনেকটাই কমে এসেছে। ছোট রুমটার ফায়ারপ্লেসের পাইন কাঠের অবশিষ্ট অংশটুকু মিটিমিটি করে জ্বলছে। খাটের ওপর পাতলা সাদা চাদরের নিচে ক্লারা জ্যাকের বুকের সাথে একদম মিশে শুয়ে ছিল। তার মাথাটা রাখা ছিল জ্যাকের চওড়া, খালি বুকের ওপর।
জ্যাকের শক্ত ডান হাতটা ক্লারার নগ্ন কোমর জড়িয়ে ধরে রেখেছে, যেন সে ঘুমন্ত অবস্থাতেও ক্লারাকে এক মুহূর্তের জন্য ছেড়ে দিতে রাজি নয়। ক্লারা চোখ খুলে হালকা করে তাকাল।
মোমবাতির শেষ আলোয় সে দেখল জ্যাক ঘুমাচ্ছে। বোস্টন ইউনিভার্সিটির সেই একরোখা ক্যাপ্টেন এখন এক অবোধ শিশুর মতো তার বুকে মুখ গুঁজে শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে আছে। তার মুখের সমস্ত কড়া ভাব গলে গিয়ে ফুটে উঠেছে নির্ভরতার মায়াবী রূপ।
ক্লারা হাত বাড়িয়ে খুব পরম ভালোবাসায় জ্যাকের ভিজে চুলের মধ্যে আঙুল চালিয়ে দিল। জ্যাক ঘুমের মধ্যেই ক্লারাকে আরও একটু নিজের দিকে টেনে নিয়ে ক্লারার কপালে আলতো করে মুখ ঘষল।

“কোথাও যাবে না, ক্লারা…” জ্যাক ঘুমের ঘোরে খুব নিচু গলায় ফিসফিস করে বলল।

ক্লারা মুচকি হাসল। তার চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা পরম তৃপ্তির জল গড়িয়ে পড়ল। সে জানতো, কাল সকালে হয়তো আবার নতুন লড়াই শুরু হবে। আর্থার মিলারের চক্রান্ত, ফিনান্সিয়াল ক্যারিয়ারের সংকট বা সমাজের নানা বাঁধা সবকিছু তাদের সামনে এসে দাঁড়াবে। কিন্তু আজ রাতের এই চরম একাত্মতার পর সে স্পষ্ট বুঝতে পেরেছে এই ছ ফুট চার ইঞ্চির একরোখা রাজপুত্রকে তার জীবন থেকে আলাদা করার ক্ষমতা পৃথিবীর কোনো শক্তির নেই।

ঘরের জানালার কাঁচ দিয়ে ভোরের প্রথম নীলচে আলো এসে পড়ল তাদের এক হয়ে থাকা অবয়বের ওপর। এক নতুন ভোরের সূচনা হলো যা শুধু দুটি শরীরের মিলন নয়, দুটি আত্মার চিরন্তন জয়গাঁথা লিখে দিয়ে গেল।

চলবে?

#Out_Of_Bounds
#ishrat_jahan_jarin
#part_24

বোস্টানের আকাশ থেকে অবশেষে বৃষ্টির জলকণা মুছে গিয়ে এক চিলতে মিষ্টি সোনালী রোদ এসে পড়েছিল কলোনি রোডের সেই পুরোনো তিনতলা বিল্ডিংয়ের জানালার কাঁচজুড়ে। সাউথ বোস্টনের ছোট ডর্ম রুমটার বাতাসে তখনও জমে আছে কাল রাতের একাত্মতার উষ্ণ সুবাস। ক্লারা চোখ মেলে তাকাল। ফায়ারপ্লেসের ছাইগুলো এখন নিভে এসেছে, কিন্তু তার শরীর জুড়ে ছড়িয়ে আছে অনাবিল স্বস্তি।

জ্যাক তখনও ঘুমাচ্ছে। তার প্রকাণ্ড, সুগঠিত একখানা হাত জড়িয়ে রয়েছে ক্লারার কোমর। জ্যাকের মুখটা একদম ক্লারার ঘাড়ের কাছে রাখা, ঘুমন্ত অবস্থায় তার মুখের সেই একরোখা, ভাবটা গলে গিয়ে ফুটে উঠেছে এক অবোধ ব্যাকুলতা।
ক্লারা চশমা ছাড়া আবছা চোখে একদৃষ্টে জ্যাকের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সে খুব সাবধানে, নিজের নিঃশ্বাস চেপে জ্যাকের হাতটা আলতো করে সরিয়ে উঠতে গেল। কিন্তু উঠতেই পারল না। জ্যাক ঘুমের ঘোরেই তার বাঁধন আরও শক্ত করে ফেলল।

“কোথায় যাওয়া হচ্ছে, মিস ক্যালকুলেটর?” জ্যাক চোখ না খুলেই খুব নিচু, কাঁপানো গলায় ফিসফিস করে বলল। তার গলার স্বর ঘুমভাঙা আবেশে আরও ভারী শোনাল। “জ্যাক… ছাড়ুন,” ক্লারা লজ্জা পেয়ে মুখ লাল করে ফেলল। “আটটা বেজে গেছে। আমাকে ইউনিভার্সিটিতে যেতে হবে। প্রফেসর অ্যান্ডারসনের আজকে স্পেশাল ট্যাক্সেশন ক্লাস আছে।”

জ্যাক এক চোখ আংশিক খুলে তাকাল। মোমবাতি আর রোদের মিশেল আলোয় চশমা ছাড়া ক্লারার ফ্যাকাশে মিষ্টি মুখটা দেখে তার ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। সে এক ঝটকায় ক্লারাকে আবার নিজের বুকের ওপর টেনে নিয়ে কপালে দীর্ঘ এক চুমু দিল। “প্রফেসর অ্যান্ডারসনকে বলো, তার সবচেয়ে মেধাবী ছাত্রী এখন আমেরিকার সবচেয়ে জেদী বাস্কেটবল প্লেয়ারের কাছে বন্দি।”

“অসভ্যতামী করবেন না!” ক্লারা জ্যাকের বুকে হাত দিয়ে ঠেলে উঠে বসল। সে দ্রুত টেবিল থেকে চশমাটা নিয়ে চোখে পরে নিল।

চশমা পরতেই ক্লারার সেই পরিচিত গম্ভীর, স্বাবলম্বী রূপটা ফিরে এলো, যদিও তার গালের গোলাপি আভাটা জ্যাকের চোখ এড়ালো না।

তিন ঘণ্টা পর, বোস্টন ইউনিভার্সিটির ফিনান্সিয়াল ল অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিং ডিপার্টমেন্ট।

করিডোর পেরিয়ে ক্লারা এসে দাঁড়াল প্রফেসর অ্যান্ডারসনের রুমের দরজায়। প্রফেসর অ্যান্ডারসন—বয়স ষাটের কাছাকাছি, মাথায় সাদা ধবধবে চুল, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে প্রবীণ ও কঠিন মেজাজের প্রফেশনাল অ্যাকাউন্টিং টিচার তিনি। বড় বড় করপোরেট হাঙরদের তিনি এক বাক্যে তুচ্ছ করে দেন, কিন্তু এই বিশ্ববিদালয়ে একমাত্র ক্লারা বেনেটের গাণিতিক বুদ্ধির ওপর তাঁর অগাধ বিশ্বাস।

ক্লারা যখন প্রথম ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হয়েছিল, তখন তার ছেঁড়া জুতো আর সাধারণ জামাকাপড় দেখে অনেকেই তাচ্ছিল্য করেছিল। কিন্তু অ্যান্ডারসনই প্রথম ক্লারার একশোর মধ্যে একশো পাওয়া পরীক্ষার খাতায় লাল কালিতে লিখেছিলেন—”এ চশমা পরা মেয়েটার মাথায় গোটা বোস্টন কেনার মতো বুদ্ধি আছে।”

“আসতে পারি, স্যার?” ক্লারা দরজায় মৃদু টোকা দিল।

প্রফেসর অ্যান্ডারসন চশমার ওপর দিয়ে তাকালেন। ক্লারাকে দেখেই তাঁর কঠিন গম্ভীর মুখে এক টুকরো পিতৃতুল্য মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল।

“এসো, ক্লারা,” অ্যান্ডারসন হাতের পাইপটা অ্যাশট্রেতে রেখে চেয়ারে সোজা হয়ে বসলেন। “তোমাকে তো আজকাল ক্লাসে কম দেখা যাচ্ছে। শুনলাম সাউথ বোস্টনে নাকি এক রাজপুত্রের সাথে নতুন সংসার শুরু করেছো?”

ক্লারা একটু অপ্রস্তুত হয়ে মাথা নিচু করল। “স্যার… আমি দুঃখিত। কিছু ব্যক্তিগত ঝামেলা ছিল, কিন্তু আমার পড়াশোনা আর রিসার্চ ফাইল একদম আপ-টু-ডেট আছে।”

অ্যান্ডারসন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর চোখে ফুটল গভীর মমতা। “আমি জানি, ক্লারা। আমি তোমার লড়াইটা প্রথম দিন থেকে দেখছি। অনাথ আশ্রমের সেই মেয়েটা নিজের যোগ্যতায় কত দূর এসেছে, তা আমার অজানা নয়। কিন্তু আমি চাই না পৃথিবীর কোনো রাজপুত্র বা কোনো অর্থশালী পরিবার তোমার আসল মেধাকে ঢেকে দিক।”

ক্লারা অবাক হয়ে ফাইলটার দিকে তাকাল। ফাইলের ওপর খোদাই করে লেখা, “রেডক্লিফ অ্যান্ড শিপিং লজিস্টিকস: ৩ বছরের অডিট অ্যান্ড ট্যাক্স ডিসক্রিপেন্সি’।

“এটা কী, স্যার?” ক্লারা জিজ্ঞেস করল।

“এটা তোমার জীবনের প্রথম আসল দরজার চাবিকাঠি,” অ্যান্ডারসন ফাইলটির ওপর হাত রেখে গম্ভীর গলায় বললেন। “রেডক্লিফ শিপিং বোস্টনের অন্যতম বড় লজিস্টিকস কোম্পানি। গত চার মাস ধরে তাদের অ্যাকাউন্টিং টিম আর বাইরের বড় বড় তিনটে আইনি অডিট ফার্ম মিলে চেষ্টা করছে, কিন্তু তাদের ব্যালেন্স শিটের দুই দশমিক পাঁচ মিলিয়ন ডলারের একটা মস্ত বড় গরমিল সমাধান করতে পারছে না। কে বা কারা ভেতর থেকে ফান্ড সরাচ্ছে, তা কেউ ধরতে পারছে না।”

ক্লারা ফাইলটার প্রথম পাতা উল্টাল। সারি সারি সংখ্যার জটিল জাল, ব্যাক-ডেটেড এন্ট্রি আর আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ট্রান্সফারের হাজারো হিসেব।

অ্যান্ডারসন ক্লারার চোখের দিকে সরাসরি তাকালেন। “কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর আমার পুরোনো বন্ধু। আমি তাকে বলেছি, আমার ডিপার্টমেন্টের এক চশমাওয়ালি তরুণী অডিটর যদি এই ফাইলের প্যাঁচ খুলতে না পারে, তবে পুরো আমেরিকা খুঁজেও লাভ হবে না।”

ক্লারা স্তম্ভিত হয়ে বলল, “স্যার… এত বড় কোম্পানি! ওরা কি একজন স্টুডেন্টের রিপোর্ট বিশ্বাস করবে?”

“ওরা বিশ্বাস করবে, কারণ রিপোর্টটার পেছনে উইলিয়াম অ্যান্ডারসনের সই থাকবে,” প্রফেসরের গলায় এক তীব্র অভিভাবকত্ব আর গর্ব ফুটে উঠল। “ক্লারা, আমি জানি তুমি সাউথ বোস্টনের ছোট ঘরে বসে সংগ্রাম করছ। কিন্তু আমি চাই না তুমি সারাজীবন ছোটখাটো দোকানদারদের দশ-বিশ ডলারের ট্যাক্স ফাইল গুছিয়ে দিন পার করো। এই কেসটার সমাধান যদি তুমি আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে করতে পারো… তবে ডিরেক্টর তোমাকে অন-দ্য-স্পট পাঁচ হাজার ডলারের চেক তো দেবেই, সাথে ‘বেনেট অ্যান্ড মিলার’-এর জন্য বোস্টনের অফিশিয়াল ফিনান্সিয়াল কনসালটেন্সি লাইসেন্স পারমিট এনে দেব।”

অ্যান্ডারসন একটু থেমে মিটিমিটি হেসে বললেন, “যদি এই অংক মেলাতে পারো, ক্লারা… তবে তোমাকে আর কোনোদিন কারও দয়ার ওপর নির্ভর করতে হবে না। তোমাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হবে না।”

ক্লারা হাত বাড়িয়ে ফাইলটা নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল। তার চোখের কোণায় জল জমে উঠল। এই পৃথিবীতে সিস্টার মার্গারেটের পর এই প্রবীণ প্রফেসরই তাঁকে নিজের সন্তানের মতো চিনেছেন, সঠিক পথ দেখিয়েছেন।

“আমি আপনাকে নিরাশ করব না, স্যার,” ক্লারা দৃঢ় গলায় বলল।


বোস্টন ইউনিভার্সিটির মেইন জিমনেসিয়াম। কাঠের চকচকে কোর্টের ওপর বাস্কেটবল ড্রিবলিংয়ের পরিচিত কড়া শব্দ হচ্ছে।
জ্যাক একা কোর্টে আছে। তার পরনে একটা হাতা-কাটা কালো স্পোর্টস গেঞ্জি আর শর্টস। তার কপাল বেয়ে ঘামের ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে, আর সে এক নাগাড়ে থ্রি-পয়েন্টার শট ছুড়ে বল রিংয়ের ভেতর গলিয়ে দিচ্ছে। ব্রুকলিনের সেই অন্ডারগ্রাউন্ড ম্যাচের পর এটাই তার প্রথম কোর্টে ফেরা। তার শরীরের প্রতিটা পেশী যেন আবার খেলার পুরোনো ছন্দ ফিরে পাওয়ার জন্য ছটফট করছে। ঠিক তখনই জিমের ভারী ওক কাঠের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন দুজন লোক। একজন হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের হেড কোচ মিস্টার রবার্টস, আর তাঁর পাশে সুট-টাই পরা প্রবীণ এক ব্যক্তিত্ব যার স্যুটের কলার ব্যাজে জ্বলজ্বল করছে ‘ইউএসএ বাস্কেটবল অ্যাসোসিয়েশন’-এর অফিশিয়াল গোল্ডেন লোগো! জ্যাক বলটা এক হাতে ধরে থমকে দাঁড়াল। কোচ রবার্টস এগিয়ে এসে খুব উত্তেজিত গলায় বললেন, “জ্যাক! ড্রিল থামাও! দেখো কে এসেছে!”

স্যুট পরা লোকটি এগিয়ে এলেন। তিনি হলেন মিস্টার মার্কাও ইউএসএ ন্যাশনাল বাস্কেটবল দলের প্রধান সিলেকশন হেড।

“মিস্টার মিলার,” মার্কাও হাত বাড়ালেন। “আমি গত এক বছর ধরে ইস্ট-কোস্ট কলেজের ম্যাচগুলোতে তোমার ড্যাঙ্ক আর স্ট্র্যাটেজি ফলো করছি। বোস্টন ইউনিভার্সিটিকে ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন বানানোর পেছনে তোমার এই হাত দুটোই মূল ভূমিকা রেখেছিল।”

জ্যাক তোয়ালে দিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে সাধারণ গলায় বলল, “ধন্যবাদ, মিস্টার মার্কাও। কিন্তু আপনারা নিশ্চয়ই জানেন আমি এখন আর ইউনিভার্সিটির মেইন স্কোয়াডে অফিশিয়ালি অ্যাক্টিভ নই।”

“সেই হিসেব চোকাতে এসেছে ইউএসএ টিম,” মার্কাও কোটের ভেতরের পকেট থেকে একটা চকচকে অফিশিয়াল খাম বের করে জ্যাকের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। খামের ওপর সোনালী হরফে লেখা, ‘ইউএসএ ন্যাশনাল টিম সিলেকশন কন্টাক্ট অ্যান্ড ন্যাশনাল ট্রেনিং ক্যাম্প’।

কোচ রবার্টসের চোখে তখন অবিশ্বাস্য আনন্দের ঝিলিক। “জ্যাক! ইউএসএ ন্যাশনাল দল তোমাকে আগামী বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের প্রাইমারি পয়েন্ট গার্ড হিসেবে সিলেক্ট করেছে! দিস ইজ দ্য বিগেস্ট থিং!”

জ্যাক খামটা হাতে নিল। তার বুকের ভেতর একটা পুরোনো স্বপ্ন আবার জেগে উঠল। বাস্কেটবল তার রক্তে, তার অস্তিত্বে। আমেরিকার জার্সি গায়ে জাতীয় দলে খেলা যেকোনো খেলোয়াড়ের জীবনের শেষ সীমানা। কিন্তু খামটির ভেতরের শর্তাবলীর দিকে চোখ যেতেই জ্যাকের ভ্রূ জোড়া কুঁচকে গেল।

“কন্ডিশন একটাই, জ্যাক,” মার্কাও গম্ভীর গলায় বললেন। “আগামী চার মাসের জন্য তোমাকে ক্যালিফোর্নিয়ার ন্যাশনাল অলিম্পিক প্র্যাকটিস ক্যাম্পে শিফট হতে হবে। বাইন্ডেড ক্যাম্প। বাইরের কারও সাথে যোগাযোগ বন্ধ, কোনো পার্সোনাল ক্যারিয়ার বা অন্য কাজের সাথে যুক্ত থাকা যাবে না। সম্পূর্ণ ফোকাস দেশের টিমে।”

জ্যাকের হাতটা খামের ওপর থমকে গেল। চার মাস? ক্যালিফোর্নিয়া? তার চোখের সামনে ভেসে উঠল সাউথ বোস্টনের সেই ছোট ঘর, চশমা পরা ক্লারার মিষ্টি মায়াবী মুখ।
যে মেয়েটা নিজের জীবনের সবকিছু ছেড়ে তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, তাকে এই মুহূর্তে বোস্টনে একা ফেলে রেখে সে কীভাবে ক্যালিফোর্নিয়ায় গিয়ে চার মাস ট্রেনিং ক্যাম্পে বন্দি থাকবে?

জ্যাক খামটা আস্তে করে কোচের হাতে ফেরত দিয়ে খুব শান্ত, নিচু গলায় বলল, “আমাকে ভাবার জন্য ২৪ ঘণ্টা সময় দিন, মিস্টার মার্কাও।”

মার্কাও অবাক হলেন। “ভাবার সময়? জ্যাক, আমেরিকার লাখ লাখ তরুণ এই একখানা অফার লেটারের জন্য নিজের পুরো জীবন বাজি রাখতে পারে! আর তুমি ভাবার সময় চাচ্ছ?”

“সবাই যা চায়, জ্যাক্সন মিলারের চাহিদা সব সময় তার চেয়ে আলাদা, মিস্টার মার্কাও।” জ্যাক অলস ভঙ্গিতে বলল

রাত একটা। সাউথ বোস্টনের ডর্ম রুম। বাইরে হিমশীতল হাওয়া বইছিল। ঘরের টেবিলে একটা টেবিল ল্যাম্পের হলুদ আলো জ্বলছে। টেবিলজুড়ে ছড়ানো রেডক্লিফ শিপিংয়ের শত শত ব্যালেন্স শিট, ভাউচার আর ব্যাংকিং স্টেটমেন্ট। ক্লারা তার চশমাটা নাকের ওপর চেপে ধরে একমনে একটা ক্যালকুলেটর আর পেন্সিল নিয়ে অংকের বিশাল ধাঁধায় ডুবে আছে। তার চোখ ক্লান্তিতে লাল হয়ে এসেছে, কপালে হালকা ঘামের বিন্দু। জ্যাক জানালার কাছে চেয়ারে বসে এক মনে ক্লারাকে দেখছিল। তার হাতে ন্যাশনাল টিমের সেই অফিশিয়াল খামটা। কিন্তু সে ক্লারাকে অফারের কথাটা এখনো বলেনি। সে ক্লারার এই চূড়ান্ত মনোযোগ ভাঙতে চায়নি। জ্যাক উঠে গিয়ে এক কাপ গরম কফি বানিয়ে আনল। সে কফির মগটা ক্লারার টেবিলের এক কোণে রাখল।

“হিসেব মিলল, মিস ক্যালকুলেটর? নাকি পুরো টেবিল জ্বালিয়ে দেবে?” জ্যাক নরম গলায় বলল।

ক্লারা কফির দিকে না তাকিয়ে পেন্সিলটা সজোরে ডেস্কে মারল—ঠক!

“পেয়ে গেছি, জ্যাক!” ক্লারার গলায় এক অদম্য বিজয়ের উল্লাস! সে উন্মাদের মতো চশমাটা সোজা করে ফাইলটা জ্যাকের সামনে মেলল।

“ওরা ভেবেছিল খুব চালাকি করেছে! শোনো, কোম্পানি প্রতি মাসে শিপিং ফুয়েল ফ্রেইট চার্জ দেখাত সুইজারল্যান্ডের একটা ভুয়া শেল কোম্পানির নামে। হিসেবটা কিন্তু ডেবিট খাতায় এক শতমাংশ নিখুঁত ছিল। কিন্তু ওরা ভুলে গেছে, ফুয়েল চার্জের সাথে মেরিটাইম ট্যাক্সের ইন্টারেস্ট কম্পাউন্ড হয়! প্রতি মাসে স্রেফ দশমিক জিরো টু পার্সেন্ট করে ফাঁকি দেওয়া হচ্ছিল। তিন বছরে সেই টাকা গিয়ে দাঁড়িয়েছে আড়াই মিলিয়ন ডলারে!”

ক্লারা উল্লাসে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে তখন এক বিদ্যুতের দ্যুতি! জ্যাক ক্লারার এই অপ্রতিরোধ্য, ক্ষুরধার বুদ্ধির দিকে চেয়ে থমকে গেল। যে অংক সমাধান করতে শত শত প্রফেশনাল টিম ব্যর্থ হয়েছে, এই চশমা পরা মেয়েটি স্রেফ নিজের মেধা আর এক রাতের পরিশ্রমে তা উপড়ে বের করে এনেছে!

পরদিন সকাল এগারোটা। রেডক্লিফ শিপিংয়ের প্রধান কনফারেন্স রুম। প্রফেসর অ্যান্ডারসন আর ক্লারা টেবিলের একপাশে বসে ছিলেন। উল্টোদিকে কোম্পানির ডিরেক্টর আর তাদের বিশাল আইনি ও অ্যাকাউন্টিং টিম। ক্লারা যখন তার মাত্র চার পাতার তৈরি করা নিখুঁত ফিনান্সিয়াল অডিট রিপোর্ট আর প্রমাণগুলো প্রজেক্টরের স্ক্রিনে পেশ করল। কনফারেন্স রুমের সবকটি অভিজ্ঞ মাথা একদম স্তব্ধ হয়ে গেল! কোম্পানির ডিরেক্টর মিস্টার রেডক্লিফ চশমা খুলে হা করে দাঁড়িয়ে রইলেন। “ইটস আনবিলিভেবল! দিস ইজ দ্য এক্স্যাক্ট ফ্রড ড্রেন!”

অ্যান্ডারসন চেয়ারে পেছনে হেলান দিয়ে এক তৃপ্তির হাসি হাসলেন। মিস্টার রেডক্লিফ তৎক্ষণাৎ নিজের পকেট থেকে ডায়মন্ডের কলম বের করে পাঁচ হাজার ডলারের সাইন করা স্পট চেক আর প্রফেশনাল পারমিটের আইনি চিঠি ক্লারার সামনে বাড়িয়ে দিলেন।

“মিস বেনেট! আপনি স্রেফ আমাদের আড়াই মিলিয়ন ডলার বাঁচাননি, আমাদের কোম্পানিকে দেউলিয়া হওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়েছেন! আজ থেকে রেডক্লিফ লজিস্টিকসের অফিসিয়াল অডিট কনসালটেন্ট আপনি।”

ঘটনাটা এখানেই থেমে থাকেনি। বিকেলের মধ্যেই খবরটা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল। ‘বোস্টন ফিনান্সিয়াল ইভনিং স্টার’ পত্রিকার অনলাইন পোর্টালে বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগোসহ হেডলাইন ফুটে উঠল,

“বোস্টনের করপোরেট জগতে তরুণী অডিট জিনিয়াস ক্লারা বেনেটের অসামান্য ফাইন্ডিং! আড়াই মিলিয়ন ডলারের জালিয়াতি ফাস!”

ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস থেকে শুরু করে বোস্টনের বড় বড় বিজনেস সার্কেলে শুধু ক্লারার নাম বইতে শুরু করল। সাউথ বোস্টনের সেই তিনতলার ডর্ম রুমের ল্যান্ডফোনে অনবরত রিং হতে লাগল বড় বড় কোম্পানি থেকে শুরু করে প্রখ্যাত লিগাল ফার্মগুলো ক্লারাকে তাদের কনসালটেন্ট হিসেবে পাওয়ার জন্য অফারের পর অফার পাঠাতে শুরু করেছে!

সন্ধ্যা সাতটা। সাউথ বোস্টনের ডর্ম রুমের দরজা খুলে ভেতরেু ঢুকল জ্যাক। তার হাতে ছিল একটা বেশ বড়, অভিজাত কালো কাপড়ের গিফট বক্স। ক্লারা তখন টেবিলের ওপর পড়া ডজন ডজন অফার লেটার আর প্রফেশনাল লাইসেন্স পারমিটটার দিকে চেয়ে আনন্দে বাকরুদ্ধ হয়ে বসে ছিল। জ্যাক রুমে ঢুকে বাক্সটা ক্লারার কোলে রাখল।

“এটা কী?” ক্লারা অবাক হয়ে তাকাল।

“রেডক্লিফ শিপিংয়ের দেওয়া চেকটা ভেঙে প্রথম অফিশিয়াল উপার্জনের শপিং,” জ্যাক মুচকি হাসল। “খোলো।”

ক্লারা ফিতাটা টান দিয়ে বাক্সটা খুলল। ভেতরে জ্বলজ্বল করছিল একখানা সিল্ক ও ভেলভেটের তৈরি গাঢ় লাল রঙের এলিগ্যান্ট ইভনিং অফ-শোল্ডার গাউন।

“জ্যাক… এটা কেন? এত দামী গাউন!” ক্লারা চোখ গোল গোল করল।

“আজ বোস্টনের সেরা অডিট জিনিয়াসের প্রথম জয় উদযাপন করা হবে,” জ্যাক ক্লারার চিবুক ধরে খুব মায়ায় বলল। “আজকে কোনো সাউথ বোস্টনের ছোট ক্যাফেটেরিয়া নয়… বোস্টনের সবচেয়ে অভিজাত রেস্টুরেন্টে আমাদের ডেট।”

আধঘণ্টা পর। ক্লারা বাথরুম থেকে গাউনটা পরে বের হয়ে এলো। তার হালকা বাদামী চুলগুলো পেছনের দিকে সুন্দর করে বাঁধা, গলায় সেই সেন্ট মার্থার সোনার লকেটটা ঝুলছে, আর লাল গাউনটায় তাকে দেখাচ্ছে কোনো রাজপ্রাসাদের অপরূপা রানীর মতো। চোখে যথারীতি সেই সাধারণ মোটা ফ্রেমের চশমা
যা তার সৌন্দর্যকে আরও একধাপ বাড়িয়ে দিয়েছে। জ্যাক স্যুট পরা অবস্থায় দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। ক্লারাকে দেখে তার ধূসর চোখের তারা দুটো স্তব্ধ হয়ে গেল। সে কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা বলতে পারল না।

“আমাকে খারাপ দেখাচ্ছে?” ক্লারা একটু লজ্জা পেয়ে চশমাটা সোজা করল।

জ্যাক ধীর পায়ে এগিয়ে এসে ক্লারার কোমর ধরে তাকে নিজের একদম কাছে টেনে নিল। “তোমাকে এত সুন্দর দেখাচ্ছে যে আমার মনে হচ্ছে বোস্টনের সব কটা ছেলের চোখ উপড়ে ফেলি,” জ্যাক নিচু, গভীর গলায় বলল।

বোস্টন হারবারের পাশে এক অভিজাত ইতালিয়ান রেস্টুরেন্ট ‘লুকা কাস্টিলো’।

কাঁচের বিশাল জানালার ওপাশে নদীর জলে বোস্টন শহরের স্ট্রিট লাইটগুলোর প্রতিফলন চকচক করছিল। টেবিলের ওপর নরম মোমবাতির আলো আর মৃদু বেহালার সুর। ওয়েটার ওয়াইন সার্ভ করে যাওয়ার পর, জ্যাক নিজের পকেট থেকে সেই ইউএসএ ন্যাশনাল টিমের খামটা বের করে ক্লারার ডেস্কে রাখল।

ক্লারা খামটা খুলে পড়ল। তার নীল চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। “জ্যাক! ইউএসএ ন্যাশনাল টিম? বাস্কেটবলের জাতীয় দল? দিস ইজ ইউর ড্রিম!”

জ্যাক শান্তভাবে ওয়াইনের গ্লাসে চুমুক দিল। “কিন্তু কন্ডিশন হলো চার মাস ক্যালিফোর্নিয়ার বন্ধ ক্যাম্পে থাকতে হবে। তোমাকে একা বোস্টনে রেখে।”

ক্লারা থমকে গেল। তার আনন্দের মাঝে এক চিলতে অভিমানের মেঘ জমে উঠল, কিন্তু পর মুহূর্তেই সে নিজের হাতটা বাড়িয়ে জ্যাকের চওড়া হাতের ওপর রাখল।

“আপনাকে যেতে হবে, জ্যাক,” ক্লারা খুব মিষ্টি, দৃঢ় গলায় বলল। “যেভাবে আজ আপনি আমার স্বপ্নকে সত্যি হতে দেখে গর্বিত হয়েছেন, সেভাবে আমিও দেখতে চাই পুরো আমেরিকা আপনাকে দেখে হাততালি দিচ্ছে। চার মাসের দূরত্ব আমাদের অংকের হিসাব কাটাতে পারবে না।”

জ্যাক ক্লারার হাতের ওপর নিজের হাত চেপে ধরল। জ্যাক বসা থেকে উঠে এসে ক্লারার হাত ধরে তাকে রেস্টুরেন্টের হালকা আলোয় ড্যান্স ফ্লোরে টেনে নিল। বেহালার মিষ্ট সুরে জ্যাক ক্লারার কোমরে হাত রেখে তাকে খুব ধীর লয়ে ঘোরাতে লাগল।
ক্লারা তার মাথাটা রাখল জ্যাকের বুকে।

বাইরে বোস্টন শহরের রাজপথের ব্যস্ততা, কিন্তু এই লাল গাউন আর স্যুটের আড়ালে দুই সফল, স্বাবলম্বী মানুষের হৃদয় আজ এক পরম ভালোবাসায় স্পন্দিত হচ্ছে। সাফল্য তাদের আলাদা করেনি বরং তাদের ভালোবাসাকে বানিয়ে দিয়েছে অপরাজেয়!

চলবে?