#Out_Of_Bounds
#ishrat_jahan_jarin
#part_21
মিউনিখের ওল্ড টাউনের গথিক স্থাপত্যগুলোর ওপর যখন শেষ বিকেলের বরফ জমছে। তখন শহরের পিয়ানো আর আলেকজান্ডার স্কয়ারের কোলাহল অনেক পেছনে ফেলে একটা পুরোনো ট্যাক্সি এসে থামল ‘সেন্ট মার্থা অনাথ আশ্রম’-এর সামনে। আশ্রেমের চারপাশের পাইন গাছগুলো তুষারে সাদা হয়ে আছে। কাঠের বিশাল ভিক্টোরিয়ান বাড়ির ছাদ থেকে বরফের ছোট ছোট ঝুল ঝুলে রয়েছে। ক্লারা ট্যাক্সি থেকে নেমেই থমকে দাঁড়াল। তার পরনে ছিল বোস্টন থেকে পরে আসা সেই সাধারণ কালো কোট আর উলের স্কার্ফ। চশমার কাঁচটা বরফ-বাতাসের স্পর্শে সাথে সাথেই ঘোলাটে হয়ে এলো। সে চশমাটা খুলে আলতো করে কোটের কোণ দিয়ে মুছল।
এই সেই বাড়ি! যেখানে সে তার শৈশবের চোদ্দটি বছর কাটিয়েছিল। এই সেই উঠোন, যেখানে বরফের দিনে সিস্টার মার্গারেট তাকে কড়া গরম কফি আর গরম রুটি খেতে দিতেন। আশ্রেমের ভারী ওক কাঠের দরজাটা খুলে বাইরে এলেন প্রবীণ আইনজীবী মিস্টার ক্রাউস। লোকটির মাথায় সামান্য চুল, চোখে গোল চশমা আর পরনে পুরোনো উলেন স্যুট। সে ক্লারাকে দেখেই দু-হাত বাড়িয়ে এগিয়ে এলেন।
“ক্লারা! ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে তুমি চার দিনের আগেই পৌঁছাতে পেরেছ!” মিস্টার ক্রাউসের গলায় গভীর উদ্বেগ ও তৃপ্তি।
ক্লারা মিস্টার ক্রাউসকে জড়িয়ে ধরে খুব নিচু গলায় বলল, “সিস্টার মার্গারেট… উনি সত্যিই আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন, মিস্টার ক্রাউস?”
“হ্যাঁ, খুকি,” মিস্টার ক্রাউস দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “উনি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তোমার কথা জিজ্ঞেস করেছেন। উনি জানতেন তুমি আসবে।”
ঠিক তখনই দরজার আড়াল থেকে উঁকি দিল বেশ কয়েকটি ছোট ছোট মাথা। পঁচিশটির মতো ছোট ছোট বাচ্চা কারো বয়স চার, কারো দশ। তারা ক্লারাকে দেখে এক সাথে চিল চিৎকার করে দরজার বাইরে ছুটে এলো।
“ক্লারা দিদি এসেছে! ক্লারা দিদি এসেছে!”
বাচ্চারা এসে ক্লারার কোট, জ্যাকেট চেপে ধরল। পাঁচ বছরের ছোট্ট মেয়ে ‘লিলি’ ক্লারার হাঁটু জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করল। ক্লারা হাঁটু গেড়ে বরফের ওপর বসে পড়ল। তার চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে নামল, যা মুহূর্তের মধ্যে বরফের হাওয়া লেগে ঠান্ডা হয়ে গেল।
জ্যাক্সন মিলার ট্যাক্সির পেছনের সিট থেকে দুটো ট্রাভেল ব্যাগ নিয়ে নেমে দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনে বাদামী চামড়ার জ্যাকেট আর ট্রাউজার। চোখের কোণে বোস্টনের সেই আন্ডারগ্রাউন্ড ম্যাচের কাটা দাগে ব্যান্ড-এইড লাগানো। সে এক হাত জ্যাকেটের পকেটে পুরে বরফের ওপর দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে দৃশ্যটা দেখছে। তার ধূসর চোখ দুটো হঠাৎ শান্ত হয়ে এলো। সে বোস্টনের বড় বড় পার্টি, শ্যাম্পেনের গ্লাস আর কোটিপতিদের মেকি হাসি দেখেছে। কিন্তু এই বরফে ঢাকা ভাঙা বাড়ির সামনে পঁচিশটা শিশুর জড়িয়ে ধরা আর ক্লারার চোখের সেই খাঁটি চোখের জল তাকে এক অদ্ভুত ভালোবাসার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিল। ক্লারা বাচ্চাদের সামলে উঠে দাঁড়িয়ে জ্যাকের দিকে তাকাল। সে খুব মৃদু গলায় বলল, “মিস্টার ক্রাউস, ইনি… ইনি জ্যাক্সন মিলার। বোস্টন থেকে আমার সাথে এসেছেন।”
মিস্টার ক্রাউস জ্যাকের দিকে এক মুহূর্ত অবাক হয়ে তাকালেন। সে বোস্টনের মিলার বংশের খবর ভালো করেই জানেন। কিন্তু এই কোটিপতির ছেলেকে সাধারণ একটা চামড়ার জ্যাকেট পরে বরফের ওপর ব্যাগ হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি নিজের বিস্ময় চাপাতে পারলেন না।
“স্বাগতম, মিস্টার মিলার।” মিস্টার ক্রাউস হাত বাড়ালেন।
জ্যাক হ্যাণ্ডশেক করে খুব সহজ, গম্ভীর গলায় বলল, “ধন্যবাদ, মিস্টার ক্রাউস। আমাদের ভেতরেে নিয়ে চলুন, এখানে বাতাস বড্ড কড়া।”
–
আশ্রেমের পেছনের উঠোনে একটা পুরোনো, মরচে ধরা লোহার বাস্কেটবল রিং ঝুলে আছে। কাঠের তক্তাটা বরফে জমে ধবধবে সাদা হয়ে আছে। সন্ধ্যা নামার আগে বরফ পড়া কিছুটা কমে এসেছে।
জ্যাক তার জ্যাকেটটা খুলে একটা সাইডের বেঞ্চে রাখল। তার পরনে স্রেফ একটা হাতা-কাটা হাফ সোয়েটার আর ট্রাউজার। কনুইয়ের কাছাকাছি কাঁচা ছাল ওঠা দাগটা এখনো স্পষ্ট। আশ্রেমের বড় ছেলে ‘টবি’ যার বয়স বারো বছর, সে বরফে ঢাকা একখানা পুরনো বাস্কেটবল হাতে নিয়ে জ্যাকের সামনে এসে দাঁড়াল।
“তুমি নাকি আমেরিকার অনেক বড় বাস্কেটবল প্লেয়ার? ক্লারা চিঠিতে লিখেছিল।” টবি একটু হিংসুটে গলায় বলল। জ্যাক এক হাত কোমর রেখে অলস ভঙ্গিতে হাসল। সে থুতনি দিয়ে টবির বলটার দিকে ইশারা করে বলল, “ক্লারা ভুল কিছু লেখেনি। বলটা দাও, দেখাচ্ছি।”
টবি বলটা সজোরে জ্যাকের দিকে ছুঁড়ে দিল। জ্যাক এক হাতে নিখুঁতভাবে বলটা রিসিভ করল। তার আঙুলের ডগায় এক মুহূর্তে চামড়ার বলটা চড়কার মতো ঘুরতে শুরু করল। বাচ্চারা চারপাশ থেকে ভিড় করে দাঁড়াল। জ্যাক কোনো সুযোগ না দিয়েই বরফের ওপর স্লাইড করে লাফিয়ে উঠল। তার শরীরটা বাতাসের সাথে শূন্যে ভাসল এবং এক নিমেষে বলটা সেই মরচে ধরা রিংয়ের ভেতর দিয়ে গলিয়ে দিল।
পঁচিশটা বাচ্চা একসাথে আনন্দে চিৎকার করে হাততালি দিয়ে উঠল।
“আবার! আবার দেখাও!” লিলি নামের ছোট মেয়েটা লাফাতে শুরু করল।
জ্যাক বলটা ধরে নিচে নেমে এলো। সে লিলিকে এক ঝটকায় কুড়িয়ে নিয়ে নিজের চওড়া কাঁধে চাপিয়ে নিল। লিলি জ্যাকের চুল ধরে হেসে কুটিপাটি।
“এবার তোদের ড্রিল শেখাব।” জ্যাক খুব গম্ভীর হবার অভিনয় করে বলল, কিন্তু তার চোখে ছিল এক অনাবিল হাসি। “যারা আমার সাথে ট্রিকস পারবে না, তাদের রাতে ডাল-রুটি বেশি খেতে হবে!”
ক্লারা দোতলার বারান্দার কাঠের রেলিংয়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়েছিল। তার হাতে ছিল মিস্টার ক্রাউসের দেওয়া এক কাপ কফি। কফির ধোঁয়াটা উবে যাচ্ছে হিমেল বাতাসে। ক্লারা চশমার আড়াল থেকে একদৃষ্টে নিচের দৃশ্যটা দেখছে। যে জ্যাক্সন মিলার বোস্টন ইউনিভার্সিটির কোর্টে কোনো জুনিয়র প্লেয়ার সামান্য ভুল করলে ধমকে উঠত, যে লোকটার অহংকারে গোটা বাস্কেটবল টিম কাঁপত সে লোকটা আজ বরফের মেঝের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে দশ বছরের বাচ্চাকে বাস্কেট গলানো শেখাচ্ছে! তার পকেটে টাকা নেই, তার সাথে নিরাপত্তারক্ষী নেই, অথচ তার মুখে এমন এক শিশুর মতো হাসি যা ক্লারা এই গত এক মাসে কোনোদিন দেখেনি। ক্লারা নিজের অজান্তেই একটু হাসল। জ্যাক হঠাৎ চোখ তুলে দোতলার বারান্দার দিকে তাকাল। দুজনের চোখাচোখি হলো। ক্লারা হালকা লজ্জা পেয়ে চশমাটা নাকের ওপর সোজা করে কফির মগে চুমুক দিল। জ্যাক নিচে দাঁড়িয়ে বাঁ বাঁকা এক চিলতে মিষ্টি হাসি উপহার দিল।
–
রাত আটটা। অনাথ আশ্রেমের স্টাডি রুম। ঘরের মাঝখানে ফায়ারপ্লেসে পাইন কাঠের আগুন জ্বলছিল। কাঠের গুঁড়ো পোড়ার একটা মিষ্টি সুবাস আর মৃদু পটপট শব্দ পুরো রুমটাকে উষ্ণ করে রেখেছে। টেবিলের ওপর মিউনিখ সিটি কর্পোরেশনের বেশ কিছু নথি ছড়ানো। মিস্টার ক্রাউস চশমা মুছে একটা কাগজে সই করছিলেন।
“আমরা বোস্টন থেকে পাঁচ হাজার ডলার এনেছি, মিস্টার ক্রাউস,” ক্লারা ব্যাগ থেকে টাকা এবং ক্যাফেটেরিয়া ও আন্ডারগ্রাউন্ড ম্যাচের রসিদগুলো বের করে রাখল। “এই টাকায় কি লিজের নবায়ন ফি শোধ হবে?”
মিস্টার ক্রাউস দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “টাকাটা যথেষ্ট, ক্লারা। কিন্তু সমস্যা শুধু টাকায় নয়। ‘এলএম হোল্ডিংস’-এর আইনি টিম কাল সকালে সিটি কোর্টে একটা ইনজাংশন ফাইল করতে যাচ্ছে। তারা দাবি করছে সিস্টার মার্গারেট নাকি মৃত্যুর আগে জমির মালিকানা হস্তান্তরের প্রাথমিক চুক্তিতে সই করেছিলেন।”
ক্লারা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। “ওটা অসম্ভব! সিস্টার মার্গারেট কোনোদিন আশ্রেমের জমি বিক্রি করবেন না!”
ঠিক তখনই আশ্রেমের বাইরের গ্যারেজের কাছে দুটো কড়া গাড়ির ব্রেক কষার শব্দ হলো। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে স্টাডি রুমের জোড়া কাঠের দরজা ঠেলে ভেতরেু ঢুকল তিনজন লোক। সামনে ছিলেন মিউনিখের নামজাদা চতুর আইনজীবী মিস্টার ভেবার, আর তার পেছনে দুটো ভারী ওভারকোট পরা সুঠাম দেহের বডিগার্ড। মিস্টার ভেবার চশমা ঠিক করে জার্মান ও ইংরেজির মিশেলে বললেন, “মিস্টার ক্রাউস! সময় নষ্ট করছেন। মিউনিখ মিউনিসিপ্যালিটি আমাদের কোম্পানিকে ডেভেলপমেন্ট পারমিট দিয়ে দিয়েছে। আগামীকাল সকাল ১০টার মধ্যে এই ভাঙা বাড়ি খালি না করলে বুলডোজার আসবে।”
ক্লারা এক ঝটকায় দাঁড়িয়ে পড়ে কড়া গলায় বলল, “আপনারা জালিয়াতি করছেন, মিস্টার ভেবার! সিস্টার মার্গারেট কোনো কাগজে সই করেননি। আর মাদার কোম্পানি ‘মিলার কর্পোরেশন’-এর নাম ভাঙিয়ে আপনি জার্মানির আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার করছেন!”
মিস্টার ভেবার তাচ্ছিল্যের সাথে হাসলেন। “খুকি, আইনের ভাষা আবেগ বোঝে না। আর মিলার কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান আর্থার মিলারের স্পষ্ট নির্দেশ এই জমি কাল সকালের মধ্যে ক্লিয়ার করতে হবে।”
“আর্থার মিলারের নির্দেশ, তাই তো?”
রুমের কোণায় এতক্ষণ কাঠের ফায়ারপ্লেসে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা জ্যাক ধীর পায়ে এগিয়ে এলো। মিস্টার ভেবার থমকে দাঁড়ালেন। সে জ্যাকের ব্যান্ড-এইড লাগানো মুখ আর ধূসর চোখের দিকে তাকিয়ে এক সেকেন্ডের জন্য চিনে ফেললেন।
“মিস্টার… মিস্টার জ্যাক্সন মিলার?” ভেবারের গলা একটু কেঁপে উঠল।
জ্যাক একদম ভেবারের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলার দূরত্বে এসে দাঁড়াল। সে পকেটে হাত রেখে খুব নিচু, হিমশীতল গলায় বলল, “আমার বাবার নাম ব্যবহার করে মিউনিখে গুণ্ডাগিরি দেখাচ্ছ, ভেবার? তুমি কি জানো আমি কে?”
“আ… আপনি চেয়ারম্যানের ছেলে, কিন্তু আপনি তো ফ্যামিলি থেকে…”
“আমি ফ্যামিলি থেকে বের হয়েছি, কিন্তু মিলার ট্রাস্টের আইনসম্মত ১৫% ইনহেরিটেন্স ডিরেক্টরশিপ এখনো আমার নামে আছে,” জ্যাকের গলায় এবার এক রাজকীয় হুংকার ফুটে উঠল। “আমার নাম ছাড়া মিলার কর্পোরেশনের ইউরোপিয়ান কোনো প্রজেক্টের ল্যান্ড একুইজিশন ভ্যালিড হয় না। তুমি যদি কাল সকালে কোর্টে ভুয়া সইয়ের ফাইল জমা দাও, তবে আমি নিজে মিলার কর্পোরেশনের শেয়ারহোল্ডার হিসেবে তোমার আর তোমার কোম্পানির নামে জালিয়াতির মামলা ঠুকে দেব।”
ভেবার ফ্যাকাশে হয়ে কয়েক পা পিছিয়ে গেল। সে জানতো আর্থার মিলারের সাথে ছেলের ঝামেলা চলছে, কিন্তু জ্যাক্সন মিলার যে সশরীরে মিউনিখে এসে এই অনাথ আশ্রেমের লিগাল ডিফেন্স হয়ে দাঁড়াবে তা সে স্বপ্নেও ভাবেনি! জ্যাক ভেবারের কোটের কলারটা আলতো করে সোজা করে দিয়ে বলল, “আমার বউয়ের অনাথ আশ্রমে এক পা বাড়ালে জার্মানির মাটিতেই মিলার কর্পোরেশনের শিপিং লাইসেন্স বাতিল করাব। এবার তোমার এই চামচাদের নিয়ে আমার সামনে থেকে বের হও।”
ভেবার আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। সে বডিগার্ডদের নিয়ে তড়িঘড়ি করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। মিস্টার ক্রাউস হা করে তাকিয়ে রইলেন। ক্লারাও একদম স্তব্ধ হয়ে জ্যাকের দিকে তাকিয়ে রইল। জ্যাকের মুখের সেই কড়া রূপ দেখে ক্লারার বুকের ভেতরটা আবার কেমন যেন কেঁপে উঠল।
আশ্রমে বাচ্চা আর মিস্টার ক্রাউসকে জায়গা দেওয়ার পর দেখা গেল সেখানে বাড়তি কোনো ঘর খালি নেই। রাত দশটায় তুষারঝড় আবার তীব্র রূপ নিল। মিস্টার ক্রাউস আশ্রম থেকে চারশো গজ দূরে ওল্ড টাউনের গলি ডাইভারশনে একটা পুরোনো কাঠের ছোট ইতালিয়ান মোটেল ‘লোকাল কাস্টিলো’-তে জ্যাক আর ক্লারার জন্য একটা রুমের ব্যবস্থা করে দিলেন। মোটেলে রুম বলতে মোটে একটা। কাঠের মেঝে, কোণায় একখানা ছোট পুরোনো ফায়ারপ্লেস আর মাঝখানে একটা আয়রন ফ্রেমের কাঠের ডাবল বেড। ঝড়ের কারণে ওল্ড টাউনের কারেন্ট চলে গেছে। মোটেলের বৃদ্ধ মালিক এসে ফায়ারপ্লেসে পাইন কাঠ জ্বালিয়ে দিয়ে টেবিলে দুটো মোটা পীত রঙের মোমবাতি জ্বেলে দিয়ে গেছেন। মোমবাতির কাঁপাকাঁপা লালচে আলোয় ঘরটা কেমন যেন মায়াবী আর উষ্ণ হয়ে উঠেছে।
ক্লারা তার কোটটা খুলে পেছনের আলনায় রাখল। সে একটা ছোট টিনের পাত্রে ফায়ারপ্লেসের আগুনে গরম জল বসাল। জ্যাক জানালার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। জানালার কাঁচজুড়ে বরফের ফুল ফুটেছে। বাইরে শুধু অন্ধকার আর বরফের তাণ্ডব। “কফি খাবেন?” ক্লারা মগ দুটি টেবিলে রাখতে রাখতে খুব সহজ গলায় জিজ্ঞেস করল।
জ্যাক ঘুরে দাঁড়াল। মোমবাতির আলো তার সুগঠিত মুখের অর্ধেকটা আড়ালে রেখেছে, আর অর্ধেকটায় সোনার মতো দ্যুতি ছড়াচ্ছে।
“কফি নয়, ফায়ারপ্লেসের পাশে এসে বসো, ক্লারা। তোমার হাত দুটি এখনও বরফের মতো ঠান্ডা,” জ্যাকের গলার স্বর হঠাৎ অনেক নরম ও গভীর শোনাল।
ক্লারা কোনো দ্বিমত করল না। সে ফায়ারপ্লেসের সামনের পুরোনো কার্পেটের ওপর হাঁটু মুড়ে বসল।
জ্যাক তার পাশে এসে বসল। দুজনের মধ্যে সামান্য কয়েক ইঞ্চির দূরত্ব। ফায়ারপ্লেসের কাঠ পোড়ার হালকা পটপট শব্দ ছাড়া ঘরে আর কোনো শব্দ ছিল না। ক্লারা নিজের দুই হাতের তালু আগুনে সেঁকে নিতে নিতে ধীর গলায় বলল, “আজকে ভেবারকে আপনি যা বললেন… ‘আপনার বউয়ের অনাথ আশ্রম’… ওটা কি সত্যি আইনি চাল ছিল, নাকি স্রেফ ভয় দেখানোর জন্য?”
জ্যাক একটু হাসল। সে আগুনের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল।
“হিসেব আর যুক্তির বাইরেও জীবনে কিছু জিনিস থাকে, মিস ক্যালকুলেটর,” জ্যাক খুব নিচু গলায় বলল। “তুমি আমাকে সবসময় অংকের সমীকরণে মাপতে চাও। কিন্তু সবকিছুর তো অংক হয় না।”
“যেমন?” ক্লারা চশমার আড়াল থেকে মুখ তুলে তাকাল।
“যেমন, এক কোটিপতি অহংকারী বাস্কেটবল প্লেয়ারের জীবনের সব অহংকার ছেড়ে ব্রুকলিনের ভাঙা মেঝের রক্ত বেচে পাঁচ হাজার ডলার নিয়ে বরফের দেশে ছুটে আসা,” জ্যাক ক্লারার নীল চোখ দুটোর দিকে সরাসরি তাকাল। “এর কি কোনো ফিনান্সিয়াল সমীকরণ আছে, ক্লারা?”
ক্লারা চুপ করে গেল। ঘরের ভেতর মোমবাতির শিখাটা সামান্য কেঁপে উঠল। ফায়ারপ্লেসের আগুনটা ধীর গতিতে জ্বলছে। বাইরে তুষারঝড়ের গর্জন যেন এই মোমবাতি জ্বালানো ছোট ঘরটার রোমান্টিকতাকে আরও হাজার গুণ বাড়িয়ে দিল। জ্যাক তার ডান হাতটা ধীরে ধীরেু বাড়িয়ে ক্লারার টেবিলের ওপর রাখা হাতটার ওপর রাখল। ক্লারা তার হাতটা সরিয়ে নিল না। তার বুকের ভেতর একটা অচেনা অনুভূতির ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে। জ্যাক ক্লারার খুব কাছে সরে এলো। এত কাছে যে ক্লারা জ্যাকের নিঃশ্বাসের উষ্ণতা টের পাচ্ছে। জ্যাক অন্য হাত দিয়ে খুব পরম মায়ায় ক্লারার চশমাটা আলতো করে খুলে কাঠের টেবিলে রাখল। চশমা ছাড়া ক্লারার নীল চোখ দুটো মোমবাতির আলোয় অপূর্ব দেখাচ্ছে। জ্যাক ক্লারার কপালে নেমে আসা চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে কাঁপানো গলায় বলল, “আমি তোমাকে প্রথম দিন থেকে ঘৃণা করার চেষ্টা করেছি, ক্লারা। ভেবেছিলাম তুমি আমার বাবাকে ব্যবহার করে স্কলারশিপ নেওয়া এক মেকি মেয়ে। তাই তোমাকে রাগ, হিংসা আর জেলাসি থেকে সেই গোপন চুক্তির বাধ্যবাধকতায় বেঁধে পেন্টহাউসে এনেছিলাম…”
ক্লারা একদৃষ্টে জ্যাকের ধূসর চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। জ্যাক একটু থেমে এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“কিন্তু আমি হেরে গেছি, ক্লারা। বোস্টনের সেই ভাঙা ডর্ম রুমে তোমার সাথে ডাল-ভাত খাওয়া, তোমার সেই কড়া যুক্তি, আর এই অনাথ আশ্রমের বাচ্চাদের জন্য তোমার চোখের জল… আমাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। এখন আমার বাবার ৫০ মিলিয়ন ডলার হারানোর ভয় হয় না… ভয় হয় স্রেফ তোমাকে হারানোর।”
ক্লারার চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা পরম স্বস্তির জল গড়িয়ে পড়ল। সে কোনো কথা বলল না। কথা বললে হয়তো এই মায়াবী মুহূর্তটা ভেঙে যাবে। ক্লারা ধীর গতিতে তার অন্য হাতটা বাড়িয়ে জ্যাকের গালে রাখা সেই ব্যান্ড-এইডের ওপর আলতো করে রাখল। তার আঙুলের স্পর্শে জ্যাকের চোখ দুটো এক মুহূর্তের জন্য বুজে এলো।
“আমিও তো সমীকরণ মেলাতে পারিনি, মিস্টার মিলার,” ক্লারা খুব মিষ্টি, সাবলীল গলায় বলল। “যে মানুষটা আমার আত্মসম্মান বাঁচানোর জন্য নিজের পুরো রাজপ্রাসাদ ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসতে পারে… তাকে কোনো অংকের খাতায় বন্দি রাখা যায় না। আপনি হেরে যাননি… আপনি জয়ী হয়েছেন।”
জ্যাক চোখ খুলল। সে খুব পরম মমতায় ক্লারার কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল।
বাইরে বরফঝড় চলুক, পৃথিবীর সমস্ত চক্রান্ত জারি থাকুক কিন্তু এই মোটেলে, মোমবাতির টিমটিমে আলোয় দুই নিঃস্ব অথচ হৃদয়বান মানুষের মনের জমে থাকা বরফ গলে ভালোবাসার নদীতে পরিনত হওয়া বন্ধ না হোক।
চলবে?
#Out_Of_Bounds
#ishrat_jahan_jarin
#part_22
সকাল নয়টা। মিউনিখ সিটি কোর্টের সুবিশাল গথিক প্রাসাদের সামনের চত্বরটা পুরু বরফে ঢেকে আছে। ওপরের ধোঁয়াটে ধূসর আকাশ থেকে হালকা হালকা তুষারের কণা ঝরে পড়ছে। কোর্টের বিশাল তিন নম্বর বিচারকক্ষের পিনপতন নীরবতা ভঙ্গ করে কাঁচের চশমা পরা বৃদ্ধ বিচারক বার্নার্ড তার কাঠের হাতুড়িটা ডেস্কে সজোরে আঘাত করলেন।
“কোর্ট এই নথিপত্র এবং প্রমাণের ভিত্তিতে চূড়ান্ত রায় প্রদান করছে,” জার্মানি ও ইংরেজির মিশেলে গম্ভীর গলায় বললেন জাজ বার্নার্ড। “সেন্ট মার্থা অনাথ আশ্রমের লিজের বকেয়া চার হাজার ডলার নগদে জমা নেওয়া হলো। লিজের মেয়াদ আগামী দশ বছরের জন্য নবায়ন করা হচ্ছে। একই সাথে ‘এলএম হোল্ডিংস’-এর পক্ষ থেকে পেশ করা জমি হস্তান্তরের চুক্তিপত্রটিকে সম্পূর্ণ ভুয়া এবং জালিয়াতি হিসেবে ঘোষণা করা হলো।”
কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা জালিয়াতি কোম্পানির আইনজীবী মিস্টার ভেবার মুখ চুন করে মাথা নিচু করে রইলেন। তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সাহায্যকারীরা তড়িঘড়ি করে ফাইলপত্র গুটিয়ে নিচ্ছে। জাজ বার্নার্ড চশমার ওপর দিয়ে সরাসরি কাঠের বেঞ্চে বসে থাকা জ্যাক্সন মিলারের দিকে তাকালেন। “মিস্টার মিলার, মিলার কর্পোরেশনের ইউরোপিয়ান ইনহেরিটেন্স ডিরেক্টর হিসেবে আপনার স্পষ্ট বিবৃতি এবং আইনি স্বাক্ষর না থাকলে এই প্রোপার্টি হস্তান্তরের যে চক্রান্ত চলছিল, তা হয়তো আটকানো অসম্ভব হতো। আপনার এই সাহসিকতা প্রশংসনীয়।”
জ্যাক স্রেফ হালকা একটু মাথা নাড়ল। আদালতের পেছনের সারিতে বসে ছিলেন প্রবীণ আইনজীবী মিস্টার ক্রাউস। তার চোখে আনন্দের জল। সে পাশে বসে থাকা ক্লারার হাত দুটো চেপে ধরে বললেন, “ক্লারা! অনাথ আশ্রমটা বেঁচে গেল! বাচ্চারা তাদের ঘর হারাবে না!”
ক্লারা কোনো কথা বলতে পারল না। তার নীল চোখ দুটো চশমার আড়ালে জলে ভরে উঠেছে। সে কাঠের বেঞ্চ ছেড়ে সোজা গিয়ে দাঁড়াল জজের কাঠগড়ার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা জ্যাকের মুখোমুখি। বারান্দা দিয়ে আসা শেষ বিকেলের রোদটা ক্লারার হালকা বাদামী চুলে এসে পড়েছে। সে খুব ধীর, গভীর গলায় বলল, “ধন্যবাদ, মিস্টার মিলার। আপনি না থাকলে আজ মিউনিখের ওই পঁচিশটা অনাথ বাচ্চা গৃহহীন হয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকত।”
জ্যাক অলস ভঙ্গিতে পকেটে হাত পুরে একটু হাসল।
“আমাকে ধন্যবাদ দিও না, মিস ক্যালকুলেটর,” জ্যাক নিচু গলায় বলল। “ধন্যবাদ দাও তোমার ওই অঙ্কের হিসেবকে। আর সাউথ বোস্টনের বুড়ো ও’মালি আর ব্রুকলিনের জিমকে, যাদের টাকা আর রক্ত না থাকলে আমরা এই বিমানের টিকিটটাই কাটতে পারতাম না। আমি তো স্রেফ আমার বাবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে একটা ড্যাঙ্ক করেছি।”
ক্লারা চশমাটা সোজা করে নিয়ে বলল, “কিন্তু ওই ড্যাঙ্কটা করার জন্য যে বুকের কলিজা লাগে, ওটা সবার থাকে না।”
জ্যাক ক্লারার খুব কাছাকাছি এসে নিচু গলায় ফিসফিস করে বলল, “আমার কলিজার অর্ধেকের বেশি তো বোস্টন ইউনিভার্সিটির এক চশমাওয়ালি মেজাজী মেয়ে চুরি করে রেখে দিয়েছে। এখন ফাইট না করে উপায় কি?”
ক্লারা লজ্জা পেয়ে দ্রুত মুখ ফিরিয়ে আদালতের ফাইলপত্র গোছাতে শুরু করল, কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠা চেনা মিষ্টি হাসিটা জ্যাকের নজর এড়ালো না।
–
দুপুর দুটো। সেন্ট মার্থা অনাথ আশ্রমের পাইন গাছে ঘেরা বরফঢাকা প্রাঙ্গণ। উত্তুরে বরফের হাওয়া বইছে, কিন্তু আশ্রমের ভেতরের আবহাওয়াটা ভীষণ উষ্ণ আর বিদায়ের সুরে ভারী।
বাচ্চারা সবাই বরফের কোর্টে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চার বছরের ছোট মেয়ে লিলি জ্যাকের ট্রাউজারের কোণ আঁকড়ে ধরেছে। তার চোখে ছোট ছোট জলের ফোঁটা। “জ্যাক ভাইয়া, তুমি আর ক্লারা দিদি কি সত্যি চলে যাবে? আর থাকবে না?” লিলি কেঁদে উঠে বলল।
জ্যাক এক হাঁটু গেড়ে বরফের ওপর বসল। সে পকেট থেকে বোস্টন লোগান এয়ারপোর্টের একটা ছোট কমিক ট্রয় বের করে লিলির হাতে দিল।
“আমি আবার আসব, লিলি,” জ্যাক নরম গলায় বলল। “যেদিন তুমি বাস্কেটবল রিংয়ে নিজের হাতে বল গলানো শিখবে, সেদিন আমি বোস্টন থেকে স্রেফ তোমার খেলা দেখতে মিউনিখে আসব। প্রমিস।”
বাচ্চারা সবাই একসাথে জ্যাক আর ক্লারাকে জড়িয়ে ধরল।
আশ্রেমের দরজায় দাঁড়িয়ে মিস্টার ক্রাউস একটি ছোট ভেলভেটের লাল বাক্স নিয়ে এগিয়ে এলেন। সে বাক্সটা ক্লারার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, “ক্লারা, সিস্টার মার্গারেট মৃত্যুর আগে এই জিনিসটা তোমার জন্য রেখে গিয়েছিলেন। উনি বলেছিলেন, যেদিন তুমি নিজের জীবনে সত্যিকারের কোনো আপন মানুষকে খুঁজে পাবে, সেদিন যেন তোমাকে এটা দেওয়া হয়।”
ক্লারা কাঁপানো হাতে ভেলভেটের বাক্সটা খুলল। ভেতরে জ্বলজ্বল করছে একটি অতি প্রাচীন ও সূক্ষ্ম কারুকাজ করা সোনার চেইন, যার লকেটে সেন্ট মার্থার ছবি আঁকা। ক্লারা লকেটটা নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল। সিস্টার মার্গারেট তাকে খালি হাতে এই পৃথিবীতে পাঠাননি, তিনি তাকে ভালোবাসার এমন এক মহামূল্যবান আশিষ দিয়ে গেছেন, যা যেকোনো কোটিপতি পরিবারের সম্পদের চেয়েও দামী। জ্যাক পাশে দাঁড়িয়ে চেইনটার দিকে তাকাল। সে খুব আলতো করে ক্লারার কাঁধে নিজের শক্ত হাতটা রাখল।
“চল, ক্লারা,” জ্যাক নিচু গলায় বলল। “বোস্টনের ফ্লাইট ধরার সময় হয়ে এসেছে। আমাদের নিজেদের যুদ্ধ এখনো বোস্টনে বাকি।”
ক্লারা চোখের জল মুছে মাথা নাড়ল। সে বাচ্চাদের শেষবারের মতো জড়িয়ে ধরে ট্যাক্সির দিকে পা বাড়াল। মিউনিখের তুষারাবৃত পথ পেরিয়ে তারা আবার তাদের লড়াইয়ের ময়দান বোস্টনের দিকে রওনা হলো।
–
পরদিন সকাল সাতটা। বোস্টন লোগান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের রানওয়েতে চারপাশের কুয়াশা ভেদ করে প্লেনটি অবতরণ করল। দীর্ঘ আট ঘণ্টার যাত্রা শেষে দুজনের শরীরেই ভীষণ ক্লান্তি। কিন্তু মনের ভেতরের আনন্দ আর আত্মবিশ্বাস সেই ক্লান্তিকেও হারিয়ে দিয়েছে। এয়ারপোর্টের লাউঞ্জ পার হয়ে বাইরে আসতেই ঠাণ্ডা বাতাস তাদের মুখে এসে লাগল। সাউথ বোস্টনের ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছে তারা। জ্যাক ব্যাগ দুটো ট্যাক্সির পেছনের ট্রাঙ্কে রাখতে রাখতে ক্লারার দিকে তাকাল।
“এখন কোথায় যাবে, মিস ক্যালকুলেটর? আবার ওই অনাথ আশ্রমের মতো ছোট ডর্ম রুমে?”
ক্লারা চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে নিয়ে ট্যাক্সির দরজা খুলল। “ওটা ছোট ডর্ম রুম হতে পারে, মিস্টার মিলার। কিন্তু ওটা আমাদের নিজেদের উপার্জনে কেনা চাল-ডাল দিয়ে চলে। আপনার বাবার সেই ১০ হাজার বর্গফুটের পেন্টহাউসের চেয়ে ওই তিন ফুটের টেবিলটাই আমার কাছে অনেক বেশি স্বাধীন।”
জ্যাক হালকা হা-হা করে হেসে উঠল। “মানলাম। কিন্তু আজকের পর থেকে কিন্তু হিসেব বদলে যাবে।”
“কীসের হিসেব?” ক্লারা অবাক হয়ে তাকাল।
“আমাদের নতুন ফার্মের হিসেব,” জ্যাক ট্যাক্সিতে উঠে ক্লারার পাশে বসল। সে তার জ্যাকেটের পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা সাদা কাগজ বের করে ক্লারার কোলে রাখল। “মিউনিখ যাওয়ার বিমানে বসেই আমি ডাফটটা বানিয়েছি। ‘বেনেট অ্যান্ড মিলার ফিনান্সিয়াল অ্যান্ড লিগাল কনসালটেন্সি’। আজ বিকেলে আমরা সিটি কর্পোরেশনে গিয়ে এটার অফিশিয়াল রেজিস্ট্রি করাব।”
ক্লারা খসখসে কাগজটার দিকে তাকাল। সেখানে জ্যাকের নিখুঁত ও স্পষ্ট হাতের লেখায় ক্যাপিটাল, শেয়ার, সার্ভিস মডেল আর আইনি ধারার ছক সাজানো। ক্লারা মুগ্ধ হয়ে বলল, “আপনি এত কিছু কখন তৈরি করলেন?”
“যখন তুমি বিমানে আমার কাঁধে মাথা রেখে শান্ত হয়ে ঘুমাচ্ছিলে,” জ্যাক অলস ভঙ্গিতে বলল। “আমার বাস্কেটবল ব্রেইন কিন্তু স্রেফ বল গলানো বোঝে না, কীভাবে নতুন সাম্রাজ্য দাঁড় করাতে হয় ওটাও আমার রক্তে আছে।”
ক্লারা জানালার ওপাশের বোস্টন শহরের দিকে তাকাল। রোদের আলোয় তুষার জমে থাকা বিল্ডিংগুলো চকচক করছিল। তার মনে হলো, যে ঝড়টা তাদের জীবনে এসেছিল, তা তাদের ধ্বংস করতে আসেনি এসেছিল তাদের ভেতরের আসল শক্তিসমূহকে জাগিয়ে তুলতে।
–
দুপুর বারোটা। সাউথ বোস্টনের ‘ম্যাকল্যারেনস ক্যাফে’। ক্যাফের বাতাস যথারীতি পোড়া মাংস, তেল আর কফির গন্ধে মুখরিত। বুড়ো ও’মালি এক হাতে ফ্রাইং প্যান আর অন্য হাতে লোহার হাতা নিয়ে খদ্দেরকে গালি দিচ্ছে। দরজার ঘণ্টাটা বাজল। ও’মালি ধোঁয়ার আড়াল থেকে চোখ তুলে তাকাল। তার সামনে দাঁড়িয়ে ক্লারা আর জ্যাক। ক্লারা একদম সোজা হেঁটে গিয়ে কাউন্টারে মিউনিখ সিটি কোর্টের অফিশিয়াল সিল মারা কাগজ আর ও’মালির দেওয়া সেই ১,০০০ ডলারের আইনি পেমেন্ট রিসিপ্টটা সজোরে রাখল।
“মিস্টার ও’মালি,” ক্লারা কড়া গলায় বলল। “আপনার ১,০০০ ডলারের হিসেব মিউনিখের আইনি খাতায় জমা পড়েছে। আর আপনার ক্যাফের ট্যাক্স ফাইল আমি কালকের মধ্যে ক্লিয়ার করে দেব।”
ও’মালি চুরুটটা মুখ থেকে বের করে ক্যাশ বাক্সের ওপর থুথু ফেলার ভঙ্গি করল। সে কাগজটার দিকে এক নজর দেখে বিদ্রূপ করে বলল, “হাহ্! চশমাওয়ালি খুকি ফিরে এসেছে! ভেবেছিলাম রাজপুত্রকে নিয়ে জার্মানি পালিয়ে গিয়েছো, আর আমার এক হাজার ডলার জলে গেল!”
জ্যাক এগিয়ে এসে কাউন্টারে নিজের চওড়া হাত দুটো রাখল। সে ও’মালির একচোখা মুখের দিকে তাকিয়ে খুব গম্ভীর গলায় বলল, “মিলার ফ্যামিলির কেউ কারো টাকা মেরে পালায় না, মিস্টার ও’মালি। আর আমার বউয়ের কাজের দাম দেওয়ার মতো ক্ষমতা আপনার এই ক্যাফেটেরিয়ার পুরো বাজেটেও হবে না।”
ও’মালি প্যান হাতে থমকে দাঁড়াল। সে জ্যাকের চোখের কাটা দাগ আর কাটকাট মুখের দিকে তাকাল। তারপর এক রহস্যময় হাসি হেসে বলল, “বউ? ওহ্, তা খবরের কাগজের ওই বোস্টন ইউনিভার্সিটির ট্রোল পোস্টটা তবে সত্যি ছিল বল? মিলারের ছেলে শেষ পর্যন্ত এক অনাথ মেয়ের হিসেব ভাঙতে এসে নিজেই বন্দি হলো?”
জ্যাক কোনো রেগে গেল না। সে ও’মালির সামনে ঝুঁকিয়া পড়ে বলল, “বন্দি হওয়াটা সব সময় পরাধীনতা নয়, মালি। মাঝে মাঝে সঠিক মানুষের কাছে বন্দি হওয়াটাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় স্বাধীনতা।”
ও’মালি চুরুটটা আবার মুখে পুরে দিয়ে ডেস্কে চাপড় দিল। “ঠিক আছে, ঠিক আছে! বেশি দর্শন ঝাড়তে হবে না। আগে আমার পেছনের হেলপার থমাসের চুরির বাকি হিসেবটা মেলাও, তারপর প্রেমের গল্প শুনব!”
ক্লারা আর জ্যাক একে অপরের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল। সাউথ বোস্টনের এই ক্যাফেটেরিয়াটাই যেন আজ তাদের বিজয়ের প্রথম সাক্ষী হয়ে রইল।
চলবে?

