Home "ধারাবাহিক গল্প "Out Of Bounds Out Of Bounds পর্ব-২৯+৩০

Out Of Bounds পর্ব-২৯+৩০

0
1

#Out_Of_Bounds
#Ishrat_Jahan_Jarin
#part_29

বোস্টন লোগান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের ভিআইপি লাউঞ্জের ভেতরে তখন মিষ্টি ভোরের রোদ এসে আছড়ে পড়ছে। গতকাল রাতের সেই উত্তাল ঝড়-বৃষ্টির কোনো চিহ্ন আজ বোস্টনের আকাশে নেই। আকাশ এখন একদম পরিষ্কার, নীল রঙের ক্যানভাসে কিছু সাদা তুলোর মতো মেঘ অলসভাবে ভেসে বেড়াচ্ছে। লাউঞ্জের নরম চামড়ার সোফায় বসে ছিলেন আর্থার মিলার। তাঁর হাতে এক কাপ গরম কফি। কিন্তু আজ তাঁর বসার ভঙ্গিতে সেই পুরোনো অহংকার বা কাঠিন্য নেই। কয়েক গজ দূরে, এয়ারপোর্টের রানওয়ের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে ছিল জ্যাক আর ক্লারা। জ্যাকের পরনে আবার ইউএসএ টিমের অফিশিয়াল স্পোর্টস জ্যাকেট আর ট্রাউজার। ক্যালিফোর্নিয়ার অলিম্পিক ট্রেনিং ক্যাম্প থেকে এক রাতের জন্য বোস্টনে ছুটে এসেছিল সে স্রেফ তার পরিবার আর ক্লারার পাশে দাঁড়াতে। আজ সকালেই তাকে আবার ফিরতে হচ্ছে ক্যালিফোর্নিয়ায়, কারণ আগামী সপ্তাহে ইউএসএ টিমের ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম অফিশিয়াল সিলেকশন ম্যাচ।
জ্যাক ক্লারার দু-হাত নিজের বড় দুই হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে রেখেছে। ক্ল্যারার পরনে একটা গাঢ় সবুজ রঙের সুতির কোট আর কালো জিন্স। চশমার কাঁচের আড়ালে তার নীল চোখ দুটোতে বিচ্ছেদের একটা হালকা ছায়া ঝুলছে, কিন্তু একই সাথে জ্বলছে তৃপ্তির আলো।

“আমাকে আবার যেতে হচ্ছে, ক্লারা,” জ্যাক নিচু, কড়া গলায় বলল। তার ধূসর চোখ দুটো সোজা আটকে ছিল ক্লারার মুখের ওপর। “ক্যাম্পের কড়া নিয়ম। কোচ মার্কাস স্রেফ চব্বিশ ঘণ্টার জন্য ছাড় দিয়েছিলেন।”

ক্লারা হালকা হেসে জ্যাকের হাতের ওপর নিজের বুড়ো আঙুল বুলাতে লাগল। “আমি জানি, মিস্টার ক্যাপ্টেন। আপনি যান। ক্যালিফোর্নিয়ায় গিয়ে এবার শুধু বাস্কেটবল কোর্টের দিকে নজর দিন। বোস্টনের সমস্ত ঝড় এখন থামানো হয়ে গেছে।”

“ঝড় থামে নাই, মিস ক্যালকুলেটর,” জ্যাক এক পা এগিয়ে এসে ক্লারার কোমরটা এক হাতে জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের একদম কাছাকাছি টেনে আনল। “প্রকৃত ঝড় তো এখন আমার ভেতরে। তোমাকে বোস্টনে একা রেখে যাওয়ার ইচ্ছে আমার এক পার্সেন্টও নেই।”

“সবাই দেখছে, জ্যাক…” ক্লারা লজ্জা পেয়ে হালকা পিছন ফিরে তাকাল। কারণ কিছু দূরেই আর্থার মিলার আর লিয়ো দাঁড়িয়ে তাদের দিকেই তাকিয়ে ছিলেন।

“দেখুক,” জ্যাক কোনোরকম তোয়াক্কা না করে ক্লারার কপালে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল। সে দীর্ঘ কয়েক সেকেন্ড ক্লারার সুবাস নিজের বুকের গভীরে টেনে নিল। “সাউথ বোস্টনের ডর্ম রুমে আমার ফেরার রাস্তা পরিষ্কার রইল। চ্যাম্পিয়নশিপের ট্রফিটা হাতে পাওয়ার পর আমি তোমাকে নিতে আসব।”

জ্যাক সোজা হেঁটে গিয়ে আর্থার মিলারের সামনে দাঁড়াল। বাবা আর ছেলের মধ্যে বহু বছর ধরে জমতে থাকা সেই বরফের দেয়ালটি আজ সম্পূর্ণ গলে গেছে। দুজনেই দুজনের দিকে কয়েক সেকেন্ড নিঃশব্দে তাকিয়ে রইলেন। আর্থার মিলার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তিনি নিজের হাত বাড়িয়ে দিলেন ছেলের দিকে।

“নিজের খেয়াল রেখো, জ্যাক্সন,” আর্থার নিচু গলায় বললেন। “দেশকে ট্রফি এনে দাও। তোমার বাবার রাজপ্রাসাদ হয়তো টলে গিয়েছিল, কিন্তু আমি জানি আমার ছেলের রক্তে পরাজয় বলে কিছু নেই।”

জ্যাক তার বাবার বাড়ানো হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। তারপর হঠাৎ এক অবিশ্বাস্য কাণ্ড ঘটাল সে এক হাত দিয়ে নিজের গম্ভীর বাবাকে টেনে এনে সজোরে বুকে জড়িয়ে ধরল! আর্থার মিলার এক মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেলেন, তারপর তাঁর চোখ দুটো ভিজে উঠল। কত বছর পর সে তার ছেলেকে এভাবে বুকে জড়াল, তা তিনি নিজেও জানেন না।

“ধন্যবাদ, বাবা,” জ্যাক আর্থারের কানে ফিসফিস করে বলল। “ক্লারাকে আগলে রেখো। ও এখন এই পরিবারের আসল চালিকাশক্তি।”

জ্যাক আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। সে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে দ্রুত ক্যালিফোর্নিয়াগামী ফ্লাইটের গেটের দিকে হেঁটে চলে গেল।

দুপুর দুটো। সাউথ বোস্টনের কলোনি রোডের সেই পুরোনো তিনতলা ইটের বিল্ডিংটার সামনে একটা রাজকীয় দৃশ্য তৈরি হলো। সাধারণত এই সাধারণ মেহনতী মানুেষের এলাকায় বড় কোনো বিলাসবহুল গাড়ি আসে না। কিন্তু আজ সোজা এসে থামল আর্থার মিলারের নিজস্ব প্রকাণ্ড কালো মার্সিডিজ মেব্যাক লিমোজিন! গাড়ির পেছনে দুটি কালো রঙের সিকিউরিটি এসইউভি। রাস্তার পথচারীরা, ছোট ছোট দোকানদাররা অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে লিমোজিনটার দিকে তাকিয়ে রইল। লিমোজিনের পিছনের দরজা খুলে নেমে এলেন কোটিপতি বিলিয়নেয়ার আর্থার মিলার। তাঁর পরনে চারকোল গ্রে রঙের ক্লাসিক সুতোর থ্রি-পিস স্যুট, মাথায় ইতালিয়ান টুপি। তবে আজ তাঁর সাথে কোনো বডিগার্ডের লোহালক্কড় ছিল না। সে একাই ধীরে ধীরে হাঁটা ধরল তিনতলা পুরোনো ইটের বিল্ডিংটার ভেতরে। সিড়িগুলো বেশ পুরোনো, কাঠের পা দানিতে হাঁটার সময় মচমচ শব্দ হচ্ছিল।
তিনতলার শেষ মাথায়, ১২ নম্বর ডর্ম রুমের সামনে এসে থামলেন আর্থার। দরজার লাল রঙটা কিছুটা চটে গেছে, কিন্তু দরজার পাশে ছোট একটা পেতলের প্লেটে সুন্দর করে খোদাই করে লেখা, “বেনেট অ্যান্ড মিলার’s হোম।”

আর্থার মিলার কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে লেখাটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। যে পরিবার, যে বংশের নাম তিনি পেন্টহাউসের ৫০ তলায় বন্দি করে রেখেছিলেন, তাঁর একরোখা ছেলে আর এই অনাথ মেয়েটি মিলে সেই নামটাকে সাউথ বোস্টনের এই এক চিলতে ঘরে এনে এক পরম পবিত্র রূপ দিয়েছে! আর্থার দরজায় আলতো করে টোকা দিলেন। ভেতর থেকে চাবির ঘোরানোর শব্দ হলো। দরজা খুলে হাত বাড়াল ক্লারা।
সে ভেবেছিল লিয়ো বা প্রফেসর অ্যান্ডারসন এসেছেন। কিন্তু সামনে আর্থার মিলারকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ক্লারা এক মুহূর্তে চমকে গেল!

“স্যার… আই মিন, বাবা?” ক্লারা একটু অপ্রস্তুত হয়ে চশমাটা সোজা করল। “আপনি… আপনি সাউথ বোস্টনে?”

আর্থার মিলার মুচকি হাসলেন। তাঁর মুখে এখন এক প্রবীণ, ভালোবাসায় ভরা বাবার ভাবচ্ছবি।

“ভেতরে আসতে দেবে না, মা?” আর্থার নরম গলায় বললেন। “নাকি তোমার এই ‘বেনেট অ্যান্ড মিলার’-এর কড়া দরজায় কোটিপতিদের প্রবেশ নিষেধ?”

“না না! ছিঃ! ভেতরে আসুন!” ক্লারা দ্রুত সরে দাঁড়িয়ে পথ ছেড়ে দিল।

আর্থার মিলার ঘরে প্রবেশ করলেন। আঠারো বাই বারো ফুটের ছোট ঘর। এক কোণে একটা সাধারণ স্প্রিংয়ের সিঙ্গেল খাট, যার ওপর পরিষ্কার নীল সুতির চাদর বিছানো। অন্য কোণে পড়ার টেবিল যেখানে ছড়ানো রয়েছে হাজারো ফিনান্সিয়াল বই, ক্যালকুলেটর আর অডিটের ফাইল। আর মাঝখানে ছোট একটা কাঠের ডাইনিং টি-টেবিল। ঘরটায় কোনো কোটি টাকার ঝাড়বাতি নেই, কিন্তু চারপাশের প্রতিটা কোণে জড়িয়ে আছে এক অদ্ভুত নিবিড় উষ্ণতা আর সুবাস। আর্থার মিলার অলসভাবে ঘরের দেয়ালে ঝুলতে থাকা একটা ফ্রেমের দিকে তাকালেন। ওটা বোস্টন ইউনিভার্সিটির ফার্স্ট ইয়ারের একটা ছবি যেখানে চশমা পরা ক্লারা একটা ট্রফি হাতে দাঁড়িয়ে আছে, আর তার পাশে হাত বাড়িয়ে হাসছে জ্যাক্সন মিলার। আর্থার টেবিলের পাশের সাধারণ কাঠের চেয়ারটায় এসে বসলেন।

“ঘরটা খুব ছোট, তাই না?” আর্থার এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন।

ক্লারা দ্রুত ছোট গ্যাসের স্টোভটায় চায়ের জল চাপিয়ে দিয়েছিল। সে কাপে ইতালিয়ান কফি আর বিস্কুট গুছিয়ে ডেস্কে এনে রাখল।

“ঘর ছোট হতে পারে, বাবা,” ক্লারা খুব শান্ত, মিষ্টি গলায় বলল। “কিন্তু এই ঘরের ভেতর কোনো মিথ্যে নেই। কোনো চক্রান্ত নেই। এখানে আমি আর জ্যাক যখন রাতে ঘুমাই, আমাদের মাথার ওপর কোটি টাকার ঋণের চাপ থাকে না। থাকে নিজেদের উপার্জনের স্বস্তি।”

আর্থার কফির কাপটা হাতে নিলেন। তিনি এক চুমুক দিয়ে চুপ করে রইলেন। তাঁর মনের ভেতরের অনুশোচনার অগ্নিশিখা তাঁকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল।

“ক্লারা,” আর্থার কফির কাপটা টেবিলে রেখে ক্লারার দিকে সোজা তাকালেন। “আমি তোমাকে ১০ মিলিয়ন ডলারের চেক দিয়েছিলাম। তোমাকে সাউথ বোস্টনের বস্তির মেয়ে বলে গালি দিয়েছিলাম। বলেছিলাম তুমি আমার ছেলের যোগ্য নও।”

ক্লারা কোনো কথা না বলে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।

“আজ আমি তোমার কাছে কোনো বিলিয়নেয়ার হিসেবে আসিনি,” আর্থার মিলারের গলার স্বর কেঁপে উঠল। তাঁর প্রবীণ চোখ দুটো জলে ভরে এলো। “আজ আমি এসেছি এক ব্যর্থ বাবা হিসেবে। যে বাবা নিজের অহংকারের দম্ভে অন্ধ হয়ে নিজের ছেলের আসল সুখকে চিনতে পারেনি। যে বাবা বুঝতে পারেনি যে তার ছেলের সবচেয়ে বড় শক্তি এই চশমা পরা অনাথ মেয়েটি।”

আর্থার চেয়ার ছেড়ে উঠে সোজা ক্লারার সামনে এসে দাঁড়ালেন।

তিনি নিজের হাত দুটো বাড়িয়ে ক্লারার মাথায় রাখলেন। “আমাকে কি ক্ষমা করা যায় না, মা?” আর্থার কান্নাভেজা গলায় বললেন। “তুমি যদি আমাকে ক্ষমা না করো, তবে মরেও আমি আমার স্ত্রীর কাছে মুখ দেখাতে পারব না। জ্যাক হয়তো বলেনি তার আপন মা ছোট কালেই মারা গিয়েছিল। সে মারা যাওয়ার সময় বলে গিয়েছিল, ‘আর্থার, আমাদের জ্যাক্সনকে কোনো দিন টাকার খাঁচায় বন্দি করো না। ওকে ভালোবাসার মুক্ত আকাশ দিও।’ আমি তা পারিনি, ক্লারা। কিন্তু তুমি তা পেরেছ।”

ক্লারা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। তার চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। সে আর্থার মিলারের পা ছুঁয়ে প্রণাম করার মতো করে ঝুঁকে পড়ল, কিন্তু আর্থার সাথে সাথে ক্লারাকে দুই হাত ধরে তুলে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলেন। “না, মা! না!” আর্থার বললেন। “আজ থেকে তুমি আমার মেয়ে। আমার পরিবারে যদি কোনো রাজপ্রাসাদ থাকে, তবে তার আসল চাবিকাঠি এখন তোমার হাতে।” সাউথ বোস্টনের সেই ছোট ডর্ম রুমটার বাতাস এক মুহূর্তে পরম একাত্মতা আর পারিবারিক মায়ায় ভরে গেল। ভাঙা সম্পর্কগুলো আজ জোড়া লেগেছে এক অনাবিল ভালোবাসার শক্ত সুতোয়।

বিকেল চারটে। বোস্টন ডাউনটাউনের সেই পেন্টহাউস। তবে আজকের পেন্টহাউসের পরিবেশ সম্পূর্ণ ভিন্ন। লিগ্যাল টিম, সিকিউরিটিজ কমিশনের অ্যাসিস্ট্যান্ট আর ব্যাঙ্কারদের দল কনফারেন্স টেবিলে ফাইল গুছিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। আর্থার মিলার বড় চেয়ারাটায় বসেছিলেন। আর তাঁর ঠিক ডানপাশের মূল প্রধান চেয়ারে বসানো হয়েছিল ক্লারা বেনেটকে। আর্থার মিলারের নিজস্ব প্রধান অ্যাটর্নি মিস্টার স্টিভেনসন একখানা বেশ লাল চামড়ার মোটা অফিশিয়াল আইনি দলিল টেবিলের ওপর মেললেন।

“মিস বেনেট,” স্টিভেনসন সাহেব অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে বললেন। “মিস্টার আর্থার মিলারের বিশেষ নির্দেশে এই ট্রাস্ট দলিলটি তৈরি করা হয়েছে। ‘মিলার কর্পোরেশন’-এর ৪০% অফিশিয়াল ওটিং শেয়ার এবং এর সমস্ত নতুন ফিনান্সিয়াল অডিট ডিরেক্টরি পারমিট আজ থেকে আপনার নামে ট্রান্সফার করা হচ্ছে।”

ক্লারা চোখ বড় বড় করে তাকাল। “কী বলছেন আপনি?! ৪০ পার্সেন্ট শেয়ার?! বাবা, এটা অসম্ভব! আমি এই টাকা বা শেয়ার নিতে পারব না!”

আর্থার মিলার হাত তুলে ক্লারাকে থামিয়ে দিলেন।

তিনি টেবিল থেকে মিলার বংশের শতাব্দীর পুরোনো পারিবারিক সোনা ও হীরে খচিত ভেলভেটের জুয়েলারি বাক্সটি বের করলেন। বাক্সটি খুলতেই তার ভেতর থেকে ঠিকরে বেরুলো এক অপরূপ এনটিক ডায়মন্ডের নেকলেস আর আংটি যা মিলার বংশের প্রথম পুরুষ তাঁর স্ত্রীকে উপহার দিয়েছিলেন এবং যা বংশের প্রতিটি প্রজন্মের ‘বড় বউ’-এর গলায় শোভা পায়। আর্থার নিজ হাতে বাক্সের আংটিটি বের করে ক্লারার ডান হাতের অনামিকায় পরিয়ে দিলেন।

“এটা কোনো দয়া বা দান নয়, ক্লারা,” আর্থার কড়া কিন্তু পরম ভালোবাসার গলায় বললেন। “এটা তোমার নিজের উপার্জিত সত্যের মূল্য। যে মেয়েটা নিজের মেধা দিয়ে এই মিলার কর্পোরেশনকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচিয়েছে, সেই মেয়েটি ছাড়া আর কারোর এই শেয়ার বা এই আংটি পরার অধিকার নেই।”

কনফারেন্স রুমে উপস্থিত প্রতিটি প্রবীণ আইনি কর্মকর্তা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে উঠলেন!

“আর শোনো,” আর্থার মিষ্টি করে হাসলেন। “জ্যাক্সন ক্যালিফোর্নিয়ায় আছে। কিন্তু আমি চাই না তোমরা এই সাউথ বোস্টনের ছোট রুমে সারাজীবন কষ্ট করো। বোস্টন হারবারের পাশে যে প্রাইভেট ভিলাটা রয়েছে, ওটা আজ থেকে ‘বেনেট অ্যান্ড মিলার’-এর নিজস্ব রাজপ্রাসাদ। আমি নিজে তোমাদের বিয়ের সমস্ত আয়োজন করব।”

ক্লারা তার নিজের হাতের ডায়মন্ডের আংটিটার দিকে তাকিয়ে রইল।

সোনার আলোয় চশমা পরা অনাথ মেয়েটির রূপ যেন আজ এক প্রকৃত রানীর মতো জ্বলজ্বল করছিল। সে কোনো অন্যায় করে, কোনো জালিয়াতি করে বা কারও দয়ায় এই পদে আসেনি সে এসেছে নিজের সততা, অদম্য মেধা আর ভালোবাসার শক্তিতে ভর করে।


লস এঞ্জেলেসের অলিম্পিক বাস্কেটবল স্টেডিয়াম।
স্টেডিয়ামে তখন প্র্যাকটিস ম্যাচের চূড়ান্ত তাণ্ডব চলছে। ইউএসএ ন্যাশনাল দলের মেইন স্কোয়াডের বিরুদ্ধে ট্রায়াল দলের মেগা স্কোয়াড ড্রিল। কোর্টে পয়েন্ট গার্ড পজিশনে খেলছিল জ্যাক্সন মিলার। তার পরনে সবুজ ইউএসএ স্পোর্টস জার্সির নম্বর ৭। কপাল থেকে ঝরঝর করে ঘাম ঝরছিল, চোখ দুটোয় সেই পরিচিত হিংস্র বাস্কেটবল একাগ্ৰতা। সে একাই অপোনেন্ট টিমের দু-তিনজনকে কাটিয়ে স্পিন ড্রিবলিং করে সোজা হাওয়ায় ভেসে উঠে এক প্রকাণ্ড ‘টু-হ্যান্ড অলিম্পিক স্ল্যাম ড্যাঙ্ক’ মারল। রিংয়ের স্টিলের রড বিকট শব্দে কেঁপে উঠল! গ্যালারিতে বসে থাকা ইউএসএ টিমের হেড কোচ মার্কাস হুইসেল বাজিয়ে চিৎকার করে উঠলেন, ‘ফিক্সড! দ্যাটস দ্য ক্যাপ্টেন উই নিড!*

প্র্যাকটিস সেশনের বিরতিতে জ্যাক তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে ড্রেসিংরুমে এলো। তার ফোনটা বেঞ্চের ওপর রাখা ছিল। সে ফোনটা হাতে নিতেই দেখল পেন্টহাউসের প্রাইভেট সিকিউর ফাইল থেকে একটা ছবি এসেছে। ছবিটা দেখে জ্যাকের হাতের তোয়ালেটা খসে পড়ে গেল!

ছবিতে দেখা যাচ্ছে, পেন্টহাউসের মূল চেয়ারে বসে আছে ক্লারা বেনেট। তার গলায় ঝুলছে সেই সোনার লকেট, আর ডান হাতে জ্বলজ্বল করছে মিলার বংশের শতাব্দী পুরোনো সেই ‘বড় বউ’-এর রাজকীয় ডায়মন্ড রিং! আর তার পাশে হাত ধরে অতি গর্বিত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন স্বয়ং আর্থার মিলার!

ছবির নিচে আর্থার মিলারের নিজের হাতে পাঠানো এক লাইনের টেক্সট বার্তা,

“জ্যাক্সন, মিলার বংশের আসল রানীকে আমি তাঁর যোগ্য সিংহাসনে বসিয়ে দিয়েছি। এবার ক্যালিফোর্নিয়া থেকে দেশের ট্রফি নিয়ে ঘরে ফেরো। তোর বাবা তোদের রাজকীয় বিয়ের জন্য অপেক্ষা করছে।”

জ্যাকের ধূসর চোখ দুটোয় এক পরম আনন্দের জলকণা ফুটে উঠল। জ্যাক ফোনটা নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল।

“তুমি সত্যি অংক মেলাতে পারো, মিস ক্যালকুলেটর,” সে নিজের মনে ফিসফিস করে বলল। “বোস্টন তুমি জয় করে ফেলেছ। এবার ক্যালিফোর্নিয়া থেকে পুরো আমেরিকাকে জয় করে আমি তোমার কাছে ফিরছি।”

চলবে?

#আউট_অফ_বাউন্ডস
#পার্ট_৩০
#ইশরাত_জাহান_জেরিন

লস এঞ্জেলেসের ‘স্ট্যাপলস সেন্টার’ আজ কানায় কানায় পূর্ণ। পঁচিশ হাজার দর্শকের উন্মাদনায় কাঁপছে সুবিশাল ইনডোর স্টেডিয়াম। আজ ‘ইউএসএ বাস্কেটবল ন্যাশনাল ট্রফি’-এর মহাকাব্যিক ফাইনাল ম্যাচ। একদিকে ক্যালিফোর্নিয়া অলিম্পিক প্রাইম টিম, আর অন্যদিকে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের জন্য নির্বাচিত ইউএসএ অল-স্টার স্কোয়াড যার নেতৃত্বে রয়েছে বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা ৬ ফুট ৩ ইঞ্চির পয়েন্ট গার্ড, জ্যাক্সন মিলার। স্টেডিয়ামের চোখ ধাঁধানো স্পটলাইটের আলো আছড়ে পড়ছিল কাঠের চকচকে লাল-নীল কোর্টের ওপর। গ্যালারিতে উড়ছিল হাজারো পতাকা, ড্রামের কড়া শব্দের সাথে দর্শকদের চিৎকার প্রতিধ্বনি তৈরি করছিল, মিলার! মিলার! মিলার!”

ভিআইপি গ্যালারির একদম প্রথম সারিতে বসেছিলেন তিনজন অতি বিশেষ অতিথি। মাঝখানে চারকোল গ্রে স্যুট পরে বসেছিলেন আর্থার মিলার। তাঁর ঠিক ডানপাশে বসে ছিলেন বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ প্রফেসর উইলিয়াম অ্যান্ডারসন। আর আর্থার মিলারের বাঁপাশে বসে ছিল ক্লারা বেনেট। ক্লারার পরনে আজ একখানা মার্জিত গাঢ় নীল রঙের কোট-ট্রাউজার। চুলগুলো পেছনের দিকে সুন্দর করে খোঁপা করা, চোখে সেই সুপরিচিত মোটা ফ্রেমের চশমা। তবে তার গলায় ঝুলছিল জ্যাকের দেওয়া সেই সোনার লকেট, আর ডান হাতের অনামিকায় জ্বলজ্বল করছিল মিলার বংশের শতাব্দী পুরোনো ডায়মন্ড রিং।

“নার্ভাস লাগছে, মা?” আর্থার মিলার কফির মগ হাতে ক্লারার দিকে তাকিয়ে পরম মমতায় জিজ্ঞেস করলেন।

ক্লারা চশমাটা নাকের ওপর সামান্য সোজা করল। তার নীল চোখ দুটো কোর্টের দিকে নিবদ্ধ। “একদম না, বাবা। যে পুরুষ বোস্টনের সমস্ত চক্রান্ত আর অপমানের মুখে দাঁড়িয়ে নিজের চরিত্র হারায়নি… ক্যালিফোর্নিয়ার এই কোর্টে তাকে হারানোর ক্ষমতা কারও নেই।”

প্রফেসর অ্যান্ডারসন মিটিমিটি হেসে পাইপটা মুখে দিলেন। “ক্লারা ঠিকই বলেছে, আর্থার। তোমার ছেলে আজ শুধু বাস্কেটবল খেলবে না, সে আজ তার ভালোবাসার প্রতিদান দিতে কোর্টে নেমেছে।”

ঠিক তখনই অ্যানাউন্সার মাইকে চিৎকার করে উঠল,

“লেডিস অ্যান্ড জেন্টলমেন! প্লিজ ওয়েলকাম দ্য ক্যাপ্টেন অফ ইউএসএ অল-স্টার্স নম্বর সেভেন, জ্যাক্সন মিলার!”

পুরো স্টেডিয়াম এক মুহূর্তে বিকট গর্জনে ফেটে পড়ল! জ্যাক কোর্টে ঢুকল। তার গায়ে গাঢ় সবুজ ও সোনালী রঙের নম্বর ৭ জার্সি। কপাল থেকে ঘামের কণা গড়িয়ে পড়ছে, চোখের দৃষ্টি বরফের মতো ঠাণ্ডা আর শিকারী চিতার মতো তীক্ষ্ণ। কোর্টে নেমেই জ্যাক একবার সোজা তাকাল ভিআইপি গ্যালারির দিকে।
হাজার হাজার মানুষের ভিড়ের মাঝেও তার ধূসর চোখ দুটো এক নিমিষে খুঁজে নিল সেই চশমা পরা অনাথ মেয়েকে। জ্যাক নিজের ডান হাতের মুঠিটা বুকের ঠিক মাঝখানে চেপে ধরে ক্লারার দিকে এক কড়া হাসি উপহার দিল। ক্লারা দূর থেকেই নিজের হাতটা আলতো করে উঁচিয়ে তাকে শুভকামনা জানাল। দুজনের চোখের ভাষায় চার হাজার মাইলের দূরত্ব আর বিরহ যেন এক সেকেন্ডে মুছে গেল।

বাঁশি বেজে উঠল। রেফারি শূন্যে বল ছুড়ে দিতেই ফাইনাল ম্যাচের মহাসংগ্রাম শুরু হয়ে গেল! প্রথম কোয়ার্টার থেকেই ম্যাচটা ভীষণ অ্যাগ্রেসিভ মোড় নিল। ক্যালিফোর্নিয়া ডায়নামোসের প্রধান ডিফেন্ডার ছিলেন লস এঞ্জেলেসের অভিজ্ঞ বাস্কেটবল প্লেয়ার ‘বিগ ডন’ ছয় ফুট সাত ইঞ্চির এক প্রকাণ্ড জায়ান্ট।

ডনের মূল স্ট্র্যাটেজিই ছিল জ্যাককে ফাউল ট্র্যাপে ফেলা এবং শারীরিক শক্তিতে কোণঠাসা করা। প্রথম দশ মিনিটের মাথায় ক্যালিফোর্নিয়া দল ১০-৪ পয়েন্টে এগিয়ে গেল। ডন একাধারে দুটো কঠিন ব্লকিং করে জ্যাককে ধাক্কা দিয়ে মেঝের ওপর ফেলে দিল! কাঠের কোর্টে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেল জ্যাক। গ্যালারিতে বসা ক্লারা এক মুহূর্তে হাত শক্ত করে চেয়ারের হাতল চেপে ধরল। তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। রেফারি ফাউলের বাঁশি বাজালেন না। ক্যালিফোর্নিয়ার দর্শকরা উল্লাসে ফেটে পড়ল।
ডন জ্যাকের সামনে এসে ঝুঁকে বিষাক্ত গলায় বলল, “এটা বোস্টনের কলেজের বাস্কেটবল নয়, মিলার! এটা ন্যাশনাল ফাইনাল। এখানে ধনী বাপের আদুরে ছেলেদের জায়গা হয় না।”

জ্যাক মেঝের ওপর এক হাতে ভর দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার কনুই ছিলে রক্ত বেরাচ্ছিল। কিন্তু সে রক্তের দিকে এক নজরও তাকাল না। সে স্রেফ নিজের কপাল থেকে ঘাম মুছে, ঠোঁটের কোণে জমা রক্ত চুষে নিল। তার ধূসর চোখে ফুটে উঠল এক পৈশাচিক, খুনে মেজাজ।

“তোমার কথা শেষ হয়েছে, ডন?” জ্যাকের গলার স্বর ছিল অস্বাভাবিক নিচু আর ঠাণ্ডা। “এবার আসল বাস্কেটবলটা দেখে নাও।”

পরের পাঁচ মিনিটে কোর্টে যা ঘটল, তা ক্যালিফোর্নিয়ার বাস্কেটবল ইতিহাসে এক অবিশ্বাস্য তাণ্ডব! জ্যাক বল হাতে নেওয়ার পর যেন এক বায়বীয় বিদ্যুতে পরিণত হলো। তার স্পিন ড্রিবলিং আর নো-লুক পাসিংয়ের সামনে ক্যালিফোর্নিয়ার পুরো ডিফেন্স তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে লাগল। প্রথম ৩-পয়েন্টার! বল একদম শূন্যে ভেসে সোজা নেট গলে ঢুকে গেল। পরের মিনিটে লং-রেঞ্জ ড্রাইভ করে ডনের মতো প্রকাণ্ড জায়ান্টকে সম্পূর্ণ ফাঁকি দিয়ে জ্যাক এক হাতে মারল উল্টো ড্যাঙ্ক।
পয়েন্ট টেবিল এক নিমেষে বদলে গেল ২৮-২৬! ইউএসএ অল-স্টার্স এগিয়ে গেল! গ্যালারিতে বসা আর্থার মিলার উত্তেজনায় সোজা দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে উঠলেন। “দ্যাটস মাই বয়! দ্যাটস জ্যাক্সন মিলার!”

হাফ-টাইমের বিরতিতে ড্রেসিংরুমে তখন চরম উত্তেজনা। টিমের ফিজিও জ্যাকের বাঁ হাঁটু আর কনুইয়ে বরফের প্যাক চেপে ধরে ব্যান্ডেজ করছে। প্রথম কোয়ার্টারের কঠিন ধাক্কায় জ্যাকের হাঁটুর পুরোনো চোটটা আবার চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। হেড কোচ মার্কাস তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে চিন্তিত গলায় বললেন, “জ্যাক, তোমার হাঁটু সোজা হতে চাইছে না। আমি তোমাকে শেষ কোয়ার্টারে বেঞ্চে বসাতে চাই। আমরা রিস্ক নিতে পারি না।”

জ্যাক সোফা ছেড়ে এক ঝটকায় দাঁড়িয়ে পড়ল। তার ফ্যাকাশে মুখে ফোটানো কড়া একরোখা জেদ। “আমাকে বেঞ্চে বসানোর কথা দ্বিতীয়বার বলবেন না, কোচ,” জ্যাক নিজের পায়ের ব্যান্ডেজটা আরও শক্ত করে টানল। “আজকের ম্যাচটা স্রেফ একটা ট্রফি জেতার ম্যাচ নয়। আজ আমার পুরো জীবন, আমার সম্মান আর আমার ভালোবাসার প্রমাণের রাত। আমি যদি এক পায়ে খুঁড়িয়েও খেলি, তবুও এই ট্রফি বোস্টনে যাবে।”

কোচ মার্কাস জ্যাকের চোখের দিকে তাকিয়ে আর একটি কথাও বলতে পারলেন না। এই ছেলের রক্তে হার মেনে নেওয়ার কোনো ব্যাকডেটেড ফাইল নেই।
তৃতীয় কোয়ার্টারে খেলা শুরু হতেই ক্যালিফোর্নিয়া দল আরও বেশি নোংরা ফাউল গেম শুরু করল।
তারা জানে জ্যাকের বাঁ হাঁটুতে চোট আছে। প্রতিবার শট নেওয়ার সময় তারা জ্যাকের বাঁ পায়ে আঘাত করার চেষ্টা করছিল। খেলার আর মাত্র তিন মিনিট বাকি। স্কোরবোর্ডে টাই। উত্তেজনায় পঁচিশ হাজার দর্শক আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। প্রতিটা সেকেন্ডের সাথে সাথে বায়ুমণ্ডলে চাপ বাড়ছিল।
জ্যাক বল ড্রিবল করছিল। তার বাঁ হাঁটুতে তীব্র যন্ত্রণা হচ্ছিল, প্রতি পদক্ষেপে মনে হচ্ছিল কেউ যেন সুঁচ ফোটাচ্ছে। কপাল বেয়ে ঝরঝর করে ঘাম ঝরছিল তার, দৃষ্টি আংশিক ঘোলাটে হয়ে আসছিল। গ্যালারি থেকে ক্লারা আর স্থির থাকতে পারল না। সে সোজা সিকিউরিটি ব্যারিকেডের সামনে এসে দাঁড়াল।
ক্লারা নিজের দুই হাত উঁচিয়ে, চশমা পরা চোখ দুটো দিয়ে কড়া দৃষ্টিতে জ্যাকের দিকে তাকাল। সে চিৎকার করে বলল, “জ্যাক্সন মিলার! ইউ আর নট আলাউড টু লুজ টুডে!”

ক্ল্যারার সেই স্পষ্ট, তীব্র আর ভালোবাসায় ভরা চিৎকার পুরো স্টেডিয়ামের শোরগোল চিরে সরাসরি গিয়ে আছড়ে পড়ল জ্যাকের কানে! জ্যাক এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে ঘাড় উঁচিয়ে ক্লারাকে দেখল। সোনার লকেটটা মোমবাতির আলোর মতো জ্বলছিল ক্লারার বুকে। জ্যাকের হাঁটু থেকে সমস্ত যন্ত্রণা যেন এক মুহূর্তে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল! তার ভেতরের সমস্ত ঘুমন্ত সিংহ এক সাথে জেগে উঠল।

খেলার শেষ দশ সেকেন্ড। স্কোরবোর্ড: ক্যালিফোর্নিয়া ডায়নামোস—৯১, ইউএসএ অল-স্টার্স—৯০!
ক্যালিফোর্নিয়া এক পয়েন্টে এগিয়ে। বল এখন জ্যাকের হাতে। পুরো স্টেডিয়াম থমথমে নীরবতায় ডুবে গেছে। ধারাভাষ্যকারের গলা উত্তেজনায় কাঁপছে, “সেকেন্ডস আর টিকিং ডাউন! ৭… ৬… ৫… মিলার হ্যাজ দ্য বল!”

ক্যালিফোর্নিয়ার তিনজন ডিফেন্ডার যার মধ্যে ‘বিগ ডন’ নিজে সামনে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে—
জ্যাককে থ্রি-পয়েন্ট আর্কের বাইরে ঘিরে ফেলেছে। কোনো পাস দেওয়ার মতো জায়গা নেই, ভেতরে ঢোকার পথ সম্পূর্ণ বন্ধ। জ্যাক ড্রিবলিং থামাল।
তার চারপাশের সমস্ত শব্দ যেন এক মুহূর্তে নিভে গেল। সে আর পঁচিশ হাজার দর্শককে দেখতে পাচ্ছিল না, সে আর ডনের হুঙ্কার শুনতে পাচ্ছিল না। তার চোখের সামনে কেবল ভেসে উঠছিল সাউথ বোস্টনের সেই ছোট তিনতলার ডর্ম রুম, ডেস্কে বসে অংক মেলাতে থাকা ক্লারার মিষ্টি মুখ আর সেই জয়ের দিনগুলো। ৪ সেকেন্ড… জ্যাক তার বাঁ পায়ের যন্ত্রণাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে, ডান পায়ে বল ব্যাক-ড্রিবল করল। ফেক শট! ডন ভেবেছিল জ্যাক ভেতরে ঢুকবে, তাই সে ডানদিকে ঝুকল। কিন্তু জ্যাক এক অবিশ্বাস্য হেজিটেশন মুভ নিয়ে সোজা দু-পা পেছনে সরে গেল,‘স্টেপ-ব্যাক হাফ-কোর্ট লাইন’!
৩ সেকেন্ড… জ্যাক হাওয়ায় ভেসে উঠল! হাঁটুর সমস্ত শক্তি এক জায়গায় করে সে শূন্যে শরীরটাকে ধনুকের মতো বাঁকাল। তার শরীর ক্যালিফোর্নিয়ার তিন ডিফেন্ডারের হাত ছাড়িয়ে একদম শূন্যে স্থির হয়ে গেল। ২ সেকেন্ড… জ্যাক তার ডান হাতের কবজি নিখুঁত ভঙ্গিতে বাঁকাল। বলটি তার আঙুলের ডগা ছেড়ে সোজা শূন্যে উড়াল দিল, আর্ক শট!
১ সেকেন্ড… কালো-কমলা রঙের বাস্কেটবলটি স্টেডিয়ামের সুবিশাল হাই-ভোল্টেজ স্পটলাইটের আলো চিরে এক দীর্ঘ বাঁকা পথ অতিক্রম করে সোজা গিয়ে নামল প্রতিপক্ষের রিংয়ের ভেতর!
কোনো বোর্ডের ছোঁয়া নয়, কোনো রিংয়ের ঘষা নয় বল একদম নিখুঁতভাবে নেট চিরে নিচে নেমে এলো!
একই সাথে বাজনা বেজে উঠল।
স্কোরবোর্ড এক মুহূর্তে বদলে গেল৷ ইউএসএ অল-স্টার্স: ৯৩, ক্যালিফোর্নিয়া ডায়নামোস: ৯১!

এক সেকেন্ডের নিস্তব্ধতা… এবং তারপর পুরো স্ট্যাপলস সেন্টার এক সাথে গর্জে উঠল! ইউএসএ টিমের খেলোয়াড়রা উন্মাদের মতো কোর্টে দৌড়ে এসে জ্যাককে ঘিরে ফেলল। তারা জ্যাককে শূন্যে তুলে আছাড়-পিছাড় উল্লাসে মেতে উঠল!
গ্যালারিতে বসা আর্থার মিলার হাত উঁচিয়ে শিশুদের মতো চেঁচিয়ে উঠলেন, আর প্রফেসর অ্যান্ডারসন চোখে জল নিয়ে হাততালি দিতে লাগলেন।
স্টেডিয়ামের মাঝখানে তৈরি করা হলো জমকালো পডিয়াম। ইউএসএ বাস্কেটবল অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট স্বহস্তে সুবিশাল স্বর্ণালী ‘ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপ ট্রফি’ আর ‘মোস্ট ভ্যালুয়েবল প্লেয়ার (MVP)’ মেডেল তুলে দিলেন জ্যাকের হাতে। সোনার মেডেলটি গলায় ঝোলানোর পর, পুরো স্টেডিয়ামের শয়ে শয়ে ক্যামেরা আর স্যাটেলাইট লাইভ ফোকাস করল জ্যাকের দিকে। ন্যাশনাল টিভি চ্যানেলের কোটি কোটি দর্শক তখন স্ক্রিনের সামনে। অ্যানাউন্সার মাইক এগিয়ে দিলেন জ্যাকের মুখে। “মিস্টার মিলার! অবিশ্বাস্য জয়! চার মাসের ট্রেনিং ক্যাম্পের পর এই ঐতিহাসিক ট্রফি জয়ের পর আপনি দেশবাসীকে কী বলতে চান?”
জ্যাক ট্রফিটা এক হাতে ধরে মাইকটা হাতে নিল। সে হাঁপাচ্ছিল, তার কপাল বেয়ে রক্ত আর ঘামের ফোঁটা মিশে গড়িয়ে পড়ছিল। জ্যাক ভিড়ের দিকে না তাকিয়ে সোজা ক্যামেরার লেন্সের দিকে তাকাল যেখান থেকে গ্যালারিতে থাকা ক্লারা তাকে দেখছিল।

“এই ট্রফি… এই মেডেল… এই সমস্ত সাফল্য আমার একার নয়,” জ্যাকের ভারী, কড়া কিন্তু পরম ভালোবাসায় ভরা গলার স্বর পুরো স্টেডিয়াম চিরে লাইভ টিভিতে ছড়িয়ে পড়ল।

“চার মাস আগে আমি যখন ক্যালিফোর্নিয়ায় আসি, তখন আমার কাছে কিছুই ছিল না। কিন্তু বোস্টনে এক অনাথ মেয়ে ছিল… যার চশমার আড়ালে ছিল আস্ত এক আত্মসম্মানের রাজ্য। যে মেয়েটা নিজের মেধা দিয়ে আমার ভাঙা পরিবারকে জোড়া দিয়েছে, আমার সম্মান বাঁচিয়েছে।”

জ্যাক পডিয়াম থেকে নেমে সোজা হেঁটে গেল ভিআইপি গ্যালারির দিকে। সিকিউরিটি গার্ডরা পথ ছেড়ে দিল। জ্যাক বাস্কেটবল কোর্টের ব্যারিকেড টপকে এসে দাঁড়াল ক্লারার ঠিক সামনে! পঁচিশ হাজার দর্শক আর লাইভ টিভির কোটি কোটি মানুষ নিঃশ্বাস বন্ধ করে এই দৃশ্য দেখছিল। জ্যাক নিজের গলা থেকে সেই স্বর্ণালী MVP মেডেলটি খুলে আলতো করে পরিয়ে দিল ক্লারার গলায় সোনার লকেটের ঠিক পাশটিতে। তারপর, বোস্টনের রাজপুত্র, আমেরিকার ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন বাস্কেটবল ক্যাপ্টেন জ্যাক্সন মিলার পঁচিশ হাজার মানুষের সামনে, লাইভ ক্যামেরার সামনে বাঁ হাঁটু গেড়ে মেঝের ওপর বসে পড়ল! সে তার পকেট থেকে বের করল মিলার বংশের সেই পারিবারিক ডায়মন্ড রিংয়ের নিজস্ব পেয়ার রিংটি।

“ক্লারা বেনেট,” জ্যাক তার ধূসর চোখের সমস্ত প্রেম ঢেলে দিয়ে কড়া অথচ পরম আর্দ্র গলায় বলল। “তুমি আমার অংক মিলিয়ে দিয়েছ। এবার কি তোমার এই একরোখা বাস্কেটবল প্লেয়ারকে সারাজীবনের জন্য নিজের সাম্রাজ্যে স্থায়ী ফাউল ট্র্যাপে বন্দি করার অনুমতি দেবে? উইল ইউ ম্যারি মি, মিস ক্যালকুলেটর?”

ক্লারা নিজের দুই হাতে মুখ ঢেকে ফেলল। তার নীল চোখ দুটো জলে ভেসে যাচ্ছিল, চশমার কাঁচ বাষ্পে ঘোলা হয়ে গিয়েছিল।

সে আর এক মুহূর্তও নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।
ক্লারা কোনো কথা না বলে হাঁটু গেড়ে বসে সজোরে জ্যাকের বুকে গিয়ে আছড়ে পড়ল! তার দু-হাত শক্ত করে জড়িয়ে ধরল জ্যাকের চওড়া পিঠ।

“ইয়েস, জ্যাক! ইয়েস! আ থাউজ্যান্ড টাইমস ইয়েস!” ক্লারা কান্নাভেজা গলায় চিৎকার করে বলল।

জ্যাক ক্লারাকে দুই বাহুতে শূন্যে তুলে ঘুরাতে লাগল।
পুরো স্টেডিয়াম এক সাথে দাঁড়িয়ে করতালি ও জয়ধ্বনিতে কেঁপে উঠল, “করতালি! করতালি!” আর্থার মিলার পাশে দাঁড়িয়ে গর্বের সাথে হাততালি দিতে দিতে চোখের জল মুছলেন। আজ কোনো অনাথ মেয়ের পরাজয় হয়নি, আজ জয় হয়েছে ভালোবাসার, সততার এবং এক অপরাজেয় রাজপুত্রের ফিরে আসার!

চলবে?