#আউট_অফ_বাউন্ডস
#পর্ব_৩১
#ইশরাত_জাহান_জেরিন
লস এঞ্জেলেসের প্রাইভেট এভিয়েশন হ্যাঙ্গার থেকে যখন বোস্টনগামী স্পেশাল চ্যাটার্ড ফ্লাইটটি রানওয়ে ছাড়ল, তখন বোস্টনের আকাশে শেষ বিকেলের সোনালী-লাল আলো ছড়িয়ে পড়েছে। বিমানের ফার্স্ট ক্লাস কেবিনে একদম জানালার পাশের সিটে বসে ছিল ক্লারা। তার কোলের ওপর রাখা ছিল ন্যাশনাল বাস্কেটবল অ্যাসোসিয়েশনের তৈরি করা সেই ভারী, চকচকে মোস্ট ভ্যালুয়েবল প্লেয়ার (MVP) ট্রফিটি। তার গলায় জ্যাকের সোনার লকেটের পাশেই জ্বলজ্বল করছিল স্বর্ণালী মেডেলটি। দীর্ঘ কয়েক মাসের ক্লান্তি, আদালতের আইনি লড়াই, অংকের হিসাব মেলানোর মানসিক চাপ সব যেন আজ দূর হয়ে গেছে। ক্ল্যারার ঠিক পাশে সোফায় এলিয়ে বসে ছিল জ্যাক। তার পরনে একটা ক্যাজুয়াল সুতির টি-শার্ট আর জিন্স, বাঁ হাঁটুতে একটা হালকা ইলাস্টিক ব্যান্ডেজ বাঁধা। প্র্যাকটিস আর ফাইনাল ম্যাচের তাণ্ডবের পর তার চোখে ঘুম জমে ছিল, কিন্তু ক্লারার হাতটা সে এক মুহূর্তের জন্যও ছাড়েনি। তার বড়, উষ্ণ হাতের পাঁচ আঙুল পেঁচিয়ে ধরে রেখেছিল ক্লারার ছোট আঙুলগুলোকে। “কী ভাবছ, মিস ক্যালকুলেটর?” জ্যাকের নিচু, গভীর গলার আওয়াজে ক্লারা মুখ ফিরিয়ে তাকাল।
জ্যাকের ধূসর চোখে ক্লারাকে হারানোর ভয়ের বদলে আজ ছিল এক পর্বতপ্রমাণ স্বস্তি। ক্লারা হালকা হেসে চশমাটা নাকের ওপর সামান্য সোজা করল। “ভাবছি, চার মাস আগে যখন আপনি ক্যালিফোর্নিয়ায় গিয়েছিলেন, তখন আমি সাউথ বোস্টনের ডর্ম রুমে বসে কাঁদছিলাম। ভাবছিলাম ধনী পরিবারের রাজপুত্রের সাথে এই অনাথ মেয়ের দূরত্ব বোধহয় চিরকালের জন্য তৈরি হয়ে গেল। আর আজ… আমরা একসাথে ফিরছি।”
জ্যাক সোজা হয়ে বসে ক্লারার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের বুকের কাছে টেনে নিল। সে ক্লারার গালে নিজের থুতনিটা ঠেেকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “দূরত্ব কোনো দিন ছিলই না, ক্লারা। তুমি যখন আমার সাথে ছিলে না, তখনও তোমার অংকগুলো আমার বাস্কেটবল কোর্টের প্রতিটি শটে গাইড হয়ে কাজ করেছে। আর তাছাড়া…” জ্যাক তার ঠোঁট দুটো ক্লারার কানের একদম কাছে এনে নিচু গলায় বলল, “…এখন আর রাজপুত্র বলে পালানোর কোনো সুযোগ নেই। বাবার কাছে গিয়েই তো তোমাকে পাকাপাকিভাবে আমার ঘরে বন্দী করার পারমিশন নিতে হবে।”
ক্লারা লজ্জা পেয়ে জ্যাকের বুকে হালকা থাপ্পড় মারল। “আপনি একদম বদলাবেন না, তাই না?”
“কখনোই না,” জ্যাক ক্লারার কপালে দীর্ঘ এক চুম্বন ছুঁইয়ে দিয়ে হাসল।
বিমানের কেবিনের অপর প্রান্তে বসে থাকা আর্থার মিলার এবং প্রফেসর উইলিয়াম অ্যান্ডারসন এই দৃশ্য দেখে নিজেদের মধ্যে তৃপ্তির হাসি বিনিময় করলেন।
আর্থার মিলার তাঁর হাতের ওয়াইনের গ্লাসটায় হালকা চুমুক দিয়ে বললেন, “উইলিয়াম, আমি জীবনে অনেক ব্যবসা করেছি, শত কোটি ডলারের প্রফিট দেখেছি। কিন্তু আজ আমার ছেলেকে ওই মেয়েটার পাশে যেভাবে হাসতে দেখছি… এই হাসির দাম আমার সমস্ত পেন্টহাউস বিক্রি করলেও হতো না।”
প্রফেসর অ্যান্ডারসন পাইপটা মুখে দিয়ে বললেন, “মেধা আর ভালোবাসার শক্তিকে কখনো টাকার দাঁড়িপাল্লায় মাপা যায় না, আর্থার। তুমি ভাগ্যবানি যে ক্লারাকে নিজের ঘরের লক্ষ্মী হিসেবে পাচ্ছ।”
–
সন্ধ্যা সাতটা। বোস্টন লোগান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের ভিআইপি টার্মিনাল। সাধারণত প্রাইভেট টার্মিনালগুলো শান্ত আর নিরিবিলি থাকে। কিন্তু আজ সেখানে পরিস্থিতি সামলাতে বোস্টন সিটি পুলিশকে অতিরিক্ত রিজার্ভ ফোর্স মোতায়েন করতে হয়েছে!
ডজন ডজন স্পোর্টস চ্যানালের ওবি ভ্যান, জাতীয় স্তরের সংবাদমাধ্যমের রিপোর্টার, বোস্টন ইউনিভার্সিটির শত শত ছাত্র-ছাত্রী আর হাজারো বাস্কেটবল ফ্যান ভিড় জমিয়েছে। তাদের হাতে ধরা ব্যানার, ‘ওয়েলকাম হোম, ক্যাপ্টেন জ্যাক্সন মিলার!’ ‘ক্লারা বেনেট: দ্য প্রাইড অফ বোস্টন!’
বিমানের দরজা খোলার সাথে সাথে বাইরে ক্যামেরার শত শত ফ্ল্যাশ একসঙ্গে জ্বলে উঠল। গর্জনে কেঁপে উঠল এয়ারপোর্ট চত্বর, “মিলার! মিলার! ক্লারা! ক্লারা!”
টার্মিনালের সিড়ি বেয়ে প্রথমে নেমে এলেন আর্থার মিলার। তারপর নামল সেই বহুল প্রতীক্ষিত জুটি জ্যাক্সন মিলার আর ক্লারা বেনেট। জ্যাকের এক হাতে ধরা সেই স্বর্ণালী চ্যাম্পিয়নশিপ ট্রফি, আর অন্য হাতে শক্ত করে চেপে ধরে রাখা ক্লারার হাত। ক্ল্যারার মুখে ছিল এক নম্র কিন্তু আত্মবিশ্বাসী হাসি। মিডিয়ার সাংবাদিকরা মাইক এগিয়ে ধরল,
“মিস্টার মিলার! আপনি কি বোস্টন ফার্স্ট সোশ্যাল ব্যাংকের জালিয়াতি উন্মোচন আর ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপ জয় এই দুই সাফল্যকে একসাথে উদযাপন করছেন?”
“মিস বেনেট! সাউথ বোস্টন থেকে বোস্টন ইউনিভার্সিটির স্কলার এবং এখন মিলার কর্পোরেশনের চিফ অডিটর… আপনার এই অভাবনীয় যাত্রাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?”
জ্যাক সাংবাদিকের মাইকটা নিজের কাছে টেনে নিল। তার অন্য হাতটি তখনও ক্লারার কোমরে জড়ানো।
“আমি স্রেফ একটা কথা বলব,” জ্যাক বোস্টনের সমস্ত সংবাদমাধ্যমের লাইভ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে খুব কড়া আর স্পষ্ট গলায় বলল। “বোস্টন আমার শহর, বাস্কেটবল আমার রক্ত। কিন্তু আজ আমি যে ট্রফি নিয়ে বোস্টনে দাঁড়িয়ে আছি, তার আসল কারিগর আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এই মেয়েটি। ক্লারা বেনেট না থাকলে আজ জ্যাক্সন মিলার বা মিলার কর্পোরেশনের অস্তিত্ব থাকত না।”
পুরো এয়ারপোর্ট চত্বর আবার উল্লাসে ফেটে পড়ল।
ক্লারা কোনো কথা বলল না, সে শুধু পরম মায়ায় জ্যাকের কাঁধে নিজের মাথাটা এক সেকেন্ডের জন্য রাখল। পুরো বিশ্ব আজ জেনে গেছে এই অনাথ মেয়েটি কারও দয়ায় রাজপ্রাসাদে ওঠেনি, সে নিজের যোগ্যতায় এই শহরের রানী হয়েছে।
–
রাত দশটা। ভিআইপি সংবর্ধনা আর মিডিয়ার কোলাহল শেষ হওয়ার পর, লিমোজিন গাড়িটি সোজা গিয়ে থামল সাউথ বোস্টনের সেই পুরোনো কলোনি রোডের তিনতলা ইটের বিল্ডিংয়ের সামনে।
আর্থার মিলার চেয়েছিলেন জ্যাক আর ক্লারা আজই সরাসরি বোস্টন হারবারের নতুন ভিলায় উঠুক। কিন্তু ক্লারা নিজে অনুরোধ করেছিল, “বাবা, সাউথ বোস্টনের এই ডর্ম রুমেই আমার আর জ্যাকের ভালোবাসার জন্ম। আমরা বোস্টনে ফিরে প্রথম রাতটা এই পুরোনো ডর্ম রুমেই কাটাতে চাই।”
আর্থার হেসে রাজি হয়েছিলেন। ১২ নম্বর ডর্ম রুমের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল দুজন। ঘরটা ঠিক তেমনই ছিল সেই পড়ার টেবিল, সেই কাঠের চটচটে ব্যাকগ্রাউন্ডের মেঝের টাইলস, কোণে রাখা গ্যাসের ছোট স্টোভ আর মেঝের কার্পেটের ওপর ছড়ানো কিছু অডিটের পুরোনো রাফ খাতা। জ্যাক নিজের ভারি স্পোর্টস ব্যাগটা কোণে রেখে দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ফেলল। সে এক পা এক পা করে হেঁটে ঘরের মাঝখানে দাঁড়াল। “ক্যাপ্টেন সাহেবের কি এই ছোট ঘরে কষ্ট হচ্ছে?” ক্লারা কোটটা খুলে হ্যাঙ্গারে ঝোলাতে ঝোলাতে মিষ্টি হেসে জিজ্ঞেস করল।
জ্যাক জবাব না দিয়ে সোজা পেছন থেকে এসে ক্লারাকে জড়িয়ে ধরল। তার দু-হাত ক্লারার পেটের ওপর শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরল, আর নিজের মুখটা লুকিয়ে ফেলল ক্লারার সুগন্ধি চুলের ভাঁজে।
“এই ঘরটা যদি না থাকত, ক্লারা…” জ্যাক খুব নিচু, কাঁপানো গলায় ফিসফিস করল, “…তবে আমি হয়তো সারাজীবন এক স্বার্থপর, অহংকারী বিলিয়নেয়ারের ছেলে হয়েই থেকে যেতাম। এই ঘরটা আমাকে শিখিয়েছে ভালোবাসা কী জিনিস। এই ঘরটা আমাকে শিখিয়েছে সত্যিকারের বেঁচে থাকা কাকে বলে।”
ক্লারা ঘুরে দাঁড়াল। সে জ্যাকের চিবুকটা নিজের হাত দিয়ে তুলে ধরল। জ্যাকের ধূসর চোখে তখন ক্লান্তির জায়গায় ফুটে উঠছে গভীর এক শারীরিক ও মানসিক অনুভূতির তীব্র আলো। “আমরা কাল সকালে এই ঘর ছেড়ে চলে যাব, তাই না?” ক্লারা হালকা গলায় বলল।
“হুম,” জ্যাক ক্লারার কপালে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল। “কাল সকালে আমরা হারবারের ভিলায় শিফট করব। কিন্তু এই ঘরের চাবি সারাজীবন আমাদের কাছেই থাকবে। যখনই আমাদের মনে হবে অহংকার আমাদের ওপর ভর করছে, আমরা এই ঘরে ফিরে আসব অংক মেলাতে।”
ক্লারা পরম ভালোবাসায় জ্যাকের দুই গালে হাত রাখল। রাতের বোস্টন শহরের আলো জানালার কাঁচ চিরে ঘরের মেঝের ওপর এক মায়াবী আলো-ছায়ার ক্যানভাস তৈরি করেছিল। জ্যাক আলতো করে ক্লারার মুখের চশমাটা খুলে পড়ার টেবিলে রাখল।
চশমা ছাড়া ক্লারার সেই গভীর নীল চোখ দুটোর দিকে এক মুহূর্ত তাকাল জ্যাক, তারপর খুব সাবধানে, পরম মমতায় তাকে নিজের বাহুতে তুলে নিয়ে সেই ছোট সিঙ্গেল খাটের দিকে হেঁটে গেল। আজ রাতে কোনো তাড়া ছিল না, কোনো কোর্টের তাণ্ডব ছিল না, কোনো আইনি লড়াই ছিল না আজ রাতে ছিল কেবল দুটি আত্মায় এক হয়ে যাওয়ার অনাবিল, পূর্ণতা।
–
পরদিন সকাল এগারোটা। বোস্টন হারবারের তীর ঘেঁষে তৈরি সুবিশাল প্রাইভেট ভিলা ‘দ্য হারবার ভিউ এসেট’। আটলান্টিক মহাসাগরের নীল জলরাশির ওপর সকালের সোনালী রোদ চকচক করছিল। সমুদ্রের নোনা হাওয়া আর গাংচিলের ডাক চারপাশের পরিবেশকে এক স্বর্গীয় শান্তিতে ভরিয়ে তুলেছিল। একটি কালো রোলস রয়্যালস ভিলার বিশাল আইরনের গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকল। গাড়ি থেকে নেমে এলেন আর্থার মিলার, লিয়ো এবং ডক্টর উইলিয়াম অ্যান্ডারসন। ভিলার লনে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন বোস্টনের বেশ কয়েকজন সেরা আর্কিটেক্ট আর ডেকোরেটর। প্যাসেঞ্জার সিটের দরজা খুলে নেমে এলো জ্যাক আর ক্লারা। ক্ল্যারার পরনে আজ একখানা ধবধবে সাদা সুট, চোখে আবার সেই প্রিয় চশমা। আর জ্যাকের পরনে গাঢ় নীল শার্ট আর সাদা ট্রাউজার। আর্থার মিলার এগিয়ে এসে ভিলার মূল দরজার পেতলের চাবিটি ক্লারার হাতে তুলে দিলেন।
“এটা এখন থেকে তোমাদের নীড়, মা,” আর্থার মিলার স্নেহের সাথে বললেন। “এই ভিলার প্রতিটা ইটের নকশা আমি নিজে তদারকি করেছি। তবে এর নাম কী হবে, তা ঠিক করার অধিকার স্রেফ তোমার।”
ক্লারা ভিলার প্রধান ফটকের দিকে তাকাল। মার্বেলের তোরণের ওপর একটি বড় পেতলের প্লেট বসানো হয়েছিল, যা এখনো কাপড়ে ঢাকা। ক্লারা রিমোট টেনে লাল কাপড়টি সরিয়ে দিল। সোনার অক্ষরে খোদাই করে বড় বড় হরফে লেখা ভেসে উঠল, “বেনেট অ্যান্ড মিলার হাউস।” ক্লারা অবাক হয়ে আর্থার মিলারের দিকে তাকাল। “বাবা… বেনেট নামটা আগে দিয়েছেন?”
“অবশ্যই,” আর্থার মিলার গর্বিত গলায় বললেন। “কারণ মিলার বংশকে ধ্বংসের হাত থেকে যে বাঁচিয়েছে, তার নামই এই বাড়ির শীর্ষে থাকা উচিত। সততা আর মেধার নাম সব সময় ক্ষমতার আগে থাকে।”
ক্ল্যারার চোখের কোণে আবার জল জমে উঠল। যে অনাথ মেয়েটির নিজস্ব কোনো ঘর ছিল না, যার পরিচয়ের পেছনে কোনো বংশের সিলমোহর ছিল না আজ বোস্টন হারবারের সবচেয়ে আভিজাত্যময় ভিলার সামনে তার নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে! জ্যাক পাশ থেকে এসে ক্লারার কাঁধে নিজের হাতটা রাখল। সে ক্লারার কানে নিচু গলায় বলল, “পছন্দ হয়েছে, আমার রানী?”
ক্লারা জ্যাকের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বলল, “পছন্দ হওয়ার অংকটা অনেক আগেই মিলে গেছে, মিস্টার ক্যাপ্টেন। এবার শুধু এই ঘরে একটা সুন্দর জীবন গড়ার অপেক্ষা।”
–
বিকেলের দিকে ভিলার বিশাল কাঁচের ব্যালকনিতে বসেছিলেন সবাই। লিয়ো সামুদ্রিক মাছের বার্বিকিউ বানাচ্ছিল, আর আর্থার মিলার ও প্রফেসর অ্যান্ডারসন কফির মগ হাতে আগামী সপ্তাহের বিয়ের প্ল্যানিং নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত ছিলেন।
“শোনো আর্থার,” প্রফেসর অ্যান্ডারসন বললেন। “বিয়ের মূল অনুষ্ঠানটা কিন্তু বোস্টন ইউনিভার্সিটির গ্র্যান্ড ক্যাথেড্রালেই হতে হবে। কারণ এই দুজন ওখানকারই সৃষ্টি।”
“একদম ঠিক কথা,” আর্থার মিলার সহমত প্রকাশ করলেন। “ক্যাথেড্রালে রিংস এক্সচেঞ্জ হবে, আর রিশেপশন হবে আমার পেন্টহাউস আর এই হারবার ভিলায়। বোস্টন শহরের সমস্ত প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব, প্রেস আর বাস্কেটবল অ্যাসোসিয়েশনের সবাইকে ইনভাইট করা হবে। আমি পুরো বিশ্বকে দেখাতে চাই মিলার বংশের বড় বউয়ের সম্মান কতটা রাজকীয় হতে পারে!”
ব্যালকনির রেলিংয়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল জ্যাক আর ক্লারা। সমুদ্রের ঠাণ্ডা বাতাস ক্লারার চুলের সুতোগুলোকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। দূরে সাগরের বুকে কিছু মাছ ধরার নৌকা আর জাহাজ ভেসে যাচ্ছিল অলস ভঙ্গিতে। জ্যাক ক্লারাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে নিজের থুতনিটা তার কাঁধে রাখল।
“আর মাত্র সাত দিন, ক্লারা,” জ্যাক খুব নিচু, কড়া অথচ ভালোবাসায় ভরা গলায় ফিসফিস করল। “সাত দিন পর তুমি অফিশিয়ালি মিস ক্লারা বেনেট থেকে ‘মিয়সেস ক্লারা বেনেট মিলার’ হয়ে যাবে।”
ক্লারা চশমার আড়াল থেকে দূরে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে রইল। “আমি নামের পরিবর্তনের কথা ভাবছি না, জ্যাক,” ক্লারা ঘাড় ঘুরিয়ে জ্যাকের ধূসর চোখে চোখ রাখল। “আমি ভাবছি সেই কঠিন দিনগুলোর কথা। সাউথ বোস্টনের রাস্তায় যখন আমার কাছে খাওয়ার মতো ভালো খাবার ছিল না, যখন আমি ডিগ্রির স্কলারশিপের জন্য দিনরাত খাতা কলমে হিসাব কষতাম… তখন আমি কখনো কল্পনাও করিনি যে ঈশ্বর আমার জীবনে এত বড় এক উপহার পাঠাবেন।”
“ঈশ্বর পাঠাননি, ক্লারা,” জ্যাক ক্লারার ঠোঁটে নিজের বুড়ো আঙুল ছুটিয়ে পরম মায়ায় বলল। “তুমি নিজেই তোমার ভাগ্যের হিসাব তৈরি করেছ। তোমার মেধা আর সত্যের কাছে পুরো বোস্টন আজ মাথা নত করেছে।”
জ্যাক ক্লারার হাতটা তুলে নিয়ে তার অনামিকার সেই ডায়মন্ড রিংটিতে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল। আটলান্টিক মহাসাগরের ওপর তখন সূর্য অস্ত যাচ্ছিল, আর সেই লাল-সোনালী আলোর ছটায় বোস্টন হারবারের নতুন ভিলার বেলকনিতে দাঁড়িয়ে থাকা দুটি হৃদয় এক নতুন, অনাবিল ভোরের অপেক্ষায় প্রহর গুনছিল!
চলবে?
#Out_Of_Bounds
#part_32
#Ishrat_Jahan_Jarin
বোস্টন হারবারের ‘বেনেট অ্যান্ড মিলার হাউস’-এ সকাল থেকেই এক অভূতপূর্ব উৎসবের আবহাওয়া। সমুদ্রের নীল জলরাশির ওপর রোদ ঝিলমিল করছে, আর চারপাশের বিশাল বাগানে থরে থরে সাজানো হয়েছে সাদা ও গোলাপি গোলাপের ঝাড়। আর মাত্র তিন দিন বাকি মূল বিয়ের। আর্থার মিলার নিজের হাতে পুরো অনুষ্ঠানের দেখভাল করছিলেন। বোস্টনের সেরা ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট টিম, আন্তর্জাতিক ক্যাটারিং সার্ভিস আর সিকিউরিটি প্রধানরা তাঁর নির্দেশে অনবরত কাজ করে যাচ্ছিল। পেন্টহাউস থেকে শুরু করে হারবার ভিলা সব জায়গায় আজ আলোর রোশনাই। সকাল দশটার দিকে ভিলার সামনে একের পর এক স্পোর্টস কার এসে থামল। গাড়ির দরজা খুলে একে একে নেমে এলো জ্যাকের বোস্টন ইউনিভার্সিটির বাস্কেটবল টিমের পুরো স্কোয়াড মার্ক, টবি, কিয়ান আর সামুয়েল! আর তাদের সাথেই গাড়ি থেকে নামল ক্লারার ইউনিভার্সিটি ফ্রেন্ডস সার্কেল ও সাউথ বোস্টনের কলোনির সেই পুরোনো লাইব্রেরির কেয়ারটেকার বুড়ো মিস্টার জনসন!
“হেই, ক্যাপ্টেন!” মার্ক গাড়ি থেকে নেমেই বিকট চিৎকার দিয়ে উঠল।
জ্যাক ভিলার দোতলার বেলকনিতে দাঁড়িয়ে ছিল। পরনে সাধারণ ছাই রঙের টি-শার্ট আর ডেনিম। বন্ধুদের গলা পেয়ে সে দ্রুত নিচে নেমে এলো।
মুহূর্তের মধ্যে পুরো লন যেন এক ছোটখাটো স্টেডিয়ামে পরিণত হলো। বাস্কেটবল টিমের ছেলেরা জ্যাককে ঘিরে ধরে কোলাকুলি করতে লাগল, পিঠ চাপড়াতে লাগল।
“ভাইরে ভাই!” টবি চোখ বড় বড় করে ভিলার দিকে তাকিয়ে বলল। “সাউথ বোস্টনের ডর্ম রুমে বসে যে ছেলে আমাদের সাথে আধ-পোড়া বার্গার খেত, সে আজ এত বড় রাজপ্রাসাদের মালিক! তাও আবার কার দৌলতে? আমাদের মিস ক্যালকুলেটরের দৌলতে!”
“চুপ কর, টবি!” জ্যাক লঘুপাপে টবির ঘাড়ে হালকা চাপড় মেরে হাসল। “ক্লারার নাম সম্মানের সাথে নিবি, ও এখন মিলার বংশের সর্বেসর্বা। আর তোদের ভাবি!”
সবাই এক সাথে হেসে উঠল। ঠিক তখনই ভিলার কাঁচের বড় দরজার আড়াল থেকে হেঁটে বেরিয়ে এলো ক্লারা। তার পরনে একখানা হালকা জলপাই রঙের ক্যাজুয়াল সুতির পোশাক, চুলগুলো আলতো করে ক্লিপ দিয়ে বাঁধা, চোখে সেই সুপরিচিত চশমা। হাতে ট্রে-তে করে বন্ধুদের জন্য ঠাণ্ডা ফলের জুস আর স্ন্যাক্স।
“ক্লারা!” মেয়েদের টিম থেকে আসা সুসান আর এমা এক সাথে চিৎকার করে ক্লারাকে জড়িয়ে ধরল।
“আমাদের স্কলারশিপের স্কলার এখন এই শহরের সেরা বিলিয়নেয়ারের ঘরের বড় বউ!” সুসান আনন্দের সাথে বলল। “তোকে আজ এত সুন্দর আর শান্ত লাগছে, ক্লারা!”
ক্লারা ট্রে-টা টেবিলে রেখে বন্ধুদের দিকে পরম মায়ায় তাকাল। “টাকা বা বাড়ি বদলেছে, সুসান… কিন্তু তোদের ক্লারা বেনেট আগের মতোই আছে। সাউথ বোস্টনের সেই লাইব্রেরির ধুলো পড়া টেবিলটা এখনো আমার কাছে এই রাজপ্রাসাদের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।”
বুড়ো মিস্টার জনসন এগিয়ে এসে ক্লারার মাথায় হাত রাখলেন। তাঁর চোখে জল। “মা ক্লারা, ঈশ্বর তোর সততার প্রতিদান দিয়েছেন। আমি কলোনির লাইব্রেরিতে বসে প্রতিদিন তোর জন্য প্রার্থনা করতাম।”
ক্লারা ঝুঁকে বুড়ো জনসনের হাত দুটো নিজের গালে চেপে ধরল। পারিবারিক আভিজাত্য আর সামাজিক মর্যাদার মাঝেও পুরোনো বন্ধুদের এই ভালোবাসা যেন আজকের দিনটাকে আরও বেশি খাঁটি করে তুলল।
–
সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামল। আর্থার মিলার ও প্রফেসর অ্যান্ডারসন তরুণদের প্রাইভেসি দিতে শহরের এক ক্লাবে ডিনার করতে গিয়েছিলেন। পুরো হারবার ভিলা এখন কমবয়সীদের দখলে। সমুদ্রের পাড়ে ভিলার নিজস্ব প্রাইভেট বিচে একটা প্রকাণ্ড ফায়ার-পিট (আগুন জ্বালার স্থান) তৈরি করা হয়েছিল। কাঠের গুড়ি জ্বালিয়ে তার চারপাশে রাখা হয়েছিল নরম কুশন আর লো-সিটিং বেঞ্চ। বার্বিকিউ গ্রিল থেকে মাছ ও মাংসের সুস্বাদু গন্ধ বাতাসে ভেসে আসছিল।
গানের হালকা সুর বাজছিল ব্যাকগ্রাউন্ডে। জ্যাক, মার্ক, টবি আর লিয়ো একপাশে ক্যান বিয়ার হাতে বসে পুরোনো বাস্কেটবল ম্যাচের স্মৃতিচারণ করছিল।
“মনে আছে জ্যাক?” মার্ক বিয়ারের ক্যান উঁচিয়ে বলল। “হার্ভার্ডের সাথে সেই সেমিফাইনাল ম্যাচটা? তুই যখন তিন পয়েন্টার মারতে পারছিলি না, ক্লারা কিন্তু গ্যালারিতে বসে তোর শর্টের অ্যাঙ্গেল হিসেব করে চিৎকার করে বলেছিল, “পাঁচ ডিগ্রি ডানদিকে বাঁকাও!”
জ্যাক বিয়ারের ক্যানে চুমুক দিয়ে নিঃশব্দে হাসল। তার ধূসর চোখ দুটো ফায়ার-পিটের লাল আগুনের আলোয় জ্বলজ্বল করছিল।
“হ্যাঁ, মনে আছে,” জ্যাক নিচু গলায় বলল। “ওই এক একটা কথা আমাকে প্রতিবার নতুন করে বাঁচিয়ে তুলেছে।”
অপরদিকে, ক্লারা আর তার বান্ধবী সুসান, এমা বালির ওপর বসে সমুদ্রের ঢেউগুলোর দিকে তাকিয়েছিল। তাদের হাতে ছিল গরম চকলেট কফির মগ।
“ক্লারা,” সুসান আলতো করে ক্লারার কাঁধে ধাক্কা দিল। “সত্যি করে বল তো, এত বড় রাজপুত্রের বউ হতে যাচ্ছিস… ভয় লাগছে না? কাল থেকে শহরের শত শত ক্যামেরা, বড় বড় অভিজাত মহিলারা তোর দিকে নজর রাখবে।”
ক্লারা কফির মগে চুমুক দিয়ে চশমাটা একটু সোজা করল। সে দূরে আগুনের পাশে বন্ধুদের সাথে হেসে কথা বলতে থাকা বিশালদেহের জ্যাকের দিকে তাকাল।
“ভয় কিসের, সুসান?” ক্লারা খুব শান্ত, গভীর গলায় বলল। “আমি তো রাজপ্রাসাদকে বিয়ে করছি না, আমি বিয়ে করছি এমন একটা মানুষকে যে আমার জন্য নিজের সমস্ত ক্ষমতা, টাকা আর রাজপ্রাসাদ এক মুহূর্তে পায়ে ঠেলে দিয়ে আমার সাউথ বোস্টনের ঘরে এসে মাটিতে বসেছিল। যে পুরুষ নারীর ক্ষমতার সামনে নিজের অহংকার বিসর্জন দিতে জানে, তার পাশে দাঁড়াতে কোনো মেয়ের ভয় পাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।”
সুসান আর এমা এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। ক্লারার এই গভীর দৃষ্টিভঙ্গিই তাকে সাধারণ মেয়েদের চেয়ে আলাদা করে তুলেছে।
–
রাত একটা। বন্ধুরা সবাই ভিলার গেস্ট রুমে ঘুমাতে চলে গেছে। সমুদ্রের পাড়ের ফায়ার-পিটের আগুন এখন কমে এসে লাল কয়লার আলো ছড়াচ্ছে। হাওয়াটা একটু বেশি ঠান্ডা হয়ে উঠেছে, ঢেউগুলো তটে এসে আছড়ে পড়ছে। ক্লারা বালির ওপর একটা উলের চাদর গায়ে জড়িয়ে একা বসে ছিল। সে জুতো জোড়া খুলে পাশে রেখে খালি পায়ে সমুদ্রের ভেজা বালির ছোঁয়া নিচ্ছিল। হঠাৎ পেছন থেকে এক জোড়া ভারী, গরম হাত এসে ক্লারার কাঁধের চাদরটা আরও শক্ত করে জড়িয়ে দিল। জ্যাক এসে বসে পড়ল ক্লারার ঠিক পেছনে। সে তার প্রকাণ্ড দুটো পা দু-পাশে ছড়িয়ে দিয়ে ক্লারাকে নিজের বুকের মাঝখানে সম্পূর্ণ ঘিরে নিল। ক্লারা আলতো করে নিজের পিঠটা তুলে দিল জ্যাকের চওড়া ছাতিটার ওপর।
“ঠান্ডা লাগছে?” জ্যাক ক্লারার গালে নিজের মুখ ঘষে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।
“একটু,” ক্লারা জ্যাকের হাতের আঙুলগুলোর সাথে নিজের আঙুল পেঁচিয়ে নিল। “কিন্তু সমুদ্রের এই রাতটা খুব সুন্দর, জ্যাক।”
জ্যাক কিছু বলল না। সে ক্লারার ঘাড়ের কাছে মুখ রেখে দীর্ঘ এক গভীর নিঃশ্বাস নিল।
“ক্লারা…”
“হুম?”
“পরশু আমাদের বিয়ে,” জ্যাকের গলার স্বর হঠাৎ খুব গম্ভীর আর কাঁপানো শোনাল। “আমি সারাজীবন একটা কথা বলতে চেয়েছি, যা কখনো সামনাসামনি বলা হয়নি।”
ক্লারা ঘুরে বসে জ্যাকের দিকে তাকাল। আগুনের লালচে আলোয় জ্যাকের ধূসর চোখে এক অদ্ভুত আর্দ্রতা ফুটে উঠেছিল।
“কী কথা?” ক্লারা প্রশ্ন করল।
জ্যাক ক্লারার দু-হাত ধরে নিজের বুকের ঠিক ওপরটায় রাখল যেখানে তার হৃদপিণ্ডটা উন্মাদের মতো দ্রুত স্পন্দিত হচ্ছে।
“আমার মা যখন মারা যান,” জ্যাক নিচু গলায় বলা শুরু করল, “তখন আমি খুব ছোট। আমার বাবা সারা দিন টাকা আর ক্ষমতার পেছনে ছুটতেন। আমি ভাবতাম এই পৃথিবীতে ভালোবাসার মতো কিছু নেই। মানুষ স্রেফ প্রয়োজন আর ক্ষমতার টানে বাঁচি। আমি বাস্কেটবল কোর্টে উগ্র হতাম, মানুষের সাথে খারাপ ব্যবহার করতাম… কারণ আমার ভেতরে এক বিরাট শূন্যতা ছিল।”
ক্লারা এক হাত বাড়িয়ে জ্যাকের শক্ত চোয়ালটা পরম মমতায় ছুঁলো।
“তারপর সাউথ বোস্টনের লাইব্রেরিতে একদিন চশমা পরা একটা একরোখা মেয়েকে দেখলাম,” জ্যাক হালকা হাসল, তার চোখের কোণ ভিজে উঠল। “যে মেয়েটা আমাকে গুন্ডা ভেবে এক কথায় তাড়িয়ে দিয়েছিল। যে মেয়েটা আমাকে শিখিয়েছে যে টাকা দিয়ে মানুষের সম্মান কেনা যায় না। ক্লারা… তুমি শুধু আমার বউ হতে যাচ্ছ না, তুমি আমার অন্ধকার জীবনে ঈশ্বর প্রদেয় সেই আলো, যা আমাকে একটা হিংস্র পশুর থেকে মানুষ বানিয়েছে।”
ক্লারা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। তার নিজের চোখ থেকেও দুটি ফোঁটা জল গড়িয়ে বালির ওপর পড়ল। সে ঝুঁকে এসে দুই হাতে জ্যাকের মুখটা তুলে ধরল।
“আপনি কখনো হিংস্র ছিলেন না, মিস্টার ক্যাপ্টেন,” ক্লারা ব্যাকুল গলায় বলল। “আপনার ভেতরে কেবল একজন ভালোবাসার কাঙাল রাজপুত্র লুকিয়ে ছিল, যে নিজের আসল ঠিকানা খুঁজছিল। আর আমি তো স্রেফ আপনার অংকের ভুলগুলো শুধরে দিয়েছি।”
“তবে এখন থেকে আমার সমস্ত অংকের একমাত্র উত্তর তুমি,” জ্যাক খুব পরম ভালোবাসায় ক্লারার কপালে, গাল দুটোতে আর ঠোঁটে গভীর চুমু এঁকে দিল।
–
পরদিন সকাল। বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যান্ড ক্যাথেড্রালের বিয়ের আগের বিশেষ ড্রেস রিহার্সাল ও ফাইনাল ফিটিং। প্যারিস থেকে আসা বিখ্যাত ডিজাইনার ব্র্যান্ডের মেম্বাররা ভিলার ড্রয়িংরুমে বিয়ের কাস্টম পোশাকগুলো সাজিয়ে রেখেছিল। ক্ল্যারার জন্য তৈরি করা হয়েছে ধবধবে সাদা রেশমি সিল্ক আর লেসের একখানা অপূর্ব ওয়েডিং গাউন। গাউনের পেছনের আঁচলটা প্রায় দশ ফুট লম্বা, যাতে ছোট ছোট এনটিক ডায়মন্ড খচিত। আর তার সাথে মানানসই পাতলা ভেইল (ঘোমটা)। ডিজাইনার ক্লারাকে পোশাকটা ট্রায়াল দেওয়ার জন্য রুমে নিয়ে গেল। দশ মিনিট পর। ড্রয়িংরুমের বিশাল দর্পণ আর পর্দাটা যখন আস্তে করে সরে গেল… সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা রূপ দেখে রুমে উপস্থিত সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল!
ক্লারা দাঁড়িয়ে ছিল সেই সাদা গাউনে। তাকে কোনো সাধারণ পাত্রী নয়, মনে হচ্ছিল এক জীবন্ত গ্রীক দেবী বা কোনো সার্বভৌম রাজ্যের মহীয়সী রানী! আর্থার মিলার চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের হাততালি চেপে রাখতে পারলেন না।
“মাই গড…” আর্থার গদগদ গলায় বললেন। “আজ যদি আমার স্ত্রী বেঁচে থাকতেন, তবে তিনি তোমাকে দেখে গর্বে কেঁদে ফেলতেন, ক্লারা।”
আর্থার মিলার নিজের অ্যাসিস্ট্যান্টকে ইশারা করলেন। অ্যাসিস্ট্যান্ট একখানা ভেলভেটের লাল বাক্স এগিয়ে দিল।
আর্থার বাক্সটি খুলে ক্লারার সামনে ধরলেন। ভেতরে ছিল একখানা শত বছরের পুরোনো প্লাটিনাম ও এনটিক নীলা খচিত নেকলেস।
“এটা জ্যাকের মায়ের নেকলেস, মা,” আর্থার পরম স্নেহে বললেন। “তিনি মৃ*ত্যুর আগে বলে গিয়েছিলেন, ‘যে মেয়ে আমাদের জ্যাকের উগ্রতা মুছে তার মন জয় করবে, এই নেকলেসটি স্রেফ তার গলাই শোভা পাবে।’ আজ এটা পরার একমাত্র অধিকার তোমার।”
ক্লারা আবেগে আপ্লুত হয়ে আর্থার মিলারকে প্রণাম করার মতো করে ঝুঁকে পড়ল। আর্থার স্নেহে তার মাথায় হাত রাখলেন।
–
রাত এগারোটা। আগামীকাল সকাল দশটায় বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড ক্যাথেড্রালে অনুষ্ঠিত হবে শতাব্দীর সবচেয়ে আলোচিত রাজকীয় বিয়ে ‘ক্লারা বেনেট ও জ্যাক্সন মিলার’-এর বিবাহ বন্ধন। পুরো বোস্টন শহরজুড়ে এখন স্রেফ এই একটিই আলোচনা। বোস্টনের প্রধান সড়কগুলোতে ব্যানার ঝুলছে, নিউ ইয়র্ক টাইমস ও ইভনিং উইক স্পেশাল এডিশন ছাপিয়েছে। সাউথ বোস্টনের দরিদ্র এলাকাগুলোতে আর্থার মিলার ও ক্লারার নির্দেশে বিনামূল্যে খাবার ও উপহার বিতরণ করা হয়েছে।
হারবার ভিলার নিজের রুমে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে ছিল ক্লারা। তার টেবিলের ওপর রাখা কালকের ওয়েডিং গাউন আর মায়ের সেই নীলার নেকলেস। চশমাটা খুলে পাশে রেখে সে জানালার দিয়ে তাকিয়ে ছিল রাতের বোস্টনের জ্বলজ্বলে আলোর দিকে।
ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। স্ক্রিনে নাম ভেসে উঠল, মিস্টার একরোখা ক্যাপ্টেন’।
ক্লারা হেসে ফোনটা রিসিভ করল। “রুলস অনুযায়ী বিয়ের আগের রাতে বর আর কনের কথা বলা বারণ, মিস্টার মিলার।”
“রুলস ভাঙাই আমার পুরোনো অভ্যাস, মিস ক্যালকুলেটর,” ওপাশ থেকে জ্যাকের সেই কড়া, নিচু আর নেশাক্ত গলার আওয়াজ ভেসে এলো। “কাল সকাল দশটা বেজতে এত দেরি কেন হচ্ছে বলো তো? আমার মনে হচ্ছে প্রতিটা সেকেন্ড এক একটা বছরের মতো কাটছে।”
ক্লারা বালিশে মুখ লুকিয়ে মিষ্টি করে হাসল। “একটু ধৈর্য ধরুন, ক্যাপ্টেন। যে মেয়ে মাসের পর মাস ধরে আপনার জন্য অপেক্ষা করতে পেরেছে, সে আর মাত্র দশ ঘণ্টা অপেক্ষা করতেই পারে।”
“কালকের পর থেকে আর কোনো অপেক্ষা নয়, ক্লারা,” জ্যাকের গলার স্বর গভীর হয়ে এলো। “কালকের পর থেকে তুমি শুধুই আমার। সারা জীবনের জন্য।”
“আমি সব সময় আপনারই ছিলাম, জ্যাক,” ক্লারা খুব নিচু গলায় ফিসফিস করে বলল। “এখন শুধু পুরো বিশ্বকে তা অফিশিয়ালি জানানোর অপেক্ষা।”
ফোনটা রেখে দিয়ে ক্লারা চোখ বুজল। সাউথ বোস্টনের অনাথ এতিমখানার ছোট মেয়েটি থেকে আজকের বোস্টনের রাজবধূর এই সুদীর্ঘ পথচলা কাল সকালে পূর্ণতা পেতে যাচ্ছে।
চলবে?

