#Out_Of_Bounds
#পর্ব ৩৪+৩৫
#Ishrat_Jahan_Jarin
বিয়ের সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতে হতে রাত অনেক গড়িয়ে গেছে। কয়েক ঘণ্টা আগেও যে বাড়িটা শত শত মানুষের হাসি, সংগীত আর আলোয় মুখরিত ছিল, এখন সেখানে শুধু সমুদ্রের ঢেউয়ের মৃদু শব্দ আর দূরের বাতিঘরের আলো এসে জানালার কাঁচে পড়ছে। জ্যাক ধীরে ধীরে ঘরের দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকল। আজকের রাতটা অন্যরকম। সারা জীবনে অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ খেলেছে সে। হাজার হাজার মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে ট্রফি জিতেছে। কিন্তু আজকের এই মুহূর্তে তার বুকের ভেতরের অস্থিরতা কোনো ফাইনাল ম্যাচের আগের উত্তেজনার সঙ্গেও তুলনীয় নয়। ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল ক্লারা।
তার গায়ে বিয়ের পর বদলে নেওয়া সাদা-রুপালি রঙের মার্জিত পোশাক। চুলগুলো খোলা। কানে ছোট্ট ডায়মন্ডের দুল। হাতে এখনও সেই নতুন বিয়ের আংটি। জ্যাক দরজা বন্ধ করে কিছুক্ষণ শুধু তাকিয়ে রইল। ক্লারা ভ্রু কুঁচকে বলল,
“এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?”
জ্যাক ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।
“ভাবছি…”
“কী?”
“সত্যিই কি তুমি আমার স্ত্রী হয়ে গেলে?”
ক্লারা মৃদু হেসে বলল, “বিয়ের মঞ্চে এতবার ‘আই ডু’ বললাম, তারপরও সন্দেহ হচ্ছে?”
জ্যাক হেসে ফেলল। সে ক্লারার সামনে এসে দাঁড়াল।
“সন্দেহ হচ্ছে না। বরং বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে।”
“কেন?”
জ্যাক নিচু হয়ে ক্লারার হাতটা নিজের হাতে নিল।
“কারণ আগে যে মেয়েটা আমাকে দেখলেই বিরক্ত হয়ে যেত, সেই মেয়েটাই আজ আমার ঘরে দাঁড়িয়ে আছে।”
ক্লারা চোখ সরিয়ে নিল। “আপনিও তো কম বিরক্ত করেননি।”
“জানি।”
“অহংকারী ছিলেন।”
“জানি।”
“একরোখা।”
“সেটাও জানি।”
“আর অসহ্য রকম জেদি।”
জ্যাক এবার হেসে মাথা নাড়ল। “কিন্তু তুমি আমাকে মানুষ বানিয়ে দিয়েছ।”
কথাটা শুনে ক্লারার চোখ নরম হয়ে এল। জ্যাক ধীরে ধীরে তার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল।
“ক্লারা…”
“হুম?”
“আজ থেকে তোমাকে আর একা কোনোদিন লড়তে হবে না।”
ক্লারা তার বুকের ওপর মাথা রাখল। “আমিও আপনাকে আর একা লড়তে দেব না।” বাইরে সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ছে। তারা সেইরাতে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলল। ক্লারার পড়াশোনা, জ্যাকের বাস্কেটবল ক্যারিয়ার, মিলার পরিবারের দায়িত্ব, সাউথ বোস্টনের মানুষগুলো, তাদের পুরোনো দিন সবকিছু নিয়ে। রাতের একসময় ক্লারা জ্যাকের দিকে তাকিয়ে বলল,
“জ্যাক?”
“বল।”
“আমাদের জীবনটা যেন কখনো এই বাড়ির মতো বিশাল না হয়ে যায়।”
জ্যাক অবাক হয়ে তাকাল।
“মানে?”
“বাড়ি যত বড়ই হোক, আমাদের ভেতরটা যেন ছোট না হয়ে যায়।”
জ্যাক কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তার হাতটা শক্ত করে ধরল।
“প্রমিস।”
বাইরে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ পাথরে আছড়ে পড়ার শব্দ তখন আরও ভয়ংকর আর মাতাল রূপ নিয়েছে। জানালার কাঁচ পার হয়ে বাতিঘরের আলোর স্থির রশ্মিটা ছাদের সিলিং ছুঁয়ে মেঝের কার্পেটে আঁকাবাঁকা ছায়া ফেলছে। ঘরের মধ্যকার স্থির বাতাসটুকু হঠাৎ যেন অদ্ভুত রকম উষ্ণ আর ভারী হয়ে উঠল। জ্যাক এক চুলও সরলো না। ক্লারার ডান হাতের কবজিটা দেয়ালের গায়ে শক্ত করে ধরে রেখেই সে তার অন্য হাতের আঙুলগুলো নামিয়ে আনল ক্লারার চিবুকে। বৃদ্ধাঙুল দিয়ে ক্লারার নিচের ঠোঁটে আলতো চাপ দিয়ে সে ক্লারার মুখটা সামান্য উঁচিয়ে বলল, “তুমি আমার স্বাধীনতা চেয়েছ, ক্লারা?” জ্যাকের কণ্ঠস্বর অন্ধকার ঘরের গাঢ়তাকে ভেদ করে ফিসফিসিয়ে উঠল, “আজ রাতে তোমার ওপর আমার নিয়ন্ত্রণ ছাড়া আর কোনো সত্য নেই।”
ক্লারা কোনো কথা বলতে পারল না। তার বুকটা দ্রুত ওঠানামা করছে। জ্যাকের সুগঠিত, দীর্ঘ শরীর তাকে দেয়াল আর তার নিজের উষ্ণতার মাঝে পুরোপুরি পিষে ফেলছে। সে অনুভব করল জ্যাকের অন্য হাতটা ধীরে ধীরে তার পিঠের ওপর নেমে আসছে। রেশমি কাপড়ের ওপর দিয়ে তার উষ্ণ হাতের তালুর প্রতিটি স্পর্শ যেন ক্লারার ত্বকে বিদ্যুৎ তরঙ্গ প্রবাহিত করে দিচ্ছে। এক ঝটকায় ক্লারার গায়ের সাদা-রুপালি পোশাকের ব্যাক-জিপার আর ফিতাগুলো আলগা করে দিল জ্যাক। পোশাকটি শব্দহীনভাবে মেঝের ওপর লুটিয়ে পড়তেই ঘরের ঠান্ডা বাতাস ক্লারার উন্মুক্ত পিঠ ও কাঁধে এসে লাগল। কিন্তু সেই মুহূর্তেই জ্যাক তার শরীরটা আরও কাছে ঘেঁষে এনে ক্লারার কাঁপন থামিয়ে দিল। জ্যাক ক্লারার ডান হাতটা মাথার ওপর শক্ত করে ধরে রেখে তার ঠোঁট নামিয়ে আনল ক্লারার উন্মুক্ত ঘাড়ের বাঁ পাশে। অত্যন্ত শ্লথ গতিতে, গভীর তৃষ্ণা নিয়ে সে চুমু আঁকতে লাগল ক্লারার কাঁধের হাড়ে, কলারবোনে।ক্লারা যন্ত্রণার আর আনন্দের এক অদ্ভুত সীমান্তবর্তী অভিজ্ঞতায় চোখ বন্ধ করে একটা ছোট দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“চোখ বন্ধ করবে না,” জ্যাকের গম্ভীর নির্দেশ ক্লারার ঘাড়ে তীব্র নিঃশ্বাস ফেলল। সে ক্লারার কাঁচা চামড়ায় নিজের দাঁতের মৃদু চাপ বসাল একই সাথে মৃদু যন্ত্রণা আর চরম সুখের এক তীব্র অনূভূতি ক্লারার সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। “আমাকে দেখো। প্রতিটা মুহূর্তে অনুভব করো, তোমার এই শরীর আর আত্মার ওপর এখন কার স্বাক্ষর আঁকা হচ্ছে।”
ক্লারা চোখ খুলতেই দেখল জ্যাকের সেই গাঢ়, ধোঁয়াটে চোখ দুটো সরাসরি তার দিকে তাকিয়ে আছে। জ্যাক ক্লারার মুক্ত থাকা দ্বিতীয় হাতটি টেনে এনে নিজের বুকের ওপর বসিয়ে দিল। তার স্পন্দিত বুক, শক্তিশালী পেশি আর শক্ত শারীরিক বাঁধন ক্লারাকে পুরোপুরি অবশ করে দিল। সে তার হাতের মুঠো আলগা করে ক্লারার অন্য হাতটাও ছেড়ে দিল, কারণ সে জানত ক্লারা এখন আর কোথাও যেতে পারবে না, সে পুরোপুরি আচ্ছন্ন। জ্যাকের শক্ত দুই হাত এবার ক্লারার কোমরের দু’পাশে শক্ত করে চেপে বসল। সে ক্লারাকে শূন্যে তুলে নিয়ে সোজা গিয়ে দাঁড়াল বিশাল বিছানাটার পাশে। ক্লারাকে আলতো করে কিন্তু একরোখা ভঙ্গিতে বিছানায় শুইয়ে দিয়েই সে তার ওপর নেমে এল। বিছানার প্রতিটি কোণে তখন অন্ধকারের তীব্র ঘ্রাণ। জ্যাক ক্লারার দুটি হাত বিছানার চাদরের সাথে মিশিয়ে দিয়ে নিচু হয়ে এল। তার ঠোঁট এবার ক্লারার ঠোঁটে আছড়ে পড়ল। অধিকার আদায়ের সম্মোহনী চুম্বনে। ক্লারা তার সমস্ত শক্তিতে সাড়া দিতে লাগল, তার আঙুলগুলো ভিজে উঠল জ্যাকের চুলে। বাইরে সমুদ্রের উত্তাল গর্জন আর ঘরের ভেতরের তীব্র নিঃশ্বাসের শব্দ এক হয়ে মিশে গেল। সময় স্তব্ধ হয়ে রইল, আর সেই দীর্ঘ রাতে বাতিঘরের আলোর তীব্রতায় উন্মোচিত হতে লাগল তাদের ভালোবাসা, যন্ত্রণা আর এক চরম আধিপত্যের অন্ধ গল্প।
–
শহর তখনও ঘুম থেকে পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। কিন্তু মিলার পরিবারের ব্যক্তিগত এয়ার টার্মিনালে ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেছে অনেক আগেই। আজ জ্যাক ও ক্লারা তাদের হানিমুনের উদ্দেশ্যে রওনা হবে। গন্তব্য ক্যারিবিয়ান সাগরের বুকে অবস্থিত সেন্ট থমাস দ্বীপ। ক্লারা নিজের লাগেজের শেষ জিপটা বন্ধ করে আয়নার সামনে দাঁড়াল। সাদা লিনেনের পোশাক, খোলা চুল, চোখে চশমা। পেছন থেকে জ্যাক বলল,
“মিস ক্যালকুলেটর?”
ক্লারা ঘুরে তাকাল।
“কী?”
“এত বই কেন?”
ক্লারা তার স্যুটকেসের দিকে তাকাল।
“মাত্র চারটা বই।”
“চারটা?”
“হ্যাঁ।”
“আমরা হানিমুনে যাচ্ছি, ইউনিভার্সিটি লাইব্রেরিতে না।”
ক্লারা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“আমার বই ছাড়া আমি কোথাও যাই না।”
জ্যাক এগিয়ে এসে একটা বই তুলে নিল।
“এটা কী?”
“গাণিতিক ফাইন্যান্স।”
জ্যাক বইটা আবার স্যুটকেসে রেখে দিল।
“এই বইটা বোস্টনেই থাকবে।”
“জ্যাক!”
“না।”
“কেন?”
“কারণ সাত দিনের জন্য আমি তোমার একমাত্র সিলেবাস।”
ক্লারা হাসতে হাসতে মাথা নাড়ল।
“আপনাকে নিয়ে সত্যিই কোনো অংক মেলানো যায় না।”
ব্যক্তিগত জেটে ওঠার পর ক্লারা জানালার পাশে বসল।
জ্যাক তার পাশের আসনে বসে হাত বাড়িয়ে তার হাতটা ধরল।
“প্রথমবার আমার সঙ্গে এত দূরে যাচ্ছ।”
“বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে হানিমুনে যাচ্ছি এটা নিশ্চয়ই খুব স্বাভাবিক ব্যাপার।”
“কিন্তু আমি স্বাভাবিক নই।”
“সেটা আমি জানি।”
কিছুক্ষণ পর বিমান মেঘের ওপরে উঠে গেল।
বোস্টনের শহর ছোট হতে হতে একসময় মিলিয়ে গেল।
ক্লারা জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
জ্যাক তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
“কী ভাবছ?”
“ভাবছি, জীবন কত অদ্ভুত।”
“কীভাবে?”
“একসময় আমি ভাবতাম আমার ভবিষ্যৎ শুধু বই আর হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।”
“আর এখন?”
ক্লারা তার হাতের আংটির দিকে তাকাল।
“এখন আমার পাশে একজন মানুষ বসে আছে, যে আমার সব হিসাব এলোমেলো করে দেয়।”
জ্যাক তার হাতের পিঠে চুমু খেল।
“এই কাজটা আমি সারাজীবন করব।”
–
কয়েক ঘণ্টা পর। সেন্ট থমাস। বিমান থেকে নামতেই উষ্ণ সমুদ্রের বাতাস তাদের দুজনকে স্বাগত জানাল।
ক্লারা বিস্ময়ে চারপাশে তাকিয়ে রইল। স্বচ্ছ নীল আকাশ। দূরে নীল সমুদ্র। নারকেল গাছের সারি। সাদা বালির সৈকত। জ্যাক তার হাত ধরে বলল,
“ওয়েলকাম টু আওয়ার লিটল প্যারাডাইস, মিসেস মিলার।”
প্রাইভেট গাড়িতে করে তারা পৌঁছাল সমুদ্রের একেবারে কোলঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা তাদের ভিলায়।
ব্যালকনি থেকে সমুদ্র যেন হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায়।
ক্লারা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলল,
“এটা সত্যিই আমাদের?”
“সাত দিনের জন্য।”
“তারপর?”
জ্যাক তার কাঁধে হাত রাখল।
“তারপরও তোমার। কারণ আমি যেখানে থাকি, সেটাই তোমার বাড়ি।”
ক্লারা মৃদু হেসে তার কাঁধে মাথা রাখল।
সন্ধ্যায় তারা সৈকতে হাঁটল।
জ্যাক জুতো খুলে ফেলল।
ক্লারাও জুতো হাতে নিয়ে বালির ওপর খালি পায়ে হাঁটতে লাগল।
একসময় ঢেউ এসে দুজনের পা ভিজিয়ে দিল।
ক্লারা হেসে উঠল।
জ্যাক সেই হাসির দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
“কী?”
“কিছু না।”
“মিথ্যে।”
“ভাবছি, তোমাকে হাসতে দেখলে আমার কেন মনে হয় আমি পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষ।”
ক্লারা কিছু বলল না। শুধু তার হাতটা আরও শক্ত করে ধরল। সেই রাতেই শুরু হলো তাদের সাত দিনের স্বপ্নের যাত্রা।
—
সেন্ট থমাসের সকাল যেন পৃথিবীর অন্য সব সকালের চেয়ে আলাদা।নক্লারা ভোরেই উঠে ব্যালকনিতে এসে বসেছিল। সামনে সমুদ্র। হাতে কফি। কোলে একটা ছোট নোটবুক। সে কিছু লিখছিল। হঠাৎ পেছন থেকে জ্যাক এসে নোটবুকটা বন্ধ করে দিল।
“কাজ বন্ধ।”
ক্লারা তাকাল।
“কী করছেন?”
“আজ কোনো পড়াশোনা নেই।”
“আমি শুধু কিছু লিখছিলাম।”
“আজ তুমি শুধু আমার সঙ্গে থাকবে।”
ক্লারা ভ্রু তুলল।
“আপনি কি আমার সময়সূচিও ঠিক করবেন?”
“বিয়ের পর স্বামীর সামান্য অধিকার আছে।”
“সামান্য?”
“খুব সামান্য।”
ক্লারা হেসে ফেলল।
সেদিন তারা প্রথমে সমুদ্রের ধারে ব্রেকফাস্ট করল।
জ্যাক ইচ্ছে করেই ক্লারার প্লেটে ফলের একটা টুকরো রেখে বলল,
“খাও।”
“নিজের হাতে খেতে পারি।”
“জানি। তবু আমি খাওয়াব।”
“আপনি ভীষণ বিরক্তিকর।”
“তবু তুমি আমাকে বিয়ে করেছ।”
ব্রেকফাস্টের পর তারা নৌভ্রমণে বের হলো।
নীল পানির ওপর ছোট্ট নৌকাটি এগিয়ে যাচ্ছিল।
ক্লারা রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে সমুদ্র দেখছিল।
জ্যাক পেছন থেকে এসে তার পাশে দাঁড়াল।
“ভয় করছে?”
“না।”
“আমি আছি।”
ক্লারা তাকিয়ে মুচকি হাসল।
“এই কথাটা শুনলেই কেন যেন আমার সব ভয় চলে যায়।”
জ্যাক তার কপালে চুমু দিল।
দুপুরে তারা দ্বীপের ছোট্ট একটি বাজারে গেল।
ক্লারা স্থানীয় হস্তশিল্পের দোকানে গিয়ে একটা ছোট কাঠের নৌকা কিনতে চাইল।
জ্যাক দাম শুনে বলল,
“এটা আমি পুরো দোকানসহ কিনে দিতে পারি।”
ক্লারা চোখ বড় করে বলল,
“না!”
“কেন?”
“সবকিছু টাকা দিয়ে কিনতে হয় না।”
জ্যাক কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকল।
“তোমার এই কথাটাই আমার সবচেয়ে ভালো লাগে।”
সন্ধ্যায় তারা সৈকতের ধারে বসে সূর্যাস্ত দেখল।
আকাশ কমলা থেকে গোলাপি, তারপর ধীরে ধীরে বেগুনি হয়ে গেল।
ক্লারা মাথা রাখল জ্যাকের কাঁধে।
“জ্যাক?”
“হুম?”
“আমাদের প্রথম দেখা যদি আজকের মতো হতো?”
“তাহলে?”
“হয়তো আমি আপনাকে এতটা অপছন্দ করতাম না।”
জ্যাক হাসল।
“আমি কিন্তু তোমাকে প্রথম দিন থেকেই পছন্দ করতাম।”
“মিথ্যে।”
“সত্যি।”
“আপনি তো প্রথম দিনই আমার ওপর রাগ করেছিলেন।”
“কারণ তুমি আমার সঙ্গে তর্ক করেছিলে।”
“তাহলে?”
“সেই মুহূর্তেই বুঝেছিলাম, এই মেয়েটা অন্যরকম।”
ক্লারা কিছু বলল না। শুধু সূর্যাস্তের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। সেদিন রাতে তারা ভিলার ছাদে বসে অনেকক্ষণ তারাভরা আকাশ দেখল। কোনো আয়োজন ছিল না। কোনো ক্যামেরা ছিল না।
ছিল শুধু দুজন মানুষ। আর তাদের মধ্যে জন্ম নেওয়া শান্ত ভালোবাসা।
–
পরিদন সকালে ঘুম ভাঙতেই ক্লারা দেখল, জ্যাক বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে দুটো কাপ।
“ব্ল্যাক কফি।”
ক্লারা অবাক হয়ে তাকাল। “আপনি কফি বানিয়েছেন?”
“হ্যাঁ।”
“কীভাবে?”
“তোমাকে বিয়ে করার পর অনেক কিছু শিখছি।”
ক্লারা কাপটা হাতে নিল।
প্রথম চুমুক দিয়েই মুখটা কুঁচকে গেল।
“এটা কী?”
জ্যাক ভ্রু কুঁচকাল।
“কফি।”
“এটা কফি নয়। এটা কোনো অপরাধের প্রমাণ।”
জ্যাক হেসে ফেলল।
“এত খারাপ?”
“ভীষণ।”
জ্যাক তার কাপটা নিয়ে এক চুমুক দিল।
“হুম… সত্যিই খারাপ।”
ক্লারা হেসে উঠল।
সেদিন তারা দ্বীপের একটি নিরিবিলি পাহাড়ি পথে ঘুরতে বের হলো।
জ্যাক মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে ক্লারার থেকে কয়েক পা এগিয়ে যাচ্ছিল, আবার পেছনে ফিরে তার হাত ধরছিল। একসময় ক্লারা বলল,
“আপনি এত বড় বাস্কেটবল খেলোয়াড়, অথচ হাঁটতেও আমাকে অপেক্ষা করতে হয়।”
“কারণ আমার স্ত্রী ছোট।”
“আমি ছোট নই।”
“আমার কাছে ছোট।”
“আপনার ছয় ফুট তিন ইঞ্চির অহংকারটা একটু কমান।”
জ্যাক হেসে ফেলল।
দুপুরে তারা সমুদ্রের কাছে বসে নারকেলের পানি খেল।
ক্লারা হঠাৎ বলল,
“জ্যাক, আপনার মনে হয় আমাদের জীবন খুব বদলে গেছে?”
জ্যাক কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
“বদলেছে। কিন্তু একটা জিনিস বদলায়নি।”
“কী?”
“তুমি এখনও আমার সবচেয়ে কঠিন প্রতিপক্ষ।”
ক্লারা হেসে বলল,
“আর আপনি?”
“আমি এখনও তোমার কাছে হারতে ভালোবাসি।”
–
আজ চারদিন হয়ে গ। চতুর্থ দিনটা ছিল সম্পূর্ণ সমুদ্রের জন্য। সকাল থেকেই দুজন সমুদ্রসৈকতে।
জ্যাক পানিতে নামতেই ক্লারাকে ডাকল।
“চলো।”
“আমি সাঁতার কাটব না।”
“কেন?”
“আমি ভিজতে চাই না।”
জ্যাক কিছু না বলে পানিতে চলে গেল। কয়েক মিনিট পর হঠাৎ একটা ঢেউ এসে ক্লারার পায়ের ওপর আছড়ে পড়ল। ক্লারা চিৎকার করে উঠল।
“জ্যাক!”
দূর থেকে জ্যাক হেসে উঠল। “সমুদ্রের ওপর আমার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই!”
ক্লারা রাগ করে বলল,
“আপনি ইচ্ছে করেই করেছেন!”
জ্যাক ততক্ষণে আবার কাছে চলে এসেছে।
“প্রমাণ আছে?”
“আপনাকে দেখে বোঝা যাচ্ছে।”
“তাহলে শাস্তি দিন।”
ক্লারা পানির এক মুঠো তুলে তার দিকে ছুড়ে মারল।
জ্যাক কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল,
“ঠিক আছে। যুদ্ধ শুরু।”
তারপর দুজনেই শিশুর মতো পানিতে একে অপরকে ভিজিয়ে দিতে লাগল। হাসতে হাসতে একসময় ক্লারা ক্লান্ত হয়ে জ্যাকের কাঁধে হাত রাখল। জ্যাক তার ভেজা চুলের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুমি জানো, তোমাকে এভাবে হাসতে দেখাটা আমার খুব ভালো লাগে?”
ক্লারা মৃদু স্বরে বলল,
“আপনি জানেন, আপনাকে এভাবে হাসতে দেখাটাও আমার ভালো লাগে?”
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
সন্ধ্যায় তারা সৈকতের ধারে হাঁটল।
জ্যাক বালির ওপর আঙুল দিয়ে লিখল—
JACK + CLARA
ক্লারা তার নিচে লিখল, OUT OF BOUNDS
জ্যাক তাকিয়ে হেসে বলল, “আমাদের গল্পের নামও এখানে লিখে ফেললে?”
“হ্যাঁ।”
একটা ঢেউ এসে লেখাগুলো মুছে দিল। ক্লারা কিছুটা বিষণ্ণ হয়ে তাকিয়ে রইল। জ্যাক তার হাত ধরল।
“লেখা মুছে গেছে বলে গল্প মুছে যায় না।”
–
ক্যারিবিয়ান সাগরের বুকে ভেসে থাকা ‘সেন্ট থমাস’ দ্বীপের সকালটা দারুণ। সমুদ্রের স্বচ্ছ নীল পানি আর সাদা বালুকাবেলার ওপর নারকেল গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে সকালের মিষ্টি রোদ ছড়িয়ে পড়েছে। সৈকতের একদম কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা একটা সুবিশাল প্রাইভেট ভিলার কাঠের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে ক্লারা। তার পরনে আজ একখানা সাদা রঙের ড্রেস, চুলগুলো পিঠের ওপর খোলা, চোখে সেই চেনা চশমা। হাতে ধরা এক কাপ গরম ব্ল্যাক কফি। আজ তাদের বোস্টনের বিয়ের পর ক্যারিবিয়ানে মধুচন্দ্রিমার শেষ দিন। হঠাৎ পেছন থেকে এক জোড়া অনাবৃত, উষ্ণ হাত এসে ক্লারার কোমরটা শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরল। জ্যাক এসে দাঁড়িয়েছে। তার পরনে স্রেফ একটা কালো স্পোর্টস শর্টস, চওড়া ছাতিতে ক্যালিফোর্নিয়ার রোদে পোড়া বাদামী আভা। সে তার মুখটা লুকিয়ে ফেলল ক্লারার ঘাড়ের খাঁজে, তার ভেজা চুল থেকে ভেসে আসছিল সমুদ্রের নোনা হাওয়া আর সুগন্ধি শ্যাম্পুর ঘ্রাণ।
“কখন উঠলে, মিসেস মিলার?” জ্যাকের নিচু, অলস আর গভীর গলার শব্দ ক্লারার কানে ফিসফিস করে বাজল। ক্লারা কফির কাপে এক চুমুক দিয়ে পেছনে হেলান দিল, নিজের পিঠটা সঁপে দিল জ্যাকের বিশাল বুকের ওপরে। “সকাল সাতটায়। আপনার মতো বাস্কেটবল প্লেয়ারদের অলস ঘুম তো আমার নেই, মিস্টার ক্যাপ্টেন।”
জ্যাক আলতো করে ক্লারার গালে নিজের ঠোঁট ঘষল। “যিনি সারা রাত আমার বাহুতে বন্দি থাকেন, তাঁর মুখে এত সকালে এই ধরনের খোঁচা মানায় না, মিস ক্যালকুলেটর। তোমার সাজা কিন্তু পাওনা রইল।”
ক্লারা ঘুরে দাঁড়াল। সে দুই হাত দিয়ে জ্যাকের শক্ত, চওড়া গাল দুটো চেপে ধরে মিষ্টি করে হাসল। “অনেক সাজা দেওয়া হয়েছে, মিস্টার মিলার। এখন বোস্টনে ফেরার সময় হয়েছে। আগামী সপ্তাহে বোস্টন ইউনিভার্সিটির নতুন সেমিস্টার শুরু, আর আপনার ইউএসএ ওয়ার্ল্ড কাপ টিমের মেইন ক্যাম্পের ট্রেনিং।”
জ্যাক ক্লারার কপালে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল। সে ক্লারার হাত থেকে কফির কাপটা নিয়ে টেবিলের ওপর রাখল, তারপর এক ঝটকায় ক্লারাকে দুই বাহুতে তুলে নিল! “জ্যাক! কী করছেন! পড়ে যাব তো!” ক্লারা মৃদু চিৎকার করে জ্যাকের গলা জড়িয়ে ধরল।
“তুমি আমার বাহুতে আছো, ক্লারা,” জ্যাক হেসে ব্যালকনি থেকে সমুদ্রের বালুকাবেলার দিকে হেঁটে যেতে যেতে বলল। “আমার হাত থেকে কোনো বল যেমন ফসকে যায় না, তেমনি আমার জীবনের এই সবচেয়ে বড় ট্রফিটাও কখনো হাতছাড়া হবে না। আজ শেষ দিন… কোনো অংক নয়, স্রেফ আমি আর তুমি।”
ক্যারিবিয়ানের সমুদ্রের হাওয়ায় ছড়িয়ে পড়ল এক নবদম্পতির অনাবিল হাসির শব্দ।
–
ক্যারিবিয়ান থেকে বোস্টনে ফেরার পরদিনই ক্লারা জ্যাককে নিয়ে সোজা চলে গেল সাউথ বোস্টনের সেই পুরোনো কলোনি রোডে। আজ তারা আনুষ্ঠানিকভাবে সাউথ বোস্টনের সেই ১২ নম্বর ডর্ম রুমের চাবি বাড়ির মালিককে বুঝিয়ে দিয়ে তাদের পুরোনো সমস্ত স্মৃতি গুটিয়ে নিতে এসেছে। পুরোনো ইটের বিল্ডিংটার সিড়ি বেয়ে ওঠার সময় জ্যাকের মনটা এক অদ্ভুত ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল। এই তিনতলা ডর্ম রুমেই সে প্রথম ক্লারার হাতের কফি খেয়েছিল, এই ঘরেই সে ক্লারার পায়ের পাশে বসে নিজের বাবার ভুলগুলোর জন্য অনুশোচনা করেছিল। ঘরটায় ঢুকে ক্লারা তার পড়ার টেবিলের ওপর রাখা পুরোনো কিছু বই আর রাফ খাতা গুছিয়ে একটা কাঁচের বাক্সে ভরছিল। জ্যাক ঘরের দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখছিল।
“মন খারাপ লাগছে?” জ্যাক নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল।
ক্লারা টেবিলটা আলতো করে হাত দিয়ে স্পর্শ করল। “মন খারাপের চেয়েও কৃতজ্ঞতা বেশি লাগছে, জ্যাক। এই ঘরটা যদি আমাকে না আশ্রয় দিত, তবে আমি আজকের ক্লারা হতে পারতাম না। এই ঘরের দারিদ্র্য আমাকে শিখিয়েছে কীভাবে সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে লড়াই করতে হয়।”
জ্যাক হেঁটে এসে ক্লারার হাতটা ধরল। সে পকেট থেকে একটি নতুন ভারী সিলভারের চাবি বের করল।
“বাড়ির মালিকের কাছ থেকে আমি এই আস্ত তিনতলা বিল্ডিংটাই কিনে নিয়েছি, ক্লারা,” জ্যাকের কথায় ক্লারা অবাক হয়ে তাকাল।
“কী বলছেন আপনি?! পুরো বিল্ডিংটা কিনে নিয়েছেন?!”
“হ্যাঁ,” জ্যাক শান্ত গলায় বলল। “সাউথ বোস্টনের যেসব দরিদ্র শিক্ষার্থীরা ডর্ম রুমের ভাড়ার জন্য পড়াশোনা ছাড়তে বাধ্য হয়, এই বিল্ডিংটা আজ থেকে তাদের জন্য বিনামূল্যে থাকার হোস্টেল হবে। আর আমাদের এই ১২ নম্বর ডর্ম রুমটা যেমন আছে, তেমনই থাকবে। যখনই আমাদের মনে হবে অহংকার আমাদের স্পর্শ করছে, আমরা এই ঘরে এসে রাত কাটাব।”
ক্ল্যারার চোখ জলে ভরে এলো। সে জ্যাকের বুকে মুখ লুকিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল। যে ছেলে একদিন নিজের অহংকারে মানুষকে মানুষ মনে করত না, সেই ছেলেটি আজ এত বড় হৃদয়ের পরিচয় দিচ্ছে! এরপর দুজনে গেল সাউথ বোস্টনের সেই প্রাচীন লাইব্রেরিতে। বুড়ো মিস্টার জনসন চশমাটা নাকের ওপর সোজা করে ডেস্কে বসে বইয়ের ক্যাটালগ করছিলেন। ক্লারা আর জ্যাককে একসাথে ঢুকতে দেখে তিনি হাসিমুখে দাঁড়িয়ে উঠলেন।
“মা ক্লারা! মিস্টার মিলার!”
ক্লারা এগিয়ে গিয়ে বুড়ো জনসনের টেবিলের ওপর একটা বড় খাম রাখল।
“এটা কী, মা?” জনসন সাহেব জিজ্ঞেস করলেন।
“এটা ‘ক্লারা বেনেট ফাউন্ডেশন’-এর তরফ থেকে এই লাইব্রেরি পুনর্নির্মাণের ৫০ হাজার ডলারের চেক, মিস্টার জনসন,” ক্লারা নম্র গলায় বলল। “আর এই লাইব্রেরিতে এখন থেকে সাউথ বোস্টনের সব শিশুর জন্য নতুন বই ও কম্পিউটারের ব্যবস্থা করা হবে। আপনার চাকরিও সারাজীবনের জন্য স্থায়ী করা হলো।”
বুড়ো জনসনের হাত কাঁপছিল। তিনি খামটা জড়িয়ে ধরে ডেস্কে বসে পড়লেন, তাঁর প্রবীণ চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল পরম শান্তির জল।
–
সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা। বোস্টন হারবারের ‘বেনেট অ্যান্ড মিলার হাউস’ আজ ফুল আর মোমবাতির আলোয় সেজে উঠেছে। আজ অফিশিয়ালি নতুন গৃহপ্রবেশ।
আর্থার মিলার, লিয়ো এবং প্রফেসর উইলিয়াম অ্যান্ডারসন ভিলার বিশাল লিভিংরুমে বসে কফির মগ হাতে গল্প করছিলেন। লিভিংরুমের ফায়ার প্লেসে মৃদু কাঠ জ্বলছিল, যা পরিবেশকে বেশ উষ্ণ করে তুলেছিল। একটি নতুন কালো লিমোজিন গাড়ি এসে থামল ভিলার তোরণে। গাড়ি থেকে নেমে এলো জ্যাক আর ক্লারা। ক্ল্যারার পরনে আজ একখানা মার্জিত গাঢ় নীল রঙের লম্বা রেশমি ড্রেস, গলায় জ্যাকের দেওয়া সেই সোনার লকেট, আর ডান হাতে জ্বলজ্বল করছে মিলার বংশের পারিবারিক আংটি। আর জ্যাকের পরনে ক্যাজুয়াল সাদা শার্ট আর নেভি ব্লু ব্লেজার। দরজায় দাঁড়াতেই ভিলার কেয়ারটেকার ও প্রবীণ পরিচারিকারা নতুন গৃহাধ্যক্ষকে বরণ করে নেওয়ার জন্য ট্রে-তে করে আরতি ও প্রদীপ নিয়ে এগিয়ে এলেন। আর্থার মিলার হাসিমুখে এগিয়ে এলেন। “স্বাগতম, আমার রাজপ্রাসাদে!”
ক্লারা আলতো করে ডান পা বাড়িয়ে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করল। গৃহপ্রবেশের এই মুহূর্তটা স্রেফ একটা নতুন বাড়িতে ওঠার গল্প ছিল না ওটা ছিল একটা ভাঙা পরিবারকে জোড়া লাগিয়ে এক নতুন পরম নীড়ের প্রতিষ্ঠার আনন্দ। সবাই মিলে ডাইনিং টেবিলে রাতের খাবারে বসল। টেবিলে সাজানো ছিল ইতালিয়ান পেনি পাস্তা, সাউথ বোস্টনের ট্র্যাডিশনাল রোস্টেড চিকেন আর তাজা ফ্রুট সালাদ। খাবারের মাঝে প্রফেসর অ্যান্ডারসন পাইপটা টেবিলে রেখে ক্লারার দিকে তাকালেন।
“তা, মিসেস ক্লারা বেনেট মিলার… আগামী সপ্তাহের বোস্টন ইউনিভার্সিটির নতুন সেমিস্টার নিয়ে তোমার প্ল্যান কী? তুমি কি এবার পোস্ট-গ্রাজুয়েশনের সাথে অডিট ডিপার্টমেন্টের হেড হিসেবে যোগ দিচ্ছ?”
ক্লারা চশমাটা একটু সোজা করে মুচকি হাসল। সে একবার পাশে বসা জ্যাকের দিকে তাকাল, যে সুস্বাদু চিকেন কাটলেটে কামড় বসাচ্ছিল। “হ্যাঁ, প্রফেসর,” ক্লারা আত্মবিশ্বাসী গলায় বলল। “আমি ইউনিভার্সিটিতে রিসার্চের কাজ চালিয়ে যাব, আর তার সাথে মিলার কর্পোরেশনের সমস্ত নতুন চ্যারিটি ফান্ডের চিফ অডিটর হিসেবে দায়িত্ব নেব। আমি চাই না এই কোম্পানিতে আবার কোনো ভুয়া হিসাবের জালিয়াতি হোক।”
আর্থার মিলার অহংকারের সাথে হাততালি দিয়ে উঠলেন। “একদম ঠিক সিদ্ধান্ত! আমার কোম্পানির অডিট ডিরেক্টরের আসনে আজ থেকে এমন একজন বসেছে, যাকে কোনো টাকা বা ক্ষমতায় কেনা সম্ভব নয়!”
—
পরদিন সকাল। বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের সুবিশাল বাস্কেটবল ইনডোর স্টেডিয়াম। মধুচন্দ্রিমা ও বিয়ের সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে আজ প্রথম কোর্টে অনুশীলনে নেমেছে জ্যাক্সন মিলার। কোর্টের মেঝের ওপর বলের পরিচিত শব্দ প্রতিধ্বনি তৈরি করছে।
জ্যাকের পরনে আবার সেই সবুজ ইউএসএ স্পোর্টস জার্সি নম্বর ৭। কপাল থেকে টপ টপ করে ঘামের ফোঁটা মেঝের ওপর ঝরে পড়ছিল। তার ধূসর চোখে আবার সেই পরিচিত হিংস্র বাস্কেটবল একাগ্রতা ফিরে এসেছে।
সে একাই তিনজনকে কাটিয়ে স্পিন ড্রিবল করে সোজা শূন্যে ভেসে উঠে এক কড়া ‘রিভার্স টু-হ্যান্ড ড্যাঙ্ক’ মারল। গ্যালারিতে বসে থাকা ইউএসএ টিমের হেড কোচ মার্কাস হুইসেল বাজিয়ে চিৎকার করে উঠলেন, “ফ্যান্টাস্টিক, জ্যাক! বিয়ে করার পর তো মনে হচ্ছে তোমার জাম্পিং হাইট আরও দুই ইঞ্চি বেড়ে গেছে!”
টিমের ছেলেরা হাসাহাসি করে উঠল। প্র্যাকটিস সেশনের বিরতিতে জ্যাক তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে গ্যালারির ভিআইপি বেঞ্চের দিকে হেঁটে গেল।
সেখানে বসে আছে ক্লারা। তার কোলের ওপর রাখা ছিল একটা ল্যাপটপ আর অডিটের কিছু জরুরি ফাইল। সে কাজের ফাঁকে ফাঁকে চশমার আড়াল থেকে তার স্বামীর বাস্কেটবল তাণ্ডব উপভোগ করছে। জ্যাক এসে সরাসরি ক্লারার পাশে বসল। সে তোয়ালেটা পাশে রেখে ক্লারার ঘাড়ের কাছে নিজের ভিজে মুখটা এনে এক গভীর শ্বাস নিল।
“আপনার গায়ে ভীষণ ঘাম, মিস্টার ক্যাপ্টেন,” ক্লারা ফাইল থেকে চোখ না সরিয়ে নকল বিরক্তি দেখিয়ে বলল।
“তাতে কী?” জ্যাক তোয়াক্কা না করে ক্লারার গালটায় একটা শক্ত কামড় দেওয়ার ভঙ্গিতে চুমু খেল। “আমার ঘামের গন্ধ তো তোমাকে সইতেই হবে, মিস ক্যালকুলেটর।”
ক্লারা হেসে ফেলে ল্যাপটপটা একপাশে রাখল। সে টিস্যু বের করে অতি পরম মায়ায় জ্যাকের কপালের ও ঘাড়ের ঘাম মুছে দিতে লাগল।
“ওয়ার্ল্ড কাপের দল কিন্তু খুব কঠিন এসেছে, জ্যাক,” ক্লারা বলল। “স্পেন আর লিথুয়ানিয়া দল এবার খুব শক্তিশালী।”
জ্যাক ক্লারার হাতটা ধরে নিজের ঠোঁটে চেপে ধরল। সে ক্লারার চোখে চোখ রেখে বলল, “স্পেন আসুক বা লিথুয়ানিয়া… যে ক্যাপ্টেনের গ্যালারিতে এমন একজন চালিকাশক্তি বসে থাকে, সেই ক্যাপ্টেনকে হারায় সাধ্য কার?”
ক্লারা চশমার আড়াল থেকে মিষ্টি হেসে বলল, “আমি কিন্তু এবার ক্যালিফোর্নিয়া বা স্পেনে আপনার সাথে যাব না। আমাকে বোস্টনের ১০০ মিলিয়নের ট্রাস্ট ফান্ড সামলাতে হবে।”
জ্যাক এক মুহূর্ত থমকে গেল। সে তার ধূসর চোখ দুটো ছোট করে ক্লারার একদম কাছে মুখ আনল।
“তুমি যাবে না মানে?” জ্যাকের গলার স্বর কড়া হয়ে উঠল। “তাহলে আমার ম্যাচের অ্যাঙ্গেল কে হিসেব করে দেবে? আমার মন খারাপ হলে অংক কে মেলাবে?”
“আমি বোস্টন থেকে লাইভ টিভিতে আপনার সমস্ত ফাউল আর শর্ট হিসেব করব,” ক্লারা পরম ভালোবাসায় জ্যাকের শক্ত চিবুকটা ছুঁলো। “আর প্রতিদিন রাতে ফোনে আপনাকে আপনার অংকের ভুলগুলো শুধরে দেব।”
জ্যাক দীর্ঘশ্বাস ফেলে ক্লারার কোলে নিজের মাথাটা রেখে সটান শুয়ে পড়ল। বোস্টনের প্রকাণ্ড বাস্কেটবল ক্যাপ্টেনের এই বালকের মতো নির্ভরতা দেখে ক্লারার বুকের ভেতরটা এক অনাবিল শান্তিতে ভরে গেল।
–
রাত এগারোটা। বোস্টন হারবারের ‘বেনেট অ্যান্ড মিলার হাউস’-এর প্রকাণ্ড কাঁচের ব্যালকনি। বাইরে সমুদ্রের বাতাস বইছে, তরঙ্গের গর্জন শোনা যাচ্ছে মৃদুভাবে। ব্যালকনিতে পাতা নরম সোফায় বসেছিল ক্লারা। তার গায়ে জড়িয়ে ছিল একখানা ইতালিয়ান সুতির চাদর। কোলে খোলা ছিল বোস্টন ইউনিভার্সিটির পোস্ট-গ্রাজুয়েশনের গাণিতিক ফাইনান্সের একটা মোটা বই। জ্যাক এক গ্লাস গরম ডার্ক চকলেট মিল্ক হাতে নিয়ে ব্যালকনিতে এলো।
সে গ্লাসটা ক্লারার হাতে দিয়ে নিজে ক্লারার পাশে বসে তাকে এক হাতে জড়িয়ে ধরে নিজের কাছে টেনে নিল।
“এখনো পড়ালেখা করছ?” জ্যাক চাদরের ভেতরে ক্লারার ছোট হাতটি নিজের বড় হাতের মুঠোয় পুরে নিয়ে জিজ্ঞেস করল।
“হুম,” ক্লারা জ্যাকের কাঁধে মাথা রাখল। “পড়াশোনা না করলে অংক মেলাব কীভাবে, বলুন?”
জ্যাক কিছু বলল না। সে কিছুক্ষণ নিঃশব্দে সমুদ্রের পানির দিকে তাকাল, তারপর ক্লারার দিকে ঘুরে বসল।
“ক্লারা…”
“বলুন?”
“আজ থেকে চার বছর আগে যখন আমরা বোস্টন ইউনিভার্সিটির করিডোরে প্রথম ধাক্কা খেয়েছিলাম,” জ্যাক খুব নিচু, গভীর আর নেশাক্ত গলায় বলা শুরু করল, “তখন কি তুমি কখনো ভেবেছিলে যে সাউথ বোস্টনের এক সাধারণ অনাথ মেয়ে একদিন এই মিলার রাজপ্রাসাদের একমাত্র মালিক হবে?”
ক্লারা বইটা বন্ধ করে পাশে রাখল। সে তার চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রাখল।
তার সেই গভীর, মায়াবী নীল চোখ দুটো সোজা আটকে গেল জ্যাকের ধূসর চোখের মণির ওপর।
“আমি রাজপ্রাসাদ বা ক্ষমতার অংক কখনো কষিনি, জ্যাক,” ক্লারা খুব শান্ত, মিষ্টি ও পরম ভালোবাসায় ভরা গলায় বলল। “আমি স্রেফ একটা জিনিস জানতাম জীবন যতই কঠিন হোক, সততা আর নিজের মেধার ওপর বিশ্বাস রাখলে কোনো শক্তি মানুষকে ধ্বংস করতে পারে না। আর…”
“আর কী?” জ্যাক উন্মুখ হয়ে প্রশ্ন করল।
ক্লারা হাত বাড়িয়ে জ্যাকের শক্ত চোয়ালটা ছুঁলো। “…আর আমি জানতাম, আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন অংকটা ছিল আপনার মতো একরোখা, অহংকারী বাস্কেটবল রাজপুত্রকে ভালোবেসে তাকে মানুষ বানানো। সেই অংকটা আমি মেলাতে পেরেছি, মিস্টার মিলার।”
জ্যাকের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল হাসি। সে ঝুঁকে এলো। সে ক্লারার চিবুকটা আলতো করে ধরে তার ঠোঁটে দীর্ঘ, গভীর ও ব্যাকুল এক স্বস্তির চুমু এঁকে দিল।
চলবে?

