Home "ধারাবাহিক গল্প "Out Of Bounds Out Of Bounds পর্ব-৩৬ এবং শেষ পর্ব

Out Of Bounds পর্ব-৩৬ এবং শেষ পর্ব

0
5

#out_Of_Bounds
#last_part
#ishrat_Jahan_Jarin

সময় তার নিজস্ব নিয়মে বয়ে যায়। আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে দিয়ে বহু ঝড়-ঝাপটা, রোদ-বৃষ্টি আর ঋতুর পরিবর্তন পেরিয়ে দেখতে দেখতে পাঁচটি বছর বোস্টন শহরের ওপর দিয়ে চটে গেছে।মবোস্টন হারবারের আভিজাত্যময় ‘বেনেট অ্যান্ড মিলার হাউস’-এর সুবিশাল বাগানটি আজ নতুন ফুটে থাকা তাজা টিউলিপ, সাদা বেলি আর রকমারি ইতালিয়ান কাসাব্লাঙ্কার সুবাসে ম-ম করছে। প্রকাণ্ড সামুদ্রিক পাইন গাছগুলোর ফাঁক দিয়ে ভোরের নরম সোনালী আলো এসে পড়েছে সুবিন্যস্ত সবুজ ঘাসের গালিচার ওপর। দূরের আটলান্টিকের নীল পানিতে রোদের ঝিলমিল আলো যেন এক অলৌকিক ক্যানভাস তৈরি করেছে। ভিলার দ্বিতীয় তলার কাঁচের রাজকীয় ব্যালকনিতে এক কাপ গরম ব্ল্যাক কফি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন প্রবীণ বিলিয়নেয়ার আর্থার মিলার।
তাঁর মাথার কোঁকড়ানো চুলগুলো এখন সম্পূর্ণ ধবধবে সাদা হয়ে গেছে, কিন্তু তাঁর বলিরেখা পরা মুখে আর সেই পুরোনো নির্দয় করপোরেট অহংকার বা কাঠিন্য নেই। সেখানে আজ ফুটে রয়েছে এক পরম আত্মতৃপ্তি, অসীম প্রশান্তি আর পারিবারিক মায়ার অনাবিল আলো। তিনি আর ডাউনটাউনের সেই খাঁ খাঁ করা পেন্টহাউসে বন্দী জীবন কাটান না, এই হারবার ভিলাই এখন তাঁর সত্যিকারের স্বর্গরাজ্য।
ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে নিচে বাগানের সবুজ ঘাসের মাঠের দিকে তাকিয়ে আর্থার মিলারের প্রবীণ চোখ দুটো হঠাৎ আনন্দে ও আবেগে ভিজে উঠল। নিচে সবুজ মখমলের মতো ঘাসের ওপর বাস্কেটবল ড্রিবল করার সেই পরিচিত মিষ্টি শব্দ প্রতিধ্বনি তৈরি করছে।
সেখানে সাড়ে চার বছরের এক ফুটফুটে চঞ্চল বালক স্পোর্টস জার্সির নম্বর ৭ পরে নিজের একহাতে একটা ছোট আকারের বাস্কেটবল ড্রিবল করার চেষ্টা করছে। তার মাথার চুলগুলো অবিকল জ্যাকের মতো কোঁকড়ানো ও সোনালী আভাযুক্ত, আর তার ডাগর চোখ দুটো ক্লারার মতো একদম গভীর, শান্ত ও নীল!

ছোট্ট বালকটির নাম জেইস মিলার।

“না না, সোনা! বলটা এভাবে কনুই বাঁকিয়ে গ্রিপ করতে হয় না!” মাঠের মাঝখানে এক হাঁটু মাটিতে গেড়ে বসেছিল স্বয়ং ইউএসএ বাস্কেটবল দলের তিনবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ও অলিম্পিক গোল্ড মেডালিস্ট বিখ্যাত ক্যাপ্টেন জ্যাক্সন মিলার! জ্যাকের বয়স এখন ত্রিশের কাছাকাছি। সে পরম ধৈর্যের সাথে তার চার বছরের ছেলের ছোট ছোট দুটো হাত নিজের বিশাল হাতের মুঠোয় ধরে বাস্কেটবল রিংয়ের দিকে নিখুঁত শট নেওয়া শেখাচ্ছে।

“আমার গাণিতিক অংক কিন্তু বলছে, শটটা যদি আরও পাঁচ ডিগ্রি ডানদিকে বাঁকানো হয়… তবেই বলটা সোজা রিংয়ের কোনো ছোঁয়া ছাড়া নেটের ভেতর নামবে!”

হঠাৎ এক মিষ্টি, স্পষ্ট ও ব্যক্তিত্বপূর্ণ গলার আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ল বাগানের বাতাসে। জ্যাক আর ছোট জুনিয়র এক সাথে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। বাগানের পাশ দিয়ে তৈরি করা সুন্দর ট্রেইল দিয়ে ধীর, মার্জিত পায়ে হেঁটে আসছে বোস্টন ইউনিভার্সিটির পোস্ট-গ্রাজুয়েট অডিট ডিপার্টমেন্টের প্রধান এবং ‘ক্লারা বেনেট ট্রাস্ট’-এর গ্লোবাল চেয়ারপার্সন ডক্টর ক্লারা বেনেট মিলার! ক্ল্যারার পরনে আজ একখানা গাঢ় রেশমি পোশাক, চোখে সেই সুপরিচিত বুদ্ধিমত্তার প্রতীক চশমা, আর গলায় জ্বলজ্বল করছে জ্যাকের দেওয়া সেই পুরোনো সোনার লকেটটি। তার রূপ ও ব্যক্তিত্ব যেন গত পাঁচ বছরে আরও কয়েক গুণ বেশি মহিমান্বিত ও তেজস্বী হয়ে উঠেছে। “মাম্মি!” ছোট জুনিয়র বাস্কেটবলটা ছেড়ে দিয়ে এক গাল হেসে দৌড়ে গিয়ে ক্লারার হাঁটু জড়িয়ে ধরল। ক্লারা পরম আদরে নিচু হয়ে তার চার বছরের কলিজার টুকরো ছেলেকে দুই বাহুতে তুলে নিল। সে নিজের ওড়না দিয়ে পরম মায়ায় ছেলের কপাল ও গালের ঘামের ফোঁটাগুলো মুছে দিল।

“তোমার বাবা তোমাকে ভুল অংক শেখাচ্ছিল, তাই না সোনা?” ক্লারা চশমার আড়াল থেকে সেই গভীর নীল চোখে কৌতুক ফুটিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জ্যাকের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসল।

জ্যাক এক হাত দিয়ে নিজের চওড়া বুক চাপড়ে, বলটা এক হাতে উঁচিয়ে সেই পুরোনো পরিচিত ভঙ্গিতে এগিয়ে এলো। “ভুল অংক?!” জ্যাক ক্লারার একদম কাছে মুখ এনে নিচু, কড়া গলায় বলল। “মিসেস মিলার, আপনি হয়তো ভুলেই গেছেন যে আপনার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষটি বিশ্ব বাস্কেটবলের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়দের একজন! আমার শটে কখনো অংকের ভুল হতে পারে না।”

“বাস্কেটবল কোর্টে না থাকতে পারে, মিস্টার ক্যাপ্টেন,” ক্লারা চশমাটা নাকের ওপর সামান্য সোজা করে আলতো চোখ মারল। “কিন্তু এই পরিবারের আর জীবনের আসল অংকটা কিন্তু এখনো এই ‘মিস ক্যালকুলেটর’-এর দেওয়া সূত্র মতোই মেলাতে হয়।”

জ্যাক আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে এক বিশাল হাত দিয়ে ক্লারা ও কোলে থাকা ছোট্ট জুনিয়রকে এক সাথে জড়িয়ে ধরে নিজের চওড়া বুকের মধ্যে পেঁচিয়ে নিল। তিনজনের অনাবিল হাসির শব্দে সাউথ বোস্টনের সমুদ্রের বাতাস যেন এক পরম আনন্দে নেচে উঠল।

দুপুর বারোটা। বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক সেন্ট্রাল প্রাঙ্গণ আজ হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রী, দেশ-বিদেশের আমন্ত্রিত অধ্যাপক, মিডিয়া প্রতিনিধি ও বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের সমাগমে কানায় কানায় পূর্ণ।
আজ বোস্টন ইউনিভার্সিটির শতবর্ষ উদযাপনের সবচেয়ে শুভ ও ঐতিহাসিক মুহূর্ত। আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপরিচিত ‘হল অফ ফেম’-এ প্রথম কোনো নারী স্কলার, সফল গবেষক ও চ্যারিটি আইকনের স্থায়ী ব্রোঞ্জের আবক্ষ মূর্তি এবং বিশেষ সম্মাননা স্মারক উন্মোচন করা হচ্ছে। মঞ্চের মূল ভিআইপি আসনে বসেছিলেন বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস ডিন প্রফেসর উইলিয়াম অ্যান্ডারসন, মিলার গ্লোবাল কর্পোরেশনের মূল ডিরেক্টর আর্থার মিলার, লিয়ো এবং সাবেক জাতীয় বাস্কেটবল ক্যাপ্টেন জ্যাক্সন মিলার। প্রফেসর অ্যান্ডারসন মাইক হাতে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে উঠলেন। তাঁর বয়সের ভারে প্রবীণ কন্ঠস্বর আজ গভীর আবেগে ও আনন্দে কেঁপে উঠছে।

“আমার প্রিয় ছাত্র-ছাত্রীবৃন্দ ও সুধী মণ্ডলী,” প্রফেসর অ্যান্ডারসন পুরো অডিটোরিয়ামে চোখ বুলিয়ে বলা শুরু করলেন। “আজ থেকে বেশ কিছু বছর আগে সাউথ বোস্টনের মেহনতী মানুষের পাড়া থেকে এক অনাথ, অসহায় মেয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজায় প্রথম পা রেখেছিল। তার কাছে কোনো রাজকীয় নাম ছিল না, কোনো ধনকুবের বাপের পরিচয় ছিল না… তার কাছে ছিল স্রেফ একজোড়া চশমা, কিছু খাতা-কলম আর সততার এক পর্বতসম মানসিক শক্তি।”

পুরো সুবিশাল হলরুম এক লহমায় পিনপতন নীরবতায় ডুবে গেল। “সেই অনাথ মেয়েটি বোস্টনবাসীকে প্রমাণ করে দিয়েছে যে মেধা ও চরিত্র কখনো টাকার দাসে পরিণত হয় না। সে কেবল এক শতকোটি ডলারের করপোরেট সংস্থাকে দেউলিয়া ও জালিয়াতির হাত থেকে বাঁচায়নি, সে এই বোস্টন শহরের হাজার হাজার দরিদ্র ও এতিম শিশুর শিক্ষার দায়িত্ব নিয়েছে। এমনকি আমাদের এই একরোখা, অহংকারী বাস্কেটবল অধিনায়ক জাক্সন মিলারকে ভালোবাসার পবিত্র পথ দেখিয়েছে। আজ আমরা অত্যন্ত গর্বের সাথে এই ঐতিহাসিক প্রাঙ্গণে উন্মোচন করছি, ‘দ্য প্রাইড অফ বোস্টন: ডক্টর ক্লারা বেনেট মিলার’-এর স্থায়ী সম্মাননা স্মারক!”

প্রফেসরের কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথে প্ল্যাটফর্মের ওপর থাকা লাল ভেলভেটের সুবিশাল পর্দাটি উন্মুক্ত হয়ে গেল! উন্মোচিত হলো নিখুঁত ব্রোঞ্জের তৈরি ক্লারার এক চমৎকার সুদৃশ্য আবক্ষ মূর্তি। মূর্তির নিচে ধবধবে সাদা মার্বেল পাথরে স্বর্ণাক্ষরে খোদাই করে লেখা, “সততাই মানুষের আসল আভিজাত্য, মেধা ও চরিত্রই পৃথিবীর একমাত্র স্থায়ী রাজপ্রাসাদ।”
ডক্টর ক্লারা বেনেট মিলার

হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও অতিথি নিজেদের আসন ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কানে তালা লাগা করতালি ও উল্লাসে ফেটে পড়ল। ক্লারা মঞ্চে দাঁড়িয়ে উপস্থিত সবার সামনে মাথা নত করে নম্র শ্রদ্ধা জানাল। তার নীল চোখ দুটো পরম কৃতজ্ঞতায় জলে ভেসে যাচ্ছিল। সে দূর থেকে দেখতে পেল গ্যালারির প্রথম সারিতে বসে থাকা সাউথ বোস্টনের সেই পুরোনো লাইব্রেরির প্রবীণ মিস্টার জনসন এবং সাউথ বোস্টন অনাথ আশ্রমের শিশুরা আনন্দে হাততালি দিচ্ছে।
জ্যাক মঞ্চে উঠে এলো। সে হাজারো ক্যামেরা ও দর্শকদের সামনে পরম মায়ায় ক্লারার হাতটি নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরল এবং তার কপালে এক দীর্ঘ, আবেগঘন চুম্বন ছুঁইয়ে দিল।

বিকেল চারটে। সাউথ বোস্টনের সেই পুরোনো কলোনি রোড। পাঁচ বছর পর আজ আবার সেই ঐতিহাসিক ১২ নম্বর ডর্ম রুমে ফিরে এসেছে জ্যাক আর ক্লারা। ছোট্ট জুনিয়রকে আজ দাদু আর্থার মিলারের জিম্মায় রেখে তারা দুজন স্রেফ একান্তে কিছু বিশেষ মুহূর্ত কাটাতে এসেছে তাদের ভালোবাসার সূচনা হওয়া সেই পুরোনো নীড়ে। আজকের এই ১২ নম্বর ডর্ম রুমটি আর কোনো জীর্ণ বা অবহেলিত ঘর নয়। বিল্ডিংয়ের এই তিনতলার দরজার পাশে পেতলের সুন্দর প্লেটে খোদাই করে লেখা, ‘বেনেট অ্যান্ড মিলার’স হিস্টোরিক্যাল রুম’ এখন পুরো তিনতলা বিল্ডিংটি এখন ক্লারার ট্রাস্টের অধীনে বিনামূল্যে গরিব শিক্ষার্থীদের হোস্টেল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। জ্যাক চাবি ঘুরিয়ে পুরোনো মেহগনি কাঠের দরজাটি খুলল। ঘরটা ঠিক আগের মতোই সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে সেই পড়ার কাঠের ডেস্কে ছড়ানো কিছু অডিটের খাতা, সেই কোণের ছোট গ্যাসের স্টোভ, আর দেয়ালে ঝুলতে থাকা বোস্টন ইউনিভার্সিটির ফার্স্ট ইয়ারের সেই চেনা বাঁধানো ছবিটা। ক্লারা ঘরের ভেতরে ঢুকে তার পুরোনো পড়ার টেবিলে গিয়ে হাত বোলাল। ধুলোহীন কাঠের স্পর্শে তার মনে পড়ে গেল শত শত স্মৃতির দৃশ্যপট।

“মনে আছে, জ্যাক?” ক্লারা মিষ্টি হেসে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। “এই ডেস্কে বসেই আমি ১০ মিলিয়ন ডলারের ব্লাঙ্ক চেকটা ছিঁড়ে আপনার মুখে ছুঁড়ে মেরেছিলাম।”

জ্যাক পেছন থেকে ধীর পায়ে হেঁটে এসে ক্লারার কোমরটা দুই হাতে শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরল। সে তার চিবুকটা আলতো করে চেপে রাখল ক্লারার কাঁধের ওপর। “হুম, প্রতিটা সেকেন্ড মনে আছে,” জ্যাক নিচু, গভীর আর নেশাক্ত গলায় বলল। “আর ঠিক সেই দিনই এই অহংকারী, বিপথগামী জাক্সন মিলার প্রথম বুঝতে পেরেছিল যে এই পৃথিবীতে এমন একজন নারী আছে যাকে কোনো টাকা বা ক্ষমতার জোরে কেনা সম্ভব নয়। যে আমার জীবনের সমস্ত পঙ্কিলতা আর অন্ধকার এক নিমেষে মুছে দিতে পারে।”

জ্যাক আলতো করে ক্লারাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। সে ক্লারার চশমাটা সাবধানে খুলে পড়ার টেবিলে রাখল ঠিক যেভাবে পাঁচ বছর আগে তাদের বিয়ের রাতে রেখেছিল। চশমা ছাড়া ক্লারার সেই গভীর, সুপ্রিয় নীল চোখ দুটোর দিকে এক মুহূর্ত মুগ্ধ হয়ে তাকাল জ্যাক। “তুমি আমাকে একটা পুরো নতুন জীবন দিয়েছ, ক্লারা,” জ্যাকের গলার স্বর গভীর অনুশোচনা ও ভালোবাসায় ভারী হয়ে এলো। “যদি সাউথ বোস্টনের এই ডর্ম রুমটা না থাকত, তবে আমি হয়তো সারাজীবন এক অভিশপ্ত কোটিপতির অহংকারী ছেলে হয়েই ধ্বংস হয়ে যেতাম।”

“আর আপনি না থাকলে,” ক্লারা পরম ভালোবাসায় জ্যাকের শক্ত, ছাঁচে ঢালা গালে হাত রাখল, “তবে এই অনাথ মেয়েটি কখনোই জানতে পারত না যে ভালোবাসার পরম শক্তি দিয়ে কীভাবে একটা কঠিন পুরুষকে জয় করা যায়।”

জ্যাক আর এক মুহূর্তও কথা বলল না। সে ঝুঁকে এসে ক্লারার রেশমি ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল। সাউথ বোস্টনের সেই ছোট্ট আঠারো বাই বারো ফুটের ঘরে তখন ঝরে পড়ছিল পরম একাত্মতার এক চিরন্তন, অনাবিল ভালোবাসা।

সন্ধ্যা ছয়টা।৷ বোস্টন হারবারের ‘বেনেট অ্যান্ড মিলার হাউস’-এর সুবিশাল প্রাইভেট বিচ। আটলান্টিক মহাসাগরের বিস্তীর্ণ জলরাশির ওপর ধীরে ধীরে অস্ত যাচ্ছিল সূর্য। পুরো পশ্চিম আকাশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল লাল, বেগুনি, গোলাপি আর সোনালি আলোর অপরূপ মায়াবী খেলা। সমুদ্রের বুকের ওপর সেই শেষ বিকেলের আলো যেন গলিত সোনার আস্তরণ বিছিয়ে দিয়েছে। দূরে কয়েকটি পালতোলা নৌকা ধীরগতিতে এগিয়ে চলেছে। গাংচিলগুলো ডানাপাপড়ি মেলে আপন নীড়ে ফিরে যাচ্ছে, আর হিমেল সমুদ্রের হাওয়া তটে এসে মৃদু ঢেউয়ের তোড় তৈরি করছে। সমুদ্রের একদম কোল ঘেঁষে রাখা প্রাচীন কাঠের লম্বা বেঞ্চটিতে পাশাপাশি হেলান দিয়ে বসেছিল জ্যাক আর ক্লারা। ক্লারা নিজের পুরো শরীর ও পিঠটা সঁপে দিয়েছিল জ্যাকের সুবিশাল, উষ্ণ বুকের ওপর। জ্যাকের দুটো বড় হাত মমতায় ঘিরে ছিল ক্লারার কোমর। পাঁচ বছর আগের সেই উচ্ছৃঙ্খল, অহংকারী, নিজের ক্ষমতা নিয়ে গর্বিত জ্যাক্সন মিলারের চোখে আজ অদ্ভুত এক প্রশান্তি। একটু দূরে নরম বালির ওপর ছোট্ট জেইস মিলারকে নিয়ে বাস্কেটবল খেলছিলেন আর্থার মিলার ও লিয়ো।
সাড়ে চার বছরের জেইস বলটা দুই হাতে বুকে চেপে ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। তারপর হঠাৎ নিজের ছোট্ট হাত দিয়ে বলটা ছুড়ে দিল দাদুর দিকে। বলটা আর্থারের কাছে পৌঁছানোর আগেই বালিতে গড়িয়ে গেল।
“দাদু! আবার! আবার!” জেইস খিলখিল করে হেসে উঠল।
আর্থারও শিশুর মতো হেসে বলটা তুলে নিলেন।
“এই যে, আমার ছোট্ট চ্যাম্পিয়ন! এবার কিন্তু দাদুকে হারাতে হবে।”
“আমি তো বাবাকেও হারাব!”
জেইসের আত্মবিশ্বাসী ঘোষণা শুনে দূরের বেঞ্চে বসে থাকা জ্যাক হেসে ফেলল।
ক্লারা মুচকি হেসে মাথাটা আরও একটু জ্যাকের বুকে ঠেকিয়ে দিল।
“আপনার ছেলে কিন্তু আপনাকেই হারানোর পরিকল্পনা করছে, ক্যাপ্টেন।”
“আমার ছেলে?” জ্যাক ভ্রু তুলে তাকাল। “ওর সাহস তো পুরোপুরি তোমার কাছ থেকেই এসেছে, মিস ক্যালকুলেটর।”
ক্লারা মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
“সাহস থাকলেই তো হয় না। অংকও জানতে হয়।”
“আবার অংক!”
জ্যাক বিরক্ত হওয়ার ভান করতেই ক্লারা হেসে উঠল।
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে রইল।
সামনে তখন সূর্যটা আরও একটু নিচে নেমে গেছে। ক্লারা সাগরের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলল,
“আজকের এই সন্ধ্যেটা বড্ড বেশি সুন্দর, তাই না, ক্যাপ্টেন?”
জ্যাক ক্লারার ঘাড়ের চুলে নিজের মুখ লুকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“তোমার পাশে কাটানো প্রতিটা সেকেন্ডই আমার কাছে পরম ঈশ্বরের দেওয়া এক একটা উপহার, ক্লারা।”
ক্লারার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
জ্যাক ধীরে ধীরে ক্লারার ডান হাতটি নিজের হাতে তুলে নিল। ক্লারার অনামিকায় থাকা সেই শতাব্দী-পুরোনো মিলার বংশের রাজকীয় ডায়মন্ড রিংটিতে অস্তগামী সূর্যের লালচে আলো পড়ে স্ফুলিঙ্গের মতো ঝলমল করে উঠল।
জ্যাক কিছুক্ষণ আংটিটির দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব ধীরে বলল,
“ক্লারা…”
“বলুন, জ্যাক?”
“আমাদের গল্পের শেষ অংকটার সমাধান কী হলো বলো তো?”
ক্লারা সামান্য ঘুরে বসল। চশমার আড়াল থেকে জ্যাকের সেই ধূসর চোখ দুটির দিকে তাকাল। সেই চোখে আজ কোনো অতীত ক্রোধ নেই, কোনো তাচ্ছিল্য নেই। আছে শুধু ভালোবাসা।
ক্লারা মায়াময় গলায় বলল,
“আমাদের গল্পের কোনো দিন শেষ হতে পারে না, জ্যাক। কারণ যে গল্প সততা, আত্মসম্মান, সংগ্রাম আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসার ওপর গড়ে ওঠে… সেই গল্প কোনো এক পর্বের ইতি টেনে শেষ হয় না। তা চিরকালের জন্য অমর উপাখ্যান হয়ে মানুষের হৃদয়ে থেকে যায়।”
জ্যাক কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে ক্লারার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর কোনো উত্তর না দিয়ে ক্লারাকে নিজের দুই বাহুর শক্তিশালী বেষ্টনীতে সম্পূর্ণ আগলে নিয়ে নিজের একদম কাছে টেনে নিল।
ক্লারা চোখ বন্ধ করে জ্যাকের বুকে মুখ লুকিয়ে ফেলল।
দূরে তখন আর্থারের হাসির শব্দ ভেসে আসছে।
“জেইস! বলটা এদিকে ছুড়ো!”
“দাদু, তুমি ধরতে পারবে তো?”
“অবশ্যই পারব!”
“কিন্তু তুমি তো বুড়ো!”
জেইসের কথা শুনে আর্থার হেসে কাশতে কাশতে বললেন,
“ওহ্! এই ছেলেকে আজ বাস্কেটবল শেখাব না, শাস্তি দেব!”
জেইস দৌড়ে পালাতে পালাতে চিৎকার করে উঠল,
“পাপা ! পাপা! দাদু আমাকে ধরতে আসছে!”
জ্যাক আর ক্লারা দুজনেই হেসে উঠল।
কিছুক্ষণ পর জেইস দৌড়ে এসে সরাসরি জ্যাকের পায়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
“পাপা পাপা!”
জ্যাক সঙ্গে সঙ্গে নিচু হয়ে তাকে কোলে তুলে নিল।
“কী হয়েছে, আমার চ্যাম্পিয়ন?”
জেইস বাবার গলা জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ছোট্ট আঙুল দিয়ে সমুদ্রের দিকে দেখাল।
“পাপা, সূর্যটা কোথায় যাচ্ছে?”
জ্যাক ছেলের দেখানো দিকে তাকাল।
“ওটা ঘুমাতে যাচ্ছে, সোনা।”
জেইস অবাক চোখে সূর্যের দিকে তাকিয়ে রইল।
“কাল আবার আসবে?”
জ্যাক হেসে ছেলের কপালে চুমু দিল।
“হ্যাঁ। কাল আবার আসবে।”
জেইস কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর হঠাৎ বাবার গলা থেকে মুখ তুলে মায়ের দিকে তাকাল।
“মাম্মি…”
“হুম, সোনা?”
“সূর্য যদি কাল আবার আসে, তাহলে আমরা কি কালও সবাই একসাথে এখানে থাকব?”
ক্লারার চোখের কোণে হঠাৎ অদ্ভুত এক মায়া জমে উঠল।
সে এগিয়ে এসে জেইসের গালে হাত রাখল।
“অবশ্যই থাকব।”
জেইস তখন মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে হেসে উঠল।
“তাহলে আমি ঠিক করেছি—আমাদের পরিবার কখনো আলাদা হবে না!”
জ্যাক আর ক্লারা একে অপরের দিকে তাকাল।
সেই এক মুহূর্তে তাদের চোখের সামনে যেন ভেসে উঠল পাঁচ বছর আগের সেই ছোট্ট ডর্ম রুম, ১০ মিলিয়ন ডলারের ছেঁড়া চেক, অসংখ্য ভুল বোঝাবুঝি, অহংকার, অশ্রু, সংগ্রাম আর শেষ পর্যন্ত ভালোবাসার কাছে সমস্ত সীমারেখার পরাজয়।
জ্যাক ছেলেকে এক হাতে বুকে জড়িয়ে নিল, অন্য হাত দিয়ে ক্লারার হাতটা শক্ত করে ধরে রাখল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
“হ্যাঁ, জেইস। আমরা কখনো আলাদা হব না।”
ছোট্ট জেইস বাবার বুকের ওপর মাথা রেখে মিষ্টি গলায় বলল,
“কারণ আমরা তো একটা পরিবার।”
ক্লারা চোখ বন্ধ করে হাসল।
দূর দিগন্তে রক্তিম সূর্যটা তখন আটলান্টিকের নীল জলে সম্পূর্ণ তলিয়ে গেছে। আকাশের শেষ আলোটুকুও ধীরে ধীরে মিলিয়ে গিয়ে বোস্টন হারবারের ওপর নেমে এলো শান্ত নীল রাত। আর্থার কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে নিজের ছেলে, পুত্রবধূ আর নাতির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
জ্যাক এক বাহুতে জেইসকে আর অন্য বাহুতে ক্লারাকে আগলে রাখল। আর সেই ছোট্ট পরিবারটির চারপাশে সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দের সঙ্গে একে একে জ্বলে উঠতে লাগল রাতের হাজারো তারা। হয়তো কিছু গল্পের সত্যিই কোনো শেষ থাকে না। কিছু গল্প সময়ের সীমানা পেরিয়ে বেঁচে থাকে। আর কিছু ভালোবাসা
জীবনের সমস্ত সীমা পেরিয়ে, শেষ পর্যন্ত নিজের ঠিকানাটা খুঁজে নেয়।

(সমাপ্ত)