Home "ধারাবাহিক গল্প "অবহেলার মুক্তা অবহেলার মুক্তা পর্ব-০৬

অবহেলার মুক্তা পর্ব-০৬

0
5

#অবহেলার_মুক্তা
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_৬

দরজায় থমকে দাঁড়িয়ে রইল রফিক শেখ। নব্বইয়ের দশকের শ্রাবণের সেই স্যাঁতসেঁতে মেঘলা দিনে রফিকের চেহারা লাল হয়ে উঠেছে রাগে। পরনে তার হাটের খাদি ধুতি আর ঢিলেঢালা ফতুয়া। হাট থেকে ফেরার পথে ঘরের গোলমালের আওয়াজ শুনে সে আর এক মুহূর্ত দেরি করেনি।

ঘরের ভেতরে তখন এক বিষাক্ত নাটক জমে উঠেছে। ইদ্রিস মাতব্বর একপাশে দাঁড়িয়ে গোঁফে হাত বুলাচ্ছেন, আর উঠোনে জমা হওয়া গাঁয়ের চ্যাংড়া-প্যাংড়ারা উঁকিঝুঁকি মারছে।

জাহিদ অমনি বুক ফুলিয়ে সামনে এগিয়ে এল। মুখে তার বিজয়ের শয়তানি হাসি। সে গ্রামের আঞ্চলিক টানে চেঁচিয়ে উঠল, “আয় রফিক ভাই, সচক্ষে দেইখা যা তোর এই ‘সতী-সাধ্বী’ বউয়ের কীর্তিকলাপ! তুই তো হাটে গেলি আর অমনি তোর ঘরের এই ভুদাই বউ আইসা শাশুড়ির সিন্দুক ভেঙে সোনা-দানা চুরি করতে নামল!”

শিউলি আঁচল দিয়ে চোখের পানি মুছতে মুছতে সুর তুলে কেঁদে উঠল, “ও রফিক ভাই রে! আমার কথা তো বিশ্বাস করলা না, আমারে বাপের বাড়ি তাড়াইয়া উনারে তো সোনার সিংহাসনে বসাইলা! এখন দ্যাহো, শাশুড়ি মা দরগায় যাইতে না যাইতেই তোমার ঘরের এই কালঙ্কী বউ সিন্দুকের তালা খুইলা সোনা-রূপা চুরির ফন্দি আঁটছে! করিমন বুবু বাধা দিতে গেছিল বইলা উনারে কেমন মারছে!”

করিমন অমনি মাটিতে ধপাস করে বসে পড়ে হাঁউমাউ করে উঠল, “ও মারে! মোরে মাইরা ফালল রে! আমি হেই সকালে আইয়া দ্যাহি মরিয়ম সিন্দুকের তালা খুলে কলসি ঝনঝনাইয়া ভাঙে! আমি কইলাম, ‘ও বুবু, এ তুমি কী করতাছ?’ অমনি মোরে ঠ্যালা মাইরা ফ্যালাইয়া দিল! ও ইদ্রিস মাতব্বর কাকা, বিচার করেন! এই ডাকাত মাইয়ার বিচার করেন!”

পুরো ঘরজুড়ে শিউলি আর করিমনের সেই চিৎকার, আর মাতব্বরের গম্ভীর হাঁকডাক। মরিয়ম ঘরের কোণে মাটির সিন্দুকটার পাশে একলা দাঁড়িয়ে থরথর করে কাাঁপছিল। তার হাতে তখনও সেই সিন্দুকের ভারী পিতলের চাবিটা ধরা। সে তো সিন্দুক খুলেছিল করিমন আর শিউলির কথা বিশ্বাস করেই! ওরা যে কীভাবে পিছন থেকে পিতলের ঘটি উল্টে দিয়ে নিজে চিল্লাচিল্লি শুরু করল, সরল মরিয়ম তা বুঝতেই পারেনি।

মরিয়ম চোখের পানিতে ভেসে রফিকের দিকে তাকাল। তার নরম গলার স্বর কান্নায় আটকে আসছিল, “আমি… আমি কিছু চুরি করি নাই গো! করিমন আর শিউলি আপাই তো মোরে ডেকে আনল… বলল আপনি নাকি বলে গেছেন…”

“চুপ কর!” জাহিদ হুঙ্কার দিয়ে উঠল, “একদম মিথ্যা কথা কবি না! রফিক ভাই তোরে কী বইলা যাইব? চাবি তো ছিল আম্মার আঁচলে! তুই আম্মার ঘর থিকা চাবি চুরি কইরা সিন্দুক খুলছোস, আবার আবার আমাদের নামে দোষ দিস?”

ইদ্রিস মাতব্বর উনার হাতের লাঠিটা মাটিতে ঠুকে বললেন, “হ, রফিক! জাহিদ তো ভুল কয় নাই। সিন্দুক তো মরিয়মের হাতেই খোলা হইছে! গ্রামের মুরুব্বি হয়া আমি এই চুরি বরদাশত করব না। তোর বউরে গ্রামসভা ডেকে শাস্তি দিতে হবে!”

রফিক শেখ ঘরের মাঝখানে এসে দাঁড়াল। ওর দীর্ঘ ছায়া পুরো ঘরের ওপর পড়ল। সে একবার সিন্দুকের দিকে তাকাল, একবার করিমনের ছিঁড়ে ফেলা আঁচলের দিকে তাকাল, আর তারপর শান্ত, কিন্তু বরফের মতো ঠান্ডা চোখে তাকাল শিউলি আর জাহিদের দিকে।

ওর গলার আওয়াজ পুরো বাঁশঝাড় কাঁপিয়ে তুলল।
“থাম তোরা! হগলে এক লগে ঘেউঘেউ শুরু করছোস ক্যা?”

রফিক শেখের সেই ধমকে এক মুহূর্তে ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল। মাতব্বর সাহেবও ঢোক গিলে একটু পিছিয়ে গেলেন। রফিকের চোখ দুটো তখন আগ্নেয়গিরির মতো জ্বলছে।

রফিক ধীরপায়ে জাহিদের একদম সামনে এসে দাঁড়াল।”জাহিদ, তুই যেন কী কইলি? সিন্দুক নাকি মরিয়ম চাবি চুরি কইরা খুলছে?”

জাহিদ বুক ফুলিয়ে বলল, “হ! চাবি মরিয়মের হাতে না? তো আর কে খুলব? শিউলি আর করিমন বুবু তো সচক্ষে দেখল উনারে সিন্দুক খুলতে!”

রফিক একচিলতে কড়া, বিষাক্ত হাসি হাসল। সে ঘুরে শিউলির দিকে তাকাল।”শিউলি, তুই যেন কী কইতাছিলি? মরিয়ম নাকি এই ঘরের চোর, আর তুই নাকি ধোয়া তুলসী পাতা? আর করিমন বুবু, তুমি কইলা মরিয়ম সিন্দুক খুইলা সোনা চুরি করতাছিল?”

করিমন চোখ গোল গোল করে বলল, “হ… হ রফিক ভাই! আমি তো নিজের চোখেই দ্যাহলাম!”

রফিক এবার পকেট থেকে একটা চকচকে পিতলের গোল চাবির তোড়া বের করে হাতের তালুতে নাচাতে লাগল।

কাঁচের মতো পরিষ্কার আওয়াজে বাজতে লাগল চাবির তোড়াটা!

সবাই থমকে গেল। রফিক শেখ চাবির তোড়াটার দিকে তাকিয়ে বিকট এক হাঁক ছাড়ল, “তবে রে শয়তানের দল! মা সকালে দরগায় যাওয়ার আগে উনার সিন্দুকের আসল চাবি আমার হাতে সঁপিয়া দিয়া গেছে! এই যে আসল চাবি আমার পকেটে! তাহলে মরিয়ম যেই চাবি দিয়া সিন্দুক খুলল, সেই ডুপ্লিকেট চাবি মরিয়মের হাতে এল কোত্থেকে?”

কথাটা যেন পুরো ঘরে একটা বিকট বাজ হয়ে পড়ল!
জাহিদের মুখের রং এক মুহূর্তে মেটে হয়ে গেল। শিউলির চোখের মণিদুটো ভয়ে কপালে উঠল, আর করিমন হাঁ করে মাটিতে বসে রইল।

রফিক এক পা এগিয়ে শিউলির কাছে গেল। ওর গলার আওয়াজ চাবুকের মতো ফেটে পড়ল, “তুই ভাবছোস রফিক শেখ হাটে গেলে তোর আর এই চোর করিমনের শলা-পরামর্শ আমি টের পাব না? এক বছর আগে তুই যখন এই ঘর থিকা আমার মায়ের সোনার হার চুরি কইরা নিজের বাপের বাড়ি সরাইছিলি, তখন যে ডুপ্লিকেট চাবি বানাইছিলি—সেই চাবিটা তুই এই এক বছর থিকা নিজের কাছে লুকাইয়া রাখছিলি! আজ সকালে মা দরগায় যাইতে না যাইতেই তুই আর করিমন মিলে সরল মরিয়মকে বুজরুকি বুঝাইয়া চাবিটা উনার হাতে দিয়া সিন্দুক খোলাইছোস! যাতে তোরা মোরে দেখাইতে পারোস মরিয়ম চোর!”

মরিয়ম বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে রফিকের দিকে তাকিয়ে রইল। সে জানতও না যে শিউলি ওকে যে চাবিটা দিয়েছিল, সেটা শিউলির পুরোনো বানানো ডুপ্লিকেট চাবি!

ইদ্রিস মাতব্বর ফ্যাকাশে মুখে বললেন, “এ… এসব কী শুনতাছি রফিক? ডুপ্লিকেট চাবি?”

রফিক এক ঝটকায় করিমনের সামনে গিয়ে তার হাতটা ধরে টান দিল। করিমনের শাড়ির ভাজ থেকে ঝনঝন করে নিচে খসে পড়ল মার সিন্দুকের ভেতরের একটা সোনা বাধানো রুলি আর এক তোড়া রূপার নুপুর! যা করিমনেরাই গোলমালের সুযোগে সিন্দুক থেকে বের করে আঁচলে লুকিয়েছিল!

“এই দ্যাখেন মাতব্বর কাকা!” রফিক গর্জে উঠল, “চোর কে! মরিয়ম, না কি আপনার এই দুই সতী-সাধ্বী জা? মরিয়ম সিন্দুক খুলছে ঠিকই, কিন্তু উনারে সরল পাইয়া ফান্দে ফালাইছে এই শিউলি আর করিমন! আর আমার ছাওয়াল ভাই জাহিদ হেই ফান্দের ঢোল বাজাইতে গ্রামবাসী ডেকে আনছে!”

উঠোনের গ্রামবাসী এবার ফিসফিস বাদ দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “আরে দূর! এ তো শিউলি আর করিমনেরই চাল! ডুপ্লিকেট চাবি তো শিউলির কাছেই আছিল!”

জাহিদ ভয়ে দু-পা পিছিয়ে গিয়ে বলল, “র-রফিক ভাই… আমি তো কিছু জানি না… শিউলি মোরে কইছিল…”

“চুপ কর হারামজাদা!” রফিক এক চ-ড় মা-রল জাহিদের গালে। চ-ড়ের চোটে জাহিদ উঠোনের মাটিতে আছাড় খেয়ে পড়ল।

রফিক এবার মাতব্বরের দিকে ঘুরল, “কাকা, এবার বিচারে বসেন! দুই জা মিলে আমার বউরে চোর বানাইতে বানাইয়া চক্রান্ত করছে, আর সিন্দুকের সোনা চুরি কইরা আঁচলে লুকাইছে! এদের কী শাস্তি হওয়া উচিত?”

ইদ্রিস মাতব্বর নিজের ইজ্জত বাঁচাতে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। তিনি কাঁপতে কাঁপতে বললেন, “অপরাধ তো স্পষ্ট রফিক! শিউলি আর করিমন পুরো গ্রামের সামনে জঘন্য কাজ করছে। করিমনের স্বামীকেও ডাকা হোক, আর শিউলিরে এই মুহূর্তে জাহিদের সাথে জুতোপেটা করে ভিটে থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হোক!”

শিউলি আর করিমন এবার ভয়ে রফিকের পায়ে এসে পাপা করতে লাগল, “ও রফিক ভাই! মোদের মাপ কইরা দাও! মোরা জাহিদের কথায় এই কাজ করছি! মোদের পুলিশে দিয়ো না!”

মরিয়ম এতক্ষণ একপাশে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। তার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি গড়াচ্ছিল, কিন্তু এবার সে পানির মাঝে কষ্টের চেয়ে রফিকের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা রূপ নিল। এই পুরুষটি শুধু তাকে স্ত্রীর মর্যাদা দেয়নি, বরং পশুর মতো শকুনের দল যখন তাকে ছিঁড়ে খেতে চেয়েছিল, তখন পাহাড়ে মতো সামনে দাঁড়িয়ে তাদের চক্রান্তের মুখোশ টেনে ছিঁড়ে ফেলেছে।

চলবে,,,,